তারপর?
তারপর সেই সরভাজা আর সরপুরিয়ার হাঁড়ি নিয়ে আমরা দুজন সোজা টেনিদাদের তে-তলার ছাদে। টেনিদা একখানা গোটা সরভাজা মুখে দিয়ে বললে; ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস–
আমি সরপুরিয়ায় কামড় দিয়ে বললুম : ইয়াক–ইয়াক!
ভজহরি ফিল্ম কর্পোরেশন
বউবাজার দিয়ে আসতে আসতে ভীমনাগের দোকানের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে গেল টেনিদা। আর নড়তে চায় না। আমি বললুম, রাস্তার মাঝখানে অমন করে দাঁড়ালে কেন? চলো।
–যেতে হবে? নিতান্তই যেতে হবে?–কাতর দৃষ্টিতে টেনিদা তাকাল আমার দিকে; প্যালা, তোর প্রাণ কি পাষাণে গড়া? ওই দ্যাখ, থরে থরে সন্দেশ সাজানো রয়েছে, থালার ওপর সোনালি রঙের রাজভোগ হাতছানি দিয়ে ডাকছে, রসের মধ্যে ডুব-সাঁতার কাটছে রসগোল্লা, পানতো। প্যালা রে–
আমি মাথা নেড়ে বললুম, চালাকি চলবে না। আমার পকেটে তিনটে টাকা আছে, ছোটমামার জন্যে মকরধ্বজ কিনতে হবে। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে, চলো এখন
টেনিদা শাঁ করে জিভে খানিকটা লাল টেনে নিয়ে বললে, সত্যি বলছি, বড্ড খিদে পেয়েছে রে! আচ্ছা, দুটো টাকা আমায় ধার দে, বিকেলে না হয় ছোটমামার জন্যে মকরধ্বজ
কিন্তু ও সব কথায় ভোলবার বান্দা প্যালারাম বাঁড়ুজ্যে নয়। টেনিদাকে টাকা ধার দিলে সে-টাকাটা আদায় করতে পারে এমন খলিফা লোক দুনিয়ায় জন্মায়নি। পকেটটা শক্ত করে ঢেকে ধরে আমি বললুম, খাবারের দোকান চোখে পড়লেই তোমার পেট চাঁই-চাঁই করে ওঠে– ওতে আমার সিমপ্যাথি নেই। তা ছাড়া, এ-বেলা মকরধ্বজ না নিয়ে গেলে আমার ছেঁড়া কানটা সেলাই করে দেবে কে? তুমি?
রেলগাড়ির ইঞ্জিনের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল টেনিদা।
ব্রাহ্মণকে সক্কালবেলা দাগা দিলি প্যালা–মরে তুই নরকে যাবি।
-যাই তো যাব। কিন্তু ছোটমামার কানমলা যে নরকের চাইতে ঢের মারাত্মক সেটা জানা আছে আমার। আর, কী আমার ব্রাহ্মণ রে! দেলখোস রেস্তোরাঁয় বসে আস্ত-আস্ত মুরগির ঠ্যাং চিবুতে তোমায় যেন দেখিনি আমি!
উঃ! সংসারটাই মরীচিকা–ভীমনাগের দোকানের দিকে তাকিয়ে শেষবার দৃষ্টিভোজন করে নিলে টেনিদা; নাঃ, বড়লোক না হলে আর সুখ নেই।
বিকেলে চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে সেই কথাই হচ্ছিল। ক্যাবলা গেছে কাকার সঙ্গে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে, হাবুল সেন গেছে দাঁত তুলতে। কাজেই আছি আমরা দুজন। মনের দুঃখে দুঠোঙা তেলেভাজা খেয়ে ফেলেছে টেনিদা। অবশ্য পয়সাটা আমিই দিয়েছি এবং আধখানা আলুর চপ ছাড়া আর কিছুই আমার বরাতে জোটেনি।
আমার পাঞ্জাবির আস্তিনটা টেনে নিয়ে টেনিদা মুখটা মুছে ফেলল। তারপর বললে, বুঝলি প্যালা, বড়লোক না হলে সত্যিই আর চলছে না।
–বেশ তো হয়ে যাও-না বড়লোক– আমি উৎসাহ দিলুম।
হয়ে যাও-না! বড়লোক হওয়াটা একেবারে মুখের কথা কিনা! টাকা দেবে কে, শুনি? তুই দিবি?– টেনিদা ভেংচি কাটল। আমি মাথা নেড়ে জানালুম, না আমি দেব না।
–তবে?
লটারির টিকিট কেনো।– আমি উপদেশ দিলুম।
ধ্যাত্তোর লটারির টিকিট! কিনে কিনে হয়রান হয়ে গেলুম, একটা ফুটো পয়সাও যদি জুটত কোনও বার! লাভের মধ্যে টিকিটের জন্যে বাজারের পয়সা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লুম, বড়দা দুটো অ্যায়সা থাপ্পড় কষিয়ে দিলে। ওতে হবে না বুঝলি? বিজনেস করতে হবে!
–বিজনেস!
–আলবাত বিজনেস। টেনিদার মুখ সংকল্পে কঠোর হয়ে উঠল; ওই যে কী বলে, হিতোপদেশে লেখা আছে না, বাণিজ্যে বসতে ইয়ে মানে লক্ষ্মী! ব্যবসা ছাড়া পথ নেই বুঝেছিস?
–তা তো বুঝেছি। কিন্তু তাতেও তো টাকা চাই।
–এমন বিজনেস করবে যে নিজের একটা পয়সাও খরচ হবে না। সব পরস্মৈপদী– মানে পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে।
-সে আবার কী বিজনেস?–আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলুম।
–হুঁ হুঁ, আন্দাজ কর দেখি?–চোখ কুঁচকে মিটিমিটি হাসতে লাগল টেনিদা; বলতে পারলি না তো? ওসব কি তোর মতো নিরেট মগজের কাজ? এমনি একটা মাথা চাই, বুঝলি?
সগৌরবে টেনিদা নিজের ব্রহ্মতালুতে দুটো টোকা দিলে।
–কেন অযথা ছলনা করছ? বলেই ফেলো না– আমি কাতর হয়ে জানতে চাইলুম।
টেনিদা একবার চারদিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখে নিলে, তারপর আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললে, ফিলিম কোম্পানি!
অ্যাঁ! আমি লাফিয়ে উঠলাম।
–গাধার মতো চ্যাঁচাসনি টেনিদা ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠল; সব প্ল্যান ঠিক করে ফেলেছি। তুই গল্প লিখবি– আমি ডাইরেকট–মানে পরিচালনা করব। দেখবি, চারিদিকে হইহই পড়ে যাবে।
–ফিলিমের কী জানো তুমি? আমি জানতে চাইলুম।
–কে-ইবা জানে?–টেনিদা তাচ্ছিল্যভরা একটা মুখ ভঙ্গি করলে; সবাই সমান সকলের মগজেই গোবর। তিনটে মারামারি, আটটা গান আর গোটা কতক ঘরবাড়ি দেখালেই ফিলিম হয়ে যায়। টালিগঞ্জে গিয়ে আমি শুটিং দেখে এসেছি তো।
কিন্তু তবুও–
ধ্যাৎ, তুই একটা গাড়ল। টেনিদা বিরক্ত হয়ে বললে, সত্যি সত্যিই কি আর ছবি তুলব আমরা! ওসব ঝামেলার মধ্যে কে যাবে!
— তা হলে?
–শেয়ার বিক্রি করব। বেশ কিছু শেয়ার বিক্রি করতে পারলে বুঝলি তো?–টেনিদা চোখ টিপল; দ্বারিক, ভীমনাগ, দেলখোস, কে. সি. দাস
এইবার আমার নোয় জল এসে গেল। চুক চুক করে বললুম- থাক, থাক আর বলতে হবে না।
পরদিন গোটা পাড়াটাই পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেল।
দি ভজহরি ফিলিম কর্পোরেশন
আসিতেছে–আসিতেছে
রোমাঞ্চকর বাণীচিত্র
বিভীষিকা।
পরিচালনা : ভজহরি মুখোপাধ্যায় (টেনিদা)
কাহিনী : প্যালারাম বন্দ্যোপাধ্যায়।
