ইন্দ্রের কথার মধ্যে মায়া ছিল। কৌশল ছিল। ধরুন, কোনও পিতা তার সন্তানকে কোনও একটি অঙ্গরাজ্যের রাজা করে দিয়েছেন। হঠাৎ সন্তান সেই রাজ্য নিয়ে বিপাকে পড়ল। পিতা এলেন সন্তানের জন্য যুদ্ধ করতে। যুদ্ধে যদি জয় লাভ করা যায়, তবে পিতা কী করেন? তিনি পুনরায় তার সন্তানকে আপন রাজ্যে সুস্থিত করে ফিরে আসেন। দেবরাজ ইন্দ্র যে রজির পায়ে মাথা খুঁড়ে তার পুত্রত্ব স্বীকার করে নিলেন তার একটাই মানে। অর্থাৎ পিতা হয়ে কি কেউ পুত্রের রাজ্য দখল করে সেই রাজ্যের রাজা হয়ে বসেন? রজি ইন্দ্রের চালাকি সব বুঝলেন। কিন্তু সব বুঝলেও তিনি চন্দ্রবংশের গরিমা বহন করেন। শত্রুপক্ষে থেকেও যদি কোনও প্রধান-পুরুষ এইভাবে পায়ে মাথা ঠেকিয়ে নিজের দৈন্য প্রকাশ করে, তবে তাকে তার অভীষ্ট বস্তু ফিরিয়ে দিতেই হয়–অনতিক্ৰমণীয়া হি বৈরিপক্ষাদপ্যনেকবিধ-চাটু-বাক্যগর্ভা প্রণতিঃ।
রজি ইন্দ্রের রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে গেলেন। স্বর্গে ইন্দ্র রাজত্ব করতে লাগলেন–শতক্রতুরপীত্বং চকার। অসুর-বিজয়ের পরিবর্তে স্বর্গে ইন্দ্র হওয়ার যে ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন রজি, স্বয়ং ইন্দ্রের মায়া-চাটুবাদে তা বিফল হয়ে গেল। রজি মর্ত্যভূমিতে নিজের রাজত্ব চালিয়েই শেষ পর্যন্ত মারা গেলেন। এইবারে আসল লড়াই আরম্ভ হল। পিতার সম্পত্তির দায়ভাগ নিতে আধুনিক যুগে যে মামলা চলে, এবার সেই মামলার শুনানি আরম্ভ হল রজির মৃত্যুর পর।
ইন্দ্র রজির পুত্রত্ব স্বীকার করে নিয়ে স্বর্গের অধিকার ফিরে পেয়েছিলেন। এদিকে মর্ত্যভূমিতে রজির পুত্র ছিলেন পাঁচশোজন। পৌরাণিকতার অতিবাদে রজির পুত্রসংখ্যা পাঁচশো নাই হোক, অন্তত অনেকগুলি পুত্র তার ছিল। তারা অত্যন্ত বলশালী এবং যুদ্ধবীর বলে খ্যাত ছিলেন। সবাই তাঁদের রাজেয়’ ক্ষত্রিয় উপাধি দিয়েছিল। রজির মৃত্যুর পর তারা সিদ্ধান্ত নিলেন–পিতা নিজে ইন্দ্র হতে না পেরে পুত্রত্ব-স্বীকার করা দেবরাজকে ইন্দ্রত্ব দিয়েছেন। কিন্তু রজির পুত্রত্বই যদি ইন্দ্রত্ব লাভের প্রধান মাপকাঠি হয়, তবে তারাই তো এখন। স্বর্গরাজ্যের আসল দাবিদার। আইনের সব দিক ভেবে রাজেয় ক্ষত্রিয়রা ইন্দ্রের কাছে গেলেন। পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারে সমস্ত আইন দেখিয়ে তারা বললেন-ইন্দ্ৰত্বের অধিকার এখন আমাদের। তার নিজের ছেলেরা যেখানে বেঁচে আছে, সেখানে আপনার কোনও অধিকার টেকে না। বলা বাহুল্য রজির ছেলেদের পক্ষে প্রধান উকিল ছিলেন দেবর্ষি নারদ নারদর্ষিচোদিতা রজিসুতাঃ শতক্রতু আত্মপিতৃপুত্রসমাচারা রাজ্যং যাচিতবন্তঃ।
ভাল কথায় ইন্দ্র রাজ্য দিলেন না। রজির পুত্রের সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করলেন। তারা অসীম শক্তিধর। অতি সহজেই ইন্দ্রকে তারা পরাস্ত করলেন এবং স্বর্গ অধিকার করে নিলেন–অবজিত্য ইম্ অতিবলিনঃ স্বয়ংমিত্বং চঃ। অনেক কাল চলে গেল। ইন্দ্র কিছুই করতে পারলেন না। পৃথিবীর মানুষেরা ইন্দ্রকে প্রায় ভুলতে বসেছিল। তারা কেউই আর ইন্দ্রের সন্তুষ্টির জন্য যাগ-যজ্ঞের আয়োজন করে না। অগ্নিতে এক ফোঁটাও ঘৃতাহুতি দেয় না ইন্দ্রের উদ্দেশে। ইন্দ্র শেষে মনের দুঃখে দেব-পুরোহিত বৃহস্পতির কাছে গিয়ে বললেন আপনি আমার জন্য একটু ঘি আর এক টুকরো পুরোডাশের ব্যবস্থাও কি করতে পারেন না?
পুরোডাশ এক ধরনের পিঠের মতো জিনিস। পূর্বকালে বৈদিক-যজ্ঞে ঘি আর পুরোডাশ দেবতার উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হত। ইন্দ্রের করুণ কথা শুনে বৃহস্পতি নানা যাগ-যজ্ঞ করে ইন্দ্রের তেজোবৃদ্ধি করলেন। নিজে গিয়ে রজির ছেলেদের নানা কথা বলে বিভ্রান্ত করলেন। তাদের বোঝালেন–বেদ-ব্রাহ্মণ কিছু নয়। তোমরাই সব। বৃহস্পতির কথা শুনে রজির ছেলেরাও অকর্ম-কুকর্ম আরম্ভ করল। সেকালের দিনে বেদ-ব্রাহ্মণের ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়া মানেই তার রাজ্যচ্যুতি হতে দেরি লাগত না। রজিপুত্রেরা রাজ্য হারালেন। ইন্দ্র আবার স্বর্গরাজ্যে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন।
রজির কাহিনী আপনারা শুনলেন। নহুষের কাহিনী আমরা পূর্বে বলেছি। রজি এবং নহুষ দুজনেই আয়ুপুত্র। দুজনের আমলেই ইন্দ্র নিজের রাজ্য হারিয়েছেন। মর্ত্যভূমির রাজাদের। হাতেই তার যখন এই নাকাল অবস্থা, সেখানে দেবতাদের চিরশত্রু দৈত্য-দানবদের আক্রমণ হলে ইন্দ্রের অবস্থা যে কতটা করুণ হয়ে উঠতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আমরা তাই প্রথমেই বলেছি–স্বর্গভূমির অবস্থা ভাল যাচ্ছিল না মোটেই। নহুষ যখন ইন্দ্রপত্নী শচীকে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন আমরা দেবগুরু বৃহস্পতিকে যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে দেখেছি ইন্দ্রের অনুকূলে। রজির পুত্র রাজেয় ক্ষত্রিয়রা যখন স্বর্গের ওপর ইন্দ্রের স্বত্ব-বিলোপ ঘটালেন তখনও আমরা সেই বৃহস্পতিকেই দেখেছি ইন্দ্রের সাহায্যে এগিয়ে আসতে। ইন্দ্রের বিপদে এই বৃহস্পতির বুদ্ধিই তাকে বারবার বাঁচিয়েছে।
রজির পুত্রেরা যখন ইন্দ্রকে মেরে-ধরে তাড়িয়ে দিলেন, তখন বৃহস্পতির কাছে সামান্য এক টুকরো পুরোডাশের জন্য ইন্দ্র দীন ভিখারীর মতো উপস্থিত হয়েছিলেন। ইন্দ্র বলেছিলেন–ঠাকুর! আমার খাবার-দাবার সব শেষ। দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছি, শরীরটা বড় দুর্বল, মনেও আমার কোনও সুখ নেই–ব্রহ্মন্ কৃশোহং বিমনা হৃতরাজ্যো হুতাশনঃ। হতৌজা দুর্বলো মূঢ়ঃ। বৃহস্পতি বলেছিলেন–তোমার এই অবস্থা হয়েছে, অথচ আগে একবারও একটু জানাওনি আমাকে। আগে জানলে এত খারাপ অবস্থা তোমার কখনও হত না। তোমার জন্য আমি করিনি বা পরে করব না, এমন কাজ তো কিছু নেই–নাভবিষ্যত্ তৎপ্রিয়ার্থৰ্মকৰ্তব্যং মমানঘ।
