ক্ষণিকের জন্য স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্র যে একবার এসেছিলেন, ইন্দ্রাণী তা দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁকে যে ধরে রাখা গেল না, সেই দুঃখ তার কাছে মর্মান্তিক হয়ে দাঁড়াল। মহাভারত বলেছে–ইন্দ্রাণী তখন উপশ্রুতি’ নামে এক রাত্রিদেবীর উপাসনা করে, তারই সহায়তায় ইন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন তার গোপন আস্তানায়। আমাদের ব্যক্তিগত ধারণায় উপশ্রুতি’ হয়তো তিনিই, যিনি সাধারণ খবর ছাড়াও আরো কিছু খবর রাখেন। সংস্কৃতে ত’ বা শব্দ-খবর রাখা বা জানা থাকার অর্থ বোঝায়। বহুশ্রুত’, ‘অল্পক্রত’ এই শব্দগুলির অর্থ লক্ষণীয়। আরও লক্ষণীয় উপশ্রুতি’ দেবী রাত্রির সমার্থক। অর্থাৎ আমাদের ধারণা–গোপন খবর জানেন এমন একজন রমণীর সঙ্গে রাতের আঁধারে ইন্দ্রাণী গিয়েছিলেন ইন্দ্রের আস্তানায়। ইন্দ্রের সঙ্গে তাদের দেখাও করতে হচ্ছে অতি সূক্ষ্ম-রূপে–সূক্ষ্মরূপধরা দেবী বভূবোপক্ৰতিশ্চ সা। এই সূক্ষ্মরূপ গোপনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইন্দ্রও সূক্ষ্মরূপে আছেন, এরাও দেখা করছেন সূক্ষ্মরূপে অর্থাৎ অন্যে যাতে বুঝতে না পারে সেইরকম গূঢ়ভাবে শচী আর উপশ্রুতি দেখা করলেন লুকিয়ে থাকা ইন্দ্রের সঙ্গে।
ইন্দ্ৰ আপন পত্নীকে এই অবস্থায় তার কাছে আসতে দেখে খুশি হলেন না মোটেই। বললেন–তুমি কী জন্য এখানে এসেছ, আমি যে এখানে আছি তাই বা জানলে কী করে–কিমর্থমসি সম্প্রপ্তা বিজ্ঞাত কথং তৃহম? শচী আর উপশ্রুতির কথা বিশদে না বলে তার আসন্ন বিপদের কথা জানালেন। জানালেন–দুরাত্মা নহুষ লজ্জা-ধর্ম ত্যাগ করে আমাকে বলেছেন তাকে স্বামিত্বে বরণ করতে। আমার সঙ্গে মিলিত হওয়ার শেষ একটা সময়-সীমাও তিনি দিয়ে দিয়েছেন–কালঞ্চ কৃতান মম। এই অবস্থায় তুমি যদি এখন আমাকে তার হাত থেকে রক্ষা না কর, তাহলে জোর করে সে আমাকে আত্মসাৎ করবে-যদি ন ত্ৰাস্যসি বিভো করিষ্যতি স মাং বশে। তুমি আক্রমণ করো নহুষকে।
ইন্দ্র শচীর সব কথা ভাল করে শুনলেন। তারপর প্রকৃত সত্য স্বীকার করে মন্তব্য করলেন–এখনও নহুষকে আক্রমণ করার সময় হয়নি। আর আমার বীরত্ব দেখানোর সময়ও এটা নয়। কারণ নহষ আমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিমান–বিক্রমস্য ন কালো’য়ং নহুষো বলবত্তরঃ। ঋষিরা নহষকে দেবতার সমাদর দেখিয়ে বাড়িয়ে তুলেছেন, এখন আর আমার কিছু করার নেই। ইন্দ্র আপন পত্নীকে নিজের অসহায় অবস্থার কথা জানিয়ে শেষে বললেন–আমি একটা কৌশল করব। তুমি সেটা কাউকে বলবে না।
বিপদ থেকে ত্রাণ পাবার আশায় শচী উৎকর্ণ হলেন। ইন্দ্র শচীকে বললেন-কেউ যখন নহুষের কাছে থাকবে না, সেই নির্জন মুহূর্তে তুমি নহুষের কাছে যাবে। তারপর বলবে…। তারপর যা বলতে হবে ইন্দ্র তা কানে কানে বলে দিলেন শচীদেবীকে। অলোকমান্যা রূপসী শচী শৃঙ্গার-মধুর বেশভূষা করে ইন্দ্রের কথামতো নির্জনে দেখা করলেন নহুষের সঙ্গে। নহুয তো শচীকে দেখে বিগলিত হয়ে বললেন–আরে ইন্দ্রাণী যে! রাস্তায় কোনও কষ্ট হয়নি তো? তা এই সময়ে তোমার চিরভক্তের কাছে তুমি এসেছ। বল কী চাও? যা চাও তাই দেব-ভক্তং মাং ভজ কল্যাণি কিমিচ্ছসি মনস্বিনি।
মধুর হেসে ইন্দ্রাণী বললেন–আপনি আমাকে যে মিলনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, তা আমি মেনে নিয়েছি। এর পরে আপনিই হবেন আমার স্বামী, আমার সব–ততস্তমেব মে ভর্তা ভবিষ্যসি সুরাধিপ। তবে কী, মনে মনে আমার একটা অভিলাষ আছে। সেই। অভিলাষ-বাক্যের মধ্যেই আছে আমার ভালবাসা–বাক্যং প্রণয়সংযুক্ত।
আপনি যদি সত্যিই আমার কথা রাখেন, তবেই আমি আপনার চরণের দাসী হব।
নহুষ ভাবলেন–তিন ভুবনের অধিকার তারই হাতে। কী এমন চাইবেন ইন্দ্রাণী যা তার অদেয় হতে পারে? শচী নহুষের মনের ভাব বুঝে সাভিনয়ে নিজের স্বামীকে পর্যন্ত তুচ্ছ করে বললেন–আমার আগের স্বামী ইন্দ্রের অনেক বাহন ছিল। হাতি, ঘোড়া, রথে আমি অনেক চড়েছি। কিন্তু হস্তিশ্রেষ্ঠ ঐরাবতও হাতি, অশ্বশ্রেষ্ঠ উচ্চৈবাও ঘোড়াই বটে। এসব বাহন আমার কাছে পুরনো হয়ে গেছে। আমি আমার ভবিষ্যৎ স্বামীকে এমন বাহনে সমাসীন দেখতে চাই, যে বাহন শিব, বিষ্ণু দেবতা-অসুর কারও নেই।
বিষ্ণুর বাহন গরুড়, কি শিবের বাহন ষাঁড়-এও যখন ভাবী-প্রিয়তমার পছন্দ নয়, অথবা দেবতাদের বাহনগুলি হংস-ঘোটক, মূষিক-ময়ূর–কিছুই যখন পছন্দ নয়, তবে হয়তো সিংহ-টিংহ পছন্দ হবে শচীর। নহুষ মনে মনে চিন্তা করলেন–শচী তাকে কতটা বড় ভাবেন। এতটাই বড় যে বিষ্ণু-শিবের সমাসনে পর্যন্ত তাকে বসাতে চান না। নহুষের আপন হৃদয়ের স্ফীত ভাবনাকে আরও প্রশ্রয় দিয়ে শচী বললেন–আমি চাই আমার প্রিয়তম আমাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য এমন একটি পাল্কি করে আসুন, যে পাল্কি বয়ে আনবেন দেবাসুরের পূজ্যতম মহর্ষিরা, দেবর্ষিরা-বহন্তু ত্বং মহাভাগা সঙ্গতা বিভো।
বলদর্পিত, কামুক নহুষ যাতে পিছিয়ে না আসেন, তার জন্য যাকে ইংরেজিতে বলি ‘ফেমিনিটি এক্সপ্লয়েট’ করা, ঠিক সেই ভাবেই শচী তার রমণীয়তা তীব্রতর করে বললেন আপনাকে এই রকম করেই দেখতে চাই মহারাজ–এতদ্ধি মম রোচতে। আপনাকে লোকে দেবতা-অসুরদের সমান বলে ভাববে–এ আমার সইবে না, রাজা! দেবতা-অসুর যার দিকে আপনি দৃষ্টিপাত করেন তারই শক্তি আপনার মধ্যে সংক্রামিত হয়। আপনি তাদের অনেক ওপরে। ওঁরা কেউ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে পর্যন্ত থাকতে পারবে না। কিন্তু সেই মানুষটা অন্য দেবতাদের মতো চিরাচরিত পশুবাহনে সমাসীন হয়ে, বড় জোর রথে চড়ে আমার গলায় বরমাল্য দিতে আসবেন–এ আমি সইতে পারব না মহারাজ। আমার মাথা খাও, ওঁদের সঙ্গে তোমাকে আমি এক করে দেখতে পারব না–নাসুরেসু ন দেবেষু তুল্যো ভবিতুমহসি।
