মনুসংহিতাতেও নহুষের যে বিবরণ পাই তাতেও নহুষের সর্পত্ব স্পষ্ট নয়। সেখানে নহুষের রাজ্যচ্যুতি এবং সমাজচ্যুতিই বড় কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে–বেনো বিনষ্টো বিনয়াৎ নহুষশ্চৈব পার্থিবঃ। মনু বলেছেন–কাম এবং ক্রোধ থেকে যে সব ভ্রষ্টাচার মানুষের মধ্যে জন্মায়, রাজাদের তা পতিত করে। কামজ এবং ক্রোধজ ব্যসনের ফলে রাজারা তাদের রাজ্য হারান-বহবোবিনয়ামষ্টাঃ। মনু আবার বলেছেন–উপযুক্ত শিক্ষা এবং বিনয় যদি থাকে তবে রাজারা হারানো রাজ্যও ফিরে পান-বনস্থা অপি রাজ্যানি বিনয়াৎ প্রতিপদিরে। রাজ্য ফিরে পাওয়া এবং রাজ্য হারানো–এই দুটিই যেহেতু মনুর মতে বিনয়-শিক্ষা এবং অবিনয়ের ফলাফল, মনু তাই নাম জানিয়ে উদাহরণও দিয়েছেন সেই রাজাদের–যাঁরা অবিনয়ের ফলে রাজ্য হারিয়েছেন এবং যারা বিনয়ের ফলে রাজ্য ফিরে পেয়েছেন। আমাদের এই নহুষও কাম এবং ক্রোধের ব্যসনে মত্ত হয়ে রাজ্যচ্যুত হয়েছিলেন ঋষিদের দ্বারা। তার সর্পগতি। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-সমাজচ্যুতির প্রতিরূপমাত্র। যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যে নহুষের দেখা হয়েছে, সে নহুষ রাজ্যচ্যুত, সমাজচ্যুত নহুষের বংশ-পরম্পরায় নেমে আসা নাগ-জনজাতির অন্যতম প্রধান। পুরুষ। ব্রাহ্মণের অভিশাপে তার প্রাচীন পূর্বপুরুষ রাজ্যচ্যুত হয়েছিলেন বলেই যুধিষ্ঠিরের কাছে তার প্রশ্ন-মহারাজ ব্রাহ্মণ কাকে বলে–ব্রাহ্মণগা কো ভবে রাজন।
.
২৮.
চন্দ্র থেকে আরম্ভ করে পঞ্চম পুরুষ নহুষ পর্যন্ত যা দেখা গেল, তাতে পুরূরবার পুত্র আয়ু এবং চন্দ্রপুত্র বুধ ছাড়া আর তিনজন রাজার সঙ্গেই তদানীন্তন ব্রাহ্মণদের কিছু বিবাদ ঘটেছে। এই তালিকায় আছেন চন্দ্র স্বয়ং। দ্বিতীয় জন পুরূরবা এবং তৃতীয় নহুষ। ব্রাহ্মণ-সমাজের সঙ্গে ক্ষত্রিয় রাজাদের এই বিবাদ-বিসংবাদের একটা সামাজিক তাৎপর্যও আছে। পরিষ্কার বোঝা যায়–একটা কনফিউশন, একটা সংশয় তখনও চলছিল। ব্রাহ্মণ-সমাজের অনুমোদন ছাড়া রাজা সিংহাসনে বসতে পারছেন না বটে, কিন্তু রাজাদের ওপর ব্রাহ্মণরা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও খুঁজে পাচ্ছেন না। পুরূরবা রাজ্যচ্যুত হয়েছেন ব্রাহ্মণদের দ্বারা। নহুষও রাজ্যচ্যুত হয়েছেন ব্রাহ্মণদের দ্বারা।
সন্দেহ নেই, যোদ্ধা রাজার ওপরে বেদ-যজ্ঞ নিয়ে থাকা দার্শনিক ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণ যথেষ্টই জরুরি ছিল। দণ্ডধারী রাজার কাছে ক্ষমতা, ঐশ্বর্য এবং স্বেচ্ছাচারিতা এমনই লোভনীয় বস্তু, যা তাদের প্রমত্ত করে। এই প্রমত্ততা যখনই বেড়েছে, তখনই ব্রাহ্মণদের অভিশাপ নেমে এসেছে নিয়তির মতো। যুধিষ্ঠিরের কাছে নহুষ দুঃখ করে বলেছেন–আমার ক্ষমতা তো কিছু কম ছিল না, রাজা! অভিষেকের সময় ঋষিরা আমাকে বর দিয়েছিলেন–যার দিকে আমি দৃষ্টিপাত করব, তারই তেজ আমার মধ্যে সংক্রমিত হবে–তস্য তেজো হরাম্যা তদ্ধি দৃষ্টেবলং মম। এককালে আমি স্বর্গীয় বিমানে চড়ে সমস্ত স্বর্গভূমিতেই ঘুরে বেড়িয়েছি। ব্রহ্মর্ষিদের হাজার বেহারা আমার পাল্কি বয়ে নিয়ে গেছেন-ব্রহ্মষীণাং সহস্রং হি উবাহ শিবিকাং মম।
নহুষ জানেন–তার পক্ষে ব্ৰহ্মর্ষিদের দিয়ে পাল্কি বওয়ানোতেও কোনও অসুবিধে ছিল না। কিন্তু স্বাধিকার-প্রমত্ততায় তার মাথায় খুন চাপল। তিনি অগস্ত্যের মাথায় লাথি মেরে বসলেন। একজন চরম শিক্ষিত লোকের এই চরম অবমাননায় হাজার জন ব্রহ্মর্ষি নিশ্চয় মুখ ফিরিয়ে ঘাড় শক্ত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন অগস্ত্যের পিছনে। শিক্ষিত জনতার রোষ নেমে এল অগস্ত্যের অভিশাপের রূপ ধরে। নহুষ রাজ্যচ্যুত হলেন। তিনি স্বীকার করেছেন–আমার আশ্চর্য লেগেছিল, যুধিষ্ঠির! আশ্চর্য লেগেছিল। সত্য, জিতেন্দ্রিয়তা, তপস্যা, অহিংসার এ কী শক্তি, যা এক দণ্ডধারী সর্বক্ষম রাজাকেও বিপর্যস্ত করে দেয়। তাকে স্থানচ্যুত করে। তপস্যার এই শক্তি দেখে সত্যিই আমার বড় আশ্চর্য লেগেছিল–ততে মে বিস্ময়ো জাতস্ত দৃষা তপসো ফলম।
চন্দ্রবংশের সর্বাধিক ঐশ্বর্যশালী সব চেয়ে বড় রাজার এই ইন্দ্রপতন আজ শত শত বচ্ছর পরেও চিন্তার ব্যাপার রয়ে গেছে। যে গহন বনের মধ্যে নহুষের নাগবংশীয় অধস্তনেরা যুধিষ্ঠিরের সাক্ষাৎ পেয়েছেন তাদের কাছে এখনও সেই প্রশ্নটাই বড় হয়ে রয়েছে–মহারাজ! ব্রাহ্মণ কাকে বলে? ভাবটা এই–জাতিটা তো বড় কথা নয়। আমরা নহুষ, আমরা রাজা ছিলাম। স্বর্গের দেবতাদের ওপর পর্যন্ত আমাদের পূর্বাধিকার বিস্তৃত ছিল। তবে কী এমন শক্তি এই ব্রাহ্মণ-নামক শব্দটির যা সব কিছুর ওপরে।
যুধিষ্ঠির বড় সুন্দর জবাব দিয়েছিলেন। যুধিষ্ঠির বলেছিলেন–সত্যনিষ্ঠা, ক্ষমা, চারিত্রিক বল, অনৃশংসতা, তপস্যা এবং দয়া–এই গুণগুলি যে ব্যক্তির মধ্যেই দেখা যাবে, তিনিই আসলে ব্রাহ্মণ। নহুষরূপী নাগবংশীয় বললেন–সে কী কথা যুধিষ্ঠির। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র–এই সামাজিক সংস্থানটা কি তুমি ভুলে মেরে দিলে! তুমি যেমন বলছ, তাতে তো একজন শূদ্রকেও ব্রাহ্মণ বলে সম্মান করতে হবে। কেননা ওই যে এত সব গুণের কথা বললে–সত্যনিষ্ঠা, ক্ষমা, দয়া–তা এসব গুণ তো একজন শুদ্রের মধ্যেও থাকতে পারে। তাহলে তো সেই শূদ্র ব্যাটাকেও গড় করতে হবে এখন থেকে–শূদ্রেঘপি চ সত্যঞ্চ দানমক্রোধ এব চ। তুমি হাসালে যুধিষ্ঠির।
