যুধিষ্ঠির অসাধারণ একটি কথা বললেন। কথাটা তার গভীর বিশ্বাস এবং অতিসংবেদনশীল দীর্ঘনিঃশ্বাসের সঙ্গেও জড়িয়ে নিয়ে বলা যায়। যুধিষ্ঠির বললেন–জাতি! মানুষের কথা বল, বুঝি। কিন্তু মনুষ্য-সমাজে জাতির ব্যাপারটা বড়ই বিচিত্র হে। সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের জাতি-জম্মের বিচার যে বড়ই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। যুধিষ্ঠির হাজার হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতির ঘেরাটোপের মধ্যে বসে পাকা নৃতাত্ত্বিকের মতো জবাব দিলেন। বললেন–মানুষ বলে কথা। আমি যে কথা বলি, যে শব্দ ব্যবহার করি, একজন ব্রাহ্মণও সেই শব্দ ব্যবহার করে। একজন শূদ্রও সেই শব্দ ব্যবহার করে। সেই অশেষ বাক্যরাশির মধ্যে কোনও শব্দের শুদ্ধতা বজায় রাখা কি সম্ভব? বলা কি যায়–এটা ব্রাহ্মণের অভিধান, আর এটা শূদ্রের? আরও সরস উদাহরণ দিয়ে বলি–ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র- সবার মধ্যে যে প্রথায় মৈথুন চলে, সেই প্রথার মধ্যে থেকে কখনও কি এমন পৃথকীকরণ সম্ভব যে-এটাকে বলব ব্রাহ্মণের মৈথুন আর ওটা ক্ষত্রিয়ের অথবা ওটা শূদ্রের? সম্ভব নয়। কারণ বাক্য, মৈথুন, জন্ম, মরণ-সমস্ত বর্ণে একই রকম–বামৈথুনমঘো জন্ম মরণঞ্চ সমং নৃণা।
যুধিষ্ঠির সমতার উদাহরণ দিয়ে তার আসল মত প্রতিষ্ঠা করেছেন। বলেছেন–মানুষ বলে কথা। ইন্দ্রিয় দুর্বার। এখনও পর্যন্ত এমন একটা শুদ্ধ-রক্তের সমাজ দেখাতে পারবে না, যেখানে তথাকথিত একটি জাতি অন্য জাতির রমণীতে সন্তান উৎপাদন করেনি। সবার ঘরে সবার ছেলে আছে। শূদ্ৰানীর গর্ভে ব্রাহ্মণের, ব্রাহ্মণীর গর্ভে শূদ্রর-সর্বে সর্বাস্বপত্যানি জনয়ন্তি সদা নরাঃ। কখনও রুচি-বৈচিত্র্য, কখনও বা সময় বুঝে মানুষ দেখে, তুচ্ছ জাতি শিকেয় তুলে নির্জন মিলন–টীকাকারের ভাষায়-রুচিবৈচিত্র্য প্রায়েণ রহোলাভাচ্চেতি। যুধিষ্ঠির সিদ্ধান্ত দিলেন–একমাত্র মৈথুনের মাধ্যমেই ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্রের রক্ত এমনভাবে মিশে গেছে যে তার মধ্যে থেকে একটা শুদ্ধ ব্রাহ্মণ-জাতি অথবা একটা শুদ্ধ শূদ্র-জাতি খুঁজে বার করাটা ভীষণ কঠিন হবে–সঙ্করাৎ সর্ববর্ণানা দুষ্পরীক্ষ্যেতি মে মতিঃ।
যুধিষ্ঠির এবার নৃতাত্ত্বিকের ভূমিকা ছেড়ে তত্ত্বজ্ঞের ভূমিকায় উত্তরণ করছেন। তিনি শাস্ত্রজ্ঞ, বেদ-বেদান্তের নিগুঢ় তত্ত্ব তিনি জানেন। উপরন্তু নিজের অনুভবের কথা বলেই তো আর ব্রাহ্মণ্যের বিচার চলে না। সেই জন্য তিনি পরম্পরাগত শ্রুতিবাক্য উচ্চারণ করছেন নহুষরূপী নাগবংশীয়র কাছে। বলছেনজম্মের নিয়মেই শুধু একটা মানুষ ব্রাহ্মণ হতে পারেন কি না, এ সন্দেহ আজকের নয় সর্প! এ সন্দেহ বৈদিক কাল থেকে আরম্ভ করে ঋষিদের কাল পর্যন্ত একইভাবে চলেছে। বৈদিক ব্রাহ্মণ বলেছেন–আমরা সঠিক জানি না, আমরা ব্রাহ্মণ, না অব্রাহ্মণন চৈতদবিম্মা ব্রাহ্মণাঃ স্ম বয়মব্রাহ্মণ বা। বেদের কালের যাজ্ঞিক যাঁরা, তারাও নিজেদের জন্মে বিশ্বাস করেন না। যার জন্য যজ্ঞ করার সময় সাধারণভাবে তারা একবারও বলেন না–আমরা ব্রাহ্মণেরা এই যজন-কর্ম করছি। তারা বলেন–’আমরা যারা যজন-কর্ম করছি’–অর্থাৎ নিজেদের জন্ম-ব্রাহ্মণ্যে তাদের আস্থা নেই। কিন্তু যজ্ঞ যখন করছেন, তখন তাদের শম-দমাদি গুণের প্রশ্নটা স্বতঃসিদ্ধই বটে–ত্যা যাগসামান্যে ‘যে যজামহে’ ইত্যাদি মন্ত্রপাঠো বিহিতঃ, তত্র চ ব্রাহ্মণ বয়ং যজামহে ইত্যাদ্যনুকত্বা যৎ ‘যে যজামহে’ ইত্যুক্তং তদ যাজ্ঞিকানামাত্মজন্ম-সন্দেহাদেব।
যুধিষ্ঠির শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্যের চরম উৎকর্ষ স্থাপন করলেন ব্রাহ্মণের সবৃত্তি এবং চরিত্রে–তস্মাচ্ছীলং প্রধানেষ্টং বিদুর্যে তত্ত্বদর্শিনঃ। যুধিষ্ঠির সারা জীবন ব্রাহ্মণদের মুখে তত্ত্বকথা শুনেছেন। তার নিজের মধ্যেও ক্ষত্রিয়দের সংস্কারের চেয়ে ব্রাহ্মণের সংস্কার বেশি। ফলত তার কথা আস্তে আস্তে বড়ই তত্ত্ব-কর্কশ শুষ্ক হয়ে উঠছিল। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে নহুষও তো কিছু কম যান না। যিনি জ্ঞান এবং তপস্যার বলে দেবতা এবং ঋষিদের দ্বারা স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্রপদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন, তার জ্ঞানও তো কিছু কম নয়। সেই জ্ঞান পরম্পরাক্রমে নেমে এসেছে তার অধস্তনের মধ্যে। নাগবংশীয় নহুষও যুধিষ্ঠিরকে কিছু উপদেশ করেছেন। সেই উপদেশ এমনই যে, তার মধ্যেও ব্রাহ্মণ্যের সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়িয়েছে সত্যনিষ্ঠা, ইন্দ্রিয়দমন, তপস্যা, দান এবং ধর্মপরায়ণতা।
বস্তুত ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের সমাজ থেকে পতিত হয়ে অনুতপ্ত নহুষ হয়তো শম-দমের সাধনেই নিজেকেই শোধন করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন–মানুষ জ্ঞানী বা বীর হলেও ঐশ্বর্য এবং সম্পদ তার মধ্যে মত্ততা সৃষ্টি করে, যে মত্ততা তাকে এক সময় গ্রাস করেছিল। মানুষের জীবনে যখন চরম সুখ, সুখের কুল-কিনারা পাওয়া যায় না, সেই সুখের মধ্যেই বাসা বাঁধে অভিমান আর মূঢ়তা-বর্তমানঃ সুখে সর্বো মুহ্যতীতি মতির্মম। নহুষ একসময় এই চরম সুখ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারও মত্ততা এসেছিল এবং সে মত্ততার শাস্তিও তিনি পেয়েছেন। হয়তো মহাবনে নাগ-জন-জাতির সঙ্গে থাকতে থাকতে দিবারাত্র সেই বিস্ময়বোধ কাজ করেছে। ঋষি অগস্ত্যের কথা তার মনে পড়ে। অর্থ নয়, দণ্ডধারণ নয়, রাজত্ব নয়; শুধু সত্য, অহিংসা, তপস্যার জোর একটা মানুষকে কত শক্তিমান করে দিতে পারে। দিনের পর দিন এই ব্রাহ্মণ্য-গুণের অনুশীলনে তার পাপ-শোধন হয়েছে, বংশ বংশ ধরে সেই শোধন মুক্ত করেছে। ব্যক্তি নহুষকে এবং নহুষের পরিমণ্ডলে বাস করা নহুষ নামের নাগ-জন-জাতিকে। নহুষেরা বুঝেছেন–সত্যনিষ্ঠা, শম-দম–এইসব গুণই মানুষকে মানুষ করে তোলে। জাতিগৌরবও নয়, জন্মলব্ধ কুল-গৌরবও নয়—সাধকানি সদা পুংসাং ন জাতি ন কুলং নৃপ। নাগদের মধ্যে বাস করেও নহুষেরা আজ তাই নিজের জাতি-কুল নিয়ে বিব্রত নয়। আজকে নহুষ দলের প্রধান পুরুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে এমন একজনের, যিনি রাজ্যভ্রষ্ট বটে, তবে তার মধ্যে রয়েছে সেইসব গুণ যা শুদ্ধ ব্রাহ্মণোচিত। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের সমাজচ্যুত নহুষেরা আজকে ব্রাহ্মণ্যের শুদ্ধ-সংজ্ঞায় মিলিত হয়েছেন এমন একজনের সঙ্গে যিনি তপস্যা, সত্যনিষ্ঠা এবং ধর্মের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত। নহুষ মুক্ত হয়ে স্বর্গে গেছেন, আর যুধিষ্ঠির সত্যনিষ্ঠ হয়ে বনান্তরালে বসে আছেন হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের সঙ্কল্প নিয়ে।
