ডট-ডটের মধ্যে আরও কতগুলি নাম আছে। সাহেব যে কোথা থেকে এসব বানালেন তা সাহেবরাই জানেন। Pargiter এর ওপর শত শ্রদ্ধা রেখে জানাই, হরিবংশ কিংবা পুরাণ তার ইষ্টসিদ্ধির জন্য সেইভাবে পড়া থাকলেও পিতৃতত্ত্ব তিনি তত যুৎসই করে বোঝেননি। সাহেব যদি যত্ন করে হরিবংশের পূর্ব পূর্ব অধ্যায়গুলি মন দিয়ে পড়তেন, অথবা পড়তেন অন্য পুরাণগুলি তাহলে আর তাকে হঠাৎ করে পিতৃকন্যার এই আজগুবি তত্ত্ব ফেঁদে বসতে হত না। মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক পুরাণে, হরিবংশে এবং মহাভারতে পিতৃগণ’ এবং পিতৃবংশ’ বলে একটা ভাবনা-চিন্তা আছে, সাহেব সেটা কিছুই বোঝেননি।
Pargiter হরিবংশে নহুষ এবং শুকদেবের ভগিনী-বিবাহ কল্পনা করেছেন। আমরা সেই হরিবংশ থেকেই জানাচ্ছি যে, আমাদের ভাবনায় সাতজন ঋষিস্বরূপ ব্যক্তি পিতৃপুরুষ নামে খ্যাত। এঁদের চারজনকে দেখা যায়, তিনজনকে দেখা যায় না। এঁরা যোগাচারী পুরুষ, কখনও বা যোগষ্টও হয়েছেন এবং তারপর আবার ব্রহ্মবাদী ঋষি হয়ে জন্মেছেন। পুরাণের ঋষিকল্পে আপনারা পুলহ, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য প্রমুখ প্রজাপতির নাম পাবেন। এরাই প্রথম লোকসৃষ্টি করেন। এই পুলস্ত্যের মানসী কন্যার নাম পীবরী। মানসী শব্দটার মধ্যে যদি আপনারা ধোঁকাবাজির গন্ধ পান, তাহলে ধরে নিন, কোনও অনামা স্ত্রীর গর্ভে পীবরী জন্মেছিলেন। এই পীবরী নিজে যোগিনী, যোগীর পত্নী এবং যোগীর মাতা। লক্ষ করে দেখবেন পীবরী শুধু পুলস্ত্যেরই কন্যা নন, তিনি অন্যান্য পিতৃগণেরও কন্যা। আমাদের স্বগত ধারণা–পুরাকালে যে সমস্ত কন্যা-সন্তান পিতামাতার অবহেলা লাভ করতেন, অথবা বাপ-মা-ভাইরা যে সমস্ত মেয়ের ভরণ-পোষণ করতেন না, তারাই এসে জুটতেন ঋষিদের আশ্রমে।
ঋষির ঘরে খাবার-দাবারের অভাব হত না। এঁরা মমতায় ভালবাসায় ঋষির আশ্রম আলোকিত করতেন, কাজকর্মও করে দিতেন। আমাদের ধারণা, এই নামগোত্রাহীনা রমণীরাই পিতৃকন্যা বলে পরিচিত হন। ঋষির আশ্রমে যেহেতু কাম-ক্রোধের প্রশ্রয় নেই অতএব এঁদের ধর্মসাধন, যোগসাধন করতে হত। হরিবংশ বলেছে–সর্বাচ্চ ব্রহ্মবাদিন্যঃ সর্বাশ্চৈবোর্ধরেতসঃ আপনারা কালিদাসের লেখায় মহর্ষি কণ্বের আশ্রমে–অনসূয়া-প্রিয়ংবদার কথা শুনেছেন। তাদের অন্য কোন পিতৃ-মাতৃ পরিচয় নেই। তারা ক-মুনির ঔরসজাত কন্যাও নন। আমাদের ধারণা, এঁদের মতো সাধনপুরা রমণীরাই পিতৃকন্যা। কশ্বশ্রমের আর্যা গৌতমীও তাই। সুপাত্র পেলে মুনিরা এঁদের বিয়েও দিয়ে দিতেন, নইলে তারা আশ্রমেই থেকে যেতেন যোগচারিণী হয়ে।
পুলস্ত্যের যোগচারিণী কন্যা পীবরীর সঙ্গে শুকদেবের বিয়ে হয় এবং পীবরীর গর্ভে শুকদেবের চার পুত্র এবং কন্যা কৃত্বীর জন্ম হয়। এই কৃত্বীর সঙ্গেই অণুহের বিয়ে হয় এবং কৃত্বীর পুত্র পুরাণে সুবিখ্যাত ব্ৰহ্মদত্ত
স (শুকদেবঃ) তস্যাং পিতৃকন্যায়াং পীবৰ্যাং জনয়িষ্যতি।
কৃষ্ণং গৌরং প্রভুং শম্ভং কৃত্বীং কন্যাং তথৈবচ।
ব্ৰহ্মদস্য জননীং মহিষীং তৃহস্য চ।
এখানে যে কোথায় শুকদেবের সঙ্গে তার নিজের বোনের বিয়ে হল, তা সাহেবের ঈশ্বরই জানেন। সাহেব হরিবংশ থেকে শুকদেবের উদাহরণ দিয়েছেন আমরাও শুকদেবের ঘটনার নিরিখেই নহুষের কথা বলি। লক্ষ্য করলে দেখবেন–হরিবংশে ‘বৈরাজ’ পিতৃগণের নাম আছে, বিরাজ-প্রজাপতির পুত্রেরা বৈরাজ’ নামে বিখ্যাত বিরাজস্য দ্বিজশ্রেষ্ঠ বৈরাজা ইতি বিশ্রুতা। নহুষের সঙ্গে যে পিতৃকন্যা বিরজার বিবাহ হয়েছিল, এই বিরজাও সম্ভবত ‘বৈরাজ’ পিতৃগণের যোগচারিণী কন্যা হবেন। মৎস্য পুরাণে পরিষ্কার বলা আছে–পুলহ-প্রজাপতির বংশে যে পিতৃগণ ছিলেন, তাদেরই মানসী কন্যার নাম বিরজা, যিনি নহুষের পত্নী, যযাতির জননী।
পুলহাঙ্গজদায়াদা বৈশ্যাস্তান্ ভাবয়স্তি চ।
এতেষাং মানসী কন্যা বিরজা নাম বিতা।
যা পত্নী নহুষস্যাসী যযার্তেজননী তথা
এখানে কি কোথাও পেলেন যে, বিরজা নহুষের নিজের বোন। এক সাহেব ইন্দ্রিয়গ্রাম’ অর্থ করেছেন village of senses. Pargite-এর পিতৃকন্যাও সেই রকম–father’s daughter. হাসব না কাঁদব। মহাভারতের অনুশাসন পর্বে প্রজাপতিদের বংশ বর্ণনায় বৈরাজ পিতৃগণের কথা আছে–ভৃণ্ডশ্চ বিরজাশৈক কাশী চোশ্চ ধর্মবিৎ। নহুষপত্নী বিরজার নাম তাই কোনও অভাবনীয় ব্যাপার নয়। তার ‘পিতৃকন্যা’ হওয়াটাও কোনও অবৈধ ব্যাপার নয়।
মহামতি Pargiter-এর ভ্ৰম উপস্থিত হয়েছে কেন, আমরা জানি। আধুনিক প্রগতিশীল অনেক গবেষকের উর্বর প্রতিভার সঙ্গে Pargiter-এর প্রতিভাও তুলনীয়। প্রাচীনেরা রমণীকে সবসময়েই ভোগ্যবস্তু হিসেবে ভেবেছেন–এই চরম ধারণা থেকেই এই মতের সৃষ্টি। পিতৃকন্যার মতো শব্দগুলি এই পূর্বকল্পিত ধারণা বা অবসেশন’ থেকেই অপব্যাখ্যাত হয়েছে। প্রাচীনদের মতো অনসূয়া-প্রিয়ংবদার সমগোত্রীয় রমণীর প্রতি যদি আজও সেই সমব্যথা থাকত, তাহলে গবেষকরা বুঝতেন, প্রাচীন ঋষি-মুনিদের আশ্রমবাড়িতে নাম-গোত্রহীন কত পিতৃকন্যা’ সসম্মানে জীবন কাটিয়ে গেছেন। তাদের কারও বিবাহ হয়েছে, কারও বা হয়নি। যাঁর বিবাহ হয়ে যেত, সে পুরাতনী সখীর গলা ধরে পিয়সহি’ বলে কাঁদত, আর ঋষি-পিতা সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন–ওদের জন্য অমন করে কেঁদো না, বৎসে! ওদেরও তো বিয়ে দিতে হবে-বৎসে, ইমে অপি প্রদেয়ে। এরাই আমাদের ধারণায় পিতৃকন্যা, পৌরাণিক ব্যাখ্যায় নাই বা গেলাম।
