স্বর্গরাজ্যের সব চেয়ে বড় সমস্যা হল দৈত্য-দানবদের আক্রমণ। দৈত্য এবং দানবদের মধ্যে পার্থক্য বেশি কিছু নেই। এঁরা সবাই দেবতাদের বৈমাত্রেয় ভাই। একই পিতার সন্তান মহর্ষি কশ্যপের পুত্র। পার্থক্য শুধু, দেবতারা কশ্যপের প্রথমা পত্নী অদিতির পুত্র, দৈত্যেরা দ্বিতীয়া পত্নী দিতির পুত্র, আর তৃতীয়া পত্নী দনুর পুত্র হলেন দানবেরা।
নহুষের পিতা আয়ু যাকে বিয়ে করেছিলেন, পুরাণে তার নাম কোথাও প্রভা, কোথাও বা বাহুপুত্রী।-পুরূরবসো জ্যেষ্ঠ পুত্রো বস্তু আয়ুর্নাম স বাহোর্দুহিতরমুপযেমে। কিন্তু মহাভারতে এবং অধিকাংশ পুরাণে আয়ুর স্ত্রীর কোনও নাম নেই, তিনি শুধুই স্বর্ভানবী অর্থাৎ স্বর্ভানু রাজার কন্যা। আমাদের ধারণা স্বর্ভানু একজন দানব রাজা। মহাভারতে দনুপুত্র দানবদের লিস্টিতে তার নাম আছে–স্বর্ভানুরশ্বেশ্বপতিঃ। সেকালে এটা কিছু অপূর্ব নয়। দৈত্য-দানবদের অনেক মেয়েই মানুষের গৃহবধূ হয়ে এসেছেন। তাদের চাল-চলনও যথেষ্ট মানুষোচিত এবং যথেষ্টই ভদ্র।
আগেই বলেছি–নহুষের রাজা হতে হয়তো কিছু দেরি হয়েছিল। কিন্তু তার এক ভাই রজিও ছিলেন বিখ্যাত রাজা। রজি যখন রাজা হলেন মর্ত্যভূমিতে, তখন স্বর্গরাজ্যে দেবাসুর সংগ্রাম চলছে পুরোদমে। দৈত্যদের রাজা তখন বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ। প্রহ্লাদ পরম বৈষ্ণব হলে কী হবে, তার দাপট কিন্তু সাংঘাতিক। দৈত্য-বাহিনী নিয়ে প্রহ্লাদ স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করেছেন। দেবতাদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠছে। দেবতাদের উদ্যোগের বিরাম নেই। সমস্ত দেব-বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছে আত্মরক্ষায়। দুপক্ষের তুমুল সংগ্রাম চলছে, কেউ জিতছেও না, হারছেও না। দেবতারা দৈত্যদের মেরে সাফ করে দিতে চান। অসুর-দৈত্যরাও স্বর্গধাম থেকে দেবতাদের নাম চিরতরে মুছে দিতে চান। কিন্তু যুদ্ধে দু-পক্ষই সমান হওয়ার দরুন একসময় তারা যুক্তি-বুদ্ধি করার জন্য লোক-পিতামহ ব্রহ্মার কাছে এসে পৌঁছলেন–পরস্পরবধেন্সবো দেবাশ্চ অসুরা ব্রহ্মাণং পছু।
দেবতারা ব্রহ্মাকে বললেন–ঠাকুর! আমরা কি এই যুদ্ধে জিতব? একই সময়ে অসুর-দৈত্যরাও জিজ্ঞাসা করলেন–আমাদের অবস্থাটা কী বুঝছেন? আমরাই কি জিতব? প্রজাপতি ব্রহ্মা দুই পক্ষেরই ঠাকুরদাদা। তিনি আর কী বলবেন? অনেক ভেবে-চিন্তে দু-পক্ষেরই মন রেখে তিনি জবাব দিলেন– তোমাদের দু-পক্ষের মধ্যে মর্ত্যভূমির রাজা রজি যাঁদের হয়ে অস্ত্র হাতে তুলবেন, তাঁরাই এই ভয়ংকর যুদ্ধে জয় লাভ করবেন-যোমর্থে রজিরাত্তায়ুবধা যোৎস্যতীতি। ব্রহ্মা রজির অনেক প্রশংসা করলেন। বললেন-রজির যেমন ধৈর্য, তেমনটি কারও নেই। যেখানে ধৈর্য, সেইখানেই বিজয়-লক্ষ্মীর চিরাবাস। তোমরা রজির কাছে যাও। তিনি যে পক্ষে যুদ্ধ করবেন, সেখানেই জয়।
ব্রহ্মার কথা শুনে সুরাসুর দুই পক্ষই রজির সঙ্গে সমঝোতা করতে গেলেন। দৈত্যরা বললেন–মহারাজ! আমরা আপনার সাহায্যপ্রার্থী। আপনি আমাদের জয়ের জন্য ধনুর্ধারণ করুন–উঁচু রম্মজ্জয়ায় ত্বং গৃহাণ বরকামুক। মর্ত্যভূমির রাজা রজি দেখলেন–এই সুযোগ! একজন উন্নতিকামী রাজা নিজের স্বার্থ দেখবেন আগে। তারপর অন্যকে সাহায্য করার প্রশ্ন আসবে। রজি বললেন–যুদ্ধ করব নিশ্চয়, তবে যাদের হয়ে আমি যুদ্ধ করব, তারা জিতলে স্বর্গের ইন্দ্রপদ আমাকে দিতে হবে–ইন্দ্রো ভবামি ধর্মেণ ততো যোৎস্যামি সংযুগে। দৈত্য-দানবেরা সরল মানুষ। রজির প্রস্তাব শুনেই তারা বললেন-দেখুন, আমাদের মনে-মুখে এক। বলব একরকম, আর করব একম-এ আমাদের চরিত্র নয়–ন বয়মন্যথা বদিষ্যামোন্যথা করিষ্যামঃ। দৈত্যরা তাদের মনের কথা পরিষ্কার করে বললেন–আমাদের ইন্দ্র হলেন প্রহ্লাদ। আমাদের যত চেষ্টা, যত উদ্যম–সবই তার জন্য। আমরা যে যুদ্ধে জয়। চাই, সেও তারই জন্য–অস্মাকমিন্দ্র প্রহ্লাদো যস্যার্থে বিজয়ামহে। অতএব মহারাজ! আমরা এরকম কোনও আগাম কথা দিতে পারব না যে, যুদ্ধে জিতলে আপনাকেই আমরা ইন্দ্র বানাব। দুঃখিত মহারাজ। আমাদের কিছু করার নেই।
অসুরেরা চলে গেলে এবার দেবতারা এলেন রজির কাছে। নিজের স্বার্থ এবং ইন্দ্ৰত্বের যশঃপ্রার্থী রজি দেবতাদের কাছেও সেই একই প্রস্তাব দিলেন–যুদ্ধ জিতলে আমাকে কিন্তু ইন্দ্রের পদটি দিতে হবে। দেবতারা সময় বুঝে বললেন-সে আর বলতে! আপনি যা বলছেন, তাই হবে। যুদ্ধে যদি অসুরদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করি, তো, আপনিই ইন্দ্র হবেন– ভবিষ্যসীন্দ্রো জিত্বৈবং দেবৈরুক্তস্তু পার্থিবঃ।
আয়ুপুত্র রজি দেবতার কথা বিশ্বাস করে দেবতাদের জন্য অসুরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করলেন এবং যুদ্ধে জয় লাভ করলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্র রজির কাছে এসে রজির পা দুটি নিজের মাথায় রাখলেন–রজি-চরণ-যুগল আত্মাশিরসা নিপীড্যাহ। বললেন-মহারাজ! আপনি আমার মা-বাপ। অসুরদের ভয় থেকে আপনি আমাদের রক্ষা করেছেন বলে, আজ থেকে আপনি আমার পিতা হলেন–ভয়ত্রাণদানাদস্মৃৎপিতা ভবান্।
নীতিশাস্ত্রে পাঁচ রকমের ব্যক্তিত্ব পিতার সংজ্ঞায় ভূষিত। যিনি অন্ন দান করেন, যিনি ভয় থেকে বাঁচান, যিনি কন্যা দান করেন, যিনি জন্মদাতা এবং যিনি উপনয়ন দেন–এই পাঁচ রকমের পিতার সংজ্ঞা বলা আছে স্মৃতিশাস্ত্রে। সম্ভবত পিতৃত্বের এই অভিধান মাথায় রেখেই ইন্দ্র বললেন–আপনি অসুরবিজয় সম্পন্ন করে আমাদের ভয় অপনোদন করেছেন; অতএব দেবতাদের মধ্যে আপনি ইন্দ্র বলে পরিচিত হলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি ইন্দ্র আজ থেকে আপনার ছেলে বলেই পরিচিত হব–যস্যাহমিন্দ্রঃ পূত্রস্তে খ্যাতিং যাস্যামি কর্মভিঃ।
