নহুষরূপী সর্পের সঙ্গে যুধিষ্ঠিরের মিলন কীভাবে হল, সে কথা পুর্বে আমরা জানিয়েছি। এখানে কৌতূহলের বিষয় একটাই–চন্দ্রবংশের পঞ্চম পুরুষ হাজার হাজার বছর ধরে শাপগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছেন কত বছর পরে তার অধস্তন যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দেখা হবে বলে। সর্প হবার অভিশাপ কি সত্যই সর্পের রূপ, নাকি সর্পগতি। মহাভারতে এবং পুরাণগুলির মধ্যে দেখা যাবে-ব্রাহ্মণেরা যখন আপন স্বধর্ম স্বাধ্যায়-অধ্যয়ন ত্যাগ করতেন, তারা তখন শূদ্রসংজ্ঞা লাভ করতেন। একইভাবে ক্ষত্রিয়েরাও যখন তাদের রাজধর্ম, প্রজারণ ধর্ম ঠিক-ঠিক পালন করতেন না, তখন তারাও শূদ্র বলে পরিগণিত হতেন। সোজাসুজিভাবে এসব কথার অর্থ হল–ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রা নিজের ধর্ম থেকে পতিত হল, আর তারা আপন সমাজের মানুষজনের সঙ্গে ওঠাবসা করতে পারতেন না। সমাজের অধম স্তরে তাদের গতি হত। অন্যদিকে লক্ষণীয়–সমাজের নিম্নস্তরেও এক ধরনের গভীর স্বাজাত্যবোধ থাকে। আজ যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণ্য বা ক্ষাত্রধর্ম থেকে পতিত হয়ে শূদ্রসংজ্ঞা প্রাপ্ত হলেন, শূদ্রেরা যে তাকে আত্মীয়বৎ নিজের করে নেবে তা মোর্টেই নয়। দলে জায়গা না পাওয়া বাঘকে বেড়ালও আত্মীয় মনে করে না। ময়ূরপুচ্ছধারী হলে কাকও অন্য কাককে জায়গা দেয় না। লক্ষ্য করে দেখবেন, নহুষ অগস্ত্যের শাপে সর্পগতি প্রাপ্ত হয়ে সর্পজগতের মধ্যে বসতি স্থাপন করেননি। তিনি এক মহাবনে একাকী রয়েছেন গুহার মধ্যে।
সোজা কথা সোজা ভাষায় বলি। নহুষ স্বর্গরাজ্য থেকে চ্যুত হয়ে অধম গতি প্রাপ্ত হয়েছেন। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের উচ্চ শাসনাধিকার থেকে তাকে নেমে যেতে হয়েছে। অত্যাচার এবং অসভ্যতার চরম দণ্ড হিসেবে শুধু রাজ্যচ্যুতিই নয়, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের সমাজেই তার স্থান হয়নি, তিনি সর্পসংজ্ঞা লাভ করেছেন। সর্পকে যেমন গর্তে লুকিয়ে থাকতে হয়, নহুষেরও তেমনই আপন সমাজে মুখ দেখানোর উপায় নেই; তিনি গুহার মধ্যে লুকিয়ে আছেন। ঠিক এই মুহূর্তে আমরা সেই ভূতপূর্ব ইন্দ্রের কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যিনি আপন পাপ এবং অন্যায়ের জন্য সর্পের মতো লুকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন জলা জায়গায়।
নহুষেরও তাই হয়েছে। মহাবনে থাকতে থাকতে হাজার বছর ধরে তার নামেও এক নাগগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যে গোষ্ঠীর কোনও পরবর্তী বংশধর-পুরুষের সঙ্গে যুধিষ্ঠিরের দেখা হয়েছে। তিনি পূর্বতন পুরুষের গৌরব অনুভব করেন, পাতিত্য ঘটা সত্তেও চন্দ্রবংশের সঙ্গে একাত্মতায় তিনি পূর্ব গৌরব অতিক্রম করতে পারেন না এবং শেষ পর্যন্ত চন্দ্রবংশের উপযুক্ত বংশধরের সাহায্যেই তিনি মুক্তির উপায় খুঁজে পান। মনে রাখতে হবে–জনমেজয়ের। সর্পষজ্ঞের পূর্বে যে সমস্ত বিখ্যাত নাগের নাম উগ্রশ্রবা সৌতির মুখে কীর্তিত হয়েছে, তাদের মধ্যে নহুষ একজন নিষ্ঠানকো হেমগুহে নহুষঃ পিঙ্গলস্তথা। বিখ্যাত নাগদের যে এক-একটা সম্পূর্ণ গোষ্ঠী ছিল, তার প্রমাণ পাবেন জনমেজয়ের সঙ্গে একেকটি নাগগোষ্ঠীর ধ্বংস থেকে। সেখানে বাসুকির বংশ, তক্ষকের বংশ অথবা ঐরাবত নাগের বংশে যত সর্প ছিল, সকলেই আগুনে প্রবেশ করেছেন।
আমাদের বক্তব্য নহুষেরও একটা বংশ তৈরি গয়ে গিয়েছিল এবং সে বংশ যথেষ্ট পুরনো। পণ্ডিতেরা বলেন–’নহুষ’ নামটির সমশব্দ পাওয়া যাবে প্রাচীন হিব্রু শব্দ ‘নঘুস বা নঘস’ শব্দের মধ্যে এবং সে শব্দের অর্থই হল মাগ। অনেকে মনে করেন নঘস’ শব্দটা থেকেই দ্রাবিড় ভাষায় নাগ শব্দটা এসেছে। বিশেষত দ্রাবিড় জাতি ভারতবর্ষে আর্যদের পূর্ববর্তী এবং প্যালেস্টাইনেও তারা সেমেটিক সভ্যতার পূর্বসূরি। কাঠিন্যের মধ্যে না গিয়ে, মহামতি কোশাম্বীর কথা উল্লেখ কলে ব্যাপারটা এইরকম দাঁড়ায়–মহাভারতের সময়ে অরণ্যবাসী অনার্য জনজাতির সঙ্গে নাগরা প্রায় সমীকৃত হয়ে গেছেন। এরা সর্পাকৃতি কোনও টোটেম ব্যবহার করতেন কিনা অথবা এরা সর্পের পূজা করতেন কিনা, সেটাও এখানে প্রায় অবান্তর। গাঙ্গেয় উপত্যকার বনভূমিতে নাগরা খাদ্য সংগ্রহ করে বেড়াতেন, যেহেতু পাঞ্জাবের মরুপার্বত্য অঞ্চলে খাদ্য সংগ্রহের চেয়ে গাঙ্গেয় সমভূমিতে খাদ্য-সংগ্রহ করা অনেক সহজ ছিল। খাদ্য-সংগ্রহের এই উদাসীন বৃত্তির সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কোনও বিরোধও ছিল না। বেদের মধ্যেই এমন ব্রাহ্মণের পরিচয় আছে, যারা এইভাবেই খাদ্য সংগ্রহ করতেন। গুরুকুলে পাঠরত ব্রহ্মচারীকেও অনেক সময় খাদ্য-সংগ্রহ করতে হত এইভাবে। নাগেরা তাই কখনও শূদ্র বা দাস-পর্যায়ভুক্ত হননি। কেন না শুদ্র বা দাসদের সঙ্গে চাষবাসের যোগ আছে। নাগমাতার পুত্র আস্তীক এবং সোমবার মুনির সম্মান দেখে একথা আরও পরিষ্কার বলা যায় যে–If the Brahmins who edited the overinflated epic could proclaim ancestry so far beyond the Aryan pale, without shame, the Nagas were in some way a very respectable people, not demons nor a low caste.
কোশাম্বী নাগ জনজাতিকে ভারতবর্ষে আর্যপূর্ব জনজাতিদের একতম মনে করেন, যাঁরা গাঙ্গেয় উপত্যকার গভীর অরণ্যভূমিতে ঘুরে ঘুরে খাদ্য সংগ্রহের বৃত্তি ত্যাগ করতে পারেননি। আমরাও আমাদের নহুষকে এক মহাবনের মধ্যে অবস্থিত দেখেছি। কাহিনীর অনুরোধে তার খাদ্যসংগ্রহের বৃত্তির মধ্যে ভীমের মতো এক খাদ্যের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আমাদের ধারণা যুধিষ্ঠির-ভীমের সঙ্গে যে নহুষের দেখা হয়েছে, তিনি পূর্বতন চন্দ্রবংশের পঞ্চম পুরুষ যে নহুষ, তার বংশধর কেউ হবেন। ঋগবেদে নহুষ তো একেবারে মনুর মতোই এক জনগোষ্ঠীর প্রতিভূর নাম। এই নহুষের সঙ্গে হয়তো বৈদিক নহুষের কোনও সম্পর্ক নেই; কিন্তু চন্দ্রবংশের পঞ্চম পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও কোনও এক নহুষের সঙ্গে যুধিষ্ঠিরের দেখা হওয়াটা কোনওভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না, যদি না তিনি ব্রাহ্মণের অভিশাপে পতিত নহুষের নাগ-বংশধর কেউ না হন।
