না, অনসূয়া-প্রিয়ংবদার বিয়ে হয়নি। হলেও আমরা জানি না। তারা কাব্যে উপেক্ষিতা। কিন্তু নহুষের বেলায় বেশ বুঝতে পারি, তার জীবনের প্রথম কল্পে ঋষি-মুনিদের সঙ্গে যখন তার দহরম-মহরম চলছে, তখনই কোনও আশ্রমবাসিনী ‘পিতৃকন্যা’ বিরজার সঙ্গে তার বিবাহ হয়েছিল। পরবর্তী পৌরাণিক সেই পিতৃকন্যার প্রতি অনুকম্পায় তার নতুন নামকরণ করবেন–অশোকসুন্দরী। কিন্তু যত সুন্দরীই তিনি হোন, তাকে যোগচারিণী তপস্বিনী করে রাখতে পৌরাণিক কিন্তু ভুলবেন না। গল্পের গরু যেমন করে লাফিয়েই গাছে উঠুক, বিরজা নামের সেই পিতৃকন্যার স্মৃতিটি অর্বাচীন পুরাণের কথক ঠাকুর ভুলতে পারেননি বলেই অশোকসুন্দরীকে নির্জন বনে নহুষের জন্য তপস্বিনী করে রেখেছেন–তস্য হেতোস্তপস্তেপে নিরালম্বা তপোবন–অথবা সেই কারণেই অশোকসুন্দরীও শিব-শিবানীর মানসকন্যা। আমরা ‘পিতৃকন্যা’ শব্দের যে অর্থকল্পনা করেছি, তাতে মানসকন্যাকে পিতৃকন্যা বলতে অসুবিধে নেই কোনও। যে অর্থে অশোকসুন্দরী মানসকন্যা সেই অর্থে বিরজাও পিতৃকন্যা। মানুষটি একই, নামভেদমাত্র।
পিতৃকন্যা বিরজার গর্ভে নহুষের ছ’টি ছেলে। পুরাণগুলিতে ছেলের সংখ্যা কোথাও পাঁচ, কোথায় ছয়, কোথাও বা সাতটি। মহাভারতে ছয় ছেলের নাম-যতি, যযাতি, সংযাতি, আয়াতি, অয়তি এবং ধ্রুব। পুত্রসংখ্যা ছয় কি সাত, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল–প্রথম দু’জন ছাড়া আর কারও না জন্মালেও চলত। কালিদাস এক স্বয়ংবর সভার চিত্রে নায়ক পদবির এক পুরুষের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন–দুনিয়ায় অনেক ছোটখাট রাজা থাকলেও যে ব্যক্তির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলা যায়–এই রাজার জন্য পৃথিবী নিজেকে সনাথা রাজস্বতী মনে করেন, ইনি তাই। নহুষের ছয় পুত্র থাকা সত্ত্বেও ইন্দ্রত্ব-পাওয়া পিতার পিতৃত্ব যে পুত্রের দ্বারা সার্থক হয়েছে, তিনি হলেন যযাতি।
নহুষের প্রথম এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র হলেন যতি। যতি শব্দের সাধারণ অর্থ যোগী, মুনি। নহষ-পুত্র যতির ক্রিয়া-কলাপও তার নামের অর্থের মতোই। তিনি মুনিবৃত্তি অবলম্বন করে বনবাসী হলেন ব্রহ্মোপলব্ধির পরম আনন্দ উপলব্ধি করার জন্য। ধারণা হয়–পিতা নহুষকে তিনি চরম ঐশ্বর্যের মধ্যে দেখেছেন এবং একই সঙ্গে ঐশ্বর্যের মোহে তার বিকারগুলিও তিনি লক্ষ্য করে থাকবেন। পরিশেষে নিরাসক্ত মুনিদের দ্বারা তাকে স্বর্গভ্রষ্ট হতেও দেখেছেন। পিতার সমস্ত ঘটনা হয়তো নহুষের প্রথম পুত্রের মনে নির্বেদ এনে দিয়েছে। তিনি মুনি হয়ে গেলেন–যতিন্তু যোগমস্থায় ব্রহ্মীভূতোভবন মুনিঃ।
নহুষের সঙ্গে যুধিষ্ঠিরের সেই কথোপকথন স্মরণ করুন। যুধিষ্ঠির যে জাতি-বর্ণ মাথায় তুলে দিয়ে শুধু গুণ এবং সদাচারের নিরিখে ব্রাহ্মণত্ব নির্ধারণ করেছিলেন, নহুষের প্রথম পুত্রই তার উদাহরণ। তৎকালীন সময়ে পিতা স্বর্গভ্রষ্ট তথা ক্ষত্রিয় সমাজ থেকে পতিত হওয়া সত্ত্বেও, তার প্রথম পুত্রের ব্রাহ্মণতে বাধা হয়নি। সমাজ তাকে ব্রহ্মভূত প্রসন্না মুনির সম্মান দিয়েছে।
যতি বনবাসী হলে নহুষের দ্বিতীয় পুত্র রাজা হলেন। শুধু রাজা নন, সম্রাট। অকৃত্রিম রাজগুণের সঙ্গে বিনয়শিক্ষা মিশ্রিত হওয়ায় তার দিন আরম্ভ হত দেবতার পূজা এবং পিতৃপুরুষের তর্পণের মধ্য দিয়ে। অনুপমাচী ব্রাহ্মণদের যাতে কথঞ্চিৎ বৃত্তির ব্যবস্থা হয় তার জন্য মাঝে মাঝে দান-যজ্ঞের ব্যবস্থা করতেন যযাতি–ঈজে চ বহুর্ভি মুখৈঃ। আর সবার ওপরে ছিল প্রজাপালনের হিতৈষণা। একদিকে সুপ্রযুক্ত পররাষ্ট্রনীতি, অন্যদিকে প্রজারঞ্জন–এই দুয়ে মিলে যযাতির সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দৃঢ়ভিত্তির ওপর। যযাতির বংশ থেকেই যেহেতু মহাভারতের কথা এবং ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন ধরনের জটিলতা এবং নবতর মাহাত্ম সূচিত হয়েছে, তাই যযাতিকে আমাদের দেখতে হবে অসীম গুরুত্ব দিয়ে নতুন ভাবনায়, নতুন আলোয়, নতুন পর্ববিভাগে।
.
২৯.
স্বর্গরাজ্যের অবস্থা মোটেই ভাল যাচ্ছিল না। দৈত্য-দানবের আক্রমণ তো ছিলই। তার মধ্যে দেবরাজ ইন্ত্রের ক্রিয়াকলাপ এবং রাজ্য-শাসনও নিশ্চয় ভাল ছিল না। ভাল হলে, তাকে স্বর্গ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হত না, মর্তের মানুষ নহুষকেও বরণ করে নিয়ে যেতে হত না স্বর্গের রাজত্ব করার জন্য। তবে যত অন্যায়ই করুন, ইন্দ্র নিজের ভুল বুঝতে পারতেন খুব তাড়াতাড়ি। তাই নিজেকে সংশোধন করার সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মা-বিষ্ণুর মতো মহত্তর দেবতাদের সাহায্য পেতেও তার দেরি হত না।
আগে যে ইলাবৃত-বর্ষের কথা বলেছিলাম, স্বর্গ এখন আর সে জায়গায় নেই। সেটা বোঝাও যায়। বেদের মধ্যে সিন্ধু নদীর গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, অপিচ বেদোত্তর যুগে হিমালয় এবং মানস সরোবরের কাছাকাছি অঞ্চলগুলির প্রাধান্যের নিরিখে বোঝা যায়–স্বর্গরাজ্যের ঠিকানা বদলে গেছে। মহাভারতের বনপর্বে অর্জুন যখন তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে স্বর্গে ঘুরে এলেন, তখন স্বর্গের রথ যেখানে তাকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল সেটা গন্ধমাদন পর্বতের কাছে একটা জায়গা। স্বর্গ যে সেখান থেকে খুব দূরে তো মনে হয় না। বরঞ্চ বলা যায়–স্বর্গ এখন অনেকটাই মানুষের নাগালের মধ্যে। মানুষ সেই স্বর্গে যায়। দেবতাদের সঙ্গে তার দেখা হয়, দরকারে সাহায্যও করে।
