শচীর ভাবে, মাধুর্যে, কথায় নহুষ নিজেকে হারিয়ে ফেললেন একেবারে। বিগলিত হয়ে বললেন-বাঃ! তুমি নইলে এমন অপূর্ব এক বাহনের কথা কার মাথায় আসত–অপূর্বং বাহনমিদং ত্বয়োক্তং বরবৰ্ণিনি। তুমি যা বলেছ, আমার ভীষণ ভীষণ পছন্দ হয়েছে। বৃহৎ কোনও পশু নয়, রথ নয়, এমনকি সাধারণ মানুষও নয়। আমি হব ঋষি-বাহন। সাধারণ অল্পশক্তি কোনও রাজা কি আর ঋষিদের নিয়ে পাল্কি বওয়াতে পারে–নাল্পবীর্যো ভবতি যো বাহান্ কুরুতে মুনী?
নহুষ আত্মখ্যাপনে ব্যস্ত হলেন। শচীকে বললেন–আর সত্যিই তো, তুমি যেমন বলেছ আমি তপস্বী এবং বলবান। আমার রাগ হলে তিন ভুবনে থরহরি কম্প লাগে। ঋষিরা এখন আমারই উদ্দেশে আহুতি দিচ্ছেন। তুমি ভেব না, ইন্দ্রাণী! যেমনটি তুমি বলেছ, তেমনটিই আমি করব। আমি যে তোমারই–তদ্বশোস্মি বরাননে। যেদিন মিলন-মুহূর্ত নির্ধারিত হবে, সেদিন সপ্তর্ষির সাত বেহারা সামনে এসে আমায় কাঁধে তুলে নেবে শিবিকার ভিতরে। পিছনে আসবেন ব্রহ্মর্ষিরা পায়ের তালে হুনহুনার ঝঙ্কার তুলে–সপ্তর্ষয়ো মাং বক্ষ্যন্তি সর্বে ব্রহ্মর্ষয় স্তথা। তুমি শুধু দাঁড়িয়ে দেখবে আমার ক্ষমতা, আমার ঋদ্ধি-পশ্য মাহাত্ম্যম্ অস্মাকমৃদ্ধি বরবৰ্ণিনি।
শচীদেবী এতক্ষণ নহুষকে যেভাবে বললেন–তার মধ্যেই দেবরাজ ইন্দ্রের কৌশল নিহিত ছিল। নহুষের অহঙ্কার স্ফীতভাব অনুমোদন করে শচীদেবী বৃহস্পতির বাড়িতে ফিরে এলেন। সময় আর বেশি নেই। সন্ধ্যাবেলায় নহুষ আসবেন ঋষি-বেহারার পাল্কি চড়ে। শচী বৃহস্পতিকে বললেন–আপনি ইন্দ্রের খোঁজ করুন। আর যে সময় নেই-সময়ো’ল্পাবশেষো মে নহুষেণেহ যঃ কৃতঃ। বৃহস্পতি অগ্নিদেবের মাধ্যমে ইন্দ্রকে খবর পাঠালেন। ইন্দ্রও যম, বরুণ, চন্দ্রের মতো উচ্চকোটির দেবতাদের সঙ্গে শলাপরামর্শ আরম্ভ করলেন নহুষের সঙ্গে শেষ লড়াই করবার জন্য। ইন্দ্র যে নহুষের মুখোমুখি হতে খুব সাহস পাচ্ছেন, তা মোটেই নয়। বারবার তিনি তার যোদ্ধা দেবতা-বন্ধুদের বলছেন–বর্তমান দেবরাজ নহুষ একেবারে সাংঘাতিক লোক, আপনারা যুদ্ধের সময়ে আমাকে সাহায্য করবেন কিন্তু রাজা দেবানাং নহুযো ঘোররূপ। স্ত সাহং দীয়তাং মে ভবদ্ভিঃ।
সৌভাগ্যের বিষয় ইন্দ্রকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে হয়নি। সেই সন্ধ্যায় নহুষ যখন রায়বেশে পাকিতে উঠেছেন, তখন তার পাক্কি কাঁধে করে বয়ে নিয়ে চললেন সাত-বেহারা সপ্তর্ষি। আগে-পিছে চললেন মহর্ষিরা, ব্রহ্মর্ষিরা। ব্রহ্মর্ষি ঋষিদের সর্বত্র সমভাব, তারা স্থিতধী। সুখ-দুঃখ, লাভ-অলাভ-সর্বত্র সমভাব–দুঃখে অনুদ্বিগ্নচিত্ত, সুখে বিগতস্পৃহ। তাঁরা যে। অযোগ্য নহুষের শিবিকা কাঁধে করে বয়ে নিয়ে চলেছেন, এতে তারা কিছু মনেও করেননি, দুঃখও পাননি। দেশের রাজা চাইছেন তিনি ঋষিদের কাঁধে চড়ে প্রিয়মিলনে যাবেন, তাঁরাও সেটাকে রাজার নবতর বিলাস মনে করে তাঁকে সানন্দে কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
মজা হল, ঋষি-মুনিরা অন্যসময় দিনরাত স্বাধ্যায়-অধ্যয়ন আর হোম-যজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে সাধারণ অবসরেও তারা সাধারণ কথা বলতে পারেন না। রাজা নহুষকে কাঁধে করে নিয়ে যেতে যেতে তারা একটু ক্লান্তও হয়ে গিয়েছিলেন। একে অনভ্যাস তার ওপরে বৃথা সময় নষ্ট। হয়তো সেই কারণেই পথে সামান্য সময়ের জন্য শিবিকা নামিয়েছিলেন। সামান্য অবসর মানেই বৈদিক ক্রিয়া-কলাপ নিয়ে ঋষিদের মীমাংসাশাস্ত্রের আলোচনা। আলোচনার বিষয় যজ্ঞকালে গো-প্রোক্ষণ। যজ্ঞের সময় গোবধের কতগুলি মন্ত্র আছে। সেই মন্ত্রগুলির প্রয়োগ নিয়ে যাজ্ঞিকদের মধ্যে কিছু মতভেদও আছে। ঋষিরা সামনে নহুষকে পেয়েছেন। নহুষ জ্ঞানী ব্যক্তি। এককালে তিনি বহু যজ্ঞ করেছেন। ঋষিরা ঠিক করলেন গো-প্রেক্ষণের প্রশ্ন মীমাংসার জন্য তারা নহুষকেই সাক্ষী মানবেন।
ঋষিরা বললেন–মহারাজ! গো-প্রাণে ব্রহ্মা যে মন্ত্রগুলি উচ্চারণ করার কথা বলেছেন, আপনি কি সেগুলিকে প্রমাণ বলে গ্রাহ্য করেন? নহুষ বললেন–না, মোটেই না। আমি সেগুলিকে প্রমাণ বলে মানি না। ঋষিরা বললেন–আপনি না মানলেও ব্রহ্মার কথাকেই আমরা প্রমাণ বলে মনে করি এবং প্রাচীন মহর্ষিরাও তাই মনে করেন। নহুষ মানলেন না। লোক-পিতামহ ব্রহ্মার বিধানও আজ নহুষের কাছে হেয়।
ঋষিদের প্রশ্ন এবং সিদ্ধান্ত নহুষের ক্রোধ উদ্রেক করল। প্রশ্নকারী ঋষিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঋষি অগস্ত্য। মুনিদের সঙ্গে তর্ক করতে করতে নহ্য অগস্ত্যের মাথায় কষে একটি লাথি মারলেন। ঋষিদের শিবিকা-বহন স্তব্ধ হল। অগস্ত্য ঘুরে দাঁড়ালেন। মন্ত্রপূত জল হাতে নিয়ে অভিশাপ উচ্চারণ করলেন–তুমি সর্বজনপূজ্য ব্রহ্মার কথা মানছ না। ঋষিরা গোপোক্ষণে যে মন্ত্র ব্যবহার করেন, সেই মন্ত্রানুষ্ঠান তুমি উড়িয়ে দিচ্ছ। আজকে তোমার এমন অবস্থা যে, পূজ্যতম মহর্ষিদের দিয়ে তুমি পাল্কি বওয়াচ্ছ, আর তোমার দুঃসাহস কতদূর বেড়েছে যে, তুমি আমার মাথায় লাথি মারলে! এর ফলে আজই তুমি স্বর্গ থেকে পতিত হবে–ধবংস পাপ পরিভ্রষ্ট ক্ষীণপূণ্যো মহীতলে–আর বিশাল সর্পদেহ ধারণ করে তোমাকে বিচরণ করতে হবে পৃথিবীতে। সময় আসবে যখন তোমারই বংশোদ্ভূত যুধিষ্ঠির তোমাকে পাপ-মুক্ত করবেন।
ঋষিদের সঙ্গে নহুষের তর্কের বিষয় নিয়ে মতভেদ আছে। মহাভারত বৈদিক যুগের অব্যবহিত পরের রচনা। ফলত তর্কের বিষয়ের মধ্যে বৈদিক কর্মকাণ্ডই প্রাধান্য লাভ করেছে। পৌরাণিকেরা মনুষ্য-কল্পনার অনেক কাছাকাছি এসেছেন, তাই তাদের উপাখ্যানে কাহিনীর সরসতা বেশি। তারা বলেন–ইন্দ্রাণী শচীর সঙ্গে মিলিত হবেন বলে নহুষের উৎকণ্ঠা এবং ব্যগ্রতা ছিল তুঙ্গে। শিবিকাবহনে অনভ্যস্ত ঋষিরা ঠিক তাল রেখে বহন করতে পারছিলেন না। তাদের সমবেত পদক্ষেপে কোনও ঐক্য ছিল না। শিবিকারোহী নহুষের তাতে কষ্ট বাড়ছিল এবং তার যেতে দেরিও হচ্ছিল। বাহনের অসুবিধে যখন চরমে উঠল, তখন নহুষ অগস্ত্যের মাথায় লাথি মেরে বলেন—’সর্প, সৰ্প’। সংস্কৃতে এই নিষ্পন্ন ক্রিয়াপদের অর্থ ‘চল চল’। আমাদের তাড়াতাড়ি থাকলে ট্যাক্সিওয়ালা বা রিক্সাওয়ালাকে আমরা যেমন বলি–একটু তাড়াতাড়ি চল, জদি চল, ঠিক সেইরমই নহুষের বক্তব্য। তবে নহুষ দর্পোদ্ধত রাজা হওয়ার ফলে তার ভাষায় কটুতা তো ছিলই, উপরন্তু অগস্ত্যের মাথায় পদাঘাত। ফল যা হবার হল। অন্তত অভিশাপের বৃত্তান্ত সর্বত্র একই রকম। নহুষের মুখে সর্প সর্প যতই শীঘ্রতা বোঝাক, সর্প শব্দটাই অভিশাপের ভাষায় ক্রিয়াপদ থেকে রূপান্তরিত হল বিশেষ্যপদে-যার অর্থ, তুমি সর্পগতি প্রাপ্ত হবে–দশবর্ষ-সহষা সর্পরূপধরো মহান্।
