যুধিষ্ঠির গম্ভীর হলেন। উত্তর দিলেন নিরপেক্ষ ধর্মাধ্যক্ষের মতো। বললেন–আমি যেসব সগুণের কথা বললাম, তা একজন শূদ্রের মধ্যে থাকতেই পারে। আবার বামুনের ঘরে জন্ম নিয়ে গলায় পৈতে ঝুলিয়েও একজন ব্রাহ্মণের মধ্যেও এসব গুণ না থাকতেই পারে–শদ্রে তু য ভবেল্লক্ষ্ম দ্বিজে তচ্চ ন বিদ্যতে। যুধিষ্ঠির হেঁয়ালি করে বললেন–তাহলে সে শুদ্রও শূদ্র নয়, আবার সেই ব্রাহ্মণও ব্রাহ্মণ নয়ন বৈ শূদ্রো ভবেচ্ছুদ্ৰো ব্রাহ্মণো ন চ ব্রাহ্মণঃ। কথাটা কেমন হল? সে শুদ্র, শূদ্র নয়। সে ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণ নয়। নহুষরূপী নাগবংশীয়র মাথাটা একেবারেই যেন ঘুরে গেল। চিরকাল তিনি শুনে আসছেন বামুনের ছেলেই বামুন, শূদ্রের ছেলেই শূদ্র। আর আজ এই ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মুখে এ সব কী নতুন কথা শোনা যাচ্ছে?
নতুন কথাই বটে। এমনকি আজকের সমাজেও এটা নতুন কথা। আজকাল কতগুলি মহাপণ্ডিত দেখতে পাচ্ছি, যাঁরা দেশীয় ধর্মবাদ, দর্শন কিছুই বোঝন না, কিন্তু আরও নানারকম বাদ-প্রতিবাদ ভাল বোঝেন। স্বীকার করে নেওয়া ভাল–মহাভারতে জাতি-ব্রাহ্মণ্যবাদ বা জাতিব্রাহ্মণ্যের সপক্ষে অনেক কথা আছে। কিন্তু প্রতিবাদী পণ্ডিতেরা শুধু সেই ব্রাহ্মণ্য গোঁড়ামির জায়গাগুলি উদ্ধার করে–আমাদের ধর্ম কত সংকীর্ণ, কত জঘন্য, কত গোঁড়া–এটা বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তাদের মাথায় যুধিষ্ঠির-নহুষের এই কথোপকথনটুকু মোটেই কাজ করে না। কাজ করে না এই কারণে যে, তাদের বক্তব্যে তাহলে আর নতুন কিছু থাকে না। তারা যে নতুন কথাটা শোনাবেন–সে নতুন কথাটা যুধিষ্ঠির আগেই বলে ফেলায় তাদের বড় অসুবিধে হয়। তাদের উদারপন্থী কথাবার্তা, নৃতত্ত্বের বড় বড় বুলির সঙ্গে মনুষ্যত্বের মশলা-মেশানো অত্যাধুনিক বচন যুধিষ্ঠিরের মুখে আগেই পরিবেশিত হওয়ায় এই অহংমানী পণ্ডিতদের বৈপ্লবিক উদারতা মূল্য হারিয়ে ফেলে। অতএব মহাভারতের অন্য কোথায় জাতি-ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতিষ্ঠা, কোথায় অনুশাসন পর্বে ব্রাহ্মণ্যের জয়-জয়কার–খোঁজ সে সব জায়গা। জনসাধারণকে দেখাও। কত সঙ্কীর্ণমনা এই লোকগুলি, ভারতবর্ষের কী ক্ষুদ্রতা! যেন অন্য কোথাও কোনও ক্ষুদ্রতা নেই। সব এই ভারতবর্ষে।
বস্তুত যুধিষ্ঠির যে কথা বলেছেন–তা যেমন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সার কথা, তেমনই তা ভারতবর্ষের অন্য ধর্মেরও পরম্পরাগত বিশ্বাস। এ বিষয়ে আমাদের ব্যক্তিগত একটা ধারণা আছে এবং সে ধারণার মধ্যে নতুনত্ব কিছু নাই থাক, তুলনামূলক বৈচিত্র্য কিছু আছে। মনে রাখতে হবে, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এবং দর্শনেও ব্রাহ্মণ’ শব্দটি বহুল প্রযুক্ত। একটি ব্যক্তি-মানুষের মধ্যে কোন কোন সদ্গুণ থাকলে ব্রাহ্মণ’ হওয়া যায়-এই তর্ক সেখানে নানা জায়গায় উপস্থিত। এটা কোনও আশ্চর্যের বিষয় নয়, কারণ বুদ্ধ এই কথাই বলবেন যে, জন্মের দ্বারা মানুষ ব্রাহ্মণ হয় না, গোত্র-বরের দ্বারাও ব্রাহ্মণ হয় না, মাথায় তপস্বিসুলভ জটাজুট থাকলেও ব্রাহ্মণ হয় না–ন জাটাহি ন গোনে। আশ্চর্যের বিষয় হল–মহাভারতে ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের প্রবক্তা হিসেবে সুপরিচিত যুধিষ্ঠিরের মতো রাজ-বর্ণের মুখে ওই একই রকম কথা এল কী করে?
অতি পণ্ডিতেরা বলবেন–ওসব কথা বৌদ্ধদের কাছ থেকে ধার করা। ঠিক যেমন তারা রামায়ণের উপাখ্যানের সঙ্গে মিল দেখে দশরথ জাতকের পূর্বগামিতা প্রমাণ করেন, ঠিক সেইভাবেই এখানেও তাদের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব কাজ করে। যুক্তি-তর্ক তাদের বড়ই সরল, কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করলে আজকাল যেহেতু প্রগতিশীলতা বেশি প্রকাশ পায়, তাই এক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মের কাছে ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের অধমর্ণতা দেখানোর আশঙ্কা থাকে খুব বেশি। আমার নিজের ব্যক্তিগত মতে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এবং দর্শন তথা বৌদ্ধধর্ম এবং দর্শন–দুটিই পরস্পরের বিকাশে পরম পরিপূরক। যদি বৌদ্ধ দার্শনিকতা থেকেও যুধিষ্ঠিরের এবংবিধ উদারতা ঘটে থাকে, আমাদের তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু আমাদের ধারণা ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের মধ্যেও এই উদার আকাশটুকু মাঝে মাঝে দেখতে পাব, যা একেবারেই আকস্মিক নয় এবং তারও একটা পরম্পরা আছে। যুধিষ্ঠিরের কথাও তাই নতুন কিছু নয় এবং নতুন নয় বলেই সেটা আমাদের পরম্পরাগত পুরাতন দর্শন, যার চরম অভিব্যক্তি ভগবদ্গীতার মধ্যে–আমি গুণ এবং কর্মের নিরিখেই চতুর্বর্ণের বিভাগ রচনা করেছি, জন্ম-কুল দেখে নয়–চাতুর্বর্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
যুধিষ্ঠির বুঝিয়ে দিলেন–কথাটা বোঝ ভাল করে। মানুষের সগুণটাই আসল। যদি দেখ এ সব সদগুণ একজন শূদ্রের মধ্যে আছে, তবে তাকে ব্রাহ্মণ বলেই মানবে। আর যদি দেখ-কুলজাত ব্রাহ্মণের মধ্যেও ক্ষমা নেই, দয়া নেই, অহিংসা নেই, তপস্যা নেই, তবে তাকে শূদ্র বলেই চিহ্নিত করবে-যত্রৈতন্ন ভবেৎ সর্প তং শূদ্ৰমিতি নির্দিশেৎ। নহুষ বললেন–কী কথা শুনালে দাদা! চরিত্র, ক্ষমা, অনৃশংসতা–এসব দিয়ে যদি বামুন চিনতে হয়, তবে তো জাতিবর্ণের কথাটাই বৃথা হয়ে গেল। সগুণের কৃতিত্ব দিয়ে যদি শূদ্রকে বামুনের আসনে চড়াতে হয়, তাহলে চাতুর্বর্ণের ভিত্তিটাই যে নড়বড়ে হয়ে গেল-বৃথা জাতিস্তদাযুম্মন্ কৃতির্যাবন্ন বিদ্যতে।
