অন্ধকারের আগন্তুক (উপন্যাস)

এক

বেঙ্গল-আসাম রেলপথের একটা ছোট স্টেশনের ওপর কৃষ্ণপক্ষের রাত ঘুটঘুট করছিল। স্টেশনটা কিন্তু বাংলা দেশে নয়, আসামেও নয়। তোমরা হয়তো জানো, বাংলাদেশের ঠিক প্রতিবেশী, উত্তর বিহারে একটা জেলা আছে-নাম পূর্ণিয়া। অনেকদিন আগে পূর্ণিয়াকে বাংলার মধ্যে ধরা হত–পরে এটাকে বিহারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আজও এ-জেলার একটা অংশের মানুষ পুরোপুরি বাঙালী হাটে বাজারে বন্দরেগঞ্জে অসংখ্য বাঙালীর বসতি।

এই জেলাটার ভিতর দিয়ে বেঙ্গল-আসাম রেলপথের অনেকগুলো শাখা প্রকাণ্ড একটা বটগাছের ডালপালার মতো ছড়িয়ে রয়েছে। তারই কোনও একটা শাখাপথের ওপরে ছোট্ট একটি স্টেশন–ধরা যাক তার নাম মানিকপুর।

রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। স্টেশনমাস্টার গণেশবাবু টেবিলে একটা পা তুলে দিয়ে হাঁ করে নাক ডাকাচ্ছেন আর মাঝে মাঝে চমকে জেগে উঠেই গালে ও কপালে প্রাণপণে থাবড়া মেরে মশা মারবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মাঠের বেপরোয়া মশা চড়চাপড়ে ভয় তো পাচ্ছেই না, চারিদিক থেকে আরও মরিয়া হয়ে ছেকে ধরেছে।

কিন্তু ধৈর্যেরও সীমা আছে মানুষের।

শেষ পর্যন্ত চেয়ার থেকে তোক করে নেমে পড়লেন গণেশবাবু।

খানিকক্ষণ অভদ্র ভাষায় মশাদের বাপ বাপান্ত করলেন, তারপর কোণের কুঁজো থেকে ঢকঢক করে গেলাস তিনেক জল গড়িয়ে খেয়ে একটা বিড়ি ধরালেন।

ঢং। ঘড়িতে সাড়ে বারোটা।

জল খেয়ে গরম লাগছিল। কোটটা খুলে গণেশবাবু বাইরে বেরিয়ে এলেন।

অদ্ভুত গুমোট রাত। আকাশের তারাগুলোকে নিবিয়ে দিয়ে মেঘ এসে জমেছে–যেন অন্ধকারের একটা বিরাট ডাইনী-মূর্তি চারদিকে তার গুচ্ছ গুচ্ছ কালো কালো চুল মেলে দিয়েছে। স্টেশনের পেছনে ফাঁকা মাঠ–তার ভেতর দিয়ে একটা ধুলোভরা মেঠো রাস্তা তারার আলোয় খানকিটা আবছা আভাস দিয়ে মিলিয়ে গেছে। একটু দূরে সেই পথের ওপর ঝাকড়া একটা বটগাছ অন্ধকারকে আরও কালো করে ওত পেতে বসে আছে যেন আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ির মতো। একফোঁটা বাতাস নেই কোথাও–গাছের একটা পাতা অবধি নড়ছে না।

সামনে মিটার গেজের ছোট ছোট তিনটি লাইন। ওপারে একটা অন্ধকার ফাঁকা মালগুদাম–তার পেছনে মাটিটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে বিল আর শ্যাওড়াবনের মধ্যে। ওখানে শেয়াল আছে, বুনো শুয়োর আছে, কখনও কখনও নাকি চিতাবাঘও এসে আস্তানা গাড়ে শীতের সময়। আশেপাশে দু-তিন মাইলের মধ্যে জনমানুষের বসতি নেই–শুধু রেল-কোম্পানির বাবু আর কুলিদের ছোট ছোট তিন-চারটে কোয়ার্টার ছাড়া।

সৃষ্টিছাড়া জায়গা–তার চেয়ে সৃষ্টিছাড়া একটা ইস্টেশন!

অত্যন্ত বিরক্ত মনে গণেশবাবু প্ল্যাটফর্মের উপর পায়চারি করতে লাগলেন। তাঁর ডিউটি রাত তিনটে পর্যন্ত–অথচ এখন মোটে সাড়ে বারোটা। অর্থাৎ আরও অন্তত আড়াই ঘণ্টা এখানে নরক-যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। আর যা মশা-সন্ধে থেকেই কানের কাছে যেন। ক্ল্যারিয়োনেট বাজাচ্ছে।

ভুঁড়িটার ওপর হাত বুলোত বুলোতে গণেশবাবু ভাবতে লাগলেন, এখন ম্যালেরিয়া না ধরলেই বাঁচা যায়! বরাবর কলকাতায় মানুষ কলকাতার ছেলে, সাপ, ব্যাঙ, জোঁক, ম্যালেরিয়ার নামে তাঁর গায়ের রক্ত শুকিয়ে আসবার উপক্রম করে। অথচ সেই গণেশবাবুকেই কিনা শিয়ালদা থেকে একেবারে এই অজগর বিজুবনে বদলি করে দিলে! রাগে-দুঃখে গণেশবাবুর মাথার মধ্যে রক্ত চনচন করতে লাগল।

সব দোষ ওই ব্যাটা ফিরিঙ্গির–ওই গোমেজটার। গোমেজ তো নয়–এক সঙ্গে গো এবং মেষ। তারই লোভের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে গণেশবাবুকে। বন্ধু তো নয়, শনি!

একঝুড়ি ভাল ল্যাংড়া আম যাচ্ছিল কলকাতা থেকে জলপাইগুড়িতে। গোমেজের বুদ্ধিতে পড়ে তারই গোটাকয়েক দুজনে মিলে ভাগাভাগি করে নির্বিবাদে সেবা করেছিলেন, তারপর ইট-পাটকেল দিয়ে ঝুড়ির মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আম যাচ্ছিল জলপাইগুড়ি কলেজের ফিজিক্সের প্রফেসার ভাদুড়ীমশায়ের নামে। তিনি দুদে লোক শ্রাদ্ধ অনেক দূর গড়াল, গেল আদালত পর্যন্ত।

গোমেজ নিরাপদে স্রেফ কেটে গেল, কিন্তু জালে পড়লেন গোবেচারা পেটুক মানুষ গণেশবাবু। ফলে, এক ধাক্কায় গণেশবাবু কলকাতা থেকে এই মাঠ আর জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়লেন। পাপের ভোগ আর কাকে বলে!

আগুন হয়ে গণেশবাবু ভাবতে লাগলেন, গোমেজকে এখন হাতের কাছে পেলে এক চাঁটিতে তিনি তার গলাসুদ্ধ উড়িয়ে দিতেন। উঃ, এখানে মানুষ থাকতে পারে। কোনদিন যে বাঘে মুখে করে নেয় ঠিক নেই। আর তাও যদি না হয়-যা মশার অত্যাচার-তিনদিনেই রক্ত শুষে ছিবড়ে করে দেবে তারা। গণেশবাবুর কান্না পেতে লাগল।

রাত থমথম করছে! কোনওখানে একটু হাওয়া নেই–শুধু যেন চারিদিক থেকে রোদ-পোড়া মাটির গন্ধ উঠছে। আকাশে জমেছে কালো মেঘের রাশ। ঝড় বৃষ্টির লক্ষণ দেখা দিচ্ছে ঈশানের কোণায় কোণায়।

হঠাৎ গণেশবাবুর ভয়ানক ভয় করতে লাগল। কেমন আশ্চর্য লাগছে রাতকে অদ্ভুত লাগছে পৃথিবীকে। মনে হল, এমন রাত্রে সম্ভব-অসম্ভব কত কী যে ঘটতে পারে। হালুম করে অন্ধকার মালগুদামটার ওপাশ থেকে একটা বাঘ এসে লাফিয়ে পড়তে পারে, রেললাইনের ওপর থেকে একটা শঙ্খচূড় সাপ ফণা উঁচু করে তেড়ে আসতে পারে, দূরের ওই বটগাছটা থেকে গোটা কয়েক কালো কালো, মোটা-রোগা, লম্বা-বেঁটে, মাদো কিংবা হেঁড়ে ভূত এসে নাচানাচি শুরু করতে পারে!

কাঁপা গলায় গণেশবাবু ডাকলেন, গিরিধারী। ছোট স্টেশনের একমাত্র পয়েন্টসম্যান গিরিধারী স্টেশনের বারান্দায় একটা লোহার খুঁটিতে ঠেসান দিয়ে ঝিমুচ্ছিল। হাতের পাশেই তার লাল-নীল লণ্ঠনটা রাখা, তা থেকে দুদিকে দুরঙা আলোর রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছে। তার মাথাটা বুকের ওপর ঝুঁকে নেমেছে, গিরিধারী গভীর ঘুমে মগ্ন।

–এই ব্যাটা গিরিধারী—

বিরক্ত গণেশবাবু গিরিধারীকে সজোরে একটা ঠোক্কর লাগালেন। আঁই-আঁই করে গিরিধারী উঠে বসল। বললে, কী হুজুর, কোনও মালগাড়ির কি ঘণ্টি হল?

–না না, কোথায় মালগাড়ি! একা-একা বড় ভয় করছে রে গিরিধারী, আয় একটু গল্প করা যাক।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও গিরিধারী উঠে বসল।

ঢং–আর একটা শব্দ হল ঘড়িতে। রাত একটা।

প্যাসেঞ্জার ট্রেনগুলো সব বেরিয়ে গেছে, শেষরাতের আগে আর ট্রেন নেই। কোয়াটারে গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোনো চলে এখন। কিন্তু যুদ্ধের সময়! যখন-তখন একটা মিলিটারি স্পেশ্যাল কিংবা গুডস-ট্রেন এসে পড়তে পারে।

প্যাসেঞ্জারদের জন্যে রাখা লোহার বেঞ্চে গা এলিয়ে দিয়ে একটা হাই তুললেন গণেশবাবু।

-আচ্ছা, এই মাঠ আর জঙ্গলের মধ্যে কোম্পানি একটা স্টেশন কেন বসালে বলতে পারিস?

লাল-নীল লণ্ঠন থেকে একটা রক্তরঙিন আভা গিরিধারীর মুখের ওপর এসে পড়েছিল, আর সেই আলোয় তার চামড়া কুঁচকে যাওয়া বুড়ো মুখোনাকে কেমন নুতন রকমের লাগছিল দেখতে। গণেশবাবুর প্রশ্নে তার চোখ দুটো হঠাৎ যেন চকচক করে উঠল।

–সে অনেক কথা বাবু। অনেক ব্যাপার।

গণেশবাবু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।

–বল, শোনা যাক। বিতিকিচ্ছি রাতটা খানিক গল্প শুনেই কাটুক।

আকাশটা মেঘে আড়ষ্ট হয়ে আছে। রেললাইনের সরু সরু রেখাগুলো প্ল্যাটফর্মের অল্প-অল্প আলোয় ঝিকিয়ে উঠেছে, যেন অন্ধকারের আড়াল থেকে কোনও অশরীরীর একটা নিষ্ঠুর হাসি ঠিকরে পড়েছে তাই থেকে। দূরের বিল আর শ্যাওড়া বনের ভিতর থেকে কতকগুলো শেয়াল একসঙ্গে ক্যা হুয়া ক্যা হুয়া বলে ডেকে উঠল।

সেদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে গিরিধারী বললে, অনেককাল-সে বহুদিন হয়ে গেল বাবু–এখান থেকে তিনকোশ দূরে নীলকর সায়েবদের একটা ঘাঁটি ছিল। তারা দেশের গরিব চাষাভুষোদের ওপরে যেমন খুশি অত্যাচার করত। জোর করে জমিতে নীল চাষ। দেওয়াত,–যে প্রজা রাজি হত না, চাবুক মেরে তার পিঠের চামড়া তুলে দিত, ঘরবাড়ি আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিত। সাক্ষাৎ শয়তানের অবতার ছিল তারা।

কিন্তু দেশের লোকের রক্তও একদিন গরম হয়ে উঠল বাবুজী। মানুষ কতদিন পড়ে পড়ে খালি মার খাবে? গোরু-ঘোড়াকেও বেশি খোঁচালে তারা গুতো মারতে কিংবা চাঁট ছুঁড়তে চেষ্টা করে, আর এরা তো মানুষ। আশেপাশে দশখানা গাঁয়ের মাথা ছিল বিশাই মণ্ডল, সেই প্রথম বলে বসল, আর আমরা নীলের চাষ করব না। ওতে যা হওয়ার তাই হল, বিশাই। মণ্ডলকে আর পাওয়া গেল না। খবর এল, সায়েবেব লোকেরা নাকি তার ধড়ের থেকে মুণ্ড আলাদা করে মহানন্দা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে।

শুকনো খড়ের মতো মানুষগুলো তাতিয়ে ছিল, তাতে যেন দেশলাইয়ের আগুন ধরল। আরম্ভ হয়ে গেল প্রলয় কাণ্ড। নীলকরদের সঙ্গে প্রজাদের লড়াই লাগল। ওদের বন্দুক, পিস্তল, এদের তীর-ধনুক, ল্যাজা, টাঙি। দেশের মানুষ সব এককাট্টা হয়ে দাঁড়িয়েছে-গুলি খেয়ে মরল, তবু হার মানল না। কদিন পরেই নীলকরেরা তল্পিতল্পা তুলে পালিয়ে বাঁচল।

কিন্তু সেখানেই জের মিটল না। সরকারের ফৌজ এল। দেশের মানুষগুলো তখন লড়ায়ে পল্টন হয়ে গেছে দিনের পর দিন বন-জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে লড়াই করতে লাগল। বিপদ দেখে সরকার এখানে ইস্টিশন বসিয়ে দিলে–যাতে ফৌজ আমদানি করতে অসুবিধে না হয়। তখন ধীরে ধীরে অবস্থা ঠাণ্ডা হয়ে এল, কতক ফৌজের গুলিতে মরে গেল, কতককে ধরে ফাঁসিতে লটকে দিলে।

–আর নীলকুঠি?–গণেশবাবু সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন।

–তারাও সেখানেই শেষ হল বাবুজী–গিরিধারী হাসল। বললে, অনেক মানুষ জান দিলে বটে, কিন্তু সে-শয়তানেরও দফা নিকেশ করে দিয়ে গেল। সায়েরা সেই যে পালাল আর এ-মুখো হয়নি গিরিধারী একটা নিঃশ্বাস ফেললে : সেসব মানুষ আর নেই বাবুজী। এখন যারা আছে তারা ভয়েই কাবু, গায়ে তাকত নেই, বুকে পাটাও নেই।

গণেশবাবু বললেন, সেনীলকুঠির বাড়িটা?

–এখন জঙ্গল হয়ে পড়ে আছে নদীর ধারে। ভয়ানক ভূতের আস্তানা। লোকে সেদিকে এগোয় না।

গণেশবাবু চুপ করে ভাবতে লাগলেন। ভূতের কথা নয়-সেইসব মানুষের কথা-যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্যে একদিন বন্দুক পিস্তলের মুখে অসঙ্কোচে বুক পেতে দিয়েছিল আর সেই অন্যায়কে দূর করে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয়েছিল। সেরকম দরাজ চওড়া বুকওয়ালা মানুষ দুনিয়া থেকে কি লোপাট হয়ে গেল নাকি? তারা কি আর ফিরবে না!

ঘরের মধ্যে টেলিফোনটা ঘটাং করে উঠল। গণেশবাবুর চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল, তিনি ফোন ধরলেন।

হ্যালো, হ্যালো, থ্রি-নাইন্টি-থ্রি? ফাইভ নাইন—

ঘর থেকে বেরিয়ে বললেন, ঘণ্টা দে গিরিধারী, মিলিটারি স্পেশ্যাল আসছে, পাখা নামিয়ে দে।

ঝনঝন করে রেললাইনের পাশে সিগন্যালের তারে টান পড়ল–সিগন্যালের সবুজ চোখ মিলিটারি স্পেশ্যালকে জানাল আসবার সঙ্কেত। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সার্চলাইটের আলোয় বান ডাকিয়ে আর লোহায় লোহায় যেন ঝড় তুলে মিলিটারি স্পেশ্যাল ছুটে বেরিয়ে গেল। ছোট স্টেশন মানিকপুরে তার থামবার কথা নয়, সে থামলও না।

গিরিধারী বললেন, বাবু, আমি একটু মাঠ থেকে আসছি।

–আচ্ছা যা।

গণেশবাবু একা বসে বিড়ি ফুঁকছেন–হঠাৎ বাইরে প্রকাণ্ড দীর্ঘশ্বাসের মতো একটা শব্দ উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গেই এক ঝলক দমকা হাওয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে একরাশ ধুলোবালিকাঁকর এনে যেন গণেশবাবুর চোখেমুখে ছড়িয়ে দিলে। ঝড় এল নাকি? ধড়ফড় করে উঠে বসতেই গণেশবাবু ভয়ে বিস্ময়ে চমকে উঠলেন। আধখোলা দরজার পিতলের হাতলের ওপরে একখানা কালো হাত। সে-হাতের মালিককে দেখা যাচ্ছে না বাইরের অন্ধকারে সে মিশিয়ে আছে অথবা আদৌ তার কোনও অস্তিত্ব আছে কি না সেটাই সন্দেহের বিষয়। অস্বাভাবিক ভয়ঙ্কর সে-হাত। তাতে বাঘের মতো বড় বড় নখ, জানোয়ারের মতো রাশি রাশি লোম। গণেশবাবুর মনে হল যে তিনি ভয়ানক একটা দুঃস্বপ্ন দেখছেন।

সেই হাতটাই যেন রুক্ষ কর্কশ গলায় বললে, সুন্দরপুরের নিতাই সরকারের বাড়ি কোন্ পথে যেতে হয় বলতে পারো?

গণেশবাবু বললেন, তুতু-তুমি কে? হাতটা তেমনি রুঢ় গলায় বললে, তা দিয়ে দরকার নেই তোমার। শুধু আমাকে পথটা বলে দাও, নইলে…

কালো হাতের নখগুলো যেন বাঘের থাবার মতো গণেশবাবুর দিকে এগিয়ে আসতে চাইল।

গণেশবাবুর ধড়ে আর প্রাণ নেই!

–ওই বটগাছের তলা দিয়ে যে রাস্তা, সেই পথ দিয়ে সোজা এগোলেই–

–ধন্যবাদ-এর পুরস্কার তুমি পাবে।

পরক্ষণেই ভীতি-বিহ্বল চোখ মেলে গণেশবাবু দেখলেন, রোমশ কর্কশ কালো হাতখানা দরজার হাতলের ওপর থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে।

.

দুই

সুন্দরপুরের নিতাই সরকার অঘোরে ঘুমুচ্ছিল।

মেঘের জমাট রাত। ঝড়বৃষ্টির একটা কিছু ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু এখনও স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না। শুধু বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে বাইরে নিমগাছে একটি পাতাও নড়ছে না। আর দূরের একটা বটগাছে যেখানে বকের বাসা আছে, সেখানে হঠাৎ ঘুমভাঙা ছানাগুলো থেকে থেকে মানুষের গলায় ককিয়ে কেঁদে উঠছে।

নতুন দোতলা বাড়ি করেছে নিতাই সরকার। তারই দোতলার একটা কোণের ঘরে নিতাই ঘুমুচ্ছে দক্ষিণের জানলাটা খুলে দিয়ে। অসহ্য গরম বলেই জানলা খুলে রাখতে হয়েছে, নইলে যে এতক্ষণে প্রায় সেদ্ধ করে ফেলত। তবে সাধারণত জানলা বন্ধ করে শোওয়াই তার অভ্যাস।

আরও একটা অভ্যাস তার আছে। কিছুদিন আগে বন্দুকের লাইসেন্স নিয়েছে তার মাথার কাছে সব সময় সেটা দাঁড়িয়ে থাকে। থাকে টোটাভরা অবস্থাতেই যাতে হাত বাড়ালেই বন্দুকটাকে সে মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে ধরতে পারে, বিছানায় শুয়েই গুলি ছুঁড়তে পারে শত্রুর ওপর।

অবশ্য পাড়াগাঁয়ে যার অবস্থা একটু ভাল, তার চোর-ডাকাতের ভয় অল্পবিস্তর থাকবেই। তা ছাড়া, দেশেও এখন আকাল চলেছে। নিতাইয়ের মতো দু-চারজনের হাতে পয়সা কড়ি এসেছে বটে, কিন্তু বেশির ভাগই পেট ভরে খেতে পায় না আজকাল। খিদের জ্বালায় চুরিচামারির চেষ্টা তারা তো করেই কখনও কখনও দুটো-একটা ডাকাতি যে হয় না তাও নয়।

তবু নিতাই সরকারের ভয়টা একটু বাড়াবাড়ি ঠেকে বইকি।

বাড়াবাড়ি ছাড়া কী আর?

সরকারি থানা আছে এখানে। নিতাইয়ের বাড়ি থেকে সে-থানা আট-দশ মিনিটের রাস্তাও নয়। বেশ বড় গঞ্জ বহু লোকজনের ঘন বসতি আছে। তা ছাড়া সুন্দরপুর ইউনিয়ন বোর্ডের বেশ মাতব্বর লোক নিতাই সরকার–দারোগা ইয়াসিন মিঞার সঙ্গে তার দহরম-মহরমের খবরটাও সকলেরই জানা। এ হেন নিতাই সরকারের বাড়িতে সহজে মাথা গলাবার সাহসই হবে না চোর-ডাকাতের।

তবু লোকটা সতর্ক হয়ে থাকে অতিরিক্ত মাত্রায়।

কোথায় তার মনের মধ্যেই একটা নিঃশব্দ ভয় ঢুকে বসে আছে কে জানে। সন্ধ্যার পরেও নির্জন রাস্তায় একা হটে না। রাত একটু বেশি হয়ে গেলে কোনও অচেনা মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে না। শোবার আগে প্রত্যেকটা দরজায় সে নিজের হাতে তালা লাগায়–ভারি-ভারি শক্ত তালা।

লোকে কানাঘুষো করে। বলে, অনেক টাকা করেছে লোকটা। জমিয়েছে যকের ধন। সেই টাকার জন্যেই এত সব বাতিক দেখা দিয়েছে তার।

কত টাকা? কেউ বলে দশ হাজার, কেউ বিশ হাজার, কেউ পঞ্চাশ হাজার, কারও কারও মতে আরও ঢের বেশি। মোটের ওপর পাঁচ বছর আগেকার গোলদারি দোকানদার নিতাই সরকারের ভাগ্য যে ফিরেছে তা নিয়ে কারও ভেতর মতভেদ নেই।

লোকে হিংসায় জ্বলে। আর সেই হিংসাটা ভোলবার জন্যেই নানাভাবে সান্ত্বনা দেয় নিজেদের।

–আমার টাকাও নেই, ভাবনাও নেই।

–তা যা বলেছ! টাকা থাকলেই আতঙ্ক। খেয়ে সোয়ান্তি নেই, ঘুমিয়ে নিশ্চিন্তি নেই। তার চেয়ে আমরাই বেশ আছি। চোর-ডাকাত আমাদের ফুটোফাটা ঘটিবাটি কোনওদিন ছুঁতেও আসবে না।

–সে তো ঠিক কথা। একটা জিনিস তবুও কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না। এত টাকা কোথায় পেল নিতাই সরকার?

ঠিক ওই একটি জিজ্ঞাসাই সকলের মনে ঘুরপাক খায়। কোত্থেকে এত টাকা এল লোকটার? একতলা মাটির ঘর তার পাকা দোতলা হয়ে উঠল। দু-সের ডাল, এক-সের চিনি, পোয়াটাক কাঁচা লঙ্কা আর গোটাকয়েক পেঁয়াজ বেচেই কি কেউ এমন করে লক্ষ্মীর অনুগ্রহ পায়? গ্রামের তারুমুদির দোকান তো অনেক বড়, কিন্তু সেও তো আজ পর্যন্ত মাট-কোঠার ওপর টিনের চালা তুলতে পারল না।

দোকান থেকে নিতাইয়ের যে এই অর্থ-সৌভাগ্যটা ঘটেনি–এটা জলের মতো সরল। পাঁচ বছর আগে নিতাই সেই যে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে কলকাতায় চলে গেল, তারপর মাত্র গত বছর সে গ্রামে ফিরেছে। আর ফিরেই গড়ে তুলেছে লোকে তাক লাগানো এই দালান; সেইসঙ্গে এমন একখানা মনোহারীর দোকান দিয়েছে সে সাতখানা গাঁয়ের মানুষকে ডেকে দেখানোর মতো। বিলিতি মো থেকে হ্যারিকেন লণ্ঠন পর্যন্ত সেখানে কিনতে পাওয়া যায়–শহরকে একেবারে টেক্কা দিয়ে চলে গেছে বলা যেতে পারে। তা হলে আসল রহস্য এই গ্রামে নেই, আছে কলকাতায়। এ-তল্লাটের লোক পারতপক্ষে সুদূর কলকাতা কখনও চোখে দেখেনি। দু-একজন যারা কালীঘাটে পুজো দিতে গেছে, তারা গাড়ি-ঘোড়ার উৎপাত দেখে যেতে না যেতেই পালিয়ে এসেছে পৈতৃক প্রাণটি বাঁচিয়ে নিয়ে।

এ হেন ভয়ঙ্কর কলকাতার পথঘাট কি সোনা দিয়ে মোড়া? সেখানে কি টাকা-পয়সা এমন করে ছড়িয়ে রেখেছে যে ইচ্ছে করলেই মুঠোভরা কুড়িয়ে আনা যায়? কে জানে। নিতাই সরকারকে দু-একজন হাবেভাবে কথাটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল। কিন্তু নিতাই একেবারে গাঁক গাঁক করে তেড়ে এসেছে।

–ওসব বাজে কথা আলোচনা করতে এসো না আমার কাছে। নিজেদের কাজকর্ম না থাকে, তারুমুদির দোকানে গিয়ে তামাক টানো গে।

লোকে তাই মনে মনে বিলক্ষণ চটে আছে নিতাইয়ের ওপর। আড়ালে-আবডালে নানারকম সমালোচনা করে।

–ইস্‌-তেজটা দ্যাখো না একবার!

–সেদিনের নেতাই ছোকা ন্যাড়া মাথা, পেটে পিলে! এক পো জিনিস মাপতে আধছটাক ওজনে ফাঁকি দিত–সে একেবারে লাটসায়েব হয়ে উঠেছে।

কান থেকে বিড়ি নামিয়ে সেটা ধরাতে ধরাতে একজন বলে, ও আর কিছু নয় বুঝলে না, গরম! টাকার গরম!

–টাকার গরম! অত গরম কোনও দিন থাকবে নাকি?

–আরে বাপু, তাই কি থাকে নাকি কোনওদিন। অহঙ্কার বেশি বাড়লে তার পতন অনিবার্য–এই স্পষ্ট কথাটা জেনে রাখো। সেইজন্যেই তো শাস্ত্রে বলছে, অতি দর্পে হতা লঙ্কা অতি মানে চ কৌরবাঃ।

কিন্তু যাই বলুক–এখন পর্যন্ত নিতাই সরকারের সর্বনাশ হবার মতো কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, বরং দস্তুরমত বহাল তবিয়তেই সে আছে চারপাশের গ্রাম থেকে খদ্দেরের ভিড় বাড়ছে তার মনোহারী দোকানে। যেখানে থেকে সে যাই করুক, আর অহঙ্কার তার যতই বাড়ুক, তার অবস্থা এখন উঠতির দিকেই; পতন হওয়ার মতো কোনও লক্ষণ এখন। কোথাও তার চোখে পড়ছে না।

নিতাই সরকারের কিন্তু শান্তি নেই। কী একটা প্রচ্ছন্ন ভয় আছে তার, একটা গোপন আশঙ্কা আছে মনের ভেতরে। ঘুমের মধ্যে কখনও যদি দেওয়ালের গায়ে একটা টিকটিকিও টক টক করে ডেকে ওঠে, সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা চলে যায় বন্দুকের ঠাণ্ডা কঠিন নলটার গায়ে। ওই বকের ছানাগুলোর কান্না শুনতে-শুনতে আচ্ছন্ন চেতনার ভেতরে তার মনে হয় যেন কোথায় কার গোঙানি শুনতে পাচ্ছে সে।

সঙ্গে সঙ্গে সে বিছানার ওপর উঠে বসে। কার মৃত্যু-যন্ত্রণার গোঙানি? কোন অশরীরী। ছায়া-মূর্তির কান্না? আচমকা হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে যায় তার সারা গায়ে ফোঁটা-ফোঁটা ঘাম ফুটে বেরোয়।

ভুল ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেই লজ্জা পায়! না! অসম্ভব। মরা মানুষ আর কখনও ফিরতে পারে না। ফেরার কোনও উপায়ই নেই তার। কোথায় কবে ঘুম-জড়ানো চোখে কিসের একটা ছায়া দেখেছিল,তারই অর্থহীন বিভীষিকা তার সব কিছুকে এমনভাবে বিস্বাদ করে রেখেছে।

তবু কি মন মানে?

আজও মাথার কাছে হাতের নাগালের মধ্যে বন্দুকটা রেখে সে শুয়েছিল। ঘুমুচ্ছিল অকাতরে।

দূরের বাঁশবনে শেয়াল ডাকল রাত বারেটা। সঙ্গে সঙ্গে এতক্ষণের দমকা গুমট ভাবটা গেল কেটে, কোত্থেকে একরাশ ধুলোবালির তরঙ্গ তুলে একঝাঁপটা ঝোড়ো হাওয়া এল ঘরের মধ্যে। সাঁ সাঁ করে উঠল স্তব্ধ নিমগাছটা ঝরঝর করে বটগাছটার ডালপালায় দোলা লাগাতেই ছানাগুলো আর্তনাদ তুলল সমস্বরে।

নিতাই সরকারের ঘুম ভাঙল। ভাঙল আকস্মিকভাবে। আর সঙ্গে সঙ্গেই সে দেখতে পেল…

কিন্তু যা দেখল তাতে সে বিছানার মধ্যে পাথর হয়ে পড়ে রইল। হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারল না বন্দুকটা–দুটো হাতই যেন তার পক্ষাঘাতে অসাড় হয়ে গেছে।

ঘরের মধ্যে একটা মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে। হ্যাঁ–তারই ঘরে। তার চারটে দরজায় শক্ত লোহার তালা সত্ত্বেও দোতলার এই বন্ধ ঘরে সে এসেছে। তার সর্বাঙ্গ একটা কালো আলখাল্লা দিয়ে মোড়ালণ্ঠনের ক্ষীণ শিখাতে দেখা গেল, আলখাল্লার ফাঁকে তার দুটো চোখ যেন দু-টুকরো জ্বলন্ত কয়লার মতো দপদপ করে জ্বলছে।

মানুষ, না প্রেতাত্মা? চোর, না খুনি?

নিতাই চিৎকার করে উঠতে চাইল, পারল না। গলা থেকে তার সমস্ত স্বর কে যেন

একটা ব্লটিং কাগজ দিয়ে শুষে নিয়েছে। শুধু নির্বাক অসহায় চোখে সমস্ত ব্যাপারটা সে দেখতে লাগল। কিছুই করবার উপায় নেই তার করবার মত শক্তিও নেই কোথাও। সে এখন এই অদ্ভুত আগন্তুকের হাতে সম্পূর্ণ অসহায় শিকার।

মূর্তিটা হঠাৎ একখানা হাত থাবার মতো করে তুলে ধরল। লণ্ঠনের আবছা আলোতেই নিতাই দেখতে পেল–সে হাত মানুষের নয়। তীক্ষ্ণধার তার নখ, রোমশ, কর্কশ তার রূপ, আর–আর সে-হাত টকটকে তাজা রক্তে-মাখানো।

সেই হাতখানা বাড়িয়ে মূর্তিটা তার দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল।

নিতাই আবার চিৎকার করতে চেষ্টা করল–মনে হল মাত্র তিন হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। তার মৃত্যু। কিন্তু এবারও সে কোনও স্পষ্ট আওয়াজ করতে পারল না, কেবল গলার মধ্যে তার ঘড়ঘড় করে উঠল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। আর খোলা জানলা দিয়ে ক্রমাগত ঘরে এসে ঢুকতে লাগল গোঁ-গোঁ করা ঝোড়ো হাওয়ার এক-একটা উদ্দাম ঝাঁপট।

মূর্তিটা কাছে এলএল একেবারে বিছানার কাছে। তারপর রক্তমাখা সেই হাতখানা নিতাইয়ের বুকের ওপর চেপে ধরল। সে-হাতের ছোঁয়ায় তার গায়ের রক্ত জমাট বেঁধে গেল বরফের মতো।

ফিসফিস করে লোকটা বললে, আমায় চিনতে পারো?

নিতাই জবাব দিলে না। জিভটা তার টাকরার সঙ্গে আঠার মতো লেপটে গেছে।

–আমি শ্ৰীমন্ত রায়।–তেমনি ফিসফিস করে বললে লোকটা, তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিংস্র একটা হাসির রেশও যেন বেজে উঠল।

বিদ্যুতের চমক খাওয়ার মতো করে নিতাইয়ের পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে গেল।

–আমায় এখানে তুমি আশা করোনি–না?

নিতাইয়ের ঠোঁট দুটো একবার নড়ে উঠল। কিছু বলতে চেষ্টা করল।

–কিন্তু আশা না করলেও অযাচিতভাবেই দেখা দিতে এসেছি। এতদিনের এমন নিবিড় বন্ধুত্ব–মায়া কাটানো কি এতই সহজ? উৎসবে, ব্যসনে, শ্মশানেসব জায়গাতেই বন্ধুর কাছাকাছিই থাকা উচিত–কী বলো?

কে বলবে? বলবার মতো অবস্থা নিতাই তখন হারিয়েছে। তার সমস্ত চেতনা যেন লুপ্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম।

–ভেবেছিলে, পালাবে? পালিয়ে বাঁচবে তিনশো মাইল দূরের এই পাড়াগাঁয়ে? কিন্তু অত সহজেই কি আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায়? আমার জন্যে যা তুমি করেছ, সে-ঋণ শোধ করবার জন্যে দরকার হলে তোমাকে খুঁজতে আমি নরকে পর্যন্ত যেতে রাজি ছিলাম, বন্ধু। এই সুন্দরপুর আর কতটুকুই বা রাস্তা সে তুলনায়?

নিতাইয়ের একটা হাত নড়তে লাগল। বন্দুকটা ধরবার অন্তিম চেষ্টা করল যেন। কিন্তু আলখাল্লার ফাঁকে দুটো চোখের জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সে ক্রমেই সম্মোহিত হয়ে যাচ্ছে। শরীরের একটি স্নায়ুপেশীও তার বশে নেই।

শ্ৰীমন্ত রায় বললে, শোনো। আমার পাওনাগণ্ডা এই মুহূর্তে মিটিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু তা আমি করব না। অপ্রস্তুত অবস্থায় শোধ নেওয়াটা তোমাদের মতো কাপুরুষের ধর্ম হতে পারে, কিন্তু তা আমার নয়। তিন দিন সময় আমি তোমাকে দিলাম। অনুতাপের যা-কিছু সুযোগ এর মধ্যেই তুমি পাবে। তারপর আমি আবার আসব। সেদিন, জেনে রেখো, আমার হাত থেকে কিছুতেই তোমার পরিত্রাণ নেই।

বাইরে আবার হাওয়া গোঁ-গোঁ করে উঠল। গোঙিয়ে উঠল বকের ছানারা। সেই মুহূর্তেই হঠাৎ জানলার কাছে সরে এল শ্ৰীমন্ত রায়। অসাড় চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিতাই দেখতে পেল, খোলা জানলা দিয়ে বিদ্বেগে শ্ৰীমন্ত হারিয়ে গেল অন্ধকারে, শুধু অনেক নীচে ধুপ করে শব্দ হল।

কড় কড় করে বাজ ডেকে গেল আকাশে। চোখ ধাঁধিয়ে গেল একরাশ অতি তীব্র বিদ্যুতের আলোয়। সেই আলোয় নিতাই দেখলে, অমানুষিক শক্তির সাহায্যে লোহার শক্ত গরাদ দুধারে বাঁকিয়ে দিয়ে তার ভেতর দিয়ে কেউ ঘরে ঢোকবার পথ করে নিয়েছে।

প্রায় দশ মিনিট পরে বাঁশপাতার মতো কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসল নিতাই। হাত বাড়িয়ে চড়িয়ে দিল লণ্ঠনের আলো।

.

তিন

সকালে স্টেশনে কাজ ছিল না। নাইট-ডিউটির পরে বেলা বারোটা পর্যন্ত কোয়ার্টারে টানা ঘুম লাগালেন গণেশবাবু। কিন্তু নিশ্চিন্ত নিদ্রা নয়–থেকে থেকে কেমন একটা দুঃস্বপ্নে যেন তিনি আঁতকে উঠছিলেন। অন্ধকার অমাবস্যার রাত–প্ল্যাটফর্মে মিটমিটে আলোয় দরজার হাতলের ওপরে একখানা হাত এসে জেঁকে বসেছে বাঘের থাবার মতো। রোমশকর্কশ–ভয়ঙ্কর।

একখানা কালো হাত। পৃথিবীর যত হিংসা আর বিভীষিকা যেন সেই হাতে। যেন সামনে যাকে পাবে, তারই গলা টিপে ধরবে।

বেলা বারোটার সময়ে এই অস্বস্তিকর ঘুম থেকে গণেশবাবু উঠে বসলেন। হাত-মুখ ধুয়ে পুরো দুপেয়ালা চা আর চারটে ডিম খেয়ে প্রাতরাশ করলেন। মোটা মানুষ, বেশ খেতে পারেন–খেতে ভালোও বাসেন। আর লোভের জন্যেই না তাঁর এই দুর্গতি। দিব্যি ছিলেন শিয়ালদা স্টেশনে, কী কুক্ষণেই যে হতভাগা গোমেজের পাল্লায় পড়ে প্রফেসার ভাদুড়ীমশায়ের ল্যাংড়া আমেই তাঁর নজর গেল–

কিন্তু রাত্রে তিনি ও কী দেখলেন। স্বপ্ন, না সত্যি? গণেশবাবু ব্যাপারটা এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা তো তাঁর অভ্যেস নয়। গাঁজা তিনি খান না–কোনও ভদ্রলোকেই খায় না। অল্প বয়সে দেশের বাড়িতে বিজয়া দশমীর দিন একবার সিদ্ধি খেয়েছিলেন। সিদ্ধির লোভে নয়–এক-এক গ্লাস সিদ্ধির সঙ্গে দুটো করে নাটোরের রসগোল্লা বরাদ্দ ছিল। তারই আকর্ষণে গাস-তিনেক সিদ্ধি টেনে যে-দুর্গতি তাঁর হয়েছিল সেকথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। দুদিন বেহুশ হয়ে পড়ে ছিলেন, আর স্বপ্ন দেখেছিলেন–একটা পাটকিলে রঙের মস্ত রামছাগল শিং নেড়ে তীর হুঁড়িতে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। দুদিন ধরে এমনি ভয়ঙ্করভাবে তিনি হেসেছিলেন যে তারপরে এক হপ্তা তিনি ভাত পর্যন্ত খেতে পারেননি–এত ব্যথা হয়েছিল চোয়ালে।

কাল রাত্রে তিনি তো সিদ্ধি খাননি। তবে কী ব্যাপার। গণেশবাবু বারকয়েক মাথা ঝাঁকড়ালেন। নাঃ–স্বপ্নই বটে। এমন ব্যাপার কখনও সত্যি হতে পারে। সত্যি হওয়া অসম্ভব। মিছিমিছি ও নিয়ে তিনি আর মাথা ঘামাবেন না। দেওয়াল-ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বেজেছে। পৌনে একটায় দুখানা গাড়ির ক্রসিং হয় মানিকপুরে। একবার স্টেশনে যাওয়া দরকার।

কোম্পানির নাম-লেখা চাঁদির-বোতাম-আঁটা শাদা জিনের কোটটা গায়ে চড়ালেন গণেশবাবু। তারপর চটিটা পায়ে দিয়ে গজেন্দ্রগমনে এগিয়ে চললেন স্টেশনের দিকে। স্টেশনের পাশেই সিগন্যাল নেমে পড়েছে–ট্রেনের আর দেরি নেই।

স্টেশনের পেছন দিয়েই একটা মেটে পথ। তার দুধারে উঁচু-উঁচু টিলা ডানদিকে একটি ঝুরি-নামা বটগাছ ছায়ার অন্ধকার করে চিত্রগুপ্তের মতো দাঁড়িয়ে। কোন্ আদ্যিকালের গাছ–তার বয়েসের যেন ঠিক-ঠিকানা নেই। সেই গাছের নীচে সিঁদুর-লেপা একটা থান। হাত-পা-ভাঙা কালো কষ্টিপাথরের একটা মুর্তি। কার্তিকী অমাবস্যায় দূর দূর গ্রাম থেকে লোক এসে রঙ্কিণী কালীকে পুজো করে যায়।

গাছটার দিকে তাকিয়েই আজ যেন গা ছমছম করে উঠল। ওর তলা দিয়েই মেটে রাস্তাটা চলে গেছে সুন্দরপুর পর্যন্ত। আশেপাশে আর জনমানুষের বসতি নেই। ওই পথ। দিয়েই কালো হাতখানা গেছে। কোথায়? সুন্দরপুরের নিতাই সরকারের বাড়িতে।

গণেশবাবুর মাথাটা আবার ঝিমঝিম করতে লাগল। স্টেশনের ওপাশে মালগুদাম, তার নীচে দিয়ে বন জঙ্গল ঢালু হয়ে নেমে গেছে কাদায় আর গোখরো সাপে ভরা এলোমেলো বিল আর বুনো ঘাসের একটা উচ্চুঙ্খল জগৎ। মাঝে মাঝে পেত্নীর মতো তেঠেঙে চেহারার শ্যাওড়া গাছের সারি। ওখানে–ওই জলার জঙ্গলে কী যে নেই, এক ভগবানই বোধকরি সে কথা বলতে পারেন; শেয়াল আছে, বুনো শুয়োর আছে, শোনা যায় বাঘও আছে। আর হয়তো দলে দলে মামদো আছে, স্কন্ধকাটা আছে যারা খুশিমতো এক-একখানা কালো হাত বাড়িয়ে–

গণেশবাবু আর ভাবতে পারলেন না।

বাঁকের মুখে আচমকা একটা তীক্ষ্ণ রেলের বাঁশি। গণেশবাবু হঠাৎ চমকে উঠলেন। ঝরাং ঝরাং ঝিপ ঝিপ শব্দ করতে করতে একখানা গাড়ি এসে স্টেশনে ভিড়ল। ওদিকে আর-একটা হুইসেল। আর একখানা ট্রেনও এসে পড়ল বলে।

গণেশবাবু জোর পা চালিয়ে দিলেন।

.

স্টেশনে ঢুকতেই গিরিধারীর সঙ্গে দেখা।

–মাস্টারবাবু, দুজন লোক আপনাকে খুঁজছে।

–আমাকে? গণেশবাবু ভু কঁচকোলেন।–কারা রে?

–তা তো জানি না। দুজন ভদ্রলোক।

–ভদ্রলোক! সেকি! কোথায়?

–ওয়েটিং রুমে বসে আছে। ডাউন গাড়ি থেকে নেমেছে।

গণেশবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন। মনটা চিন্তায় ভরে উঠেছে মূহুর্তে। এই অজগর জঙ্গলে কারা তাঁকে খুঁজতে এল? এমন আত্মীয়ই বা তাঁর কে আছে? কলকাতা থেকে আত্মীয়স্বজন যদি কেউ খুঁজতে এসে থাকে তারাই বা চিঠিপত্র না দিয়ে এমন করে চলে আসবে কেন? আর যদি বা এসেও থাকে তা হলে সোজা তাঁর কোয়ার্টারেই তো চলে যেতে পারে–এখানে বসে থাকবে কোন্ দুঃখে?

সাত-পাঁচ ভেবে গণেশবাবু ওয়েটিং রুমে ঢুকলেন।

নামেই ওয়েটিং রুম। একটা পুরনো ওভ্যাল-শেপ কাঠের টেবিল, তার ওপরে আধ ইঞ্চি ধুলো জমে আছে। একটা ডেক-চেয়ার আছে বছর ত্রিশেক আগেকার, তার বেতের ছাউনি বারো আনার মত খসে পড়ে গেছে। আর একটা বেঞ্চি আছে একপাশেদরকার হলে সেখানে পড়ে পড়ে গিরিধারী নাক ডাকায়।

দুটি যুবক সেখানে বসে সিগারেট টানছিল। গণেশবাবু ঘরে ঢুকতেই তারা উঠে দাঁড়াল, তারপর নমস্কার করলে। গণেশবাবুও প্রতি-নমস্কার জানালেন।

একজন সাহেবি পোশাক পরা, চোখে সোনার চশমা। বেশ প্রিয়দর্শন চেহারা চোখে তীক্ষ্ণধার বুদ্ধির আলো। সেই ই আলাপ আরম্ভ করলে।

–আপনি গণেশবাবু?

গণেশবাবু সবিনয়ে বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ।

–এখানকার স্টেশনের ইনচার্জ বুঝি?

–আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনারা?

–বলছি।–সাহেবি পোশাক পরা যুবকটি বললে, বসুন না। সিগারেট নিন। আপনার সঙ্গে একটু জরুরি ব্যাপার আছে।

জরুরি ব্যাপার! গণেশবাবুর বুকটা ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। এরা কারা? এইরকম একটা জংলি স্টেশনে দুটি বিশিষ্ট লোকের হঠাৎ আসবার হেতুই বা কী? কেমন যেন সন্দেহে গণেশবাবুর মাথাটা ঘুরতে লাগল।

গণেশবাবু বেঞ্চিটার ওপরে বসলেন। দ্বিধাভরে একটা সিগারেট নিয়ে ধরালেন। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা আসছেন কোত্থেকে?

এবার জবাব দিলে দ্বিতীয় যুবকটি। এ সাহেবি পোশাক পরা নয়, কিন্তু এরও বেশবাসে যথেষ্ট পারিপাট্য আছে। তা ছাড়া এ-লোকটির একটা একটা বিশেষত্বও এতক্ষণে গণেশের চোখে পড়ল। মস্ত জোয়ান। পাতলা সিল্কের পাঞ্জাবির নীচে তার শরীরের লোহার মত মাগুলো ফুলে ফুলে উঠেছে। মাথার চুলগুলো কড়া, তামাটে। গাল দুটো ভাঙা, চোয়ালের হাড় খগের মতো খাড়া হয়ে আছে। মুখের হাঁকড়াটা যেন একটু বেশি বড় সব মিলিয়ে যেন একটা ভয়ানক চেহারার বুলডগের আদল আসে। প্রথম লোকটির চাইতে এর বয়সও একটু বেশি মনে হল।

গম্ভীর গমগমে গলায় সে বললে, কলকাতা।

–কলকাতা? তা এখানে কী কাজে? কোথায় যাবেন?

–দাঁড়ান, ব্যস্ত হবেন না-দ্বিতীয় লোকটি সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বেশ রহস্যমণ্ডিত হাসি হাসল; কাছাকাছি কোথাও ডাকবাংলা আছে বলতে পারেন?

–আছে, সুন্দরপুরে। মাইল পাঁচেক দূরে হবে।

–সুন্দরপুর! নতুন লোক দুটি যেন একসঙ্গে চমকে উঠল। সাহেবি পোশাক পরা যুবকটি সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে খানিকক্ষণ অন্যমনস্কর মতো তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে। বললে, না, সেখানে চলবে না। এই ওয়েটিং রুমেই আমরা দিনকয়েক কাটাতে চাই। কী বলেন গণেশবাবু?

গণেশবাবু বিব্রত হয়ে বললেন, তা কেমন করে হবে? রেল কোম্পানির আইন আছে তো একটা। থাকতে দেবে কেন?

দ্বিতীয় লোকটি সশব্দে হেসে উঠল। বাইরে ট্রেন দুটো অনেকক্ষণ আগেই স্টেশন ছাড়িয়ে চলে গেছে, দুপুরের রোদে ঝাঁ ঝাঁ করছে নির্জনতা। তার হাসির শব্দে চারিদিকে স্তব্ধতা যেন দুলে উঠল।

–আইন আপনাকে কিছু বলবে না। আমরাও আইনের তাগিদেই এসেছি।

পুলিশের লোক আমরা ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ।

গণেশবাবু সভয়ে উঠে দাঁড়ালেন। –অ্যাঁ–তাই নাকি। মাপ করবেন, বুঝতে পারিনি। কিছু মনে করবেন না, স্যার।

প্রথম যুকটি বললে, না না, মনে করব কেন। আপনাকে আমাদের চাই, একটা অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপারে আপনি আমাদের হেলপ করবেন। একটা সাসপেক্টেড খুন, প্রচুর টাকা চুরি এবং তার সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক গণ্ডগোল–সব মিলিয়ে জিনিসটা পুলিশ বিভাগে মস্ত একটা গোলকধাঁধা হয়ে আছে। আপনি আমাদের সাহায্য করবেন নিশ্চয়ই?

গণেশবাবুর ঘাম ছুটতে লাগল। সাসপেক্টেড খুন, প্রচুর টাকা চুরি এবং রাজনৈতিক গণ্ডগোল। ভয়ে তাঁর তোতলামি বেরিয়ে গেল : আ–আ–আমি ক্‌-ক্‌-কী সাহায্য করব?

–সে আমরা দেখব। ভাবনার কোনও কারণ নেই আপনার। যদি কাজটা করে ফেলতে পারি, আপনিও পুরস্কারের অংশ পাবেন।

পুরস্কারের অংশ! সঙ্গে সঙ্গে গণেশবাবু শিউরে উঠলেন। পুরস্কার। কালো হাতও তাঁকে বলে গেছে পুরস্কার দেবে। কিন্তু পুরস্কারের নমুনা যা দেখা যাচ্ছে, এখন ব্ৰহ্মতালু ফুড়ে প্রাণটা বেরিয়ে না গেলেই তিনি বাঁচেন। উঃ গোমেজ…হতভাগা গোমেজ! তার জন্যেই না তাঁকে আজ এই দুর্বিপাক ভোগ করতে হচ্ছে।

গণেশবাবু দাঁড়িয়ে রইলেন। সাহেবি পোশাক পরা যুবকটি বললে, আমাদের পরিচয়টাও আপনার জানা দরকার। আমি এ-লাইনে ইন্সপেক্টর, অনাদি ঘোষাল আমার নাম। আর ইনি বিরিঞ্চি চক্রবর্তী, আমার সহকর্মী।

গণেশবাবু এতক্ষণে যেন কথা খুঁজে পেলেন।

–তা হলে আপনাদের খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্তটা

–কিচ্ছু ব্যস্ত হবেন না, আমাদের সঙ্গে চাল-ডাল, আলু আর কুকার আছে, ওতেই চলে যাবে। আপনি একটু জলের বন্দোবস্ত

–না, না–সে কি হয়।–হনহন করে গণেশবাবু চলে গেলেন। ভয়, অস্বস্তি আর অশান্তিতে তাঁর সমস্ত মনটা কলাপাতার মতো কাঁপছে।

গণেশবাবু বেরিয়ে যেতে অনাদি আর বিরিঞ্চি ঘন হয়ে বসল।

অনাদি বলল, কেমন দেখলে হে ভদ্রলোককে?

বিরিঞ্চি চট করে উঠে গেল। একবার মুখ বাড়িয়ে দেখে নিলে কেউ আছে কি না। তারপর দরজাটা বন্ধ করে ফিরে এল অনাদির কাছে।

–গণেশবাবুর কথা বলছিলে তো? লোকটা একেবারে গবেট!

–কাজ হবে?

–হুঁ অনায়াসে। মাথায় কাঁটাল তো দুরের কথা, নারকেল আছড়ে ভাঙলেও টু করবে।

–এক ঢিলে দুপাখি মারতে হবে। শেয়ারে অন্তত পাঁচ হাজার করে আমাদের পাওয়া উচিত, কী বলে?

–নিশ্চয়, আর মেল ট্রেন থেকে যা পাওয়া যায় সেটা উপরি।

অনাদি আর-একটা সিগারেট ধরাল। চিন্তিত মুখে বললে, কিন্তু বড্ড দুঃসাহসিক হচ্ছে। শেষরক্ষা করতে পারলে হয়। তা ছাড়া, আমার মনে হয় শ্রীমন্ত রায় বেঁচে আছে।

–অসম্ভব। আমার সামনেই সে ছোরা খেয়ে গিয়েছিল মাটিতে–রক্তে ভেসে গিয়েছিল সব। আর বেঁচেই যদি থাকে–তাতেই বা ক্ষতি কী। পঞ্চাশ রাউন্ড করে রিভলবারে গুলি আছে আমাদের, ভুলো না—হাঃ—হাঃ–হাঃ। বিরিঞ্চি রাক্ষসের মতো হেসে উঠল।

–হাঃ—হাঃ—হাঃ—

পরক্ষণেই বাইরে থেকে তেমনি একটা হাসির প্রতিধ্বনি।

অনাদি আর বিরিঞ্চি একসঙ্গেই লাফিয়ে উঠল দুজনে। মুহূর্তের মধ্যে পকেট থেকে একটা রিভলবার বার করলে বিরিঞ্চি। দুজনের মুখ থেকেই সমস্বরে বেরোল : কে হাসল অমন করে?

সবেগে দুজনে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ছাইয়ের মতো বিবর্ণ হয়ে গেছে তাদের চেহারা।

নির্জন স্টেশন। দুপুরের রোদে তার কাঁকর আর লাইনের ইস্পাত জ্বলছে। ওপাশে ঢালু জমিতে যতদূর চোখ যায় বিল আর জঙ্গল। স্টেশনমাস্টারের ঘরে লোক নেই, শুধু একটা রেলের কুলি প্ল্যাটফর্ম ঝাঁট দিচ্ছে মন দিয়ে। বুড়ো মানুষ, মাথার চুলগুলো শাদা। এত নির্বিকার, যে…

বিরিঞ্চি বাঘের মতো গলায় ডাকল, এই কুলি।

কুলিটা দাঁড়িয়ে উঠে একটা সেলাম ঠুকল। বললে, ক্যা হুকুম হুজুর।

–কে এখানে হাসল?

–কোই নেই হুজুর।

–কোই নেই?

–না হুজুর।

–হাসি শোনোনি? নেহি হুজুর। আপনোককা ভুল হুয়া হোগা।

–ভুল হুয়া হোগা। দুজনেই সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল কুলিটার দিকে। ভুল হবে? দুজনেরই একসঙ্গে? কেমন করে সম্ভব। তবে কি প্রতিধ্বনি? কিন্তু–

–তোমার নাম কী?

–গিরিধারী হুজুর। আজ দশ বছরের বেশি হল এই টিশনে আছি।

–আচ্ছা যাও।

–সেলাম হুজুর!-ঝাঁটাটা তুলে নিয়ে গিরিধারী চলে গেল।

ওয়েটিং রুমের বাইরে অনাদি আর বিরিঞ্চি এ-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পাথরের গড়া মূর্তির মতো ভাষা জোগাচ্ছে না।

.

চার

মিনিট পাঁচেক প্ল্যাটফর্মে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনাদি আর বিরিঞ্চি। দুজনেই কি একসঙ্গে ভুল শুনল? তাও কি সম্ভব? সিল্কের পাঞ্জাবির নীচে হুলো বেড়ালের মতো বিরিঞ্চির মাংসল পেশল শরীরটা ফুলে ফুলে উঠছে। হাতের মুঠোর মধ্যে রিভলবারটা কেমন একটা শব্দ করল–যেন দাঁত কড়কড় করছে। যাকে সামনে পাবে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে তাকে।

অনাদির মুখটা যেন পাঙাশ হয়ে গেছে। হাঁটু দুটো কাঁপছে ঠকঠক করে। ফিসফিস করে অনাদি বললে, ও কে হাসল? শ্ৰীমন্ত রায়?

কিন্তু বিরিঞ্চি নিজেকে সামলে নিলে। হঠাৎ অনাদির কাঁধে মস্ত বড় থাবড়া দিলে একটা।

–খেপেছ তুমি? যে-লোক আমার সামনে মরে গেছে সে এখানে আসবে কেমন করে?

–কিন্তু সত্যিই মরেছে তো?

বিরিঞ্চি যেন ধমক দিয়ে উঠল, ওসব কী কুসংস্কার তোমার? মরেনি তো মরেনি। তাই বলে সে এখানে এসে জুটবে কেমন করে?

–তা হলে ও-হাসি কার?

–কোনও পাগল-টাগলের হবে বোধহয়।

–বোধহয়।

মনের দিক থেকে এ-ছাড়া সান্ত্বনা পাওয়ার কিছু ছিল না।

মেঘের মত মুখ নিয়ে দুজনে ওয়েটিং রুমে ঢুকল। বিরিঞ্চির সমস্ত কপাল চিন্তায় রেখায়িত হয়ে উঠেছে–অনাদির চেহারায় এখনও স্বাভাবিকতা ফুটে ওঠেনি। ঘরে ঢুকে অনাদি ডেক-চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে ক্লান্তের মতো শুয়ে পড়ল আর বিরিঞ্চি একটা টেবিলের ওপরে পিঠ খাড়া করে বসে কী যেন চিন্তা করতে লাগল।

বাইরে রোদ ঝাঁ-ঝাঁ করছে। রেললাইনের পাশে টেলিগ্রাফের তারে একটা শঙ্খচিল চ্যাঁ-চ্যাঁ করে উঠল–ভারি অলুক্ষণে ডাক। রঙ্কিণী কালীর থানের ওপরে ঝাঁকড়া বটগাছটা অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে বাতাসে তার পাতাগুলো ঝরঝর করছিল।

নিরুত্তরে দুজনে দুটো সিগারেট ধরাল। হাসির কথাটা মন থেকে মুছে ফেলবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।

অনাদি বললে, আমার ভাই ভালো লাগছে না একটুও।

বিরিঞ্চি সুকুঞ্চিত করলে : কেন?

–মনে হচ্ছে সুবিধে হবে না। বিপদে পড়ব।

–বিপদ?–বিরিঞ্চি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল : দুটো রিভলবার আর দুশো কার্তুজ আছে সঙ্গে। এই মেডোর দেশে এসেও যদি কাজ গুছিয়ে নিতে না পারি, তাহলে মানুষ হয়ে জমেছি কেন বলতে পারো?

–হুঁ।–অনাদি গম্ভীর হয়ে রইল।

নির্জন স্টেশনের ওপরে দুপুরের রোদ জ্বলছে। চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে লাইন পেরিয়ে একটা ঢালু জমি প্রসারিত হয়ে গেছে দিগন্ত পর্যন্ত। তার ওপর জঙ্গল আর জঙ্গল। কালো কালো ডানা আকাশে মেলে দিয়ে উড়ে চলেছে শামকল পাখির ঝাঁক।

হাতের রিভলবারটা নিয়ে বিরিঞ্চি খেলা করতে লাগল। একবার তাকাল বাইরের দিকে। বললে, হাতে দুটো কাজ এখন। নিতাই সরকারের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা আদায় করতে হবে। দু নম্বর–মেল ট্রেন।

অনাদি বললে, তিন নম্বর কাজেরও দেখা পাবে। মনে করো যদি শ্ৰীমন্ত রায় এসে সামনে দাঁড়ায়–বলে–

–হ্যাং; ইয়োর শ্ৰীমন্ত রায়। বাঘের মতো গর্জন করে বিরিঞ্চি মাটিতে দাঁড়িয়ে পড়ল। বললে, আসে আসুক–এই রিভলবারের মুখে–

কিন্তু এবারেও বিরিঞ্চির কথা শেষ হল না।

সমস্ত স্টেশনটা কাঁপিয়ে হঠাৎ একটা প্রচণ্ড অট্টহাসির ঝড় উঠল। হোঃ–হোঃ–হোঃ। অমানুষিক, নৃশংস আর ভয়ঙ্কর হাসি। সে-হাসিতে এই দিন-দুপুরেও দুজনের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল সজারুকাঁটার মতো।

চকিত হয়ে দুজনে পেছন ফিরে তাকাল। যা দেখল তা বিশ্বাস করবার মতো নয়। ওয়েটিং রুমের কাঁচের জানলার পাল্লার ওপর থেকে নক্ষত্র-গতিতে একখানা হাত সরে গেল। সে-হাত সাধারণ মানুষের হাতের প্রায় দ্বিগুণ। তার রং কালির মতো কালো, রোমশ, কর্কশ আর ভয়ঙ্কর।

বিস্ফারিত চোখ মেলে দুজনে তাকিয়ে রইল সেদিকে।

পরক্ষণেই আর-একটা। আতঙ্কের উপর আতঙ্ক।

খোলা জানলা দিয়ে প্রকাণ্ড একটা শাদা গোলার মতো কী ছিটকে এল ওদের দিকে ক্র্যাশ করে আছড়ে পড়ল মেঝেতে, তারপর ঘরময় গড়িয়ে গেল ফুটবলের মতো।

একটা নরমুণ্ড। তার বিকট দাঁতগুলো ছরকুটে আছে–যেন কামড়াতে চায়। আর তার সঙ্গে আঁটা একটা শাদা কাগজ–তার ওপরে প্রকাণ্ড একখানা হাতের ছাপ রক্তমাখা হাতের ছাপ।

মাত্র কয়েক মুহূর্ত। তারপরেই জানালার দিকে পাগলের মতো ছুটে গেল বিরিঞ্চি। বাইরে হাত বাড়িয়ে ট্রিগার টিপল রিভলবারের।

গুড়ম–গুড়ম—

সমস্ত স্টেশনটা থরথর করে উঠল। আর দূরে প্ল্যাটফর্মের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে খৈনি টিপতে লাগল গিরিধারী।

.

পাঁচ মিনিটের মধ্যে সমস্ত লোক জমা হয়ে গেল ওয়েটিং রুমে। অনাদি মূৰ্ছিতের মতো বসে পড়েছে ডেক-চেয়ারে, তার মাথাটা যেন কুমোরের চাকার মতো বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে। কিন্তু বিরিঞ্চি অত সহজে বিচলিত হয়নি। শুধু মুহূর্তের জন্যে তারও শরীরটা কেমন করে উঠেছিল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়েছে। বোঝা যাচ্ছে শত্রু আছে কাছাকাছি। কিন্তু সে-জন্যে পিছিয়ে গেলে চলবে না, দুশো রাউন্ড কার্তুজ তারা এনেছে রিভলবারে ব্যবহার করার জন্যে।

ওয়েটিং রুমে লোক জড়ো হওয়ার আগেই সে মড়ার মাথাটা থেকে কাগজখানা খুলে নিলে নিঃশব্দে সেটাকে পুরলে নিজের পকেটে। তারপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

হইহই করতে করতে ছুটে এলেন গণেশবাবু, স্টেশনের ছোঁকরা বুকিং ক্লার্ক রহমান আর পানিপাঁড়ে রাম সিং। গণেশবাবুর অবস্থা দেখলে দুঃখ হয়। স্নানের উদ্যোগ করছিলেন ভদ্রলোক, হাতে গাড়, কানে পৈতে, পরনে গামছা। সেই অবস্থাতে ছুটে এসেছেন তিনি। মোটা মানুষ, এমনিতেই হার্ট দুর্বল! এই দিন-দুপুরে রিভলবারের দু-দুটো আকাশফাটানো শব্দে তাঁর বুকের মধ্যে যে কেমন করছে সে তিনিই জানেন।

–কী হয়েছে? ব্যাপার কী?

সমস্বরে সকলের প্রশ্ন।

অনাদি কোনও কথা বলতে পারল না, জবাব দিলে বিরিঞ্চি। আঙুল বাড়িয়ে বললে, ওইটে দেখুন।

সর্বনাশ! মড়ার মাথা! তিনজনেই লাফ দিয়ে দরজার দিকে সরে গেল আতঙ্কে। সবচাইতে প্রচণ্ড লাফ দিলেন গণেশবাবু অমন মোটা শরীর নিয়ে অতবড় লাফ তিনি যে কী করে দিলেন এ একটা আশ্চর্য ব্যাপার। তাঁর সেই লক্ষদান দেখলে ক্যাঙারুরও লজ্জা হত। হাতের গাড়টা ঠাঁই করে গিয়ে লাগল পানিপাঁড়ে রাম সিংয়ের কাঁকালে, সেও আঁই আঁই আঁই দুদ্দা বলে মেঝেতে বসে পড়ল।

মিনিট-খানেক পরে একটু সামলে নিল সকলে।

কাঁপা গলায় গণেশবাবু বললেন, ওটা কী করে এল?

বিরিঞ্চি সংক্ষেপে উত্তর দিলে, জানলা দিয়ে।

–জানলা দিয়ে? কোনও লোজন–?

–নাঃ-ডেক–চেয়ারে বসে এতক্ষণ পরে সাড়া দিলে অনাদি। দুটো ঘোলাটে চোখ মেলে বললে : শুধু একখানা হাত! যেমন বিশ্রী কালো, তেমনি ভয়ঙ্কর। একখানা কালো হাত!

গণেশবাবুর বুকের রক্ত চন-চন করে উঠল। হাত দুটো থর-থর কতে কাঁপতে লাগল।

রাম সিং কাঁকালের ব্যথাটা সামলে নিয়ে বললে, রাম, রাম–ই তো কোই জিন কা কারবার হোগা মালুম হোতা!

ঠাঁই! গণেশবাবুর কাঁপা হাত আবার গাড়র ধাক্কা লাগল রাম সিংয়ের হাঁটুতে।

–আঁই হো দাদা-মর গেই রে–আর একলাফে রাম সিং বাইরে চলে গেল। গাড়টার গতিবিধি তার সুবিধাজনক মনে হচ্ছিল না।

রহমান বললে, দিন-দুপুরে ভূত! এ হতেই পারে না।

বিরিঞ্চি বললে, নিশ্চয়ই না। এ কোনও বদলোকের কাছ। ভালো কথা, আপনাদের স্টেশনের পয়েন্টসম্যান গিরিধারীকে একবার ডাকুন তো!

–গিরিধারী!–গণেশবাবু সবিস্ময়ে বললেন, তাকে কেন?

বিরিঞ্চি কঠিন গলায় বললে, ডাকুন না। দরকার আছে।

কিন্তু স্টেশনে গিরিধারীকে পাওয়া গেল না। এদিক-ওদিক খুঁজে এসে রহমান বললে কোয়ার্টারে গেছে।

হাতের মুঠোর মধ্যে রিভলবারটা শক্ত করে ধরে বিরিঞ্চি বললেন, অনাদি, তুমি ঘর পাহারা দাও। আমি একবার গিরিধারীর সঙ্গে মোলাকাটা করে আসি।

অনাদি বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইল, কোনও জবাব দিলে না।

তিনজনে প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে গিরিধারীর কোয়াটারের দিকে চলল। বিরিঞ্চি আগে আগে। প্রখর সূর্যের আলোয় জ্বলতে লাগল তার খাড়া চোয়াল আর আগুনের মতো চোখ। হাতের মুঠোর মধ্যে রিভলবারের ঈদোটা ক্রমেই গরম হয়ে উঠতে লাগল। আর গণেশবাবুর মনে। হতে লাগল, তাঁর চারপাশে একখানা অলক্ষ্য কালো হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে–যখন-তখন সে তার ভয়ঙ্কর থাবাটা ক্যাঁক করে তাঁর গলায় বসিয়ে দিতে পারে। হৃৎপিণ্ডের ভেতর তখন থেকে ধড়াস ধড়াস করছে, আচমকা হার্টফেল করে বসবেন না তো গণেশবাবু?

একটা ছোট তামাকের খেত পেরিয়ে গিরিধারীর কোয়ার্টার। সামনে খুঁটোয় বাঁধা একটা গরু জাবনা চিবোচ্ছে। জনমানুষ কোথাও নেই।

–গিরিধারী, গিরিধারী!

কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।

অসহিষ্ণু হয়ে গণেশবাবু দরজায় ধাক্কা দিলেন : এই ব্যাটা, করছিস কী? মরে আছিস নাকি ঘরের ভেতরে?

গণেশবাবুর ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা খুলে দুফাঁক হয়ে গেল। আর পরক্ষণেই সকলের চোখে পড়ল

একটা দড়ির খাঁটিয়ার ওপরে একজন লোক পড়ে আছে। তার হাত-মুখ শক্ত করে কাপড় দিয়ে বাঁধা, চোখ দুটো অস্বাভাবিক বিস্ফারিত। আর তার বাঁধা মুখের ভেতর থেকে গোঁ-গোঁ করে একটা যন্ত্রণার চাপা শব্দ বেরিয়ে আসছে।

.

পাঁচ

গিরিধারী যা বললে তা অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার।

আপ আর ডাউন গাড়ি ক্রসিং হওয়ার পরে সে কোয়ার্টারে ফিরে আসে। ভারি খিদে পেয়েছিল তার। সকালে রান্না করে রেখে গিয়েছিল, ভেবেছিল ফিরে গিয়ে নিশ্চিন্তে খাবারটা খেয়ে নেবে। কিন্তু দু-গ্রাস ভাত মুখে দিতেই তার কী যে হল সে জানে না। হঠাৎ মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল, তারপর সব অন্ধকার। যখন জ্ঞান হল সে দেখলে, এই খাঁটিয়াটার সঙ্গে কে তাকে শক্ত করে বেঁধে রেখে গেছে। তার গায়ে যে কোম্পানির পোশাক ছিল, তাও উধাও।

–আমি পুলিশের লোক। আমার কাছে সত্য কথা বলবে। তা হলে বেলা বারোটার সময় তুমি প্ল্যাটফর্ম ঝাঁট দিচ্ছিলে না?

–না হুজুর।

–হঠাৎ একটা হাসির শব্দ তুমি শুনতে পাওনি?

–না হুজুর।

–হুঁ!–বিরিঞ্চি আর কথা বাড়াল না। গণেশবাবুকে বললে, চলুন–হয়েছে।

গণেশবাবু যেমন ভীত, তেমনি আকুল হয়ে উঠেছিলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞাসা করলেন, ব্যাপার কী স্যার? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

–বোঝবার দরকার নেই–বিরিঞ্চি যেন তীব্রভাবে একটা ধমক দিলে : আপনি শুধু মুখ বুজে চুপ করে থাকুন। অনেক রহস্য আছে এর ভেতরে। যদি কোনও কথাবার্তা বলেন, তা হলে কিন্তু সব মাটি হয়ে যাবে বুঝেছেন?

–আজ্ঞে হ্যাঁ–শুকনো ঠোঁটটা চেটে গণেশবাবু জবাব দিলেন : আমি কোনও বিপদে পড়ব না তো?

–বলা যায় না। তবে, আপনি চুপ করে থাকলে সেটাই নিরাপদ হবে।

–অ্যা–বলা যায় না। গণেশবাবুর বুকের ভিতরটা ডাঙায় ভোলা মাছের মতো ধড়ফড় করে খাবি খেতে লাগল। মনের সামনে এখনও ভাসছে অন্ধকার রাত্রিটার ছবি, দরজার হাতলের ওপরে একখানা ভয়ঙ্কর কালো হাত। তারপর মড়ার মাথা, বিরিঞ্চির পিস্তলের শব্দ আর গিরিধারীর দুর্গতি সব মিলে কী-যে একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে, গণেশবাবু তা কল্পনাই করতে পারলেন না।

উঃ, হতভাগা গোমেজ। কী কুক্ষণেই ভাদুড়ীমশায়ের আমের ওপর তাঁর নজর পড়েছিল। এখন তার ঠ্যালা সামলাতে প্রাণ যায়। নাঃ–চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরেই ফিরে যাবেন তিনি। প্রাণ আগে, না চাকরি আগে?

বিরিঞ্চির মাথার ভেতর তখন ধুধু করে আগুন জ্বলছে। সেও কিছু বুঝতে পারছে না। এ কী করে হল–এ কেমন করে সম্ভব। নিজের চোখে সে দেখেছে মেঝের উপর উবুড় হয়ে পড়ে আছে শ্ৰীমন্ত রায়। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। নিখুতভাবে ছোরার ঘা-টা যে তার বুকে লেগেছিল তাতেও সন্দেহ নেই। তবে?

তবে? বিরিঞ্চি মুঠোর মধ্যে শক্ত করে রিভলবারটা চেপে ধরল : তবে এ কী ব্যাপার? অনাদিকে আশ্বাস দিয়েছে বটে, কিন্তু ও-হাসি যে শ্ৰীমন্ত রায়ের, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। হ্যাঁ–নিঃসন্দেহে শ্ৰীমন্ত রায়। কিন্তু শ্ৰীমন্ত রায় কেমন করে আসবে এখানে? তা হলে এটা কি কোনও ভৌতিক ব্যাপার? একটা অশরীরী আত্মা?–গায়ের ভেতর শিরশির করে শিউরে গেল।

কিন্তু না–নিজেকেই একটা ধমক দিলে বিরিঞ্চি। ভূত-টুত ওসব নিতান্ত গাঁজাখুরি–ছেলে-ভোলানো ব্যাপার। ভূতে বিশ্বাস করে না বিরিঞ্চি। তাছাড়া এ তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, গিরিধারীকে খাঁটিয়ার সঙ্গে বেঁধে রেখে একটা লোক গিরিধারী সেজে তাদের ওপর বেশ এক চাল চেলে গেল, এবং সে-লোক যে শ্ৰীমন্ত রায়, একথা বিরিঞ্চি কাগজে-কলমে লিখে দিতে পারে।

অতএব আর দেরি করা চলবে না। যা করবার আজকের রাত্রের মধ্যেই তা শেষ করে ফেলতে হবে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, শিকার নিতাই সরকার। আর শিকারি দুজন–বিরিঞ্চি আর শ্ৰীমন্ত রায়। দেখা যাক–কে জেতে।

মুখের ভেতরে দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠল বিরিঞ্চির। দুটো চোখ আগুনের দুটো গোলার মতো ধকধক করে জ্বলতে লাগল।

.

রাত অন্ধকার।

আকাশে মেঘ জমে আছে, তার তলায় ডুব দিয়ে তারাগুলো মিলিয়ে গেছে দৃষ্টির বাইরে। স্টেশনের আলোটা মিটমিট করে জ্বলছে, কিন্তু তাতে দুহাত দূরের অন্ধকারও আলো হয়ে উঠছে না। আর ওপারের ঢালু বিলের বুক থেকে তেমনি শনশন হাওয়া দিচ্ছে। সমস্ত পরিবেশটাই যেন কেমন অস্বস্তিকর আর অস্বাভাবিক।

একটু পরেই মেল ট্রেন আসবে। আশেপাশে দু-তিনটে পোস্ট-অফিস থেকে কতগুলো মেলব্যাগ এসে জমে আছে–সেগুলো তুলে দিয়ে নতুন ব্যাগ নামাতে হবে। রাতে আর রানার যাবে না, সেগুলো জমা থাকবে স্টেশনে–তারপর সকালে—

.

রহমান খেতে গেছে, বাইরে বসে আছে গিরিধারী। ঠিক কালকের রাতটার মতো। গণেশবাবু ভাবছিলেন, এই শান্ত নির্বিরোধ স্টেশনটায় এই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কত কী ঘটে গেল। কালো হাত থেকে আরম্ভ করে গিরিধারীর এই দুর্গতি পর্যন্ত সবই একটা রহস্যের সূত্রে গাঁথা। গণেশবাবুর ভয় করছিল, কিন্তু সেইসঙ্গে এও মনে হচ্ছিল যে এর ভেতরে নিশ্চয় কোনও লোকের শয়তানি আছে।

বিশেষ করে বিরিঞ্চি আর অনাদিকে তাঁর এতটুকু ভালো লাগছে না। বললে, ওরা নাকি আই-বির লোক। কিন্তু ভাব-ভঙ্গি দেখে গণেশবাবুর কেমন সন্দেহ জাগছে। ওদের ভঙ্গি ঠিক ভালো লোকের মতো নয়–কেমন যেন–

গণেশবাবু থানায় খবর পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিরিঞ্চি তা হতে দেয়নি। বলছে যে, তাতে নাকি কাজের ক্ষতি হবে। কিন্তু পুলিশের লোকের কাজের কী ক্ষতি হবে তা গণেশবাবু বুঝতে পারলেন না। নাঃ–তিনি টেলিফোন করে সদর স্টেশনে খবর দেবেন, সেখান থেকে তারা যা খুশি করুক। শেষে একটা অঘটন ঘটলে তাঁর কাঁধের ওপর যে সমস্ত দায়িত্বটা এসে খাঁড়ার মতো নেমে পড়বে তা তিনি কিছুতেই হতে দেবেন না। গোমেজের পাল্লায় পড়ে তাঁর সে-শিক্ষা হয়ে গেছে।

ঢং করে সাড়ে নটা বাজল। আর সঙ্গে সঙ্গেই ওদিকে ঝনঝন করে সাড়া উঠল টেলিফোন থেকে। নটা চল্লিশে ডাক-গাড়ি আসবে, তারই সূচনা।

স্টেশনে যাত্রী বেশি নেই–যে-দু-চারজন আছে, তাদের আগেই টিকিট দেওয়া হয়ে গেছে। টেলিফোন ধরে খানিকক্ষণ সাঙ্কেতিক ভাষায় আলাপ করলেন গণেশবাবু। তারপর বললেন, ঘণ্টি লাগা গিরিধারী সিগন্যাল দে। গাড়ি আসছে।

ঠিক আছে হুজুর হাতের লাল-নীল লণ্ঠনটা তুলে নিয়ে গিরিধারী সিগন্যাল দিতে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অন্ধকারের ভেতর থেকে উড়ে এল আলোকের ঝড়। ডাক-গাড়ি এসে দু মিনিটের জন্যে দম নিলে মানিকপুরে। খানিকক্ষণ হইচই, যাত্রীদের ওঠা-নামা। এর মধ্যেই মেলব্যাগ নামানো হয়ে গেল।

স্টেশন যখন আবার নিঃসাড় আর নিঝুম হয়ে গেল, তখন রাত দশটা। সাড়ে দশটা থেকে রহমানের ডিউটি। এই আধঘণ্টা সময়টুকু ভালোয় ভালোয় কেটে গেলে হয়। মেলব্যাগগুলো ছোট একটা ঘরের ভেতর বন্ধ করে ভালো করে তালা-চাবি দিয়ে গণেশবাবু চেয়ারে এসে বসলেন, তারপর বিড়ি ধরালেন একটা।

হঠাৎ মনে পড়ল, এখানকার ব্যাপারটা সদরে জানানো সরকার।

গণেশবাবু টেলিফোনটা তুলে নিলেন।

আর সেই মুহূর্তেই পিস্তলের শব্দে স্টেশনটা থরথর করে কেঁপে উঠল। গণেশবাবুর কাঁপা হাত থেকে রিসিভারটা ঠক করে টেবিলের ওপর পড়ে গেল।

টলতে টলতে ঘরের মধ্যে চলে এল গিরিধারী। ঘরের বড় আলোটায় গণেশবাবু যা দেখলেন তাতে তাঁর দম আটকে আসবার উপক্রম করল। গিরিধারীর বুকের বাঁ পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, তার নীল উর্দি লাল হয়ে গেছে রক্তে। এক হাতে ক্ষত-চিহ্নটাকে চেপে ধরে গিরিধারী মেঝের ওপরে পড়ে গেল।

অমানুষিক ভয়ে গণেশবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, গিরিধারী, এ কী! কিন্তু তাঁর কথাটাও শেষ হতে পেল না।

খোলা দরজার পথে দুটি মূর্তি এসে দেখা দিয়েছে। দুটি মূর্তি–পিশাচের মতো জ্বলছে তাদের চোখ। তাদের দুহাতে দুটি পিস্তল গণেশবাবুর বুক লক্ষ্য করে উদ্যত হয়ে আছে, যেন এই মুহূর্তে তাঁকে গুলি করবে।

আর্তনাদ করে গণেশবাবু বললেন, বিরিঞ্চিবাবু, অনাদিবাবু! আপনারাই শেষে গিরিধারীকে–

-হ্যাঁ, আমরাই গিরিধারীকে খুন করেছি, দরকার হলে আপনাকেও খুন করব।বাঘের মতো চাপা গলায় হিংস্র গর্জন করে বিরিঞ্চি জবাব দিলে। গণেশবাবুর মুখ দিয়ে অব্যক্তভাবে বেরুল : কেন?

-চুপ, কোনও কথা নয়। তোমাকে মেরে আমাদের লাভ নেই। তোমরা দুজন ছিলে–আমাদের কাজের অসুবিধে হতে পারত, তাই একটাকে নিকেশ করে দিয়েছি।

দুটো উদ্যত রিভলবারের মুখে দাঁড়িয়ে ঘামে গণেশবাবুর সর্বাঙ্গ ভিজে যেতে লাগল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড যেন পাথর হয়ে গেছে তাঁর।

–চাবি দাও শিগগির–অনাদি পাগলা শেয়ালের মতো খেঁকিয়ে উঠল।

–কিসের চাবি—

–যে-ঘরে ডাকের ব্যাগ রেখেছ সেই ঘরের।

গণেশবাবুর কথা কইবার শক্তি যেন লোপ পেয়েছে। তিনি শুধু নিঃশব্দে আঙুল বাড়িয়ে টেবিলের ওপরকার চাবির গোছাটা দেখিয়ে দিলেন।

অনাদির পিস্তলটা তেমনি গণেশবাবুর দিকে মুখ করে আছে, বিরিঞ্চি একটা থাবা দিয়ে চাবিগুলো তুলে নিলে। আতঙ্ক-বিহ্বল আচ্ছন্ন দৃষ্টির সাহায্যে গণেশবাবু স্পষ্টই দেখতে পেলেন, বুনো জানোয়ারের ক্ষুধিত মুখের মতো একটা উগ্র লোভ বিরিঞ্চি আর অনাদির চোখে-মুখে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে।

–কোন্ চাবি? শিগগির বলে দাও আমাদের সময় নেই।

–ওই তো বড় পিতলেরটা।

এইবার হঠাৎ পিশাচের মতো হেসে উঠল বিরিঞ্চি। সেই হাসিতে অনাদিও যোগ দিলে–পাগলা শেয়ালের গোঙানির মতো সে টেনে টেনে হাসতে লাগল।

বিরিঞ্চি বললে, শোনো গোবর-গণেশ, তোমাকে আমরা খুন করব।

–কেন? গণেশবাবু শেষ চেষ্টায় নিজেকে সংযত করলেন। বিপদের সময় অতি বড় কাপুরুষের বুকেও সাহস জেগে ওঠে, গণেশবাবুরও তাই হল।

গণেশবাবু বললেন, আমি চাবি তো দিয়েছি।

–কিন্তু তুমি আমাদের মুখ চেনো।

–সে তো রহমান চেনে, রাম সিংও চেনে।

–সকলকেই সাবাড় করব–এবং আজ রাত্রেই করব।

যেটুকু শক্তি মনের মধ্যে জেগে উঠেছিল, সেটুকু লোপ পেয়ে গেল নিঃশেষে। এরা খুনে, এরা ডাকাত! গণেশবাবু কেঁদে উঠলেন : টাকা নিয়ে যাও, আমাকে বাঁচাও!

আবার অনাদি আর বিরিঞ্চি তেমনি অমানুষিকভাবে হাসতে শুরু করলে।

–বাঁচাতে পারতুম, কিন্তু উপায় নেই। তা হলে আমরাই বিপদে পড়ব।

–তোমরা আমাকে মারবেই?

–নিশ্চয়! রেডি হও। ইচ্ছে হলে শেষবারের মতো ভগবানকেও ডেকে নিতে পারো।

গণেশবাবুর মনের সামনে ছবির মতো ভেসে গেল তাঁর কলকাতার বাড়ি। বুড়ি মা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে। তারা যখন এই খবর পাবে–

শেষ চেষ্টায় গণেশবাবু বললেন, আমাকে বাঁচাও!

অনাদির হাতের পিস্তলটা কাঁপতে লাগল : অসম্ভব! ওয়ান—টু–

গণেশবাবু চোখ বুজলেন।

কিন্তু অনাদি থ্রি বলবার আগেই জানলা-পথে একটা বিদ্যুতের ঝলক। গুড়ুম করে পিস্তলের শব্দযন্ত্রণায় আর্তনাদ করে অনাদি বসে পড়ল। তারপর আরও শব্দ–আরও, আরও। ঝনঝন করে ঘরের আলোটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, একটা সীমাহীন অন্ধকারে প্লাবিত হয়ে গেল সমস্ত। বাইরে থেকে উকট হাসির তরঙ্গ উঠল : হাঃ—হাঃ—হাঃ—হাঃ–

অতিম চেষ্টায় প্রবল একটা চিৎকার করে গিরিধারীর রক্তাক্ত মৃতদেহের ওপরে গণেশবাবু মূৰ্ছিত হয়ে পড়লেন।

.

ছয়

বুকের ওপর গেঞ্জিটার গায়ে রক্তমাখা একটা হাতের ছাপ জ্বলজ্বল করছে।

নিতাই সরকার পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল খানিকক্ষণ। ভাববার বা কথা বলার শক্তি তার একেবারে লোপ পেয়ে গেছে। মাথার ভেতরে কী একটা চাকার মতো ঘুরছে প্রচণ্ড বেগে, কানের কাছে ভোমরার ডাকের মতো নিরবচ্ছিন্নভাবে বোঁ-বোঁ করে শব্দ হচ্ছে। বাইরে বাতাসের গোঙানি চলেছে অশ্রান্তভাবে–যেন অশরীরী শ্ৰীমন্ত রায় আহত হয়ে আর্তনাদ করে উঠেছে। ঘরের ভেতরে ছোট আলোটা জ্বলছে, কোনও ক্রুদ্ধ ক্ষুব্ধ একচক্ষু দানবের চোখ থেকে যেন হিংসার আগুন পিছলে পড়ছে।

কতক্ষণ কেটে গেছে নিতাইয়ের খেয়াল ছিল না। হঠাৎ একসময় সচেতন হয়ে সে আর্তনাদ করে উঠতে চাইল। কিন্তু গলা দিয়ে স্বর ফুটল না–কে যেন তার জিভটাকে গলার ভিতর দিয়ে একেবারে সোজা পেটের মাঝখানে টেনে নিয়ে গেছে।

শ্ৰীমন্ত রায়। শ্ৰীমন্ত রায় সত্যিই মরেনি! না–না, তা কী করে সম্ভব। তার হাতের ছোরা তো ব্যর্থ হয়নি! মনে পড়ছে কাশী মিত্র ঘাটের পাশে সেই নির্জন গলি আর শূন্য পাটগুদাম। বাইরে ঝাঁ ঝাঁ রাত। স্ট্র্যান্ড রোড ঘুমিয়ে পড়েছে, গঙ্গার বুক থেকে কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না–শুধু দূর থেকে ভেসে আসছে একটা মাতালের চিৎকার আর মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক। একটা পেটা ঘড়িতে রাত দুটো বাজল।

শুন্য পাটগুদামের নির্জন তেতলা। বিদ্যুতের বাতি নেই, শুধু একটা লণ্ঠন মিটমিট করছিল। ঘরে ছিল তারা দুজন। কেশবদাস মাগনিরামের গদি থেকে লুট করে আনা পনেরো হাজার টাকার নোটের তাড়াটা তাদের সামনেই পড়েছিল। আধাআধি ভাগ হবে। দুজনের চোখই লোভে জানোয়ারের মতো জ্বলছিল।

হঠাৎ নিতাই বলেছিল, ওই জানলাটা বন্ধ করে দাও ভাই শ্ৰীমন্ত। এত রাত্রে এখানে আলো দেখে কোনও ব্যাটা পুলিশ যদি

–ঠিক কথা।শ্ৰীমন্ত উঠে পড়েছিল, বন্ধ করতে গিয়েছিল জানলা।

আর এই মুহূর্তের জন্যেই অপেক্ষা করছিল নিতাই। বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়িয়ে সে টেনে বার করেছিল একখানা ধারালো ছোরা, লণ্ঠনের আলোয় সেটা ক্ষুধার্ত বাঘের জিভের মতো লকলক করে উঠেছিল। শ্ৰীমন্ত তখনও পেছন ফিরে আছে, ঘাসের ভেতরে লুকিয়ে-থাকা বিষধর গোখরো সাপের মতো যে বিপদ তার দিকে এগিয়ে আসছে তা কল্পনাও করতে পারেনি। চোখের পলকে নিতাই হাতখানাকে ওপরে তুলেছিল, বাঘের জিভটায় লেগেছিল একটা তীব্র ঝলক, তারপরেই সেটা সবেগে গিয়ে বিধেছিল শ্ৰীমন্ত রায়ের পিঠে।

–বিশ্বাসঘাতক—

কথাটা সম্পূর্ণও বেরুতে পারেনি শ্ৰীমন্ত রায়ের মুখ দিয়ে। টলতে টলতে সে মাটিতে উবুড় হয়ে পড়ে গিয়েছিল, ফোয়ারার মতো খানিক রক্ত উছলে এসে নিতাইয়ের জামায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু নিতাই আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি। বিদ্যুতের মতো নোটের তাড়াটা পকেটে পুরে নিয়ে এবং ঘরের আলোটা নিবিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজায় শিকল বন্ধ করে দিয়েছিল; পথে বেরিয়ে এসে সোজা গঙ্গার ঘাটে গিয়ে গায়ের রক্তাক্ত জামাটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল গঙ্গার খরধারার মধ্যে। তারপর–

তারপর আজ সেই শ্ৰীমন্ত রায় ফিরে এসেছে।

অশরীরী। ভূত! কে জানে? নিতাই কিছু ভাবতেও পারছে না, বুঝতেও পারছে না। ছয় মাস আগে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার পর থেকে সে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে মরবার পরেই শ্ৰীমন্ত রায় ফুরিয়ে যায়নি। দেহীই হোক আর অশীরীই হোক, সে যে নিতাইকে খুঁজে বেড়াচ্ছে এ নিঃসন্দেহে সত্য, এবং একদিন সে যে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে, তাতেও কোনও সংশয় তার নেই।

হ্যাঁ-এক বছর আগেকার ঘটনা। পটলডাঙার এক মেসবাড়িতে সে তখন আস্তানা নিয়েছিল। হঠাৎ নিশিরাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে ভোলা জানলায় তার চোখ পড়েছিল। রাস্তা থেকে অল্প অল্প গ্যাসের আলো আসছিল, সেই আলোয় দেখেছিল, ছায়ামূর্তির মতো একজন মানুষ ওখানে দাঁড়িয়ে।

আর এক লহমায় সে মানুষটাকে চিনতে পেরেছিল–আবছা আলোতে তার ভুল হয়নি একবিন্দু। সে আর কেউ নয়–শ্ৰীমন্ত রায়। নিজের চোখ দুটোকে ভালো করে বিশ্বাস করবার আগেই মূর্তিটা মিলিয়ে গিয়েছিল হাওয়ায়–মিলিয়ে গিয়েছিল ব্ল্যাকআউটের কলকাতার রহস্যময় অন্ধকারে।

সেই থেকে একটা আশ্চর্য ভয় সঞ্চারিত হয়ে গেছে নিতাইয়ের চেতনায়। ভূতের ভয়, অশরীরীর ভয়। তারপরেই নিতাই কলকাতা ছেড়ে চলে এসেছিল। রাত্রির অন্ধকার এলেই তার শরীর ছমছম করে উঠত, থমথম করে উঠত মন। মাঝে মাঝে আশঙ্কা হত, গভীর রাত্রে তার ঘরের চারপাশে যেন শিকারি বিড়ালের মতো পা ফেলে শ্ৰীমন্ত রায় চলে বেড়াচ্ছে। তার সর্বাঙ্গ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, তার চোখে দপদপ করে জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুন।

অবশেষে বিভীষিকা কিনা সত্যি-সত্যিই এসে দেখা দিল। বাইরে বাতাস গোঙাচ্ছে–অন্ধকার আমবাগান যেন আছাড়ি-পিছাড়ি করছে একটা প্রবল আক্রোশে। হঠাৎ ধড়াস করে একটা শব্দ হয়ে পেছনের জানলাটা খুলে গেল, ঘরের ভেতর ঢুকল একটা মাতাল বাতাস, আর–

আর সমস্ত ঘরটার মধ্যে ধুলোর ঘূর্ণির একটা পাক দিয়ে সেই বাতাস দপ করে আলোটাকে নিবিয়ে দিলে। মনে হল খোলা জানলার পথে শ্ৰীমন্ত রায় আবার এসে ঘরে ঢুকেছে।

এতক্ষণে–এইবার ঘরফাটানো আর্ত একটা চিৎকার বেরুল নিতাইয়ের গলা দিয়ে। মুহূর্তে সমস্ত বাড়ি জেগে উঠল, হইচই করে লোক ছুটে এল।

.

পরের দিনটা তার কী ভাবে যে কাটল সেকথা ভগবানই বলতে পারেন।

গত রাত্রিতে এ কী ঘটল? এমন দুঃস্বপ্ন যে কখনও সম্ভব হতে পারে একথা কি সে কোনওদিন কল্পনাই করতে পেরেছিল নাকি? কিন্তু তবুও তো এ সম্ভব হল! স্বপ্ন মনে করে একে উড়িয়ে দেওয়া চলবে না, বুকের ওপরে হাতের লাল ছাপখানাই তার প্রমাণ।

কী করবে সে? কী উপায় তার? পালিয়ে যাবে? কিন্তু পালিয়েই বা লাভ কী? যার দেহ আছে তাকে ফাঁকি দেওয়া চলে, কিন্তু অশরীরীর দৃষ্টিকে অতিক্রম করবার কোনও উপায় নেই। যেখানেই যাও–ঠিক তোমাকে খুঁজে বার করবে, প্রতিশোধ নেবে। আকাশে বাতাসে প্রেতাত্মার আগুন-ভরা রাশি রাশি চোখ ভেসে বেড়াচ্ছে। অন্ধকারের আড়ালে আড়ালে ঘুরছে তার হিংস্র থাবা, তার রক্তাক্ত নখর।

সমস্ত দিন সে অসুস্থের মতো ঘরের মধ্যে পড়ে রইল। কানের কাছে ক্রমাগত বাজছে রাত্রির সেই ভবিষ্যদ্বাণী–তিনদিন মাত্র সময়। তার একটা দিন তো কেটে গেল। তারপর আর একদিন কাটবে, তারপরে আরও একটা দিন। নিতাই কিছুই করতে পারে না। কোনও প্রতিকার করতে পারে না, শুধু একান্ত অসহায়ভাবে, একান্ত মুড়ের মতো একটা ভয়ঙ্কর বীভৎস পরিণামের জন্যে প্রতীক্ষা করে থাকবে।

উঃ, অসহ্য।

নিতাই যেন পাগল হয়ে যাবে। মাথার ভেতরে তার আগুনের একটা কুণ্ড যেন খাঁ-খাঁ করে জ্বলছে। অন্যায় করেছিল সে–এই তার শাস্তি। অন্যায় কখনও ঢাকা থাকবে না, পাপ কখনও চাপা থাকবে না। অনেক টাকার মালিক হয়েছে সেবড়লোক হয়েছে। কিন্তু শাস্তি কই? সুখ কোথায়? শুধু এক শ্ৰীমন্ত রায়কেই তো ছোরা মারেনি। যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে সে ধানচালের ব্লক মার্কেট করেছে। শুধু এক শ্ৰীমন্ত রায়ই নয়–দুর্ভিক্ষে যারা অনাহারে মরেছে, তারা সবাই কি এই সুযোগে তার ওপরে প্রতিশোধ। নিতে আসবে?

মর্মান্তিক যন্ত্রণায় আর-একটা দিন কেটে গেল। এইবারে ট্রেনের একখানা টিকিট কিনে সে দিল্লি-আগ্রা কোথাও চম্পট দেবে কি না ভাবছে, এমন সময় দারোগা সাহেব এসে উপস্থিত।

এত বন্ধুত্ব, এত খাতির, তবু নিতাইয়ের বুকটা হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠল। আচমকা মনে হল, যেন সে যে শ্ৰীমন্ত রায়কে খুন করেছে এ-খবরটা জানাজানি হয়ে গেছে পৃথিবীর সব

জায়গায়। আর সেই অপরাধে দারোগাসাহেব তাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছেন।

নিতাই চমকে উঠে দাঁড়াল। হাত থেকে হুঁকোটা ঠকাস করে পড়ে গেল মাটিতে। দারোগা হো-হো করে হেসে উঠলেন।

–তোমার হল কী সরকার? এমন আঁতকে উঠলে কেন?

নিজেকে সামলে নিয়ে নিতাই বললে, না, কিছু হয়নি তো?

–তবে অমন ভয় পেলে কেন?

–না–না–ভয় পাইনি। কিন্তু এই সাতসকালে অমন ধড়াচূড়া পরে কোথায় চললেন দারোগাসাহেব!

–শোনোনি কিছু? মানিকপুর স্টেশনে কাল রাত্রে ভয়ঙ্কর কাণ্ড হয়ে গেছে যে!

নিতাইয়ের মাথার মধ্যে রক্ত চলকে গেল।

–কী হয়েছে মানিকপুরে?

–খুন! পয়েন্টসম্যানকে খুন করে দুজন ভদ্র ডাকাত স্টেশনের মেলব্যাগ লুট করতে চেয়েছিল। স্টেশনমাস্টার গণেশবাবুকেও তারা খুন করতে যাচ্ছিল–এমন সময় বাইরে থেকে কে পিস্তলের গুলি ছুঁড়ে একজন ডাকাতকে আহত করে। ডাকাত দুটো পালিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য, যে গুলি ছুঁড়ে ডাকাত তাড়াল, তার কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

–কী ভয়ানক!

–হ্যাঁ, ভয়ানক ব্যাপার বইকি! শুনে তো আমারই হাত-পা পেটের ভেতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে! আছি বাবা ধ্যাধ্যেড়ে গোবিন্দপুরের এক জঙ্গলের ভেতর পড়ে, এখানে ওসব বোমা-পিস্তলের কারবার কেন? সিধে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করুক, লাঠিপেটা করে দু-একটার মাথা ভাঙুক, গ্রামকে গ্রাম ধরে চালান করে দিই সদরে। কিন্তু এ সব কী রে বাপু।

পিস্তল! ভদ্র ডাকাত। নিতাইয়ের সমস্ত মুখটা ছাইয়ের মতো বিবর্ণ হয়ে গেল। এই ঘটনাটা যেন বিচ্ছিন্ন একটা আকস্মিক ব্যাপার নয়। আচমকা তার মনে হল, যেন এর সঙ্গে কোন একটা অলক্ষ্য সূত্রে তার ভাগ্যটাও জড়িয়ে আছে।

দারোগা বললেন, আরে সেই তো বলছি। এর ভেতরে মস্ত একটা রহস্য আছে, বিস্তর ঘোরপ্যাঁচ আছে। এ-নিয়ে ধস্তাধস্তি করা আমাদের মতো পুঁটিমাছ দারোগার কম্ম নয় বাবা! সিধেল চোর দু-চারটে ধরতে পারি, দাগিকে এনে ঠ্যাভানি লাগাতে পারি; অর্থাৎ সেরেফ খাই-দাই আর কাঁসি বাজাই। জয়ঢাক বাজাতে হলে কেমন করে ঠ্যালা সামলাই!

হঠাৎ নিতাই চুপ করে রইল।

একটা বিড়ি ধরিয়ে দারোগা বললেন, যাচ্ছি তো এনকোয়ারিতে। ওখান থেকে সোজা সদরে চিঠি লিখব; দু-চারটে ডিটেকটিভ-ফিভ পাঠিয়ে দাও। এসব ভদ্র ডাকাতের ব্যাপারে ইয়াসিন মিঞা নেই। শেষকালে রাত-বেরেতে দু-চারটে পিস্তলের গুলি মেরে দিলে কোন্ আফাজুদ্দিন চাচা আমাকে বাঁচাতে আসবে।

ঘোড়া ছুড়িয়ে দারোগা চলে গেলেন। যাবার আগে বলে গেলেন, তুমিও সাবধান হয়ে থেকো সরকার সক্ষণ আমার ভাল ঠেকছে না।

–অ্যাঁ–অ্যা–আমি। আমি কেন? দারোগা ঘোড়া থামালেন। ভয়ানক একটা গুরুগম্ভীর চেহারা করে তাকালেন নিতাইয়ের দিকে।

–বিশ্বাস কী! তুমি তো অনেক টাকা করেছ বাজারে জোর গুজব। ভদ্র ডাকাতেরা একবার তোমার ঘরে যদি হানা দেবার চেষ্টা করে তাতে অন্যায়টা কোথায় আছে!

নিতাইয়ের পিলে-যকৃতে ভূমিকম্প জাগিয়ে হিতৈষী ইয়াসিন দারোগা প্রস্থান করলেন। নিতাই সরকার উঠে দাঁড়াল। কী করবে কিছু বুঝতে পারছে না। হাতে আর একদিন মাত্র সময়। অশরীরী শ্ৰীমন্ত রায়ের আগুন-ভরা চোখ থেকে কোনওখানে সে নিস্তার পাবে না। বুকের গেঞ্জিতে রক্তরাঙা হাতের ছাপ তার ভয়ঙ্কর পরোয়ানা জানিয়ে গেছে।

রাধেকৃষ্ণ নিতাই চমকে উঠল। সামনে একজন বুড়ো বৈরাগী এসে দাঁড়িয়েছে। একটা গোপীযন্ত্র বাজাচ্ছে টুং টুং করে। বলছে : হরেকৃষ্ণ–দুটি ভিক্ষে পাই?

নিতাইয়ের সমস্ত রাগ নিরীহ বৈরাগীটার ওপরে গিয়েই ফেটে পড়ল। জানোয়ারের মতো দাঁত খিঁচিয়ে বললে, হ্যাঁরা কৃষ্ণ! ভিক্ষে করতে এসেছে! যাও, ভাগো এখান থেকে! বোষ্টম

–আরও কিছু, যত শালা জোচ্চোর!

–তোমার এত টাকা, গরিব বোষ্টমকে তাড়িয়ে দিচ্ছ বাবা?

–আমার এত টাকা! কে তোমাকে খবরটা দিলে তা? ইয়ার্কি পেয়েছ, মামাবাড়ির আবদার, না? যাও, নিকালো হিয়াসে! রাগের চোটে নিতাইয়ের মুখ দিয়ে হিন্দী বেরুতে লাগল : নেহি যায়গা তো এক ঘুষি দেকে মুণ্ডু উড়ায়ে দেগা!

পাকা দাড়ির আড়ালে বুড়ো বৈরাগীর চোখ একবার ধক করে জ্বলে উঠেই নিবে গেল। বৈরাগী বললে, আচ্ছা বাবা চলে যাচ্ছি, বুড়ো মানুষকে ঘুষি মেরে তোমার আর বীরত্ব দেখাতে হবে না। ভগবান তোমার মঙ্গল করুন। হরেকৃষ্ণ।

টুং টুং করে গোপীযন্ত্র বাজিয়ে বৈরাগী দ্রুতপদে অগ্রসর হয়ে গেল।

আর বৈরাগী চলে যাওয়ার পরেই একটা আশ্চর্য ব্যাপার চোখে পড়ল নিতাইয়ের। সামনে। ঘাসের ওপরে একখানা নীল রঙের খাম পড়ে আছে।

ক্ষিপ্র হাতে খামটা তুলে নিতেই তার ভেতর থেকে একটুকরো চিঠি বেরিয়ে পড়ল। রুদ্ধশ্বাসে চিঠিটা পড়ে গেল নিতাই :

তোমার বিপদের কথা আমরা জানি। কোনও ভয় নাই। শ্ৰীমন্ত রায়ের প্রেতাত্মার হাত হইতে যদি রক্ষা পাইতে চাহ, তাহা হইলে এই চিঠির আদেশ পালন করিও। আজ সন্ধ্যার পরে নীলকুঠির জঙ্গলে আসিও–একা। কোনও ভয় করিও না–তোমার সমস্ত বিপদের যাহাতে অবসান হয় সেই পথ তোমাকে বাতলাইয়া দিব। যদি অবহেলা করিয়া না আসো, তাহা হইলে জানিও যে ভয়ঙ্কর দুভাগ্য তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে, তাহা হইতে কেহ তোমাকে রক্ষা করিতে পারিবে না। ইতি–

তোমার বন্ধু।

.

সাত

ব্যাপার দেখে ইয়াসিন দারোগা খানিকক্ষণ হাঁ করে রইলেন। খুনি আর দাগি নিয়ে কারবার করেছেন বিস্তর, কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা জীবনে বিশেষ ঘটেনি। একে অজ পাড়া-গাঁ, এই ছোট স্টেশন–বিহারের একটা নিরিবিলি অঞ্চল। এখানেও যে এমন সব ঘটনা ঘটতে পারে, এ কি কল্পনাও করা যায় কখনও? জার্মানযুদ্ধের চাইতেও এ ভয়ানক–জাপানী বোমার চাইতেও এ যে মারাত্মক।

অফিস ঘরের মেঝেতে তেমনি পড়ে আছে গিরিধারীর লাশটা। গলা আর বুকের ভেতর দিয়ে দু-দুটো পিস্তলের গুলি পরিষ্কারভাবে বেরিয়ে গিয়েছে। খুব কাছে থেকেই গুলি করা হয়েছিল। নীল উর্দি রক্তে একেবারে ভিজে গেছে। মেঝের ওপর দিয়ে অনেকটা গড়িয়ে গেছে রক্ত–শুকিয়ে গিয়ে সে রক্ত আঠার মতো কালো হয়ে আছে। দেওয়ালের গায়েও সে-রক্তের ছিটে। গিরিধারীর পদা-পড়া নিষ্পলক হলদে চোখ দুটো তখনও ভয়ে আর বিস্ময়ে অস্বাভাবিকভাবে বিস্ফারিত হয়ে আছে, যেন ব্যাপারটা কী ঘটেছে ভাল করে বোঝবার আগেই মৃত্যু তার প্রেত-ছায়া ছড়িয়ে দিয়েছে তার চেতনার ওপরে।

একপাশে টেলিফোনের রিসিভারটা ঝুলে পড়েছে টেবিল থেকে নীচেতে। একটা গুলি তার মাউথপিসে লেগেছিল-খানিকটা উড়ে গেছে তার থেকে। শক্ত দেয়ালের গা থেকে খানিকটা চুন-সুরকি ঝরিয়ে দিয়ে একটা কালো বুলেট প্রায় এক-ইঞ্চি ভেতরে ঠুকে শক্ত হয়ে আটকে বসেছে–যেন একটা বড় পেরেককে জোরে ঢুকে ওখানে বসিয়ে দিয়েছে কেউ। ঘরটার দিকে একবার তাকালেই বুঝতে পারা যায়, কাল রাত্রে কী ভয়ঙ্কর প্রলয় কাণ্ড ঘটে গিয়েছে ওখানে বয়ে গেছে কী ভয়ঙ্কর একটা দুর্যোগ।

অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলেন না ইয়াসিন দারোগা। সামনে গিরিধারীর দেহটা একটা পৈশাচিক বিভীষিকার মতো পড়ে রয়েছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, দেওয়ালের কোণ ঘেঁষে ছোট গোলমতো কী একটা পড়ে আছে।

দারোগা লাফিয়ে উঠে ওটাকে তুলে আনলেন। একটা পিস্তলের খালি কার্তুজ। সেটাকে মন দিয়ে নাড়াচাড়া করে তিনি বললেন, হুঁ।

অর্থাৎ যেন মস্ত একটা সমস্যার সমাধান তিনি চোখের সামনে দেখতে পেয়েছেন। এর পরে চটপট আসামীদের ধরে ফেলতে তাঁর কোনও অসুবিধেই ঘটবে না।

খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ইয়াসিন দারোগা একটা বিড়ি ধরালেন। আর যাই হোক, দিনের বেলা। চারিদিকে ঝকঝক করছে রোদ। স্টেশন ভরা লোক। একটা বিচিত্র ঘটনার গন্ধ পেয়ে আশপাশ থেকে কিছু কৌতূহলী লোকও এসে জড়ো হয়েছে। রাত্রির অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে তার অজানা ভয় আর আশ্চর্য বিভীষিকাটাও মিলিয়ে গিয়েছে। এখন কোনও আনাচকানাচ থেকে একটা বেখাপ্পা পিস্তলের গুলি এসে তাঁর টুপিটাকে উড়িয়ে দিতে পারবে না–এ-সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত আর নিশ্চিন্ত বোধ করলেন ইয়াসিন দারোগা।

অতএব এবার নিশ্চিন্ত-চিত্তে কর্তব্য পালনে মনোযোগী হওয়া যায়।

তাঁর মতো একটা ভারিক্কি দারোগার যেরকম পদমর্যাদা থাকা উচিত, সেইরকম চোখমুখের একটা ভয়ঙ্কর ভঙ্গি করে তিনি বিড়ির ধোঁয়া ছাড়লেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর শহরে খবর দিয়েছেন নিশ্চয়?

একটা চেয়ারে বিহুলের মতো বসে ছিলেন গণেশবাবু। তাঁর কপালে একটি পটি বাঁধা, কেমন করে যেন কেটে রক্ত বেরিয়েছিল ওখান থেকে। অন্ধকার ঘরের ভেতর যেসব ধস্তাধস্তি ঘটেছিল–তার ফলেই ওটা হয়ে থাকবে বোধহয়।

গণেশবাবু সেই রাত থেকে দারুভূত মুরারির মতো ঠায় বসে আছেন। ভয়ে-আতঙ্কে আর ঘটনার অস্বাভাবিক আকস্মিকতায় তাঁর কথাই বন্ধ হয়ে গেছে তখন থেকে। ইয়াসিন দারোগার কথায় শুধু তাঁর ঠোঁটটা একবার নড়ে উঠল। তিনি কী একটা বলবার চেষ্টা করলেন, বলতে পারলেন না।

জবাব দিলে এ-এস-এম রহমান।

–হ্যাঁ স্যার, টেলিফোন করেছি।

–কোনও খবর এল?

–হ্যাঁ, খবর পাঠিয়েছে। বারোটার ট্রেনে লোক আসছে।

–যাক–বাঁচা গেল। ইয়াসিন দাবোগা দায়মুক্ত। তবু যতটা পারা যায় নিজের কর্মদক্ষতার পরিচয়টা এই ফাঁকে দিয়ে দেওয়া দরকার।

–তা বেশ। ওরা এলে ভালোই হবে। কিন্তু এ সামান্য ব্যাপার–আমিই এর কিনারা করতে পারতাম। কত খুন-জখম জল করে ফেলল এই ইয়াসিন দারোগাকত ফেরারীকে ধরে চালান করে দিলে, আর এ ভো–হুঁ!–

গলার স্বরে উচ্ছ্বসিত গর্ব আর গৌরব ফুটে বেরুল।

রহমান বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ–স্যার।

ইয়াসিন খুশি হয়ে গর্বভরে পা নাচাতে লাগলেন।

রহমান জিজ্ঞাসা করলে, ব্যাপারটা আপনার কী মনে হয় স্যার?

দারোগা অত্যন্ত বিচক্ষণের মতো একবার ডাইনে আর একবার বাঁয়ে হেলালেন ঘাড়টা। মুখের ওপর মুরুব্বিয়ানার একটা গুরু-গম্ভীর ছায়া পড়ল : আমার তো মনে হয় এ একেবারে জলের মতো পরিষ্কার কেস। আসামীকে আমি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি ইচ্ছে। করলেই অ্যারেস্ট করতে পারি। কিন্তু শহরের কর্তাদের কেরামতিই এবারে দেখা যাক। তারপরে যা করবার আমি করব।

–আচ্ছা স্যার–একবার কেশে নিয়ে রহমান জিজ্ঞাসা করলে : দুজন লোক ডাকাতি করবার জন্যে এসেছিল এ তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু তাদের গুলি করে তাড়ালেই বা কে, আর অমন করে হাসলেই বা কেন? তা ছাড়া কালো হাতখানাই বা কার? আর তা ছাড়া ঘরের ভেতরে মড়ার মাথা গড়িয়ে দেওয়া

ইয়াসিন দাবোগা একেবারে দস্তুরমতো বিরক্ত হয়ে উঠলেন।

–আরে মশাই, আপনি তো আচ্ছা লোক? বলি, দারোগা কে? আপনি না আমি? রহমান সঙ্কোচে এতটুকু হয়ে গেল : আজ্ঞে আপনি।

–তবে?

উত্তরে কী বলা যায় রহমান ভেবে পেল না।

–দারোগা না হলে কি বোঝা যায় মশাই? রেল-কোম্পানির ঘন্টা বাজিয়ে আর মালগাড়ির হিসেব নিয়ে কি পুলিশের ব্যাপার বুঝতে পারা যায়? এর জন্যে আলাদা মগজ চাই–হুঁহুঁ! সরকার আমাদের মুখ দেখে বহাল করেনি, বুঝলেন? ভেতরে অনেক বস্তু আছে। বলেই একটা থানার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা করে দিয়েছে। মানেন কি না?

–আজ্ঞে মানি বইকি!

–তা হলে? তা হলে এত সহজেই বুঝতে চাইছেন কেন সব? ধৈর্য ধরে থাকুন, সময়ে সব জানতে পারবেন।

ঘরের সবাই একেবারে চুপ মেরে রইল।

দারোগা একখানা খাতা বার করলেন। বললেন, এনকোয়ারি-রিপোর্টটা তৈরি করে ফেলা যাক। খুন-জখম, পিস্তলের কাণ্ডগুরুতর ব্যাপার। আপনারা যে যা জানেন সব ঠিক করে বলবেন। যদি সত্যি কথা একবিন্দু গোপন করেন তা হলে সকলকে জেলে যেতে হবে-মনে থাকে যেন!

–আজ্ঞে মনে থাকবে বইকি।

মহা আড়ম্বরে দারোগা সাক্ষ্য নিতে বসলেন। এক ঘণ্টার মধ্যে তিনবার চা এল, দুটো ডাব এল। সেইসঙ্গে যেমন তর্জন, তেমনি গর্জন। ভাব দেখে মনে হল, হাতের কাছে আসামীকে না পেলে তিনি এঁদের ফাঁসিকাঠে নিয়ে লটকে দেবেন। গণেশবাবু একেই হতভম্ব হয়ে বসে ছিলেন, দারোগার ধমকধামকে তাঁর প্রায় হার্টফেল করবার উপক্রম হল।

রিপোর্ট লেখা হল।

চতুর্থ পেয়ালা চা আর তিন নম্বর ডাব নিঃশেষ করে ইয়াসিন দারোগা উঠতে যাবেন, এমন সময় ঘরে ঢুকল স্টেশনের ঝাড়দার রামগিদ্ধড়। দারোগাকে সেলাম দিয়ে বললে, হুজুর, আপকা চিঠি!

–আমার চিঠি? সবিস্ময়ে দারোগা বললেন, আমার চিঠি? কোত্থেকে এল?

–একঠো বাবু দিয়া। মাস্টারবাবু, আপকো ভি একঠো দিয়া।

–কোন বাবু?

–মালুম নেহি। একঠো গোরা বাবু, নয়া আদমি কোই হোগা।

কী ব্যাপার। কথা নেই বার্তা নেই, কোত্থেকে এক নতুন বাবু এসে স্টেশনমাস্টার আর দারোগাকে চিঠি দিয়ে গেল।

ক্ষিপ্রগতিতে খাম ছিঁড়তে ছিঁড়তে দারোগাবাবু বলল, কিধার হ্যায় বাবু?

–চলা গিয়া।

–বটে।

খাম খুলে দুজনেই চিঠি বার করলেন। তার চিঠি পড়বামাত্র দুজনেরই মুখের ভাব এক রকম হয়ে গেল–মড়ার মতো বিবর্ণ আর পাঙাশে।

দারোগার চিঠিতে লেখা ছিল সংক্ষেপে মাত্র এই কটি কথা :

বেশি চালিয়াতি না করে বাড়ি যাওনইলে বেঘোরে মারা পড়বে।–হিতৈষী।

আর গণেশবাবুর চিঠিতে লেখা লিছ :

মাস্টারমশাই, অন্ধকার রাত্রে আমায় পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন–আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আপনি ভালো এবং নিরীহ লোক। তাই কাল রাত্রে আমি সামান্য কিছু কর্তব্য করে আপনাকে রক্ষা করেছি। আজ এই পর্যন্ত।কালো হাত।

.

আট

নীলকুঠির জঙ্গল।

আগে জঙ্গল ছিল না, পাশ দিয়ে যে-মরা নদীটা বালির মধ্যে লুকিয়ে গিয়েছে, ওরও অবস্থা ছিল এরকম–দূরের মহানন্দা তখন কানায় কানায় ঘোলা জল নিয়ে ঘূর্ণি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বয়ে যেত, আর তারই জলে ছায়া ফেলত নীলকুঠির ব্যারাকের মতো সমকোণের ধরনে গড়া মস্ত বাড়িটা।

আশেপাশের দশখানা গ্রামে সাহেবরা জোর করে নীলের চাষ করাত, বুকের রক্ত আর চোখের জলে মাটি ভিজিয়ে চাষারা ফলাত সেই সর্বনেশে ফসল। পেটের ভাত জুটত না–জুটত সাহেবের লাথি আর চাবুক। যারা অস্বীকার করত, সাহেবরা তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলত, পৃথিবীতে কেউ আর কোনওদিন তাদের দেখতে পেত না। তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হত, আত্মীয়-স্বজনেরা ত্রাহি ত্রাহি করে যেদিকে পারে পালিয়ে বাঁচত।

তারপর এল প্রজা-বিদ্রোহ। অত্যাচারে জর্জরিত মানুষগুলো মাখা তুলে দাঁড়াল। যবনিকা পড়ল নীলকরদের ভয়াবহ অত্যাচারের ওপরে। নীলকুঠি খালি হয়ে গেল।

নীলকুঠি খালি হল বটে, কিন্তু তবু মানুষ সহজে সেদিকে আসতে পারত না। সকলের মনের ভেতর জায়গা করে নিয়েছিল একটা বিচিত্র ভয়, একটা আশ্চর্য আতঙ্ক। দুপুরের বাতাসে ওই বাড়িটার দিক থেকে যেন কাঁদের দীর্ঘশ্বাস হু-হুঁ করে ভেসে আসত, মনে হত রাত্রের অন্ধকারে কারা যেন ওখানে গুমরে গুমরে কাঁদছে। লোকে ভয়ে ওদিকে হাঁটাই ছেড়ে দিল।

চলতে লাগল সময়ের স্রোত।

পাশের নদীটা আস্তে আস্তে মরে গেল–একটা বিকট ভয়ের মূর্তি নিয়ে নীলকুঠির জঙ্গল নিমগ্ন হয়ে রইল। মাঝে মাঝে জ্যোৎস্না রাত্রে নাকি দেখা যায়, কারা যেন ঘোড়া ছুটিয়ে ওই জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছ। তারা মানুষ নয়–মানুষের ছায়ামূর্তি। কত লোক যে ওখানে ভয় পেয়েছে তার আর সীমাসংখ্যা নেই।

মাঝরাত্তিতে ওই জঙ্গলে যেতে হবে নিতাই সরকারকে! তাও আবার একা! এমন কথা কী। স্বপ্নেও ভাবতে পারে নাকি কেউ?

সারাটা দিন নিতাই ঘরের মধ্যে আফিংখোরের মতো বসে বসে ঝিমোতে লাগল। কী যে হবে বুঝতে পারছে না। ওদিকে শরীরী হোক আর অশরীরী হোক, রাত্রে শ্রীমন্ত রায়ের সেই বিভীষিকা তাকে মাত্র তিন দিনের সময় দিয়ে গেছে–আজকে শেষ রাত্রি। কালকে যে তার

অদৃষ্টে কী ঘটবে এক ভগবানই বলতে পারে সে কথা।

কিন্তু এই বন্ধুটি কে? শ্ৰীমন্ত রায়ের কথাই বা জানবে কী করে? মানিকপুর স্টেশনে যে-ঘটনাগুলো ঘটে গেল তারই বা অর্থ কী? সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে সে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল।

পালিয়ে যাবে? পালিয়ে যাবে এখান থেকে? কিন্তু কোথায়? যে অশরীরী, তার হাত থেকে কোথাও কি নিস্তার আছে? তার চাইতে বন্ধুর উপদেশটাই কানে তোলা যাক। দেখা যাক–যদি কিছু হয়।

রাত এগারোটা। শুক্লা তৃতীয়ার চাঁদ বনের আড়ালে অস্ত গেছে। চারদিক থমথমে অন্ধকার। আকাশে যেনক্ষত্রগুলো জ্বলছিল তারাও যেন কী-একটা ভয়ে আড়ষ্ট আর পাণ্ডুর হয়ে গেছে। দূরের মাঠে আলেয়ার আগুন থেকে-থেকে স্কন্ধকাটার রাক্ষুসে হাসির মতো দপদপ করে উঠছিল–আর কোথায় যেন ককিয়ে ককিয়ে কাঁদছিল একটা কুকুর। অমন করে কুকুর কাঁদলে নাকি গৃহস্থের অমঙ্গল হয়।

নানা দুশ্চিন্তায় নিতাই এতক্ষণে যেন বেপরোয়া হয়ে গেছে। যা হওয়ার তা হোক, ব্যাপারটার একটা শেষ দেখবে সে। এমনিও ডুবছে, অমনিও ডুবছে কাজেই যাহয় একটা হেস্তনেস্ত করে নিতেই হবে।

কাপুরুষ সে নয়। কোনও কিছুকেই সে ভয় করে না, খুনখারাপিতে সে ভয় পায় না। তা যদি পেত তা হলে শ্ৰীমন্ত রায়ের পিঠে অমন করে ছোরা বিধিয়ে সে টাকাগুলো নিয়ে সরে পড়তে পারত না। ভয় তার মানুষকে নয়-অপদেবতাকে; শ্ৰীমন্ত রায়কে নয়–তার প্রেতাত্মাকে। মানুষের সঙ্গে একহাত মহড়া সে নিতে পারে, কিন্তু ভূতের সঙ্গে লড়াই করবে কেমন করে?

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, শ্ৰীমন্ত রায় মরেনি। যদি না মরে থাকে, তাহলে তাকে আর ভয় কিসের? তার সঙ্গে যদি চালাকি করতে আসে তাহলে সেও দেখে নেবে–সহজে ছাড়বে না। হিংস্র উত্তেজনায় নিতাইয়ের দাঁত কড়মড় করে বেজে উঠল।

কাঠের একটা পুরনো বাক্সের ভেতর থেকে নিতাই একটা রিভলভার বের করে আনল। দোনলা বন্দুকের কাজ নয়। রিভলভারের লাইসেন্স তার নেই, এটা বেআইনি অস্ত্র। দরকার হতে পারে বলে এটাকে সে কাছে রেখেছে। রিভলভারের পাঁচটা ঘরে সে কার্তুজ ভরে নিল, সঙ্গে নিল আরও কিছু বাড়তি কার্তুজ আর তিন শেন্স-এর একটা টর্চ। তারপর ঘাড়ে মাথায় একটা কালো রুমাল জড়িয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

বুকটা ঢিপঢিপ করছিল কিন্তু নিতাই সংযত করল নিজেকে। নাঃ, ভয় পেলে তার চলবে না, ঘাবড়ে গেলে সব মাটি হয়ে যাবে। হয় শ্ৰীমন্ত রায়ের আজ একদিন, অথবা তার শেষ। এসপার কিংবা ওসপার।

কিন্তু এই বন্ধুটি কে?

সবই রহস্যময়। তবু দেখা যাক। হাতের মধ্যে রিভলভারটা শক্ত করে বাগিয়ে ধরে সে এগুতে লাগল।

অন্ধকার, নির্জন গ্রামের পথ। চারদিক থমথম করছে, পাতাটি কোথাও নড়ছে না। শুধু আকাশের তারাগুলো যেন হিংস্রভাবে জ্বলছে, আর দূরে-দূরে জ্বলছে আলেয়া। একটা কুকুর তাকে দেখে খেঁকিয়ে উঠল–নিতাই ভ্রূক্ষেপ না করে এগিয়ে চলল।

কিন্তু সে যা টের পায়নি–অন্ধকারের ভেতরে একটি ছায়ামূর্তি তাকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে আসছে। সে থামলে থামছে, এগুলে এগুচ্ছে। সেই মূর্তির মুখ মানুষের নয়–নরকঙ্কালের। তার অস্থিময় মুখের কোটরের ভেতরে দুটো চোখ আগুনের হলকার মত ঝিলিক দিচ্ছে। তার হাত মানুষের হাত নয়–সে-হাত গরিলার হাতের মতো বড়,–এক ইঞ্চি পরিমাণ ধারালো বড় বড় তার নখ, আর কুচকুচে কালো সেই হাতখানা টকটকে রক্তে রাঙানো।

.

নয়

তখনও রক্ত, তার একটা প

নীলকুঠির জঙ্গল। নীলকুঠির ভুতুড়ে বাড়িটা ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেছে। বেশির ভাগ ঘরেরই দেওয়াল আছে, ছাত নেই। দরজা জানলাগুলো ভেঙে কবে যে ধুলোয় মিশে গেছে কেউ তা বলতে পারে না। বাড়িটার এখানে-ওখানে সর্বত্র শিকড় জেগেছে, মাথা তুলেছে ছোটবড় অশ্বথ গাছের সারি। কালো অন্ধকারে ঢাকা সেইসব অশ্বথের থেকে মাঝে মাঝে একটা কালপ্যাঁচা ভুতুড়ে গলায় ধু-ধু-ধু-ধু-ম শব্দ করে ডেকে উঠছে।

এই বাড়ির একটা ভাঙা ঘরের ভেতরে একটা মোমবাতির আলো মিটমিট করে জ্বলছে। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিরিঞ্চি। তার হাতে একখানা ধারালো ছোরার আঠারো। ইঞ্চি ফলা মোমবাতির আলোয় রাক্ষসের জিভের মতো লকলক করছে। মেঝেতে শুয়ে। আছে অনাদি–তার একটা পায়ে ময়লা ন্যাকড়ার ব্যাস্তেজ বাঁধা, তা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে তখনও রক্ত পড়ছে। দুটো হাত শক্ত করে বাঁধা অনাদির-চোখ দুটা ভয়ে যেন কোটর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসছে।

কাতর অসহায় কণ্ঠে অনাদি বললে, আমাকে মেরো না।

বিরিঞ্চি হেসে উঠল। জোরে নয়–চাপা, নিষ্ঠুর তার হাসি। তারপর অনাদির কথার জবাব না দিয়ে আঙুলের মাথায় ছোরাটার ধার পরীক্ষা করতে লাগল। এক ঘায়ে একেবারে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেওয়া যাবে কি না সেটাই দেখছে।

অনাদি আবার কাতর স্বরে বললে, কেন আমাকে মারবে? আমি কী করেছি?

–তোমাকে না মারলে আমার উপায় নেই।

–কেন?

–তোমার পায়ে চোট লেগেছে শ্ৰীমন্ত রায়ের গুলি উরু দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তুমি পালাতে পারবে না–ধরা পড়বেই। তারপর তোমার দৌলতে আমাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। কাজেই আগেভাগে নিশ্চিন্ত হতে চাই।

–মিথ্যাবাদী, শয়তান–অনাদি গর্জে উঠল : তোমার মতলব আমি বুঝতে পেরেছি। নিতাই সরকারের কাছ থেকে যে-টাকা আদায় করবে ভেবেছ, তার ভাগ আমাকে দিতে চাও না। তাই তোমার এইসব ছুতো! শ্ৰীমন্ত রায়ের গুলি না লাগলেও তুমি আমাকে খুন করতে।

–তা করতাম–নির্বিকার নিরাসক্ত গলায় বিরিঞ্চি জবাব দিল।

–এই তোমার বন্ধুত্ব?

–শয়তানে শয়তানে বন্ধুত্ব এইরকমই হয় বন্ধু–আবার হিংস্র চাপা গলায় বিরিঞ্চি হেসে উঠল : স্বার্থসিদ্ধি হলে সবটা একা গ্রাস করবার জন্যে হয় তুমি আমায় খুন করবে, নইলে আমি তোমায় খুন করব। ভাগ্যবলে চান্সটা আমি পেয়েছি–ছাড়ব কেন?

–রাক্ষস, শয়তান–অনাদি আর্তনাদ করে উঠল।

–যা খুশি বলতে পারো, নির্বিকারভাবেই বিরিঞ্চি জবাব দিল–মেল-ট্রেনের টাকাগুলো বাগানোর চেষ্টা বৃথা হয়ে গেল বাগড়া দিল শ্ৰীমন্ত রায়। নিতাইয়ের কাছ থেকে যা পাওয়া যাবে, তাতে আমার নিজেরই কুলোবে না। কাজেই তোমাকে আর ভাগীদার রাখতে চাই না। এবার শ্ৰীমন্ত আর নিতাইকে কাবার করতে পারলেই আমার পথ পরিষ্কার।

অনাদি আবার বলল, শয়তান, বিশ্বাসঘাতক!

–বড্ড গালাগাল দিচ্ছ, আর বেশিক্ষণ তোমার বাঁচা উচিত নয়। রেডি হও। ওয়ান–টু–

ছুরি হাতে বিরিঞ্চি এগুতে লাগল।

বিস্ফারিত ভীত চোখে অনাদি পালাবার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই উঠতে পারল না।

–আমাকে মেরো না, তোমার পায়ে পড়ি মেরো না, আমি ভাগ চাই না, আমাকে ছেড়ে দাও! অনাদির অসহায় চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।

তা হয় না–বিরিঞ্চির গলার স্বর পাথরের মতো কঠিন।

–আমাকে মেরো না–আমাকে মে—

মোমবাতির আলোয় ছোরাতে বিদ্যুৎ ঝকে উঠল। ধপ করে সেটা নেমে এল অনাদির বুকের ওপরে, বসে গেল বাঁট পর্যন্ত। আঁ–আঁ–আঁ।

অন্তিম আর্তনাদ। বারকয়েক হাত-পা ছুঁড়েই শান্ত হয়ে গেল। অনাদির বিস্ফারিত চোখের ওপর নেমে এল শাদা কাপড়ের একটা পদা। আর বিরিঞ্চি ছোরাটা ফস করে সজোরে টেনে বার করে আনতেই একহাত উঁচু হয়ে ছিটকে বেরুল রক্তের ফোয়ারা। লাগল দেয়ালে, লাগল বিরিঞ্চির গায়ে।

অনাদির জামাটাতে ছোরার রক্ত মুছে নিয়ে বিরিঞ্চি সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুখে নিশ্চিন্ততার একটুকরো হাসি। একটা আপদ গেছে, আরও দুটো বাকি। তাদের অবস্থাও এমনিই হবে।

ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা সে নিবিয়ে দিল। ঘরে ঘনিয়ে এল ভৌতিক কৃষ্ণ ছায়া। প্যাঁচাটা আবার ডেকে উঠল : ধু-ধু-ধু-ম-ধু-ধু-ধুম।

এমন সময় জঙ্গলের ভেতরে একটা তীব্র টর্চের আলো এসে পড়ল–যেন তলোয়ারের ফল চিরে দিল নীলকুঠির জঙ্গলের প্রেচ্ছন্ন রাত্রিকে।

আর কেউ নয়–নিতাই সরকার।

.

দশ

নিতাই খানিকক্ষণ বিহ্বলভাবে দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকার নীলকুঠির সামনে। বাতাস উঠেছে। চারদিকের বন-জঙ্গলে বাজছে একটা ভৌতিক মর্মর–যেন অতীতযুগের যত প্রেতাত্মা আজ এই অন্ধকার রাত্রে নীলকুঠির জঙ্গলে হানা দিয়েছে। অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে ঝোপে ঝাড়ে–তাদের হিংস্র চোখ থেকে ঠিকরে-পড়া আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেন।…

নিতাইয়ের বুক কাঁপতে লাগল। এ কোথায় এল কার সর্বনাশা আকর্ষণে এখানে এসে পড়ল সে? জঙ্গলের কোলে ঘন অন্ধকার যেন তাকে ঠেসে ধরেছে, যেন তার দম আটকে আসছে! কে এই বন্ধু–এমন অস্থানে এমন অসময়ে তাকে ডেকে আনল? সে কি সত্যি সত্যিই বন্ধু, না কোনও শত্রুর ফাঁদ?

নিতাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ, ভয়ব্যাকুল চোখ দুটো বুলিয়ে নিল পোড়ো নীলকুঠির ভয়াবহ রহস্যময়তার ওপরে। তারপর চেপে ধরল পকেটের রিভলভারটা। নিজের অস্ত্রটার নিষ্ঠুর শীতল স্পর্শে তার নিজের শরীরটাই যেন শিউরে উঠল।

ফিরে যাবে? বোধহয় ফিরে যাওয়াই ভাল, কিন্তু যাবে কি যাবে না ভাবতে ভাবতেই সে চমকে লাফিয়ে উঠল। তার কাঁধের ওপর কার একখানা হাত পড়েছে। যেন মানুষের হাত নয়, চারিদিকের আঁধারই একখানা লম্বা হাত বার করে তার কাঁধের ওপর রেখেছে।

অস্বাভাবিক গলায় নিতাই বলল, কে?

আঁধারের ভেতর থেকেই জবাব এল, এসো—

নিতাই পকেটের রিভলভারটা ধরবার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু ভয়ে আর উত্তেজনায় তার হাতটা থরথর করে কাঁপছে। তেমনি বিকৃত গলায় সে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে?

জবাব এল, বন্ধু!

ওরা কেউ দেখতে পায়নি, একটু দূরে আর-একটি ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। তার মুখ মানুষের নয়, কঙ্কালের। তার হাত মানুষের নয়, গরিলার মতো, বড় আর সেই হাতখানা টকটকে রঙে রঙিন।

কঙ্কাল-মূর্তিটা নিঃশব্দে হাসছিল–হঠাৎ তার হাড়ের দাঁতগুলো খটখট করে বেজে উঠল।

নিতাই চমকে বলল, ও কী?

বন্ধু জবাব দিল, কিছু না–বোধহয় কটকটে ব্যাঙ।

.

ঘরে ঢুকে মোমবাতির আলোটা জ্বালাল বিরিঞ্চি। তারপর নিজের পিস্তলটা নিতাইয়ের দিকে ঘুরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিঃশব্দে একটা ভয়ঙ্কর হাসি হেসে বলল, চিনতে পারছ?

ততক্ষণে আতঙ্কে পাথর হয়ে গেছে নিতাই। মোমবাতির মৃদু আলোয় চোখে পড়ছে ঘরের ভেতরের বীভৎস সেই অমানুষিক দৃশ্যটা, মেঝেতে তাজা রক্তের স্রোত বইছে–নিতাইয়ের পায়ের নীচে সেরক্ত আঠার মতো চটচট করে উঠল। আর রক্তের সেই পৈশাচিক সমারোহের মধ্যে পড়ে আছে একটা মৃতদেহ–মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। প্রসারিত হাতের দুটো মুঠি শক্ত করে আঁটা, অন্তিম যন্ত্রণায় পায়ের আঙুলগুলো পর্যন্ত দোমড়ানো।

কিন্তু তার চাইতেও বড় বিভীষিকা নিতাইয়ের সামনেই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাসছিল। তার হাতের ছোট রিভলভারের নলটা তারই বুকের দিকে উদ্যত হয়ে আছে তার শাদা শাদা বড় বড় দাঁতগুলো ক্ষুধার্ত জানোয়ারের মতো যেন তাকে তাড়া করে আসছে।

নিতাই অস্ফুট গলায় বলল, বিরিঞ্চি।

বিরিঞ্চি আঙুল বাড়িয়ে দেখিয়ে দিল মৃতদেহটার দিকে : আর অনাদি।

নিতাইয়ের সমস্ত জ্ঞান যেন লুপ্ত হয়ে গেল–মাথা ঘুরে রক্তাক্ত মেঝের ওপরেই বসে পড়ল সে। শুধু তেমনি করেই, সামনে দাঁড়িয়ে পিশাচের মতো হাসতে লাগল বিরিঞ্চি।..কয়েক মিনিট পরে নিতাই উঠে দাঁড়াল। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল অনাদিকে কে খুন করেছে?

–আমি।

–কেন?

–দরকার ছিল। কিন্তু বিরিঞ্চি বিকটভাবে সেইরকম শব্দহীন হাসি হাসল : ভয় নেই, তোমাকে খুন করব না। বলছি তো, আমি তোমার বন্ধু।

–বন্ধু! কী রকম বন্ধু তা আমি জানি। নিতাইয়ের হাত-পা কাঁপছে : আমার কাছে তুমি কী চাও?

–কিছুই না–পুরনো বন্ধু, একটু আলাপ-পরিচয় আর কি। বিরিঞ্চি নিশ্চিন্তভাবে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল : তাছাড়া একটু দাবিও আছে। আশা করি বন্ধুকে বিমুখ করবে না।

–কী দাবি?

–কিছু টাকা—

–কীসের টাকা?

–কেশবদাসের সিন্দুক থেকে নেওয়া হাজার টাকার অর্ধেক—

–সে-টাকার আমি কিছু জানি না–

–জানো না? বিরিঞ্চি তেমনি হাসতে লাগল : একথা তোমার কাছ থেকে একেবারে আশা করিনি, তা নয়। লজ্জা কী বন্ধু, সত্যি কথাটা সবাই জানে। সবই চাই না, মাত্র সাড়ে সাত হাজার পেলেই আমি চলে যাব–

–মিথ্যে কথা, আমার টাকা নেই।

–নেই? নিশ্চিন্তভাবে বিরিঞ্চি বললে, তোমার টাকা নেই? আমার রিভলভারে টোটা আছে। অনর্থক কেন বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটাচ্ছ বল দেখি? রাজি হয়ে যাও

–সে টাকায় তোমার দাবি নেই, আছে শ্ৰীমন্ত রায়ের—

–একই কথা। দাও, টাকাটা দিয়ে ফেলো চটপট—

–না।

–দেবে না? বিরিঞ্চি অনাদির মৃতদেহটা দেখিয়ে দিল, ক্ষুব্ধস্বরে বলল, তা হলে আমাকে আর-একটা খুন করতেই হল দেখা যাচ্ছে–

নিতাই আর্তনাদ করে উঠল, হাতটা চলে গেল পকেটের ভেতর।

–খবরদার!

হঠাৎ আকাশফাটানো গলায় চেঁচিয়ে উঠল বিরিঞ্চি : খবরদার, আমি জানি তোমার পকেটে পিস্তল আছে। কিন্তু বার করবার চেষ্টা কোরো না তার আগেই মিছিমিছি প্রাণটা খোয়াবে।

বিরিঞ্চির পিস্তলটা নিতাইয়ের প্রায় বুকের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে ট্রিগারে একটা আঙুল তৈরি হয়ে আছে।

হাল ছেড়ে দিল নিতাই। হতাশভাবে বলল, কিন্তু আমার কাছে তো টাকা নেই–

–না, তোমার ব্যাঙ্কে আছে। সে আমি জানি। তা ভালো, ছেলের মতো এটা সই করে দাও দেখি–

–কী এ?

–চেকবই।

–চেকবই! এ যে আমার ব্যাঙ্কের চেকবই! এ কোথায় পেলে?

বিরিঞ্চি মুচকি হাসল : কোন্ ব্যাঙ্কে টাকা আছে জানলে চেকবই যোগাড় করা এমন আর শক্তটা কী! নাও–সই কর–

–আমি সই করব না। কালো রিভলভারটা নাচিয়ে বিরিঞ্চি বললে, করবে না?

–না!

–তা হলে অনাদির দিকে একবার তাকাও।

–দাও সই করছি নিতাই হাত বাড়াল : কিন্তু কলম?

–এই নাও–পকেট থেকে ফাউন্টেন পেন বার করে দিল বিরিঞ্চি।

–কত টাকা লিখব?

রিভলভারটা নাচিয়ে বিরিঞ্চি বললে, লিখবে হবে না–শুধু সই কর।

–তার মানে? ব্ল্যাক চেক?

–হাঁ ব্ল্যাঙ্ক চেক।

সভয়ে নিতাই বলল, তুমি যদি আমার সব টাকা তুলে নাও?

–বন্ধুকে বিশ্বাস করো।

–না, সই করব না!

–তা হলে–বিরিঞ্চি পিস্তল বাগিয়ে ধরল।

–দাও সই করেছি–খসখস করে চেকে স্বাক্ষর করে দিল নিতাই। তারপর মাথায় হাত দিয়ে মেঝেয় বসে পড়ল। আজ তার সব গেল–আজ সে পথে বসেছে। কিন্তু কিন্তু নিতাইয়ের চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠল। এর শোধও সে নিতে পারবে। ও টাকা হজম করবার ক্ষমতা বিরিঞ্চির হবে না।

নিতাই বলল, এবার আমাকে যেতে দাও–

–হ্যাঁ দিচ্ছি, বিরিঞ্চি রক্তমাখা ছোরাটা হাতে তুলে নিলে। মোমবাতির আলোয় ঝিকিয়ে উঠল রাক্ষসের জিভ। ছোরাটা শক্ত করে মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে ধরে বিরিঞ্চি এগুতে লাগল নিতাইয়ের দিকে।

নিতাই সভয়ে চেঁচিয়ে উঠল এ কী!

এবার বিরিঞ্চি শব্দ করে হাসল, টেনে টেনে হাসল।

–নিতাই সরকার, ভেবেছ তুমিই সবচেয়ে চালাক, তাই নয়? আজ চেকে সই করে দিয়েছ, কালই কলকাতায় ব্যাঙ্কে তুমি টেলিগ্রাম করে দেবে, তারপর চেক ভাঙাতে গেলেই আমার হাতে দড়ি পড়বে। না–অত বোকা আমি নই।

পাংশু পাণ্ডুর মুখে নিতাই বলল, তুমি কী করতে চাও?

–শত্রুর শেষ রাখব না—

তীরের মতো বেগে নিতাই দাঁড়িয়ে উঠল, টেনে বার করে আনল রিভলভারটা। কিন্তু তার আগেই বিরিঞ্চির ছোরা তার বুকে এসে বিধেছে। নিঃশব্দে একটা ভারি বস্তার মতো অনাদির রক্তাক্ত দেহের ওপর গড়িয়ে পড়ল নিতাই।–একটা আর্তনাদ করবারও সময় পেল না। বিরিঞ্চি গর্জে উঠল–কেল্লা ফতে। আর সেই মুহূর্তেই কঠিন ভয়াবহ গলায় কে বলল, একটু দাঁড়াও বিরিঞ্চিসটা এখনও শেষ হয়নি।

সাপের ছোবল খাওয়ার মতো লাফ দিয়ে উঠল বিরিঞ্চি। শ্ৰীমন্ত রায়ই বটে। কোনও সন্দেহ নেই–শ্ৰীমন্ত রায়েরই কণ্ঠস্বর!

তীরবেগে বিরিঞ্চি রক্তমাখা ছোরাখানা তুলে ধরল। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। চারদিকের অন্ধকার সীমাহীন সমুদ্রের মতো। তার ভেতর কিছুই চোখে পড়ল না। অন্ধকারের মধ্যে আবার সেই ভয়ঙ্কর স্বর উঠল : রিভলভারটা হাত থেকে ফেলে দাও বিরিঞ্চি।

শ্ৰীমন্ত রায়! বিকট গলায় বিরিঞ্চি চেঁচিয়ে উঠল। তারপর শব্দ লক্ষ্য করে ছোরা তুলে ঝাঁপ দিতেই দুম করে এল একটা গুলির আওয়াজ। অসহ্য যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল বিরিঞ্চি–আহত হাত থেকে শব্দ করে ছোরাখানা ঝনঝন করে মেঝের ওপর খসে পড়ল!

বাঁ হাতে বিরিঞ্চি রক্তঝরা ডান হাতখানা চেপে ধরল, তারপর আতঙ্কে বিহ্বল চোখ মেলে চেয়ে রইল রহস্যময় অন্ধকারের ভেতর। সামনেই কোথাও তার অদৃশ্য শত্ৰু মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, লক্ষ করছে তার প্রত্যেকটি চাল-চলন, তার প্রত্যেকটি কাজ। এই অলক্ষ্য আততায়ীর কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তার কোনও উপায় নেই।

সহসা শ্ৰীমন্ত রায় আবার বলল, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো বিরিঞ্চি! যা বলি, তা মন দিয়ে শোনো। অনেক অপরাধ তুমি করেছ, তার জন্যে আজ তোমায় দণ্ড নিতে হবে। কিন্তু বিনা বিচারে শাস্তি তোমায় দেব না। তোমার কী জবাবদিহি করবার আছে, আগে তাই শুনে নিতে চাই।

বিকৃত স্বরে বিরিঞ্চি বলল, সাহস থাকে তো সামনে এসে দাঁড়াও শ্ৰীমন্ত রায়। অমন করে কাপুরুষের মতো আড়ালে থেকো না!

–কাপুরুষ।–হা-হা করে একটা বীভৎস হাসির আওয়াজ পোভড়া বাড়িটার থমথমে ভৌতিক রাত্রিকে কাঁপিয়ে তুলল–একথা অন্তত তোমার মুখে মানায় না বিরিঞ্চি। হাটলোর ফাঁকা পাটগুদামে পেছন থেকে আমার পিঠে ছোরা মারবার সময় এবীরত্ব তো তোমার ছিল না!

বিরিঞ্চি বলল, থামো থামো, শুধু একটা কথার জবাব দাও। তুমি কি মানুষ–অথবা প্রেত? মৃত্যুর ওপার থেকেই তুমি প্রতিশোধ নিতে এসেছ?

শ্ৰীমন্ত রায়ের অলক্ষ্য কণ্ঠ আবার তীক্ষ্ণ ভয়ঙ্কর মুখর হয়ে উঠল, বলল, সে-প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু ডান হাতটা খুইয়েছ বিরিঞ্চি, আবার বাঁ হাতটাও খোয়াতে চাও? হ্যাঁ, তোমায় স্পষ্ট আমি দেখতে পাচ্ছি। পকেটে হাত দিতে চেষ্টা কোরো না-ওখানে তোমার পিস্তল আছে তা আমি জানি। এও জানি যে, বাঁ হাতেও তুমি সব্যসাচীর মতো গুলি চালাতে পারো।

সভয়ে বাঁ হাতটা পকেট থেকে টেনে বার করে আনল বিরিঞ্চি। কাঁপা গলায় বলল, তুমি কী বলতে চাও?

–সেটা বলতেই তো চেষ্টা করছি, কিন্তু তার আগে তোমাকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। অস্থির হয়ে উঠলে নিজের ক্ষতি নিজেই আরও বেশি করবে আশা করি সেটা বুঝতে পারছ।

–কী করতে হবে?–হতাশ স্বরে বিরিঞ্চি জানতে চাইল।

–বসো ওই মেঝের ওপর।

বিরিঞ্চি বসল। টের পেল তলায় একটা ঠাণ্ডা আঠার স্রোত। মুহূর্তে বিরিঞ্চির সারা শরীর কুঁকড়ে উঠল। নিতাই অথবা অনাদির রক্ত–অথবা দুজনেরই। কিন্তু একতিল নড়ে বসতে তার সাহস হল না।

অদৃশ্য স্বর বলল, মনে আছে বিরিঞ্চি, একদিন এই শ্ৰীমন্ত রায় আদর্শ ভালো ছেলে ছিল? বন্ধু হয়ে তার কাছে তুমি এগিয়ে এলে, তারপর–

বিরিঞ্চি বলল, ওসব কথা কেন?

–বাধা দিয়ো না। মনে রেখো, আজ তোমার বিচার। গোড়া থেকে সব কথাই তোমায় শুনতে হবে।

বিরিঞ্চি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, বলল, বলে যাও।

–আমার টাকা ছিল–আমি ছিলাম সরল, ছিলাম নিবোধ। নির্বুদ্ধিতার সুযোগ নিয়ে তুমি আমাকে নিয়ে ভিড়িয়ে দিলে রেসের মাঠে। যত বাজি হারতে লাগলাম, টাকাগুলো যত পাখনা মেলে উড়ে যেতে লাগলযত আমি পালাতে চেষ্টা করতে লাগলাম, ততই আমায় তুমি আঁকড়ে রাখলে। দুঃখ ভোলাবার জন্যে ধরালে মদসর্বনাশের রাস্তা সহজ করে দিলে।

বিরিঞ্চি আবার উসখুস করে উঠল।

–দাঁড়াও বিরিঞ্চি, দাঁড়াও শ্ৰীমন্ত রায়ের তিক্ত গলা শুনতে পাওয়া গেল : সেদিন ভিক্ষুক করে যদি তুমি আমায় ছেড়ে দিতে তাহলে আমি তোমায় ক্ষমা করতাম। কিন্তু সেইখানেই তুমি থামলে না। যখন তুমি আমাকে নিঃস্ব করে দিলে, তখন নিয়ে এলে লোভ। আর সেই লোভের ফাঁদে আমি অসহায়ের মতো পা দিলাম।

বিরিঞ্চি জবাব দিল না।

–মদের নেশায় তখন আমার কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান ছিল না। সেই সুযোগে একটা জালিয়াতির ব্যাপারে তুমি আমায় জড়িয়ে দিলে। তখন আমার ঘোর ভাঙল। দেখলাম, এখন আমায় যে করে হোক তোমার হাত থেকে পালাতেই হবে। কিন্তু সে-পথ তুমি আমার রাখোনি। আমার মৃত্যুদণ্ড তোমার মুঠোর মধ্যে। যেসব কাগজপত্র তোমার কাছে ছিল তা দিয়ে অনায়াসে তুমি আমাকে সাত বছর জেল খাটাতে পারতে। নিরুপায় হয়ে তোমার দয়াতেই নিজেকে আমি সঁপে দিলাম।

কাতর গলায় বিরিঞ্চি বললে, ভুলে যাও শ্ৰীমন্ত, ভুলে যাও। ওসব পুরনো কথা কেন টেনে তুলছ?

–বলেছি তো, আজ তোমার বিচার। সব শুনতে হবে বিরিঞ্চি। সংক্ষেপেই বলব, কিন্তু একটা শব্দও বাদ দেওয়া চলবে না। পৃথিবীতে অনেক শয়তান জন্মেছে, কিন্তু তাদের মধ্যেও কিছুনা-কিছু মনুষ্যত্ব ছিল। কিন্তু ওসবের বিন্দুমাত্র বালাই তোমার ছিল না বিরিঞ্চি। এদিক থেকে তুমি নিরঙ্কুশ-তোমার তুলনা হয় না।

–শ্ৰীমন্ত!

–আজ তোমার গলা কাঁপছে কেন বিরিঞ্চি? কোনও অন্যায়–কোনও পাপেই তো কখনও তুমি এতটুকু টলোনি! আজ এ-দুর্বলতা কেন তোমার! এখন যা বলছি–নিঃশব্দে শুনে যাও।

বিরিঞ্চি নিরুত্তর হয়ে রইল। আহত ডানহাতের তালুতে তীব্র যন্ত্রণা। বুড়ো আঙুলের তলাকার হাড়টা গুঁড়ো হয়ে গেছে, এখনও রক্ত পড়ছে গড়িয়ে। সেটাকে প্রাণপণে টিপে ধরে বিরিঞ্চি বসে রইল।

–তারপর–অদৃশ্য শ্ৰীমন্ত বলে চলল : তারপর থেকে আত্মরক্ষার কোনও উপায় আমার আর রইল না। নিরাপদে পেছনে বসে থেকে আমায় পাপের পথে ঠেলে দিতে লাগলে। চুরি, জুয়াচুরি, জালিয়াতি, ডাকাতি–কিছুই বাদ গেল না। আর এমনি কায়দায় তুমি কাজগুলি করতে যে, ধরা পড়লে আমি জেলে যাব, তোমার গায়ে কুটোটির আঁচড়ও লাগবে না। খুব বুদ্ধিমানের মতো ব্যবস্থা, সন্দেহ কী! নির্বাক মুখে আমি তোমার প্রত্যেকটি আদেশ পালন করে চললাম। জানতাম, একবার যদি তোমার হুকুম অমান্য করি, তুমি আমায় সাত বছরের মতো জেলখানায় ঘানি ঘুরোতে পাঠিয়ে দেবে।

–থামো শ্ৰীমন্ত!–বিরিঞ্চি আর্ত হয়ে বলল, আর কেন ওসব? যেতে দাও ওসব কথা। যা হওয়ার হয়ে গেছে। এবার এসো-নিতাইয়ের টাকাটা আমরা ভাগাভাগি করে নিই রফা হয়ে যাক সবকিছু।

–ঘুষ?-শ্ৰীমন্তর হাসি শোনা গেল : লোভ দেখাচ্ছ আমাকে। কিন্তু ও-চালাকি পুরনো হয়ে গেছে বিরিঞ্চি হালদার, ওতে আর আমায় ভোলাতে পারবে না। তোমার কথার দাম কতখানি, একটু আগেই অনাদি তার পরিচয় পেয়ে গেছে। আমাকে অত বোকা তুমি ভেবো না।

–বিশ্বাস করো, একবার সুযোগ দাও আমাকে–বিরিঞ্চি প্রার্থনা করল।

–সুযোগ তুমি অনেক পেয়েছ বিরিঞ্চি, আর নয়। সব সুযোগেরই একটা সীমা আছে। ও-সব কথা এখন থাক। হ্যাঁ, যা বলছিলাম। আমার প্রতি শেষ কর্তব্য তুমি পালন করলে কেশবদাস মাগনিরামের ব্যাপারে। আমাকে ছোরাটা ঠিকই মেরেছিলে তোমরা, কিন্তু কপাল-জোরে আমি বেঁচে গেলাম। কী করে? সে অনেক কথা। কিন্তু তারপরেই মনে হল, তোমরা তিনজন–তুমি, অনাদি আর নিতাই তোমাদের কাছে আমার অনেক ঋণ। সে-ঋণ আমায় শোধ করতেই হবে। বিশেষ করে তুমি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ মহাজন।

বিরিঞ্চি চিৎকার করে উঠল : আমায় ছেড়ে দাও শ্ৰীমন্ত! এ-টাকার সবটা তুমিই নাও–শুধু আমাকে মুক্তি দাও, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।

–ক্ষমা?-শ্ৰীমন্ত আবার সেই ভয়ঙ্কর হাসি হাসল : তোমাকে ক্ষমা করবার পরিণাম কী, আমি কি তা জানিনে বন্ধু? গোখরোর মতো তুমি আমায় খুঁজে বেড়াবে–তোমাকে হাড়ে হাড়ে আমি চিনি। আর আমাকে যদি তুমি নাই পাও, আমার মতো আরও কতজনের সর্বনাশ যে তুমি করবে তার হিসেব নেই। আইন তোমায় ধরতে পারবে না–এতই তুমি সতর্ক। কাজেই আজ আমার কাছ থেকে তোমায় দণ্ড নিতে হবে।

–শ্ৰীমন্ত!

–উঠে দাঁড়াও বিরিঞ্চি!–বজ্রের মতো আদেশ এল।

–শ্ৰীমন্ত!

–উঠে দাঁড়াও, নইলে গুলি করব।

বিরিঞ্চি মন্ত্রমুগ্ধের মতো উঠে দাঁড়াল।

–ডানদিকে ঘুরে দাঁড়াও।

–আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাও শ্ৰীমন্ত?

–এখুনি জানতে পারবে। ডানদিকে ফেরো। হ্যাঁ–আরও, আরও দু-পা। এবার হাঁটতে আরম্ভ করো। পালাতে চেষ্টা কোরো না বিরিঞ্চি। মনে রেখো, আমার অশরীরী চোখ আর হাতের রিভলভার তোমার সবকিছু লক্ষ করছে।

বিরিঞ্চি অন্ধকারে অন্ধের মতো হাঁটতে লাগল।

–আর একটু ডাইনে, হাঁ, আরও দু-পা চলো–চলো বিরিঞ্চি।

বিরিঞ্চি চলতে লাগল পোভড়া বাড়ির আবর্জনায় হোঁচট খেতে খেতে-পায়ের তলায় জঙ্গল মাড়িয়ে মাড়িয়ে।

–দাঁড়াও–আবার কঠোর কণ্ঠের আদেশ এল।

বিরিঞ্চি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়াল।

–আমি অশরীরী কি না জানতে চেয়েছিলে। এইবার জানতে পারবে। তোমার কাছে টর্চ আছে?

বিরিঞ্চি বিহ্বল স্বরে বলল, আছে।

–এবার সেটা জ্বালাতে পারো।

পকেট থেকে আড়ষ্ট হাতে টর্চ বের করে বিরিঞ্চি। আলো ফেলল অদৃশ্য স্বর যেদিক থেকে আসছিল সেইদিকে।

কিন্তু মুহূর্তের সেই আলোতেই বিরিঞ্চির মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে গেল।

মাত্র চার-পাঁচ হাত দূরেই যে দাঁড়িয়ে আছে সে শ্ৰীমন্ত নয়। একটা নরকঙ্কালের মুখ–ভয়ঙ্কর কালো রক্তাক্ত হাতে একটা উদ্যত পিস্তল। তার মুখের অস্থির দাঁতগুলোয় খস্থ করে প্রেতের হাসি বাজছে।

হাত থেকে টর্চটা পড়ে গেল–একটা বোবা আর্তনাদ করে পিছিয়ে গেল বিরিঞ্চি। সঙ্গে সঙ্গেই আর একটা আর্তনাদ চারিদিক মুখর করে দিলে। ঠিক পেছনেই পোড়ো কুয়োটার মধ্যে সে উল্টে পড়ল–আছড়ে পড়ল বারো হাত নীচের শুকনো পাটকেল-ভরা গর্তটার মধ্যে : পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘাড়টা মটকে গেল তার।

কালো হাত তার পড়ে-যাওয়া টর্চটা তুলে নিয়ে কুয়োর মধ্যে ফেলল। ওই সে চেয়েছিল। বিরিঞ্চির বিষাক্ত রক্ত নিজের হাতে আর সে ঝরাতে চায়নি।

ঘাড় মটকে পড়ে কুয়োর তলায় ঝুলে আছে বিরিঞ্চি। আর টর্চের আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল, ভাঙা ইটের ভেতর থেকে সক্রোধে গলা বার করে এক বিশাল, দুধরাজ গোখরো বিরাট ফণা তুলে বিরিঞ্চির অসাড় দেহে একটার পর একটা ছোবল মেরে চলেছে। টর্চের আলোয় তার হিংস্র চোখ দুটো ঝিলিমিল করে উঠল একবার।

.

এগারো

বাইরে ঝাঁ ঝাঁ করছিল রোদ।

নিজের কোয়ার্টারে হাঁ করে ঘুমুচ্ছেন গণেশবাবু। মুখের সামনে অনেকগুলি মাছি উড়ছিল ভনভন করে, তাদের জ্বালায় বিরক্ত হয়ে মাঝে মাঝে জেগে উঠেই আবার ঝিমিয়ে পড়ছিলেন তিনি। সামনে টেবিলের ওপরে একখানা কাগজ কী সব লেখা রয়েছে, এখান থেকে বদলি হবার জন্যে গণেশবাবু দরখাস্ত লিখছিলেন, লিখতে লিখতেই ঘুমিয়ে পড়েছেন।

ভেজানো দরজাটা খুলে নিঃশব্দ পায়ে একজন লোক ঢুকল। রেলের খালাসির মতো জাঙিয়া পরা, দেখলে সাধারণ একজন কুলি ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। একবার আড়চোখে সে নিদ্রিত গণেশবাবুর দিকে তাকাল, তারপরে একখানা খাম আর একটা ছোট প্যাঁকেট বিছানার ওপরে রেখে তেমনি নিঃশব্দে বার হয়ে গেল।

একটু পরেই মানিকপুর স্টেশনে এল দেড়টার ট্রেন, স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেল। আর গণেশবাবুর ঘুম ভাঙল তারও প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে, প্রায় বেলা চারটের সময়।

তখনই তাঁর চোখে পড়ল সেই প্যাঁকেটটা, আর সেই চিঠিখানা। গণেশবাবু সবিস্ময়ে বললেন, এ কী! এগুলো এখানে কে রেখে গেল। আগে তিনি প্যাঁকেটটা খুললেন। আর খোলবামাত্র ভীত বিস্ময়ে তাঁর বারোধ হয়ে গেল। প্যাঁকেটের ভেতর থেকে পড়ল রবারের মস্ত মস্ত দুটো দস্তানা, কঙ্কালের মাথা আঁকা একটা মুখোশ। দস্তানা দুটো সাধারণ হাতের প্রায় দ্বিগুণ, তার উল্টো পিঠে গঁদের আঠায় কতগুলো লোম আটকানো, আর তার মাঝে মাঝে লাল রং দেওয়া–সবটা মিলে মনে হয় সেটা যেন। রক্তরঞ্জিত।

গণেশবাবু জিনিসগুলোর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আড়ষ্ট হাতে খুললেন খামখানা। তার ভেতরে এই চিঠিখানা ছিল :

প্রিয় গণেশবাবু,

গত এক সপ্তাহের মধ্যে আপনাদের এখানে অনেকগুলো ব্যাপার ঘটে গেছে, যেগুলো আপনাদের কাছে একটা বিচিত্র রহস্য মাত্র। কয়েকজন মানুষের প্রাণ গেছে–ঘটেছে। কতগুলো শোচনীয় দুর্ঘটনা। দুর্ভাগ্যক্রমে আপনিও সে-দুর্ঘটনার হাত একেবারে এড়াতে পারেননি। সেদিন আমি সময়মতো এসে পড়তে না পারলে ও-শয়তান দুটোর গ্রাস থেকে কিছুতেই আপনাকে বাঁচাতে পারতাম না।

কিন্তু আমি কে? সেই পরিচয়টা দেবার জন্যেই এই চিঠিখানা আপনাকে লেখা–এ-থেকেই যা-কিছু ঘটেছে তার রহস্যভেদ হয়ে যাবে। আমি এখানকার সকলের বিভীষিকা আমি কালো হাত।

চমকে উঠবেন না। আমি ভূত নই, প্রেত নই, কিছুই নই। নই যে, তার প্রমাণ ওই আলতা রাঙানো রবারের দস্তানা আর ওই মুখোশ। আজ ওদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তাই আজ থেকে আবার আমি আপনাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ–আমি শ্ৰীমন্ত রায়।

কালো হাত রূপে একটা মানুষকে আমি খুন করেছি। একটা মানুষকে? না–একটা হিংস্র ভয়ঙ্কর পশুকে। তবু আমি নরহত্যা করেছি। এ-পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি করব। কেমন করে–আপনাকে তা জানিয়ে লাভ নেই। শুধু যেটুকু জানাবার, সেটুকুই লিখছি।

আমি শ্ৰীমন্ত রায়। ভদ্রলোকের ছেলে, বিশিষ্ট বনেদি পরিবারে আমার জন্ম, লেখাপড়াও যথেষ্ট শিখেছিলাম। কিন্তু ভদ্রলোকের মতো জীবন যাপন আমি করতে পারিনি, কুসঙ্গে পড়ে অধঃপাতে গেলাম। সুনাম গেল–সব গেল। অথচ টাকার অভাব। দৃশ্চরিত্র লোকের। কোথাও জায়গা জোটে না, আমারও জুটল না। দেনার জ্বালায় মাথার চুল অবধি বিকিয়ে যাচ্ছে, অথচ কোনও উপায় নেই। আমি যেন উন্মাদ হয়ে উঠলাম।

এই পতনের মূলে ছিল বিরিঞ্চি। আর নিতাই সরকার শয়তান, বিশ্বাসঘাতক। এরা দুজনেই আমাকে পাপের পথ দেখিয়ে দিল। অধোগতির যেটুকু বাকি ছিল তাও পূর্ণ হয়ে গেল–চুরি বাটপাড়ি বদমায়েসি সব শুরু করলাম। শেষে কেশবদাস মাগনিরামের সিন্দুক ভেঙে পঁচিশ হাজার টাকা লুঠ করলাম।

সেই টাকার বখরা নিয়ে গণ্ডগোল দেখা দিল। বিরিঞ্চি আর নিতাই যে শয়তান তা আমি জানতাম, কিন্তু কত বড় শয়তান তা আমার জানা ছিল না। বাইরে থেকে আরও একটা বদমায়েসকে সে জুটিয়ে আনল–সে অনাদি। এই অনাদি ও বিরিঞ্চিকে আপনি চেনেন। সেই দুজন–পুলিস-অফিসার সেজে আপনার স্টেশনে এসে জাঁকিয়ে বসেছিল, তারপর আপনাকে খুন করে মেল লুঠ করবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে পরের কথা–আগের ঘটনাই বলা যাক।

ওই তিনটে কাপুরুষ মিলে একটা পোড়ো বাড়িতে পেছন থেকে আমাকে ছোরা মারল। তারপর দরজায় শিকল টেনে দিয়ে পালিয়ে গেল। ওরা নিশ্চিত ভেবেছিল আমি মরে গেছি। আমার আঘাত সাঙ্ঘাতিক হয়েছিল–মরে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক। তবু আমি বাঁচলাম। ভাগ্যক্রমে একটু পরেই ওবাড়িতে আমার একটি বন্ধু এসে পড়ে, বহু সেবাযত্ন করে সে আমাকে বাঁচিয়ে তোলে।

আমি বেঁচে উঠলাম। কিন্তু প্রতিশোধের কথা ভুলতে পারলাম না। খুঁজতে লাগলাম রাক্ষস তিনটেকে। নিতাই সরকার সবচাইতে ধূর্ত, বিরিঞ্চি আর অনাদিকেও সে কলা দেখিয়েছিল। তাই নিতাইয়ের শত্রু দাঁড়াল তিনজন–আমারও তিনজন। আজ আমারই জিত হয়েছে, তিন শতুই নিপাত হয়েছে।

আমি নিতাইয়ের খোঁজে এলাম, সে রাত্রির কথা নিশ্চয় আপনার মনে আছে। তারপর অনাদি আর বিরিঞ্চি এল তাদের কার্যোদ্ধার করতে। আমি দেখলাম, আশ্চর্য যোগাযোগে তিন শতুই আমার মুঠোর মধ্যে এসে পড়েছে। ওরা ওয়েটিং রুমে এসে আস্তানা গাড়লো, ওদের কথাবার্তা শোনবার জন্যে আমাকে কৌশল করে গিরিধারীর পোশাকটা জোগাড় করতে হল। শুনলাম সব, বুঝলাম ওদের মতলব। সেইসঙ্গে এও ঠিক করলাম, হয় ওদের একদিন, নয় আমারই একদিন।

কোথায় থাকতাম আমি? সুন্দরপুর বাজারে–মুসলমান ফকির সেজে রাত্রে বেরোতাম অভিযানে। যেদিন বিরিঞ্চি আর অনাদি ডাক লুঠ করতে এবং আপনাকে খুন করতে চেষ্টা করে, সেদিন বাইরে থেকে গুলি করে আমিই ওদের চক্রান্ত ব্যর্থ করেছিলাম। গিরিধারীকে বাঁচাতে পারিনি, সে-দুঃখ আমার রয়ে গেল। কিন্তু গণেশবাবু, হয়তো আপনার মনে আছে, প্রথমদিন ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলাম আপনাকে পুরস্কার দেব। সে-পুরস্কার দিয়েছি–আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছি সেদিন। আমি খুনি বটে–আমাকে আপনি ঘৃণা করতে পারেন, কিন্তু আপনাকে যে দুটো পিশাচের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছি, এ-গৌরব চিরদিন আমার থাকবে। দুটো পিশাচ। হ্যাঁ, পিশাচ বইকি। কিন্তু পিশাচ হিসেবে বিরিঞ্চির তুলনা হয় না। পাছে বখরা নেয় এই জন্যে আহত অনাদিকে নীলকুঠির জঙ্গলে সে খুন করল। তার মতো বিশ্বাসঘাতক পৃথিবীতে খুব বেশি জন্মেছে বলে মনে হয় না। তারপর ওই নীলকুঠিতেই নিতাই সরকারকে ভয় দেখিয়ে সে চেক লিখিয়ে নিল, নিষ্ঠুরভাবে তাকেও হত্যা করল। ভালোই হল, ষাঁড়ের শত্রু বাঘে মারল। নইলে ও-দুটোকে খুন করার অপরাধও আমাকেই বইতে হত।

তারপর আমার কাজ আমি করলাম। আমি শেষ করলাম বিরিঞ্চিকে। এজন্য অনুতাপ করি না। ও-পাষণ্ডকে ইংরেজের আইন কোনওদিন ছুঁতে পারত না, কাজেই আমাকেই ওর। বিচার করতে হল। অপরাধী হতে পারি, কিন্তু মনে আমার কোনও গ্লানি নেই। যে-পনেরো হাজার টাকার জন্যে এত রক্তপাত, সে-টাকা আমার হাতের মুঠোয়।

কিন্তু ও-পাপের ধনে আমার লোভ নেই। আমি বুঝেছি অন্যায়ের টাকা কত অন্যায়কে টেনে আনে, একটা পাপ কত পাপকে জমিয়ে তোলে। নিতাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতায় আমার চোখ খুলে গেছে। ও-টাকা জনহিতকর প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমি বিলিয়ে দেব–বিলিয়ে দেব মন্বন্তরে মুমূয়ু বাংলাদেশের ক্ষুধিতদের ভেতরে।

কালো হাতের আজ থেকে মৃত্যু হল। শ্ৰীমন্ত রায় নতুন রূপে আজ বাঁচতে চেষ্টা করবে, বাঁচতে চেষ্টা করবে দেশের আর দশের সেবায়। জীবনে কোনওদিন আর আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে না; যদি হয়ও, আপনি আমাকে চিনতে পারবেন না।

আমি জানি এর পরে ওখানে পুলিশি তদন্তের ঢেউ এসে যাবে, বহু নিরীহ লোক অনর্থক হয়রান হবে। আপনি এই চিঠি তাদের দেখাবেন, বলবেন তিনটি মৃতদেহ পাওয়া যাবে নীলকুঠির জঙ্গলে, একটিকে পাওয়া যাবে পুরনো কুয়োটার মধ্যে। সেই-ই বিরিঞ্চিপাপচক্রের নেতা। আর জানবেন, আজ থেকে মানিকপুর সুন্দরপুরের সমস্ত রহস্যের ওপর শেষ যবনিকা পড়ে গেল। আপনাকে আবার ধন্যবাদ–আমার সশ্রদ্ধ নমস্কার। আশীবাদ করবেন, শ্ৰীমন্ত রায়ের হাত থেকে, মন থেকে যেন এই রক্তের দাগ মুছে যায়, যেন সহজ স্বাভাবিক মানুষ হয়ে মানুষের কল্যাণে সে বেঁচে থাকতে পারে। ইতি

শ্ৰীমন্ত রায়।

চিঠিখানা শেষ করে গণেশবাবু দুহাত তুলে নমস্কার করলেন।

অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ (উপন্যাস)

অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ (উপন্যাস) – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

এক – নিদারুণ দুঃসংবাদ

শ্রীমান পিলটু চক্রবর্তীর বয়েস বারো। সে মানুষ হচ্ছিল তার পিসেমশাই আনন্দবাবুর কাছে। রাঁচির নামকুমে।

পিলটু চক্রবর্তী আসলে কলকাতার লোক। কলকাতায় তা মা বাবা রয়েছেন এবং আরও দুটি ছোট ছোট ভাইবোন আছে। কিন্তু আজ চার বছর ধরে পিসেমশাই তাকে নিজের কাছে এনে রেখেছেন। আর কলকাতার ছোট্ট বাড়ি, ঘোট ঘোট পার্ক আর অনেক মানুষের ভিড় থেকে পিসেমশাই-এর কাছে এসে তার চমৎকার দিন কাটছে।

বাড়ির সঙ্গে অনেকখানি জুড়ে মস্ত বাগান। কত রকমের গাছ, কত যে ফুল, তার তো কোনও হিসেবই নেই। উত্তর দিকটায় কয়েকটা ঝাউ আর শিরীষ গাছ এমনি অন্ধকার করে। রেখেছে যে, বিকেলের ছায়া পড়লে পিলটু তো আগে সেদিকে যেতে সাহসই পেত না। কিন্তু এখন আর তার ভয় নেই।

এই জন্যেই ভয় নেই যে, এবার তার জন্মদিনে পিসেমশাই তাকে একটা ভালো দেখে। এয়ার গান কিনে দিয়েছেন।

সাধারণত যেসব এয়ার গান তোমরা উপহার পেয়ে থাকো, এ সে জিনিসই নয়। কর্কের মাথায় একটু বারুদ লাগানো থাকে, ঘোড়া টিপলে দুম করে একটু আওয়াজ হয় আর হাত। দশেক দূরে কর্কটা ছিটকে যায় রামোমোতাকে কি আর বন্দুক বলে! তার ঘা খেলে একটা মাছির বড় জোর মিনিট খানেকের জন্যে দাঁতকপাটি লাগতে পারে, অবিশ্যি যদি মাছিদের দাঁত থাকে। (আমি মাছিদের দাঁত কখনও দেখিনি, তবে দুপুরে ঘুমুলেই যে ভাবে ওরা এসে কুটুস করে আমার লম্বা নাকটার ডগায় কামড়ে দেয়, তাতে সন্দেহ হয়, দু-একটা দাঁত ওদের থাকলেও থাকতে পারে।)

কিন্তু মাছিরা এখন থাক, পিলটুর এয়ার গানের কথাই বলি। সেটা দস্তুরমতো রাইফেল। তাতে একটা হ্যাঁন্ডেলের মতো আছে, তাই দিয়ে হাওয়া পাম্প করে নিতে হয়। তারপর ভরে নাও একটা ছোট্ট সীসের গুলি। (পিলটুকে পিসেমশাই তাও এক বাক্স কিনে দিয়েছেন।) এইবার লক্ষ্য ঠিক করো–ঘোড়া টেনে দাও। একটুখানি শব্দ হল কেবল কটা! ব্যস–দেখতে পেলে টিকটিকিটা মারা পড়েছে, কিংবা চড়ুই পাখিটা ভিরমি খেয়েছে, নয়তো কাকটা কাকারে কাকা-জোরসে লাগা বলে উড়ে পালাচ্ছে, আর নইলে কাঠবেড়ালটা। একেবারে পাঁই পাঁই করে শিরীষগাছের মগডালে গিয়ে উঠেছে।

এই বন্দুকটা হাতে পাবার পর থেকেই আর কথা নেই। ঠিক দুকুর বেলা, যখন ভূতে মারে ঢেলা–চারদিক ঝিম ঝিম করে, বাগানের শিরীষ গাছগুলো ঝির ঝির আর ঝাউগুলো শাঁ শাঁ করে, দুরে সুবর্ণরেখার জল সোনার মতো চিক চিক করে আর বাড়িতে পিসেমশাই, পিসিমা, বুড়ো চাকর গোপাল, ঠাকুর রাম অওতার আর দারোয়ান খুবলাল সিং সবাই ঘুমোয় কিংবা ঝিমোয়, তখনও পিলটু উত্তর দিকের বনের ভেতরে একা একা ঘুরে বেড়ায়। পাখি আর কাঠবেড়াল শিকার করতেও চেষ্টা করে। অবিশ্যি সাতদিনেই কারও শিকারের হাত তৈরি হয় না, তবু এর মধ্যেই একটা কাকের লেজে সে যে গুলি লাগাতে পেরেছিল, সেটাও একেবারে কম কথা নয়।

পুজো সবে শেষ হয়েছে–এখনও সামনে লম্বা ছুটি। পিলটুর মা বাবা-ভাই-বোন পুজোর কদিনের জন্যে রাঁচি বেড়াতে এসেছিলেন, তাঁর কাল আবার কলকাতায় ফিরে গেছেন। কটা দিন খুব হইচই করে কাটিয়ে এখন ভারি ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকছে পিলটুর। শিকারেও আর মন বসছে না। উত্তর দিকের বনের ভিতরে ঢুকে, বন্দুকটা মাটিতে রেখে, একফালি ঘাসের ওপর চুপটি করে শুয়ে ছিল সে। কোথায় ঘুঘু ডাকছিল, এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল সোনা রঙের রোদের টুকরো– পিলটুর মনে হচ্ছিল, সে যেন আফ্রিকার জঙ্গলে তাঁবু খাঁটিয়ে শুয়ে আছে। এখনই হয়তো মস্ত কেশরওয়ালা একটা সিংহ এসে হাজির হবে, আর সে তার রাইফেলটা তুলে–

কিন্তু সিংহের গর্জন শোনা গেল না, কানে ভেসে এল পিসেমশাইয়ের ডাক।

–পিলটু–পিলটু-উ-উ–

–আসছি পিসেমশাই–গলা তুলে সাড়া দিল পিলটু। বন্দুকটা কাঁধে তুলে ছুট লাগাল ঘাসের উপর দিয়ে। বাগানের কৃষ্ণচূড়া গাছটার চারদিকে ঘিরে পিসেমশাই বসবার জায়গা তৈরি করেছেন একটা। রাতে চাঁদ উঠলে কিংবা দক্ষিণের হাওয়া দিলে কখনও কখনও একটা বালিশে আধশোয়া হয়ে পিসেমশাই ওখানে গড়গড়া টানেন আর পিলটুকে গল্প বলেন। সে কত রকমের গল্প! তরাইয়ের জঙ্গলে কীভাবে মাচাং বেঁধে বসে বাঘ শিকার করতেন, কিংবা হাজারিবাগের ফানুয়া-ভালুয়ার জঙ্গলে কেমন করে ভালুকের সঙ্গে হাতাহাতি লড়েছিলেন–সে সব রোমাঞ্চকর কাহিনী পিলটু অনেক শুনেছে! বলতে গেলে পিসেমশাইয়ের মতো শিকারি হতে পারাই তার জীবনের সব চাইতে বড় স্বপ্ন। আজও পিসেমশাই যখন সেই বাঁধানো জায়গায় এসেছেন আর তেমনিভাবে গড়গড়া নিয়ে বসেছেন, তখন নিশ্চয় ভালো গল্প শোনবার আশা আছে।

হাঁপাতে হাঁপাতে পিলটু হাজির হল। ধপাং করে বসে পড়ল পিসেমশাইয়ের কোলের কাছে।

–কী শিকার হল বীরপুরুষ?

–কিচ্ছু না।

–হাতি কিংবা গণ্ডার–কিছুই পাওয়া গেল না? নিদেনপক্ষে একটা গিরগিটি?

–বড় হয়ে মারব হাতি আর গণ্ডার। খুব নামজাদা শিকারি হব তখন–দেখে নিয়ে।

–হুঁ।–আনন্দবাবু প্রসন্ন চোখে একবার পিলটুর দিকে তাকিয়ে মোটা গোঁফজোড়ায় তা দিলেন।

পিলটু আরও ঘেঁষে বসল তাঁর কাছে।

–একটা গল্প বলো না পিসেমশাই!

–কীসের গল্প?

পিলটু বললে–বাঘের।

কিন্তু তারপরেই তার মনে হল, দিনের বেলায় বাঘের গল্প শুনতে ভালো লাগবে না। রাত্তিরবেলা বাইরে ঝাঁ ঝাঁ করে ঝিঁঝি না ডাকলে কিংবা গাছপালায় ঘন অন্ধকার না জমলে, বাঘের গল্পে গা ছমছম করতে চাইবে না।

আনন্দবাবু অল্প-অল্প টান দিচ্ছিলেন গড়গড়ায়। পিলটু বলল–না, বাঘ নয়। তোমার ছেলেবেলার গল্প।

–ছেলেবেলার গল্প?

–হুঁ। আচ্ছা পিসেমশাই, তোমার এয়ার গান ছিল?

সগর্বে আনন্দবাবু বললেন–আলবাত। ছেলেবেলায় কার বা এয়ার গান না থাকে?

–তুমি শিকার করেছ তাই দিয়ে?

–নিশ্চয়। কে বলবে করিনি? তবে আরও অনেক করতে পারতুম, যদি না বাবা সেটা কেড়ে নিতেন।

পিলটুর কৌতূহল বাড়তে লাগল।

–তোমার বাবা বুঝি বন্দুকটা কেড়ে নিয়েছিলেন? কী করেছিলে?

–বিশেষ কিছু নয়। মানে পাড়ার হাড়কৃপণ আর বেজায় খিটখিটে লোক হারুবাবুর চকচকে টাকে একদিন–

বলতে বলতে সামলে নিলেন পিসেমশাই–না, না, সে-সব কিছু নয়। ওকথা এখন থাক। আমি বরং বাঘের গল্পই বলি।

হারুবাবুর চকচকে টাকের প্রসঙ্গে বেশ উৎসাহিত হচ্ছিল পিলটু। প্রতিবাদ করে বলল–না পিসেমশাই, বাঘ নয়। সেই যে কৃপণ আর খিটখিটে হারুবাবু–

–পিলটু!

একটা খনখনে গলা বেজে উঠল কানের কাছেই। দুজনেরই চমক লাগল। পিসিমা এসে হাজির হয়েছেন।

পিসেমশাই গম্ভীর হয়ে গেলেন, পিলটু একবার ভয়ে ভয়ে পিসিমার দিকে তাকাল। পিসিমা মোটেই পিসেমশাইয়ের মতো নন। দারুণ রাশভারী, বেশ চড়া মেজাজ। পিলটুকে ভালোবাসেন না, তা নয়–খুব ভালোবাসেন। কিন্তু সময় মতো পড়তে না বসলে কিংবা একটু গণ্ডগোল করলেই–সঙ্গে সঙ্গে রামবকুনি!

পিসিমার মুখের দিকে তাকিয়েই পিলটুর বুঝতে বাকি রইল না, পিসিমার মেজাজ এখন ঠিক নেই। পিসিমা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ লক্ষ করলেন তাকে।

–পিলটু, একবার বাড়ির ভিতরে যাও। তোমার পিসেমশাইয়ের সঙ্গে আমার কথা আছে।

পিলটু আর দেরি করল না। তক্ষুনি বন্দুকটা নিয়ে সুড়ুৎ করে বাড়ির ভিতরে হাওয়া হয়ে গেল।

কাঠগড়ার আসামীর দিকে জজসাহেব যেমন করে তাকিয়ে থাকেন, তেমনি করে পিসেমশাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন পিসিমা। তারপর–

–তুমি ওকে এয়ার গান কিনে দিয়েছ কেন?

–ছেলেমানুষ বলে। নিজে তো আর কিনতে পারি না–লোকে পাগল বলবে।

পিসিমা কড়া গলায় বললেন–থামো। ঠাট্টা করতে হবে না। একে তো দুষ্টু ছেলে–তায় বন্দুক হাতে পেয়ে রাতদিন হইচই করে বেড়াচ্ছে। জোর করে কাছে এনে রেখেছ, যদি লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে না পারে, তা হলে রমেনের কাছে কৈফিয়ত দেবে শুনি?

রমেন পিলটুর বাবার নাম।

–ও ঠিক মানুষ হবে, তুমি ভেব না–আনন্দবাবু গড়গড়ায় টান দিলেন।

–ছাই হবে। পিসিমা ঠোঁট ওলটালেন–একেবারে বাঁদর হয়ে যাচ্ছে। ও-সব চলবে। আমি খগেনকে চিঠি লিখে দিয়েছি, সে কালই আসছে।

–খগেন পিসেমশাই চমকে সোজা উঠে বসলেন।

–হ্যাঁ, খগেন।–পিসিমার স্বর আরও কঠোর।

পিসেমশাই একবার খাবি খেলেন–খগেন কেন আসবে?

–সব ম্যানেজ করবার জন্যে। আমার মামাতো ভাইয়ের শালার বন্ধু বলেই বলছি না–ছেলেটি সব দিক থেকেই খাসা। বিলেত থেকে ফিরে এসেও কেমন ধার্মিক ব্রাহ্মণ—

–ধার্মিক হয়েছে তিন বার ব্যারিস্টারি ফেল করেছে বলে, আর বাপ লাঠি নিয়ে তাড়া করেছিল, সেই জন্যে।

পিসিমা ধমক দিয়ে বললেন–চুপ করো। আমি খগেনকে চিঠি লিখেছিলুম। কালই সে আসছে। আর শুধু যে আসছে তা-ই নয়। এখন থেকে এখানেই সে থাকবে।

এখানেই থাকবে। পিসেমশাই আবার খাবি খেলেন–খগেন থাকবে? সেই যে শেষরাতে উঠে বেসুরো কালীকীর্তন গায়, চারবার স্নান করে, গঙ্গাজল দিয়ে মুরগি খায় আর রাতদিন বলে ব্যায়াম করুন। সকালে ব্যায়াম, দুপুরে ব্যায়াম, বিকেলে ব্যায়াম, সন্ধেয় ব্যায়াম, মাঝরাত্তিরেও ব্যায়াম। একবার দিল্লিতে সাতদিন আমার বাসায় ছিল, ব্যায়ামের উপদেশে শক্ত ব্যারামে পড়বার জো হয়েছিল আমার!

–ভয় নেই, তোমাকে ব্যায়াম শেখাবে না। পিলটুর জন্যেই সে আসছে।

–বেচারা!

পিসিমা ভ্রূকুটি করে বললেন–তুমি তো ছেলেটার মাথা খাচ্ছ, দেখি খগেন এসে ওকে বাঁচাতে পারে কি না!

–বাঁচাবে? মেরে ফেলবে!

পিসিমা গর্জন করে বললেন হয়েছে, আর দরকার নেই। আমি যা বলছি তা-ই শোনো। খগেন আসবেই–কেউ তাকে ঠেকাতে পারবে না।

বলে, পিসিমা চলে গেলেন।

হা হতোস্মি! মানে–গেলুম! পিসেমশাই মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন সেখানেই।

.

দুই – দুবলাল সিংয়ের অ্যাডভেঞ্চার

খুবলাল সিং আনন্দবাবুর দারোয়ান।

ভালো মেজাজের লোক। খায়-দায়, লাঠি কাঁধে এদিক ওদিক চক্কর দেয়, ফাইফরমাস খাটে। ভালো মনিব, সুখের চাকরি। কিন্তু সম্প্রতি সে খুব মুস্কিলে পড়েছে।

মুস্কিল আর কিছু নয়–দেশ থেকে তার ভাইপো দুবলাল সিং এসে হাজির হয়েছে। নামের সঙ্গে আশ্চর্য মিল। খুবলাল বেশ লম্বাচওড়া জোয়ান, কিন্তু খাস হিন্দুস্থানী হয়েও দুবলাল একেবারে প্যাঁকাটির মতো রোগা। গুণের মধ্যে কেবল ঘুমুতে পারে আর ছারা–র‍্যা র‍্যা বলে হোলির ছড়া কাটতে পারে।

খুবলালকে দুবলাল চেপে ধরেছে। একটা চাকরি তাকে পাইয়ে দিতে হবে।

শুনে, গোঁফে চাড়া দিয়েছে খুবলাল।–চাকরি আছে, বেশ ভালো চাকরি। সম্প্রতি মাইল কয়েক দূরে একটা বড় ফলের বাগান কিনেছেন আনন্দবাবু। কলা, আমরুদ (পেয়ারা), পিচফল, আর আনারস সেখানে বিস্তর ফলে। কিন্তু বাঁদরেই খায় আর চুরিও যায়। সেই বাগান পাহারা দেবার জন্যেই লোক দরকার। আরামে থাকতে পারবে, পেট ভরে ফলও খেতে পারবে।

দুবলালের চোখ চকচকিয়ে উঠেছে।

–তা হলে ওটা আমারই চাই। পাইয়ে দাও চাচা।

–তোকে?–চোখ বাঁকা করে তাকিয়েছে খুবলাল।

–কেন? আমি পারব না?

–পারবি না কেন? খেতে তুই ভালোই পারবি। তোর মতো একটা ধেড়ে বাঁদর থাকতে ছোটখাটো বাঁদরেরা গাছের একটা ফলও ছুঁতে পারবে না সে আমার বেশ মালুম আছে। কিন্তু বাবু তোকে নেবে না।

–কেন নেবে না?–দুবলাল ব্যথা পেয়েছে মনে। বলেছে–তামাম হাজারিবাগ জিলায় আমার মতো হোলির ছড়া কে কাটতে পারে, শুনি?–এই বলে কানে হাত দিয়ে সুর ধরেছে—ছ্যা-রা-রা-রা। আরে, বৃন্দাবন কি বন্‌মে ডোলে-ডোলে বনোয়ারী—হাঁ—ছ্যা–রা–

–বাস্, খামোশ।–হাউমাউ করে উঠেছে খুবলাল–আর চেঁচালে বাবু এখুনি তোকে-আমাকে বাড়ির চৌহদ্দি থেকে বার করে দেবে। আরে, ওতে চিড়ে ভিজবে না। খুব একটা জোয়ান কি–মানে জব্বর কোনো পালোয়ানী দেখাতে পারলে তবেই। কিন্তু এই তো একটা মুসা ভি মারতে পারিস না। কে চাকরি দেবে তোকে?

–তা হলে অত আমরুদ, কলা, পিচফল আর অমন একটা খাসা চাকরি ফসকে যাবে চাচা?–বলতে বলতে প্রায় কেঁদে ফেলেছে দুবলাল।

তখন গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ ভেবেছে খুবলাল। চারবার গোঁফে তা দিয়েছে, তিনবার টিকিতে গিঠ দিয়েছে আর খুলেছে। তারপর বলেছে–হাঁ, মতলব এসেছে একটা।

–কী মতলব?

–গিন্নীমা আর বাবুর খুব চোরের ভয়। আজ রাতে তুই বাগানে ঢুকে নীচের জানলার একটা কাঁচ ভেঙে ফেলবি।

–খামকা শিসা টুটিয়ে দিব?

–খামকা কেন রে বুদ্ধ? তুই শিসা ভাঙলেই ঝনঝন করে আওয়াজ উঠবে। তখন আমি কাঁহা চোট্টা কাঁহা চোট্টা বলে দৌড়ে বেরুব। আর তুই একটা লাঠি হাতে করে এসে বলবি, আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম, তাইতেই চোট্টা হায় বাপ বলে ভাগলপুরমে ভাগ গিয়া। বাস, কাজ হাসিল!

খানিকক্ষণ ভেবেছে দুবলাল। শেষে ঘাড়-টাড় চুলকে বলেছে–তব ঠিক হ্যায়।

সেদিন রাত্রে আনন্দবাবু বিষণ্ণ হয়ে ডেক-চেয়ারে শুয়ে আছেন। খগেন আসর্বে–এই চিন্তাই তাঁর মাথার ভিতরে একটা নিদারুণ দুঃস্বপ্নের মতো ঘুরছে। আর হয়তো এসেই কালীকীর্তন জুড়ে দেবে। বলবে–এখন হাফপ্যান্ট পরুন, তখন মাথা নিচু করে শূন্যে দাঁড়িয়ে থাকুন পা তুলে। আর, শেষরাতে উঠে পাকা এক পো ছোলা খান।

তা হলে আনন্দবাবু আর নেই!

আর পিলটু? সে তো নেহাত বেঘোরেই মারা যাবে!

কিন্তু গিন্নীকে কিছু বলবার জো নেই। আনন্দবাবু তাঁকে যমের মতো ভয় পান।

গিন্নী এখনও ঘরে আসেননি, নীচের ঘরে কী নিয়ে যেন চেঁচামেচি করছেন। খগেনের হাত থেকে কী করে উদ্ধার পাওয়া যায় এই দুশ্চিন্তায় যখন তাঁর মাথা ঘুরছে, সেই সময় বাড়ির পুরনো চাকর গোপাল তাঁর রোজগার বরাদ্দ দুধের গ্লাস নিয়ে এসে হাজির হল।

আনন্দবাবু একবার আড়চোখে তাকালেন। দুধ খেতে তাঁর একেবারে ভালো লাগে না, কিন্তু গিন্নীর শাসনে মুখ ফুটে সে কথা বলবার জো নেই।

–আজ দুধটা না-ই খেলুম গোপাল।

–তা হলে গিন্নীমাকে গিয়ে বলি সে কথা।–গোপালের স্বর গম্ভীর।

–থাক, থাক, দে—

যেমন করে লোকে কুইনিন মিকশ্চার খায়, তেমনি ভাবেই দুধটা খেতে হল আনন্দবাবুকে। তারপর কাতরদৃষ্টিতে গোপালের দিকে তাকালেন তিনি।

–শুনেছিস?

নেপাল কম কথা বলে। সংক্ষেপে জবাব দিল–শুনেছি।

–কী শুনেছিস?

–খগেনবাবু আসছেন।

–তাকে মনে আছে তোর?

–তেনাকে কে ভুলবে বাবু? রাত্তির পোয়াতে না পোয়াতে সেই বাজখাই গলার গান, কানে তালা ধরে যেত। তার ওপর পেস্তার শরবত বানাতে বানাতে আমার হাড় কালিয়ে যেত।

–হুঁ–গোপালের মুখের দিকে চেয়ে আনন্দবাবু বললেন কী করা যায় বল তো?

–এজ্ঞে ভগবানকে ডাকুন, তিনিই ভরসা।

আনন্দবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

–সবাই বলে, ভগবান ভরসা। কিন্তু ভগবানও খগেনকে ভয় পান।

গোপাল বলল–আচ্ছা, পরে দেখা যাবে। এখন শুয়ে পড়ুন।

হতাশ হয়ে আনন্দবাবু বললেন–তাই যাই, শুয়েই পড়ি। কিন্তু ঘুম কি আর আসবে?

ঘুম কিন্তু এল। শোবার দশ মিনিটের মধ্যেই আনন্দবাবুর নাক ডাকতে লাগল।

সেই নাকের ডাক অনুসরণ করেই বাগানের ভিতর গুটি গুটি পায়ে এগোচ্ছিল দুবলাল সিং। আর একটু এগোলেই জানলা। একখানা কাঁচ ভেঙে ফেলবার ওয়াস্তা। তারপরেই কেল্লা ফতে! পেয়ারা, কলা, আনারস আর পিচফলের কথা ভাবতে গিয়েই জিভের ডগায় তার জল আসছে।

আর ঠিক সেই সময় শ্রীমান পিলটু চক্রবর্তীর ঘুম ভাঙল।

পিলটু স্বপ্ন দেখছিল। এয়ার গান নয়, রাইফেল হাতে নিয়ে আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে শিকার করতে বেরিয়েছে। দূরে গরিলার হাঁক শোনা যাচ্ছে, মাথার উপর অন্ধকার বাওবাব। গাছের ডালে লেজ জড়িয়ে মাথা ঝুলিয়ে শিকারের অপেক্ষা করছে পাইথন, আওয়াজ তুলছে শোঁ শোঁ। হায়নারা হেঁকে উঠছে থেকে থেকে, গরগর শব্দে কোথায় ঝগড়া করছে চিতা বাঘ। এমন সময় কোত্থেকে হুম্ করে একটা সিংহ একেবারে সামনে এসে হাজির।

সিংহটাকে রাইফেল দিয়ে গুলি করতে যাবে, হঠাৎ দেখে হাতে রাইফেল তো নেই, রয়েছে একটা চকোলেট। সর্বনাশ!

আর তখনি সিংহ পরিষ্কার মানুষের গলায় বলল–দাও না হে, চকোলেটটা খাই!

বলতে বলতেই সিংহের মুখটা সুকুমার রায়ের হ্যবরল-এর ব্যাকরণ সিংয়ের মতো হয়ে গেল। দারুণ চমকে জেগে উঠল পিলটু। জেগে উঠল আফ্রিকার জঙ্গলে নয়, নিজের ঘরে, বিছানার উপর। দেখল, ঘরে নীল বাবের আলো জ্বলছে আর টেবিলে পড়ে রয়েছে তার এয়ার গানটা।

কিন্তু বাইরে কেমন একটা খস খস শব্দ হচ্ছে না? মনে হচ্ছে বাগানের ভিতর কে যেন চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে! টুপ করে বিছানা থেকে নেমে পড়ল পিলটু। চলে এল জানলার কাছে।

পরিষ্কার দেখতে পেল, একটা টর্চের আলো বাগানের মধ্যে জ্বলেই নিবে গেল সঙ্গে সঙ্গে। আর চোখে পড়ল, ঝোঁপের আড়ে আড়ে কে যেন এগোচ্ছে ছায়ার মতো।

নিশ্চয় চোর! বাগানে চোর ঢুকেছে।

চট করে টেবিল থেকে এয়ার গানটা তুলে নিল পিলটু।

দুবলাল সিং চুপি চুপি এগোচ্ছিল। আর একটু–আরও একটু হ, এইবার। কাঁচের ওপর একটা ঘা বসিয়ে দিতে পারলেই–

–খটাস—

জানলায় পিলটুর এয়ার গানের শব্দ হল।

–আরে দাদা–মর গইরে–

নাকে এসে লেগেছে এয়ার গানের গুলিটা। টর্চ আর লাঠি ফেলে দুই লাফে দুবলাল সিং হাওয়া হয়ে গেল।

–চোর-চোর-চোর—

আর ওদিকে দুবলালের কান ধরে ঠাঁই ঠাঁই করে দুটো চাঁটি বসিয়ে তাকে খাঁটিয়ার তলায় চালান করে দিল খুবলাল। দাঁতে দাঁত ঘষে বলল–সব গড়বড় কর দিয়া–বুদ্ধু কাঁহাকা!

.

তিন – খগেনের আগমন

কালী গো, কেন ন্যাংটা ফেরো,
শ্মশানে মশানে ফেরো–

সকাল বেলায় বাইরের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন আনন্দবাবু। সবে চা খেয়েছেন, মুখে গড়গড়ার নল–মেজাজটা বেশ খুশিই আছে আপাতত। এমন কি, একটু আগেই বাড়ির সামনে ঘটঘট আওয়াজ করে যে একটা মোটর সাইকেল এসে থেমেছে, সেটা। পর্যন্ত শুনতে পাননি। কিন্তু বিকট ওই গানের শব্দটা তাঁর কানের কাছে বোমার আওয়াজের মতো ফেটে পড়ল।

তাকিয়ে দেখলেন–খগেন!

একেবারে নির্ভুলভাবে খগেন–আদি এবং অকৃত্রিম! গায়ে ধুসো একটা গলাবন্ধ কোট, মুখভর্তি গোঁফদাড়ি, কপালে সিঁদুরের ফোঁটা, ষাঁড়ের মতো এক বিরাট জোয়ান। তারই গলা থেকে বেরুচ্ছে এই রাসভরাগিণী–কালী গো, কেন ন্যাংটা ফেরো–

যেন ভূত দেখেছেন, এমনি ভাবে চেয়ে রইলেন বেচারি আনন্দবাবু।

আমাকে চিনলেন না? ঝাঁটা গোঁফের ভেতর থেকে সারি সারি লাউয়ের বিচির মতো দাঁত বের করল খগেন–আমি খগেন। খগেন বটব্যাল।

–বিলক্ষণ! তোমাকে না চিনে উপায় আছে?

–আনন্দবাবুর মুখোনা হাঁড়ির মতো দেখাল।

–আমি আসাতে আপনি নিশ্চয় খুব খুশি হয়েছেন?–খুশি হওয়ার কারণ দেখছি না।

–দেখছেন না?–খগেন কিছুমাত্রও দমে গেল না–তা আপনি খুশি না হলেও কিছু আসে যায় না। কাকিমাই আমায় চিঠি দিয়েছিলেন। তিনি খুশি হবেন।

–অঃ।

খগেন ঘড়ঘড় করে একটা চেয়ার টেনে এনে ধপাৎ করে বসে পড়লকাকিমার চিঠিতেই জানলুম, এখানে আমাকে নাকি দারুণ দরকার। আমি অবশ্য আজকাল কালী সাধনায় মন দিয়েছি, বিষয়-আশয়ের দিকে ফিরে তাকাইনে। তবু কাকিমা ডেকে পাঠিয়েছেন। ভাবলুম, মায়ের ইচ্ছে, তাই এলুম।

–তা বেশ!

খগেন এবার খবরের কাগজটার দিকে তাকাল।

–কী পড়ছেন ওটা? কাগজ? ছছঃ! কেন যে ওসব বাজে জিনিস পড়ে সময় নষ্ট করেন। বরং সকালে উঠে এক মনে মোহ-মুদগর পড়বেন, দেখবেন, চিত্ত পবিত্র হয়ে যাবে। শুনুন–নলিনী দলগত জলমতি তরলং, তদ্বৎ জীবন অতিশয় চপলং–অর্থাৎ বুঝলেন কিনা, পদ্মপাতায় যেমন জল, এই জীবনও তেমনি অত্যন্ত–কী বলে–

আনন্দবাবু বললেন–কিছুই বলে না।

–বলে না? মানে?–খগেন চটে উঠল–আলবাত বলে।

–তা হলে বলে!–আনন্দবাবু কাতর হয়ে উঠলেন–কিন্তু তুমি আর কিছু বোলো না। যেটুকু বলেছ, তাতেই আমার মাথা ঘুরছে।

–ঘুরছে নাকি? খগেন খুশি হল–তা হলে আপনার হবে।

–কী হবে?–আনন্দবাবু চমকে গেলেন।

–জ্ঞান। জ্ঞান যত বাড়তে থাকবে, ততই মাথা ঘুরবে, কান কটকট করবে, দাঁত কনকন করবে, গাঁটে গাঁটে বাত দেখা দেবে বলতে বলতে আনন্দে খগেনের গোফদাঁড়ি সব যেন নাচতে শুরু করে দিল।

উঠে ছুটে পালাবেন কিনা ভাবছিলেন আনন্দবাবু, এমন সময় পিলটুর পিসিমা এসে গেলেন।

–এই যে খগেন। কখন এলি?

–এইমাত্র। কাকাবাবুর সঙ্গে শাস্ত্র আলোচনা করছিলুম।

–আচ্ছা, সে পরে হবে। এখন হাতমুখ ধুয়ে জলখাবার খাবি আয়।

–জলখাবার? দি হোলি মাদার-এর উপাসনা–মানে কালীকীর্তন না করে তো জলস্পর্শ করিনে কাকিমা!

–তবে কালীকীর্তন সেরে নে। আমি তোের খাবারের ব্যবস্থা করি।

–চলো তবে।–খগেন উঠে পড়ল–তবে আমি সামান্যই জলখাবার খেয়ে থাকি। মানে, সকালে ছটা মুরগির ডিম, বারো খানা টোস্ট, চারটে আপেল আর ছটা সন্দেশ হলেই আমার চলবে, কাকিমা।

আনন্দবাবু একটা বিষম খেলেন।

–তুমি কালীভক্ত হয়ে মুরগি খাও?

ঝাঁকড়া দাড়িগোঁফের আড়ালে আবার লাউয়ের বিচি বেরিয়ে এল। মানে, খগেন হাসল।

–আপনি দেখছি শাস্ত্র কিছুই জানেন না, কাকা! সংসারের কোনও জীবকেই ঘৃণা করতে নেই। সব সমান।

–অঃ!

গিন্নী একবার কটমট করে তার দিকে তাকালেন।

–খগেনের সঙ্গে শান্তর নিয়ে তুমি আর তক্কো করে না বাপু। সারাটা জীবন তো চাকরি করলে আর ইংরেজি বই পড়লে। শান্তরের তুমি কী জানো?

–কিছু না! কিছু না!–বলে আনন্দবাবুকে নস্যাৎ করে দিয়ে খগেন তার কাকিমার সঙ্গে কালীকীর্তন গাইতে চলে গেল।

আনন্দবাবু সেই ভাবেই বসে রইলেন। খগেন এসেই তাঁকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। ছটা ডিম, বারোটা টোস্ট, চারটে আপেল আর ছটা সন্দেশ দিয়ে যার প্রাতরাশ শুরু হয়, রাতের বেলা সে মানুষ ধরে খেতে চাইবে এমনি একটা গভীর আশঙ্কা দেখা দিল তাঁর মনে।

কিছুক্ষণ পরেই বন্দুক হাতে পিলটুর প্রবেশ।

–পিসেমশাই?

–কী খবর পিলটু?

–ও লোকটা কে পিসেমশাই? ওই যে মুখভরা দাড়িগোঁফ আর বিকট গলায় গান গাইছে?

আনন্দবাবু চিচি করে বললেন–খগেন।

–কে খগেন?

–ও তোমার পিসিমার মামার শালার মাসতুতো ভাইয়ের কীসের যেন কী হয়। কিন্তু আসলে ও হল খগেন। ভয়ঙ্কর খগেন।

–খগেন কী করে পিসেমশাই?

–তিনবার ব্যারিস্টারি ফেল করে। ক্যাশিয়ার হয়ে দুটো ব্যাঙ্ক ফেল করায়। কালীকীর্তনের নামে বেসুরো গলায় গাঁক গাঁক করে চেঁচায়। গঙ্গাজল দিয়ে মুরগি রাঁধে। আর পিলটুকে পড়ায় আর ব্যায়াম করায়।

শুনে পিলটু দারুণ চমকে উঠল।

–কী বললে? আমাকে পড়াবে আর ব্যায়াম করাবে? এই পুজোর ছুটিতে?

–সেই জন্যেই এসেছেন।

–কক্ষনো না!–পিলটুর গলায় জ্বালাময় প্রতিবাদ–কী অন্যায়। ছুটির মধ্যে পড়তে আমার বয়ে গেছে!

–পড়তেই হবে। তুমি না পড়লেও দেখবে ও তোমায় পড়িয়ে ছাড়বে।

–দেখি, কেমন করে পড়ায়। ভারি বিচ্ছিরি কিন্তু ওই খগেন।

–খুব সম্ভব।

–আর কী বাজে ওর গোঁফ। এমন গোঁফ তো রাখত জানি শ্যামবাবুদের গয়লা–

আনন্দবাবু বললেন–ছিঃ, মাস্টারকে বলতে নেই ওসব।

–মাস্টার না হাতি!

–পিলটু!

পিসিমা এসে ঢুকলেন। আনন্দবাবু তক্ষুনি কাগজটা তুলে নিলেন–পড়তে লাগলেন এক মনে। আর পিলটু দাঁড়িয়ে রইল কাঠ হয়ে।

চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে কড়া চোখে পিসিমা কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন পিলটুর দিকে।

–সকাল থেকেই বন্দুক নিয়ে বেরিয়েছ? পড়াশুনো তোমার কিছু হবে?

–হবে পিসিমা। রাত্তির হলে।

–সে তো দেখতেই পাচ্ছি কদিন ধরে। চলো এখন।

–কোথায়?

–তোমার মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে আলাপ করবে।

করুণ চোখে পিলটু একবার পিসেমশাইয়ের দিকে তাকাল। পিসেমশাই একবার তাকালেন মাত্র। তারপর কাঁচপোকা যেমন করে তেলাপোকাকে টেনে নিয়ে যায়–তেমনি করে পিসিমার পিছন পিছন প্রস্থান করল পিলটু।

আনন্দবাবু কেবল বলতে পারলেন–বেচারা!

কিন্তু দুর্ঘটনাটা ঘটল ঘন্টা দেড়েক পরেই।

পিলটু তখন খগেনের পাল্লায় পড়েছে। আর খগেন তাকে জ্ঞান দান করছে প্রাণপণে।

–বিদ্যেটা পরে, আগে আত্মার উন্নতি। তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে, তোমার আত্মা অত্যন্ত ছটফটে। তা হলে তো চলবে না। অশান্ত আত্মা হচ্ছে জলের মতো তরল, তাকে আইসক্রিমের মতো জমিয়ে ফেলা দরকার। আর আইসক্রিম…ও কী? কী দেখছ ওদিকে?

–একটা হলদে পাখি।

–না, হলদে পাখি নয়। আত্মা হচ্ছে তা হলে আইসক্রিম। আর—

–আমি আইসক্রিম খাব।

–শার্ট আপ–খগেন চটে গিয়ে পিলটুর কান ধরে মোচড় দিল একটা–খাওয়ার কথা পরে। এখন শোনো। আইসক্রিম করে কী দিয়ে? বরফ। আত্মাকে জমাতেও বরফ চাই। সে বরফ কী? আধ্যাত্মিক ব্যায়াম। বুঝেছ?

রাগে পিলটুর সর্বাঙ্গ জ্বলছিল। পিসেমশাইয়ের কাছে আসবার পর থেকে কেউ তার গায়ে কখনও হাত দেয়নি। খগেনের কানমলা খেয়ে চোখ ফেটে জল আসছিল তার।

খগেন বলল–বোঝোনি? আচ্ছা, বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই যে কাঁকড়া বিছের মতো হাত-পা ছড়িয়ে দিলুম একে বলে বৃশ্চিকাসন।বলতে বলতে নিচু হয়ে পিছনের একটা পা লেজের মতো উপরে তুলে খ্যাঁক করে লাফ দিল খগেন–এর নাম মর্কটাসন–

কিন্তু পিলটু চক্রবর্তী আর অপেক্ষা করল না। এয়ার গান তুলে খগেনের পিঠের দিকে তাকালে।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে আর একবার মর্কটের মতো লাফাল খগেন। বলতে লাগল–এই আসন যদি ঠিকমতো করা যায়–

–খটাস—

এয়ার গানের গুলি এসে লাগল খগেনের পিঠে।

–বাপরে—

এবার আর মর্কট লাফ নয়–একেবারে সমুদ্রলঙ্ঘন লক্ষ দিল খগেন। আর সেই সুযোগে তীরবেগে বন্দুক কাঁধে করে বনের মধ্যে উধাও হয়ে গেল পিলটু।

.

চার – ঝড়ের কালো মেঘ

আনন্দবাবুর একটু ঝিমুনি এসেছিল।

স্বপ্ন দেখছিলেন, খগেন রক্তবস্ত্র পরে একটা খাঁড়া হাতে করে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। বলছে—হুঁ—হুঁ–মুরগিতে কুলোবে না, নরমাংস খাব!

–দোহাই বাপু, আমাকে খেয়ো না–চেঁচিয়ে আনন্দবাবু এই কথা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় কে যেন ডাকল : বাবু! চোখ মেলে আনন্দবাবু দেখলেন, গোপাল।

–এগুলো সব আপনার ঘরে থাকবে। পিলটুবাবুর বন্দুক আর টোটা।

–এখানে থাকবে কেন?–আনন্দবাবু আশ্চর্য হলেন।

–গিন্নীমা পাঠিয়ে দিয়েছেন।

আনন্দবাবু বিরক্ত হয়ে উঠলেন–আহা-হা, ছেলেমানুষ! ওরটা অমন করে কেড়ে নেওয়া কেন! ভারি অন্যায়!

–সেসব গিন্নীমা জানেন।

বলতে বলতেই পিলটুর পিসিমা এসে ঢুকলেন। গোপাল এক পাশে সরে দাঁড়াল।

আনন্দবাবু বললেন–তুমি পিলটুর বন্দুক—

পিলটুর পিসিমা ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন–সেই কথাই বলতে এসেছি। আদর দিয়ে মাথাটা তুমি খেয়ে দিয়েছ একেবারে। একদম গোল্লায় পাঠিয়েছ।

–কাকে? খগেনকে?

–খগেন গোল্লায় যাবে কেন? খাসা ছেলে। তার মাথা খাবারই বা তুমি কে? আমি পিলটুর কথা বলছি।

–অঃ!

–জানো, পিলটু কী করেছে?

–কী?

–এয়ার গান দিয়ে খগেনের পিঠে গুলি করেছে।

–কী সর্বনাশ!–আনন্দবাবু আঁতকে উঠলেন।

ধিক্কার-ভরা গলায় পিলটুর পিসিমা বলে চললেন–খগেন ওকে আধ্যাত্মিক ব্যায়াম শেখাচ্ছিল, সেই ফাঁকে এই কাণ্ড। খগেনের সঙ্গে যখন ওর আলাপ করিয়ে দিই, তখনই ওর চোখমুখের চেহারা দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিল। একেবারে বাঁদর হয়ে গেছে ছেলেটা। রমেনকে কী বলবে শুনি?

আনন্দবাবু মাথা চুলকোতে লাগলেন।

–যাই হোক, পিলটুর ব্যবস্থা আমি করছি। আপাতত এই টোটা আর বন্দুক জমা রইল তোমার কাছে। খবরদার, পিলটুর হাতে যেন না যায়। খেয়াল থাকবে?

–থাকবে।

গিন্নী ঘর কাঁপিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বন্দুকটার দিকে কিছুক্ষণ করুণ চোখে চেয়ে রইলেন আনন্দবাবু। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর। বেচারি পিলটু।

গোপাল তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। বন্দুকটা হাতে তুলে নিয়ে আনন্দবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন–ছেলেবেলায় কখনও এয়ার গান ছুঁড়েছিস গোপাল?

–এজ্ঞে ছুঁড়িছি।

–পেলি কোথায়?

–এজ্ঞে, গাঁয়ের জমিদারের ছেলের একটা ছেলে। তা তিনি মোটে তাক করতে পারত না। আমি তেনার বন্দুক নিয়ে দনাদন শালিক পাখি, কাঠবেড়ালী এই সব মেরে দিতাম।

–আমারও বন্দুক ছিল। নিখুঁত তাক ছিল আমার। কুড়ি হাত দূর থেকে আরশোলা মারতে পারতুম। সবাই বলত, হ্যাঁ, হাত বটে খোকনের।

–আমারও খুব তাক ছিল এজ্ঞে। গোপাল জবাব দিল।

–আমার মতো নয়। গোপাল কী বলতে যাচ্ছিল, দূর থেকে গিন্নীর ডাক এল-গোপাল-গোপাল

–যাই এজ্ঞে, মা-ঠান ডাকছেন।

বন্দুকটা কোলে করে আনন্দবাবু বসে রইলেন কিছুক্ষণ। হঠাৎ চোখে পড়ল, দরজার বাইরে কাতরভাবে পিলটু দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে।

–পিলটু। এসো এখানে।

চোরের মতো পিলটু এসে ঘরে ঢুকল।

–খগেনকে গুলি করেছ?

পিলটু চুপ।

–খুব অন্যায় করেছ।

–ও মিছিমিছি আমার কান মলে দিলে কেন?

–গুরুজনেরা ও রকম মিছিমিছিই কান মুচড়ে দেয়।

–গুরুজন না ঘোড়ার ডিম!–পিলটু ঠোঁট ওলটাল।

–ছিঃ, বলতে নেই ওসব।

পিলটু গোঁজ হয়ে রইল।

আনন্দবাবুর কৌতূহল বাড়তে লাগল।

–ঠিক পিঠে মেরেছ খগেনের?

–হুঁ, পিসেমশাই।

–কত দূর থেকে?

–এই হাত পাঁচেক।

–মোটে? আমি কুড়ি হাত দূর থেকেও সোজা ওর নাকে মারতে পারতুম। কথাটা বলেই আনন্দবাবু লজ্জা পেয়ে, ঘুরিয়ে নিলেন কথাটা তাড়াতাড়ি।

–খুবই অন্যায় করেছ পিলটু।

–হুঁ।

–তোমার বন্দুক তো বাজেয়াপ্ত। এখন কী করছ?

পিলটু গোঁ গোঁ করে বললে–পিসিমা ত্রিশের প্রশ্নমালা থেকে আঠারোটা শক্ত শক্ত প্রশ্নের অঙ্ক কষতে দিয়েছে।

–কপাল!–সহানুভূতিভরা গলায় আনন্দবাবু বললেন করো গে যাও।

–ওই খগেনটা কেন এল পিসেমশাই?–পিলটু আবার গজগজ করতে লাগল–ও না। এলে তো কোনও গণ্ডগোল হত না।

–চুপ—চুপ!–সভয়ে আনন্দবাবু পিলটুকে থামিয়ে দিলেন–তোমার পিসিমা শুনতে পেলে আঠারোর জায়গায় আটান্নটা অঙ্ক চাপিয়ে দেবেন তোমার ঘাড়ে। এখন যাও, লক্ষ্মীছেলের মতো আঠারোটাই কষে ফেলো।

পিলটু চলে গেল।

আনন্দবাবু বন্দুকটা হাতে করলেন। তাঁর চোখ দুটো অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। স্মৃতির সামনে ময়মনসিংহের সেই ছেলেবেলার দিনগুলো ভাসছে। একটা মস্ত মাঠের ভিতর বড় বড় সবুজ ঘাস চামরের মতো দুলছে। সেই ঘাসবনে আনন্দবাবু ঘুরছেন বন্দুক হাতে। ওই তো একটা মেটে রঙের মস্ত খরগোশ! তাক করলেন, ঘোড়া টিপলেন, তারপর–

মনটা ফিরে এল বর্তমানের ভেতর।

হাতের তাক তাঁর তো যায়নি। বড় হয়ে শিকার করেছেন সুন্দরবনে, হাজারিবাগের জঙ্গলে। এয়ার গানের লক্ষ্যও কি তাঁর ব্যর্থ হবে?

ঘরের কোণে টেবিলের উপর মাটির তৈরি একটা বুড়োর মূর্তি। আনন্দবাবু বসা অবস্থাতেই সেটাকে লক্ষ্য করে ঘোড়া টিপলেন।

–খটাস।

মুর্তিটার বাঁ কান উড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

–ইউরেকা! পেয়েছি!–উল্লাসে দাঁড়িয়ে উঠলেনব আনন্দবাবু–সেই ছেলেবেলার নিখুঁত তাক এখনও আছে। কিন্তু আরও ভালো করে যাচাই করতে হচ্ছে। কী করি? কী মারব?

বন্দুক হাতে করে ছেলেমানুষের মতো এগিয়ে গেলেন তিনি জানলার কাছে।

.

বাগানের ভিতরে বসে পরমানন্দে তখন মুরগি ছাড়াচ্ছিল খগেন। গলা দিয়ে তার উকট রাগিণী বেরিয়ে আসছে–এবার কালী তোমায় খাব–

তার থেকে প্রায় পনেরো গজ দূরে জানলা দিয়ে আনন্দবাবু মুখ বার করলেন।

–কী করি? কী মারব?

কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। কেবল খগেনকে ছাড়া।

আনন্দবাবুর মাথার ভিতরে দুই সরস্বতী ভর করল। পিলটু খগেনের পিঠে গুলি করেছিল পাঁচ হাত দূর থেকে। আমি পারব না পনেরো গজ দূর থেকে? এতই কি অসম্ভব?

কী করছেন বোঝবার আগেই শব্দ হল–খটাস!

–ওরেঃ বাবা!–

শূন্যে একটা লাফ মারল খগেন। আর তৎক্ষণাৎ টুপ করে জানলার নীচে ডুবে গেলেন আনন্দবাবু।

শুধু একজন লোক ব্যাপারটা দেখতে পেল। বাগানের ভিতর ছাগল বাঁধতে এসে স্তম্ভিত চোখে সে দেখেছিল আনন্দবাবুর অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ।

সে ওই বাড়ির দারোয়ান–দুবলাল সিংয়ের চাচা খুবলাল সিং।

.

পাঁচ – এক একটি দুর্ঘটনা

ঝড়ের মতো খগেনকে সঙ্গে নিয়ে আনন্দবাবুর ঘরে ঢুকলেন পিলটুর পিসিমা। ভয়ে, লজ্জায় আনন্দবাবু তাঁর ডেক-চেয়ারে কাঠ হয়ে বসে রইলেন। এইবারেই বুঝি তাঁর জীবনের কঠিনতম পরীক্ষা।

ষাঁড়ের মতো চেঁচাতে চেঁচাতে ঢুকল খগেন।

–প্রতিকার চাই–অবিলম্বে চাই! ওই ছেলেটার গা থেকে যদি ছাল-চামড়া তুলে না নিয়েছি, তা হলে আমার নাম খগেন বটব্যালই নয়!

আনন্দবাবুর বললেন–অত চেঁচিয়ো না খগেন, আমার ব্লাড়প্রেশার বেড়ে যাবে।

–চেঁচাব না, মানে? জানেন আপনি? ওই বাঁদর ছেলেটা আবার আমার পিঠে গুলি করেছে।

–অসম্ভব!–আনন্দবাবু সজোরে মাথা নাড়লেন–অসম্ভব! এ কিছুতেই হতে পারে না।

–হতে পারে না মানে? আপনি কি বলতে চান আমার পিঠে শুধু শুধু মার্বেলের মতো ফুলে উঠেছে?

–তা আমি কী করে বলব? তোমার পিঠ ফুটবলের মতো ফুলে উঠলেই বা কী আসে যায়? বন্দুক রয়েছে আমার ঘরে, পিলটু কী করে গুলি ছুঁড়বে? কথাটা কী জানো খগেন? দিনরাত কালীকীর্তন গাইতে গাইতে মাথাটা বেশ একটু গরম হয়ে গেছে তোমার। তাই সব সময় ভাবছ তোমার পিঠে কে যেন গুলি করছে।

খগেন ঘোঁত ঘোঁত করে বলল–আর ফোলাটা?

–বাত।

–বাত?–খগেন প্রতিবাদ করল–আমার বাত নেই। আমার বাত কখনও হয়নি।

–কিন্তু হতে কতক্ষণ?–আনন্দবাবু বললেন–ছেলেবেলাতে নিশ্চয় তোমার দাড়িগোঁফ ছিল না, কিন্তু এখন তো মুখভর্তি গজিয়েছে!

পিলটুর পিসিমা এবার আনন্দবাবুকে একটা ধমক দিলেন।

–আঃ, কী বকবক করছ তুমি?

বকবক মানে? সত্যি কথাই বলছি। অত ডিম, মুরগি কখনও সহজে হজম হয়? কোনদিন হয়তো বা খগেনের মনে হবে, ও একটা খাজা কাঁটাল, আর পৃথিবীর যেখানে যত কাক আছে, সবাই এসে ওকে ঠোকরাচ্ছে। কালীসাধকদের অসাধ্য কিছুই নেই।

পিসিমা চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন আনন্দবাবুর দিকে। একটা কুটিল সন্দেহ হঠাৎ এসে দেখা দিয়েছে তাঁর মনে। বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে স্বামীর কৈশোরের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে যেসব গল্প শুনতেন, তারই দুটো-একটা ভেসে উঠছিল স্মৃতির উপর।

–আমি কথা বলছি। খগেন, তুমি এখন বাইরে যাও।

গোঁ গোঁ করতে কালীসাধক বেরিয়ে গেল।

পিসিমা আনন্দবাবুর আরও কাছে এগিয়ে এলেন। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাঁকে লক্ষ করতে করতে বললেনবন্দুক এ-ঘরের বাইরে যায়নি। গুলি তাহলে করল কে? শুনেছি, ছেলেবেলায় তোমার এয়ার গানের দৌরাত্মে পাড়ার লোককে তুমি অতিষ্ঠ করে তুলেছিলে। এ তোমারই কাণ্ড নয় তো?

–আমার? কী বলছ তুমি?–আনন্দবাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন।

–সেইরকমই তো সন্দেহ হচ্ছে।

তারস্বরে প্রতিবাদ তুললেন আনন্দবাবু।

–এ অন্যায় সন্দেহ। অত্যন্ত অন্যায়। আমি খগেনকে গুলি করব কেন? ও কি গুলি করবার যোগ্য? ও খরগোশ নয়, পাখি নয়–এমন কি, নেংটি ইঁদুরও নয়। ও সকলের চাইতে অখাদ্য। ওকে গুলি করব কোন্ দুঃখে? বুড়ো বয়েসে আমি কি পাগল হয়ে গেছি?

–তুমিই জানো।–সন্দিগ্ধ চোখে আর একবার কতার দিকে তাকিয়ে গিন্নী বন্দুক আর গুলির বাক্স তুলে নিলেন–যাই হোক, এটা দেখছি তোমার কাছেও নিরাপদ নয়। আমার ঘরেই আমি নিয়ে চললুম।

গিন্নী বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে যেতে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল আনন্দবাবুর। যাকফাঁড়া কেটে গেল। কিন্তু পিলটুর জন্যে এখন দুঃখ হচ্ছে। ওকে ডেকে আঠারোটা অঙ্ক থেকে অন্তত নটা তাঁর কষে দেওয়া উচিত। তাদের দুজনের দোষের ভাগ তো এখন সমান।

পিলটুকে ডাকতে যাচ্ছেন, হঠাৎ শুনলেন–হুজুর!

দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দারোয়ান খুবলাল সিং।

–কী খবর খুবলাল?

–একটা আরজি আছে হুজুর।

–কী আরজি? চটপট বলে ফেলল।

–হিনুর ওধারে যে বাগানটা কিনিয়েছেন হুজুর, তার একজন দারোয়ান চাই বলছিলেন না?

–তা লোক পেয়েছ?

–লোক তো আছেই হুজুর। হামার ভাতিজা দুবলাল সিং।

আনন্দবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন–দুবলাল? ওই চিংড়ি মাছের মতো ছোঁকরাটা? ওটা তো অকর্মার গোঁসাই। নানা–ওকে দিয়ে কাজ চলবে না।

খুবলাল বলল–ওকে লিবেন না হুজুর?

–পাগল নাকি?

–তোবে হামি গিন্নীমার কাছে যাচ্ছে। গিয়ে বোলছে, আমি দেখলাম কি, বাবু বন্দুক নিয়ে খগেনবাবুর পিঠ বরাবর গোলি মারিয়ে দিল।–খুবলাল বিনীত হাসি হাসল।

–আঁ?–আনন্দবাবু চেয়ার থেকে তড়াক করে উঠে পড়লেন।

–আর দুবলালকে নোকরিটা দিলে হামি কুছু জানে না। কুছু দেখেনি।

–আলবাত–আলবাত!-আনন্দবাবু অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে উঠলেন–চমৎকার লোক দুবলাল। বাগানের জন্যে আমি এখনি ওকে নিয়ে নেব। কিন্তু জানোই তো খুবলাল, গিন্নীমাকে রাজি করাতে না পারলে–

–হঁ।–এইবারে খুবলালও চিন্তিত হল।

–গিন্নীমা বললে আমি সঙ্গে সঙ্গেই দুবলালকে চাকরি দেব। কিন্তু গুলি করবার কথাটা–

–হামি কুছু জানে না হুজুর, হমি কুছু দেখেনি।

সেলাম করে খুবলাল বিদায় নিয়ে চলে গেল। সন্ধে হয়ে গেছে। শরতের জ্যোৎস্নায় ছেয়ে গেছে চারদিক। আনন্দবাবু নিজের ঘরে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ সম্বন্ধে কী একটা ইংরেজী বই পড়ছেন। পিলটু আঠারোটা অঙ্ক নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে, এখন পর্যন্ত তার ছটার বেশি কষা হয়নি। পিলটুর পিসিমা খগেনের জন্যে মুরগির রোস্টের তত্ত্বাবধান নিয়ে রান্নাঘরে ব্যতিব্যস্ত।

আর বাগানে সেই বাঁধানো পাথরের বেদীটার উপরে বসে খগেন গান ধরেছে–

ডুব দে রে মন কালী বলে—

সেই সময় রান্নাঘরের সামনে এসে খুবলাল সিং ডাক দিল–মাঈজী।

গিন্নী বেরিয়ে এলেন।

–কী হয়েছে দারোয়ান?

—বাবুর নতুন বাগানটার জন্যে হামার ভাতিজা দুবলালকে যদি দাবোয়ানী দেন–

–দুবলালকে?–গিন্নী চটে উঠলেন–ওকে দিয়ে কী হবে? ওই তো পাকাটির মতো শরীর। বাগানের বাঁদর তাড়ানো দুরে থাক, বাঁদররাই ওকে তাড়িয়ে দেবে। নানা–ওসব লোকে কাজ চলবে না।

–ওকে লিবেন না মাঈজী।

–উঁহু, অসম্ভব।

–আদমি বহুৎ ভালো ছিল মাঈজী। গিন্নী কড়া গলায় বললেন–ভালো আদমিতে আমার দরকার নেই। আমি চাই ভালো দারোয়ান। ও সব হবে না।

–হোবে না?

–না। গিন্নী ব্যাপারটা ওইখানেই মিটিয়ে দিয়ে আবার রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলেন।

বিমর্ষ হয়ে খুবলাল চলে গেল। মাঈজীকে রাজি করানো যাবে বলে মনে হচ্ছে না। এই বুন্ধু ভাইপোটাকে নিয়ে বিপদেই পড়া গেল! ঘাড় থেকে না নামাতে পারলে তার যথাসর্বস্ব খেয়ে শেষ করে দেবে! কী করা যায়।

.

আনন্দবাবুর বাগানে জ্যোৎস্নায় পাখি ডাকছিল। আর গিন্নীমার ঘরে তাঁর বড় আয়নাটা পরিষ্কার করতে করতে গোপালের মন উদাস হয়ে গেল।

সেই ছেলেবেলার দিনগুলো। নদীতে সাঁতার কেটে, গাছে উঠে, মাঠে চরে খাওয়া ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে তাকে ছুটিয়ে দেওয়া–সে কতকাল আগেকার কথা!

ড্রেসিং টেবিলের উপরেই পিলটুর এয়ার গানটা রয়েছে। মনে পড়ল, সে আর জমিদারের ছেলে কান্তিবাবু বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা পেটমোটা শেয়াল সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে আর কান্তিবাবু বলছেন–এই গোপলা, মার তো মার তো ওই শেয়ালটাকে

অন্যমনস্ক হয়ে বন্দুকটা তুলে নিল গোপাল। একটা গুলিও ভরল। বাগানের সেই বেদীতে বসে সমানে গান গেয়ে চলেছে খগেন। একটু দূরেই রান্নাঘর। সেখান থেকে মুরগির রোস্ট আর খাঁটি ঘিয়ের প্রাণ-মাতানো গন্ধ আসছে। গন্ধটা যত নাকে লাগছে–ততই খগেনের গলা চড়ছে–

ডুব দে রে মন কালী বলে,
তুমি দম-সামর্থ্যে এক ডুবে যাও,
কালী-কুণ্ডলিনীর কূলে—

গোপাল জানলার কাছে এগিয়ে এল। জ্যোৎস্নায় খগেনের পিঠটা চকচক করছে। হঠাৎ গোপালের মনে হল, ও খগেন নয়–যেন একটা উঁড়ো শেয়াল বসে আছে ওখানে। আর কান্তিবাবু যেন পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন–মার গোপাল–মেরে দে ওকে–

বন্দুকে আওয়াজ উঠল–খটাস্।

আর সঙ্গে সঙ্গে ছটাস করে বাগদা চিংড়ির মতো লাফিয়ে উঠল খগেন। হেঁড়ে গলার আর্তনাদ উঠল কাঁপিয়ে–বাপরে–গেলুম!

গিন্নীর ড্রেসিং টেবিলের উপর বন্দুকটা নামিয়ে রেখে গোপাল তৎক্ষণাৎ ঘর ছেড়ে উধাও হল।

.

ছয় – শেষ মার

–কাকিমা–কাকিমা–কাকিমা—

রাঁচি নামকুম, হিনু–ডুরান্ডা সব একসঙ্গে কাঁপিয়ে খগেন গগনভেদী চিৎকার করতে লাগল।

রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন গিন্নী।

–কী হয়েছে! অত চেঁচামেচি কেন?

–চেঁচাব না? দক্ষযজ্ঞ করব এইবারে। আবার কে আমায় গুলি করেছে।

পিলটুর পিসিমা অবাক হয়ে গেলেন।

–পাগল নাকি? বন্দুক তো আমার ঘরে। কে গুলি করবে তোকে?

–তা জানি না, কিন্তু এই দ্যাখো, পিঠটা প্রায় ফুটো করে দিয়েছে এবার।

–অসম্ভব। পিলটু কখনও আমার ঘরে ঢুকবে না। তুই খেয়াল দেখেছিস খগেন।

–খেয়াল, খগেন হাঁই-মাই করে উঠল–পিঠটা টোম্যাটোর মতো ফুলে উঠেছে, আর তুমি বলছ খেয়াল! ও সব বদখেয়াল আমার নেই।

গিন্নী চিন্তায় পড়লেন। তারপর খগেনকে নিয়ে এগোলেন কর্তার ঘরে।

–শুনছ? আবার কে খগেনকে বন্দুক মেরেছে।

আনন্দবাবু এবার সত্যি সত্যিই আশ্চর্য হয়ে গেলেন।

–কিন্তু বন্দুক তো তোমার ঘরে গুলি করবে কে? যত সব আজগুবি কথা! আমি তো আগেই বলেছি, অতগুলো মুরগির ডিম খেয়ে খগেনের পেট গরম হয়ে গেছে। তাই আবোল-তাবোল বকছে।

খগেন জোরালো গলায় প্রতিবাদ করল।

–না, আমি মোটেই আবোল-তাবোল বকছি না।

–নিশ্চয় বকছ! রাঁচিতে যখন এসেছ তখন আর একটু এগোলেই তুমি কাঁকেতে পৌঁছবে। সেইখানেই যাও, সেইটিই তোমার পক্ষে আদত জায়গা।

গিন্নী বললেন–থামো। খগেন, তা হলে তুমি বলতে চাও ভূতেই তোমাকে গুলি করেছে?

–ভূত-ফুত জানি না। আমার পিঠটাকে যেন ঝাঁঝরা করে দিল। কাকিমা, তুমি যদি এর ব্যবস্থা না করো, তা হলে এখানে আমি আর থাকব না। এখান থেকে সোজা বদরিকা আশ্রমে তপস্যা করতে চলে যাব।

আনন্দবাবু বললেন–আঃ, থামো না তুমি। শোনো খগেন, এখন এ-ভাবে আর দাপাদাপি কোরো না। আজ রাতে ভালো করে খেয়েদেয়ে গিয়ে ঘুমোও। কাল সকালে আমি যা হয় এর একটা ব্যবস্থা করব।

–বেশ, একটা রাত আপনাদের সময় দিচ্ছি। কাল সকালের মধ্যে যদি এর প্রতিকার না হয়–তা হলে আমি কিন্তু কেলেঙ্কারি করে ছাড়ব।

দাপাদাপি করতে করতে কাকিমার পিছনে পিছনে বেরিয়ে গেল খগেন।

খগেন মিথ্যা নালিশ করেনি, আনন্দবাবু তা বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু গুলিটা সত্যিই করল কে? পিলটু নয়–তিনিও নন। তবে কি ভূতের কাণ্ড?

ভাবতেই আনন্দবাবুর গা ছমছম করে উঠল, ভূতকে দারুণ ভয় পান তিনি। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, খগেনকে ভগবানও ভয় পান-ভূতের সাধ্য কি ওকে গুলি করে?

–বাবু?

ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ ঘরে এসে ঢুকল গোপাল।

–কী রে গোপাল, কাঁদছিস কেন?

গোপাল এসে আনন্দবাবুর পা জড়িয়ে ধরল।

–আমার মাইনেটা দিয়ে দিন বাবু, আমি এখান থেকে চলে যাব।

–সে কী রে? হঠাৎ কী হল তোর?–আনন্দবাবু আকাশ থেকে পড়লেন কুড়ি বছর চাকরি করে তুই হঠাৎ চলে যাবি মানে? তোর গিন্নীমা বকেছে বুঝি?

–কেউ বকেনি বাবু। আমি ভারি অন্যায় করেছি।–গোপাল ফোঁস ফোঁস করতে লাগল সমানে।

–কী অন্যায় করেছিস?

–আমি–আমি–খগেনবাবুর পিঠে গুলি করে দিয়েছি বাবু। হঠাৎ বন্দুকটা দেখে মাথাটা কেমন হয়ে গেল। ভাবলাম, ছেলেবেলায় অমন তাক ছেলে–একেবারেই ভুলে। গিয়েছি নাকি? তারপর–তারপর কী যে করে ফ্যালোম–

আনন্দবাবু হা হা করে হেসে উঠলেন।

–তা হলে ওটা তোর কাণ্ড! যাক–চেপে যা। বেমালুম চেপে যা। কিছু অন্যায় করিসনি। খগেনের পিঠে তাক করার রাইট সকলেরই আছে। কোনও দোষ করিসনি তুই।

–কিন্তু গিন্নীমা যদি সন্দেহ করেন—

–কোনও ভয় নেই, আমি আছি।

.

খাওয়াদাওয়া শেষ হতে রাত সাড়ে এগারোটা বাজল। পিঠের ব্যথা ভোলবার জন্যে একটা আস্ত মুরগির রোস্ট একাই সাবাড় করল খগেন। তারপর বাগানে এসে বসল।

ওদিকে কাজকর্ম সেরে পিলটুর পিসিমা তাঁর জানলার সামনে এসে দাঁড়ালেন। পিলটুর পিসিমার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তাঁর দিনগুলো আসামে কেটেছে।

যে শহরে তাঁরা থাকতেন, সেখান থেকে দূরে বর্মা সীমান্তের নীল পাহাড়গুলোকে দেখা যেত। মেঘ ঘনিয়ে আসত সেগুলোর উপর দিয়ে। গাছপালায় ভিজে হাওয়া মর্মর তুলত। কত ফুল ফুটত–আর কত প্রজাপতি! কী আনন্দে বনের ভিতর খেলা করে বেড়াতেন তিনি।

আর, কী দুরন্ত ছিলেন নিজেও!

তাঁর দাদার এয়ার গান ছিল একটা। তিনিও সুযোগ পেলেই দখল করতেন সেটা।

বেশ টিপও হয়ে গিয়েছিল হাতের। চড়ই মেরেছেন, দেওয়াল থেকে টিকটিকি নামিয়ে এনেছেন কতবার! সে আজ প্রায় চল্লিশ বছরেরও আগেকার কথা। এখনও কি সে হাতের টিপ তাঁর আছে?

ভাবতে ভাবতে একসময় পিলটুর বন্দুকটা টেবিল থেকে তুলে নিলেন তিনি।

দাদার বন্দুকটা এত সুন্দর ছিল না। কিন্তু বড় ছিল এর চাইতে। পিলটুর পিসিমা বন্দুকটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখতে লাগলেন। ঠিক এইভাবেই গুলি ভরতে হত। সবই প্রায় এক রকম।

তারপর কী খেয়াল হতে বন্দুকে গুলি ভরে দেওয়ালের দিকে চাইলেন একবার।

না–একটা টিকটিকিও কোথাও নেই। হাতে তখনও বন্দুকটা রয়েছে।

বাবা কত ভালবাসতেন। বলতেন, ইয়োরোপের মেয়েরা পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে যায়। সিংহ, হিপো, আরো কত কী শিকার করে। আমার মেয়েকেও বিদেশি মেয়েদের মতো গড়ে তুলব। বাঙালীর মেয়েরা কেবল ঘরের কোণে বসে থাকে আমার কল্যাণী বাঙালী মেয়েদের অপবাদ দূর করে দেবে।

পিলটুর পিসিমা–অর্থাৎ কল্যাণীর দীর্ঘশ্বাস পড়ল।

কিছুই হল না। কেবল আনন্দবাবুর ঘর-সংসার করেই তাঁর জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল।

বন্দুকটা হাতে নেবার পর থেকেই ক্রমাগত হাতটা যেন তাঁর নিশপিশ করছে।

একটা কিছু করা চাই–যে-কোনও একটা লক্ষ্যভেদ। দেওয়ালে টিকটিকি নেই–এত রাতে চড়ুই পাখিই বা তিনি পাবেন কোথায়? মনে পড়ল, একবার দাদার বন্দুকটা নিয়ে গাছে কী একটা পাখির দিকে তাক করেছেন, হঠাৎ একটা মস্ত বড় গোৰু শিং নেড়ে ফোঁস ফোঁস করে তেড়ে এসেছিল তাঁর দিকে। কল্যাণী ছোট হলেও তাঁর সাহস কম ছিল না। পাখি ছেড়ে গোরুটার দুটো শিংয়ের ঠিক মাঝখানে খটাস করে গুলি করে বসলেন।

গোরুটা থমকে দাঁড়াল। তারপরেই লেজ তুলে উলটো দিকে ভোঁ দৌড়!

কল্যাণীর চোখে যেন স্বপ্ন ঘনিয়ে এল।

বাগানের মধ্যে কে যেন বসে আছে। জ্যোৎস্নায় চওড়া পিঠটা দেখা যাচ্ছে তার। কল্যাণীর মনে হলো, ওই সেই শিং-ওলা গোরুটা ছাড়া আর কিছুই নয়। ওকেই গুলি করব? করি, করে দেখি না–কী হয়!

কল্যাণী বন্দুক তুললেন, নিশানা ঠিক করলেন।

তার একটু আগেই চাপাটি খেতে খেতে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গিয়েছিল খুবলাল সিংয়ের। সকালে যে-ছাগলটাকে সে বাগানে বেঁধে রেখেছিল, সেটাকে ঘরে আনা হয়নি। যদি শেয়ালের পেটে যায়?

চটপট বাগানে চলে এল খুবলাল।

আর খুঁটি থেকে ছাগলটার দড়ি খুলে দিতে গিয়েই দেখল–জানলায় গিন্নীমা দাঁড়িয়ে। চাঁদের আলোতে যেন ফ্রেমের ভিতর একখানা ছবি। আর তাঁর হাতে বন্দুক।

কিন্তু জানলায় দাঁড়িয়ে ও কী করছেন গিন্নীমা? আরে আরে–সোজা খগেনবাবুর পিঠ বরাবর তাক করছেন যে!

খুবলাল চোখ কচলাল। স্বপ্ন দেখছে না তো সে?

–খটাস—

–বাবা গো, গেছি—

প্রাণপণে লাফ মারল খগেন। আর গিন্নীমা টুপ করে জানলার নীচে বসে পড়লেন!

.

পিলটুর পিসিমা সোজা এসে বিছানায় আশ্রয় নিলেন। ততক্ষণে চটকা ভেঙেছে তাঁর।

ছিঃ ছিঃকরেছেন কী তিনি! শেষকালে তিনিও কিনা খগেনের পিঠে—

বাইরে কার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। কে এসে যেন ঘা দিল তাঁর দরজায়।

কল্যাণী উঠে দরজা খুললেন। বাইরে আনন্দবাবু আর খুবলাল সিং দাঁড়িয়ে।

স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে একবার কাশলেন আনন্দবাবু। তারপর বললেন–এই খুবলাল সিং বলছিল, ওর ভাইপো দুবলালকে যদি আমাদের হিনুর বাগানটায়–

কল্যাণী চটে উঠলেন।

–সেইজন্যে তুমি এত রাতে ওকে নিয়ে আমায় বিরক্ত করতে এলে? আমি তো বলেই দিয়েছি, ও-সব লোক দিয়ে আমার কাজ চলবে না?

–তা না হয় না-ই চলল। কিন্তু এই খুবলাল বলছিল, তুমি নাকি একটু আগেই বন্দুক দিয়ে খগেনের পিঠে–

কল্যাণী মেঝেয় বসে পড়তে পড়তে সামলে গেলেন। সামলে খাবি খেলেন বার কয়েক।

ভক্তিভাবে একটা সেলাম ঠুকল খুবলাল।

–তাই আমি বোলছি মাঈজী, দুবলালের নোকরিটা যদি মিলে যায়, তব হামি খুবলাল সিং কুছু দেখেনি, কুছু জানে না, কুছু বোলে না। নেহি তো–

কল্যাণী প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন–না-না, তুমি কিছু দেখোনি, কিছু জেনেও তোমার কাজ নেই। বাবুর যদি আপত্তি না থাকে, তা হলে কালই তোমার ভাইপো হিনুর বাগানের কাজে বাহাল হয়ে যাবে।

–মাঈজীর বহুৎ দয়া!

আর একটা জোর সেলাম ঠুকে বেরিয়ে গেল খুবলাল। আর বাইরে গিয়ে ছাগলটাকে কাঁধে তুলে নাচতে নাচতে চলল নিজের ঘরের দিকে। এই ছাগলটাই তার লক্ষ্মী–এরই গুণে তার অকর্মার ঢিবি ভাইপোটার গতি হয়ে গেল!

সেই সময় গগনভেদী রোল তুলে গিন্নীর ঘরে এসে প্রবেশ করল খগেন।

–কাকিমা–আবার!

কল্যাণী ভুরু কুঁচকে বললেন–কী আবার?

–আমার পিঠে গুলি মেরেছে।

শুনে চটে চেঁচিয়ে উঠলেন এবার কল্যাণী।

–তোর মাথাই খারাপ হয়েছে খগেন। রাতদিন কে তোর পিঠে গুলি মারতে যাবে, শুনি?

–কে মেরেছে কেমন করে বলব? তবে একেবারে কমলানেবুর মতো ফুলে উঠেছে। এবার।

আনন্দবাবু বললেন–বাত।

খগেন তারস্বরে বললে–না, বাত নয়।

–তবে আমবাত।

–আমবাতও নয়।

–ওহো, তা-ও বটে।–আনন্দবাবু মাথা নেড়ে বললেন কমলানেবুর মতো ফুলে উঠেছে বলছ যখন, তখন ওটা বোধহয় নেবুবাত।

–না, নেবুবাতও নয়। খগেনের আবার প্রবল প্রতিবাদ শোনা গেল।

–এজ্ঞে, বাত না হলে বাতিক। বাতের বাড়াবাড়ি হলেই বাতিক।–ইতিমধ্যে গোপাল এসে আসরে পৌঁছেছিল, শেষ কথাটা সেই ঘোষণা করল।

–বাতিকই বটে! পিলটুর পিসিমা এবার একমত হলেন গোপালের সঙ্গে।

খগেন এবার নিদারুণভাবে চেঁচিয়ে উঠল।

–ওসব বাজে কথা বুঝি না। এবাড়ি হচ্ছে স্রেফ মানুষ-মারা কল। এখানে আর আমি একদিনও থাকব না। আমার সমস্ত পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। কালই আমি বদরিকা আশ্রমে কালীসাধনা করতে চলে যাব।

কল্যাণী ঝামটা দিয়ে বললেন–তাই কর গে যা। আমার হাড় জুড়োয়।

আনন্দবাবু বললেন, হ্যাঁ, সেই ভালো। নইলে কাঁকের পাগলা গারদেই পাঠাতে হবে তোমাকে।

–হুঁম?—

ঝাঁকড়া দাড়িগোঁফের ভিতর থেকে এক বিকট হুঙ্কার ছেড়ে দাপাতে-দাপাতে চলে গেল খগেন।

.

পরদিন সকাল।

গেটের বাইরে নিজের মোটর সাইকেলটাকে ঠিক করছিল খগেন। এ বাড়িতে আর সে থাকবে না। মুরগি, সন্দেশ, আপেল আর দুশো টাকা মাইনের আশাতেও নয়।

একটু দূরে বাগানের ভিতর পিলটুর বন্দুক হাতে আনন্দবাবু আর গোপালের প্রবেশ। আনন্দবাবু গোপালকে জিজ্ঞেস করেলন-তুই কদুর থেকে মেরেছিলি খগেনকে?

–এজ্ঞে বাবু, বারো গজ হবে।

–আর তোর গিন্নীমা?

–এজ্ঞে, সাত-আট গজ হবে।

–শেম! ও তো টার্গেটে মারা নয়, পাহাড় শিকার করা। আচ্ছা, খগেন এখন কতদূরে আছে?

–অন্তত কুড়ি গজ হবে।

–তবে এই দ্যাখ—

খটাস করে বন্দুক ছুঁড়লেন আনন্দবাবু।

–বাপরে গেছি—

খগেন লাফিয়ে উঠল শূন্যে। তারপর মাটিতে পড়েই সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় লাফে চড়ে বসল মোটর সাইকেলে আর প্রাণপণে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করতে লাগল।

আনন্দবাবু বললেন–ভাবছিস হঠাৎ লাগল? তা নয়। তাদের সক্কলের চাইতে আমার হাতের টিপ যে কত ভালো, দ্যাখ আবার সেটা প্রমাণ করে দিচ্ছি।

আবার বন্দুক ছুঁড়লেন–খটাস।

–ওরেঃ বাবা!

এবার সিটের উপরেই দেড় হাত নেচে উঠল খগেন–আর তারপরেই ভট ভট আওয়াজ উঠল মোটর সাইকেলে। দেখতে দেখতে দাড়িগোঁফ আর সেই ধুসো-কোট সুষ্ঠু খগেনকে নিয়ে মোটর সাইকেল নক্ষত্ৰবেগে উধাও হয়ে গেল।

আনন্দবাবু বললেন কালীসাধনা করতে চলে গেল।

গোপাল মাথা নেড়ে বললে–এজ্ঞে, হ্যাঁ। মায়ের ডাক কিনা– বড্ড তাড়া।

(একটি বিদেশি গল্পের প্রভাবে)

জয়ধ্বজের জয়রথ (উপন্যাস)

শীতের মিষ্টি নরম রোদে জয়ধ্বজ মণ্ডল–যার ডাকনাম জয়–নতুন ঝকঝকে সাইকেলটায় চড়ে বেরিয়ে পড়েছিল।

সাইকেলটা এত নতুন, এত সুন্দর, আর প্যাড়লে পা ছোঁয়াতেই এমন তরতর করে চলে যে, জয়ধ্বজের মনে হচ্ছিল সে যেন একটা পক্ষিরাজ ঘোড়া কিংবা ময়ূরপঙ্খী নৌকোয় চড়ে এগিয়ে চলেছে। গ্রাম ছাড়িয়ে জয়ধ্বজ চলল স্টেশনের রাস্তায়। কোনও কাজ আছে, তা নয়। আজ রবিবার–দোকান বন্ধ। জয়ধ্বজের ছুটির দিন। এই দিনটাতে–স্টেশনের পাশে নেপালদার চায়ের দোকানে আড্ডাটা ভারি ভালো জমে। বিশেষ করে আচার্য বাড়ির সুকুমার–যাকে ট্যাঁপা বলে সকলে জানে, জয়ধ্বজের যে প্রাণের বন্ধু, তাকেও পাওয়া যাবে সেখানে। ক্রিসমাসে কলেজ বন্ধ, ট্যাঁপা কলকাতার হস্টেল থেকে দেশে এসেছে।

সাইকেলে করে যেতে যেতে ভারি ভালো লাগছিল জয়ধ্বজের। সাইকেলটা তাকে দিয়েছেন তার মামা ভীমরাজ পুরকায়েত। নাম ভীমরাজ হলেও মামা মোটেই ভীমের মতো দশাসই নন-লম্বা রোগা চেহারা, গলায় তুলসীর মালা, ভীষণ বৈষ্ণব–মাছ-মাংস-পেঁয়াজ স্পর্শ করেন না। মামীও খুব ভালো মানুষ-বাড়িতে বসে রঙ-বেরঙের দড়ি দিয়ে নানা রকম শিকে তৈরি করেন, থালার মতো সব বড় বড় ফুল-টুল কাটা বড়ি বানান, ক্ষীর আর নারকেল দিয়ে অনেক রকম মিষ্টি করতে পারেন। পলাশপুরের বাজারের সব চাইতে বড় কাপড়ের দোকানটার মালিক হলেন মামা। তাঁর ছেলেপুলে নেই, জয়ধ্বজ তাঁর একমাত্র ভাগনে। সবাই জানে, মামা তাঁর জমি-জমা, দোকানপাট সব জয়ধ্বজকেই দিয়ে যাবেন।

জয়ধ্বজের বাবা রেলে চাকরি করতেন। তার পাঁচ বছর বয়সের সময় তিনি একটা দুর্ঘটনায় মারা যান। সেই থেকে মামা বিধবা ছোট বোন আর ভাগনেকে দেখাশোনা করছেন।

লেখাপড়ায় জয়ধ্বজ যে খুব ভালো তা নয়। একবার ফেল করে যখন থার্ড ডিভিশনে স্কুল-ফাইন্যাল পাশ করল, তখন মামা বললেন, খুব হয়েছে, আর পড়ে কাজ নেই।

শুনে জয়ধ্বজের চোখে জল এসে গেল।

বা রে, আচার্যিদের ট্যাঁপা যে কলেজে পড়তে যাচ্ছে।

ভুরু কুঁচকে মামা বললেন, ট্যাঁপা ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করেছে–দুটো লেটার পেয়েছে। ও কলেজে পড়বে না তো কে পড়বে? আর তুই? স্কুল-ফাইন্যালে একবার ডিগবাজি খেলি, একশো-দেড়শো টাকার চাকরির জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াবি তো? কী লাভ তাতে, শুনি? ব্যবসাই লক্ষ্মী, জানিস তো? আমার দোকানে ভিড়ে পড় ব্যবসা শেখ–মানুষকে না ঠকিয়ে সৎপথে থাক–দেখবি, ধুলোমুঠো সোনা হয়ে যাবে।

জয়ধ্বজ গোঁ হয়ে বাড়ি চলে এল।

অবশ্য, জয়ধ্বজের নিজের যা জমিজমা আছে, তাতে এক রকম করে তার কলেজে পড়বার খরচটা যে চলে না যেত, তা নয়। ছেলের কষ্ট দেখে মারও দুঃখ হল। আর নিজের ছেলে বি-এ, এমএ পাশ করে পণ্ডিত হবে–কোন্ মা-ই বা তা চান না? কিন্তু দাদার বুদ্ধির ওপরে তাঁর অগাধ বিশ্বাস, তিনি জানেন, দাদা যা করেন তা ভালোর জন্যেই।

মা বললেন, মন খারাপ করিসনি বাবা-দাদা যা বলছেন, তাতে তোর ভালোই হবে। আমার বাবা তো সাত-আট বিঘে জমি আর বাস্তুভিটেটুকু ছাড়া কিছুই রেখে যাননি। দাদা নিজের চেষ্টায় অত বড় ব্যবসা গড়ে তুলেছে, অত সম্পত্তি করেছে। দাদার কথা শুনে চল, তাতে তোর উন্নতিই হবে।

কী আর করা–ভীষণ মন খারাপ করে জয়ধ্বজ মামার দোকানে চাকরি করতে গেল।

প্রথম প্রথম বেজায় বিরক্তি লাগত। কোথায় ট্যাঁপা কলকাতায় মজা করে কলেজে পড়ছে কত নতুন জিনিস শিখছে, ফাঁকে ফাঁকে কখনও যাচ্ছে গড়ের মাঠে খেলা দেখতে, কখনও চিড়িয়াখানায়; আর সে এই দোকানে বসে সমানে শুনছে : নামা ধনেখালি, আন শান্তিপুরী, দেখা বেগমপুর।

তারপর আস্তে-আস্তে সয়ে গেল। তারও পরে ভালো লাগতে শুরু করল। মামা ভীমরাজ পুরকায়েত আগাগোড়া নজর রাখেন তার দিকে। ভুলচুক হলে ছোটখাটো ধমকও দেন–এ ব্যবসার কাজ বাপু, সব সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়।

অবশ্য মামার উদ্দেশ্য আলাদা। এত বড় ব্যবসাটা যার হাতে তুলে দিয়ে যাবেন, তাকে সব শিখিয়ে-পড়িয়ে যাওয়া দরকার- সব সময় লক্ষ রাখা উচিত তার ওপরে। ত্রিশ বছরের পরিশ্রমে যে-দোকান তিনি গড়ে তুলেছেন, আনাড়ির হাতে তা নষ্ট হয়ে যাবে, ভীমরাজ তা কোনওমতেই সইতে পারবেন না।

আজ দুবছর ধরে ভাগনের কাজকর্ম দেখে মনে হয়েছে, না–ছেলেটার বুদ্ধিসুদ্ধি আছে, ওর ওপর ভরসা করা যায়। খদ্দেরের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করে, কথা কইতে জানে, আগের চাইতে বরং দোকানের কাটতি বেড়েছে। তাই খুশি হয়ে এবার ভীমরাজ জয়ধ্বজকে একখানা ভালো সাইকেল কিনে দিয়েছেন।

সাইকেল তো নয়–যেন রাজত্ব। যেদিন সকালে ব্রাউনপেপারে মোড়া নতুন সাইকেলটা তাকে দেখিয়ে মামা বললেন, ওটা তোর, তোকে দিলুম– সেদিন জয়ধ্বজ প্রথমটা বিশ্বাসই করতে পারেনি। একটা সাইকেলের শখ যে তার কতদিনের–সে কথা তার চাইতে বেশি আর কে জানে! এ যে না চাইতে হাতে স্বর্গ পেয়ে যাওয়া।

সাইকেলে চড়ে যেদিন প্রথম পথে বেরোল–মনে হল সে যেন মূর্তিমান সম্রাট।

নতুন সাইকেল-ঝকঝক তকতক করছে। তার রঙের গন্ধ, তার নতুন সিটের গন্ধ, তার চকচকে চেন, তরতর করে তার ছুটে চলা আঃ। গ্রামে তো আরও অনেক সাইকেলই আছে, কিন্তু রংচটা, ঝরঝরে, বুড়োটে। তার সাইকেল তাদের মাঝখানে রাজার রাজা।

বাঃ বেড়ে সাইকেলটি তো। লোকে মুগ্ধ হয়ে বলে।

হুঁ-হুঁ, মামা দিয়েছে।

তা দেবেই তো। ভীমরাজের তো আর পয়সার অভাব নেই।

এই সাইকেল নিয়ে জয়ধ্বজ পাগল। দুবেলা ধুয়ে-মুছে তকতকে করে রাখে। সবার সাইকেল থাকে বাড়ির বারান্দায় কিংবা উঠনে, কিন্তু জয়ধ্বজ রাত্রে তুলে রাখে শোওয়ার ঘরে। যতক্ষণ ঘুম না আসে, চেয়ে-চেয়ে সাইকেলটাকে দেখে। আলো-নেবানো ঘরে সাইকেলটা চিকচিক করে–মনে হয়, জয়ধ্বজের দিকে তাকিয়ে খুশির হাসি হাসছে সে।

নতুন সাইকেল পিচের রাস্তায় প্রাণের খুশিতে এগিয়ে যাচ্ছিল জয়ধ্বজ। সাইকেল তো চলেছে না, যেন উড়ছে। মাঠে তখনও শীতের শিশিরের গন্ধ–ছোলা আর কলাই শাকে ধানকাটা মাঠে সবুজের ছোপ, খেজুরগাছের ঝরা রসের কলসিতে ভিড় জমিয়েছে মৌমাছি আর ভীমরুলের ঝাঁক। জয়ধ্বজের মনে হল, জগতে এই মুহূর্তে তার মতো সুখী বোধহয় আর কেউ নেই!

সুখের মাত্রাটা আরও বাড়ল, যখন নেপালদার চায়ের দোকানের সামনেই চোখে পড়ল ট্যাঁপাকে।

ট্যাঁপা বললে, তোর নতুন সাইকেল বুঝি? চমৎকার হয়েছে তো।

কিন্তু সাইকেল তো আছেই। ট্যাঁপাকেই পাওয়া যাবে না। কদিন পরেই তার কলেজ খুলবে, সে চলে যাবে কলকাতায়। কত গল্প জমে আছে তার কাছে, কত খবর শোনবার আছে কলকাতার। সাইকেলটা দোকানের সামনে রেখে ট্যাঁপার গলা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে জয়ধ্বজ দোকানে ঢুকল। চেঁচিয়ে বললে, নেপালদা-দুগেলাস ভালো চা আর সব চেয়ে ভালো বিস্কুট।

.

ঘণ্টা দুই জমাট আড্ডা চলল। তারপর ট্যাঁপা বললে, চল, তোর নতুন সাইকেল দেখি।

তুই দেখে কী করবি?–জয়ধ্বজ হাসল : তুই তে পড়ুয়া ভালো ছেলে, সাইকেলে চাপতে পর্যন্ত জানিসনে।

তোর ক্যারিয়ারে উঠব।

খুব ভালো কথা। জয়ধ্বজ খুশি হয়ে বললে, আজ দিনটা ভারি সুন্দর, চল–তোকে ক্যারিয়ারে বসিয়ে ঈশানীতলার কালীমন্দির পর্যন্ত বেড়িয়ে আসি।

ট্যাঁপা আনন্দে হাততালি দিয়ে বললে, গ্র্যান্ড আইডিয়া।

কিন্তু বাইরে বেরিয়েই–

জয়ধ্বজ চমকে উঠল : ট্যাঁপা, সাইকেলটা তো দেখছি না।

সে কী রে।

এখানে–এই জায়গাতেই তো ছিল। তালা দিয়ে গিয়েছিলুম।জয়ধ্বজের মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল মাটিতে এই তো চাকার দাগ। কিন্তু সাইকেলটা কোথায় গেল? কেউ চুরি করে নিলে না তো?

চুরি!–ট্যাঁপা খাবি খায় : সে কী রে।

তা হলে যাবে কোথায়? নেপালদা–নেপালদা–

একটা ভাঙা পেয়ালায় ডিম ফেটাচ্ছিল নেপালদা, সেইটে হাতে করে লাফিয়ে বেরিয়ে এল সে। এল দোকানের আরও তিনজন খদ্দের। না, সাইকেলের খবর তারা কেউ জানে না। শীতের এই সকালে চারদিকের এই আলোর ভেতর-নতুন সাইকেলটা–জয়ধ্বজের ময়ূরপঙ্খী যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

জয়ধ্বজ একেবারে ধপ করে বসে পড়ল ধুলোর উপর।

.

দুই

সত্যিই সাইকেলটা উধাও! দিনে-দুপুরে হাওয়া!

না–কেউ কিছু জানে না। অথচ নেপালদা যেখানে দাঁড়িয়ে চা বানায়, ওমলেট তৈরি করে কিংবা টোস্ট ভাজে, সেখান থেকে তিন-চার হাত দূরেই সাইকেলটা ছিল। সাইকেলটা ছিল, বলতে গেলে, নেপালদার একেবারে চোখের সামনে। যে বাচ্চা ছেলেটা নেপালদার অ্যাসিসট্যান্ট সে তো সারাক্ষণই বাইরে ঘোরাঘুরি করছিল। তা হলে কে এর মধ্যে সাইকেলটা নিয়ে সরে পড়ল?

এ যে পি সি সরকারের ম্যাজিককে হার মানিয়েছে।

অবিশ্যি বাচ্চাটা একবার একটু দূরের টিউবওয়েলটায় জল আনতে গিয়েছিল; নেপালদাও হয়তো ভেতরে তখন চা-টা কিছু দিচ্ছিল তার খদ্দেরদের। সেই ফাঁকেই নিয়ে সটকেছে খুব সম্ভব। খুব ওস্তাদ চোর বলতে হবে! একেবারে তক্কে তক্কে ছিল।

ভারত্তিক বঙ্কিম পাণ্ডা বললেন, যা–নন্দীগ্রাম থানায় খবর দিয়ে আয়।

নেপালদা বললে, ছাই হবে। পুলিশের দারোগা থাকে তার হাজারো রকমের কাজকর্ম নিয়ে। সাইকেল-চোর খুঁজতে তার বয়ে গেছে।

বঙ্কিম পাণ্ডা মাথা নেড়ে বললেন, তা বটে, তা বটে। তবু চুরির ব্যাপার যখন, পুলিশে খবর একটা দিতেই হয়।

ট্যাঁপা বললে, তাই ভালো জয়, চল–আমরা থানাতেই যাই। অমন করে বসে পড়লে তো চলবে না–এমন চমৎকার ঝকঝকে সাইকেলটা, যেমন করে তোক উদ্ধার করতেই হবে।

সুরেশ হালদার গলায় একটা মাফলার জড়িয়ে এতক্ষণ খুকখুক করে কাশছিলেন। এবার একটু সামলে নিয়ে বললেন, দিনে-দিনে দেশের হল কী? চারদিক চোর-হেঁচড়ে একেবারে। ছেয়ে গেল নাকি?

ট্যাঁপা আবার বললে, ওঠ জয়–এখন বসে থাকলে হবে না। দেরি করলে চোর যে কোথায় পালিয়ে যাবে ঠিক নেই। চল–চল

নেপালদা, বঙ্কিম পাণ্ডা আর সুরেশ হালদার সবাই একসঙ্গে বললে, হ্যাঁ, হ্যাঁ–দেরি করা ঠিক নয়। সুরেশ হালদার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তক্ষুনি তাঁর ভীষণ কাশি এসে। গেল, আর বলতে পারলেন না।

জয়ধ্বজ উঠল, ট্যাঁপার সঙ্গে বেরিয়ে এল রাস্তায়। আর পেছনে নেপালদার দোকানে এই সাইকেল চুরির ব্যাপারটা নিয়ে দারুণ উত্তেজিত আলোচনা চলল, সুরেশ হালদার আরও বেশি করে কাশতে লাগলেন।

খানিকটা চুপচাপ করে–ট্যাঁপার সঙ্গে সঙ্গে গোঁজ হয়ে হাঁটতে লাগল জয়ধ্বজ। তারপর বললে, আমরা কোথায় যাচ্ছি রে ট্যাঁপা?

কেন, থানায়।

না, থানায় যাব না।

সে কী!–ট্যাঁপা আশ্চর্য হয়ে গেল; কী করবি তা হলে?

থানায় গিয়ে কী হবে?–জয়ধ্বজ বললে, ভূপেনকাকার বাড়িতে গত বছর চুরি হয়ে গেল, তারপর কী হল মনে নেই? পরদিন দারোগা এসে অনেক মিষ্টি-টিষ্টি খেয়ে বললেন, চোর ব্যাটাকে যদি একবার ধরে দিতে পারেন, তা হলে ওটাকে পিটিয়ে একেবারে তক্তা করে দেব। শুনে ভূপেনকাকা মনের দুঃখে বললে, চোরকে যদি ধরতেই পারব, তবে আপনাকে আর ডাকব কেন? আর ধরতে পারলে পিটিয়ে তক্তা করবার জন্য আপনাকে ডাকতে হবে না–ওটাও আমরাই পারব এখন। দারোগা রেগে বললেন, আপনার তো খুব চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। যান–যান, আপনার চোর আপনিই ধরুন গে। বলে সেই যে গেলেন, একেবারেই গেলেন। না, থানা-টানায় সুবিধে হবে না।

ট্যাঁপা বললে, কিন্তু–

জয়ধ্বজ বললে, দাঁড়া, একটু মাথা ঠাণ্ডা করে নিই। ওসব দারোগা-ফারোগার দরকার নেই। তুই আমাকে একটু হেলপ করতে পারবি?

কেন পারব না? কিন্তু তুই কী করতে চাস, সেইটেই আমি ঠাহর পাচ্ছি না।

জয়ধ্বজ বললে, যা করব, তোতে আমাতে।

–তোতে আমাতে।

–ট্যাঁপা আরও আশ্চর্য হল : আমরা কী করতে পারব?

–সব করতে পারব। উদ্ধার করব সাইকেলটা।

ট্যাঁপা বললে, তোর মাথা খারাপ হয়েছে, জয়! আমরা কি হেমেন্দ্রকুমারের জয়ন্ত না প্রেমেন মিত্তিরের পরাশর বর্মা? তুই বাংলা ডিটেকটিভ বই পড়ে পড়ে

মোটেই ডিটেকটিভ বই না।–জয়ধ্বজ বিরক্ত হল : তুই এ রকম ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র আর আমিও তো নেহাত হাঁদা গঙ্গারাম নই। দুজনে মিলে একটা কিনারা করতে পারব না? আয়, এই বাদাম গাছটার তলায় একটু বসা যাক। একটু ভেবেচিন্তে দেখা যাক সব–বুদ্ধি করা যাক একটা।

ট্যাঁপাকে প্রায় জোর করে টেনেই জয়ধ্বজ বাদাম গাছের তলায় এনে বসাল।

ট্যাঁপা বললে, কী পাগলামি করছিস তুই? মিথ্যে দেরি করে কী লাভ? বাদাম গাছের তলায় বসে আমরা প্ল্যান করব, আর সেই ফাঁকে চোর সাইকেলটা নিয়ে দশ মাইল রাস্তা পেরিয়ে যাবে।

জয়ধ্বজ বললে, না–যাবে না। আমার এই সাইকেল এদিক্কার সকলের চেনা। দিনে-দুপুরে ওটাকে নিয়ে কেউ বেশি দূর চালাতে সাহস পাবে না। যদি সরাতে হয় সরাবে রাতের বেলায়, দিনেও কোথাও লুকিয়ে রাখবে।

কিন্তু চোর যদি গাঁয়ের লোক না হয়? যদি পথ-চলতি কেউ ওটা নিয়ে সটকে থাকে?

পথ-চলতি কে এখন আসবে এদিকে? দুঘণ্টার মধ্যে ইস্টিশনে কোনও ট্রেন আসেনি, বাইরের কেউ খামকা এদিকে আসে না। নিয়েছে গ্রামেরই কেউ। কোনও চেনা লোক।

চেনা লোক।

সাইকেলটার ওপর অনেকেরই নজর পড়েছিল রে!

আচ্ছা জয়– ট্যাঁপার একটা কথা মনে হল :এমন তো হতে পারে, মজা দেখবার জন্যে কেউ ওটা নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে একটুখানি?

হতে পারে, নাও পারে। কিন্তু মজা দেখবার জন্যেও যদি কেউ নিয়ে থাকে, তাকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে, জয়ধ্বজ মণ্ডলের সঙ্গে চালাকি চলে না। মোদ্দা কথা, আমরা ওটা খুঁজে বের করবই।

যদি খুঁজে না পাই?

পেতেই হবে।–জয়ধ্বজ গম্ভীর হয়ে বললে, মামা সাইকেলটা দেবার সময় আমাকে বলেছিল যত্ন করে রাখিস–কেউ চুরি-টুরি করে নিয়ে না যায়। আমি বলেছিলুম, কোনও চোরের ঘাড়ে তিনটে মাথা নেই যে, জয়ধ্বজ মণ্ডলের সাইকেল চুরি করে নেবে। মামা বলেছিল, বেশ, দেখব, কেমন হুঁশিয়ার ছেলে তুই। সাইকেলটা উদ্ধার না করে মামার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারব আমি? প্রেসটিজ থাকবে আমার?

তা বটে–তা বটে– ট্যাঁপা ভাবনায় পড়ল।

তা ছাড়া সুরেশ হালদারকে তো জানিস। এক নম্বরের গেজেট। এখুনি খুকখুক করে কাশতে কাশতে মামার কাছে গিয়ে খবর দেবে–নেপালের চায়ের দোকান থেকে তোমার ভাগনের সাইকেল লোপাট। তখন আমার অবস্থাটা কী দাঁড়াবে, বল? নাঃ, এ অপমান সত্যু করা যায় না। সাইকেল উদ্ধার করে তারপর মামার কাছে গিয়ে বলব; দেখলে তো–জয়ধ্বজ মণ্ডলের জিনিস কেউ হজম করতে পারে না।

ট্যাঁপা অধৈর্য হয়ে বললে, তা নয় হল। কিন্তু এখানে বসে বসে ভাবলে তো আর ওটা ফিরে পাওয়া যাবে না।

দাঁড়া না–একটু বুদ্ধি খাটাই। আমি তোকে বলছি ট্যাঁপা, সন্ধের আগে গাঁ থেকে সাইকেল বেরুবে না। এখন বেলা সাড়ে নটা। তার মানে, প্রায় ঘণ্টা দশেক সময় রয়েছে আমাদের হাতে। আগে ভেবে দেখা যাক–কাকে কাকে সন্দেহ করা যেতে পারে!

আচ্ছা–ভাব।

প্রথমেই মোনা পাল।

শুনেই ট্যাঁপা চমকে উঠল : ঠিক বলেছিস। মোনা পাল দাগী চোর, চার বার জেল খেটেছে। একাজ ও ছাড়া আর কারুরই নয়।

দাঁড়া–দাঁড়া। দাগী চোর হলেও মোনা পাল গাঁয়ের কারও কিছু কখনও চুরি করেনি। ওকে লিস্টে প্রথমে রাখব না। তারপর নেউলে–

নেউলে?

আরে নিয়োগীদের নেউলে। ওর হাতটান আছে, বুঝলি? একবার ওর বাবার হাতঘড়ি চুরি করে মহিষাদলে কাকে বেচে এসেছিল না? তারপর ধরা পড়ে বাপের হাতে রাম-ঠ্যাঙানি খেয়েছিল। আমার সাইকেলটার দিকে কবার ও আড়ে আড়ে তাকিয়েছে–আমি লক্ষ, করেছি।

তা হলে নিশ্চয় এ নেউলে নিয়োগীরই কাণ্ড।

জয়ধ্বজ বিরক্ত হয়ে বললে, নাঃ, তুই জ্বালালি ট্যাঁপা। আরে সবটা আগে ভাল করে ঠাউরে নিতে দে না। তিন নম্বর, পঞ্চ সামন্ত। লোকটা সুবিধের নয়-জানিস তো। তার ওপর একটা সাইকেলের দোকান আছে তমলুকে। সেখানে ওটা অনায়াসেই বেচে দিতে পারে।

ট্যাঁপা প্রায় বলতে যাচ্ছিল, তবে ওটা পঞ্চু সামন্তই নিয়েছে–কিন্তু জয়ধ্বজের চোখের দিকে তাকিয়ে সামলে গেল।

জয়ধ্বজ বললে, আপাতত এই তিনজনকে দিয়েই শুরু করি। তারপরে অন্যদের কথা ভাবা যাবে। প্রথমে কার কাছে যাওয়া যায় বল দিকি?

মোনা পাল।

না, মোনা নয়। আগে নেউলে নিয়োগী। বলেই উঠে দাঁড়াল জয়ধ্বজ : চল ট্যাঁপা–নাউ টু অ্যাকশন।

নেউলে নিয়োগীর দেখা পেতে দেরি হল না। তার বাড়ির দিকে এগোতেই চোখে পড়ল, এক হাতে একটা ঠোঙা নিয়ে নিবিষ্ট মনে ডালমুট খেতে খেতে কোথায় চলেছে সে।

দূর থেকে ট্যাঁপা ডাকল :এই নেউলে, একটু দাঁড়া। তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।

শুনেই নেউলে দারুণ চমকে উঠল। হাত থেকে পড়ে গেল ডালমুটের ঠোঙাটা। তারপর আর কোনও দিকে না তাকিয়ে–মাঠের মধ্যে লাফিয়ে পড়ে–টেনে দৌড়।

.

তিন

এই নেউলে, দৌড়চ্ছিস কেন? দাঁড়া না–আবার চেঁচিয়ে উঠল ট্যাঁপা।

কিন্তু কে কার কথা শোনে? নেউলে ছুটছে তো ছুটছেই–মনে হল, একেবারে হলদিয়ার বন্দরে পৌঁছবার আগে সে আর থামবে না। একটা পাটকিলে রঙের এঁড়ে গোৰু খুব যত্ন করে ঘাস-টাস খাচ্ছিলে, নেউলে উলটে পড়ল তার ঘাড়ে। গোরুটা লেজ তুলে দৌড় লাগাল–ম্যা ম্যা করে তিন-চারটে ছাগলও ছিটকে পড়ল চারদিকে।

আর নেউলে যে-ভাবে ছুটল, তাতে বোধহয় অলিম্পিক রেকর্ড হয়ে যেত একটা।

এই নেউলে–এই নেউলে–পালাচ্ছিস কেন?–পেছনে ছুটতে ছুটতে জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা সমানে ডাকতে লাগল। নেউলে একবার ফিরে তাকায়, আবার দৌড়তে থাকে। যেন

অলিম্পিক রেকর্ডটা না করে কোনওমতেই সে থামবে না।

তা রেকর্ডটা হয়েও যেত, খুব সম্ভব হলদিয়ায় পৌঁছেও যেত সে। কিন্তু খেতের আলের ওপর একটা মাটির চাঙাড়ে টক্কর খেয়ে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থমকে গেল। একটা ঝোঁপের ওপরে উলটে পড়ে কোলা ব্যাঙের মতো হাত-পা ছুঁড়তে লাগল সে, আর সেই ফাঁকে ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ গিয়ে তাকে ক্যাঁক করে চেপে ধরল, নেউলে আর একবার উঠে পড়বার চেষ্টা করবার আগেই।

নেউলে হাঁসফাঁস করে জয়ধ্বজকে আঁচড়ে দিলে, ট্যাঁপাকে কামড়াবার চেষ্টা করল। রেগে আগুন হয়ে গেল জয়ধ্বজ।

ভালো করে ওর হাত দুটো চেপে ধর তো ট্যাঁপা! হতভাগা আঁচড়ে কামড়ে দেবার চেষ্টা করছে! এক চড়ে আমি ওর একপাটি দাঁত খসিয়ে দিচ্ছি।

ট্যাঁপা পটলডাঙার টেনিদাকে কোট করে বললে, কিংবা এক চাঁটিতে ওর কান কানপুরে পাঠিয়ে দেওয়া যাক।

বেগতিক দেখে নেউলে হাঁউমাউ করতে লাগল : তোমরা আমায় মারছ কেন? ছেড়ে দাও বলছি।

তুই আমাকে আঁচড়ে দিলি কেন? ট্যাঁপাকে কামড়াচ্ছিলি কী জন্যে?

তোমরা কেন আমাকে মারতে এলে?

আমরা তো তোকে মারতে আসিনি। কেবল একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছিলুম।

হুঁ, জিজ্ঞেস করতে!–নেউলে গজগজ করতে লাগল : আমি যেন কিছু জানি না। ভীম জ্যাঠার বাগান থেকে নারকোলী কুল পেড়ে খেয়েছি বলে তোমরা আমাকে ঠ্যাঙাতে এসেছ।

নারকোলী কুল!

ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ আশ্চর্য হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, আলগা হয়ে গেল হাতের মুঠো, আর ফাঁক বুঝে নেউলে উঠে পড়ল এক লাফে, চম্পট দেবার চেষ্টা করল।

কিন্তু জয়ধ্বজের ফুটবল খেলার অভ্যাস আছে, বেকাদায় পড়লে কেমন করে ফাউল করতে হয়, সেটাও তার বিলক্ষণ জানা। বসা-অবস্থাতেই সে চট করে একখানা পা ছুঁড়ে দিলে এবং তৎক্ষণাৎ আর একবার চিত হল নেউলে।

ওরে বাবা রে, মেরে ফেলল রে–! নেউলে চেঁচাতে লাগল।

গোঁ গোঁ করে জয়ধ্বজ বললে, ফের পালাবার চেষ্টা করবি তো ঠ্যাং ভেঙে দেব এবার। হয়রান হয়ে নেউলে বললে, সত্যি বলছি, আমি পাঁচিল টপকে ঢুকেছিলুম বটে, কিন্তু আট-দশটার বেশি কুল আমি খাইনি। দোতলার বারান্দা থেকে ভীম জ্যাঠা কে রে বাগানে? বলতেই আমি দৌড়ে পালিয়ে এসেছি। কুলগাছের ডাল কে ভেঙেছে তার কিছু জানি না কাঁদো কাঁদো হয়ে নেউলে সমানে বলে যেতে লাগল : সত্যি বলছি কিছু জানি না।

জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা আবার চুপ। নেউলে বলতে লাগল : সত্যি ভাই, আমায় ছেড়ে দাও। হতে পারে, দুচারটে কুল আমি বেশি খেয়েছি, লাফিয়ে নামবার সময় কুলগাছের এক-আধটা ডাল ভেঙেও যেতে পারে কিন্তু তোমার দিব্যি, আর কোনওদিন আমি তোমার মামার বাগানে ঢুকব না।

জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা আবার এ-ওর দিকে তাকাল। কী বলা যায় ভেবে পেল না।

তারপর একটু সামলে নিয়ে ট্যাঁপা বললে, আর সাইকেল?

কিসের সাইকেল?–নেউলে হাঁ করে তাকাল।

ট্যাঁপা আবার কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আঙুলের একটা খোঁচা দিয়ে জয়ধ্বজ থামিয়ে দিল তাকে। ট্যাঁপাকে একবার চোখ টিপে বললে, তুই নাকি কার সাইকেলে ঢিল মেরে দুটো স্পোক ভেঙে দিয়েছিস?

আমি?–নেউলে এবার চটে গেল–বেশ মজা তো! না হয় তোমার মামার বাগানে ঢুকে দুটো কুলই খেয়েছি, তাই বলে রাস্তার লোকের সাইকেলে আমি ঢিল ছুঁড়ব? আমি পাগল নাকি?

না, তুই একটা বুদ্ধ তোর মগজে কেবল খুঁটে–এই বলে জয়ধ্বজ টকাস করে একটা টোকা মারল নেউলের মাথায় : যা ভাগ। কিন্তু খবরদার, আর কখনও মামার বাগানে ঢুকেছিস তো–

শেষ কথা আর কে শুনছে? ছাড়ান পেয়ে নেউলে তখন বাড়ির দিকে ভোঁ-দৌড়!

আশ্চর্য হয়ে ট্যাঁপা বললে, ছেড়ে দিলি ওকে?

ব্যাজার মুখে জয়ধ্বজ বললে, ছেড়ে দেব না তো কী করব? ওর মুখ দেখে বুঝতে পারছিস না? মামার বাগানে ঢুকে কুল চুরি করেছে, ডাল ভেঙে পালিয়েছে। ভেবেছে, মামা আমাদের লেলিয়ে দিয়েছে ওকে পিট্টি দেবার জন্য। তাই অমনভাবে পালাচ্ছিল। সাইকেলের ও কিছু জানে না।

কিন্তু এমন তো হতে পারে যে, ও আমাদের ধোঁকা দিয়ে গেল?

জয়ধ্বজ একটু হাসল।

অতই যদি ওস্তাদ হবে তা হলে ও গোয়েন্দা-গল্পের কোনও দস্যু-সর্দার-টদার হতে পারত, বাবার ঘড়ি চুরি করে ঠ্যাঙানি খায়? না–নেউলে নয়, ও সাইকেল চুরির কিছু জানে না। ওকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে হল।

তা হলে?

মাথার ওপর মিষ্টি নীল আকাশ। টুকরো টুকরো সাদা মেঘে রোদের সোনা জ্বলছে। মাথার ওপর দিয়ে এক জোড়া চখা-চখী উড়ে গেল কোনও নদীর চরের দিকে। একটু চুপ করে থেকে জয়ধ্বজ বললে, চল, ওঠা যাক।

কোথায় যাবি? মোনা পালের ওখানে? না, পঞ্চ সামন্তের কাছে?

ভেবে দেখি।

দুজনে মাঠ পেরিয়ে একটা কাঁচা রাস্তায় এসে পড়ল। নেউলে দৌড় করিয়ে তাদের অনেকদূর নিয়ে এসেছে, অনেকটা হেঁটে তাদের গ্রামের দিকে ফিরতে হবে।

ভাবতে ভাবতে চলেছিল, হঠাৎ ট্যাঁপারই চোখে পড়ল। দারুণ উত্তেজিত হয়ে খপ করে জয়ধ্বজের জামা টেনে ধরল।

জয়, দেখেছিস?

কী দেখব?

লক্ষ কর কাঁচা রাস্তার ওপর। সাইকেলের টায়ারের দাগ।

দুজনেই ঝুঁকে পড়ল তক্ষুনি।

কাঁচা রাস্তায় সাইকেলের চাকার দাগ থাকা খুব স্বাভাবিক, কত লোকেরই তো সাইকেল আছে আশেপাশে। কিন্তু একটু বিশেষত্ব ছিল এই দাগগুলোর। প্রথম কথা, সাইকেলটা খুব অল্প আগেই এই রাস্তা দিয়ে চলে গেছে কারণ তার ওপরে এখনও পথচলতি মানুষের পায়ের ছাপ কিংবা গোরুর গাড়ির চাকার দাগ পড়েনি। আর দ্বিতীয় কথা–

দ্বিতীয় কথা, চাকার দাগগুলো ভারি স্পষ্ট। আনকোরা নতুন টায়ারের দাগ যেমন পড়ে। শিউরে উঠে ট্যাঁপা বললে, তোর সাইকেলের দাগ।

জয়ধ্বজ ভুরু কুঁচকে বললে, হতে পারে, না-ও হতে পারে।

না-ও হতে পারে মানে? একেবারে নতুন সাইকেল?

আর কেউ যে একটা নতুন সাইকেল কিনতে পারে না, এমন তো কথা নেই।

কিন্তু এদিকের কেউ নতুন সাইকেল কিনলে নিশ্চয়ই জানা যেত। বাজারে সে আসতই।

হয়তো আজকাল কেউ কিনে এনেছে, আমরা দেখিনি।

ট্যাঁপা বিরক্ত হয়ে বললে, তর্ক করিসনি। আমার মন বলছে, এ তোরই সাইকেল। চল, ফলো করি।

জয়ধ্বজ বললে, চল।

কিন্তু কত দূর চলে গেছে সাইকেল, এ পথ কোন গ্রাম থেকে কোথায় এগিয়ে গেছে, কে জানে তার খবর! তবু দুজনে সেই দাগ ধরেই এগিয়ে চলল। একটু দূরে আম-জামের ছায়ায় ছোট্ট একটা গ্রাম দেখা যায়–দাসপুকুর। হয়তো দাসপুকুরেই লুকিয়ে আছে সাইকেল চুরির চাবিকাঠি!

আর তখন তাদের দেখা হল সেই রাখাল ছেলেটার সঙ্গে। একপাল মোষ তাড়িয়ে নিয়ে আসছিল সে।

ট্যাঁপা তাকে ডাকল : এই শোন।

.

চার

রাখাল ছেলেটা আসছিল গান গাইতে গাইতে। বেশ খুশি মেজাজ। একটা লালচে মতন মোষের বাচ্চার গায়ে হাতের ছোট লাঠিটা দিয়ে টুকটুক করে তাল দিচ্ছিল, আর গাইছিল : দেখে এলেম নদীয়ায় সোনার গোরাচাঁদে রে–

ট্যাঁপা আবার ডাকল : এই গোরাচাঁদ, শুনছিস?

গান থামিয়ে ছেলেটা বললে, আমার নাম পেল্লাদ, গোরাঁচাঁদ নয়।

ঠিক আছে, পেল্লাই হল। তোর বাড়ি কোথায়?

ওই কুমিরডাঙায়। দাসপুকুরের বাঁয়ে।

তা বেশ। কিন্তু একটা লোককে তুই দেখেছিস?

পেল্লাদ হি-হি করে হাসল।

একটা লোক কেন গো, কত লোককেই তো দেখেছি। এই তোমাদেরও তো দেখছি।

কথাটা ভুল হয়েছে বুঝে ট্যাঁপা মাথা চুলকোল। বললেন, নানা, একটা সাইকেলে-চড়া লোক। সাইকেলে চেপে কেউ এদিক দিয়ে যায়নি?

হুঁ, গেছে বই কি। একটু আগেই তো গেল।

কী রকম সাইকেল? নতুন?

নতুন কিংবা পুরনো–সে আমি কেমন করে জানব? তবে পেল্লাদ একটু ভেবে নিল : তা রোদ্দুরে বেশ চিকিমিকি করছিল বটে।

ঠিক ধরেছি তা হলে।–ট্যাঁপা একই সঙ্গে উৎসাহ আর রোমাঞ্চ বোধ করল : বুঝলি জয়, তা হলে ওই লোকটাই। আচ্ছা পেল্লাদ, লোকটা সাইকেল নিয়ে কোনদিকে গেল বলতে পারিস?

দাসপুরের দিঘির বাগেই তো গেল মনে হচ্ছে।–পেল্লাদ এবার চোখ মিটমিট করল : কেন গো, বিত্তান্তটা কী? এত খোঁজখবর নিচ্ছ কেন?

সে খবরে তোর দরকারটা কী?–ট্যাঁপা বিরক্ত হল : মোষ চরাতে যাচ্ছিলি তাই চরা গে। চল জয়, আমরা দাসপুরের দিঘির দিকে এগোই।

পেল্লাদ ব্যাজার মুখে বললে, বেশ লোক তো। নিজেরা আমায় সাত কাহন কথা জিজ্ঞেস করলে, আর আমি কিছু জিজ্ঞেস করলেই দোষ? ঠিক আছে, আর কিছু বলব না। আমি। বলেই বাচ্চা মোষটার পিঠে আবার লাঠির ঠোকা দিয়ে গান ধরল : দেখে এলেম নদীয়ায়–

জয়ধ্বজ একটাও কথা বলছিল না এতক্ষণ, চুপ করে দাঁড়িয়ে কী ভাবছিল। ট্যাঁপা তাকে একটা খোঁচা দিয়ে বললে, দাঁড়ালি কেন, চল না।

জয়ধ্বজ বললে, আমার কিন্তু একটা কথা মনে হচ্ছে ট্যাঁপা! সাইকেল গাঁয়ের ভেতরেই কোথাও আছে, বাইরে যায়নি।

তুই বললেই হল?–ট্যাঁপা চটে গেল : তা হলে একটা নতুন সাইকেল নিয়ে দাসপুরের দিঘির দিকে কে গেল? মাইন্ড ইট–দাসপুরের দিঘি। তার একদিকে ভাঙা একটা শিবমন্দির, দুদিকে জঙ্গল। গ্রাম বেশ খানিকটা দূরে। কেন লোকটা সাইকেল নিয়ে ওদিকে যাবে?

কেন?

এটাও বুঝতে পারলিনে?–ট্যাঁপার হঠাৎ মনে হল, সে শার্লক হোমস হয়ে গেছে : সাইকেলটা দিনকয়েক ওই ভাঙা মন্দিরে কিংবা জঙ্গল-টঙ্গলে লুকিয়ে রেখে দেবে। তারপর

এদিকের হইচই থেমে গেলে ওটাকে বের করে এনে সরিয়ে ফেলবে।

ভুরু কুঁচকে একটু চুপ করে রইল জয়ধ্বজ। তারপর বলল, আচ্ছা, চল।

দুজনে এগিয়ে চলল। ট্যাঁপার উৎসাহই বেশি।

একটু তাড়াতাড়ি পা চালা জয়! লোকটা সাইকেলটা লুকিয়ে ফেলে যদি একবার সরে পড়তে পারে, তা হলে মুস্কিল হবে।

পথের ধুলোয় টায়ারের দাগ মধ্যে মধ্যে পরিষ্কার চোখে পড়ছে। যাচ্ছে দাসপুরের দিকেই। পেল্লাদ মিথ্যে কথা বলেনি।

দুজনে দাসপুর পাশে রেখে দিঘির দিকে চলল।

পুরনো দিঘি, পুরনো শিবমন্দির। কতকাল আগেকার কেউ জানে না। দিঘির উঁচু পাড়িতে বেলগাছের সার, আশেপাশে জঙ্গল। অনেককাল আগে এখানে নাকি বাঘ আসত।

এখানেও টায়ারের দাগ। এতক্ষণে জয়ধ্বজেরও উৎসাহ হচ্ছিল। একটা গোলমাল কিছু আছে নিশ্চয়ই। নইলে খামকা একটা লোক কেন আসতে যাবে এই জংলা দিঘির ধারে?

দিঘির ভাঙা ঘাটটার ওপর ওরা এসে দাঁড়াল। জল চোখেই পড়ে না। হাওয়ায় শালুক দুলছে, পদ্মপাতা দুলছে। ফড়িং উড়ছে–পদ্মপাতার ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে খঞ্জন আর জলপিপি। মাথার ওপর ঝিরঝির করছে বেল আর শিরীষের পাতা।

কিন্তু কোথায় সাইকেল–কোথায় কে!

লোটা এর মধ্যেই সরে পড়ল নাকি?

ট্যাঁপা বললে, শিবমন্দিরটা একবার দেখি, আয়।

মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ওরা। মাথার ওপর পাকে পাকে জড়িয়ে একটা অশ্বথের গাছ। মন্দিরের দরজা নেই–ভেতরে একরাশ কালো ছায়া, ভাঙা দেওয়াল দিয়ে রোদের দু-একটা টুকরো পড়েছে ফুটিফাটা বেদীর ওপর। কয়েকটা চামচিকে ইট আঁকড়ে ঝুলে আছে কোনায় কোনায়। আর কিছুই নেই।

জয়ধ্বজ বললে, এখানে নেই।

ট্যাঁপা বললে, তাই তো দেখছি।

হঠাৎ দিঘির পাড়ির তলা দিয়ে দুড়দাড় করে শব্দ। কেউ যেন ছুটে পালাচ্ছে।

জয়, সেই লোকটা!–ট্যাঁপা লাফিয়ে উঠল : পালাচ্ছে।

দুজনে দৌড়ল সেইদিকে। ঢালু পাড়ি বেয়ে হুড়মুড় করে নামতে গিয়ে ট্যাঁপা পা পিছলে পড়ে গেল, গড়িয়ে পড়ল হাত তিনেক। জয়ধ্বজ তাকে টেনে তুলল।

কিন্তু পরিশ্রমটা মাঠেই মারা গেল।

যে দুড়দাড় করে দৌড়ে যাচ্ছে–তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। সে মানুষ নয়, পাটকিলে রঙের অল্পবয়েসী গোরু একটা। ওদের মধ্যে মধ্যে ওরকম আচমকা ফুর্তি জেগে ওঠে, তারপরে অকারণেই লেজ তুলে দৌড়ে বেড়ায় খানিকটা।

জয়ধ্বজ বললে, ধেৎ–গোরু!

ট্যাঁপা পায়ে হাত বুলাতে বুলোতে বললে, , গোরুই তো। কোনও মানে হয় না–মাঝখান থেকে হাঁটুটাই খানিক ছড়ে গেল আমার।

দুজনে কিছুক্ষণ চুপ।

জয়ধ্বজ মাটিতে বসে পড়ে একটা শুকনো বেল কুড়িয়ে নিয়ে ভাঙা ইটের ওপর ঠুকতে লাগল।

ট্যাঁপা বললে, কী করা যায়, জয়?

ভাবছি।

তুই তো খালি ভেবেই চলেছিস। কিন্তু লোকটা যে কোথায়–

জয়ধ্বজ জবাব দিল না, একমনে বেলটাকে ঠুকতে লাগল।

চটে, তার হাত থেকে বেলটাকে কেড়ে নিলে ট্যাঁপা।

নে–ওঠ ওঠ–আর বসে বসে ছেলেমানুষি করতে হবে না। চল, জঙ্গলের ভেতরে দেখি একবার।

কিন্তু ওকে কি আর পাওয়া যাবে! কোনদিকে চলে গেছে এতক্ষণে।

যাবে আর কোনদিকে, জঙ্গল ছাড়া? রাস্তার দিক দিয়ে যদি যেত, তা হলে তো আমরাই দেখতে পেতুম। চল জয় সামনের জঙ্গলে খুঁজে দেখি। নিশ্চয় কোথায় ঘাপটি মেরে আছে এখানে।

আচ্ছা, চল—

বেল, শিরীষ আর আগাছার বনের মধ্যে ওরা কয়েক পা কেবল এগিয়েছে, এমন সময়—

দুম্ করে একটা বন্দুকের শব্দ। একসঙ্গে দুজনের বুক চমকে উঠল একেবারে।

লোকটাকে দেখা গেল বনের মধ্যে, সাইকেলটাকেও। তার হাতে বন্দুক। সেই বন্দুক থেকে তখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছে। আর জ্বলন্ত চোখে সে চেয়ে আছে ওদের দিকেই।

.

পাঁচ

লোকটির মাথায় শোলার হ্যাঁট, গায়ে সাদা হাফশার্ট। মালকোঁচা করে ধুতি পর। বন্দুক থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে তখনও। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপার দিকে।

আর সাইকেলটা হেলান দেওয়া রয়েছে একটা শিমুল গাছের গায়ে, তার ক্যারিয়ারে বাঁধা একটা ক্যাম্বিসের থলে, একছড়া কলা বেরিয়ে আছে তা থেকে। হ্যাঁন্ডেলে ঝুলছে একটা জলের বোতল।

সাইকেলটা জয়ধ্বজের নয়। কস্মিনকালেও নয়।

আর বন্দুক-হাতে লোকটি কিছুক্ষণ এদের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আরে–জয়ধ্বজ না? এখানে কী মনে করে?

আরে রাম রাম, সেই পেল্লাদের কথা শুনে–এ কী কাণ্ড! এ যে জেলা বোর্ডের ওভারসিয়ার মোহনলালবাবু! ভীমরাজ পুরকায়েতের সঙ্গে খুব খাতির, দোকানে প্রায় আসেন কখনও কাপড়-চোপড় কিনতে, কখনওবা নিছক গল্পগুজব করতে।

ট্যাঁপা গোটা দুই খাবি খেল। জয়ধ্বজ মাথা চুলকোতে লাগল।

আজ্ঞে কিছু না–এই একটু বেড়াতে বেড়াতে–

মোহনলাল বললেন, না হে, এদিকটায় বেশি এসো-টেসো না। পুরনো ইটের পাঁজা চারদিকে বিস্তর গোখরা সাপ আছে। আমি অবিশ্যি মধ্যে মধ্যে আসি, ঘুঘু মারি, বন-মুরগিও পাওয়া যায় এক-আধটা। আর আমার সঙ্গে তো বন্দুক থাকেই।

দুই বন্ধু চুপ। ট্যাঁপার হাঁটুটা টনটনিয়ে উঠল আবার। ধুত্তোরখালি খালি ক্রোশখানেক হাঁটার পণ্ডশ্রম। তায় আবার ধুড়ম করে একটা আছাড় খেতে হল। পেল্লাদটা তো আচ্ছা হতভাগা! চারদিকের সবাই ওভারসিয়ারবাবুকে চেনে, আর সে চেনে না!

জয়ধ্বজই সামলে নিলে। বললে, পাখি-টাখি কিছু পেলেন মোহনকাকা? মোহনলাল ব্যাজার হয়ে বললেন, কই আর পেলুম! বরাতটাই খারাপ আজকে। বেশ মোটাসোটা একটা তিতির পেয়েছিলুম ঝোঁপের ভেতরে, বন্দুকের ঘোড়া টিপতে যাচ্ছি, পুটুস করে ঠিক সেই সময় একটা গেছে পিঁপড়ে দিলে বাঁ কানটায় কামড়ে! ভীষণ চমকে গেলুম, হাত নড়ে গেল–একটা চার নম্বরের টোটাই বরবাদ। আর টোটার যা দাম আজকাল!

এই বলে বাঁ কানটা খুচখুচ করে একটু চুলকে নিলেন মোহনলালবাবু। তারপর বন্দুকটাকে দুভাঁজ করে ভেঙে কাঁধের ওপর ব্যালান্স করলেন।

গুলির আওয়াজে সব তো পালিয়েছে এদিক থেকে। দেখি, দিঘির পাড়ির ওপরে এক-আধটা ঘুঘু-টুঘু পাই কি না। তার আগে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক, ভারি খিদে পেয়েছে।–ক্যাম্বিসের থলেটা থেকে কলার ছড়া আর একটা পাউরুটি বের করতে করতে বললেন, এসো হে জয়ধ্বজ, শেয়ার করো। আর তুমি–তোমাকেও চেনা-চেনা ঠেকছে–হুঁ, আচার্যি-বাড়ির ট্যাঁপা না?

ট্যাঁপা বললে, আজ্ঞে।

তা হলে ব্রাহ্মণ-সন্তানকেই আগে দিতে হয়। নাও ধরো বলে একটা কলা বাড়িয়ে দিলেন।

আজ্ঞে না, না, আমাদের কিছু দরকার নেই—আমরা—

কিন্তু কে শুনছে সেকথা। মোহনলাল দুজনের হাতে দুটো কলা প্রায় জোর করেই খুঁজে দিলেন। তারপর বললেন, রুটি?

আজ্ঞে আর না– জয়ধ্বজ প্রাণপণে প্রতিবাদ করল : আমরা একটু আগেই ভাত খেয়ে বেরিয়েছি।

তা হলে থাক। বনবাদাড়ে আর ঘুরো না–বলতে বলতে হঠাৎ মোহনলালবাবুর চোখ মিটমিট করে উঠল : বুঝলে জয়ধ্বজ, এদিকে আসবার সময় রাস্তায় তোমার মামার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।

মোহনলাল একেবারে আধখানা কলা মুখে পুরে দিয়ে বললেন, তিনি কথায় কথায় তোমার খুব প্রশংসা করছিলেন। বলছিলেন, যেমন কাজের ছেলে, তেমনি সাবধানী আর সেই রকম দায়িত্বজ্ঞান।

শুনে জয়ধ্বজের মুখটা লম্বা হয়ে ঝুলে পড়ল। সাবধানী আর দায়িত্বজ্ঞানই বটে! না হলে, সকালের এমন ঝিলমিলে রোদের ভেতরে নেপালদার চায়ের দোকান থেকে সাইকেলটা তার চুরি হয়ে গেল। এরপরে মামার সামনে গিয়ে সে দাঁড়াবে কোন মুখে?

কলার বাকিটুকু চিবুতে চিবুতে মোহনলাল আবার মিটমিট করে তাকালেন এদের দিকে।

যাও–যাও, রোদ্দুরে খামকা ঘুরতে নেই স্ট্রেট বাড়ি চলে যাও এবার। ভালো কথা ধাঁধার উত্তর-টুত্তর আসে তোমাদের?

ট্যাঁপা কলাটা ছুলতে যাচ্ছিল, থমকে গেল সে কথা শুনে। জয়ধ্বজ ভুরু কুঁচকে তাকাল।

ধাঁধা?

মোহনলাল মাথা নেড়ে বললেন, হুঁ–ধাঁধা। আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল জবাব দিতে পারিনি। তোমরা ভেবে দেখো তো। ধাঁধাটা হল :

চিন্তামণি নেই রে বনে,
থাকেন তিনি ঘরের কোণে।
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।

বুঝলে কিছু?

জয়ধ্বজ বললে, আজ্ঞে না।

ট্যাঁপা বিরক্ত হচ্ছিল। জয়ধ্বজের কানে কানে বললে, ধাঁধা-ফাঁধা নিয়ে কী পাগলামি আরম্ভ করলি জয়? ওদিকে এতক্ষণে সাইকেল-চোর–

মোহনলাল মুচকি মুচকি হাসলেন।

উত্তরটা বুঝি পেয়ে গেছ ট্যাঁপা?

আজ্ঞে না, উত্তর পাইনি। পেলে আপনাকে জানাব এখন। চল জয়, আমরা যাই

পাউরুটিতে মস্ত একটা কামড় দিয়ে মোহনলাল বললেন, হ্যাঁ, সেই ভালো। বাড়ি চলে যাও। তারপর কেমন মিটমটি করে তাকাতে লাগলেন ওদের দিকে। সেই তাকানোটা

জয়ধ্বজের ভালো লাগল না।

আবার সেই পুরনো রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরা। মন-মেজাজ দুজনেরই খারাপ।

ট্যাঁপা বললে, ধুং ফলস্ ক্লু।

জয়ধ্বজ বললে, বুঝতে পারিনি এখনও।

তার মানে?–ট্যাঁপা উত্তেজিতভাবে বললে, তুই কি ভাবছিস মোহনলালবাবুই সাইকেল-চোর? কিংবা চোরের দলের সঙ্গে যোগ আছে তাঁর?

জিভ কেটে জয়ধ্বজ বললে, আরে রাম!

তবে?

আমি ভাবছি ধাঁধাটার কথা।

দুত্তোর ধাঁধা–ট্যাঁপা চটে গেল : কোথাকার এক চিন্তামণি আর গৌ-মাতা! কোনও মানে হয় না। যত সব বোগাস লোক।

হয়তো একটা মজা করলেন।

তা হবে। কিন্তু ট্যাঁপা–তুই তো লেখাপড়ায় দারুণ ভালো ছেলে। ধাঁধাটা মনে আছে তোর?

কেন মনে থাকবে না?–

চিন্তামণি নেই রে বনে,
থাকেন তিনি ঘরের কোণে।
গৌ-মাথা তার বলেন হেসে
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।

কিন্তু ধাঁধা চুলোয় যাক। এখন তাড়াতাড়ি পা চালা।

কোথায় যাওয়া যাবে এবার?

মোনা পালের কাছে। দাগী চোরকয়েকবার জেল খেটেছে।

জয়ধ্বজ বললে, কিন্তু মামা বলছিল, মোনা নাকি আজকাল আর চুরি-চামারি করে না–স্রেফ ভালোমানুষ হয়ে গেছে?

ধুর বাজে কথা। চোরের স্বভাব বদলায় কোনওদিন?

তা ছাড়া মোন কোনওদিন গাঁয়ের কারও জিনিস চুরি করেনি।

চোরের আবার ধম্মোজ্ঞান!

আরে যে দাগী চোর সে তো বোঝে, কারও কোনও কিছু খোয়া গেলে পুলিশ প্রথমেই তাকে সন্দেহ করবে, আর তাকে ধরেই পিটুনি লাগাবে।

তুই বড্ড এঁড়ে তক্কো করিস জয়! ট্যাঁপা ভীষণ বিরক্ত হল : পিটুনি খেলে চোরের কিচ্ছু হয় না। ওসব ওদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। ওরা জানে, পেটে খেলে পিঠে সয়।–রেগে গিয়ে ট্যাঁপা এবার খোসাসুদ্ধ কলাটাই মুখে পুরে ফেলল : আমি বলছি, মোনা পালকেই একবার বাজিয়ে দেখি।

আচ্ছা–চল।

মোনা পালকে খুঁজতে হল না। বাড়ির সামনেই ছিল সে। কালো কটকটে বেঁটে চেহারার লোক, মাথা ভর্তি সাদা সাদা কদমছাঁট চুল, গোঁফ আর ভুরু ধপধপে পাকা। সে তখন একটা দড়ির খাঁটিয়া তুলে দমাদম করে আছাড় মারছিল। আর সেই খাঁটিয়া থেকে টুপটাপ করে পড়ছিল প্রমাণ-সাইজের সব ছারপোকা। বিশ্রী রকম মুখ ভেংচে, পা দিয়ে ঘষে ঘষে সেইসব ছারপোকাকে সংহার করছিল মোনা পাল।

ট্যাঁপা ডাকল : ও মোনাদা!

মোনা জবাব দিল না, তেমনি যাচ্ছেতাই মুখ করে ছারপোকা মারতে লাগল।

ও মোনাদা! বলি, শুনছ?

উত্তরে মোনা পাল আবার খাঁটিয়া তুলে আছাড় মারল একটা।

জয়ধ্বজ বললে, ওভাবে ছারপোকা সাবাড় করতে পারবে না–খাঁটিয়ায় আগুন লাগাও। কিন্তু ব্যাপার কী, আমাদের কথার জবাব দিচ্ছ না কেন?

মোনা পাল বললে, আমি আজকাল কানে কম শুনি।

কবে থেকে?–জয়ধ্বজ হেসে ফেলল : পরশুও তো হাটে তুমি বেশ দর-দাম করে বেগুন কিনছিলে?

মোনা পাল নিরুত্তরে আবার আছাড় মারল খাঁটিয়ায়।

মোনাদা, কবে থেকে কানে কম শুনছ?–আবার জিজ্ঞেস করল জয়ধ্বজ।

আজ থেকে।

কিন্তু আমি এবার এত আস্তে আস্তে বললুম, তবু তো শুনতে পেলে?

মধ্যে মধ্যে শুনতে পাই, কিন্তু আর পাব না–বলে মোনা পাল গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর মাটিতে চোখ নামিয়ে ছারপোকা খুঁজতে লাগল।

জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা এ-ওর দিকে তাকাল।

হুঁ–পরিস্থিতি বেশ গুরুতর। সন্দেহের নিবিড় মেঘে আকাশ ঘনীভূত।

.

ছয়

ট্যাঁপা ডাকল : ও মোনাদা!

মোনাদার সাড়া নেই। মাটির দিকে চোখ রেখে সমানে ছারপোকা খুঁজছে সে। ট্যাঁপা বিরক্ত হয়ে বললে, আরে শোনোই না মোনাদা! কানে না হয় একটু পরেই কম শুনো, তার আগে সোজা বাংলায় দুএকটা কথার জবাব দাও দিকি?

মোনা পাল এবার কানে হাত দিয়ে কেমন ঘোলা ঘোলা চোখে ট্যাঁপার দিকে তাকাল। তারপর বললে, অ্যাঁ–জবাই? আমি তো মুরগি জবাই করি না। কালু মিঞার কাছে যাও।

না–না-জবাই না, জবাব। মানে উত্তর।

মোনা পাল বললে, উত্তরপাড়া? সে হল গে তোমার কোন্নগরের কাছে।

ট্যাঁপা চটে গিয়ে বললে, আমাদের, কী বলে, লাইফ অ্যান্ড ডেথ–মানে জীবন-মরণ সমস্যা, আর তুমি মস্করা করছ আমাদের সঙ্গে?

মোনা বললে, গুশকরা? না–না, সে ইদিকে কোথায়? নলহাটি লাইনে যেতে হয়।–আর… বলেই খাঁটিয়াটা তুলে আর একবার চিৎকার ছাড়ল একটা।

সোজা কথায় জবাব দাও মোনাদা-নইলে একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে যাবে, তা বলে দিচ্ছি। জয়ের নতুন সাইকেলটা নেপালদার দোকানের সামনে থেকে চুরি হয়ে গেছে। সে সাইকেল তুমি দেখেছ?

মাইকেল? মাইকেল তো পদ্য লেখেন। পাঠশালার পণ্ডিতমশাইয়ের মুখে শুনিছি।

ট্যাঁপা আবার চেঁচিয়ে উঠল : ও–কিছুতেই কানে শুনবে না ঠিক করেছে? খানিকটা ফুটন্ত গরম জল এনে কানে ঢেলে দিচ্ছি তোমার, দেখি, শুনতে পাও কি না।

মোনা এটাও শুনতে পেল না। মাটিতে ছারপোকা খুঁজতে লাগল আবার।

ট্যাঁপা তড়াক করে লাফ মারল একটা, বোধহয় কারও বাড়ি থেকে এক কেটলি গরম জল আনার জন্যেই দৌড়ে যাচ্ছিল সে। জয়ধ্বজ চটে যায়নি, বরং সমস্ত ব্যাপারটায় তার বেশ মজা লাগছিল।

আঃ, থাম না ট্যাঁপা। মোনাদা যদি কানে শুনতে না-ই পায়, তা হলে কী করা যাবে আর।

না, কানে শুনতে পায় না! সবটাই চালাকি।

দাঁড়া–দাঁড়া, মাথা গরম করিসনি। আমি দেখছি।–ও মোনাদা!

মোনাদা তেমনি কানে হাত দিয়ে ঘোলা চোখে জয়ধ্বজের দিকে তাকাল।

পোনার কথা বলছ? তোমার মামা এবার অনেক পোনা ছেড়েছে তালডাঙার পুকুরে।

ট্যাঁপা খেঁকিয়ে উঠতে যাচ্ছিল, জয়ধ্বজ তার মুখে হাত চাপা দিয়ে দিলে। তারপর বললে, মামা যে অনেক পোনা ছেড়েছে তালডাঙার পুকুরে, সে আমি ভালোই জানি। সে-খবর তোমায় দিতে হবে না। কিন্তু জিজ্ঞেস করছি, আমার সাইকেলটার কথা।

মোনা বললে, কিছু শুনতে পেলুম না।

পাবে—পাবে–জয়ধ্বজ একটু হাসল : মামা আমার সাইকেলটার কথা তোমায় কিছু বলেছিল?

ট্যাঁপা লক্ষ করল না, কিন্তু জয়ধ্বজ টের পেল, মোনা পাল যেন চমকে উঠল একটু।

জামা? খামকা জামা গায় দেব কেন?

জামা নয়–মামা।

ধামা? কিনবে? তা আমাকে বলছ কেন? বুনোপাড়ায় যাও, ওরা ধামাকুলো তৈরি করে বেচে। যত ধামা চাও-দেবে।

ট্যাঁপা রাগে সাপের মতো ফুঁসছিল। বললে, কী ওর সঙ্গে বকবক করছিস জয়! ও কোনও জবাব দেবে না। সোজা আঙুলে যে ঘি ওঠে না–সে তো দেখতেই পাচ্ছিস। চল, থানায় যাই। সাইকেল এ-ই সরিয়েছে–নির্ঘাত।

মোনা বললে, ভাত খাবে? এই বেলা তিনটের সময়? কেন–দুপুরে খাওয়া হয়নি নাকি?

দাঁত কিড়মিড় করে ট্যাঁপা বললে, জয়, এর সঙ্গে আর দুমিনিট কথা বললে আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে-রিয়্যালি! থানাতেই চল। দারোগা ধরে নিয়ে গিয়ে একে বেশ করে ঠ্যাঙাকসুড়সুড় করে সত্যি কথা আপনিই বেরিয়ে আসবে।

না। থানায় যাব না। মোনাদা যাতে এক্ষুনি কানে শুনতে পায়, সে ব্যবস্থা আমি করছি।–বলেই জয়ধ্বজ মুখটাকে মোনা পালের বাঁ কানের কাছে নিয়ে গেল। তারপর কানের ফুটোয় মুখ রেখে আকাশ কাঁপানো এক বাজখাঁই হাঁক ছাড়ল : মো-না-দা!

সেই নিদারুণ চিৎকারে ট্যাঁপার পর্যন্ত পিলে চমকে উঠল। আর মোনা আঁতকে গিয়ে এক লাফে হাতখানেক শূন্যে উঠে পড়ল, তারপর ধপাৎ করে বসে গেল মাটিতে।

জয়ধ্বজ বললে, এতেই শুনতে পাবে, না ডান কানেও আর একটা আওয়াজ দেব?

মোনা পাল একেবারে হাঁউমাউ করে উঠল।

উরিব্বাবা! তোমার এক চিৎকারেই আমার মগজে তালগোল পাকিয়ে গেছে বাবা জয়ধ্বজ! আর হাঁক ছেড়ো না–তা হলে মারা পড়ে যাব। তুমি মানুষ খুনের দায়ে ফেঁসে যাবে তাহলে।

এবার সব কথা শুনতে পাচ্ছ মোনাদা?

শুনতে পাচ্ছিনে আবার? আমার যে বুড়ি পিসিমা তিরিশ বছর বদ্ধ কালা হয়ে রয়েছে, তোমার ওই বোম্বাই হাঁক শুনলে তারও কান সাফ হয়ে যেত। বলল, কী বলতে চাও।

ট্যাঁপা বললে, এবার ডান কানে আমিও একটা ডাক ছাড়ি জয়। তখন থেকে বড্ড ভুগিয়েছে।

মোনা পাল সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে দুকান চেপে ধরল।

আরিব্বাস! এতেই আমার মাথায় ঘুরন-চক্কর চলছে তুমিও যদি একখানা ছাড়ো, তা হলে আর আমি নেই, স্রেফ গো-হত্যে হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি তোমাকে।

জয়ধ্বজ বললে, তা হলে সোজাসুজি কটা কথার উত্তর দাও।

বলো।

আজ সকাল থেকে তুমি কী করছিলে?

কী আর করব? ঘুম থেকে উঠে, মুখটুক ধুয়ে, বাসী ভাত খানিক ছিল, তাই খেয়ে—

তাই খেয়ে?

মাঠে গেলুম। সেখানে ধান কাটা হচ্ছিল। আমিও খানিকটা কাটলুম।

তারপর?

তারপর তোমার মামার সঙ্গে দেখা হল।

জয়ধ্বজ নড়ে উঠল একটু।

মামা কী বললেন?

কী আর বলবেন? কেমন আছ-টাছ এইসব। তা আমি বেশিক্ষণ মাঠে থাকতে পারিনি। আমার একজন সোয়ারি ছিল কিনা, তাকে গোরুর গাড়িতে করে ইস্টিশনে নিয়ে গেলুম–সকালের ট্রেন ধরাতে।

তারপর?

তার আর কী? বাড়ি এসে ডোবা থেকে কটা কুচো চিংড়ি ধরলুম, কলমি শাক তুলে তাই দিয়ে রান্না করলুম। তারপর ভাত বেঁধে–

ট্যাঁপা ছটফট করে উঠল : আচ্ছা জয়, কী পাগলামি হচ্ছে? এখানে দাঁড়িয়ে থেকে মোনাদার আবোল-তাবোল শুনছিস, অথচ–

জয়ধ্বজ বললে, দাঁড়া–দাঁড়া, শুনেই নিই না। কিছুই বলা যায় না, কাজে লেগে যেতে পারে।–হ্যাঁ, ভাত রাঁধবার পরে কী করলে মোনাদা?

কী আর করব? খেলুম। কুচো চিংড়ি দিয়ে কলমি শাকের ঝোলটা যে কী ভালো হয়েছিল–

সে থাক। তারপর?

তারপর খাঁটিয়া পেতে ঘুমোবার চেষ্টা করলুম। কিন্তু অ্যায়সা ছারপোকা বুঝলে, গোটা পিঠে যেন হালচাষ করে দিলে। ঘুমাব কী, পাঁচ মিনিট শুয়ে থাকে সাধ্যি কার! তারপর খাঁটিয়া এনে ছারপোকা মারছি–এমন সময় তোমরা এলে।

এর মধ্যে আর কিছু নেই?

কিসসু নেই। মা কালীর দিব্যি।

মা কালীর নাম নিয়ে মিথ্যে কথা বলছ মোনাদা? নাকি আবার চিৎকার ছাড়ব?

না–না, আর দরকার হবে না– মোনা পাল শিউরে উঠে বললে, এখনও আমার বুকের ধড়ফড়ানি থামেনি। তা–তা এর মধ্যে একটা কিছু হয়েছিল বই কি।

কী হয়েছিল?

সে ভীষণ ব্যাপার–মোনা একবার চারদিকে তাকিয়ে নিলে : সে তো এখানে বলা যাবে না, চুপি চুপি বলতে হবে।

কেউ শুনছে না, কোনও লোক নেই এদিকে। বলো তুমি।

মোনা বললে, না–না, বাইরে সে কথা বলবার জো নেই। চলো আমার ঘরের ভেতরে।

ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ বললে, বেশ, ঘরেই চলো তা হলে।

ট্যাঁপা আগে ঘরে ঢুকল, পেছনে জয়ধ্বজ। এবং তৎক্ষণাৎ–

তৎক্ষণাৎ এক টানে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলে মোনা পাল। তারপর–ঝনাৎ! সোজা শেকল তুলে দিল দরজায়।

ভেতর থেকে ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ চেঁচিয়ে উঠল : এ কী হচ্ছে মোনাদা-দরজা বন্ধ করে দিলে কেন? খোলো—খোলো–

অট্টহাসি করে মোনা পাল বললে, আমার কান খারাপ হয়ে গেছে, আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।

মোনা পালের ঘরে শেকলবন্দী হয়ে তো দুজনে থ।

ব্যপারটা যে সত্যি সত্যিই এত দূর গড়াতে পারে, এরকম ভাবাই যায়নি। এ যে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুনো যাকে বলে। নেপালদার দোকানের সামনে থেকে জয়ধ্বজের নতুন সাইকেলটা চুরি হয়ে গেল, হতেই পারে, অনেক সাইকেলই তো চুরি যায়। কিন্তু গোটা জিনিস শেষ পর্যন্ত এমন প্যাঁচালো হয়ে যাবে, এ ওদের স্বপ্নেও ছিল না।

তা হলে কেবল একটা সাইকেল চুরিই নয়, যে-কোনও এক ছিচকে চোরের কাণ্ডকারবারও নয়! এর পেছনে গভীর চক্রান্ত আছে। কিন্তু কী চক্রান্ত? কী সে উদ্দেশ্য?

আর মোনা পাল—

কথা নেই, বার্তা নেই–দুম করে শেকল আটকে পালিয়ে গেল! কালা সাজবার ভান করে বাঁদর নাচাচ্ছিল ওদের। লোকটা তো দারুণ ঘুঘু।

ট্যাঁপা বিরক্ত হয়ে বললে, জয়, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কী? এই ঘরে কয়েদ হয়ে থাকব নাকি?

জয়ধ্বজ বললে, থাম, একটু ভেবে নিই।

এতে আবার ভাবাভাবির কী আছে। বেরুতে হবে না এখান থেকে?

জয়ধ্বজ বললে, বেরুবার জন্যে চিন্তা নেই, ও যা পলকা দরজা, একটা-দুটো লাথি মারলেই শেকল-টেকল সুদ্ধ উপড়ে পড়ে যাবে।

তবে তাই করা যাক, আয়।

ট্যাঁপা দরজার দিকে এগোচ্ছিল, জয়ধ্বজ তার হাত চেপে ধরে বললে, দাঁড়া।

দাঁড়াব কী? এটা কি একটা ঘর নাকি?ট্যাঁপা নাক কোঁচকাল : রামো–রামো, কী নোংরা বিছানাটিছানা পড়ে রয়েছে মেঝেতে। ওদিকে আবার কতগুলো হাঁড়িকুঁড়ি! যেন ছুঁচোরও গন্ধ পাচ্ছি।

তা কী করা যাবে, গরিব মানুষের ঘর এরকমই হয়ে থাকে।

তোর আবার মোনা পালের জন্যে দরদ দেখা দিল নাকি?ট্যাঁপা একটা হাঁ করল : হতে পারে গরিব, কিন্তু তাই বলে শয়তানী করবে আমাদের সঙ্গে? মানে কী এর?

মানে একটা আছেই, একটু একটু আঁচ পাচ্ছি যেন।

কী পাচ্ছিস?

সাইকেলটা ও-ই সরিয়েছে।

সে তো এখন জলের মতো পরিষ্কার– ট্যাঁপা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল : তা হলে আর সময় নষ্ট করে কী হবে, চল–দরজা ভেঙে বেরিয়ে পড়ি। ধরে ফেলি মোনাকে।

ধরা যাবে না। বুড়ো হলে কী হয়, এখনও ঘোড়ার মতো ছোটে। ওকে দৌড়ে ধরা তোর-আমার কাজ নয়। ও যদি অলিম্পিকে যেত না, বুঝলি, ঠিক সোনার মেডেল পেয়ে যেত প্রিন্টে।

ট্যাঁপা বললে, জয়, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? এদিকে মোনা পাল গেল পালিয়ে, আর তুই সোনার মেডেল পাওয়াচ্ছিস ওকে! ধরতে হবে লোকটাকে?

ধরা যাবে ওকে, আর ধরেও কোনও লাভ নেই। আমি ততক্ষণে একটু ভেবে আমাদের পরের প্রোগ্রামটা একটু ঠিক করে নিই।

এই ঘরে? এই ছুঁচোর গন্ধের ভেতর?

চুলোয় যাক ছুঁচো। আগে মোনার ওপর একটু প্রতিহিংসা নেওয়া যাক।– মিটমিট করে হাসল জয়ধ্বজ : শুধু ছুঁচোর গন্ধ পাচ্ছিস, আর কিছু না? ওদিকে দড়ি বাঁধা একছড়া পাকা চাঁপা কলা ঝুলছে, দেখছিস? নিয়ে আয়-সাবাড় করে দিই।

এই তোর কলা খাওয়ার সময়?

কলা খাওয়ার আবার সময়-অসময় আছে নাকি? পেলেই খেতে হয়। কলা খেতে খেতে প্ল্যান ঠাওরাব–

ট্যাঁপাকে দরকার হল না, জয়ধ্বজ নিজেই কলার ছড়াটা পেড়ে আনল। বললে, নে।

উৎসাহ ছিল না, তবু ট্যাঁপাকে কলা মুখে পুরতে হল।

জয়ধ্বজ বললে, বেশ কলাগুলো–না?

ট্যাঁপা রাগ করে বললে, সাইকেল তোকে পেতে হবে না, ওই কলাই খা।

আহা–দাঁড়া দাঁড়া।–কলা চিবুতে চিবুতে জয়ধ্বজ বললে, আচ্ছা, মোহনলালবাবুর সেই ছড়াটা মনে আছে?

দুত্তোর ছড়া! কী হবে তা দিয়ে?

দরকার আছে। বল না। তুই ভালো ছাত্র, ঠিক মনে করে রেখেছিস?

ট্যাঁপা গজগজ করে বললে,

চিন্তামণি নেইকো বনে,
আছেন তিনি ঘরের কোণে
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে,
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।

জয়ধ্বজ বললে, হুঁ। গৌ-মাতা তার–মানে এই দুটো লাইনই খটকা ঠেকছে।

এখন বুঝি ধাঁধার উত্তর বের করবি?

উঁহু, সাইকেল খুঁজে বের করব। চল–বেরাই এখান থেকে।

ট্যাঁপা তৎক্ষণাৎ বন্ধ দরজায় লাথি মারতে যাচ্ছিল, জয়ধ্বজ বললে, দরকার নেই।

মানে? বেরুব কী করে?

আরে ভেতরের ওই দরজাটা দেখছিস না? খিল দেওয়া রয়েছে? খুললেই বেরিয়ে যেতে পারব।

তাই তো-তাই তো! ট্যাঁপা লজ্জা পেল। এ-পাশে একটা খিল-দেওয়া দরজা যে রয়েছে তার সে-খেয়ালই হয়নি। আসলে, উত্তেজনায় তার মাথাই গরম হয়ে গিয়েছিল, আর জয়ধ্বজ ওটা ঢুকেই দেখতে পেয়েছে বলে একটুও ঘাবড়ায়নি।

সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দুজনে পেছনের উঠনে। মোনা পালের বাড়িতে তো কোনও পাঁচিলের বালাই নেই, কাজেই বাইরের রাস্তায় ঘুরে আসতে আধ মিনিটও লাগল না।

বাইরে ঝাঁ ঝাঁ করছে দুপুরের রোদ। কোনওদিকে জন-মানুষের চিহ্ন নেই। মোনা পাল যে কোথায় উধাও হয়েছে, ভগবানই জানেন। কেবল বাইরে তার ছারপোকা-ভর্তি খাঁটিয়াটা আকাশে চারটে ঠ্যাং তুলে চিতপাত হয়ে রয়েছে।

ট্যাঁপা বললে, কী করবি এখন? মোনাই নিশ্চয় সাইকেল-চোর, কিন্তু কোথায় পাচার করল সেটা?

পাশেই একটা জামগাছের তলায় মোনার গোরুর গাড়িটা। বলদ দুটো একটু দূরে মাঠে বাঁধা–ঘাস খাচ্ছে তারা।

কপাল কুঁচকে জয়ধ্বজ একটু ভাবল। তারপর এগিয়ে গেল গোরুর গাড়িটার দিকে।

ট্যাঁপা বললে, ওখানে কী?

দ্যাখ না–

জয়ধ্বজ দ্রুত হাতে গোরুর গাড়িতে বিছানো খড়গুলো সরাতে লাগল।

ওর তলায় সাইকেল লুকোনো আছে? তোর মাথা খারাপ?

জয়ধ্বজ জবাব দিল না। আর একটু পরেই তার গলা থেকে বেরুল একটা জয়ধ্বনি।

ট্যাঁপা–এই দ্যাখ।

একমুঠো খড় বাড়িয়ে ধরেছে জয়ধ্বজ। তাতে তেলকালিমাখা।

অ্যাঁ–এ যে—

হ্যাঁ, সাইকেল থেকে লেগেছে– জয়ধ্বজ হাসল : এই গোরুর গাড়িতে সাইকেল পাচার করেছে স্টেশন থেকে আসবার সময়। কিন্তু নেপালদা তো তখন বাইরে দাঁড়িয়ে চা করছিল– জয়ধ্বজ ভুরু কোঁচকাল : চল ট্যাঁপা।

নেপালদার কাছে?–উত্তেজনায় ট্যাঁপা হাঁপাতে লাগল।

না, পঞ্চু সামন্তের কাছে। ভুলে গেলি! তমলুকে তার সাইকেলের দোকান?

চল—চল–

দুজনে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল।

.

সাত

জয়ধ্বজ বললে, তা হলে এবার—

ট্যাঁপা বললে, হুঁ, পঞ্চু সামন্ত।

দাঁড়া–তা হলে ব্যাপারটা মনে মনে একটু গুছিয়ে নিই।–মোনা পালের এক কাঁদি চাঁপা কলা খেয়ে মেজাজটা খুব ভালো হয়ে গিয়েছিল জয়ধ্বজের : গোড়া থেকেই ধরা যাক। আমরা নেপালদার দোকানে ঢুকে চা খাচ্ছিলুম কখন? ধর, নটা–সাড়ে নটা। খড়গপুর লোক্যাল আমাদের স্টেশন পার হয়েছে কখন? ধর, আটটা চল্লিশ–এই রকম একটা সময়ে। তা হলে–

তা হলে সাইকেলটা নিয়ে ট্রেনে তুলে দেয়নি তো রে?

সে কী করে হবে? গাড়িতে সোয়ারি ছিল বলছে। তাদের সামনে আর সাইকেলটা চুরি করবে কী করে?

যদি সাঁট থাকে?

হতে পারে। কিন্তু তারও একটা মুস্কিল আছে। স্টেশনের ভেতর একটা সাইকেল নিয়ে গিয়ে ট্রেনে ভোলা লোকের চোখে পড়বেই। তা ছাড়া আটটা চল্লিশের গাড়িতে কাউকে তুলতে হলে দশ-পনেরো মিনিট আগে এসেছে নিশ্চয়ই, তাকেও তো টিকিট কাটতে হবে। তাহলে আটটা পনেরো থেকে আটটা ত্রিশের ভেতরে–আগেও হতে পারে–মোনা পাল এসেছে স্টেশনে। তখন তো আমরা নেপালদার দোকানে পৌঁছুইনি মোটেই।

ট্যাঁপা একটু ভেবে বললে, হুঁ, ঠিক কথা।

নিতে হবে ফেরবার সময়। সে কখন? নটার পর থেকে সাড়ে নটাৰু ভেতর।– জয়ধ্বজের ভুরুটা কুঁচকে এল : তখন তো নেপালদা দোকানের সামনে তার কাঠের টেবিলে চা তৈরি করছে। সাইকেল রয়েছে তার চোখের সামনেই।–একটু থামল জয়ধ্বজ : কী করে সম্ভব যে নেপালদা দেখতে পেল না?

ট্যাঁপা হঠাৎ শিউরে উঠল : আচ্ছা, এমন তত হতে পারে, নেপালদার সঙ্গে চোরের বন্দোবস্ত আছে?

জয়ধ্বজ হাসল।

যাঃ।

যাঃ কেন? অসম্ভব নাকি? ট্যাঁপা এবার গোয়েন্দা-গল্পের লাইনে ভাবতে আরম্ভ করেছিল : বুঝলি, বাইরে থেকে যাকে সবচেয়ে ইনোসেন্ট মনে হয়, আসলে হয়তো দেখা যায় সে-ই সব চাইতে বড় ক্রিমিন্যাল। শার্লক হোমসের একটা গল্পে

আরে দূর শার্লক হোমস!্যাঁপার এসব ভালো ভালো চিন্তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলে জয়ধ্বজ : গল্পের কথা রাখ। জানিস, অনেক সময় নেপালদা কলকাতায় গেলে মামা তার হাতে দুতিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে দেয় দোকানের জিনিস কেনবার জন্যে? এত বিশ্বাস করে যে, বলে–নেপালের কাছ থেকে হিসেব মেলাবারও দরকার নেই। আর যারই হোক, মামার কখনও লোক চিনতে ভুল হয় না।

তোর ভারি বিচ্ছিরি স্বভাব, জয়! ভেবেচিন্তে কু বের করি, আর সঙ্গে সঙ্গে তুই সব গুলিয়ে দিস।

জয়ধ্বজ বললে, কী করা যায় বল? মিথ্যে কুর পেছনে ছুটে তো কোনও লাভ নেই। আমার কেবল মনে হচ্ছে সবটাই যেন চোখের সামনে রয়েছে অথচ আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। যেন সেইসব প্রশ্নের অঙ্কের মতো–পড়লে ধাঁধা লাগে, কিন্তু জিনিসটা ধরতে পারলেই টক করে হয়ে যায়।

বিরক্ত হয়ে ট্যাঁপা বললে, মোনা পালকে ধরলেই অঙ্কের ফল মিলে যেত।

নিশ্চয়। একটুও সন্দেহ নেই।–জয়ধ্বজ মাথা নাড়ল : আমাদের ধোঁকা দিয়ে বেমালুম পালিয়ে গেল। আর সামনে থেকে পালালেই বা কী করা যেত? এখন চুরি করে না, কিন্তু চোরের ঠ্যাং তো–তার সঙ্গে দৌড়ে পাল্লা দেওয়া তোর-আমার কাজ নয়।

লোকটার কানে আরও গোটা দুই চিৎকার ছাড়তে পারলে কাজ হত–ট্যাঁপা গজগজ করতে লাগল।

তা হত। কিন্তু সেকান যে এখন কমাইল দূরে, তা কে জানে!

তাই বলে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবি?

নাঃ–চল, পঞ্চু সামন্তের ওখানে যাওয়া যাক। ওরই তো সাইকেলের দোকান আছে তমলুকে, চোরাই সাইকেল পাচার করে দেওয়া ওর পক্ষেই সম্ভব।

আবার চলা। ট্যাঁপা ক্রমশ বিরক্ত হচ্ছে, ভাবছে–এখন মোনা পালকেই খুঁজে বের করা উচিত, তা হলে সব পরিষ্কার হয়ে যায়। আর মাথার ভেতর একটা চিন্তাই পাক খাচ্ছে জয়ধ্বজের : চোখের সামনে থেকে সাইকেলটা তুলে নিয়ে গেল, তবু কেন দেখতে পেল না। নেপালদা–কেন?

আর চোরের সঙ্গে কোনও যোগ আছে নেপালদার–এ কথা পাগলেও ভাবতে পারে না।

পঞ্চু সামন্তের একটা ছোট দোকান আছে এখানেও। সকালটা সে এখানে থাকে, বিকেলে বাসে চেপে তমলুক যায়।

দোকানের সামনে, একটা প্রকাণ্ড পাম্পারের ওপর প্রায় বৈঠকি দিয়ে একটা সাইকেল-রিকশার চাকায় হাওয়া ভরছিল মিচকে। পঞ্চুর ভাইপো। তার ভালো নাম একটা কিছু নিশ্চয় আছে, কিন্তু সবাই তাকে মিচকে বলেই ডাকে। নামটা বেমানান নয়, ভারি ঘুঘু ছেলে।

ওদের আসতে দেখেই কেমন যেন আড়চোখে তাকাল মিচকে, তারপরেই আবার পাম্পারের ওপর বৈঠকি দিতে লাগল।

ট্যাঁপা বললে, কেমন সন্দেহজনকভাবে তাকাল–দেখেছিস জয়?

জয়ধ্বজ বললে, হুঁ।

ওরা দাঁড়িয়ে রইল, মিচকে হুস হুস করে পাম্প দিতে লাগল। পাম্প হয়ে গেলে, রিকশাওলা নিতাই কৈরী তার পাঞ্জাব মেল নাম লেখা রিকশাটা নিয়ে বেল বাজাতে বাজাতে স্টেশনের দিকে রওনা হল।

তখন জয়ধ্বজ ডাকল :এই মিচকে!

দাঁড়াও না–একটু জিরিয়ে নিই। হাঁপিয়ে গেছি–দেখছ না?–হাফপ্যান্টের পকেট থেকে একটা তেলকালি-মাখা রুমাল বের করে মুখ মুছতে লাগল মিচকে। ওরা দাঁড়িয়ে রইল।

একটু সময় দিয়ে জয়ধ্বজ বললে, এই মিচকে, পঞ্চুমামা কোথায় রে?

গ্রাম সুবাদে পঞ্চ কীরকম মামা হয় জয়ধ্বজের। মিচকে বললে, মেজো কাকা? সে এখানে নেই, তমলুকে গেছে।

মিথ্যে কথা।–জয়ধ্বজ ধমকে উঠল : পঞ্চুমামা এ-বেলা কখনও তমলুকে যায় না, তায় আজকে ছুটির দিন।

তবু গেছে।

না–যায়নি।

মিচকে আবার সন্দেহজনকভাবে তাকাল। তারপর মিনমিন করে বলল, তবে তাই–তোমরা যখন বলছ, তা হলে যায়নি।

আছে কোথায় এখন?

আমি জানিনে।

জানিসনে?–জয়ধ্বজ চেঁচিয়ে উঠল : আবার মিথ্যে কথা?

তখন মিচকে মুখটাকে অদ্ভুত কাঁচুমাচু করে বললে, জানি জয়দা, জানি। কিন্তু বলব না–কক্ষনো বলব না।

কেন বলবি না?–জয়ধ্বজ একটা কড়া ধমক দিল।–তোকে বলতেই হবে। এই ট্যাঁপা, ধর তো ওকে। কেমন ও না বলে দেখি।–জানি কিন্তু বলব নাকক্ষনো বলব না!–কেমন না বলে আমি দেখছি—

কিন্তু কথা জয়ধ্বজের মুখেই রইল। দারুণ ঘুঘু ছেলে মিচকে, সে প্রচণ্ড বেগে একটা দৌড় দিল।

ধর–ধর করে ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ তার পেছু পেছু ছুটল।

কিন্তু মিচকের পায়ে তখন অলিম্পিক স্পিড। খানিকটা ছোটার পর মিচকে ওদের ছাড়িয়ে জঙ্গল পার হয়ে কোথায় চলে গেল চোখের নিমেষে!

ট্যাঁপা দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।–আর যাব না। কী হবে গিয়ে? মিচকেকে কিছুতেই ধরা যাবে না।

জয়ধ্বজও বসে পড়ে হাঁপাতে লাগল। খানিকটা পর একটু জিরিয়ে নিয়ে বললে, চল তো পঞ্চ সামন্তের বাড়ি, দেখি গিয়ে তাকে পাওয়া যায় কিনা।

.

আট

পঞ্চু সামন্তের বাড়ি এখান থেকে বেশি দূরে নয়। ওরা হাঁটতে লাগল দ্রুত পায়ে।

পঞ্চু সামন্তের বাড়িতে কেউ নেই, আছে এক বুড়ি বোবা পিসি। সেই ওদের দেখাশোনা করে, বেঁধে-টেধে দেয়। পিসি বোবা হলে কী হবে, তোক খুব ভালো।

জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা গিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাক দিল : পঞ্চুমামা–ও পঞ্চুমামা!

পিসি বারান্দায় বসে বড়ি দিচ্ছিল, ফিরেও তাকাল না। আবার ডাক ছাড়ল জয়ধ্বজ : পঞ্চুমামা, বাড়ি আছ?

পিসির যেন ভ্রুক্ষেপও নেই।

এবার ট্যাঁপা বাজখাঁই গলায় এক পেল্লায় হাঁক ছাড়ল–ও পিসি, বলি পঞ্চুমামা, কোথায়?

পিসি বড়ি দেবার ছোট টিনটা হাতে নিয়ে বারান্দা থেকে নেমে সেটাকে উঠোনের রোদে রেখে ইশারায় বললে, ভালো তো ব?

জয়ধ্বজ বললে, ভালো, কিন্তু পঞ্চুমামা কোথায়?

পিসি আবার একগাল হেসে ইশারায় বললে, তোর মার শরীর—

ভালো; কিন্তু পঞ্চুমামা কোথায়?

পিসি এবার গম্ভীর হয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল।

ও পিসি, কাঁদো কেন? পঞ্চুমামা কোথায়?–ট্যাঁপা এবার চিৎকার করে বললে।

সমস্ত মুখে একটা প্রচণ্ড ভয়ের ছায়া পড়ল পিসির। তারপর হাঁউমাউ করে একটা শব্দ করল খানিকক্ষণ। তারপর চটপট বড়ি দিয়ে চড়চড়ে হাতটা ধোবার জন্যে কুয়োর পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল।

ট্যাঁপা ধপ করে বারান্দায় বসে পড়ল।–জয়, এই বোবা কালা বুড়ীর সঙ্গে এভাবে কতক্ষণ কথা বলব বল তো? ও তো কিছুই বোঝে না! আর বলতেও পারে না।

জয়ধ্বজ বসে বসে ভাবতে লাগল। বললে, বুঝতে যদি পারে, তা হলে ওর কাছেই পঞ্চুমামার একটা হদিস মিলতেও পারে।

কিন্তু পিসিকে বোঝানো যাবে কী করে? ট্যাঁপা বললে, বোঝাতেই হবে যেমন করে হোক। পিসি লোক খুব ভালো, কিন্তু ভারি সাদাসিধে মানুষ। বিশেষ ঘোরপ্যাঁচ বোঝে না। এজন্যে পঞ্চুমামা ওকে খুব বকাবকি করে।

দেখ না তুই চেষ্টা করে, ওকে বোঝানোই যে শক্ত কাজ। যাক, হাত ধুয়ে আসুক তো আগে!

পিসি দুগ্লাস জল হাতে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। একটা রেকাবিতে দুটো নারকেলের নাড়। ইশারায় বললে, খাও তোমরা।

কী বিপদ! পিসি আমাদের হাঁপাতে দেখে ভেবেছে যে, জলতেষ্টায় আমরা মরে যাচ্ছি, এখুনি জল না পেলে আমাদের প্রাণ যাবে। তাই তাড়াতাড়ি জল আর নাড় এনে দিয়েছে।

জয় টপ করে রেকাবি থেকে একটা নাড় তুলে নিয়ে পিসির হাত থেকে জলের গ্লাসটা নিয়ে পিসিকে ইশারায় বললে, এখানে বসোকথা আছে। ট্যাঁপা, তুই নাড় আর জলটা খেয়ে ফেল, তারপর পিসিকে নিয়ে আমাদের পড়তে হবে।

নাড়ু আর জলটা খেয়ে জয় আর ট্যাঁপা কিছুটা সুস্থ হল। তারপর পিসির কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলে, পিসি, পঞ্চুমামা কোথায়?

পিসি ঘাড় নেড়ে জানাল, কী?–বুঝতে পারছি না।

পঞ্চুমামা–সাইকেলের দোকান করে যে।–ট্যাঁপা মুখ দিয়ে কিরিং-কিরিং শব্দ করে বারান্দায় খানিকটা দৌড়ে বোঝাতে চাইল–যে-গাড়ি বেল বাজায় আর দুপায়ে গড়গড় করে চলে।

পিসি অবাক হয়ে ওদের দুজনের মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী যেন বুঝতে চাইল। তারপর খানিকটা কী ভেবে নিয়ে ইশারায় জানাল : ঘরেই তো ছিল খাটে ঘুমিয়ে, এখন সে কোথায় গেছে জানি না– তারপর নিজেই যেন অবাক হয়ে ঘরের দিকে তাকিয়ে রইল।

যত সব বোবা কালাকে নিয়ে পড়া গেছে!–ট্যাঁপা বললে।–আমার মনে হচ্ছে উনি কিছু বুঝতেই পারছেন না।

পারছে না আবার! এমনিতে তো ঠোঁট নড়লেই অন্যদিন সব বুঝতে পারে, আজ একেবারে ন্যাকা সেজে গেছে যেন! কিছুতেই কিছু বুঝবে না ঠিক করেছে। ওর কাছ থেকে যে করেই হোক কথা বের করতেই হবে ট্যাঁপা, ধৈর্য হারালে চলবে না।–জয় বললে।

পিসি এক-একবার করে ইশারা করে, আবার ঘরের দিকে তাকায়, আবার বারান্দার কোনে কী যেন দেখে।

জয় বললে, পিসি, মিচকে কোথায়?

পিসি মাথা নাড়ল। বুঝতে পারছে না।

ট্যাঁপা বললে, মিচকে কি এখানেই থাকে?

জয় বললে, হ্যাঁ। ও পিসির খুব আদরের, ওকে পিসি ছেলের মত করে মানুষ করেছে। পিসির কেউ নেই কিনা। কিন্তু পিসি ঘরের মধ্যে বার বার তাকাচ্ছে কেন? ওখানে কী আছে?

পিসি, মিচকে কি পঞ্চুমামার খোঁজে গেছে?

পিসি শুধু ফিক ফিক করে হাসতে লাগল, কোনও কথার উত্তর দিল না।

সব বুঝছে, কিন্তু ন্যাকামির ভান করছে। জয় বললে।

কিন্তু উনি যদি কিছু না বলেন এই না বোঝার ভান করে, তা হলে আমরা কী করব? আমাদের তো করবার কিছু নেই। চল, চলে যাই–

করবার কিছু নেই? কী করি দেখ তা হলে।

.

নয়

মিচকে ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসছিল।

জয়ধ্বজ বললে : তবে রে। যত শয়তানীর মূলে এই ছোঁড়াটা। ও সব জানে কিন্তু বলবে না। ধর তো ট্যাঁপা, ওকে।

ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ ওর পেছনে ধাওয়া করতেই ও সেই ছড়াটা আওড়াতে আওড়াতে ছুট দিল তীরের মত বেগে

চিন্তামণি নেই কো বনে,
আছেন তিনি ঘরের কোণে
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে,
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।

দৌড়ে মিচকের সঙ্গে পারে সাধ্য কার?

খানিকটা ছুটে ট্যাঁপা বসে পড়ল।

বসলি যে?–জয় বললে,।

না, বসব না! চটেমটে ট্যাঁপা উত্তর দিল, ওর পেছনে পেছনে ছুটে কি ওকে ধরতে পারা যাবে? শুধু দৌড়নোই সার হবে। মোহনলাল, মিচকে, নেপালদা, পঞ্চু সামন্ত–এদের সবার যোগ আছে সাইকেল-চোরের সঙ্গে।

জয়ধ্বজও হাঁপাচ্ছিল। বললে, আমারও মনে হচ্ছে ওদের মধ্যে যে-কোনও একজনের কাছ থেকেই সব ব্যাপারটা জানা যেতে পারে। ওদের নিজেদের মধ্যে সাঁট আছে। তা ছাড়া আর একটা কথা আমার কেমন মনে হচ্ছে, সবটাই যেন চোখের সামনে রয়েছে অথচ আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। যেন সেইসব প্রশ্নের অঙ্কের মত–পড়লে ধাঁধা লাগে, কিন্তু জিনিসটা ধরতে পারলেই টক করে হয়ে যায়।

ধরতে পারলে তো টক করেই হয়ে যায়, কিন্তু ধরতে পারাটাই তো সমস্যা। ট্যাঁপা বলল।

ওই মিচকে সব জানে। পঞ্চুমামাকে কোনওমতে যদি ধরা যায়, তা হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, আমি মনে করি।–জয় বললে।–সে নিশ্চয়ই কোথাও লুকিয়ে আছে। ওই মিচকে সব জানে, কিন্তু বলবে না। সে যায়নি, এখানেই কোথাও আছে।

কিন্তু কোথায় যে আছে সেই তো কথা। ট্যাঁপা বললে–এখন আর বসে থেকে লাভ নেই, চল আমরা এগিয়ে চলি। বড্ড খিদে আর তেষ্টা পেয়েছে। একটু দূরেই আমার এক দূর-সম্পর্কের পিসিমা থাকেন, তাঁর কাছে গিয়ে খেয়ে নিই নইলে আর চলতে পারছি না।

ওরা দুজনেই এগিয়ে চলতে লাগল। বেলা পড়ে আসছে। দূরে সূর্য মাঠের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। পাখিরা বাসায় ফিরছে ধীরে ধীরে। ওরা এগিয়েই চলতে লাগল। পিসিমার বাড়ি তখন দেখা যাচ্ছে।

পিসিমারা গ্রামের সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ। অনেক খেতখামার, পুকুর, বাগান–গোয়াল-ভরা গোরু, মরাই-ভরা ধান।

ওরা এগিয়ে যেতেই লাগল। সন্ধে তখন, পিসিমা তুলসীতলায় আলো দিচ্ছেন। ওরা দুজন উঠনে এসে দাঁড়াতেই দেখল, পিসিমা তুলসীতলায় প্রণাম করলেন।

পিসিমা, আমি আর আমার এক বন্ধু এসেছি। বড্ড খিদে পেয়েছে আমাদের, শিগগির কিছু খেতে দাও–

ওরা ধপ করে বারান্দার ওপর বসে পড়তেই ঘরের খোলা দরজা দিয়ে দেখা গেল, কে যেন একজন ছায়ার মতো টুক করে পাছ-দরজা দিয়ে বাগানের মধ্যে নেমে পড়ল।

পঞ্চুমামা না?–জয় চিৎকার করে উঠল।

.

দশ

ট্যাঁপা চিৎকার করে উঠল, পঞ্চুমামা! তারপর পটলডাঙার টেনিদাকে কোট করে বললে, ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস।

জয় বললে, ইয়াক–ইয়াক–ছোট-ছোট–

খাওয়া রইল মাথায়, ওরা পঞ্চু সামন্তের পেছনে ছুটতে লাগল।

খানিকটা সোজা পথে ছুটে লোকটা জঙ্গলের বাঁকা পথ ধরল।

তখন অন্ধকার নেমে গেছে। জঙ্গল-পথ বাঁকা, তার ওপর একটা কালো চাঁদরে লোকটার মুখ ঢাকা। ওরা কিছু ঠাহর করবার আগেই লোকটা তার পরিচিত পথ ধরে কোথায় কোনদিকে উধাও হয়ে গেল। একে অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না, তার ওপর অপরিচিত পথ। ওরা অনেকটা ছুটেও লোকটাকে ধরতে পারল না, কোথায় যেন মিলিয়ে গেল সে।

ওরা ঘুরতে ঘুরতে ফের একটা বড় গোয়ালঘরের পাশে চলে এল। জয়ধ্বজ বললে, আমরা আজ আর বাড়ি যাব না। রাতে এই গোয়ালঘরেই থাকব। পাশেই তো ওই পথুমামার বিরাট গোয়াল, সকালে ওখানে পঞ্চুমামা আসবেই। তখন–

একটু অন্যমনস্কভাবে আবার বলল জয়ধ্বজ, মামা সাইকেলটা দেবার সময় আমাকে বলেছিলেন, যত্ন করে রাখিস–কেউ চুরি-টুরি করে না নিয়ে যায়। আমি বলেছিলুম, কোনও চোরের ঘাড়ে তিনটে মাথা নেই যে, জয়ধ্বজ মণ্ডলের সাইকেল চুরি করে নেবে। মামা বলেছিলেন, বেশ, দেখব, কেমন হুঁশিয়ার ছেলে তুই। সাইকেলটা উদ্ধার না করে মামার কাছে দাঁড়াতে পারব আমি! প্রেসটিজ থাকবে আমার?

তা বটে–তা বটে! ট্যাঁপা ভাবনায় পড়ল।

গেজেট সুরেশ হালদার এতক্ষণে খুকখুক করে কাশতে কাশতে গিয়ে নিশ্চয়ই খবর দিয়েছে মামাকে-নেপালের চায়ের দোকান থেকে তোমার ভাগনের সাইকেলটা লোপাট। জানি না মামা আমাকে এ-সব শোনবার পর কী ভাবছে। না ট্যাঁপা, আমি এই গোয়ালঘরেই বসলাম, সাইকেল উদ্ধার না করে আমি আর কোথাও যাব না। যদি পাই, তখন মুখ করে বলতে পারব–দ্যাখো মামা, এই সাইকেল–জয়ধ্বজ মণ্ডলের জিনিস কেউ হজম করতে পারে না।

ওরা গোয়ালঘরের ভেতরেই একপাশে বসে পড়ল। কিন্তু গোয়ালটা বড্ড নোংরা, পাঁক আর কাদায় ভরা। বসবার জায়গা নেই। ট্যাঁপা বললে, চল না, আমরা পাশের পঞ্চুমামার গোয়ালঘরে গিয়ে বসি, ওটা বরং বেশ পরিষ্কার আছে।

ওরা পাশের বেড়াটা পার হয়ে পথু সামন্তের গোয়ালঘরে গিয়ে ঢুকল।

গোয়ালটা পরিষ্কার বটে, তবে মশার হাত থেকে বাঁচা শক্ত। মেঘের মতো কালো হয়ে এসে মশারা ওদের হেঁকে ধরল। দুহাত দিয়ে সরিয়েও নিষ্কৃতি নেই, সর্বাঙ্গ যেন ফুলিয়ে দিল।

তার ওপর আর-এক উৎপাত। একটা গোরু পাশে দাঁড়িয়েছিল, খসখসে জিভ দিয়ে সমানে জয়ের গা চেটে চেটে চামড়া উঠিয়ে দিতে লাগল যেন সে। জয় যত পেছনে সরে যায়, গোরুটাও ততই এগিয়ে আসে। আর সরবে কোথায়? পেছনেও তো গোরুর পাল।

ট্যাঁপা বললে, পাশের ঘরে খড় জমা করা আছে। চল, খানিকটা খড় ওদের মুখের সামনে এনে দিতে পারলে আর গা চাটবে না–খড় খাওয়াতেই মন দিয়ে দেবে।

তাই চল, খানিকটা খড়ই এনে দিই গোরুটাকে। ও তো চেটে চেটে আমার গায়ে অর্ধেক চামড়া তুলে নিলে।

কিন্তু খড় টানতে গেলে তো শব্দ হবে। ওরা যদি চোর মনে করে আমাদের ওপর মারধোর করে!–ট্যাঁপা হঠাৎ ভেবে বললে।

তার তো সম্ভাবনা প্রচুর, কিন্তু কী করা যায় বল? যেভাবে গোরুগুলো আমাদের চাটতে আরম্ভ করেছে তাতে এখানে যদি একটুও বসে থাকি, ওরা আমাদের গায়ের আর একটু চামড়াও রাখবে না। তার ওপর মশা আর ডাঁশ তো আছেই।

কী করা যায়? চল দেখি, চুপি চুপি যাই।–ট্যাঁপা, তুই একটুও শব্দ করবি না। আর খড়ও টানবি খুব ধীরে ধীরে, যেন একটুও শব্দ না হয়। ওরা যেন কিছুই জানতে না পারে। তা হলে আমাকে আর তোকে ওরা আস্ত রাখবে না।

তা বটে! আগে তো হাতের সুখ করে নেবে চোর বলে; পরে জানতে পারলে হয়তো আপসোস করবে। কিন্তু তাতে তো আমাদের গায়ের জ্বালা কমবে না।

আচ্ছা চল, পা টিপে টিপে এগোই আমরা। না এগিয়ে তো কোনও উপায়ও নেই।

ওরা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল।

ট্যাঁপা!–জয় ডাকল : মোহনলালের ধাঁধাটার কথা তোর মনে আছে?

হ্যাঁ, কেন থাকবে না? খুব মনে আছে–

চিন্তামণি নেই রে বনে,
থাকেন তিনি ঘরের কোণে।
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।

কোত্থেকে এল ওই যে কে এক মোহনলাল-ধাঁধা-ফাঁধা নিয়ে কী যে, এক পাগলামি করতে লাগল। আর জয়, তোর মাথায়ও সেই পাগলামি ঢুকেছে দেখছি।কিসের বা চিন্তামণি, আর কিসের বা গৌ-মাতা! যত সব পাগলামো

জয় মাথা নাড়ল, চুপ কর–চুপ কর। আমি ভাবছি ধাঁধাটার কথা। আর অত কথা বলিস না, শেষে ধরা পড়ে যেতে হবে। একেই তো সকাল থেকে কার মুখ দেখে যেন আজ উঠেছি। সাইকেলটা চুরি গেল, তারপর থেকে সারা সকাল আমাদের ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে, তার কোনও তুলনা নেই। এরপরেও হয়তো আরও কত কষ্ট আছে কে জানে!

ওরা ধীরে ধীরে এগোতে লাগল।

নিশুতি রাত। পঞ্চ সামন্তের বাড়ির সবাই অঘোর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে। ওরা ধীরে ধীরে খড়ের গাদার কাছে এগিয়ে এল, কিন্তু খড় টানতে দ্বিধা করতে লাগল। যদি শব্দ হয়, তাহলে সবাই তো জেগে যাবে। ধরাও পড়ে যাবে, কাজও হবে না।

ট্যাঁপা বললে, এখানেই বসি না আমরা! গোয়ালঘরে যাবার আমাদের কী দরকার?

জয় বললে, না। জানলাটা ওদের ঘর বরাবর। ওটা খুললেই আমাদের স্পষ্ট দেখা যাবে। তার ওপর একটু যদি নড়াচড়া করি তারও শব্দ শোনা যাবে। আর গোয়ালঘরে থাকলে গোরুর নড়াচড়ায় ওরা ভাববে যে গোরই ওরকম করছে। ওখানে যে মানুষ আছে, ওরা তা ভাবতেও পারবে না। তুই ধীরে ধীরে খানিকটা খড় ওপাশ থেকে টেনে নে। গোরুগুলোকে একটু ঠাণ্ডা করতে না পারলে ওরা আমাদের ওখানে কিছুতেই স্থির হয়ে বসতে দেবে না।

জয় এগিয়ে গেল পা টিপে টিপে; পেছনে ট্যাঁপা। ঘরের এক কোনে খড়ের গাদার কাছে গিয়ে গোরুকে দেবার জন্যে গাদায় টান পড়তেই কী যেন লাগল হাতে।

জয় চাপা গলায় ট্যাঁপা–! বলে ডাক দিয়ে জোরে টান দিতেই হুড়মুড় করে একটা কচকে নতুন সাইকেল মাটিতে পড়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে পঞ্চ সামন্ত চোর–চোর! মিচকে, লাঠি নিয়ে আয়, গোয়ালে চোর ঢুকেছে। বলে কে হাতে ইয়া এক বোম্বাই গদার মত লাঠি আর এক হাতে লণ্ঠন নিয়ে ছুটে এল।

.

এগারো

না–না করতে করতেও জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপার পিঠে বেশ গোটা কতক জোর রদ্দা ধাঁই ধাঁই করে পড়ে গেল। পঞ্চুমামা যেন কথাগুলো শুনেও শোনেন না। ট্যাঁপা চিৎকার করে। বললে, এ যেমন রদ্দা হাঁকড়াচ্ছে–আমার কানটা কানপুরে, নাকটা নাগপুরে পাঠিয়ে আমায় টেনিদার ভাষায় মুগ্ধবোধ করে ছাড়বে! চিৎকার কর—

ও পঞ্চুমামা!–আমরা জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা!

এতক্ষণে যেন কথাটা পথুমামার কানে গেল।

ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।

উঠনের ওপরে নতুন সাইকেলটা ভোরের আলোয় চকচক করছে। তাকিয়ে তাকিয়ে জয়ধ্বজের মনে পড়ছে–সাইকেল নয় তো, যেন রাজত্ব। যেদিন সকালে ব্রাউন পেপারে মোড়া নতুন সাইকেলটা তাকে দেখিয়ে মামা বললেন, ওটা তোর, তোকে দিলুম–সেদিন জয়ধ্বজ প্রথমটা বিশ্বাসই করতে পারেনি। একটা সাইকেলের শখ যে তার কতদিনের, সে কথা তার চেয়ে বেশি করে কে জানে! এ যেন না চাইতেই হাতে স্বর্গ পেয়ে যাওয়া!

হঠাৎ চমক ভাঙল। মোহনলাল আসছেন মিটমিট করে তার দিকে তাকাতে তাকাতে–

চিন্তামণি নেই রে বনে,
থাকেন তিনি ঘরের কোণে।
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।

–বলি জয়ধ্বজ, ধাঁধার উত্তরটা এবার এল তোমার? কিছু চিন্তা করে পেলে?

জয়ধ্বজ মাথা নিচু করল। কোনও কথা বলল না।

তোমার মামা তোমার খুব প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, যেমন কাজের ছেলে, তেমনি সাবধানী আর সেই রকম দায়িত্বজ্ঞান। তার প্রমাণ পেলাম। কিন্তু পাবার আগে তো পরীক্ষার প্রয়োজন; তাই মোনাকে বলে তোমাদের সাইকেলটা খোঁজার সোজা পথটা একটু বাঁকা করে দিলাম। যাকে তার মামা এত প্রশংসা করছেন, তাকে একটু যাচাই করা প্রয়োজন বইকি! তুমি কী বলো ট্যাঁপা?

ট্যাঁপা এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।

তবে ঘোরানোটা একটু বেশি হয়ে গেছে।–মোহনলাল দাওয়ার ওপর একটা জলচৌকি নিয়ে বসে পড়লেন।

দরজার কাছে একটা শব্দ হল। মিচকে ঢুকছে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে হাসতে। সঙ্গে ভীমরাজ পুরকায়েত।

জয়ধ্বজ ছুটে মামার কাছে এগিয়ে গেল।

জয়।–মামা ডাকলেন।–আমার কাছে দাওয়ার ওপরে বসো।

পঞ্চু সামন্ত মিচকেকে নিয়ে একটু বেরিয়ে গেল–মামা, এক্ষুনি আসছি।

ভীমরাজ পুরকায়েত জয় আর ট্যাঁপাকে দাওয়ার ওপর বসিয়ে বললেন, দেখো, জয়ধ্বজ, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে। লম্বা রোগা চেহারার লোকটি এবার বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন।

তুমি জানো জয়ধ্বজ, আমি নিজের চেষ্টায় এত বড় ব্যবসা গড়ে তুলেছি। এত সম্পত্তি করেছি। আমি একটি দিন বিশ্রাম করিনি, কখনও অলস, অসাবধান হইনি।

দিদি তোমার কথা বলতেই, আমি তোমাকে আমার দোকানে কাজ শেখাবার জন্য নিয়েছিলাম। তুমি কাজে প্রথম বিরক্ত হতে। আমি নামা ধনেখালি, আর শান্তিপুরী, দেখা বেগমপুর বললেই তোমার ভুরু কুঁচকে আসত। আস্তে আস্তে তুমি কাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিলে। তোমার সবটাই সয়ে গেল। আস্তে আস্তে কাজটা ভালো লাগতে শুরু করল। আমি আগাগোড়াই নজর রেখে চললাম। ভুলচুক হলে ছোটখাটো ধমক দিতাম–এ ব্যবসার কাজ বাপু, সব সময় মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতে হয়।

আমার উদ্দেশ্য ছিল আলাদা। জানো, আমার ব্যবসার ভবিষ্যৎ মালিক তুমি। এত বড় ব্যবসা যার হাতে তুলে দিয়ে যাব, তাকে সব শিখিয়ে-পড়িয়ে যাওয়া দরকার–সব সময় লক্ষ রাখা উচিত তার ওপর। ত্রিশ বছরের পরিশ্রমে যে-দোকান আমি গড়ে তুলেছি, আনাড়ির হাতে পড়ে তা নষ্ট হয়ে যাবে–আমি তা কোনওমতেই সইতে পারব না।

আজ দুবছর তোমার কাজকর্ম দেখে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলাম। মনে হল না, ছেলেটা পারবে ব্যবসা সামলে রাখতে। সব সময় লক্ষ করি, খদ্দেরদের সঙ্গে তুমি ভালো ব্যবহার করো– কথা কইতে জানো সব রকম লোকের সঙ্গে। তোমার গুণে ব্যবসার উন্নতিও হয়েছে।

তাই খুশি হয়ে তোমাকে একটা নতুন সাইকেল দিলাম। তুমি এটা পেয়ে কেমন যত্ন করে রাখা তাই দেখবার জন্যে–অল্প দিয়ে পরীক্ষা করেছিলাম–বেশি পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সব নষ্ট করে না ফেলো। কিন্তু দেখলাম, তুমি সাইকেলটাকে চাবি দিয়ে না রেখে চা খেতে নেপালের দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়লে। তোমার ইচ্ছে চাবি দেবার, কিন্তু আনন্দে ভুলে গেছ। আমিই সাইকেলটা তুলে নিয়ে যাই–পঞ্চু সামন্ত সেটা গোয়ালঘরের খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখে।

তা হলে মামা, ওঁরা আমাদের এত কষ্ট দিলেন কেন? ট্যাঁপা বললে।

কষ্ট দেওয়া হল কেন? জয়কে পরীক্ষা করছিলাম। যদি কিছু খোয়া যায় ওর, আবার তা ফিরিয়ে আনার ধৈর্য-যত্ন-শক্তি আছে কি না তাই দেখছিলাম। ও সে পরীক্ষায় পাশ করেছে। এখন আমার বিশ্বাস হল, বিপদে পড়লে শক্ত হাতে হাতল ধরে বিপদকে কাটিয়ে ওঠবার শক্তি ওর আছে। আমি তোমায় আশীবাদ করি জয়, তুমি জয়ী হও।

এক-হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে মিচকে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে হাসতে এসে ঢুকল বাড়ির ভেতর। পেছন পেছনে পঞ্চ সামন্ত, নেপালদা, মোনা পাল। মিটমিট করে মোহনলালও রসগোল্লার হাঁড়িটার দিকে তাকাতে লাগলেন।

ভীমরাজ পুরকায়েত বললেন, ওটা তোমার অনার-এ আনিয়েছি জয়, তুমি ওগুলো সবাইকে ভাগ করে দাও। আয় ট্যাঁপা, তুই আমায় হেলপ কর।–বিজয়ীর হাসি হেসে জয়ধ্বজ ট্যাঁপাকে বললে।

পঞ্চাননের হাতি (উপন্যাস)

পঞ্চানন মুখোঁপাধ্যায়ের তিন কুলে আর কেউ ছিল না–শুধু আট বছরের একটি ফুটফুটে নাতনি ছাড়া। সে-নাতনিও তাঁর কাছে থাকে না, থাকে তাঁর ঠাকুর্দা ত্রিলোচন চক্রবর্তীর বাড়িতে। অর্থাৎ পঞ্চানন হচ্ছেন নাতনির দাদু।

পঞ্চাননের বাপ-মা তো সেই কবে মারা গেছেন–সে তো তিন যুগ আগে। ভাই-বোন বলতেও কেউ ছিল না। স্ত্রী মারা গেলেন বছর দশেকের একটি মেয়েকে রেখে। পঞ্চানন সেই মেয়েটিকে বড় করলেন, অনেক খুঁজেপেতে তিনখানা গাঁয়ের পরে ত্রিলোচন চক্রবর্তীর একমাত্র ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। ছেলেটির নাম নিতাই, খুব ভালো ছেলে বিএ পাশ করে কী সব ব্যবসা-ট্যাবসা করত। মেয়েটাকে সুখী দেখে পঞ্চাননের আনন্দের সীমা রইল না।

কিন্তু বরাত আর কাকে বলে!

নাতনি রুনকুমার ভালো নাম স্বাতী–তার যখন তিন বছর বয়েস, তখন দুদিনের সামান্য একটু অসুখেই তার মা চোখ বুজল চিরকালের মতো। শোকে-দুঃখে একেবারে পাথর হয়ে গেলেন পঞ্চানন। পঁয়তাল্লিশ বছরেই তিনি যেন ষাট বছরের বুড়ো হয়ে গেলেন।

তারপর আরও পাঁচটা বছর পার হল।

মেয়ের মৃত্যুর পর আর বেয়াইবাড়ি যাননি পঞ্চানন–একবারের জন্যেও না। মা-মরা নাতনিটার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন কী করে? ত্রিলোচন চিঠি লিখেছেন, বেয়াই, একটিবার অন্তত আসুন। জামাই নিতাই দু-তিনবার এসে ঘুরেও গেছে। পঞ্চানন যাননি–যেতেই পারেননি।

এর মধ্যে অবশ্য ত্রিলোচন চক্রবর্তী অবস্থা পাল্টে ফেলেছেন। ব্যবসার বুদ্ধি তাঁর ছিলই, নিতাইয়ের মাথাটা খুব সাফ, এই সাত-আট বছরের ভেতরে বাপ-ছেলেতে মিলে অনেক টাকা রোজগার করেছেন। ছিলেন সাধারণ গেরস্ত, হয়েছেন পেল্লায় বড়লোক। মস্ত তিনতলা বাড়ি করেছেন, অনেক জমি-জমা পুকুরবাগান এই সব হয়েছে–এমনকি একখানা মোটর গাড়ি পর্যন্ত কেনা হয়েছে। সেই গাড়িতে চড়ে তার ভোঁপ-ভোঁপ আওয়াজে গাঁয়ের গোরু-মোষকে চমকে দিয়ে নিতাই মধ্যে-মধ্যে ব্যবসার খাতিরে শহরে যায়।

পঞ্চাননের মনে আর একটা বাধা এইখানেই। তিনি গরিব মানুষ, পুরুতগিরি করে খান, সামান্য জমি থেকে যা ধান-টান আসে, তাতে একলা মানুষের কষ্টেসৃষ্টে চলে যায়। রামের মা বলে গাঁয়ের একটি অনাথা দূর সম্পর্কের বিধবা আত্মীয়া আছে, সে-ই এসে তাঁকে দুবেলা দুটো বেঁধে দেয়।

তাঁর নাতনি বড়লোকের আদরের দুলালী। ঠাকুদার চোখের মণি বাপ তার জন্যে পাগল, ঝি-চাকরে তাকে সব সময় আগলে রাখে। তায় দুবছর হল নিতাই কলকাতার কোন সাহেবি স্কুলে নিয়ে গিয়ে পড়াচ্ছে। নিতান্তই পেঁয়ো পুরুত ঠাকুর পঞ্চানন মুখুজ্যেকে সে কি আর চিনতে পারবে? এক-আধবার ভেবেছেন দু চারদিনের জন্যে রুনকুকে কাছে এনে রাখবেন, কিন্তু তাঁর এই মাটির দাওয়া আর এই টিনের ঘর–এখানে এসে কি সে থাকতে পারবে? যে রাজভোগ খায়, মোটা চালের ভাত আর শাক-তরকারি কি তার মুখে রুচবে?

এই সব ভেবেই পঞ্চানন এতদিন চুপ করে ছিলেন, এমন সময় একদিন একখানা ছোট্ট চিঠি এল তাঁর নামে। ছেলেমানুষী কাঁচা অক্ষরে লেখা–

দাদু, আমি গরমের ছুটিতে কলকাতা থেকে এখানে এসেছি। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। তুমি কেন আমার কাছে আসছ না? প্রণাম নিয়ো। রুনকু।

চিঠিটা পড়ে পঞ্চাননের চোখে জল এল। তিন বছর বয়সের যে ফুটফুটে নাতনিটিকে দেখে এসেছিলেন শেষবার, তাকে যেন নতুন করে আবার দেখতে পেলেন। এক মাথা কোঁকড়া চুল, দুষ্টুমিভরা বড় বড় চোখ আর সেই চোখের কাজল গালে-মুখে একাকার। পঞ্চানন এতদিন পরেও যেন তার আধো-আধো গলার ডাক শুনতে পেলেন, দাদু–দাদু!

যে-মেয়েটি তাকে দুবেলা বেঁধে-বেড়ে দেয়, সে বললেন, তা যাও না দাদা, নাতনিকে দেখেই এসো না এবারে। নিজের হাতে চিঠি লিখে তোমায় ডেকে পাঠিয়েছে।

চোখের জল মুখে পঞ্চানন বললেন, কিন্তু নাতনিকে দেখলে যে আমার মেয়েটার কথা মনে পড়বে।

সেজন্যে দুঃখ করে আর কী হবে, দাদা! যে যায় সে তো আর ফিরে আসে না। তাই বলে নাতনিকে তুমি ভুলে থাকবে?

তার ওপরে তারা এখন মস্ত বড়লোক

তারা বড়লোক তো কী হয়েছে। নাতনি তো তোমার।

অনেক ভেবেচিন্তে পঞ্চানন ঠিক করলেন, যাবেন এবারে নাতনিকে দেখতে। যদি আসতে চায়, নিয়েও আসবেন দু-চার দিনের জন্যে। হোক বড়লোকের মেয়ে–গরিব দাদুর ঘরে শাক-পাতা যা জোটে তাই খাবে পেট ভরে।

রওনা হবার দিন পঞ্চানন দেখলেন, রামের মা এক কাণ্ড করে বসে আছে। মুখবাঁধা দুটো মস্ত মস্ত হাঁড়ি তাঁর সঙ্গে যাবার জন্যে তৈরি।

আরে, এ কিসের হাঁড়ি? কী আছে এতে? কুটুমবাড়ি যাবে দাদা, খালি হাতে যাওয়াটা কী ভালো দেখায়? নারকোলের নাড়, চিড়ের মোয়া, মুড়কি–

ওরা বড়লোক, এ-সব খাবে?

বড়লোকে কি সোনা খায়?–রামের মা রাগ করে বললে, খুব খাবে, তরিবত করে খাবে। তুমি নিয়েই যাও না।

কিন্তু চার ক্রোশ রাস্তা, পায়ে হেঁটে যাব, সঙ্গে ছাতা থাকবে, ব্যাগ থাকবে। তায় এত বড় দুটো বাঘা হাঁড়ি, নেব কী করে?

তুমি নেবে কেন? এসব কি কেউ হাতে করে নিয়ে নিজে নিয়ে যায়? সঙ্গে তোমার পাইক যাবে।

পাইক!–পঞ্চানন আকাশ থেকে পড়লেন : আমি কি মহাজন, না জমিদারের নায়েব? পাইকবরকন্দাজ আমি পাব কোথায়?

এই তো আমি হাজির আছি দা-ঠাকুর!

যেন ভূতের গলা শুনছেন, এমনিভাবে চমকে ফিরে তাকলেন পঞ্চানন। দেখলেন, প্রায় হাত ছয়েক লম্বা রোগা কিটকিটে এক তালঢ্যাঙা মূর্তি, গায়ের রঙ ভুসো কালির মতো কালো। সেই মূর্তির মাথায় একহাত উঁচু এক পাগড়ি, হাতে বাঁশের লাঠি। রাত্তিরবেলা। মাঠে-ঘাটে চেহারাখানা দেখলে অতি বড় সাহসীও বাবা গো বলে টেনে দৌড় লাগাবে।

আরে–কে এটা!

আমি দামু এজ্ঞে–জ্যান্ত তালগাছ কান পর্যন্ত দাঁত ছড়িয়ে দিয়ে হাসল : আমায় চিনতে পারলেন না? আপনার দামু–সুদাম দাস।

চিনব কী করে–যা জগদ্দল পাগড়ি চাপিয়েছিস মাথায়! তার ওপরে ওই ঠ্যাঙা।

হিঁ-হিঁ–দামু আরও খুশি হল : এজ্ঞে পাইক হয়ে যাচ্ছি যে আপনার। একটু সাজগোজ করে যাব না?

সে তো বুঝতেই পারছি–পঞ্চানন ব্যাজার হয়ে গেলেন : তোকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব? তুই যে এক নম্বরের ভণ্ডুলরামকী করতে কী করে বসবি তার ঠিক নেই।

এজ্ঞে না, এখন আমি চালাক হয়ে গেছি–দামু বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠল : সঙ্গে নিয়েই দেখেন না আমাকে। কোনও গোলমাল যদি হয়, আমার কান ছিঁড়ে নেবেন।

কান ছিঁড়তে বলছে, সেটা ভালো কথাই। কিন্তু বেঁটে-খাটো ধরনের মানুষ পঞ্চানন সেকান হাতে পাবে কী করে, সেটাই বুঝতে পারলেন না।

সঙ্গে নিয়ে যাও দাদা রামের মা বললে, বোকা-সোকা আছে বটে, কিন্তু দামু ছেলে ভালো। এতটা পথ হেঁটে যাচ্ছ, সঙ্গে ভরসার মতো রইল। তারপর হাঁড়ি-টাঁড়িগুলোও নিয়ে যেতে পারবে। ওকে নিয়ে তোমার কোনও অসুবিধে হবে না, দেখে নিয়ো।

তবু ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন পঞ্চানন। সন্দেহ নেই, দামু মানুষ ভালো। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে, একটু বেশি রকমেরই ভালো। তারও মা-বাপ নেই, আছে কেবল এক মাসি। সে-মাসি লোকের বাড়ির কাজকর্ম করে, ধান-টান ভেনে দিয়ে কোনওমতে দিন চালায়। দামু সেই মাসির আদরেই আছেনইলে এতদিনে তার যে কী হাল হত জোর করে সেকথা বলা শক্ত।

ছেলেটা দারুণ হাবা। একবার কে যেন বলেছিল, দেখে এলাম, আমড়া গাছতলায় তোর ডান কানটা পড়ে আছে–তাই শুনে, নিজের কান পরখ না করেই, আধ মাইল দূরের আমড়াতলায় কান কুড়োতে ছুটেছিল দামু। আর-একবার, তার নিজের বাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে, কে যেন তার মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলেছিল–তুই তো আর বাড়ি থেকে যেতে পারবি না, তুই হারিয়ে গেছিস–আর তাই শুনে পাক্কা দেড় ঘন্টা দামু সেখানে দাঁড়িয়ে ঘ্যানঘ্যান করে কেঁদেছিল : ওগো–আমি কেমন করে বাড়ি যাব গো–আমি যে হারিয়ে গেছি–মাসি গো

তা এসব হল ছেলেবেলার ব্যাপার। এখন অবশ্য দামুর কুড়িবাইশ বছর বয়েস হয়েছে, অতটা ক্যাবলামিও আর নেই, কিন্তু তাই বলে বুদ্ধিটা যে খুব পেকে উঠেছে তা-ও বলতে পারা যায় না। এখনও দামু যদি হাটে-বাজারে জিনিস কিনতে যায়-ধরো, সে দশ পয়সার কুমডোফালি আর আট পয়সার ঝিঙে কিনে দোকানিকে একটা আধুলি, মানে পঞ্চাশ পয়সা দিয়েছে তা হলে দোকানি হয়তো এইভাবে তাকে হিসেব বুঝিয়ে দেবে : দশ পয়সা আর আট পয়সায় হল চব্বিশ পয়সা–তুমি দিয়েছ–পঞ্চাশ-চব্বিশ আর বারোতে হল পঞ্চাশ–ঠিক তো? (দামু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লা, হিসেব ঠিক আছে) তা হলে এই নাও বারো পয়সা ফেরত–আর দামু নাচতে নাচতে ওই বারো পয়সাই ফেরত নিয়ে আসবে।

এ-হেন একটি সঙ্গীকে নিয়ে–পঞ্চানন ইতস্তত করতে লাগলেন।

দেরি করছ কেন দা-ঠাকুর, চলো–দামুর উৎসাহী গলা শোনা গেল। পঞ্চানন চেয়ে দেখলেন, সেই জাঁদরেল পাগড়ির ওপরে দুটো বিরাট হাঁড়িকে চাপিয়ে নিয়েছে দামু-এক মাইল দূর থেকেই বোধহয় দেখা যাচ্ছে সেগুলো। বগলে নিয়েছে লাঠি, আর হাতে নিয়েছে ব্যাগটা।

চলো দা-ঠাকুর–রোদ উঠে গেলে কষ্ট হবে রাস্তায়।

হাঁ রে, হাঁড়ি-টাঁড়ি ফেলে দিয়ে একটা কেলেঙ্কারি করবি না তো শেষ তক?

দা-ঠাকুর, কক্ষনো ফেলব না–মা কালীর দিব্যি!

দুর্গা শ্রীহরি–একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন পঞ্চানন : চল তা হলে, যাওয়াই যাক।

.

দুই

চার ক্রোশ রাস্তা–মানে আগেকার হিসেবে আট মাইল। তোমরা যারা কলকাতার মতো বড় শহর-টহরে থাকো, তোমাদের তো এক কিলোমিটার হাঁটতেই হাঁফ ধরে; রিক্সা, কিংবা ট্যাক্সি আর নিদেন পক্ষে বাস না হলে চোখে প্রায় সর্ষের ফুল ফুটে ওঠে। কিন্তু পাড়াগাঁয়ের মানুষের পক্ষে ওরকম দশ বারো মাইল রাস্তা কিছু নয় বড় বড় পা ফেলে দেখতে-দেখতে পার হয়ে যায়।

তবু, পঞ্চাননের তো বয়েস হয়েছে–একটু ধীরে ধীরেই যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু দামুর আর তর সয় না। একে তো ঠাকুরমশাইয়ের পাইক সেজেছে, তার ওপর মাথায় ওই পেল্লায় পাগড়ি আর হাতে ওই জাঁদরেল লাঠি–হাঁড়ি-ফাঁড়ি সুদ্ধ সে প্রায় পঞ্জাব মেলের মতো চলতে। লাগল। আর পঞ্চানন মধ্যে মধ্যে কাতর হয়ে ডাকতে লাগলেন, একটু ধীরেসুস্থে যা বাপু, সব ফেলে-টেলে দিয়ে একটা কেলেঙ্কারি করবি নাকি?

কেলেঙ্কারি প্রায় হতেই যাচ্ছিল আর কি!

এখন দেশসুদ্ধ লোক সবাই ই তো দামুকে চেনে। ওই তালঢ্যাঙা চেহারা, নিপাট বোকামি, কান-হারানোর গল্প–সব মিলে দাম দস্তুরমতো বিখ্যাত লোক। তার ওপর তার আজকের সাজগোজ প্রকাণ্ড পাগড়ির ওপর জগদ্দল হাঁড়ি–এই সমস্ত দেখেশুনে ছেলেপুলের দল চমকে গেল। দামুর সামনে এসে রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে গেল তারা।

ও দামু, তোর মাথায় কী?

প্রথমটায় দামুর খুব অহঙ্কার হল।

দেখতেই পাচ্ছিস পাগড়ি।

পাগড়ির ওপরে ও কী?

হাঁড়ি–হাঁড়ি। দামু দাঁত বের করে বললে, কোথাকার নিরেট গাধা রে সব, হাঁড়ি চিনিসনে?

হাঁড়িতে কী আছে রে দামু?

হাঁড়িতে আবার কী থাকে? চিড়ের মোয়া, নারকোলের নাড়, ছানার মুড়কি–এই সব আছে।

ছেলের দল তাই শুনে আরও ঘন হয়ে এল।

দূটো দে না ভাই দামু, আমরা খাই।

ব্যস, আর যায় কোথায়! তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে উঠল দামু।

আস্পর্ধা তো কম নয়। ঠাকুরমশাই তত্ত্ব নিয়ে যাচ্ছেন কুটুমবাড়ি–আর তাই খেতে দেব তোদের! পথ ছেড়ে দে বলছি শিগগির–

ও দামু, দুটো নাড়-মুড়কি দে দামু–ছেলের দল মজা পেয়ে একসঙ্গে কোরাস ধরল।

নোলা কেটে দেব তোদের।–দামু চিৎকার ছাড়ল : পথ ছাড় শিগগির–যেতে দে—

দুটো মোয়া দিয়ে যা দামু–দামু রে দামু–

পথ তো ছাড়লই না, পেছন থেকে এসে আবার দামুকে কুট করে চিমটিও কেটে দিল একটা।

এরপরে কারও মেজাজ আর ঠিক থাকে–মানে থাকতে পারে কখনও। দামু বোঁ করে একপাক ঘুরে গেল। হাঁক ছাড়ল-হা-রে-রে-রে–তারপর ছেলের দলকে তাড়া করতে গেল।

এর পরে যা ঘটতে যাচ্ছিল সে তো বুঝতেই পারছ। হাঁড়ি আছড়ে পড়ত মাথা থেকে, তারপর ছেলের দলের পোয়া বারো। কিন্তু সেই সময় এসে পড়লেন পঞ্চানন।

এসে পড়লেন ছুটতে ছুটতেই। দূর থেকেই ব্যাপারটা আঁচ করেছিলেন।

এই দামু–কী হচ্ছে–এই—এই–

দ্যাখেন না ঠাকুর মশাই, এই বাঁদরগুলো বলছে–ও দামু আমাদের নাড়মুড়ি খেতে দে।

পঞ্চাননকে দেখে ছেলের দল ছিটকে গিয়েছিল। দুর থেকে তারা চাঁচাতে লাগল : দামু রে দামু–

কে আবার বাঙাল ভাষায় কবিতা মিলিয়ে বললে, মোয়া দে খামু—

দামু তাদের তেড়ে যায় আর কি! খাওয়াচ্ছি মোয়া-দাঁড়া–দাঁড়া–

পেছন থেকে খপাৎ করে পঞ্চানন চেপে ধরলেন তাকে। বললেন, সর্বনাশ করেছে রে, সব যাবে! ওরে দোহাই তোর, ওদের আর তাড়া করতে হবে না, ভালোয় ভালোয় তোকে নিয়ে পৌঁছতে পারলে এখন বাঁচি।

একবার ছেড়ে দেন কতা–দামু তবুও তড়পাতে লাগল : হাতে এই রামলাঠি রয়েছে, কটা বাঁদরকে পিটিয়ে ঢিট করে আসি।

আর ঢিট করতে হবে না বাপু, এতেই যথেষ্ট। নে–চল চল–

গোঁ গোঁ করে দামু এগিয়ে চলল। আর পেছন থেকে শোনা যেতে লাগল : দামু রে দামু–

শুনছেন?

পঞ্চানন বললেন, শুনছি। তাতে আর কী হয়েছে, গায়ে তো ফোস্কা পড়ছে না। পা চালা–পা চালা। কিন্তু এবারে বাপু আমি আর সঙ্গ ছাড়ছিনি। লম্বা ঠ্যাং দুটোকে একটু সামলাও, নইলে দুজনেই বেঘোরে মারা পড়ব।

পথে আর অঘটন কিছু ঘটল না। একবার কেবল একটা পুকুরঘাটে হাঁড়ি নামিয়ে যখন জল খেতে গিয়েছিল দামু, তখন কটা মাছি এসে হাঁড়ির ওপর উড়ে বসছিল আর দামু উপেন্দ্রকিশোরের সেই সাতমার পালোয়ান কানাইয়ের মতো লাঠি হাঁকড়ে সবসুদ্ধ সাবাড়ের জো করেছিল। কিন্তু পঞ্চানন তক্কেতকে ছিলেন, ধাঁ করে সে-যাত্ৰা লাঠিটা কেড়ে নিলেন।

তারপর দুজনে বেয়াইবাড়ি গিয়ে পৌঁছুলেন।

ত্রিলোচন চক্রবর্তীর মস্ত বাড়ি, অনেক টাকা, গরিব পঞ্চাননের তো দেউড়ির সামনে গিয়ে পা আর উঠতেই চায় না। কিন্তু ত্রিলোচন বসেছিলেন বাইরের বৈঠকখানায়, ধান-চালের হিসেব করছিলেন, তিনি হাঁ হাঁ করে ছুটে এলেন।

আরে বেয়াইমশাই যে! কী ভাগ্যি–কী ভাগ্যি! অ্যাদ্দিনে পায়ের ধুলো পড়ল!

এজ্ঞে তা ধুলো বই কি! চার ক্রোশ রাস্তার ধুলো।–এক কাঠা দাঁত বের করে দামু। বুদ্ধিমানের মতো জবাব দিলে।

পঞ্চানন বিরক্ত হয়ে বললেন, থাম তুই, মেলা বকিসনি।

ত্রিলোচনও ততক্ষণে দামুকে দেখেছেন, তার পাগড়ি, হাঁড়ি, লাঠিন্ধু সেই বিরাট কাণ্ডকারখানা দেখে হাঁ হয়ে গেছেন। রাতের অন্ধকারে এটিকে দেখলে তিনি বাবা গো বলে ছুটে পালাতেন।

ঘাবড়ে ত্রিলোচন বললেন, বেয়াই, এটি—

আমাদের গাঁয়ের ছেলে। জিনিসপত্র বয়ে সঙ্গে এসেছে। নাম দামু! ওরে দামু, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? হাঁড়ি-টাঁড়িগুলো নামা

এজ্ঞে নামাই– বলেই দামু হাঁড়ি দুটো ধপাৎ করে ত্রিলোচনের একেবারে পায়ের ওপর নামিয়ে ফেলল। উঃ– বলে ত্রিলোচন লাফিয়ে উঠলেন।

পঞ্চানন বললেন, কী রে, হাঁড়ি দুটো একেবারে পায়ের ওপর ফেলে দিলি? একটা আক্কেল-বিবেচনা বলেও কিছু নেই? তোর মতো গো-মুখকে সঙ্গে আনাই–

পায়ে হাত বুলোতে বুলোতে বাধা দিলেন ত্রিলোচন : ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমার লাগেনি। যাও হে দামু, বসে বিশ্রাম-টিশ্রাম করো। ওরে–কে আছিস, হাঁড়ি দুটো ভেতরে নিয়ে যা।

এঃ হে, আপনাকে পেন্নাম করতেই ভুলে গেনু বলে দামু এবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলে ত্রিলোচনের পায়ে। যেখানে হাঁড়ি নামিয়েছিল, সেই ব্যথার জায়গাতেই ঠাস করে ঠুকে দিলে মাথাটা।

ত্রিলোচন একবার বললেন, ইঃ–তারপর বললেন, বেঁচে থাকো বাবা, বেঁচে থাকো। এবার ভেতরে যাও।

বড়লোক বেয়াইবাড়ির আদর-যত্নে পঞ্চানন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলেন। মরা মেয়েটার কথা মনে হয়ে চোখে জল আসছিল, কিন্তু ফুটফুটে নাতনিটিকে বুকে নিয়ে সব দুঃখ তিনি ভুলে গেলেন। আরও অনেক মিষ্টি হয়েছে রুনকু–অনেক সুন্দর হয়েছে। টক টক করে। কথা বলে, কলকাতার গল্প, তার স্কুলের গল্প, মেমসায়েব দিদিমণির গল্প। তারপর আবার কতগুলো ইংরেজী ছড়াও শুনিয়ে দিলে দাদুকে। পঞ্চানন মুগ্ধ হয়ে গেলেন। আর বারবার মনে-মনে বলতে লাগলেন, বেঁচে থাক দিদি, সুখে থাক।

কিন্তু ত্রিলোচনের এই আদরের নাতনিকে তিনি কী করে নিয়ে যান তাঁর ভাঙা কুঁড়েঘরে? রামের মা ভরসা দিয়েছে বটে, কিন্তু পঞ্চানন মনে জোর পাচ্ছিলেন না। যাই হোক, আজকের দিনটা তো যাক। ভেবেচিন্তে কাল যা হয় করা যাবে।

তার আগেই দামু একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসল। দামুকে দেখে রুনকুর ভালো লাগবে এ তো জানা কথা। আর কুটুমবাড়ি এসে, বেশ করে অনেকগুলো লুচি-মণ্ডা খেয়ে দামুরও মেজাজ খোলতাই হয়ে গিয়েছিল, এ-সব ভালো জিনিস তো আর যখন-তখন তার বরাতে জোটে না। সে রুনকুকে নিয়ে গল্প জমিয়ে বসল।

জানো দিদি, এবারে আমরা তোমায় নিয়ে যাব।

রুনকু খুশি হয়ে বললে, ই, দাদুর বাড়িতে আমি বেড়াতে যাব এবার।

সেখানে রামের মা আছে। সে কত রান্না করে দেবে। আর আমি গাছ থেকে পাখি ধরে দেব তোমাকে।

পাখি ধরে দেওয়ার কথায় রুনকুর আর উৎসাহের সীমা রইল না। সে বললে, সব পাখি ধরে দেবে?

সব। দোয়েল, কোকিল, শ্যামা, শালিক—যা চাও।

রুনকু নেচে উঠল : কী মজা হবে, সব পাখি আমি খাঁচায় করে পুষব! কখন নিয়ে যাবে আমায়?

কাল। দাঁড়াও, আজ একটু ভালোমন্দ খেয়ে নিই, তোমার দাদু বড় বড় রুই মাছ ধরিয়েছে পুকুর থেকে, সেগুলো ভালো করে সাবাড় করি, তারপর।

রুনকুর মন রুই মাছের দিকে ছিল না। সে আবার বললে, কীসে করে নিয়ে যাবে আমাকে?

কেন, তোমাদের মটোর গাড়িতে? ভোঁপ-ভোঁপ করে চলে যাব।

দূর, মোটরে তো সব সময় চড়ি। মোটর ভালো লাগে না।

তা হলে গোরুর গাড়িতে চেপে?

না–গোরুর গাড়িতে নয়।

তবে তো মুস্কিল!–দামু মাথা চুলকোতে লাগল : তা হলে কীসে যাবে? পাল্কিতে? ঘোড়ায়? হাতিতে?

হাতি-ঘোড়া-পালকি এসব বলবার জন্যেই বলেছিল, কিন্তু হাতি শব্দটা টুক করে কানে লাগল রুনকুর।

দাদুর হাতি আছে বুঝি?

দামু পেছনোর পাত্র নয়। বলেই যখন ফেলেছে, তখন আর হার মানা চলে না। বললে, আলবাত আছে। কী নেই তোমার দাদুর? হাতি, ঘোড়া, গোরু, সব।

রুনকু আবার নেচে উঠল : তা হলে আমি হাতি চেপেই দাদুর বাড়ি যাব। ঠিক—ঠিক–ঠিক–

দামু টেরও পেল না, কী সর্বনেশে কাণ্ডটি বাধিয়ে বসল সে।

.

তিন

দুদিন বেয়াই–বাড়িতে আদর-যত্নে তো খুব চমৎকার কেটে গেল পঞ্চাননের। ব্রিলোচন তাঁকে তো আর ছাড়তেই চান না। আর দামু যেরকম উৎসাহের সঙ্গে মাছের মুড়ো, মাংসের কালিয়া আর দই রসগোল্লা খেয়ে চলেছিল, তাতে মনে হল, এখানে সারা জীবন থেকে যেতে হলেও তার এতটুকুও আপত্তি নেই! অমন এলাহি খাওয়া-দাওয়া তার কপালে তো কোনওদিন জোটেনি!

কিন্তু গোলমাল বাধল তত তিন দিনের দিন। যেদিন পঞ্চানন রুনকুকে নিয়ে যাবেন, সেইদিন।

ত্রিলোচন বলেছিলেন, নিয়ে যাবেন বই কি, আপনাদেরই তো মেয়ে।রুনকুও একেবারে তৈরি। তার ছোট্ট সুটকেস তার খেলনা, তার ছবির বইসব ঠাকুরমা যত্ন করে গুছিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে বুড়ি ঝি সদু যাবে, সেও তার পোঁটলা-পুঁটলি বেঁধে নিয়েছে। ত্রিলোচনের দেউড়িতে মোটর গাড়িখানা এসে দাঁড়িয়েছে, পঞ্চানন দুগা-দুগা এই সব বলে-টলে চটিজোড়া পায়ে গলাতে যাচ্ছেন, দামুর মাথায় সেই দেড়-হাত উঁচু পাগড়িটা প্রায় বাঁধা হয়ে গেছে, এমন সময়

এমন সময় সেই বিপর্যয় কাণ্ড!

হঠাৎ রুনকুর এক আকাশ-ফাটানো চিৎকার : আমার হাতি কোথায়?

হাতি! ব্যাপারটা কেউ বুঝে উঠতে পারলেন না। ত্রিলোেচন হেসে বললে, ওহো, দিদির বোধহয় খেলনাটা নিতে ভুল হয়ে গেছে। ওরে কে আছিস, সেই তুলোর তৈরি গলায় ঘুঙুর বাঁধা লাল হাতিটা।

না–লাল তুলোর হাতি না।–রুনকু আবার চিৎকার করে জানাল : আমি জে বড় হয়ে গেছি, ও-হাতি নিয়ে তো আমি আর খেলি না। আমার আসল জ্যান্ত হাতি কোথায়? সেই হাতিতে চেপেই তো আমি দাদুর বাড়ি যাব।

সে কি! হাতি কোথায় পাওয়া যাবে?

বা রে, দামুদাদা যে বললে আমাকে হাতিতে করে দাদুর বাড়িতে নিয়ে যাবে! কই দামুদাদা, হাতি কই আমার?

দামু প্রমাদ গনল। ভাবগতিক দেখে তার নিরেট মগজটাও একটু করে সাফ হতে আরম্ভ করেছিল। দামু বুঝতে পারল, কাজটা খুব কাঁচা হয়ে গেছে। বড়লোকের আদুরে নাতনিকে হাতিমাকা গল্প বলা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি।

দন্তবিকাশ করে, খানিকটা হেঁ-হেঁ আওয়াজ তুলে, মাথা-টাথা চুলকে দামু বললে, ঐ হে-হে। রুনকু দিদি, ও আমি একটুখানি ঠাট্টা করেছিলাম। এবার না হয় মোটর গাড়ি চেপেই দাদুর বাড়ি চলল, তারপর দেখেশুনে একটা দাঁতওলা পেল্লায় হাতি–

আর বলতে হল না। রুনকু একেবারে সোজা বসে পড়ল ধুলোর ওপর। তারপর হাত-পা ছুঁড়ে শুরু হল দাপাদাপি–মোটর গাড়ি ছাই, মোটর গাড়ি বিচ্ছিরি আমাকে হাতি এনে দাও, এক্ষুনি এনে দাও

তার পরের ব্যাপার আর না বলাই ভালো। মা-মরা নাতনিকে একটু বেশিই প্রশ্রয় দিয়েছিলেন ত্রিলোচন, কিছুতেই তার জেদ ভাঙানো গেল না। ত্রিলোচন অনেক বোঝালেন, পঞ্চাননের বেয়ান এসে বিস্তর ভালো-ভালো কথা শোনালেন, সদু ঝি অনেক মিষ্টি কথায় তাকে ভোলাতে চাইল, কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। শেষকালে ধুলোতে শুয়ে পড়ল রুনকু।

হাতি কোথায় গেল–দাদুর হাতি? হাতি না হলে আমি যাব না।

তেতে-বিরক্ত হয়ে শেষে রুনকুর বাবা যখন মেয়েকে মারবার জন্যে একটা চড় তুলেছে, তখন পঞ্চানন এসে তাকে কোলে তুলে নিলেন। বললেন, থাক বেয়াই, এ-ভাবে জোর করে নিয়ে গিয়ে তো কোনও লাভ নেই। তার চাইতে এখন থাকুক-একটু ঠাণ্ডা হোক, তারপর না হয়–

বিলোচন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, সেইটেই ভালো কথা। আপনি আরও দুটো দিন থাকুন বেয়াই, আমি এর ভেতরে মেয়েকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠাণ্ডা করে দেব।

চোখে জল আসছিল, পঞ্চানন সামলে নিলেন। ম্লান হেসে বললেন, না বেয়াই, আমার আর থাকবার জো নেই–বাড়িতে রামের মা একা রয়েছে। যখন সুবিধে হয়, আপনি পাঠিয়ে দেবেন। আমি বরং আজ আসি, আপনারা ততক্ষণ রুকুকে শান্ত করুন।

শান্ত যে সে সহজে হবে, এমন মনে হচ্ছিল না। সদু ঝি তাকে দোতলায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেও সমানে শোনা যাচ্ছিল তার কান্না আর ফোঁপানিঃ হাতি কোথায়, হাতি? দামুদাদা যে বলেছিল আমাকে হাতি–

মাথার দেড়-হাত উঁচু পাগড়িটা খুলে ফেলে, কোলের ওপর সেই মস্ত লাঠিখানা রেখে দামু কেলে হাঁড়ির মতো মুখ করে একটা কাঁটালতলায় বসেছিল। কী ভাবছিল, সেই জানে। এইবার তার দিকে একটা বজ্ৰদৃষ্টি ফেললেন পঞ্চানন।

কি রে, যাবি আমার সঙ্গে? না–হাতি জোগাড় করবি এখানে বসে বসে?

শুকনো গায় দামু বললে, এজ্ঞে চলুন। পায়ে হেঁটে যেতে যতই সময় লাগুক, মোটরে আর কতটুকু রাস্তা? ধুলো উড়িয়ে, ভঁক ভঁক করে হর্ন বাজিয়ে, দুপাশের গোর তাড়িয়ে গাড়ি চলতে লাগল। পেছনের সিটে বসে পঞ্চাননের চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। দামু মাথা নিচু করে বসেছিল ড্রাইভারের পাশে, জীবনে প্রথম মোটর গাড়িতে চাপতে পেরেও তারও মনে যে এতটুকু সুখ ছিল না, পঞ্চানন তা বুঝতে পারছিলেন।

হতভাগা–গো-মুখ্য কোথাকার!

কিন্তু রাগ করে আর কী হবে, ইচ্ছে করে তো আর বিপদ বাধায়নি। স্রেফ বুদ্ধির দোষেই এই কেলেঙ্কারিটা বাধিয়ে বসেছে। পঞ্চানন ভাবতে লাগলেন, সবই তাঁর কপালের দোষ।

হলে নিজের মেয়েটা এত সুখী হয়েও এমন অসময়ে মরেই বা যাবে কেন, আর নাতনিটাই বা দামুর মতো গর্দভের কথায় বিশ্বাস করে এমন একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসবে কেন! তাঁর বরাতটাই খারাপ, নাতনিকে দু-দিনের জন্যে কাছে নিয়ে যাওয়াও তাঁর অদৃষ্টে লেখা নেই, তিনি আর কাকে দোষ দেবেন। রামের মার কথা ভেবে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল–সে বেচারি অনেক আশা করে রুনকুর জন্যে নারকোলের নাড়, রসবড়া, গঙ্গাজলী চিড়ের মোয়া-এই সব তৈরি করে বসে রয়েছে।

দামু চুপ করে বসেছিল। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে, বিষম ব্যাজার গলায় বললে, দাদাঠাকুর, আমি একটা আস্ত পাঁঠা।

পঞ্চাননের তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু মুখে তিনি সেকথা বলতে পারলেন না, বরং দামুকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টাই করলেন একটু।–তুই আর কী করবি, একটু বেশি গল্প করেছিলি বই তো নয়। সেইটে যে ও বিশ্বাস করে বসে থাকবে, তা তুই কেমন করে জানবি?

না দাদাঠাকুর, আমি একটা গাড়ল।

মনে দুঃখ করিসনি দাম, ভুল-টুল মানুষের হয়ই।

আমাকে যে সবাই বলে অকর্মার ধাড়ি আর পয়লা নম্বরের ভণ্ডলরাম-সে একদম খাঁটি কথা।

পঞ্চাননের মন আদৌ ভালো ছিল না, তার ওপরে দামুর এইসব খেদোক্তি শুনে এখন তাঁর বিরক্তি ধরে গেল। বললেন, হয়েছে, হয়েছে, বাপু, থাম। যা করেছিস, করেছিস, এখন আর ভ্যানভ্যান করে আমাকে জ্বালাসনি।

দামু আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর গাড়িটা যখন গ্রামের কাছাকাছি এসে পড়েছে, তখন হঠাৎ সে চেঁচিয়ে উঠল : ও ডেরাইভার সায়েব, গাড়িখানা একটু থামাও দিকিনি।

পঞ্চানন বললেন, আবার কী হল, গাড়ি থামাতে হবে কেন?

একটু কাজ আছে দাদাঠাকুর।–কই গাড়ি থামালে না?

মোটর থামল। আর থামতে না থামতেই লাঠি আর পাগড়ি নিয়ে গাড়ি থেকে প্রায় লাফিয়ে পড়ল দামু।

পেন্নাম দাদাঠাকুর, আমি চললুম।

পঞ্চানন আশ্চর্য হয়ে গেলেন। গ্রাম তো এখনও দু মাইল দূরে। এখানে নেমে তুই কোথায় যাচ্ছিস?

গ্রামে যাব না দাদাঠাকুর। তোমার যে-ক্ষেতি করেছি, তার প্রতিবিধেন না করে গাঁয়ে আর মুখ দেখাব না। রুনকু দিদির জন্যে হাতি খুঁজতে যাচ্ছি।

রাগে আর বিরক্তিতে পঞ্চাননের আর মেজাজ ঠিক রইল না।

হতভাগা–উল্লুক! হাতি কি পাকা আমড়া যে গাছতলায় গেলেই কুড়িয়ে পাওয়া যায়? শিগগির ওঠ বলছি গাড়িতে, এখন আমার মস্করা করবার সময় নয়।

মস্করা নয় দাদাঠাকুর, সত্যি বলচি। প্রিতিজ্ঞে করচি, হাতিতে চাপিয়ে দিদিকে আপনার কাছে নিয়ে আসব, নয় আর কোনওদিন গাঁয়েই ফিরব না। এই আমি চললুম।

তারপরেই আর দেখতে হল না। সেই এক-একখানি হাত-চারেক লম্বা ঠ্যাং ঝড়ের বেগে ফেলে ফেলে লাঠি আর পাগড়িসন্ধু তালগাছের মতো দামু পাশের মাঠে নেমে পড়ল, আর পঞ্চানন ভালো করে কিছু বোঝবার আগেই বাবলা বনের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

প্রায় পনেরো মিনিট ধরে গলা ফাটিয়ে ডাকাডাকি করলেন পঞ্চানন। কিন্তু দামুর কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। সে ততক্ষণে মাইল দেড়েক পথ পাড়ি দিয়েছে।

ড্রাইভার বললে, আমি খুঁজতে যাব বাবু?

তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে পঞ্চানন বললেন, খুঁজে কী হবে? পেটে আগুন লাগালে আপনিই ফিরে আসবে এখন। হতচ্ছাড়া উজবুক কোথাকার! তুমি গাড়ি চালাও।

.

চার

রাগে, দুঃখে, বিরক্তিতে একাকার হয়ে পঞ্চানন তো বাড়ি ফিরে গেলেন। আর ওদিকে দামু চলল পঞ্চাননের হাতির খোঁজে। হাতিতে চাপিয়ে রুনকু দিদিকে যদি দাদুর বাড়ি নে যেতে না পারি, তা হলি গাঁয়ে আর মুখই দেখাব না মনে-মনে এই কঠিন প্রতিজ্ঞা করে। লম্বা লম্বা ঠ্যাঙে দামু মাঠের পর মাঠ পেরুতে লাগল।

ঘন্টা চারেক এই ভাবে মাঠ-ঘাট বনবাদাড় গ্রাম-গঞ্জ পাড়ি দিয়ে তারপর দামুর হাঁপ ধরল। বেশ বড় গোছর একটা গ্রামের কাছে এসে ছায়া-ছায়া একটা নিম গাছের তলায় বসে পড়ল সে।

ইস-কাণ্ডখানা দ্যাখো একবার!–দামু ভাবতে লাগল : কারবারটা একবার দ্যাখো। এই-যে এতটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে এলুম–তা প্রায় ক্রোশ চারেক হবে–এর মধ্যে একটা হাতিও কি চোখে পড়ল? গোরু চরছে তো চরছেই, ছাগলে ঘাস খাচ্ছে তো খেয়েই যাচ্ছে, দুটো-চারটে ভেড়াও ভ্যা-ভ্যা করছে এদিক-ওদিক, এক-আধটা ঘোড়াও তো ছোলা-মটরের বুড়ো শাকগুলো চিবিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু একটা হাতিরও কি চরতে নেই কোথাও? কেন হাতি কি ঘাস খায় না, ছোলা-মটরের শাক চিবোয় না?

ভাবতে ভাবতে দামু বিরক্ত হয়ে গেল। কেমনধারা লোক সব দেশের? এত গোর-ঘোড়া-ছাগল পুষছে–অথচ দু-দশটা হাতি পুষতে পারে না কেউ? কত সুবিধে! পিঠে চাপা যায়–সে তো আছেই। তা ছাড়া–এই ধরো না, হাতিকে লাঙ্গলে জুড়ে চাষ করলেওঃ, সে আর দেখতি হবে না। ওই পেল্লায় জানোয়ার–এক ঘন্টার ভেতরে দশ বিঘে জমি চষে একেবারে ধুলো করে দেবে। আর গোরু পোয্য কী জন্য? দুধ খাবার জন্যি তো? হাতি পুষে তাকে দুইয়ে নাও না কমসে কম একমন দুধ দেবে একবারে, গাঁ সুষ্ঠু লোককে দুবেলা বাটিবাটি পায়েস খাইয়ে দিতে পারবে।

সেসব টু-টু, পুষছে কতগুলো শিংওলা গোরু আর দাড়িওলা কটা পুঁচকে ছাগল। দেশসুদ্ধ লোকের বোকামি দেখে দামুর গা জ্বালা করতে লাগল।

অবিশ্যি, সব চেয়ে বেশি জ্বালা করছিল পেটের ভেতরে। রওনা হওয়ার আগে ত্রিলোচন চক্রবর্তীর বাড়িতে খান তিরিশেক লুচি আর সের খানেক মিঠাই খেয়েছিল সে, কিন্তু এই চার ক্রোশ রাস্তা পাড়ি দিয়ে সেসব কখন বেমালুম উধাও হয়ে গেছে। হাতির খোঁজ পরে হবে,

সে তো আছেই, তার আগেই পেটটা একটু ঠাণ্ডা করে নেওয়া যাক।

একটু দূরেই, একটা টিনের ছাউনির তলায় বসে মাথায় টাক পড়া ভালোমানুষ চেহারার একজন লোক মস্ত লোহার কড়াইয়ে জিলিপি ভেজে-ভেজে রসে ফেলছিল। সেই জিলিপির গন্ধ দামুর প্রাণমন কেড়ে নিলে। আপাতত হাতির ভাবনা ছেড়ে দিয়ে সে ময়রার কাছে গিয়ে হাজির হল।..

জিলিপি দাও তো দাদু দু গোণ্ডা।

দু গোণ্ডা? আট খানা?–লোকটা বললে, আট আনা লাগবে কিন্তু। পঞ্চাশ পয়সা।

অ্যাঁ, পঞ্চাশ পয়সা! ইকি ডাকাতের গাঁ নাকি হে? আমাদের দেশে তো পঁচিশ পয়সাতেই দু গোণ্ডা জিলিপি পাওয়া যায়।

সেসব ভাঙা আর বাসী জিলিপি। নিবারণ ময়রার দোকানে ওসব পাবে না। তবে তুমি বিদেশী লোক, অতিথ এয়ে বলতে গেলে, তোমাকে চল্লিশ পয়সায় দিতে পারি।

দাও তবে, তাই দাও।

তা হলে বোসো ওখানে–নিবারণ ময়রা একটা নড়বড়ে বেঞ্চি দেখিয়ে দিলে।

বেঞ্চিতে বসে দামু গম্ভীর হয়ে জিলিপি খেতে লাগল। জিলিপিগুলো সত্যিই ভালো, লোকটা জাঁক করতে পারে বটে। আরও দু-চারখানা খেলেও হত। কিন্তু না, বেশি পয়সা খরচ করা চলবে না।

লোকে তাকে বোকারাম বলে বটে, কিন্তু এখন দামু চালাক হয়ে গেছে। রুকু দিদির জন্যে হাতি খুঁজতে বেরিয়েছে সে। এমনিতে সে-হাতি পাওয়া যাবে কি না কে জানে, হয়তো কিনতে হবে শেষ পর্যন্ত। হাতির দাম কত হবে কে বলতে পারে। দোকানদারেরা সুযোগ পেলেই তাকে ঠকায়, তাই মাসি অনেক কান্নাকাটি করে তাকে গুনতে শিখিয়েছে। দাম জানে, এখন তার ট্যাকে কম করেও তেরো টাকা বারো গণ্ডা পয়সা আছে। পঞ্চানন তাকে দুটো টাকা দিয়েছিলেন, পাঁচ টাকা দিয়েছেন ব্রিলোচন, আরও পাঁচ টাকা দিয়েছিলেন ত্রিলোচনের গিন্নি–মানে রুনকুর ঠাকুরমা। আসবার সময় মাসি আরও এক টাকা বারো গণ্ডা পয়সা দিয়েছিল, তা হলে দাঁড়াল তেরো টাকা বারো গণ্ডা। সোজা হিসেব।

এরই মধ্যে তাকে খাওয়া-দাওয়া করতে হবে–আর এমনিতে যদি কারুর কাছে গতি না পাওয়া যায়, তা হলে একটা কিনেই নিতে হবে তাকে। একটা হাতির দাম কত হবে? মনে-মনে আঁচ করতে লাগল দামু। অত বড় জানোয়ার, অমন পেরকাণ্ড শুড়, গাছের গুঁড়ির মতো মোটা-মোটা পা-দাম একটু বেশিই হবে নিশ্চয়। হয়তো আট-দশটা টাকাই লেগে যাবে হাতি কিনতে। হুঁ, বুঝেই খরচ করতে হবে একটু। জিলিপি খেতে যতই ভালো লাগুক, লোভ সামলেই চলতে হবে আপাতত।

দামু মনে-মনে হিসেব করছিল আর জিলিপি খাচ্ছিল, এদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তাকে দেখছিল নিবারণ ময়রা। দেখবার মতো চেহারাই বটে। এমনটি সচরাচর নজরে পড়ে না।

শেষে আর থাকতে না পেরে নিবারণ বললে, পাগড়িখানা তো জব্বর চাপিয়েছ হে?

দামু খুশি হয়ে বললে, হুঁ-হুঁ, কুটুমবাড়ি গিয়েছিলুম কি না।

তা বেশ করেছিলে। কুটুমবাড়ি যাওয়ার মতো সাজই বটে। এখন বুঝি বাড়ি ফিরছ?

বাড়ি? এখন? উঁহু!–দামু সগর্বে মাথা নাড়ল : একটা হাতি যোগাড় করতে বেরিয়েছি।

হাতি?–নিবারণ একটু চমকাল। তারপর বললে, ওঃ, বুঝিছি, খেলনার হাতি? তা উদিকে কুমোর পাড়ায় যাও–সেখানে তারা ওসব বানায়-টানায়।

খেলনার হাতি তোমায় কে বললে?–দামু নাক কোঁচকাল : সত্যিকারের হাতি। ঘরের চালের সমান উঁচু। শুড় নাড়ে, চলে বেড়ায়।

নিবারণ টাক চুলকোল। আবার কিছুক্ষণ চেয়ে রইল দামুর দিকে।

তা হাতি দিয়ে কী করবে?

অত খোঁজে তোমার দরকারটা কী? হাতি একটা আমার অবিশ্যিই চাই, সেইজন্যিই বেরিয়েচি। কোথায় পাব বলতে পারো?

গরিবের ঘোড়া-রোগ হয় বলে জানতুম, কারুর কারুর যে হাতি-রোগও হয় এটা এই পেপ্রথম শোনা গেল।–নিবারণ আবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে লাগল দামুর। এত মন দিয়ে দেখতে লাগল যে জিলিপি ভাজার কথা স্রেফ ভুলেই গেল সে।

কী বললে হে তুমি?

কী আর বলব তোমায়।–নিবারণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : মাথায় ছিট থাকলে তাকে কী আর বলা যাবে। তা যাও খোঁজ গে হাতি।

ছিট-টিট বোলো না ময়রার পো–দামুর রাগ হতে লাগল : তুমি কি হেঁজি-পেঁজি পেলে আমায়? জানো, দরকার হলে হাতি আমি কিনতে পারি?

কিনতি পায়রা? লাটসায়েবের নাতি নাকি তুমি? কত টাকা নিয়ে বেরিয়েচ।

হুঁ হুঁ, অনেক। তোমাকে জিলিপির দাম দিয়েও আমার তেরো টাকাইয়ে তেরো টাকা, খুচরো পয়সার হিসেব করতে গিয়ে দামুর একটু গুলিয়ে গেল : মরুক গে, তেরো টাকা কয়েক গণ্ডা পয়সা থেকে যাবে আমার কাছে। কত হবে বলে একটা হাতির দাম? বেশি হলেও ওই ধরো দশটা টাকাই লাগুক–অ্যাঁ?

আরও একবার চমকাল নিবারণ ময়রা। এবার এত বেশি করে চমকাল যে জিলিপি ভাজার কড়াইটা উল্টে যেতে যেতে একটুর জন্যে সামলে গেল।

তারপর নিবারণ সোজা দুহাতে নিজের টাক থাবড়ে বলতে লাগল : হায়—হায়—হায়–হায় রে।

বলি, অমন করে মাথা চাপড়াচ্ছ কেন? আমি হাতি কিনব শুনে তোমার যে সব্বোনাশ হয়ে গেল মনে হচ্ছে।

সে কথায় কানই দিলে না নিবারণ। টাক থাবড়ে বলে যেতে লাগল : ওগো, এমন পাগলাকেও কেউ রাস্তায় ছেড়ে দেয়? দশ টাকায় হাতি কিনতে চায়, একে যে পাগলা গারদে আটকে রাখা উচিত ছিল গো! হায়—হায়—হায়–

বর্ষার জল-ভরা ধানখেতে ঢোঁড়া সাপের তাড়া খেয়ে ধেনো চিংড়িগুলো যেমন ছটাং ছটাং করে লাফিয়ে ওঠে, তেমনি করে একটা লাফ মারল দামু।

বটে, মস্করা হচ্ছে আমার সঙ্গে? আমায় বলছ পাগল?–দামু চেঁচিয়ে উঠল : ভাগ্যিস তোমার জিলিপি খেয়েছি, নইলে হাতের এই লাঠি দিয়ে তোমায় পিটিয়ে আমি চৌকো করে দিতুম! ইঃ, উনি আবার জিলিপি ভাজেন। তোমার জিলিপি পচা, তোমার জিলিপি ছাই, তোমার জিলিপি ছাগলেও খায় না। এই আমি চললুম। হাতি নিয়ে তোমার সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে যদি চলে না যাই, তবে আমার নাম দামু মণ্ডলই নয়।

কড়ায় জিলিপি পুড়ে গেল, নিবারণ হাঁ করে চেয়ে রইল দামুর দিকে। পয়সা আগেই দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, মাথায় সেই জগঝম্প পাগড়ি আর মস্ত লাঠি নিয়ে হন্ হন্ করে এগিয়ে গেল দামু।

ফুঃ, ময়রাজিলিপি ভাজতেই জানে কেবল, হাতির ও কী জানে। চলতে-চলতে ভাবতে লাগল দামু : এ-সব বোকা-সোকা লোকের সঙ্গে কথা কয়ে লাভ নেই, বুঝদার কাউকে জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে। গাঁ সুদ্ধ সবাই নিশ্চয় ময়রাটার মতো হাবাগোবা নয়।

বুঝদার তোক পাওয়া গেল একটু পরেই। দাওয়ায় বসে তামাক খাচ্ছিল সে।

তার নাম জগাই ঘোষ। পেল্লায় মোটা চেহারা, প্রকাণ্ড ভূঁড়ি, লম্বা-লম্বা কান। গাঁয়ের ছেলে-পুলে দূর থেকে তাকে দেখে হাতি-হাতি বলে চাঁচায়, আর তা শুনলেই জগাই ঘোষ–

তা শুনলেই জগাই ঘোষ কী করে, সেটা দামুই টের পেল একটু পরে।

জগাইয়ের জাঁদরেল চেহারা দেখেই দামু দাঁড়িয়ে গেল। বেশ বিনয় করে বললে, ও মশাই!

লাল টুকটুকে দুটো খুদে চোখ দিয়ে দামুকে একবার দেখল জগাই। তারপর বললে, কী, দই চাই? দই আজ ফুরিয়ে গেছে, আর হবে না। কাল সকালে এসো।

এজ্ঞে দই চাইনে। একটা হাতি—

ঠক করে হুঁকোটা নামিয়ে জগাই ঘোষ ঘোঁৎ করে উঠল : কী বললে?

এজ্ঞে হাতি। একটা হাতি যদি—

ব্যস, ওই পর্যন্তই, আর বলতে হল না। তখুনি দাঁড়িয়ে পড়ল জগাই ঘোষ।

পাজি–নচ্ছার—বেল্লিক—ছুঁচো– বলে আকাশ ফাটিয়ে ডাক ছাড়ল একটা। তারপরেই কুড়িয়ে নিল একখানা রাম-লাঠি–দামুর লাঠির চাইতেও হাতখানেক সেটা লম্বা।

আজ খুনই করে ফেলব তোকে–বলে জগাই সেই বিরাট শরীর নিয়ে–হা-রে-রে-রে বলে তাড়া করল দামুকে!

বাবা রে গিচি–গিচি–বলে দামু ছুটল। ছুটল বিশ মাইল স্পিডে। পেছনে খ্যাপা হাতির মতো তেড়ে চলল জগাই ঘোষ।

.

পাঁচ

ছুট তো ছুট–একেবারে বাপ-রে মা-রে করে।

হাতে অবিশ্যি পেল্লায় লাঠিখানা দামুর ছিলই, কিন্তু জগাইয়ের সেই হাতির মতো জগঝম্প চেহারা, সেই পাকা করমচার মতো টুকটুকে লাল চোখ, সেই পিলে কাঁপানো চিৎকার আর অ্যাই মোটা ঠ্যাঙাটা দেখেই দামু বুঝতে পেরেছিল যে জগাই একবার তাকে ধরতে পারলে আর আস্ত রাখবে না। প্রাণপণে ছুটতে ছুটতে দামু ভাবতে লাগল : এই দ্যাখো একবার। কাণ্ডখানা! হাতির খবর জানতে চাইলে তেড়ে মারতে আসে। এ কী রকম গাঁ–আর এখানকার মনিষ্যিগুলিই বা কী ধরনের! বাবা গো–এ যে দেখছি মেরেই ফেলবে একেবারে।

কিন্তু জগাই দামুকে ধরতে পারল না। একে তো তালগাছের মতো লম্বা লম্বা ঠ্যাং, তার ওপরে প্রাণের দায়। দামু ছুটতে লাগল দিল্লি মেলের মতো। আরও একটা কাণ্ড ঘটল তার সঙ্গে। হঠাৎ দূর থেকে পাঁচ-সাতটা ছেলে: চেঁচিয়ে উঠল। এই রে হাতি খেপেছে।

ঘাঁক করে থেমে গেল জগাই ঘোষ, যেন ব্রেক কষল। ঘাড় ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে উঠল : কে বললে রে?

দূর থেকে সাড়া এল :হাতি খেপেছে রে, হাতি খেপেছে।

তোদের সব কটাকে চটকে আমি ছানা বানাব বলেই জগাই ঘোষ এবার ছুটল ছেলেদের দিকে। অর্থাৎ দিল্লি মেলের পেছনে ছুটলাগানো বোম্বাই মেল লাইন বদল করল। আর দামু গিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ল একটি ভালোমানুষের ঘাড়ে, সে বেগুন-মুলো-কাঁচকলা–এই সবের পসার নিয়ে বসেছিল তার ঘরের সামনে। বোধহয় হাটে বেরুতে যাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ মুলো-বেগুন কাঁচকলার ভেতরে গড়াগড়ি খেল দুজনে। তারপর সামলেসুমলে উঠে বসল দামু। হাতজোড় করে বললে, কিছু মনে কোরো না দাদা–যে রামতাড়া লাগিয়ে ছিল, দিশে হারিয়ে তোমার ঘাড়ে এসে পড়িচি।

চাষী গেরস্তটি নিপাট ভালোমানুষ। সে ধুলো ঝেড়ে উঠে তরকারি গোছাচ্ছিল। বললে, কিছু মনে করিনি ভাই, নিজের চোখেই তো দেখলুম। ওই ছোঁড়াগুলোই তোমায় বাঁচিয়ে দিলে। ওদের আর ধরতে পারবে না–টুক টুক করে আমগাছে জামগাছে উঠে পড়বে। তা বেত্তান্তটা কী? জগাই ঘোষকে অমন খেপিয়ে দিলে কী বলে?

খেপাইনি তো। হাতির কথা জিজ্ঞেস করেছিলুম।

আল্লা–আল্লা।–চাষীটির মুখ ভার হল :তোমারই বা আক্কেল কী, দাদা? একেবারে ছেলেমানুষ তো নও। তুমিও হাতি-হাতি বলে জগাইকে খেপাতে গেলে?

আরে দুত্তোর! আমি ভি-গেরাম থেকে এইচি, কী করে জানব যে হাতির নাম শুনলিই। লোকটার অমন মাথামুণ্ডু বিগড়ে যায়? কেবল বলিচি, দাদা-একটা হাতি কোথায় পাব–অমনি ব্যস!

তুমি জানতে না?

মা কালীর দিব্যি, কিচ্ছু জানতুম না।

অ।–চাষীটি বললে, ওই তো মুস্কিল। যাক গে, বেঁচে গেলে এ-যাত্রায়। কিন্তু কারবারখানা কী বলল দিকিনি? সত্যিই তোমার একটা হাতি দরকার নাকি?

সত্যিই দরকার।

কিন্তু তুমি হাতি নিয়ে কী করবে?–লোকটি ভালো করে দামুর দিকে চেয়ে দেখল : তুমি তো দেখছি আমার মতন গরিব মানুষ। হাতি পুষবে কী করে?

অনেক খরচ বুঝি?

বেজায়। শুনিচি, হাতি পুষতে রাজা বাদশাও দেউলে হয়ে যায়।

তবে পুষব না। কাজ মিটে গেলে বনেবাদাড়ে ছেড়ে দেব। চরে খাবে।

সে আবার কী?–একটা বেগুন হাতে নিয়ে চাষীটি বোকার মতো চেয়ে রইল :তোমার কথার মাথামুণ্ডু তো বুঝতে পারছি না।

সব বুঝিয়ে বলছি। আগে এক ঘটি জল খাওয়াও দাদা–ওই জগাইয়ের তাড়ায় আমার বুকের ভেতরটা হাঁক্কোল-পাঁক্কোল করছে।

লোকটি ভেতরে উঠে গেল। শুধু এক ঘটি জলই নয়, একটা ছোট ধামায় করে খানিক মুড়ি-মুড়কিও নিয়ে এল। আর তখন সব দুঃখ ভুলে গিয়ে, মুড়ি-মুড়কিতেই মন দিলে দামু। জগাই ঘোষের চিৎকার শুনেই নিবারণ ময়রার জিলিপিগুলো হাওয়া হয়ে গিয়েছিল পেটের ভেতর।

দেখতে দেখতে ধামা সাফ। তারপর এক ঘটি জল। এতক্ষণ পরে দামুর পেট, শরীর, মাথা সব একসঙ্গে জুড়িয়ে গেল। নাঃ, যা ভেবেছিল তা নয়। এ-গাঁয়ে ভালো লোকও আছে! একটা ঢেকুর তুলে, মুখ-টুখ মুছে বললে, তা হলে বেত্তান্তটা হল গিয়ে তোমার–

ব্যথার ব্যথী পেয়ে দামু খুলে বললে ব্যাপারটা। পঞ্চাননের কথা, রুনকুর কথা–সব।

চাষীর নাম কলিম শেখ। শুনে সে মাথা চুলকোতে লাগল।

তবে তো মুস্কিল।

খুব মুস্কিল।

দশ-বারো টাকায় হাতি কিনতে চাইছ- কলিম শেখ মাথা নাড়তে লাগল :সে তো হবে না।

পঁচিশ-তিরিশ লেগে যাবে নাকি?–দামু ভয় পেয়ে গেল।

না হে, শুনচি দুত্তিন হাজার টাকা লাগে।

দুত্তিন হাজার! সে কত?

কে জানে। চোখে দেখেচি নাকি কোনওদিন? মানে, তোমার আমার মতো বিশ-পঞ্চাশ জনকে বেচলেও হবে না। উঁহু, হাতি তুমি কিনতে পারবে না।

তবে কী হবে?–দামুর কান্না এসে গেল গলায় : হাতি কী একটা আমি পাব না? তা হলে যে আমি আর ঠাকুরমশাইয়ের কাছে মুখ দেখাতে পারব না। আমাকে সন্নিসি হয়ে চলে যেতে হবে।

দাঁড়াও–দাঁড়াও, সন্নিসি হবে কেন? তুমি তোক ভালো, আল্লা আছেন–একটা ব্যবস্থা করে দেবেনই। কলিম শেখ একটু ভেবে নিল : শুনিচি, চৌধুরীপাড়ার জমিদারবাবুর একটা হাতি আছে। যাও না–তাঁকে বলে কয়ে কদিনের জন্যে চেয়ে নাও না হাতিটা।

দেবে?

কেন দেবে না? তুমি একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বললেই দিতে পারে।

চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী–দামু ভাবল। যা মনে হচ্ছে, হাতি বোধহয় কেনা যাবে না। তার চেয়ে জমিদারের কাছে গিয়েই ধরে পড়া যাক। বড়লোক, শরীফ মেজাজকে জানে দিয়েও দিতে পারে।

চৌধুরীপাড়া? সে কত দূর?

তা কোশ পাঁচেক হবে এখান থেকে। এই তো সোজা রাস্তা-জোর পায়ে যদি হেঁটে যাও, তা হলে সন্ধের পর পৌঁছে যাবে সেখানে। তার চেয়ে আমি বলি কী, সে তো অচেনা জায়গা–রাত-বিরেতে গিয়ে কিছু ঠাহর করতে পারবে না–আমার এখানেই রাতটা থেকে যাও।

কিন্তুক দেরি হয়ে যাবে যে।

কিচ্ছু দেরি হবে না। আর জমিদার–তাদের হল গে নবাবী মেজাজ, রাত্তিরে কি আর তারা তোমার আমার মতো গরিব মানুষের সঙ্গে দেখা করবে, না কথা কইবে? থেকে যাও এখানেই। আমাদের রান্না তো আর খাবে না, আমি নতুন হাঁড়ি দেব, চাল-ডাল-আনাজ দেব, দুটি ফুটিয়ে নিয়ো।

দামু ভেবে-চিন্তে বললে, তবে তাই হোক দাদা, আজ আমি তোমারই অতিথ হলাম।

.

রাতটা খুব সুখে কেটে গেল দামুর। শুধু ডাল-চাল-আনাজ নয়, কোত্থেকে চারটি মাছও এনে দিলে কলিম শেখ। রান্না-টান্ন দামুর আসে না–কলিম শেখের বুড়ো মা দূরে বসে সব দেখিয়ে-টেখিয়ে দিলে। মোটের ওপর খাওয়াটা তার ভালোই হল।

সকালে উঠেই দামু তৈরি। আর তর সইছে না।

কলিম বললে, আল্লা ঠিক তোমায় একটা হাতি জুটিয়ে দেবেন। কিন্তু যাওয়ার সময় এখান দিয়ে একটু দেখিয়ে নিয়ে যেয়ো ভাই। আমার অনেক কলাগাছ আছে, তোমার হতিকে পেট পুরে খাইয়ে দেব।

নিচ্চয়–নিচ্চয়। সকলের আগে তো তোমার দোরগোড়াতেই হাতি নিয়ে আসব। অনেক উবগার করেছ দাদা–কোনওদিন তোমায় ভুলতে পারব না।

দামু বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।

একটু এগিয়েছে, হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল একদল ছেলের চিৎকার : খেপেছে রে, হাতি খেপেছে–

আবার জগাই ঘোষ!

দামু আর দাঁড়ায়? কোনওদিকে না তাকিয়েই সোজা দৌড়।

দৌড়ল মাইল তিনেক। না–গাঁ-টা পেছনে পড়ে গেছে অনেকক্ষণ, জগাইয়ের চিহ্নও নেই কোথাও। দামু জিরোবার জন্যে একটা গাছতলায় বসে পড়ল।

একদল লোক আসছিল উল্টো দিক থেকে। দামু তাদের জিজ্ঞেস করলে, চৌধুরীপাড়া এদিকেই তো?

তাদের একজন বললে, , আর কোশ তিনেক হবে। আমরাও চৌধুরীপাড়া থেকেই আসছি।

বটে-বটে।–দামু উঠে দাঁড়াল : তবে তো ভালোই হল। বলতি পারো, ওখানে গেলে জমিদারবাবুর সঙ্গে হবে কি না?

জমিদারবাবু? তিনি তো এখন গাঁয়ে নেই, ছমাস হল কলকাতায় গেছেন। সেখানেই তিনি থাকেন, কালে-ভদ্রে গাঁয়ে আসেন। কেন, তাঁকে তোমার কী দরকার?

তাঁকে দরকার নেই, দরকার তাঁর হাতিটা।

হাতি?–লোকগুলো আশ্চর্য হল। তারপর একজন বললে, বুঝেছি, মাহুতের চাকরি চাও। কিন্তু সে-হাতি তো মরে গেছে সাত বচ্ছর হল। আর এখন তো জমিদারিই নেই হাতি পুষবে কে?

–অ্যাঁ!–ধপাস করে দামু বসে পড়ল গাছতলায়। কী হল, শুনে যে তোমার মাথায় বাজ পড়েছে মনে হচ্ছে।

কিন্তু একটা হাতি যে আমার চাই-ই দাদা।

নেতান্তই চাই!–আর একজন ঠাট্টা করে বললে, তাহলে জঙ্গলে চলে যাও–একটা হাতি ধরেই আনো গে।

শুনে, সব লোকগুলো খ্যাঃ খ্যাঃ করে একচোট হাসল, তারপর এগিয়ে চলে গেল।

কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল দামু। বসে রইল মুখোনাকে একটা কেলে হাঁড়ির মতো বিকট আর গম্ভীর করে।

ঠিক বলেচে। হাতিই ধরব জঙ্গল থেকে। সেদিনও পালানো ছাগল ধরে এনিচি, দড়ি ছেঁড়া বাছুর ধরিচি–আর একটা হাতি ধরতি পারব না? নিশ্চয় ধরব। কেবল জঙ্গল চাই একটা। দামু উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে পড়ল জঙ্গল খুঁজতে।

.

ছয়

জঙ্গল একটা খুঁজতে হবে। কিন্তু কোথায় সেরকম জঙ্গল, যাতে হাতি পাওয়া যায়?

চলতে চলতে দামু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার খিদে পেয়েছে। হাতির ভাবনা ভাবতে ভাবতে হাতির মতোই খিদে পেয়ে যায় কেবল। কী মুস্কিল!

একটা কুয়ো দেখা যাচ্ছিল একটু দূরে, গাঁয়ের মেয়েরা তাতে জল তুলছিল। দামু সেই কুয়োর কাছে গিয়ে মস্ত একটা পাকুড় গাছের তলায় বসে পড়ল। খাওয়ার ভাবনা ছিল না, আসবার সময় কলিম শেখের বুড়ি মা পুঁটলি বেঁধে সের দুই মুড়ি-মুড়কিকদমা বাতাসা বেঁধে দিয়েছিল তার সঙ্গে। তারই খানিকটা খেতে-খেতে দামু ভাবতে লাগল-একটা বেশ বড়গোছর জঙ্গল দরকার।

অবশ্য তার নিজের গাঁয়ে, আশেপাশে, ঝোঁপঝাড়, বনবাদাড় বিস্তর আছে। টোপা কুল, বৈঁচি, তফল, পানিয়াল কিংবা ট্যাঁপারির খোঁজে সে সব ঝোপেঝাড়ে আদাড়ে-পাদাড়ে সে হানা দিয়েছে অনেকবার। শেয়াল-খরগোশ-খটাশ এ সব অনেক দেখেছে, ভাম বেড়ালও চোখে পড়েছে দু চারটে, কিন্তু হাতি কখনও দেখেনি। হাতির জন্যে অনেক বড় জঙ্গল দরকার বোধহয়। অমন পেল্লায় জানোয়ার-ছোটখাটো জঙ্গলে কি তার পোয়?

কিন্তু সেই বড় জঙ্গলটার খবর পাওয়া যাবে কী করে?

থাবা থাবা মুড়ি-মুড়কি খেয়ে, গোটা ছয়েক কদমা চিবিয়ে, দামুর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। যে-মেয়েরা জল তুলছিল, তাদের দিকে এগিয়ে গেল সে।

এটটু জল দাও দিনি বাছারা। গলায় কদমা আটকে তো মলাম।

প্রায় এক বালতি জল খেয়ে দামুর প্রাণটা একটু ঠাণ্ডা হল।

বাঁচালে বাছারা। ভগবান ভালো করবেন তোমাদের।

ভার-ভাত্তিক গিন্নি-বান্নি চেহারার একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল : বিদেশী লোক বুঝি?

হাঁ দিদি, বিদেশী লোক।

যাবে কোথায়?

যাব?–একটু ভেবে-চিন্তে দামু বললে, যাব একটা হা–মরুক গে, যাব জঙ্গলে।

জঙ্গলে! অ্যাঁ, সেকি গো?–মেয়েরা অবাক হয়ে গেল। অবশ্য দামুকে দেখলে আচমকা জঙ্গলের জীব বলেই সন্দেহ হয়, কিন্তু সত্যি সত্যিই সে যে জঙ্গলে যেতে চাইবে এটা তারা ঠিক বিশ্বাস করতে পারলে না।

হাঁ দিদি, একটা জঙ্গলই আমার দরকার। বড় জঙ্গল।

বড় জঙ্গল! কী করবে সেখানে গিয়ে?–একজন দামুর মস্ত লাঠিখানার দিকে চেয়ে দেখল : বাঘ–ভালুক মারবে নাকি? ওই লাঠি দিয়ে?

না–না, বাঘ-ভালুক মারব না। দামু ভীষণ চমকে গেল : বাঘ-ভালুক আমি আদৌ পছন্দ করি না।–বলতে বলতে দামুর মনে পড়ে গেল, তাদের গাঁয়ের কে যেন জঙ্গলে যেত কাঠের ব্যবসা করতে। সে বুদ্ধি খাঁটিয়ে বলে বসল : আমি কাঠের ব্যবসা করি।

তাই বুঝি?

সেই জন্যেই তো জঙ্গল খুঁজে বেড়াচ্ছি দিদি। বলতে পারো, কোন্ দিকে গেলে জঙ্গল পাব?

তা জঙ্গলের অভাব কী? দেশটাই তো জঙ্গলে ভর্তি। এই তো পুবদিকে ক্রোশ দুই হাঁটলেই রাজার গড়ের মস্ত জঙ্গল রয়েছে। মাঝে মাঝে সেখান থেকে চিতে বাঘ-টাঘ বেরোয় শুনেছি।

না–না, চিতে বাঘ নয়।–দামু আবার ভীষণভাবে চমকে উঠল : আমার দরকার একটা হা বলতে বলতেই দামু জিভ কাটল। এই রে, হাতির কথাটা বলে ফেলেছিনু আর কি। জগাই ঘোষের তাড়া খেয়ে আর পথ-চলতি লোকগুলোর ঠাট্টা মস্করা শুনে, সে বুঝে গিয়েছিল–হাতির ব্যাপার যাকে-তাকে বলে ফেলাটা উচিত নয়। তাতে লাভ তো হয়ই না, বরং ঝঞ্জাট বেড়ে যায়। সাধে কি পিসি বলে, ভালো পিত্তিজ্ঞে পাঁচ কান করতে নেই?

সেই গিন্নি বান্নি মেয়েটি অবাক হয়ে বললে, হা কিগো? হা কাকে বলে?

কাউকে বলো না দিদি, কাউকে না।–দামু খুব বুদ্ধিমানের মতো সামলে নিলে : এই মুখ দিয়ে একটা হাই উঠেছিল কিনা, তোমার গে সেইটেকেই–সে যাক গে, আমি রাজার গড়ের জঙ্গলের দিকেই চললুম।

বলতে বলতে, হাতের সেই রামলাঠিতে ভর দিয়ে দামু লাফিয়ে নেমে পড়ল মাঠের ভেতর। তারপর আরও গোটা কয়েক লাফ দিয়ে একেবারে উধাও!

মেয়েরা অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে রইল সেদিকে। তারপর একজন বললে, লোকটা যেন কেমনধারা। পাগল-টাগল নাকি?

আর একজন বললে, মানুষ নয় বোধহয়। বেহ্মদত্যি-টত্যি হতে পারে। চেহারাখানা দেখলে না? তার ওপর আবার লাফাতে লাফাতে চলল জঙ্গলের দিকে। হুঁ, বেহ্মদত্যিই নিঘাত।

অ্যাঁ। রাম—রাম–রাম–

আর দামু তো চলল জঙ্গলের দিকে। মাঠ-ঘাট খানা-খন্দ গাঁ-গঞ্জ পেরিয়ে চলেছে তো চলেছেই। হাতি ধরবে–হাতি ধরবে। যে-জঙ্গলে চিতাবাঘ থাকে সেখানে হাতি থাকবে না, তাও কি হয়?

কিন্তু বাঘ!

দামু একবার থেমে দাঁড়াল। এই বাঘের ব্যাপারটাই তার পছন্দ হচ্ছে না। যদি হাতি ধরতে গিয়ে বাঘে খায়? সব্বোনাশ!

ঝঞ্জাটটা দ্যাখো দিকিনি একবার। একটা ভালো কাজও কি নিশ্চিন্দি হয়ে করবার জো আছে? জঙ্গল থাকবে, সেখানে পালে-পালে হাতি চরে বেড়াবে আর দামু তাদের একটা শুড় ধরে সুড়সুড় করে টেনে নিয়ে আসবে। এর ভেতরে আবার খামকা বাঘ এসে হাজির হয় কেন? বাঘ সোঁদরবনে যাক না–সেখানে হালুম-হালুম করে যাকে ইচ্ছে ধরে খাক।

মরুক গে, আর ভাবব না। পিঠের পুঁটলি থেকে আরও কিছু মুড়ি কদমা খেয়ে, একটা পুরনো দিঘি থেকে খানিকটা জল খেয়ে নিয়ে-দামুর মনে হঠাৎ একটা তেজ এসে গেল। ইস, বাঘে খেলেই হল আর কি। হাতে লাঠি আছে না? দাদাঠাকুরের নাতনির জন্যে হাতি খুঁজতে চলেছি, কত বড় পুণ্যির কাজ-বাঘের সাধ্যি কী, আমার কাছে এগোয়? হাতের এই পেল্লায় লাঠি দিয়ে পিটিয়ে একেবারে পরোটা বানিয়ে ছাড়ব।

যেই মনে হল কথাটা, অমনি দামু একটা হুঙ্কার ছাড়ল। কাছেই দুটো দাড়িওয়ালা ছাগল চরছিল, তারা আচমকা ভয় পেয়ে ব্যাব্যা করে বাড়ির দিকে ছুটল।

দামু চলল। মাথার ওপর দিয়ে দুপুর গড়িয়ে গেল, বিকেল হল। তবু রাজার গড়ের জঙ্গলের তো দেখা নেই। মিথ্যে কথা বললে নাকি মেয়েরা?

একজন চাষী আসছিল নিড়েন হাতে। দামু তাকেই ডাকল।

ও দাদা।

কী গো?

রাজার গড়ের জঙ্গল কোনদিকে?

রাজার গড়? সে তো ওদিকে।–দামু যে-দিক থেকে এসেছে সেই দিকটাই দেখিয়ে দিল লোকটা।

ওই রাস্তা দিয়েই তো এলমদেখতে পেলাম না তো?

কটা উঁচু উঁচু ঢিবি দ্যাখোনি? একটা পুরনো দিঘি?

দেখব না কেন? সেই দিঘিতে নেমে তো জল খেলুম।

সেইটেই তো রাজার গড়।

কিন্তু জঙ্গল তো দেখতে পেলুম না।

আরে জঙ্গল তো ছিল বিশ বছর আগে। কবে কেটে সাফ করে দিয়েছে লোকে। পাঁচ-সাত বছর আগেও দু-চারটে গাছটাছ ছিল, এখন তাও নেই।

অ্যাঁ।–দামু বসে পড়ল ধুলোর ওপর।

কী হল তোমার?

কিছু হয়নি দাদা, তুমি যাও।

এবার দামুর কান্না পেতে লাগল। বরাত একেই বলে। জমিদারের হাতি মরে গেছে সাত বচ্ছর আগে, বিশ বছর হল রাজার গড়ের জঙ্গল সাফ। তা হলে? তা হলে হাতি কোথায় পাওয়া যাবে? কেমন করে সে ফিরে যাবে দা-ঠাকুরের কাছে, রুনকু দিদির কাছে? আর কি কোনও দিন কারও কাছে মুখ দেখাতে পারবে সে?

চোখ দিয়ে দামুর জল পড়তে লাগল।

অনেকক্ষণ একভাবে সে বসে রইল। সূর্য ডুবে গেল মাঠের ওপারে, চারদিকে কালো রাত নেমে এল। তখন দামুর মনে হল মাঠের ভেতরে এরকম একা একা বসে থাকার কোনও মানে হয় না। কাছাকাছি কোনও গাঁয়ে গিয়ে রাতের আস্তানাটা যোগাড় করা যাক, তারপরে কাল সকালে যা হয় একটা ব্যবস্থা করা যাবে।

দামু গ্রাম খুঁজতে বেরুল। কিন্তু অন্ধকারে মাঠের ভেতরে পথ হারাতে তার সময় লাগল না। না পায় খুঁজে গ্রাম, না চোখে পড়ে একটা আলো। ঘুরতে ঘুরতে হাঁটু টনটন করতে লাগল, কাঁটায় পা ছড়ে গেল, কিন্তু গ্রাম আর মেলে না! কোথা থেকে যে কোথায় যাচ্ছে, কিছুই টের পাচ্ছে না সে।

ইকি ল্যাঠায় পড়া গেল রে বাপু। সারা রাতই ঘুরে মরতে হবে নাকি এমনি করে?

ল্যাঠা মিটতে দেরি হল না। শেষ পর্যন্ত দামু যেখানে গিয়ে পৌঁছল সেখানে চারদিকে শুধু গাছপালার সার আর অথই অন্ধকার।

অ্যাঁ–এই তো জঙ্গল! এই তো পেয়ে গেছি!

কিন্তু জঙ্গল পেয়েও দামুর মনে তখন আর সুখ ছিল না। বুক ভয়ে ধুকপুক করছে। তখন। বাপরে, কী অন্ধকার আধ হাত দূরেও যদি নজর চলে! ঝাঁ ঝাঁ করে ঝিঁঝি ডাকছে চারদিকে–সে-আওয়াজে কানের পর্দা ছিঁড়ে যাওয়ার জো! ধু ধুধুম করে কোথায় একটা হুতোম প্যাঁচাও ডাকল।

হাতি মাথায় থাক, এখন বাঘে না খেলেই রক্ষে।

লাঠিটা অবিশ্যি সঙ্গেই আছে, বাঘকে জুতমতো পেলে পিটিয়ে ঠাণ্ডা করেও দেওয়া যায়। কিন্তু তার আগেই তো বাঘ তাকে ধরে ফেলবে। অন্ধকারে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, পিছন থেকে বাঘ যদি গুটিগুটি এসে

ওরে বাপরে!

দামু আর ভাবতে পারল না। হাতি-টাতি পরে হবে, এখন তো একটা গাছে টাছে উঠে পড়া যাক। তারপর সকাল হলে খুঁজে দেখা যাবে, এই বনের ভেতর দু-একটা হাতির দেখা মেলে কি না!

অতএব আর কথা নয়, সামনে যে-গাছটা পেল, তাতেই তড়বড়িয়ে উঠে পড়ল দামু।

কী গাছ কে জানে। যেমন বড়, তেমনি ঝুপসি। গাছটার আধাআধি উঠে পড়ে, গোটা দুই মোটা ডালে ঠেসান দিয়ে বসে পড়ল দামু। জায়গাটা মন্দ জোটেনি। এখানে শুধু বসে থাকা নয়, ইচ্ছে হলে একটু ঝিমিয়েও নেওয়া যেতে পারে।

দু-চারটে কাঠপিঁপড়ে কামড়ে দিয়েছিল, তাতে এক-আধটু জ্বালা করছিল। একঝাঁক বিচ্ছিরি মশাও গুনগুন করছিল কানের কাছে। তবু পরম নিশ্চিন্তি হয়ে বসে রইল দামু। অনেকটা উঠে বসেছে সে–এখানে অন্তত বাঘ তাকে লাফিয়ে ধরতে পারবে না।

আশেপাশে এদিকে-ওদিকে জোনাকির সার জ্বলছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন দামুর দুচোখ ভরে ঘুম এল। হাতের লাঠিটা যে কোন ফাঁকে নীচে পড়ে গেল সে টেরও পেল না। তারপর একসময় চটকা তার ভাঙল। শুকনো পাতায় খসখস করে আওয়াজ উঠছে যেন। গাছের নীচে কালো মতন কী একটা চরে বেড়াচ্ছে না? অন্ধকারে চোখ একটু সয়ে গিয়েছিল। ভালো দেখতে না পেলেও দামু বুঝতে পারল, সেটা চার পায়ে গুঁড়ি মেরে হাঁটছে। না–বাঘ নয়। বরং–

অ্যাঁ, তবে কি বাচ্চা হাতি? মানে হাতির বাচ্চা?

মনে হতে যা দেরি। তবে তো পেয়ে গেছি! জয় গুরু!

গাছের তলায় হাতির বাচ্চাটা তখনও গুঁড়ি মেরে হাঁটছিল। দামু নামতে লাগল আস্তে আস্তে। ধরবই এবার। একবার ঝপাং করে পিঠে চড়াও হই, তারপর দেখব তুমি কেমন হাতির বাচ্চা! দেখব সুড়সুড় করে তোমায় পঞ্চানন মুখুজ্যের দুয়ারে নিয়ে হাজির করতে পারি কি না!

জয় গুরু!

হাত তিনেক ওপর থেকেই দামু ধপাস করে লাফিয়ে পড়ল হাতির বাচ্চার পিঠের ওপর। সঙ্গে সঙ্গেই সে আওয়াজ করল, ক্যাঁক–আর মাটির ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।

জঙ্গল কাঁপিয়ে, দামু বিজয়োল্লাসে হাঁক ছাড়ল : ধরিচি—ধরিচি—

.

সাত

সেই মিশমিশে অন্ধকারের ভেতরে একটা বিটকেল কাণ্ড শুরু হয়ে গেল তখন।

ধরিচিধরিচি বলে দামু যত গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচায়–ততই চেপটে যাওয়া জানোয়ারটা কী রকম যেন কঁক কঁক করে আওয়াজ করতে থাকে। দাম বললে, করো–করো কঁক কঁক–! এর পরে যখন কলাটা মুলোটা খাইয়ে দিদিমণিকে তোমার পিঠে চাপিয়ে দেব, তখন ভাববে–হাঁ, হাতি-জন্মটা অ্যাদ্দিনে সাথক হল আমার।

কিন্তু একটু পরেই কেমন খটকা লেগে গেল দামুর। অ্যাঁ–ই কী রকমটা হল? হাতিটার মাথায় যেন ছাঁটা-ছাঁটা কদম চুল রয়েছে। হাতির বাচ্চার মাথায় চুল থাকে নাকি? কই–এমন তো কখনও শোনা যায়নি। তা ছাড়া গায়ে যেন তেল মাখা রয়েছে মনে হচ্ছে! আর হাতির গুঁড়-দামু মুখে হাত বুলিয়ে দেখল শুড় তো নেই, দিব্যি একটা থ্যাবড়া মতন নাক রয়েছে সেখানে।

.

অ্যাঁ–এ যে মনিষ্যি বলে মনে হচ্ছে গো!

দামু হাঁউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠবে কি না ঠাহর করবার আগেই টর্চ লাইটের খানিক আলো এসে পড়ল তার গায়ে। তারপরই মোটা গলার আওয়াজ : বলি হচ্ছে কী? হচ্ছেটা কী এই অন্ধকারের ভেতর?

কোত্থেকে আবার লণ্ঠন হাতে জন দুই লোক দৌড়েও এল। দামু দেখল, টর্চ আর লাঠি হাতে গাঁয়ের চৌকিদার, তার পিছনে পিছনে দুজন গাঁয়ের মানুষ।

আর সে যার ওপর গাঁট হয়ে বসে রয়েছে সে এক কালো মুশকো জোয়ান। তার পরনে। লেংটি মন কী রয়েছে, এক হাতে একটা সিঁদকাঠি। জোয়ানটা বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে–গলা দিয়ে গোঁ গোঁ করে আওয়াজ বেরুচ্ছে তার।

চৌকিদার আর লোক দুটো খানিকক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইল এই অপরূপ দৃশ্যের দিকে। তারপর তাদের একজনের মুখ থেকে অদ্ভুত আওয়াজ বেরুল : এ যে পটাই চোর গো!

কিন্তু পটাইয়ের পিঠের ওপর বসে কে? ঐ যে আদত বেহ্মদত্যি!

তা বেহ্মদত্যি ছাড়া কী আর? চেহারাখানা একবার দেখছ না? তার ওপরে আবার মাথায় আড়াই হাত এক পাগড়ি।

দামু এতক্ষণে একটু একটু করে ধাতস্থ হচ্ছিল। দুত্তোর, জঙ্গল না ঘোড়ার ডিম, কোত্থেকে কাঁদের এক আমবাগানে ঢুকে বসে আছি! আর হাতির বাচ্চাই বা কোথায় কোন এক লেংটিপরা পটাই চোরকেই ঘপাৎ করে ধরে ফেলিচি! রামো-রামো।

লোকগুলো দূরে দাঁড়িয়ে কথা কইছিল, এতক্ষণে ভরসা পেয়ে চৌকিদার একটু একটু করে এগিয়ে গেল। বেশ মিহি গলায় দামুকে ডাকল : ওহে বেহ্মদত্যি।

শুনে দামু চটে গেল।

আমি বেহ্মদত্যি নই–দামু।

তা দামুই হও আর বেহ্মদত্যিই হও–এবার পটাইয়ের পিঠ ছেড়ে ওঠো দিকিনি। অজ্ঞান হয়ে গেছে-গোঁ গোঁ করছে, দেখতে পাচ্ছ না?

দামু এতক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পটাইয়ের পিঠেই গদিয়ান হয়ে বসেছিল, এবার তোক করে লাফিয়ে উঠল।

চৌকিদার গুটিগুটি পায়ে আরও একটু এগোল দামুর দিকে।

তুমি কে বট হে?

দামু বিরক্ত হয়ে বললে, কানে কম শোনো নাকি? বললুম না–আমি দামু? বিদেশ থেকে এইচি?

বিদেশ থেকে? তা এই আমবাগানে ঢুকেছিলে কেন?

কে জানে আমবাগান না কী!–হাতির ব্যাপারে দামু চালাক হয়ে গিয়েছিল, আসল কথাটা স্রেফ চেপে গেল। গজগজ করে বললে, আঁধার হয়ে গেল, গাঁ-টা কিছু খুঁজে পাইনে, এর মধ্যে ঢুকে পড়েছিলুম। ভেবেছিলুম, সকাল হলে যা হয় হবে।

বিদেশী তো এখানে কেন?

একটা চা-চাকরি খুঁজতে।

তোমার যা চেহারা–দেখলেই তো প্রাণ ঠাণ্ডা হয়ে যায়।–একজন টিপ্পনি কেটে বললে, চাকরি তোমায় দেবে কে হে? রাত্তিরবেলা তোমাকে দেখলে তো মানুষের দাঁতকপাটি লেগে যাবে।

আর তুমিই বা কোন কাত্তিকটি হে?–দামু চটে গেল : এই তো বেঁটে একটা খটাশের মতন চেহারা–তার ওপর কপালে আবার একটা আব গজিয়েছে। ঠিক কোলাব্যাঙের মতো দেখতে।

চৌকিদার থানার লোক–সে গম্ভীর হয়ে ঝগড়াটা থামিয়ে দিলে। বললে, যেতে দাও, যেতে দাও, এ-সব তুচ্ছু কথা নিয়ে সময় নষ্ট করতে হবে না। তা দামু, তুমি পটাইকে ধরলে কী করে বলো তো হে? ভারি ঘোড়েল চোর, আজ তিন মাস ধরে আমরা ধরবার চেষ্টা করছি অথচ ওর টিকিও ছুঁতে পাইনে। ইদিকে আশপাশের পাঁচ-সাতখানা গাঁ চুরি করে একেবারে ফাঁক করে দিলে। কী করে এটাকে ধরলে দাদা?

ইচ্ছে করে তো ধরিনি।

সেই কপালে আবওলা কোলাব্যাঙের মতো লোকটা আবার টিপ্পনি কাটল : তা যা বলেছ, ইচ্ছে করে তোমার ধরবার দরকার হয় না। সামনে এসে একবার দাঁত খিঁচিয়ে দাঁড়ালেই–ব্যস!

চৌকিদার মোটা গলায় বললে, আঃ, চুপ করো না গুপী হাজরা। এখন আইনের কথা হচ্ছে, এর মধ্যে টিকটিক কোরো না। তুমিই বলো দিকিনি দাদা হয়েছিলটা কী?

কী আর হবে?–দামু একবার কটমট করে তাকাল গুপী হাজরার দিকে : ভাবলুম বনবাদাড়, রাত্তিরে আবার মা-মনসা ছুবলে না দেন। তাই গাছের ডালে উঠে একটু ঘুমুতে চেষ্টা করছিলুম। তারপরেই যেন একটা হাতি

হাতি! হাতি কী হে!–চৌকিদার চমকে গেল।

না–না, ভুল বলিচি।–দামু সঙ্গে সঙ্গে জিভ কাটল : মানে হাতি নয়–ঘুমের ঘোরে হাত ফসকে পড়ে গিয়েছি গাছ থেকে। একেবারে লোকটার ঘাড়ের ওপর।

পটাই কী করছিল গাছতলায়?

কী করছিল সে আমি কেমন করে জানব? ওকেই শুধোও না।

কিন্তু তুমি যে ধরিচিধরিচি বলে চ্যাঁচাচ্ছিলে? সেই চিৎকার শুনেই তো আমরা এদিকে দৌড়ে এলুম।

দামু মাথাটা একবার চুলকোতে চাইল, কিন্তু পাগড়ির জন্যে চুলকানো গেল না। বললে, তাই তো–কেন যে চ্যাঁচালুম–সে তো জানিনে। বোধহয় বেভুল লেগে গিয়েছিল।

চৌকিদার মাথা নেড়ে বললে, লাগে, ওরকম বেভুল লাগে। ঘুমুতে-ঘুমুতে ও-ভাবে। আচমকা কারুর ঘাড়ের ওপর পড়লে অমন চিৎকার লোকের বেরোয়।

পটাই চোর এতক্ষণে আস্তে আস্তে উঠে বসল। চোখ দুটো ছাগলের চোখের মতো গোল-গোল করে তাকাতে লাগল চারদিকে! ব্যাপারস্যাপার যেন এখনও সে বুঝতে পারছে না।

চৌকিদার ঠাট্টা করে বললে, ওঠো হে মক্কেল, আর কেন? বিস্তর হাড় জ্বালিয়েছ আমাদের, উঠে পড়ো এবারে। লক্ষ্মী ছেলের মতো থানায় চলো এবার, তারপর মাস ছয়েক বেশ করে জেলখানায় ঘানি ঘুরিয়ে আসবে।

পটাই ঘোঁ-ঘোঁ করে বললে, ভূ—ভূ–ভূত—

গুপী হাজরা খ্যাখ্যা করে হাসল : ভূত নয়–ভূত নয়, বেহ্মদত্যি! পরশু চক্কোত্তি মশাইয়ের বাড়িতে সিঁধ কেটেছিলে না? তিনিই বেহ্মদত্যি চালান করে দিয়েছেন।

দামু বললে, দ্যাখো কোলাব্যাঙ–

চৌকিদার বললে, আহা থামো থামো, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে নেই। চলো হে পটাই, দারোগাবাবু তোমার মুখোনা দেখবার জন্যে ভারি ব্যস্ত হয়ে রয়েছেন। আর দামুদাদা, তোমাকেও যে একবারটি থানায় আসতে হচ্ছে আমাদের সঙ্গে।

থানার নাম শুনে বিষম ঘাবড়ে গেল দাম।

আমি? আমি কেন থানায় যাব? চোর নাকি আমি?

আহা-হা, চোর তুমি কেন, চোর তোপটাই। তুমি তাকে ধরেচ না? পটাইকে ধরলে একশো টাকা বকশিশ পাওয়া যাবে, দারোগাবাবু নোটিশ দিয়েছেন যে! আজ তো তোমারই ফুর্তি হে! চলো–চলো–ড্যাং ড্যাং করে নাচতে নাচতে চলল।

পটাই হাজতে গেল, চৌকিদারের সঙ্গে সেই দুজন ছাড়া আরও কিছু কিছু লোক পটাইকে গাল দিতে দিতে থানায় গিয়েছিল, তারাও বাড়ি চলে গেল। দারোগা একটা চেয়ারে বসে হুঁকো খাচ্ছিলেন। এবার দামুর দিকে তাকিয়ে বললে, তুমি কোথায় যাবে?

আমি আবার যাব কোন চুলোয়?–দামু, চটাস করে একটা মশা মারবার চেষ্টা করে। বললে, যদি দয়া করে থাকতে দেন, তা হলে থানার বারান্দায় শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারি।

তারপর?

কাল সকালে আবার পথে বেরিয়ে পড়ব।

কিন্তু তোমার চোর ধরবার বকশিশ? ও তো সরকারি টাকা–পেতে একটু দেরি হবে।

তা বটে!–দামু ভাবনায় পড়ল : টাকাটা পেলে খুব উগার হত। একটা দামী জিনিস কিনতে বেরিয়েছি–মানে একটা হাতি–

দারোগার হুঁকোর ফুড়ক-ফুড়ক টান বন্ধ হয়ে গেল।

কী কিনতে বেরিয়েছ বললে?

দামু একটু চুপ করে রইল। তারপর দারোগাবাবুর ভারভাত্তিক চেহারা দেখে তার মনে হল, হাঁ, বিশ্বেস করে সব কথা এঁকে বলা যায়। ইনি শোনবার মতো লোক।

একটু কেশে নিয়ে দামু বললে, তা হলে ইয়ে মানে দারোগাবাবু, আপনাকে সবটা গোড়া থেকেই বলি।

দারোগা গম্ভীর হয়ে সব শুনলেন। কোনও কথা বললেন না, দু-একবার বোধহয় হাসি পেয়েছিল, খুক খুক করে কেশে সেটা সামলে নিলেন। তারপরে সব শুনে-টুনে আবার ফুড়ক-ফুড়ক করে হুঁকো টানলেন কিছুক্ষণ।

দামু কাতর হয়ে বললে, দারোগাবাবু, আমি হাতি পাব একটা?

দারোগাবাবু বললেন, নিশ্চয়।

আপনি যোগাড় করে দিতে পারবেন?

দারোগা বললেন, আলবাত। আমরা থানার দারোগা–ইচ্ছে করলে সব পারি। যদি মনে করি, তোমাকে এক ঘটি টাটকা বাঘের দুধও খাইয়ে দিতে পারি–তা জানো?

দামু একেবারে গলে গেল।

এজ্ঞে জানি বই কি! সবাই তো সেই কথাই বলে।

দারোগা বললেন, তবে হাতি তো–দু-চারদিনের কাজ নয়, যোগাড় করতে একটু সময় লাগবে। সেদিন তুমি বরং আমার বাসাতেই থেকে যাও। আপত্তি আছে?

আপত্তি! বলেন কী! আমি আপনার গোলাম হয়ে থাকব।

দারোগা খুশি হয়ে বললেন, তা হলে চলো আমার বাসায়। রাত্তিরে বোধ হয় কিছু খাওয়া হয়নি তোমার?

খাওয়ার কথায় দামুর মনে পড়ে গেল, সেই চিড়ের পুঁটলি সাবাড় হয়ে গেছে কখন, এখন পেটে আগুন জ্বলছে। বললে, এজ্ঞে না। খুব খিদে পেয়েছে।

পাবেই। পটাই চোরকে ধরা কি চাট্টিখানি কথা হে? ওর মুখ দেখেই তো অন্নপ্রাশনের চাল পর্যন্ত হজম হয়ে যায়। এসো–এসো আমার সঙ্গে। দেখি, বাড়িতে ভাত-তরকারি কিছু আছে কি না।

পরমানন্দে দামু দারোগার সঙ্গে রওনা হল।

আর দারোগাবাবু ভাবছিলেন–যাক, বাঁচা গেল। একটা হাবা-গোবা চাকর খুঁজছিলুম অনেক দিন ধরে–অ্যাদ্দিনে পাওয়া গেল সেটাকে। একেই বলে বরাত।

.

আট

চোর ধরা পড়ল, বকশিশও জুটল, কিন্তু দারোগার বাড়ি থেকে দামুর আর ছুটি মেলে না। সন্ধেবেলা–যেদিন থানায় বিশেষ কাজ-টাজ থাকে না–সেদিন দামুকে পাক্কা দুটি ঘণ্টা ধরে দারোগার হাত-পা ডলাই-মলাই করতে হয়। আমেজে দারোগার চোখ বুজে আসে, আর দামু তখন তাঁর কানের কাছে সমানে ভ্যানর-ভ্যানর করতে থাকে : আমার হাতি কী হল? অ দারোগাবাবু, আমার হাতি?

মেজাজী ঘুমটা চটে যায়–দারোগা ভারি বিরক্ত হন বোকা লোকটার ওপর। ধমক দিয়ে বলেন : হচ্ছে–হচ্ছে, এত ব্যস্ত কেন?

কই আর হচ্ছে। এক মাস পেরিয়ে গেল যে।

হাতি কি আর চাড়ডিখানি জানোয়ার?–হাই তুলে দারোগা বলেন, পাঁঠা না গোরু যে গলায় দড়ি বেঁধে দিলুম ব্যাব্যা, হাম্বা-হাম্বা করে ডাকতে থাকল আর তুই হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে গেলি? অত বড় পেল্লায় একখানা কাণ্ড, তাকে ধরতে বিস্তর হ্যাঁপা। এখন চুপ করে থাক, সময় হলেই এনে দেব, আর তুই তখন তার পিঠে চেপে ড্যাং ড্যাং করতে করতে চলে যাবি।

বলতে বলতে দারোগা ঘুমিয়ে পড়েন আর কুড়ং কুড়ং করে তাঁর নাক ডাকতে থাকে।

আসলে, দামুকে পেয়ে দারোগাবাবুর আর তাঁর গিন্নির সুখের সীমা নেই, মাইনে-টাইনে কিছু তো দিতে হচ্ছে না–দামু মাইনে চায়ও না–বিনি পয়সায় এমন খাটবার লোক, এমন। একটি নিরেট বোকারাম আর কোথায় পাওয়া যাবে? শুধু হাত-পা-ই টেপে নাকি? কুয়ো থেকে বালতি বালতি জল তুলে দিচ্ছে, বাগান কোপাচ্ছে, আস্ত-আস্ত গাছ হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে কেটে চ্যালা কাঠ বানাচ্ছে, কাঁড়ি কাঁড়ি বাসন মেজে দিচ্ছে। তার ওপরে গোরু চরানো তো আছেই।

দারোগা আর তাঁর গিন্নি দুধ-ক্ষীর এইসব খেতে খুব ভালবাসেন–কেই বা না বাসে, বলো? আর পেট পুরে দুধ-ক্ষীর-দই খাওয়ার জন্যে দারোগা গোটা সাতেক গোরু পুষেছেন। রোজ সকালবেলা নটা নাগাদ বাড়ির কাজকর্ম সেরে দামু বেরোয় গোরু চরাতে। রাতের খানিকটা বাসী রুটি-তরকারি গিন্নি-মা পুঁটলি করে বেঁধে দেন–সারাদিন তাই গিলে বিকেল পর্যন্ত দামু নদীর ধারে গোরু চরায়, তারপর বিকেল হলে গোরুর পাল তাড়িয়ে ফিরে আসে।

গোরু চরাতে দামুর যে খুব খারাপ লাগে তা নয়। বাড়িতে থাকলেই তো গিন্নি মার হাজারো ফাইফরমাস, তার চাইতে এ এক রকম ভালো। নিজের আনন্দে চেঁচিয়ে গান। গাওয়া যায়-এমনিতে কেউ তার গান শুনতে চায় না, হয়তো কেবল প্রাণ খুলে যাত্রাগানের একটা সুর ধরেছে : ও ভাই লক্ষ্মণ রে, কোথায় গেল জনকনন্দিনী–অমনি চারদিকে সবাই হইচই করে ওঠে: থাম-থাম কান ফেটে গেল) গোরুরাও তার গানে কোনও আপত্তি করে না। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে, একটা লাল-শাদা আর একটা কালো গোরুকে নিয়ে। দারোগার গোক হলে কী হয়–সে-দুটো আইন কানুন কিছু মানে না। একবার ছাড়া পেল তো আর কথা নেই সঙ্গে সঙ্গে দে-দৌড়। লম্বা লম্বা ঠ্যাং নিয়েও দামু তাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না, একেবারে ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকে গোরু দুটো।

শুধু ছুটলেও বা কথা ছিল। এর কলাই খেতে নেমে সব মুড়িয়ে দিয়ে আসে, তার লাউয়ের মাচা টেনে নামায়, ওর বাগান ভেঙে ঢুকে কচি কচি পালং শাকগুলো একেবারে সাফ করে দেয়। গোৰু তো নয়–যেন দু-দুটো ডাকাত পুষেছেন দারোগা। তাঁর গোরু বলে লোকে আর তাদের ধরে খোঁয়াড়ে দিতে সাহস পায় না; কিন্তু দামুকে গালাগাল করে একেবারে ধুন্ধুড়ি উড়িয়ে দেয়!

কেমন বেয়াক্কেলে গো-মুখ রাখাল তুমি হে! গোরু সামলাতে পারো না।

গো-মুখ্য বলেই তো গোরু চরাই। হি-হি!–দামু হাসতে চেষ্টা করে।

আবার দাঁত বের করে হাসা হচ্ছে? বলি, আমার পালং শাকগুলো সব যে খেয়ে নিলে–তার দাম কে দেবে হে? তুমি?

আমি দেব কেন? দারোগাবাবুর গোরু, তাঁর কাছেই যাও না।

দারোগার কাছে আর কে পালংলা কলাইয়ের দাম চাইতে যাচ্ছে? জলে বাস করে কুমিরকে ঘাঁটানো–আরে ব্বাস! নিরুপায় লোকগুলো বিড়বিড় করতে করতে চলে যায়–আর দূর থেকে দামুকে গাল পাড়ে।

কেলেভূত–ঊন-পাঁজুরে–বেয়াক্কেলে।

কিন্তু সবাই তো আর নিরীহ ভালোমানুষ নয়। শেষ পর্যন্ত একদিন একজন লোক এসে ক্যাঁক করে দামুর টুটি টিপে ধরল।

কী তার চেহারা! সেই হাতি-মাকা জগাই ঘোষকেও বলে তফাত থাকো! বুনো মোষের মতো জোয়ান, মুখে দেড় হাত দাড়ি, চোখ দুটো আগুনের ভাঁটার মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। দামুর ঘাড় চেপে ধরে বললে, দে শিগগির, আমার সাত সের ঝিঙের দাম দে।

সেই বজ্র টিপুনিতে দামুর দম আটকে আসবার জো।

ছাড়ো-ছাড়ো, আমি কোথায় পয়সা পাব মিঞা সাহেব।

পয়সা নেই তো আমার ঝিঙেগুলো গোরুকে দিয়ে খাওয়ালি কী বলে?

আমি তো খাওয়াইনি–নিজেই খেয়েছে। তোমার ইচ্ছে হয় দারোগাবাবুকে—

নিকুচি করেছে দাবোগাবাবুর! তুই রাখাল–সব দোষ তোর! বলে লোকটা দামুকে ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল, চোখ কপালে চড়ে গেল দামুর।

আমি–আমি–দাবোগাবাবুকে বলে দেব।

দে বলে।–দাড়িওয়ালা লোকটা বিচ্ছিরি করে মুখ ভ্যাংচাল : তারপর আবার আসবি তো গোরু চরাতে? তখন তোর মুণ্ডটি ভেঙে নদীর বালিতে পুঁতে দেব–এই তোকে বলে গেলুম।

তারপর ঠাঁই-ঠাঁই করে কটা রাম চড়। সেই চড় খেয়ে দামু মাথা ঘুরে পড়ে গেল, যখন উঠল তখন দাড়িওয়ালা লোকটা কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে।

মনের দুঃখে দামু বসে বসে খানিকটা হাঁউমাউ করে কাঁদল। তার পিসিমার কথা মনে পড়ে গেল কতদিন দেশে যায়নি সেকথা ভেবে তার আরও কান্না পেতে লাগল। কী কুক্ষণেই যে রুনকুকে হাতি চড়াবার কথাটা বলেছিল সে।

একটু সামলে-সুমলে দেখে সামনেই সেই লাল-সাদা গোরুটা। সাত সের ঝিঙে খেয়ে এসে পরমানন্দে জাবর কাটছে এখন।

তোর জন্যেই এত কাণ্ড! দাঁড়া–মেরে পোম্বা উড়িয়ে দেব।

হাতে লাঠি ছিল না–দামু ঠেসে একটা চাঁটি বসিয়ে দিল গোরুকে। সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজ হল ফোঁসস! এক তঁতোয় গোরু দামুকে চিত করে দিয়ে ল্যাজ তুলে হন হন করে বাড়ির দিকে ছুটতে লাগল।

সেদিন বাড়ি ফিরে দামুর আর ধৈর্য থাকল না। একে চড়ের জ্বালা, তার ওপরে গোরর অঁতো–মানুষের শরীরে আর কত সয়! দামু সোজা গোঁ-গোঁ করতে করতে দারোগাবাবুর কাছে গিয়ে হাজির হল।

শিগগির হাতি দিন আমার। আমি চলে যাব।

দারোগা মুখ থেকে হুঁকো নামিয়ে বললেন, চলে যাবি মানে?

মানে, চলে যাব। আর আমি গোরু চরাতে পারব না।

পারবি না-বটে!–দারোগা মিটমিটে চোখে চেয়ে রইলেন খানিকক্ষণ : যাবার চেষ্টা করেই দ্যাখ না। তোকে আমি তখুনি ধরে চোর বলে হাজতে পুরে দেব।

চোর বলে–অ্যাাঁ?–দামু শুনে আকাশ থেকে পড়ল : কেন, আমি কী চুরি করিচি তোমার?

আমার চুরি করবি কেন? গাঁসুন্ধু লোকের ঘরে সিঁধ দিয়েছিস।

আমি।

হুঁকোয় একটা জর টান দিয়ে দারোগা বললেন, আলবাত। সিঁদেল চোর না হলে আর অমন বিটকেল চেহারা হয় কারও? তুই পটাই চোরের দলের লোক–আমি বুঝেছি।

আমি পটাই চোরের দলের?–দামু কটা খাবি খেল শুনে : বা রে, আমি তাকে ধরিয়ে দিলুম, আর শেষে আমাকেই–

হাঁ-হাঁ, তোকেই–তোকেই হাঁড়ির মতো মুখ করে দারোগা বললেন, আমি বিশ বছর ধরে পুলিশে চাকরি করছি, চোর চিনি নে? কত ঘঘাড়েল চোরকে জেলে পাঠিয়ে ঘানি ঘোরালুম আর তুই তো তুই।–দারোগা হুঁকোয় আর একটা টান দিয়ে বললেন, আমি সব জানি। চুরির বখরা নিয়ে পটাইয়ের সঙ্গে তোর ঝগড়া হয়েছিল, তাই তুই তার ঘাড়ে চড়াও হয়ে ধরিয়ে দিয়েছিস, আর দিব্যি ভালোমানুষ সেজে সরকারের কাছ থেকে বকশিশ। নিয়েছিস। আমি ইচ্ছে করে তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ফের যদি হাতি-হাতি করে চ্যাঁচাবি কিংবা এখান থেকে সটকাতে চাইবি–তা হলে তোকে তখুনি আমি হাজতে চালান করে দেব। তারপরে পাক্কা ছটি মাস জেল।

অ্যাঁ।–

দামু হাঁ করে চেয়েই রইল, আর কথা ফুটল না তার মুখ দিয়ে।

দারোগা বললেন, আর যদি জেল খাটতে না চাস, তা হলে যেমন আছিস, তেমনি থাক–বাসন-টাসন মাজ, কাঠ চ্যালা কর, গোরু চরা। তোফা আরামে থাকবি। এই তোকে সাফ কথা বলে দিলুম। এখন যা–খানিক সর্ষের তেল এনে ভালো করে আমার হাঁটুতে মালিশ করে দে। বেশ টনটন করছে–বাতই হল কি না কে জানে।

এই বলে দারোগা পরম আরামে হুঁকো টানতে লাগলেন। আর তাঁর সেই মোক্ষম কথাগুলো শুনে গোটা তিনেক খাবি খেয়ে, দামু হুঁকোর মতো মুখ করে গিন্নি-মার কাছে সর্ষের তেল আনতে চলে গেল।

মুচকি হেসে দারোগা মনে মনে বললেন, পুলিশের খপ্পরে পড়েছ বোকারাম–এত সহজেই কি আর ছাড়ান পাবে? হুঁ–হুঁ—

.

নয়

হাঁড়ির মতো মুখ করে দামু দারোগার পায়ে তেল মালিশ করতে লাগল, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন দারোগা, গুড়গুড় করে নাক ডাকতে থাকল তাঁর। তখন দামু উঠে পড়ল সেখান থেকে, তারপর দারোগার বাসা থেকে বেরিয়ে সুড়সুড় করে এসে থানার বারান্দায় বসে পড়ল।

ইস, প্যাঁচখানা দ্যাখো একবার। কী কুক্ষণেই যে সে হাতির বাচ্চা ভেবে পটাই চোরের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছিল, তারপর থেকেই এই যাচ্ছেতাই কাণ্ড! পটাই এখন কোনও জেলে আছে নিশ্চয়, অনেক ভালোই আছে তার চাইতে। সেও তো কয়েদী, দারোগাবাবুর হাত থেকে ছাড়া পাবার কোনও রাস্তাই তো দেখা যাচ্ছে না। জেলে গেলে নাকি ঘানি ঘোরাতে হয়, পটাইও নিশ্চয় ঘোরাচ্ছে, কিন্তু দামুর মনে হল তার চাইতে অনেক সুখেই আছে সে। তাকে তো আর দুটো হাড়বজ্জাত গোরু চরাতে হয় না, সেই গোরুর গুতো খেতে হয় না, কোত্থেকে একটা দাড়িওলা বিটকেলে লোক এসে তাকে ঠাঁই-ঠাঁই করে চাঁটিয়ে দেয় না! আর কাঠ চ্যালা করা–ওঃ! একদিন তো কুড়ল ফসকে তার একখানা পা-ই চ্যালা হয়ে যাচ্ছিল।

অথচ, দারোগাবাবুকে কী নিপাট ভালোমানুষটিই মনে হয়েছিল তখন! এমন মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বললেন যে দামু ভেবেছিল–গণ্ডা গণ্ডা হাতি তাঁর গোয়ালঘরে বাঁধা আছে, যখন ইচ্ছে দামুকে একটা বের করে দেবেন। দ্যাখো এখন! হাতি তো দূরে থাক, চলে যেতে চাইলে হাজতে পুরে দেবেন বলে শাসাচ্ছেন,আর বলছেন সে-ও পটাই চোরের দলের লোক।

এখন কী করবে সে? পালাবে?

কিন্তু পালিয়ে কি রেহাই মিলবে দারোগার হাত থেকে? ঠিক চৌকিদার পাঠিয়ে ধরে আনবেন, তারপর বরাতে যে কী আছে ভগবানই জানেন। তা অমন ধড়িবাজ দারোগার খপ্পরের চাইতে জেলে ঘানি ঘোরানোও ভালো। কিন্তু—কিন্তুক–হাতির কী হবে? যেমন করে তোক রুনকুকে যে হাতি চাপাতেই হবে তার। রুনকু–দা-ঠাকুর–সক্কলে যে তারই জন্যে পিত্যেশ করে বসে আছে!

দামুর ইচ্ছে হল, খানিকক্ষণ ডাক ছেড়ে গাঁ-গাঁ করে কাঁদে, পিসিমার নাম ধরেই কাঁদে। এই দারুণ বিপদে পিসিমা কাছে থাকলে যা-হোক একটা উপায় বাতলে দিতে পারত। খুব বুদ্ধি আছে পিসিমার। কিন্তু, এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে কোথায় পাওয়া যাবে পিসিমাকে?…

আরে ফাগুয়াকো রাত হো,
শ্যাম হোরি খেলে হো,
আরে লালে লাল হো,
আরে চ্যারারা-রা-রা-রা—

বিকট গানের আওয়াজে বেজায় রকমের চমক খেল দাম, থানার বারান্দা থেকে নীচে ঘাসের ওপর মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে অনেক কষ্টে সামলে গেল। খাকি শার্ট পরে, দেহাতী চামড়ার জুতো মচমচিয়ে থানার কনস্টেবল ছত্তেরি সিং আসছে। তারই মোটা গোঁফের ফাঁক দিয়ে বেরুচ্ছে এই ভয়ঙ্কর গান : আরে ফাগুয়াকো রাত হে, চ্যা-রা-রা-রা–! ফাগুয়া–মানে দোলের বেশ দেরি আছে, কিন্তু ছত্তেরি সিং এখন থেকেই মশগুল। আজ সারা সকাল বসে বসে সে তার ঢোলে নতুন করে ছাউনি দিয়েছে।

থানার বারান্দায় যে কেরোসিনের আলোটা ঝুলছিল, তাইতে দামুর প্যাঁচা-মাকা মুখোনা দেখতে পেল ছত্তেরি সিং। গান থামিয়ে গুটিগুটি এগিয়ে এল দামুর দিকে।

–এ দামু ভেইয়া, ক্যা ভইল বা?

–কী আর হবে সেপাইজী? মন-মেজাজ ভারি খারাপ।

–কেননা? মেজাজ খরাব হইলো কেনো?–ছত্তেরি সিং মুচকি হাসল : হাঁথি নেহি মিলা?

দামুর হাতির গল্পটা সকলেরই জানা। ছত্তেরি সিংও জানে।

–কোথায় হাতি?–আরও ব্যাজার হয়ে দামু বললে, খালি বলেন, হবে–হবে। আজ অ্যাদ্দিন হয়ে গেল, হাতির ল্যাজ অবধি দেখতে পেলুম না। আজ রাগ করে বলেছিলুম, চলে যাব–তাতে শাসিয়ে বলেছেন, তা হলে আমায় চোর বলে হাজতে ভরে দেবেন। ইকি ল্যাঠায় পড়লুম বল দিকিনি সেপাইজী!

ছত্তেরি সিং এবার আর হাসল না। দামুর পাশে এসে বসে যে গম্ভীরভাবে হাতের তেলোয় খইনি ডলতে লাগল। তারপর গম্ভীর হয়ে বললে, আভি হম তো সব কুছ সমঝলাম (সব কিছু বুঝে ফেলেছি)।

দামু আকুল হয়ে বললে, কী সমঝালে সেপাইজী?

–বোলো, বড়বাবুকে (মানে দারোগাকে) হামার কথা তুমি বোলবে না?

–না, বলব না।

–হামি জানে, বড়বাবু তুমাকে ছোড়বে না।

–ছাড়বে না? কেন?

–আরে মাহিনা দিতে হোবে না, কুছু না–নোকর (চাকর) বড়বাবু ছোড়বে? অ্যায়সা আদ–মি নেহি! বড়বাবু তুমাকে কভি ছোড়বে না।

বা-রে!–দামু ফাঁস করে উঠল : বিনা মাইনেয় ওঁর চাকরি করবার জন্যে বুঝি আমি দেশ-গাঁ ছেড়ে এই ধাপধাড়া গোবিন্দপুরে এসে পড়ে আছি। আমার হাতির তা হলে কী হবে?

–হাঁথি? আঁথি!–এক খাবলা খইনি মুখে পরে ছত্তেরি সিং বললে, আমি একটা সচ বাত (সত্যি কথা) বোলবে দামু দাদা–তুমি গোঁসা করবে না। তুমি বহুৎ বুন্ধু (বোকা) আছে। আরে দারোগাবাবু হাঁথি কাঁহাসে পাবে? মাজিস্টর (ম্যাজিস্ট্রেট) সাহেব ভি হাঁথি মিলাতে পারে না–উ তো রাজা-মহারাজা কা জাবর (জানোয়ার) আছে।

–তা হলে কী হবে সেপাইজী?–দামু এতক্ষণে কেঁদে ফেলল : সারা জন্ম আমায় এমনি করে দারোগাবাবুর গোরু চরাতে আর কাঠ ফাড়তে হবে নাকি?

ছত্তেরি সিং বললে, আমি বোলে কি, তুমি হিয়াসে ভাগো!

–ভাগব?

–জরুর। আভি ভাগো। আজ রাতমে ভাগো।

–যদি ধরে আনে?

–কেইসে ধরবে? আরে দাদা তুমার ডর কী আছে? তুমি তো চোরি-উরি কুছ করেনি। তুমি বুন্ধু আছে–তাই বড়বাবু ঝুটমুট উসব বাত বোলে। তুমাকে কোই ধরবে না। ভাগ যাও।

–কিন্তু হাতি কোথায় পাব?–আকুল হয়ে জানতে চাইল দামু।

–হাঁ, ওহি বাত। আবার কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে ভাবল ছত্তেরি সিং। তারপর বললে–হাঁ, এক কাম করো। তুমি আসাম মে চলা যাও।

–আসাম!–অবাক হয়ে দামু হাঁ করল : সে আবার কোথায়?

–কুছ দূর তো হবে।–ভেবে-চিন্তে ছত্তেরি সিং বলতে লাগল : রেল গাড়ি মে চড়ে যেতে হয়। উহা পর হাঁথি মিল সকতা (ওখানে হাতি পাওয়াও যেতে পারে)।

–ওখানে হাতি থাকে বুঝি?

–হাঁ, বহুৎ। জঙ্গল মে থাকে। উহাসে তো হাঁথি ধরে হামার দেশে শোনপুরের মেলা মে বেচতে লিয়ে আসে। তুমি আসাম মে যাও।

দামু একটু চুপ করে রইল। নানা অবস্থায় পড়ে এতদিন সে বুঝেছে, হাতি যোগাড় করা সোজা নয়, অনেক টাকা লাগে। বকশিশের একশো টাকা আর ট্যাঁকের কটা টাকা দিয়ে আর যাই করা যাক–হাতি কেনা যায় না।

মাথা চুলকে দামু বললে, কিন্তু আমি কি হাতি কিনতে পারব?

–আরে–তুমি কিনবে কেমন কোরে? রাজা-মহারাজা সব কোই পারে না, জিলার মাজিস্টর সাহেব ভি পারে না। যে লোগ াঁথি ধরে–উসসে পাস যাও। কাম-উম করে দাও–সাথ-সাথ রহো (কাজ-টাজ করে দাও, সঙ্গে সঙ্গে থাকো)খুশ করো, উসকে বাদ একঠো হাঁথি বখশিশ মাঙ্গ (চেয়ে) লেও।

–দেবে?

–দে সকতা (দিতেও পারে)। খুশি হোলে কেনো দিবে না?

আর বলতে হল না। দামু লাফিয়ে উঠল এবার।

–সেপাইজী, আমি আসামেই যাব।

–হাঁ যাও।-ছত্তেরি সিং ভরসা দিয়ে বললে, কুছ ডর নেহি দাদা, তুমি বহুৎ ভালা আদমি আছে–তুমার ভালা হোবে। এখানে বড়বাবু তোমাকে বুদ্ধ বানিয়েছে, তাই আমার বহুৎ দুখখো হইলো–এহি শলা (পরামর্শ) তুমাকে দিলাম। চলা যাও ভাইয়া-আজহি চলা যাও।

দামুর চোখ জলে ভরে গেল!

–সেপাইজী, খুব উগার করলে আমার। এই তোমার গা ছুঁয়ে বলছি দাদা, হাতি যদি পাই তোমাকে পেট ভরে আমি মোণ্ডা খাওয়াব।

–আচ্ছা-আচ্ছা, আগে হাঁথি মিলে, তবে তো!–ছত্তেরি সিং হাসল।

সেই রাতেই রওনা হল দামু। দারোগা আর তাঁর গিন্নি তখন অঘোরে ঘুমুচ্ছেন। ছত্তেরি সিং তাকে স্টেশনের রাস্তা বলে দিয়েছিল। মাইল পনেরো রাস্তা বাসে চেপে যেতে হয়। কিন্তু পাড়াগাঁয়ে আর অত রাতে বাস কোথায়? তা ছাড়া ছত্তেরি সিং-এর কথায় দামুর ভরসা নেইবাসে যদি কেউ তাকে চিনে ফেলে আর দাবোগাকে গিয়ে খবর দেয়? সর্বনাশ! উঁহু, বাস পেলেই চেপে বসবে, দামু এমন কাঁচা ছেলে নয়।

লম্বা লম্বা ঠ্যাংয়ের কাছে পনের মাইল কিছুই নয়-দামুর হাঁটবার অভ্যেস আছে, দেখতে-দেখতে সে পথ পেরিয়ে গেল। চতুর্দশীর জ্যোৎস্না ছিল আকাশে, কোনও অসুবিধে হল না। কেবল দু-চার বার তাকে দেখে গাঁয়ের কুকুরগুলো ঘেউঘেউ করে উঠেছিল কয়েকটা শেয়াল খ্যাঁচম্যাচ করে এদিক-ওদিক ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল, একজন চৌকিদার কে যায় গো বলে হাঁক দিয়ে দামুর সামনে এসেই–ওই বিকট মূর্তি, মস্ত পাগড়ি আর লম্বা লাঠি দেখে, ভূত ভেবে–বাবা গো বলে দৌড় দিয়েছিল। আসাম যাওয়ার উৎসাহে দামু এ সব কিছুই গায়ে মাখেনি; থানার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে মাইল পাঁচেক এসেই সে একটা করুণ গান ধরেছিল–ও রাম, কেন তুই যাবি বনবাস–আর এই গান গাইতে গাইতেই ঠিক ভোরবেলায় এসে সে রেলের ইস্টিশনে পৌঁছে গেল।

আসাম যেতেই হবে। কিন্তু তার আগে–।

তার আগেই দামুর চোখে পড়ল স্টেশনের লাল ইটের দেওয়ালে ছবিওলা একটা মস্ত পোস্টার। হাতি-ঘোড়া বাঘ-ক্লাউন–তারের ওপরে সাইকেল চালাচ্ছে মেয়েরা, ফ্লাইং ট্রাপিজ থেকে একজন শূন্যে উড়ে যাচ্ছে। আর, আর লেখা আছে–দি গ্রেট হিমালয়ান সাকাস। চমকপ্রদ হাতি আর বাঘের খেলা। রহিমপুরের মেলায় দেখানো হইতেছে। এমন সুযোগ–

দামু সামান্য যেটুকু লেখাপড়া জানত, তাতে ওটুকু সে এক রকম পড়ে ফেলল। নেচে উঠল তারপরেই।

সে কোথায় যাবে ঠিক হয়ে গেছে। আসাম নয় রহিমপুরে।

.

দশ

এই সকালবেলাতেই একজন লোক ইস্টিশনের বাইরে বসে, একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে, শিশিরে ভিজে ভিজে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে, কুড়মুড় কুড়মুড় করে মুড়ি খাচ্ছিল আর একটা পাকা লঙ্কায় একটু একটু করে কামড় দিয়ে হুস-হুঁস করে শিস টানছিল। দামু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার খাওয়া দেখল, তারপর ডাকল, ও মশাই।

লোকটি বললে, উঁ–হু–উস। আমায় কিছু বলছ?

এজ্ঞে আপনাকেই তো!

হুস–কুড়মুড় কুড়। তা কী বলবে বলে ফ্যালো।

এজ্ঞে সার্কেসটা কোন দিকে হচ্ছে?

সার্কেস? হু উ-উস!–একবার লাল লঙ্কার শেষটুকু অবধি দাঁতে কেটে নিয়ে, তার বোঁটাটা নাকের কাছে ধরে, লোকটা কিছুক্ষণ চেয়ে রইল দামুর দিকে। লঙ্কার ঝালে তার চোখে জল এসে গিয়েছিল, বাঁ-হাতে সেটা মুছে ফেলে বললে, সার্কেস হচ্ছে ওই ওদিকে রথতলার মাঠে। কিন্তু তুমি কে হে?–দামুর সেই তালট্যাঙা চেহারা, মাথায় সেই জাঁদরেল পাগড়ি আর হাতের সেই জবরদস্ত লাঠির ওপর খানিকটা চোখ বুলিয়ে নিয়ে শেষে বললে, বুঝিচি।

কী বুঝেছ হে?

তুমি নিযস সার্কেসের খেলুড়ে। চেহারাতেই মালুম হচ্ছে।

দামু আপত্তি করে বললে, না, আমি কখনও সার্কেসের খেলুড়ে নই।

বললেই হল দাদা? কুড়কুড়কুড়। সার্কেসের লোক না হলে এমন উদভুট্টে চেহারা হয়। কারুর? তোমায় রাতের বেলা রাস্তায় দেখলে আমারই যে ভিরমি লেগে যেত হে!

দামু রাগ করে বললে, মেলা বোকো না। আমার চৌদ্দ পুরুষ সার্কেসের খেলুড়ে নয়।

তাই নাকি? হু-উ-স! তবে তুমি কোথায় খেলা দেখাও দাদা? কুড়-মুড়-কুড়। রাত-বিরেতে আমগাছে জামগাছে নাকি? রাম—রাম–রাম! ভূত আমার পুত, শাঁকচুন্নি আমার ঝি, রাম-লক্ষ্মণ বুকে আছে–

ধ্যাত্তোর–কী একটা বেহেড লোকের পাল্লায় পড়লুম।–দামু গজগজ করতে লাগল : তুমি বকর বকর করো বসে আর মুড়ি গিলে ময়রা–আমি যাচ্ছি।

পিছন থেকে খ্যাঁকর-খ্যাঁকর করে হাসতে থাকল নোকটা। দামু হনহন করে চলল। রথতলার মাঠের দিকে।

চিনিয়ে দিতে হল না সাকাসের তাঁবু, তার মাথার ওপর দিয়ে দড়িতে লাল-নীল পতাকার সার অনেক দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল। তার সামনে পৌঁছে দামু খানিকক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইল। ওরেব্বাকত ছবি টাঙিয়েছে এখানে-ওখানে! সাইকেলে চেপে বাঁদর চলে যাচ্ছে–দড়ির দোলনা থেকে কারা যেন পরীর মতো আকাশে উড়ে চলেছে, হাতিরা লাল বল নিয়ে খেলা করছে, একজন আবার রাজপুত্তুরের মতো পোশাক পরে-হাতে চাবুক নিয়ে তিন-তিনটে সিঙ্গীকে শাসাচ্ছে।

কিন্তু দামু সব ছবি দেখছিল না–তার নজর শুধু হাতির দিকে। আহা–অমন একখানা হাতি যদি তিন দিনের জন্যও তাকে দেয়। শুধু যে রুনকু দিদিকে পিঠে চাপিয়ে দাদুর বাড়িতে নিয়ে যাবে তা নয়–দিদির সঙ্গে রাঙা বল নিয়ে এক-আধটু খেলাও করবে হয়তো। কী চমৎকার যে হবে তা হলে! ভাবতে গিয়ে হাততালি দিয়ে নেচে উঠতে ইচ্ছে হল দামুর।

সামনের বড় গেটটা পেরিয়ে দামু একেবারে তাঁবুর কাছে চলে এল। বাইরে একটা খাঁচার। ভেতরে চার-পাঁচটা বাঁদর লাফালাফি করছিল, কয়েকটা বাচ্চা গাঁয়ের ছেলে হাঁ করে বাঁদর দেখছিল আর বাঁদরগুলো ভেংচি কাটছিল তাদের। দামুও কিছুক্ষণ সেসব দেখল। তিনটে ঘোড়া চি-হি-হি করছিল এক জায়গায় আর শাদা পোশাক-পরা দুজন লোক বালতি করে জল দিচ্ছিল, একজন মালকোঁচা মারা গাঁট্টাগোট্টা জোয়ান থাবড়ে থাবড়ে গা পরিষ্কার করছিল তাদের।

দামু এদিক-ওদিক তাকাল। কিন্তু যে-হাতির জন্য সে এখানে এসেছে, তাদের কাউকে সে দেখতে পেল না। সাকাসের হাতিদুটোকে ছেলেপুলেরা বিরক্ত করে বলে ম্যানেজার তাঁবুর ওপাশে–ভেতর দিকে বেঁধে রেখেছিল তাদের।

যারা ঘোড়া ধোয়াচ্ছিল, এবার তাদের নজর পড়ল দামুর দিকে। বেড়ে মূর্তিটি তো! এমন জীব তত সহজে চোখে পড়ে না!

একজন জিজ্ঞেস করলে, ওই ওহে–তোমার নাম কী?

সাহস পেয়ে দামু বললে, আমি? আমার নাম দামু দাস।

সার্কাসে চাকরি করবে?

শুনে যে দামুর মনটা একবার ছটফট করে উঠল না, তা নয়। সার্কাসের চাকরি? আহা–তার মতো সুখের আর কী আছে! রোজ বিনি পয়সায় হাতি-ঘোড়া বাঘ-ভাল্লুকের। খেলা দেখা যাবে, হয়তো বা হাতিতে চড়াও যাবে কখনও কখনও। লোকে কত খাতির করবে-বলবে, সাবাস-সাকাসের খেলুড়ে। হয়তো অনেক মাইনেও দেবে কে জানে, এক কুড়ি টাকাই কি না!

কিন্তু তা হয় না। আগে রুনকু দিদির জন্যে হাতি যোগাড় করে তবে অন্য কথা। দামু গম্ভীর হয়ে বললে, না–আমি এখন চাকরি করব না।

কেন হে–আপত্তি কী?–একটা লোকের নাকের নীচে মাছির মতো একটু গোঁফ ছিল, সে মিটমিট করে হেসে বললে, আমাদের খাঁচায় শিম্পাঞ্জি নেই–অনেক দাম, তুমি থাকলে তোমাকে দিয়েই কাজ চলে যেত।

শিম্পাঞ্জি?–দামু অবাক হয়ে গেল সে কাকে বলে?

নিজেই তো তুমি শিম্পাঞ্জি হে–চেনো না? বেশ খাঁচায় থাকবে–কলাটা-মুলোটা খেতে দেব–নেচে নেচে খেলা দেখাবে–হি-হি-হি!

সব লোকগুলো একসঙ্গে হাসিতে গড়িয়ে পড়ল।

দামু বোকা হলেও বুঝতে পারল এরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে, আর শিম্পাঞ্জি নিশ্চয় কোনও জানোয়ারের নাম। বানর-টানরই হবে হয়তো বা।

দামু গজগজ করে বললে, আমি তোমাদের সঙ্গে কথা কইব না। সার্কেসের মালিকের সঙ্গে দেখা করব।

মালিক? তার সঙ্গে তোমার কী কাজ?

দরকারি কথা কইব।

দরকারি কথা?–লোকগুলো একটু অবাক হয়ে হাসি বন্ধ করল : কী কথা?

তাঁর ঠেয়ে বলব।

লোকগুলো একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। তারপর একজন এগিয়ে এসে বললে, আমাকে বলতে পারো, আমিই মালিক।

দামুর ঠিক বিশ্বাস হল না! কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইল। তারপর আস্তে-আস্তে বললে, একটা জিনিস আমি চাইতে এসেছি। এই তিন দিনের জন্যে।

কী সেটা?

একটা হাতি।

কী বললে?-লোকগুলো একসঙ্গে হাঁ করল : কী বললে তুমি?

দামু আবার গম্ভীর হয়ে জবাব দিলে : হাতি–একটা হাতি। রুনকু দিদির ওখানে নিয়ে যাব–দিদি সেটাতে চেপে দাদুর বাড়িতে–

দামুর কথাটা শেষ হতেও পেল না! লোকগুলো চারদিক ফাটিয়ে হেসে উঠল হা-হা করে। একজন বললে, পাগল, আর একজন বললে, দে ওর মাথাটা ঠাণ্ডা করে।

ঝপাৎ–ছলাৎ! একেবারে পুরো এক বালতি ঘোড়া-ধোয়ানোর ময়লা জল এসে পড়ল দামুর মুখে। সেই জলের ঘায়ে উল্টে পড়তে পড়তে সামলে নিয়ে দামু দেখল, আর-এক বালতি তুলে ধরেছে আর একজন।

গিছি গিছি–বাবা গো–বলে টেনে দৌড় দিলে দামু। যে বাচ্চাগুলো এতক্ষণ বাঁদরের ভেংচি দেখছিল, পাগলা-পাগলা বলে তারাই তাড়া করল দামুকে।

ছুটতে ছুটতে দামু চলে এল প্রায় গাঁয়ের বাইরে। তারপর সামনে একটা জংলা বাগানের ভেতরে মস্ত একটা পোড়ো বাড়ি দেখতে পেয়ে ঢুকে গেল তার ভেতরে।

না ঢুকে উপায় ছিল না। প্রায় শ তিনেক ছেলে তার পিছু নিয়েছিল আর সমানে গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচাচ্ছিল : পাগলা–হাতি-পাগলা। দামু এতক্ষণে বুঝতে পারছিল, হাতির নাম শুনলেই সেই জগাই ঘোষ অমন করে খেপে যায় কেন।

একটা ভাঙাচুরো অন্ধকার ঘরের ভেতরে, ইটের ওপর মাথা রেখে সারাদিন মনের কষ্টে চুপ করে পড়ে থাকল দামু। আজকে তার কিছুই খাওয়া হয়নিদারুণ দুঃখে সেই খিদের কথাটাও একেবারে ভুলে গেল সে। পাওয়া গেল না-হাতি পাওয়া গেল না। দাদাঠাকুরের অপমান হল, রুনকু দিদি দাদুর বাড়িতে যেতে পারল না, দামুর কথার খেলাপ হয়ে গেল। না–সে আর দেশে ফিরবে না। এইবার একদম বিবাগী হয়ে–যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই চলে যাবে।

ছত্তেরি সিং বলেছিল, আসামের জঙ্গলে হাতি ধরে, সেখানে গেলে চেয়ে-চিন্তে একটা হাতির বাচ্চা আনা যায়। কিন্তু তারাও কি দেবে। হয়তো এমনি পাগল বলেই তাড়িয়ে দেবে তাকে। দামুর গাঁয়ের কথা মনে পড়ল, পিসিমার কথা মনে পড়ল, ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে লাগল দামু।

দিনটা এইভাবে কেটে গেল, বেলা পড়ল, সন্ধ্যার অন্ধকার নামল পোড় বাড়িতে ঝিঁঝি ডাকতে লাগল, দামুর ভয় ধরে গেল।–ভাবল, এই বেলা উঠে পড়ি এখান থেকে–আঁধারে আঁধারে পালিয়ে যাই স্টেশনের দিকে। এমন সময়–

এমন সময় হঠাৎ মানুষের গলার আওয়াজ। কারা যেন চুপিচুপি কথা কইছে!

ভূত। পিলে চমকে উঠল। তারপরেই দামুর চোখে পড়ল, ঘরটার ফাটা দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে আলো আসছে। পাশের ঘরে কারা যেন কথা বলছে।

দামু চোখ এগিয়ে নিলে ফাটলের দিকে।

আর পরিষ্কার শুনতে পেল : হাঁ, ওই সার্কাসের তাঁবুতে। আজ রাত্তিরেই আগুন দিতে হবে– ব্যাটাচ্ছেলেরা কালু নস্করকে চেনে না।

আরও খাড়া হল দামুর কান, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল তার।

শুনতে শুনতে দামুর যে কেবল কান খাড়া হল তা নয়, সারা বুক ধড়ফড় করতে লাগল, হাত-পা হিমহয়ে আসবার জো হল। বলে কী লোকগুলো! সার্কেসের তাঁবুতে আগুন লাগিয়ে দেবে! ই কী সব্বোনেশে কথা গো!

কালু নস্কর বলে লোকটার কালো কালো বেঁটে চেহারা, হাত ভর্তি বড়বড় রোঁয়া, নাকের নিচে ছাঁটামতন গোঁফ আর মুখে ইয়া ইয়া দাঁত। রেগে সে দাঁত কটমট করছিল আর গোল-গোল চোখ দুটো তার বনবন করে পাক খাচ্ছিল। দেওয়ালের ফাটল দিয়ে লণ্ঠনের

আলোয় দামু তার যেটুকু দেখল–আত্মারামকে আঁতকে দেবার পক্ষে তাই যথেষ্ট।

কালু নস্কর বললে, বুঝিচিস তো হেবো?

হেবো বললে, বিলক্ষণ–বুঝিনি আবার! এক-টিন কেরোসিন ঢেলে দেব তাঁবুর গায়ে। তারপরে একটা দেশলাইয়ের কাঠির ওয়ান্তা। ব্যস–খেল খতম।

খতম বলে খতম। আর কারদানি করে সাকাস দেখাতে হচ্ছে না বাছাদের! আমি কালু নস্কর-সাতখানা গাঁয়ের ঝানু কাপ্তান–আমাকে পাশ দেবে না? বলে, বিনি-পয়সায় সাকাস দেখা যায় না রাস্তায় মাদারীর খেল দ্যাখো গে। ঠিক আছে–এবার তোদেরই আমি মাদারীর খেল দেখাচ্ছি কালু এমন করে দাঁত বের করল যে দামুর মনে হল, এখুনি সে কাউকে খ্যাঁক করে কামড়ে দেবে।

হেবো বললে, মাঝরাতে তো?

মাঝরাতে বই কি। সামনেই ওদের লোক জেগে থাকে, পিছনে বড় কেউ থাকে না–সে আমি নজর করে দেখেছি। আর থাকলেও বুঝলি তো আমরা তিনজন আছি, জাপটে ধরে কপ করে হাত-মুখ বেঁধে ফেলব।

সঙ্গে যে আর-একটা জোয়ান লোক ছিল, সে বললে, গাঁট্টা মেরে একেবারে চুপ করিয়ে ফেলব।

কালু বললে, ঠিক আছে, এই কথাই তা হলে রইল। চল–উঠে পড়ি এবার। ওদিকে আবার সব ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা করতে হবে।

হেবো লণ্ঠন নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কালু আর জোয়ান লোর্কটাও উঠল। তারপর তিনজনে যে সুট করে কোন দিকে চলে গেল, দামু তা আর ঠাহর করতে পারল না।

পোড়ো জংলা বাড়িটাকে ঘিরে তখন অথই অন্ধকার নেমেছে। দামু মশার কামড় খেতে-খেতে, প্যাঁচার ডাক শুনতে-শুনতে ভয়ে কাঠ হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। স্বপ্ন দেখলম নাকি? সার্কেসের তাঁবুতে–মাঝরাত্তিরে–এক-টিন কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেবে? পটাই চোর কোথায় লাগে এদের কাছে? এরা তো ডাকাতের ওপরেও এক কাঠি।

সব্বোনাশ–সব্বোনাশ! এখুনি তো সার্কেওলাদের খবরটা দিতে হয়।

দামু হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল খানিকটা। ঘরের বাইরে মুখ বের করে দেখল–চারদিকে শুধু অন্ধকার, এখানে-ওখানে ইটের পাঁজা, গাছপালাগুলো কালো কালো ভূতের মতো দুলছে। না–জন-মনিষ্যিরও সাড়া নেই কোথাও। কালু নস্করের দলবল সেই অন্ধকারের ভেতরে কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে।

দামু উঠে পড়ল। তারপরেই টেনে দৌড়।

আর কোথাও নয়–একেবারে সোজা সাকাসের তাঁবুর দিকে।

তখন সাকাস আরম্ভ হয়ে গেছে। একেবারে জমজমাট। শুধু এই গঞ্জই নয়, চারদিকের সব গাঁ ঝেটিয়ে লোক এসেছে সাকাস দেখতে। ভেতরে চলছে ছুটন্ত ঘোড়ার খেলা। সাকাসের মালিক নিজেই রিং-মাস্টার, ঘোড়া আর বাঘ-সিঙ্গীর খেলা সে-ই দেখায়। বেশ জবরদস্ত পোশাক পরে, গলায় মেডেলের মালা দুলিয়ে–চাবুক সাঁই সাঁই করে ঘোড়ার দৌড় করাচ্ছে। ওদিকে আবার দুজন ক্লাউন নেমেছে এসে–একজন একটা ঘোড়ার পেট ধরে ঝুলছে আর একজন ঘোড়ায় চাপতে গিয়ে ধপাস ধপাস করে আছাড় খাচ্ছে। হেসে কুটিপাটি হচ্ছে লোক, ক্ল্যাপও দিচ্ছে ঘন ঘন।

এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে দামু এসে গেটে হাজির।

আমি সার্কেসের ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করব–এক্ষুনি।

কেন–কী দরকার?

ভীষণ ব্যাপার আছে একটা। সব্বেনাশ হয়ে যাবে।

দামুর বিটকেল চেহারা আর তার ভাবভঙ্গি দেখে গেটকিপার চটে গেল।

এঃ, ভারি একটা লাটসায়েব এসেছেন সব্বোনাশ হয়ে যাবে! যাওয়াও–মেলা। ঝামেলা কোরো না। ম্যানেজার এখন খেলা দেখাচ্ছেন কিছু বলতে হয়, সকালে এসে বোলো।

না–এখুনি বলতে হবে। পথ ছেড়ে দাও শিগগির-বলে দামু গেটকিপারকে ধাক্কা মারল একটা।

আরে–আচ্ছা লোক দেখছি তো।–গেটকিপার দামুর ঘাড়টা চেপে ধরল : পাগল নাকি?

ভারি গোলমাল শুরু হল একটা।

কোন দিক থেকে সেই দুটো লোক এগিয়ে এল–সেই যারা সকালে ঘোড়া ধোয়াচ্ছিল। দামুকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল তারা।

আরে এই তো সেই পাগলা। সকালে হাতি চাইতে এসেছিল।

পাগলা-পাগলা বোলো না বলে দিচ্ছি।–দামু চেঁচিয়ে উঠল : উদিকে রাত্তিরে লোকে তাঁবুতে আগুন দিতে চাইছে, আর এরা–

হাতি ছেড়ে এবারে আগুন।–লোকগুলো হা-হা করে হেসে উঠল : মাথায় একটা-একটা খেলে ভালো। যা পাগলা–শিগগির ভাগ এখান থেকে

তোরা পাগল–তোরা ভাগ। আমি ম্যানেজারবাবুকে বলবই। নইলে রাত্তিরে যদি আগুন ধরিয়ে দেয়

হা-হা-হা-হাসতে-হাসতে গড়িয়ে পড়ল লোকগুলো।

সরো–আমায় যেতে দাও বলছি বলে দামু এবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল গেটকিপারের ওপর। আর তক্ষুনি তিন-চারটে লোক সাপটে ধরল তাকে।

এই পাগলটা তো দেখছি এখানে আর সাকাস করতে দেবে না। আবার যাঁড়ের মতো চাঁচাচ্ছে দ্যাখ না। হাত-পা মুখ বেঁধে ফ্যাল শক্ত করে।

তাই হল। দামুকে তারা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল বস্তার মতো। গোঁ-গোঁ করতে লাগল দামু। সার্কাসের জিমন্যাস্টিক করা জোয়ান লোক সব–তাদের সঙ্গে সে পারবে কী করে?

একজন বললে, চল–এটাকে ম্যানেজার সাহেবের তাঁবুতে ফেলে রেখে আসি। যা করবার তিনিই করবেন এখন।

কী আর করবেন–আচ্ছা করে ঠ্যাঙাবেন।

কিংবা থানায়-টানায় পাঠিয়ে দেবেন–যা খুশি।

বলে তারা চ্যাং-দোলা করে দামুকে তুলে নিয়ে গেল।

তাঁবুর বাইরে গোলমাল একটু হচ্ছিল বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তখন জমাট খেলা, ক্ল্যাপ আর হাসির আওয়াজ–ম্যানেজার কিছুই টের পাননি। ঘণ্টা দেড়েক বাদে, খেলা শেষ হলে, ভেতরে এসে তিনি অবাক হয়ে গেলেন–এটা কী রে? কোনও আজব জানোয়ার নাকি?

লোকেরা বললে, স্যার–ওটা পাগল।

মানে?

সকালে কদিনের জন্যে হাতি ধার চাইতে এসেছিল।

সে কী?

আর বলেন কেন স্যার, আমরা তখন তাড়িয়ে দিলুম। আবার সন্ধেবেলায় এসে ভারি হাঙ্গামা আর মারামারি বাধিয়ে দিলেবলে, আপনার সঙ্গে দেখা করবে কারা রাত্তিরে নাকি তাঁবুতে আগুন দেবে–হা-হা-হা!

ম্যানেজার দামুকে একটা খোঁচা দিলেন, দামু সাড়া দিলে না।

মুখটা খুলে দাও।

খোলা হল–তবুও দামুর সাড়া নেই।

কাল সারা রাত জেগে পথ-চলা, আজ গোটা দিন না-খাওয়া, ভয়ে-দুঃখে-ক্লান্তিতে দামু মড়ার মতো ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাকে কিছুতেই আর জাগানো গেল না।

ম্যানেজার বললেন, রাত্তিরটা থাক পড়ে। সকালে তাড়িয়ে দিস।

কিন্তু তাঁবুতে আগুন! কেমন যেন বেয়াড়া কথাটা। বলুক পাগলে, তবু মনের ভেতরটা খচখচ করতে লাগল। একটু সাবধানে থাকলে ক্ষতি কী। তাতে তো পয়সা লাগে না।

বন্দুক নিয়ে জেগেই রইলেন ম্যানেজার। পাঁচ-সাতজন লোককে রেখে দিলেন পাহারায়।

.

দামু একবার চোখ মেলল মাঝরাতে।

বাইরে দারুণ হট্টগোল তখন। দুমদাম করে গোটা দুই বন্দুকের আওয়াজ। কেরোসিনের টিনসুষ্ঠু ধরা পড়েছে কালু নস্কর আর তার সঙ্গী জোয়ান লোকটা। হেবোকে ধরা যায়নি,

অন্ধকারে ছুটে পালিয়েছে সে।

কিন্তু খিদেয়, ক্লান্তিতে দামু তখন কিছু বুঝতে পারল না, ভাবতেও পারল না। একবারের জন্যে চারদিকে তাকাল, কোথায় আছে, কীভাবে আছে, কিছু মনে করতেও পারল না। তারপরে আবার ঠিক মরণঘুমে দুই চোখ তার জড়িয়ে এল।

.

দামু চেঁচিয়ে বললে, আরে থামোথামো-ই কী করছ!

কিন্তু কে শোনে কার কথা! পুরো দশ মিনিট তাকে কাঁধে করে নাচলেন ম্যানেজার। নিজের নাচ শেষ হলে দামুকে তুলে দিলেন আর-একজন পালোয়ানের হাতে–যে মাথায়। একটা হেলমেট পরে তারের খাঁচার ভেতরে বনবনিয়ে মোেটরসাইকেল চালায়। সে দামুকে পিঠে করে গোটা তাঁবুর ভেতরে সাঁই সাঁই করে তিন পাক ঘুরে এল। তারপর সে আবার দামুকে তুলে দিলে ভীমের মতো জোয়ানটার হাতে–যে বুকের ওপর হাতি চাপায়। সে-লোকটা আবার দামুকে ধাঁই করে ছুঁড়ে দিলে! দামু-বাবা গো–গিচি গিচি করতে করতে টাঙানো একটা জালের ঝোলার মধ্যে পড়ল। একটুও লাগল না–চিত হয়ে তার ওপর শুয়ে দোল খেতে লাগল।

সার্কাসের ক্লাউনরা ডিগবাজি খেতে লাগল। আর সবাই মিলে হাততালি দিয়ে গান গাইতে লাগল : লা-লা-লা–ট্রা-লা-লা–

ঝোলার মধ্যে আঁকুপাঁকু করতে করতে দামু বললে, তোমরা ই কী করচ–অ্যাঁ?

ঝোলা থেকে নামিয়ে এনে ম্যানেজার দামুর হাত ঝাঁকাতে লাগলেন : তুমি আমার সাকাস বাঁচিয়েছ, লাখ টাকা বাঁচিয়েছ। তুমি সময়মতো খবর না দিলে আগুন লেগে সর্বনাশ হয়ে যেত একেবারে। বলো মিস্টার–কী করতে পারি তোমার জন্যে।

খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল দামু। তখনও তার মাথা ঘুরছে।

ম্যানেজার বললে, তুমি খবর না দিলে ওরা ঠিক আগুন দিয়ে পালিয়ে যেত। পারেনি শুধু তোমার জন্যে আমরা ওদের ক্যাঁক করে ধরে ফেলেছি। আমার লোকজন না বুঝে। তোমার ওপর খুব দুর্ব্যবহার করেছে, আমি সেজন্য ভারি লজ্জিত। বলো মিস্টার কী পুরস্কার তুমি চাও?

এতক্ষণে দামুর মাথায় একটু-একটু করে আক্কেল গজাতে লাগল। তা হলে এসব হচ্ছে তারই অভ্যর্থনা–তারই জন্যে আনন্দ করছে সবাই! দামু বললে, সে সব কথা পরে হবে, আগে কিছু খাওয়াও দিনি। কাল থেকে পেটে কিচ্ছুটি পড়েনি, খিদেয় চোঁ-চোঁ করছে।

ও–এই কথা?

ম্যানেজার তক্ষুনি গলা ফাটিয়ে হাঁক ছাড়ল : এই–কৌন হ্যায়! রসগোল্লা লাও-চমচম লাও–গজা লাও-মোতিচুর লাও–সিঙাড়া লাওকচুরি লাও–দহি লাও–দুহিবড়া লাও

দামু যা খেল, সে দেখবার মতো। রসগোল্লা-চমচম-গজা-সিঙাড়া-দইবড়া কিচ্ছুটি ফেলা গেল না। তার খাওয়া দেখে সাকাস সুদ্ধ লোক থ! সবাই বললে, শাবাশ খাইয়ে বলতে হয় তো একেই।

খাওয়া-দাওয়া মিটে গেলে ম্যানেজার বললে, মিস্টার–তুমি সাকাসে চাকরি করবে? শুনে দামু চটে গেল। কালকের কথা মনে পড়ে গেল তার।

তোমার সাকাসের খাঁচায় বুঝি আমায় বাঁদর সাজিয়ে বসিয়ে রাখবে?

ম্যানেজার জিভ কেটে বললে, আরে রাম রাম, কে বলেছে সেকথা! তুমি বাঁদর সাজবে কেন? মধ্যে মধ্যে মাথায় পাগড়ি বেঁধে লাঠি হাতে এসে লাফালাফি করবে, আর

দামু গোঁজ হয়ে বললে, না–আমি সাকাসে চাকরি করব না।

করবে না?–ম্যানেজার দুঃখিত হয়ে বললে, অল রাইট। তবে আর কী করা যাবে। কিন্তু বলোক পুরস্কার কত টাকা তোমার চাই?

দামু বললে, একটা টাকাও চাই নে। শুধু সাতদিনের জন্যে একটা হাতি ধার চাই আমার।

.

শুধু হাতি ধার দেননি ম্যানেজার, হাতি চালাবার লোক দিয়েছেন, আর সেই সঙ্গে দিয়েছেন হাতির খাই-খরচ। হাতির রোজকার খাওয়া তো চারটিখানি ব্যাপার নয়–সে এক এলাহি কাণ্ড! অন্তত গোটা দশেক কলাগাছ আর সের তিরিশেক চাল তার চাই। গরীব মানুষ দামু সে-সব জোটাবে কোত্থেকে।

হাতি চড়ে বীরদর্পে দামু রওনা হয়ে গেল। পিছন থেকে হাততালি দিয়ে ম্যানেজার আর তার দলবল গান গাইতে লাগল। ট্রা-লা-লা-লা-লা–

দামু চলল–মাঠ-ঘাট পেরিয়ে–গ্রাম ছাড়িয়ে। যেতে-যেতে এক জায়গায় দেখল সাইকেল থামিয়ে তার হাতির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে পথের ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সেই দারোগাবাবু। দামু তাঁকে দেখে গান গেয়ে উঠল :

এখন করবে আমার কী
আমি হাতি পেয়েছি।

দারোগা কিছুই করতে পারলেন না। কেবল ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলেন।

হাতি চলল কলাগাছ খেতে-খেতে–আরও অনেক গ্রাম-নদ-নদী-মাঠ-জঙ্গল পেরিয়ে। তারপরে এক জায়গায় একদল ছেলেমেয়ে চেঁচিয়ে উঠল–হাতি-হাতি? দামুর হাতি দেখেই তারা চ্যাঁচালো কি না কে জানে কিন্তু ঘোঁৎ করে আওয়াজ তুলে একটা বেজায় মোটা লোক তক্ষুনি তাদের পিছনে তাড়া করল।

জগাই ঘোষ!

হাতির ওপরে বসে দামু দুলে দুলে বলতে লাগল :

বনের হাতির পিঠে চড়ে–
মানুষ-হাতি দৌড়ে মরে!

জগাই শুনতে পেল না। সে হা-রে-রে-রে করে বাচ্চাদের পিছনে পিছনে ছুটতেই লাগল।

ঠিক সেই সময় কলিম শেখ এক ঝাঁকা ঢ্যাঁড়স নিয়ে বাজারে বেরুচ্ছিল। হঠাৎ সে দেখল সামনে একটা বিরাট হাতি।

কিন্তু হাতিটাকে ভালো করে দেখবার আগেই তার কানে এল : কলিম দাদা–ও কলিম দাদা!

কলিম হাঁ হয়ে দেখল, হাতির উপরে দামু বসে।

অ্যাঁ, তুমি।

আমিই তো। সেই দামু। কত খাইয়েছিলে, কত আমায় যত্ন করেছিলে–মনে আছে?

হাতি পেয়েছ তা হলে?

দেখতেই পাচ্ছ।

ভীষণ খুশি হয়ে কলিম শেখ বললে, যে লোক ভালো হয়, আল্লাহ তার ভালো করেন। তা হাতি থামাও দাদা-দুটো কলা-মুলো খাইয়ে দিই।

নিশ্চয়–নিশ্চয়। তোমার এখানেই তো হাতিকে বরণ করতে হবে আগে। তুমি ভরসা না দিলে তো আমি ডুবে যেতুম কলিম দাদা। তুমি কলা-মুলো খাওয়াবে–আর নিবারণ ময়রাকে ডাকো–সে পাঁচ টাকার জিলিপি দিয়ে যাক–ভারি চ্যাটাং চ্যাটাং তার কথা। ও মাহুত দাদা-হাতি থামাও।

.

পঞ্চানন মুখুজ্যের বেয়াই ত্রিলোচন চক্রবর্তী তাঁর কাছারি বাড়িতে বসে চমকে উঠলেন। মস্ত একটা হাতি দেউড়ি পেরিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকল।

আশ্চর্য হয়ে বেরিয়ে এলেন ত্রিলোচন।

কার হাতি? কোত্থেকে এল?

পা ভেঙে হাতি বসে পড়ল তাঁর সামনে। আর হাতির ল্যাজ বেয়ে সড়াক করে নেমে এল দামু। ত্রিলোচনের পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বললে, রুনকু দিদিকে হাতি করে দাদুর বাড়ি নে যাব দা-ঠাকুর।

ত্রিলোচন একটা খাবি খেয়ে বললেন, অ্যাঁ।

দিদি কোথায়–তাকে ডাকুন।

ত্রিলোচন আবার বললেন, অ্যাঁ।

কিন্তু দিদিকে আর ডাকতে হল না। দোতলা থেকেই সে হাতি দেখেছিল, হাতির পিঠে দামুকেও দেখেছিল। চ্যাঁচাতে-চ্যাঁচাতে, লাফাতে লাফাতে সে ছুটে বেরিয়ে এল।

আমার হাতি এসেছে–আমার হাতি এসেছে। দামুদা হাতি এনেছে–এবার আমি হাতি চেপে দাদুর বাড়ি যাব।

তারপর?

তারপর আর কী? হাতি চেপে রুনকু দাদুর বাড়ি গেল কত আনন্দ, কত খাওয়াদাওয়া হল, রামের মা রুনকুর জন্যে কত পিঠে, কত নাড়, কত মোয়া যে তৈরি করল! বেশিটাই অবিশ্যি গেল দামুর পেটে।

আর পঞ্চানন–দামুকে বুকে জড়িয়ে ধরে–কত চোখের জল ফেলে–কত যে আশীর্বাদ করলেন–সে আর কী বলব।

ওদিকে থানার সেপাই ছত্তেরি সিং! হঠাৎ একদিন দশ টাকার একটা মানি অর্ডার এসেছিল তার নামে। তাতে লেখা : হাতি পেয়েছি, মিঠাই খেয়ো। ছত্তেরি সিং ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারল না–কিন্তু মিঠাই খেল পেট ভরেই।

দামু এখন আর গাঁয়ে থাকে না–সে থাকে কলকাতায়। সে আর তার পিসি রুনকু দিদির কলকাতার বাড়িতেই রয়েছে। দামুদাদাকে ছাড়া রুনকুর এক মিনিটও চলে না–দামু তাকে এখনও হাতি পাওয়ার গল্প বলে–শুনে-শুনেও রুনকুর কাছে তা পুরনো হয় না।

দামু এখন কলকাতার লোক–অনেক চালাকচতুর হয়ে গেছে। এখন আর তার পাগড়ি নেই, সে লাঠিও না। তবু তাকে দেখলেই তোমরা চিনতে পারবে। রোজ বেলা দশটার সময়–গড়িয়াহাটার মোড়ে একটি ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েকে সে ইস্কুলে নিয়ে যায়। দু-চারদিন ওই সময়–মোড়টার কাছে দাঁড়ালেই তোমরা ওদের দেখতে পাবে। তখন ওকে জিজ্ঞেস কোরো :তোমার নাম কি দামু? ও গম্ভীর হয়ে বলবে : আমার নাম সুদামচন্দ্র মণ্ডল।

তোমার পাগড়ি কোথায় গেল?

পাগড়ি আমি আর পরিনে।–দামু আরও গম্ভীর হয়ে বলবে : গাঁয়ের লোকে পরে।

তোমার লাঠিগাছটা কোথায়?

দিদিমণিদের বাড়িতে বন্দুক আছে। লাঠি আর লাগে না।

দামু, তুমি আমাদের হাতি চড়াতে পারো?

দামু আরও গম্ভীর হয়ে বলবে : সে অনেক বেত্তান্ত। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে আমার কথা কইবার সময় নেই, দিদিমণির ইস্কুলের দেরি হয়ে যাবে।

তোমরা এই হাতির গল্পটা যদি দামুর মুখ থেকেই শুনতে চাও, তা হলে ওর রুনকু দিদিমণির সঙ্গেই ভাব করে নিয়ো।

রাঘবের জয়যাত্রা (উপন্যাস)

এক

রামগর্জনবাবু দোকানে প্রথমে সিদ্ধিদাতা গণেশকে প্রণাম করলেন। তারপর চারদিকে গঙ্গাজল ছিটিয়ে মন্ত্রট আউড়ে, নিজের ক্যাশবাক্সটির সামনে এসে ভাবুকের মতো বসে পড়লেন।

এখনও ভোর হয়নি। মফস্বল শহরের ইলেকট্রিক আলোগুলো সবে নিবতে আরম্ভ করেছে। গঙ্গার দিকটায় আকাশে ফিকে লালচে রং। কাকেরা সবে বেরুতে আরম্ভ করেছে, রামগর্জনবাবুর টিনের চালে গোটাকতক শালিক পাখি ঘুম থেকে উঠেই ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছে–ওই ওদের স্বভাব।

রামগর্জনের কর্মচারী বনোয়ারী একটা মস্ত গামলায় জিলিপির গোলা তৈরি করছে, ছটুলাল কচুরির ময়দা মাখছে। মস্ত মস্ত দুটো উনুন এখনও অল্প অল্প বেগুনে ধোঁয়া ছাড়ছে, একটু পরেই কয়লা গন-গন করে উঠবে, কচুরি আর জিলিপি ভাজা আরম্ভ হয়ে যাবে। রসগোল্লা, লেডিকেনি, চমচম আর সন্দেশ কাল রাতেই তৈরি হয়ে রয়েছে। ছটা বাজতে না বাজতেই খদ্দেরের আনাগোনা শুরু হবে। সকাল সাড়ে ছটার ট্রেনে যেসব যাত্রী নামবে তাদেরও অনেকেই স্টেশন থেকে বেরিয়ে রামগর্জনের দোকানে এসে বসবে। তারপর থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত সমানে বেচা-কেনা।

রামগর্জনবাবুর জয়গুরু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার শহরের সব চেয়ে বড় মেঠাইয়ের দোকান। তাঁর মিঠাই লোকের আরও মিঠে লাগে তাঁর মধুর ব্যবহারে। বাপের আমলের ছোট ব্যবসাটিকে নিজের চেষ্টায় তিনি এত বড় করতে পেরেছেন, চমৎকার একটি দোতলা বাড়ি করেছেন। জমিজমা কিছু হয়েছে। তিনপুরুষ আগে তাঁরা উত্তর প্রদেশ থেকে এখানে এসেছিলেন। এখন আচার-ব্যবহার চাল-চলন আর কথাবার্তায় পুরো বাঙালী হয়ে গেছেন।

বাইরে থেকে দেখলে রামগর্জনের মতো সুখী আর কেউ নেই। নামে গর্জন থাকলে কী হয়–নেহাত গোবেচারি ভালো মানুষ তিনি। সবাই তাঁকে পছন্দ করে তাঁর মিঠাইকেও। এমন কি তাঁর চমচমে কামড় বসিয়ে কেউ যদি জিভের ওপর ডেয়ো পিঁপড়ের কামড় খায়, সেও তাঁর ওপর রাগ করে না। অথচ–

অথচ রামগর্জনবাবুর মনে সুখ নেই। একবিন্দুও নয়। তার কারণ তাঁর ছেলে রঘু। যার ভালো নাম রাঘবলাল রামগর্জন যাকে বলেন রাঘববোয়াল। একমাত্র ছেলে–একমাত্র সন্তান। তাকে নিয়েই তাঁর যত অশান্তি।

ছেলেটার চাল-চলন যে নেহাত খারাপ, তা নয়। বরং নিতান্তই গোবেচারা। এত বেশি গোবেচারা যে ক্লাসে পড়া জিজ্ঞেস করলে পর্যন্ত মুখ নিচু করে বসে থাকে।

এক-আধজন মাস্টার আছেন–তাঁরা কিছুতেই হাল ছাড়বার বান্দা নন। তাঁদেরই একজন হচ্ছেন গোপেশবাবু। তিনি রঘুর নীরবতা ভাঙবার পণ করে বসলেন। বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, এই রোঘো শিগগির বল বাংলাদেশের মুখ্যমন্ত্রীর নাম কী?

এমন বিপদেও মানুষ পড়ে।

রঘু এর আগে একমনে একটা গুবরে পোকা লক্ষ করছিল। সেটা মিনিট কয়েক পরে মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছে। প্রাণপণে হাত-পা ছুঁড়ছে আর গুরতর করে আওয়াজ ছাড়ছে। কতক্ষণে ওটা উবুর হতে পারবে এবং তারপর জানালা দিয়ে বোঁ করে বেরিয়ে যাবে রাঘবের সমস্ত মনোযোগটা সেদিকেই ছিল। এমন সময়ে বাংলা দেশের মুখ্যমন্ত্রী আচমকা তার ঘাড়ের ওপরে পড়ে সব গোলমাল করে দিলে।

এর মধ্যে গোপেশবাবু অক্লান্তভাবে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছেন এবং স্থির লক্ষ্যে এগোচ্ছেন লাস্ট বেঞ্চের দিকে। এবং তাঁর হাতে যে-ছড়িটি আছে, তারও হাবভাব অত্যন্ত সন্দেহজনক।

অগত্যা রঘুকে উঠে দাঁড়াতে হল।

শিগগির বল, বাংলাদেশের মুখ্যমন্ত্রীর নাম কী? গুবরে পোকার আশা ছেড়ে দিয়ে রঘু ফস করে বলে ফেলল : রাঘবলাল সিং।

ক্লাসে হাসির বোমা ফাটল, কিন্তু গোপেশবাবু হাসতে পারলেন না; তাঁর মুখের চেহারা দেখে একবার সন্দেহ হল, এক্ষুনি বুঝি কেঁদে ফেলবেন; কিন্তু তাও করলেন না, যেখানে ছিলেন সেইখানেই জমে রইলেন কিছুক্ষণ, হাত থেকে বেতটা পাশের ছেলেটার নাকের ওপর খটাস করে খসে পড়ল। সে কাঁউকাঁউ করে উঠতে গোপেশবাবু তাকে দুটো থাবড়া মেরে বসিয়ে দিলেন, তারপর করজোড়ে রঘুকে বললেন, আপনি যে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সে তো জানতুম না স্যার! না জেনে কত বেয়াদবি করে ফেলেছি। নিজগুণে মার্জনা করবেন! সেই থেকে রঘু বাংলাদেশের মুখ্যমন্ত্রী।

আর মুখ্যমন্ত্রীকে পেলে কেউ কি ছাড়তে চায়, স্কুলও তাকে ছাড়েনি। পরপর দুবছর ক্লাস এইটেই রেখে দিয়েছে। ক্লাস টেন-এর ছেলেরা একবার টেবিলের ওপর তাকে বসিয়ে তার গলায় এক ছড়া মালা পরিয়েছিল, মানপত্রও দিয়েছিল একখানা। মানপত্রে একটা কাঁচকলা আঁকা ছিল আর মালার ভেতরে ছিল গোটা কয়েক বিছুটির পাতা–সেটা অবশ্য রঘু টের পেয়েছিল একটু পরেই।

তা, এসবের জন্য রামগর্জনবাবুর মন খারাপ হয় না। ছেলেটা একটু সাদাসিধে, পড়াশোনাতে মাথা নেই কিন্তু তাতে আসে যায় না কিছু। তাঁর মস্ত কারবার, বিশ্বাসী কর্মচারীও আছে–দুদিন সকালে বসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, আস্তে আস্তে চালাক-চতুর হয়ে উঠবে। গোলমালটা সেখানে নয়। চলতি কথায় আছে, ময়রা সন্দেশ খায় না। ময়রা হয়তো খায় না, কিন্তু তাঁর ছেলে খায় কি না, প্রবাদে একথা বলা হয়নি। রঘু সন্দেশ খেয়ে থাকে। এবং প্রচুর পরিমাণে।

রামগর্জন কৃপণ নয়। মিঠাই মণ্ডা-দই ক্ষীর রঘু যথেষ্ট খেতে পায়। কিন্তু তার কিছুতেই তৃপ্তি নেই। এক সের রসগোল্লা খেয়ে সে আর-এক সের খাবার জন্যে তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত। একেই বলে আসলে গোল্লায় যাওয়া; শিবরাম চক্রবর্তীর গল্প না পড়েও রামগর্জনবাবু সে কথা বুঝতে পারেন। কিন্তু একথাই বুঝতে পারেন না যে, অতটুকু পেটে অত খাবার সে রাখে কোথায়!

আরে–দোকানের খাবার যদি সব তুই-ই খাবি তা হলে ব্যবসা করবি কী করে? সব যদি তোরই পেটে যায়–খদ্দেররা কি কেবল শালপাতার ঠোঙা নিয়ে তোকে পয়সা দিয়ে যাবে? একটু রয়ে-সয়ে খা না বাপু! জীবনভোরই তো খেতে পাবি তা হলে! এসব কথা রঘুকে বুঝিয়েছেন তিনি অনেকবার। রঘুও বুঝেছে মাথা নেড়েছে সঙ্গে সঙ্গেই। ভাব দেখে মনে হয়েছে যে এরপর থেকে সে প্রত্যেকদিনই একাদশী করতে থাকবে। তারপরেই হয়তো রামগর্জন কোনও কাজে একটু উঠে গেছেন, আর তাঁর দোকানের কর্মচারীরা একটু অন্যমনস্ক হয়েছে, সেই ফাঁকে বিশেষ কিছু করেনি রঘু-ডজনখানেক চমচম কিংবা গোটা ষোলো পান্তুয়া দেখতে-দেখতে সাবাড় করে বসেছে।

একমাত্র ছেলের গায়ে হাত তুলতে মায়া হয় রামগর্জনের। তবু কান শক্ত করে ধরে কড়া মোচড় লাগিয়েছেন একটা।

–এতক্ষণ ধরে কী বোঝালুম–অ্যাঁ! গড্ডর কাঁহাকা–হতচ্ছাড়া পেটুকদাস।

–কী করব বড্ডে খিদে পেয়েছিল যে!

–খিদে! তোর হয়েছে সেই গাঁয়ের গোবকের দশা!বাপের মুখ থেকে শোনা একটা হিন্দী বচন আওড়ান রামগর্জন যে খায়–ও লালায়! বলি পেটে কী আছে? জালা না সিন্দুক?

রঘু জবাব দেয় না, ক্লাসে পড়া জিজ্ঞেস করলে যেমন, তেমনি পরমহংস হয়েই বসে থাকে।

–এরপরে তুই আমাকে খাবি, বুঝেছিস? তুই তো রাঘব নোস–রাঘব বোয়াল! আমাকে খেয়েই তোর লালচ শান্ত হবে।

রঘু একবার বাপের দিকে তাকিয়ে দেখে। খুব সম্ভব ভাবে, তার বাবা যদি একটা প্রকাণ্ড পান্তুয়া হত, তা হলে এ-অনুরোধ করবার একেবারেই দরকার হত না। অনেক আগেই সে–

রামগর্জনবাবু কপাল থাবড়ে বললেন, বরাত, বরাত! নইলে এমন পেটুক এসেও মিঠাইওলার ঘরে জন্মায়!

আজও রামগর্জন দোকানে বসে নিজের দুঃখের কথাই চিন্তা করছিলেন। ছেলেটার এই খাই-খাই রোগ কী করে বন্ধ করা যায়? আর চুরি করে খাওয়া? ছানার সঙ্গে খানিকটা বাঘা ওল মিশিয়ে সন্দেশ খাইয়ে দেখবেন নাকি? উহুঁ, ওতে সুবিধে হবে না। যে রাক্ষস বাঘা ওল-টোল সব হয়তো অম্লান মুখে হজম করে বসবে। আর তা না হলে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হবে এবং তাঁকেই ছুটতে হবে।

.

একটু একটু করে সকাল হল। রাশি রাশি গরম গরম জিলিপি পড়ল রসের ভিতর, জমল কচুরি আর নিমকির ভূপ। বোঁদে চড়ল। দোকানে খদ্দেরের ভিড় শুরু হয়ে গেল।

মনটা শান্ত করে রামগর্জন পয়সা গুনতে আরম্ভ করলেন। আপাতত ছেলের চিন্তাটা ধামাচাপা পড়ল।

এমন সময় ভঁক ভঁক করে একখানা মোটর গাড়ি এসে থামল তাঁর দোকানের সামনে। নেমে এলেন মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান গৌরহরিবাবু। গায়ে গরদের পাঞ্জাবি–গলায় সিল্কের চাঁদর। একখানা ঝানদার লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে দোকানে এসে ঢুকলেন।

রামগর্জন দাঁড়িয়ে উঠলেন : আসুন স্যার আসুন! বসুন।

গৌরহরি বললেন, বসবার সময় নেই। আমার মেয়ে-জামাই এসেছে সাড়ে ছটার ট্রেনে, গাড়িতে বসে আছে তারা। তোমাকে যে আড়াই সের স্পেশ্যাল ছানার জিলিপি তৈরি করতে বলেছিলুম, সেটা–

–হ্যাঁ স্যার কাল রাতেই রেডি করে রেখেছি। দিচ্ছি এখুনি।

স্পেশ্যাল অর্ডারের আলমারিটা খুললেন রামগর্জন!

এর চাবি তাঁর ঘুনসিতেই থাকে।

কিন্তু খুলে যা দেখলেন–তাতে তাঁরই চোখ ছানাবড়া নয়, একেবারে ছানার জিলিপি হয়ে গেল।

অত বড় হাঁড়িটা প্রায় সাফ। তলায় খানতিনেক পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষের মতো!

–কী হল হে?

তিনটে খাবি খেয়ে রামগর্জন বললেন, আপনি যান স্যার একটু পরেই আমি তোক দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

গৌরহরি চলে গেলেন। আর সেইখানে কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন রামগর্জন। ব্যাপারটা চক্ষের নিমেষে বুঝতে পেরেছেন। কাল রাত্রে যখন ঘুমিয়েছেন, তখন তাঁর কোমর থেকে চাবি খুলে এনে বন্ধ দোকানের ভেতরে বসে নিঃশব্দে ওগুলো সাবাড় করেছে রঘু। রাতের বেলা ছানার জিলিপির পাশে সে অনেকক্ষণ ধরেই ঘুরঘুর করছিল বটে।

অনেক হয়েছে–আর নয়। আর ছেলেকে প্রশ্রয় দেওয়া চলে না। এইবার একটা এসপার-ওসপার হয়ে যাবে।

দোকানের পেছনেই বাড়ি। একলাফে বাড়িতে গিয়ে ঢুকলেন। কুড়িয়ে নিলেন একটা বাঁশের লাঠি। এতদিন পরে সত্যিকারের রামগর্জন ছাড়লেন একখানা।

–কোথায় রঘুয়া? কোথায় সেই রাক্ষস–সে রাঘববোয়াল? আমি আজ ওকে খুন করব–জরুর উসকো জান লে লেগা!

রামগর্জনের স্ত্রী ছুটে এলেন। ক্যা হুয়া, ক্যা হুয়া?

–হুয়া আমার মাথামুণ্ডু! আজ তোমার ছেলের ভুড়ি ফাঁসিয়ে না দিই তো আমি রামগর্জন সিং-ই না। কোথায় সেই বদমাস–বেল্লিক পেটুকদাস।

গৌরহরিবাবুর মোটর দোকানের সামনে থামতে দেখেই দু-একটা কিল-থাপ্পড়ের জন্য তৈরি হচ্ছিল রাঘবলাল। কিন্তু বাপের এই রুদ্রমূর্তি সে কল্পনাও করেনি। অতএব বাপের লাঠি ঘাড়ে পড়বার আগেই যঃ পলায়তে সঃ জীবতি! তড়াক করে সে বড় রাস্তায় লাফিয়ে পড়ল, তারপর টেনে দৌড়।

–কাঁহা ভাগবি? আজ তোমার মুণ্ডু ছাতু করে তবে আমি বলে রামগর্জন ছেলেকে তাড়া করলেন। প্রায় ধরেই ফেলেছেন এবং লাঠির একটা ঘা বসিয়ে দিতে যাচ্ছেন ছেলের পিঠে–এমন সময় কোত্থেকে দুটো ষাঁড় গুঁতোগুতি করতে করতে দুজনের মাঝখানে এসে পড়ল। রামগর্জন থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, আর

আর এক জোড়া যুযুৎসু ষাঁড়ের ভেতর দিয়ে অসহায় ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, রঘুর মাথার টিকিটি বাতাসে নাচতে নাচতে অনেক দূরে মিলিয়ে গেল–মিলিয়ে গেল তাঁর লাঠির আওতার বাইরে–অনেক দূরে।

.

দুই

ইস্ কয়েকটা ছানার জিলিপির লোভে শেষ পর্যন্ত কী ল্যাঠাতেই পড়া গেল। বাবা যে এমন খেপে যাবে সেকথা কি স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল রঘু!

চিরকালই সে আদুরে ছেলে। চড়-চাপড় কখনও সখনও দুটো-চারটে না খেয়েছে তা নয়, মিঠাই খেয়েছে অনেক বেশি। ছানার জিলিপি খাওয়ার সময় জানত দু-এক ঘা পিঠে পড়বেই, আর পিঠে এক-আধটু না সইলে পেটের তোয়াজই বা করা যায় কী করে?

কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাঠি! আর ওই রকম গাঁটেগাঁটে পাকানো রাম-লাঠি! ওর এক-এক ঘা জুত-মতো পড়লেই আর দেখতে হবে না, রঘু স্রেফ ছাতুনা না, হালুয়া হয়ে যাবে! হালুয়া খেতে ভালোই কিন্তু হালুয়া হওয়া যে মোটেই ভালো নয়, এটুকু বোঝবার মতো বুদ্ধি রঘুর আছে।

না হয় খেয়েইছে ডজন-দুই ছানার জিলিপি। পরের তোতা নয়, বাপের দোকানেরই তো জিনিস। তারই জন্যে এত লাঞ্ছনা? বাপ রামগর্জনের এমনি রামগর্জন? আর এই পিলে-চমকানো পেল্লায় কোঁতকা নিয়ে তাড়া করা? তার গোলগাল ভালোমানুষ চেহারার বাপের প্রাণ যে এমন পাষাণের মতো কঠিন–সে কথা কে কবে চিন্তা করেছিল!

কিন্তু আপাতত রঘুকেই চিন্তা করতে হচ্ছে। আর সেটা চলছে স্টেশনের সাইডিঙে একটা মালগাড়ির তলায় ঘাপটি মেরে বসে। বাপের কাছ থেকে পালিয়ে যাবার জন্য আপাতত এ-ছাড়া ভালো জায়গা আর সে খুঁজে পায়নি।

সেই পালিয়ে এসেছে সকালবেলা, এখন রোদ হেলে পড়েছে পশ্চিমের দিকে। এর মধ্যে। বার-পাঁচেক খাওয়া হয়ে যায়, কিন্তু রঘুর মুখে এক ফোঁটা জল পড়েনি। একে পেটুক মানুষ, তায় দারুণ খিদে পেয়েছে–পেটের নাড়িগুলো ত্রাহি ত্রাহি করে ডাক ছাড়ছে। কিন্তু রঘুর বেরুবার সাহস নেই। স্টেশনের সবাই তাকে চেনে, এতক্ষণে তার খোঁজও পড়েছে নিশ্চয়। বেরুলেই কেউ না কেউ ক্যাঁক করে গলাটা পাকড়ে বাপের কাছে নিয়ে যাবে তাকে। আর তারপর–তারপর–সেই লাঠি! রামলাঠি!

না, রঘু যাবে না। তারও মনে দারুণ ধিক্কার এসে গেছে। ছি-ছি, কয়েকটা ছানার জিলিপির জন্যে কেন এত লাঞ্ছনা! ভাই নেই, বোন নেই–একমাত্র ছেলে সে, তার সঙ্গে এমন নৃশংস ব্যবহার! বেশ, সেও আর বাড়ি ফিরবে না। কলকাতায় চলে যাবে, সেখানে রোজগার করবে, তারপর সেও একটা মিঠাইয়ের দোকান দেবে। যত ইচ্ছে খাবে, যা খুশি বিক্রি করবে। তখন হায় হায় করতে থাকবেন রামগর্জন, বুঝবেন রাঘবলালও নেহাত তুচ্ছ করবার ছেলে নয়।

রঘু সেই মালগাড়ির তলায় বসে সারা দুপুর এইসব কঠিন প্রতিজ্ঞা করছিল আর দেখছিল একটু দূরে পাথরের ভেতর থেকে ড্যাবডেবে চোখ মেলে একটা কটকটে ব্যাঙ তারই দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েকটা ঢিল মেরে ব্যাঙটাকে তাড়িয়ে দিয়ে রঘুর মনটা শান্ত হল। তারপর গাড়ির তলায় ঠাণ্ডা ছায়ায় বেশ লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। এলোমেলো ভাবনায় দুপুর গড়িয়ে গেল, সামনে দিয়ে কুলি আর পয়েন্টসম্যানরা আসা-যাওয়া করল, ঝমঝম করে অনেকগুলি ট্রেন এল আর গেল! তারপরেই দেখা দিল প্রচণ্ড খিদে।

কলকাতায় যাওয়ার প্রতিজ্ঞা বুঝি আর টেকে না; মা-র কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে। ধোঁয়ানো গরম ভাতের ওপর খাঁটি ঘিয়ের গন্ধ, ঘন অড়হড়ের ডাল, ভাজা-ভুজি, আলুর দম, চাটনি, ক্ষীরের বাটি–তার সঙ্গে চারটি টাটকা মিষ্টি। বুকের ভেতর আঁকুপাঁকু করে, পেটটা চোঁ চোঁ করতে থাকে। রঘু ভাবে, বাবার রাগ নিশ্চয় এতক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, মা বসে বসে। তার জন্যে চোখের জল ফেলছেন। বেরুবে? দেখবে নাকি একটুখানি এগিয়ে?

কিন্তু–বাবার হাতের সেই লাঠি! সেই বাঘা হুঙ্কার! সে-যাত্ৰা নয় ষাঁড়ের লড়াইয়ের জন্যে প্রাণ বেঁচেছে, কিন্তু এবার যদি বাবা টিকিটা একবার চেপে ধরতে পারে–

ভাবতেই প্রাণ শুকিয়ে এল।

এদিকে কী খিদেই যে পেয়েছে। সেই কটকটে ব্যাঙটাকে ধরতে পারলেও চিবিয়ে খায় এমন মনের অবস্থা! আর তো সহ্য করা যায় না!

বাইরে রোদ লাল হয়ে এসেছে–রঘুর চোখের সামনে সার বাঁধা রেললাইনের ওপর দিয়ে লম্বা লম্বা ছায়া নামছে। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। তারপর রাত আটটার সময় কলকাতা যাওয়ার গাড়িটা এলে টুক করে বেরিয়ে রঘু চেপে বসবে তাতে। কিংবা রঘু ভাবতে লাগল, সেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে গুটিগুটি পায়ে বাড়ির দিকেও এগোনো যেতে পারে। খিড়কির দরজা দিয়ে যদি একবার ভেতরে ঢোকা যায়, একবার যদি মার আঁচলের তলায় আশ্রয় নেওয়া যা,–তা হলে—

কিন্তু তারও তো দেরি আছে। এতক্ষণ থাকা যায় কী করে? রঘু কি এই মারাত্মক খিদেতেই মারা পড়বে নাকি শেষপর্যন্ত।

যা হওয়ার হোক–বাড়ির দিকেই যাই–এমনি একটা প্রায় ঠিক করে ফেলেছিল রঘু। ঠিক সেই সময়

যে-মালগাড়ির তলায় সে শুয়েছিল, তার থেকে হাত চারেক দূরে দুটো লম্বা কালো পা দেখা গেল। একবারের জন্যে রঘুর বুক ধড়ফড় করে উঠল। বাবা নাকি? খোঁজ পেয়ে ধরতে এসেছে তাকে? পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে সটকান দিতে যাবে, এমন সময় পায়ের মালিক ঝুপ করে সেখানে বসে পড়ল। আর বেশ দরাজ গলায় গান ধরলে :

আরে ভজো ভেইয়া কৌশল্যানন্দনকো
ভজো সিয়া রামকো—

না–বাবা নয়। লোকটাকে রঘু চেনে। এই স্টেশনেরই বুড়ো কুলি চম্পতিয়া।

চম্পতিয়া তাকে দেখতে পায়নি বলেই মনে হল। মালগাড়ির তলায় কালো ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থেকে লক্ষ করতে লাগল রাঘবলাল। তার আরও মনে পড়ল চম্পতিয়া ডান চোখে দেখতে পায় না। দিনের আলোতেই হাত চার-পাঁচের বেশি তার নজরে আসে না। সুতরাং রঘুকে সে যে দেখতে পাবে এমন সম্ভাবনা বিশেষ নেই।

আরে ভজো ভেইয়া রাবণসুদন,
ভজো রঘু রাইকো—

রঘু রাইকে ভজন না-হয় করুক, কিন্তু এখানে বসে বসে কী করছে চম্পতিয়া? এতক্ষণে সব দেখতে পেল রঘু। তাকেই ভজন করুক আর শ্রীরামচন্দ্রজীকেই করুক, সামনে যা করছে তা ভোজনের আয়োজন। একটা পেতলের থালায় ছাতু ঢেলেছে লোটা থেকে জল দিয়ে পাকাচ্ছে মস্ত এক গোলা। কাঁচা লঙ্কা আছে, লবণ আছে, দুটো বড় বড় কলাও রেখেছে। পাশে।

ছাতু অবশ্য রাঘবলালকে বিশেষ খেতে হয় না, কিন্তু চম্পতিয়ার খাওয়ার ব্যবস্থা দেখে তার জিভে জল এসে গেল! ইস্! ও-থেকে একটুখানি ছাতু যদি সে পেত। পেটের ভেতরে আগুন জ্বলছে, আর মাত্র হাত কয়েক দূরেই এমন জবরদস্ত খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। কাঁচা লঙ্কা আর ছোলার ছাতুর গন্ধও এত মিষ্টি লাগে!

একটা দমকা হাওয়া এল সেই সময়। বোধহয় ভগবানই পাঠালেন।

–আরে হাঁ-হাঁ-হাঁ—

চম্পতিয়া চেপে ধরবার আগেই তার কাঁধের গামছাটা হাত-দশেক উড়ে গেল। আর চম্পতিয়া ছুটল সেই পলাতক গামছার সন্ধানে। নাউ অর নেভার–ক্লাস এইটে তিন বছর আটকে থাকা রঘুর এই ইংরেজী বচনটা জানা। সঙ্গে সঙ্গেই সে এগিয়ে গেল থালাটার দিকে, মালগাড়ির তলা থেকে হাত বাড়াল তারপর সেই আধসের ছাতুর তাল পেতলের থালাটা থেকে অদৃশ্য হল। বিলীন হল চোখের পলকেই।

গামছা কুড়িয়ে নিয়ে ফিরে এসেই মুখ হাঁ হল চম্পতিয়ার।

–আরে ই ক্যা হো? ছাতুয়া কিধর গৈল বানু? কুত্তা লে গৈল ক্যা?

কিন্তু কাছাকাছি কোনও কুকুরের চিহ্ন পাওয়া গেল না। আর চোখের দৃষ্টি কম বলেই চস্পতিয়া দেখতে পেল না, রাঘবলাল ততক্ষণে সেই ছাতুর তাল নিয়ে পেছনের একটা মালগাড়িতে গিয়ে উঠেছে।

–রাম রাম! ইয়ে তো জিন মালুম হোতা। ব্যস—চম্পতিয়া আর দাঁড়াল না, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগাল স্টেশনের দিকে।

আর তখন আধখোলা বিচালিতে অর্ধেক-বোঝাই একটা মালগাড়িতে চেপে বসেছে রাঘবলাল। আর বিচালির মধ্যে লুকিয়ে বেশ নিশ্চিন্তে ছাতুর তালটা সে সাবাড় করছে।

যাক–এতক্ষণে পেটটা একটু ঠাণ্ডা হল।

পেট কেবল ঠাণ্ডাই হল না, পাথরের মতো ভারি হয়ে উঠল। রঘু আর বসতে পারল না–বিচালির মধ্যেই দিব্যি আরাম করে শুয়ে পড়ল। আস্তে-আস্তে ঘুমে জড়িয়ে এল চোখ।

আবার যখন ঘুম ভাঙল–

মনে হল, স্বপ্ন দেখছে। হু-হুঁ করে হাওয়া লাগছে গায়ে, কালো অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটা ছুটন্ত ট্রেনের ভোলা গাড়িতে সে কাত হয়ে শুয়ে আছে। দু-পাশে ছিটকে ছিটকে যাচ্ছে অন্ধকার বন জঙ্গল, মাথার ওপর রাশি রাশি তারার দিকে ইঞ্জিনটা মুঠো মুঠো আগুনের ফুলকি ছুঁড়ে দিচ্ছে, ঝড়াং ঝড়াং করে বিকট আওয়াজ উঠছে ট্রেনের লোহা-লক্কড়ে আর–

আর কে যেন একটা কড়কড়ে লম্বা জিভ দিয়ে এক মনে তার পিঠটা চেটে চলেছে।

.

তিন

আতঙ্কে হাউ-মাউ করে উঠল রাঘব। কালো অন্ধকারে ছিটকে চলেছে বন-জঙ্গল, হাওয়ায় উড়ছে অসংখ্য আগুনের ফুলকি, শব্দ হচ্ছে ঝড়াং ঝং ঝনাৎ ঝনাৎ। এ যেন ট্রেনের আওয়াজ! রঘু কি তবে রেলগাড়িতে বসে আছে নাকি? আর বসে আছে একটা খোলা কামরায়–বাতাস তাকে যখন খুশি উড়িয়ে নিতে পারে?

এ কী সর্বনাশ! রাঘব কি স্বপ্ন দেখছে নাকি?

কোথায় তাদের বাড়ি–দোতলার ঘরের নরম বিছানাটি। মা যে পরিপাটি করে মশারি খুঁজে দেন, কোনও কোনও দিন মাথায় হাত দিয়ে ঘুম পাড়ান, গরম লাগলে পাখার বাতাস করেন। তার বদলে এ কী কাণ্ড! জিন-পরীর খেল নাকি? তখন সব মনে পড়ল। সেই কালান্তক ছানার জিলিপি, রামগর্জনের হাতের সেই রামলাঠি, মালগাড়ির তলায় লুকিয়ে থাকা, চম্পতিয়ার ছাতুর তাল লোপাট করা। আর তারপর–ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেই ফাঁকে মালগাড়িটা টেনে নিয়ে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। কোথায় যাচ্ছে কে জানে? কাশী–কনৌজ—এলাহাবাদ–কলকাতা যেখানে খুশি চলে যেতে পারে এ-গাড়ি। তখন কী করবে রাঘব? বাবা নেই, মা নেই, বাবার দোকানের মেঠাই নেই–একেবারে যে বেঘোরে মারা যাবে রাঘবলাল!

আমায় মাপ করো বাবা, আর কোনওদিন আমি চুরি করে খাব না রঘু ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল। আর ঠিক তখন তার কানের কাছে ভোঁস ভোঁস করে কে যেন গরম গরম নিঃশ্বাস ফেলল–আর লম্বা একটা খরখরে জিভ দিয়ে চকাত চকাত করে ঘাড়ের উপর চেটে দিলে।

–ওরে বাবা। পেত্নীতে চেটে চেটে রক্ত খাচ্ছে নাকি? রাঘবলাল চেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল আর সেই সময় ট্রেন ঝড়াং ঝাং করে একটা বাঁক নিতেই আবার উল্টে পড়ল সেই গাদা করা খড়ের ভেতর।

আর পড়েই দেখতে পেলে—

পেত্নী নয়–আট-দশটা গোরু। এতক্ষণে রাঘবলাল বুঝল, নেহাত একটা গোরুর মতোই সে গোরুদের গাড়িতে উঠে পডেছে–এই বিচালিগুলো তাদেরই খাদ্য। আর বিচালির মধ্যে রাঘবলাল আবিষ্কার করে অপত্য স্নেহে তারা তার গা চেটে দিচ্ছে।

হায় ভগবান, এ কী ল্যাঠা!

রাঘবলাল একটু সরে বসল। বেশি দূর সরতে ভরসা হয় না–তা হলে সোজা গাড়ি থেকে একেবারে চাকার তলায়। তার ওপর যা হাওয়া! আশ্বিনের রাত–দস্তুরমতো শীত করছে তার। গায়ে একটা গেঞ্জি ছাড়া কিছুই নেই। রাঘব কোঁচার খুট জড়িয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে রইল বিচালির ভেতর।

কিন্তু পৃথিবীর সব জিনিসকে ঠেকানো যায়–একমাত্র গোরুকে ছাড়া। গোরা যে কী ভয়ানক দুরন্ত আর দুর্ধর্ষ হতে পারে, রাঘব তা আগেও অনেকবার দেখেছে। একবার বাজারে ঢুকে পড়েছে তো এক খাবলায় এক ঝুড়ি লাউডগা মুখে তুলে নেবে, দোকানে গলা বাড়িয়ে চালে ডালে যাতে যাতেই মুখ দিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে সের-তিনেক সাফ! যতই লাঠিপেটা করো, চোখ বুজে ঠায় চিবুতে থাকবে–যেন বিয়েবাড়ির ভোজ পেয়ে পরম আরামে নেমন্তন্ন খাচ্ছে। আর যখন শিং নেড়ে তাড়া করে আসে তখন তো কথাই নেই কাউকে না কাউকে গুঁতিয়ে তবে তার গোঁ থামবে। এই গোঁয়ের জন্যেই বোধহয় গোরুকে গো বলা হয়ে থাকে।

সুতরাং রাঘবও পালাতে পারল না।

একটা বড় বড় শিংওলা গোরু সমানে তার কান চাটতে লাগল। রাঘব দু-একবার ভাঙা গলায় বললে, হেই-হেই। জোরে বলতে সাহস হল না, পাছে এক গুতোয় তাকে সোজা গাড়ির তলায় ফেলে দেয়।

অবশ্য তাকে তোবার রাইট গোরুদের আছে–ষোলো আনাই আছে। কারণ মানুষের রিজার্ভ কামরার মতো এ-গাড়িও গোরুদের রিজার্ভ করা। রাঘবলাল নিতান্তই অনধিকার প্রবেশ করেছে এখানে। তারা যদি হটো-হটো রিজার্ভ যায়, দুসরা ডিব্বামে চলা যাও-বলে চাঁদা করে তাকে গুতিয়ে দেয়, তা হলে সে তো আর কোথাও নেই। তার ওপর। রাঘবলাল স্রেফ বিনা টিকিটের যাত্রী। সুতরাং গোরুকে কর্ণগোচর করে, অর্থাৎ কর্ণে গোরুকে চরতে দিয়ে সে ঝিম মেরে বসে রইল।

কিন্তু এ-গাড়ি কি আর থামবে না? সেই যে তখন থেকে চলছে–সেচলার যেন আর বিরাম নেই। অন্ধকার ছুটছে, গাছপালা ছুটছে, আগুনের ফুলকির ঝড় উঠছে, গুমগুম করে পেরিয়ে যাচ্ছে রেলের পুল, দু-একটা ছোট-ছোট আলো দেখা দিয়েই ঘুরপাক খেয়ে কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে। পর-পর তিন-চারটি স্টেশন চলেও গেল কিন্তু মালগাড়ি একটানা ছুটছেই আর ছুটছেই। তার থামবার কোনও লক্ষণ নেই–কোথাও যে আদৌ থামবে, এমনও মনে হচ্ছে না।

যদি না থামে? যদি একটানা চলতে চলতে দিল্লি-আগ্রা-মোরাদাবাদ-বোম্বাই সব পেরিয়ে যেখানে খুশি চলে যায়? তা হলে? তা হলে কেমন করে দেশে ফিরবে রাঘবলাল? বাবার দোকানের রসগোল্লা-চমচম-বেদে-জিলিপিসন্দেশ-মনোহ-খাস্তা কচুরিগরম সিঙারা-মতিচুর সে কি আর খেতে পাবে কোনওদিন? আর কি কোনও আশা আছে?

রাঘবলাল অঝোরে কাঁদতে লাগল।

বাবা, তোমার কাছে মাফ চাইছি। তুমি এসে এখান থেকে আমায় নিয়ে যাও। যত খুশি লাঠিপেটা কর, আমার কোনও আপত্তি নেই। এই গোরুদের গাড়ি থেকে–এই চলতি ট্রেন থেকে আমায় উদ্ধার করো।

এদিকে গোরুর জিভ ঘাড় থেকে গলায় নামল। প্রথম-প্রথম যত বিশ্রী বোধ হচ্ছিল এখন আর তেমন লাগছে না। বরং বেশ একটুখানি আমেজ হচ্ছে তার। কাঁদতে কাঁদতেই কখন তার চোখ বুজে এল, তারপর এক ফাঁকে বিচালির গাদার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

.

আবার যখন ঘুম ভাঙল, তখন দেখল, ট্রেন থেমেছে। আকাশে ভোরের আলো ফুটেছে, পাশে বন-জঙ্গলের মাথার ওপর রোদের লাল আভা একটুখানি লেগেছে কেবল। রেললাইনের দুধারে গাছপালার ওপর পাখিরা কিচির-মিচির করছে।

রাঘব তাকিয়ে দেখল, স্টেশন নেই। বুঝল, সিগন্যাল ডাউন হয়নি, গাড়ি কোনও স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে পড়েছে। রাঘবের মনে হল এই সব চাইতে ভাল সুযোগ। স্টেশনে নামলেই তো টিকেট চাইবে, গোরুদের রিজার্ভ গাড়িতে চেপে এসেছে বলে ডবল ভাড়াই চাইবে কি না কে জানে? তার চাইতে এই বেলাই সোজা চম্পট দেওয়া ভালো। যা ভাবা সেই কাজ। চারদিকে বেশ করে দেখে নিয়ে সে টুপ করে একটা লাফ দিয়ে নীচে পড়ল। নুড়িগুলোতে একটু চোট লাগল বটে, কিন্তু সেটা এমন কিছু বেশি নয়। তারপরেই টেনে দৌড়। চোখের পলকে তারের বেড়া টপকে একেবারে রেললাইনের বিপজ্জনক সীমানার বাইরে।

গাড়ি থেকে একটা গোর ডাকল : হাম্বা! যেন বললে, কোথা যাস বাবা, ফিরে আয়।

কিন্তু রাঘব আর ফিরল না। চক্ষের পলকে কাঁটাগাছের ঝোঁপ, রেলের শুকনো নয়ানজুলি, টেলিগ্রাফের পোস্ট-সব পার হয়ে একটা পায়ে-চলা সরু পথ ধরে সে ছুটতে। লাগল। গাড়ির ইঞ্জিনের ভোঁ শুনল, একবার দেখল ট্রেনটা আস্তে-আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে, দু-তিনটে গোরু যেন কান তুলে এখনও তার দিকে তাকিয়ে আছে, থাকুক তাকিয়ে রাঘব। আর ওদের গ্রাহ্য করে না।

রাঘব ছুটল–প্রায় মাইলখানেক দমবন্ধ করে ছুটল। তারপর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল এক জায়গায়।

এ সে কোথায় এল!

গ্রাম নেই–মানুষজনের চিহ্ন নেই–এ যে অথই জঙ্গল। দুধারে সারি সারি ঝাঁকড়া গাছ, প্রথম ভোরের আলো এখনও ঢুকতে পারেনি তাদের ভেতরে। পায়ে-চলা পথটা ভিজে ভিজে মাটির ভেতর মুছে গেছে, চারদিকে থমথমে ছায়া। শুধু মাথার ওপরে অসংখ্য পাখির চিৎকার। এ কোথায় এল রাঘব! এখানে যে তাকে বাঘে-ভাল্লুকে ধরে খাবে!

এর চাইতে যে রেলগাড়িও ভাল ছিল।

যে-পথ দিয়ে এসেছে, ভাবল সে পথেই ফিরে যায়। কিন্তু কোথায় পথ? চারদিকেই যে ঘন কালো জঙ্গল!

এখন–এখন কী হবে?

রাঘবলাল আবার ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল।

–তু কোন্ হো?

নিদারুণ চমকে রাঘব একটা লাফ মারল।

আর সেই সময় কার একটা লোহার থাবার মতো হাত শক্ত করে কাঁধটা চেপে ধরল তার।

আর একেবারে হাঁড়িচাঁচার গলার মতো কর্কশ আওয়াজ তুলে কে জিজ্ঞেস করলে, আরে রোতা কেঁউ (কাঁদছিস কেন?)? তু কোন হো (তুই কে?)?

রাঘব তাকিয়ে দেখল, মানুষই বটে, কিন্তু কী রকম মানুষ! প্রকাণ্ড মাথায় আরও প্রকাণ্ড পাগড়ি, কান পর্যন্ত মোটা গোঁফ–দুটো লাল টকটকে বিকট চোখ মেলে ঠিক বাঘের মতোই তাকিয়ে আছে তার দিকে।

.

চার

দারুণ ভয়ে রঘু মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল, সেই ভয়ঙ্কর লোকটা লোহার মতো শক্ত হাতে তার ঘাড় চেপে ধরে বললে, এই, খাড়া রহো!

খাড়া দাঁড়িয়ে থাকার জো রঘুর ছিল না। মনে হচ্ছিল, তার পা দুটো স্রেফ শোলার মতো হালকা হয়ে হাওয়ায় ভাসছে। আসলে রঘু হাওয়াতেই ভাসছিল। সেই ভয়ঙ্কর লোকটা তাকে মাটি থেকে তুলে ধরে বেড়ালছানার মতো শূন্যে দোলাচ্ছিল।

রঘু কেবল বলতে পারল : আঁ–আঁ–আঁ–

আঁ-আঁ? আচ্ছা চল আমার সঙ্গে। পিছে বোঝা যাবে।

লোকটা রঘুর ঘাড় ছেড়ে দিলে। সঙ্গে সঙ্গেই একটা কাটা কুমড়োর মতো ধপাৎ করে স্যাঁতসেঁতে মাটির ওপর আছড়ে পড়ল রঘু।

সেই লোকটা তখন লাল-লাল চোখ দুটো পাকিয়ে, করাতকলে কাঠ-চেরাইয়ের মতো বিকট আওয়াজ তুলে হা হা করে হেসে উঠল। আর সেই হাসির আওয়াজে রঘুর সামনে বিশ্বসংসার লুপ্ত হয়ে গেল।

যখন জ্ঞান হল, তখন রঘুর মাথার ভেতরটা ঠিক চরকির মতো ঘুরছে। কিছুক্ষণ ধরে একরাশ সর্ষের ফুলের মতো কী কতগুলো তার সামনে নাচতে থাকল, মনে হল, একটা মাকড়সার জাল হাওয়ায় দুলছে আর তার ভেতর থেকে কয়েক জোড়া পাকানো চোখ কটকট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

রঘু উঠে বসল।

একটা স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে সে পড়ে ছিল এতক্ষণ। দেখল, কেমন করে যেন একটা পুরনো পোড়ো বাড়িতে এসে পড়েছে সে। সামনে একটা জানালা দিয়ে রোদ আসছে, সেই রোদ পড়ে একটা মাকড়সার জাল জ্বলজ্বল করছে, তার মধ্যে মস্ত কালো মাকড়সাটা কদাকার পা নেড়ে চলে বেড়াচ্ছে। ইট-বেরকরা দেওয়ালগুলোতে কোথাও চুনের আস্তর নেই–একটা ভ্যাপসা ভিজে গন্ধ উঠছে, হাওয়ার ধাক্কায় জানলার আধভাঙা পাল্লা ক্যাঁচ ক্যাচ করে শব্দ তুলছে। ঘরটা বেশ বড়। তারই একটা দিকে দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে বসে আছে। সে। একটু দূরে গোটাতিনেক খাঁটিয়ার ওপর ময়লা বিছানা গোটানো রয়েছে, লোটা আছে গোটা চারেক, দেওয়ালে হেলান দেওয়ানো রয়েছে মোটামোটা বাঁশের লাঠি আর সড়কি বল্লম। দুটো দরজা–একটা সামনের দেওয়ালের গায়ে, সেটা বন্ধ আছে। বোধহয় পাশের ঘরের দরজা। আর একটা দরজা তার ডানদিকে, সেটা ভোলা,-জানালা দিয়ে বাতাস এসে সেই পথে হু-হুঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। গাছপালার শব্দ আসছে, শোনা যাচ্ছে পাখির ডাক।

রঘুর ইচ্ছে করল, খোলা দরজাটা দিয়ে এক ছুটে বাইরে পালিয়ে যায় সে। তার মন বলছিল, বাবু রাঘবলাল, এ-জায়গাটা একদম ভালো নয়। যদি প্রাণ বাঁচাতে চাও, তা হলে তিন লাফে উধাও হও এখান থেকে। কিন্তু ইচ্ছে সত্ত্বেও সে পালাতে পারল না। একে তো ভয়ে, ক্লান্তিতে সারা শরীর অসাড় হয়ে গেছে, তার ওপর সেই প্রচণ্ড খিদে। চম্পতিয়ার ছাতুর তাল কখন যে হোমিওপ্যাথিক বড়ি হয়ে তার পেটের অতলে অদৃশ্য হয়েছে, তা সে নিজেও জানে না। রাঘব বুঝতে পারল, সেই লাল-লাল চোখওলা বিকট চেহারার লোকটাই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। লোকটার কথা মনে পড়তেই তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভয়ে ঝাঁকুনি খেয়ে উঠল। কিন্তু তখুনি পেটের আগুন-জ্বলা খিদেটা চাঁই চাঁই করে বলে উঠল : পাহাড় খাই, গাছ খাই, লোহা-লক্কড় যা পাই তাই খাই।

এনেছে যখন, তখন ভূত হোক, যা-ই হোক, কিছু নিশ্চয় তাকে খেতে দেবেই। আর, কিছু খেতে পেলে এমনিতেই যখন সে মারা যাবে, তখন খেয়ে-দেয়ে মরাই ভাল। কিন্তু যদি সত্যিই লোকটা রাক্ষস হয়? যদি তাকে একটা কাঁচা নরমুণ্ড এনে খেতে দেয়? কিংবা যদি সত্যিই তার মুণ্ডুটাই কচমচ করে–খোলা দরজার একটা পাটি বাতাসে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ দড়াম করে খুলে গেল সেটা। আর বিষম ভয়ে ওরে বাবা বলে রঘু একটা লাফ মারল।

এত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? বুদ্ধু কাঁহাকা।

রাঘবলাল দেখল, এবার যে ঘরে ঢুকেছে তাকে দেখে ঠিক রাক্ষস বলে বোধ হচ্ছে না। তার চাইতে বয়সে একটু বড়, কালো মিশমিশে একটি ছেলে। অসম্ভব জোয়ান, চওড়া বুক, লোহার শাবলের মতো দুখানা লম্বা লম্বা হাত। ইচ্ছে হলে এ-ও এক আছাড়ে তাকে চাপাটি বানিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু ছেলেটা হাসছে, কালো মুখের ভেতর চকচক করছে শাদা দাঁতের সারি।

–আরে, এত ডর খাচ্ছিস কেন? আমি তোর সঙ্গে গল্প করতে এলুম।

রঘু এবার ভয় পেল না বটে, কিন্তু বেশি ভরসাও পেল না। টুক করে আবার নিজের জায়গাতে বসে পড়ল, আর ছেলেটা তার মুখোমুখি বসল একটা খাঁটিয়ার ওপর।

–আমি কোথায় এসেছি?–এতক্ষণে সাহস করে জিজ্ঞেস করল রাঘবলাল।

–কোথায় এসেছিস? ছেলেটা আবার হাসল, তা ভালো জায়গাতেই ভিড়েছিস এসে। এর নাম বলরামপুরের শালবন। সহজে কেউ এ বনের ত্রিসীমানা মাড়ায় না।

–তবে তোমরা কেন এখানে থাকো?

–কেন থাকি? জানতে পারবি একটু পরেই। তারপর আগে তোর কথা শুনি। কে তুই?

–আমি রাঘবলাল সিং। সবাই রঘু বলে ডাকে।

–আমিও রঘুই বলব। তোর কে কে আছে?

–বাবা-মা সবাই। আমি আবার তাদের কাছে ফিরে যাব। বলতে বলতে রঘুর চোখে জল এসে গেল।আমি কিরিয়া করে বলছি, আর কখনও আমি ছানার জিলিপি চুরি করে খাব না।

–চুরি করে খেয়েছিলি?

–সেজন্যেই তো! বাবা মস্ত একটা লাঠি তেড়ে এল। তারপর—

ছেলেটা বললে, হুঁ, বলে যা।

চোখের জল মুছতে মুছতে রঘু নিজের করুণ কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করলে।

শুনতে শুনতে ছেলেটা হাসছিল, শেষ পর্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেল। আস্তে আস্তে বললে, কাজ ভালো করিসনি। বাপ-মাকে ছেড়ে পালিয়ে আসা খুব খারাপ। আমিও তাই করেছিলাম, তারপর–

–তুমিও পালিয়েছিলে! রঘু কৌতূহলে সোজা হয়ে উঠে বসল।

ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একটু পরে বললে, এখন থাক এসব কথা। তুই তো কাল থেকে ভুখা আছিস দেখছি। কিছু খাবি?

–খিদেয় মরে যাচ্ছি ভাই!

–তবে বোস, আমি খাবার নিয়ে আসি। কিন্তু খবর্দার, ঘর থেকে বেরুবি না। ভারি মুস্কিলে পড়বি তা হলে।

ছেলেটা বেরিয়ে গেল।

হাঁ করে বসে রইল রঘু। মুস্কিল? সেই ভয়ঙ্কর লোকটা কে? গেলই বা কোথায়? বলরামপুরের শালবনের মানে কী? কেন লোকে এর ত্রিসীমানায় পা দেয় না? এই ছেলেটাকে দেখে তো ভয়ের কিছু মনে হল না তার। তবে ঘরের বাইরে যেতে বারণ করছে। কেন? কী আছে বাইরে? জিন-পরী? বাঘ-ভাল্লুক?

রঘু দেখতে লাগল, সামনে মাকড়সার জালে রোদ পড়ে রুপোর তারের মতো ঝিলমিল করছে। আর সেই বিকট কালো মাকড়সাটা যেন কুতকুতে চোখ মেলে চেয়ে আছে তার দিকেই। হাওয়ার ধাক্কায় জানালার ভাঙা পাল্লাটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে শব্দ করছে সমানে।

মনের মধ্যে কে যেন ডেকে বললে, এখন পালাও রাঘবলাল, এখনও সময় আছে। কিন্তু পালাবার সাধ্য কী? ছেলেটা খাবার আনতে গেছে, না-খেয়ে এক পা-ও সে নড়তে পারবে না। তারপর ঘরের বাইরে ভূতপেত্নী, সাপবাঘ কী যে থাবা পেতে বসে আছে কে জানে! রঘু ঘামতে লাগল।

ছেলেটা ফিরে এল। একটা কলাই করা থালায় কয়েকটা লাড়ু, গোটা চারেক কলা আর পেতলের গ্লাসে এক গ্লাস দুধ।

বললে–খা লে। আমার খাবারটা তোকে দিচ্ছি।

–সে কি! তুমি কী খাবেলাড়ুতে হাত দিয়েও রাঘবলাল হাত গুটিয়ে নিলে।

–আমার জন্যে তোকে ভাবতে হবে না; আমার দুসরা ব্যবস্থা আছে। তুই খা!

আর বলতে হল না। রাঘব বাঘের মতো খাবারগুলোর ওপর ঝাঁপ দিয়ে পড়ল।

খাওয়া শেষ করে দুধের গ্লাসে চুমুক দিয়েছে, এমন সময়–

আরে বাঃ বাঃ চিড়িয়া যে দানাপানি খাচ্ছে দেখছি।

বিষম চমকে উঠে রঘু দরজার দিকে তাকাল। তিনটে গুণ্ডা জোয়ান এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানে। সকলের সামনে সেই লোকটা–যে ঘরের ভেতরে রঘুর টুটি চেপে ধরেছিল।

লোকটা সেই করাত-চেরা আওয়াজে আবার ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল। বললে, লে–লে শেষ খাওয়াটা খা লে! তারপর তোকে সাবাড় করব।

রঘু ভয়ে পাথর হয়ে গেল।

ছেলেটা বললে, কেন মিছে ছোট বাচ্চাটাকে ভয় দেখাচ্ছ চাচা?

–মিছে ভয় দেখাচ্ছি?–লোকটার অট্টহাসিতে রঘুর মাথা ঘুরে গেল, ওটা বাচ্চা ছেলে নয়, কেউটের বাচ্চা। খুদে গোয়েন্দা! নইলে এই বলরামপুরের শালবনে এসে ঢোকে? আজই সন্ধেয় ওকে কালীর পায়ে বলি দেব; তবে আমার নাম বৃন্দা সিং—হাঁ।

রঘুর হাত থেকে ঠকাৎ করে গ্লাসটা খসে পড়ল, দুধের ঢেউ বয়ে চলল মেঝেতে।

.

পাঁচ

রঘু হাউমাউ করে কান্না জুড়েছিল, ঘরঘরে গলায় বৃন্দা সিং জোরালো ধমক দিলে একটা।

–এই রোও মৎ!

রঘুর কান্নাটা গলায় এসে কোঁৎ করে থেমে গেল।

–খাড়া হো যাও।

রঘু দাঁড়াল। কেমন করে দাঁড়াল জানে না, শুধু চোখের সামনে সেই মাকড়সার জালটা যেন বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল।

–নাম কী? ঘর কাঁহা?

রঘু জড়িয়ে জড়িয়ে কী যেন বললে, কেউ তা বুঝতে পারল না। বৃন্দা সিং চোখ পাকিয়ে আবার বিকট গলায় ধমক দিলে : সাফ সাফ বলল, নেহি তো–বিরাশি সিক্কা নয়, একশো চৌষট্টি সিক্কার একটি চড় আকাশে উঠল। সেটা গালে পড়লে রঘু সেই চম্পতিয়ার ছাতুর গোলার মতো তাল পাকিয়ে যেত সঙ্গেসঙ্গে।

রঘুর গলা দিয়ে কেবল ক্যাঁ করে একটা আওয়াজ বেরুল। আর তক্ষুনি আড়াল করে দাঁড়াল সেই কালো ছেলেটা–যার নাম মুরলী।

মুরলী বললে, কেন ঝুটমুট ওকে ভেবড়ে দিচ্ছ চাচা? আমি সব বলছি। ছানার জিলিপি চুরি করে খাওয়া, তারপর বাপের ঠ্যাঙার ভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালানো–ট্রেনে উঠে ভোরবেলা লাফিয়ে নেমে পড়ারাঘবের অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী সব বলে গেল মুরলী। আর তাই শুনে হা-হা করে হাসতে-হাসতে পেটে হাত চেপে বসে পড়ল বৃন্দা সিং। সঙ্গের বাকি তিনটে জোয়ানও সে-হাসিতে যোগ দিলে, আর, মনে হলো, বলরামপুরের জঙ্গলে যেন হাজার খানেক করাত একসঙ্গে কাঠ চিরছে।

হাসি থামলে বৃন্দা সিং বললে, আঁ এইসা বাত? ওরে বুদ্ধ রঘুয়া, খাওয়ার জন্য বাঁচতে নেই বাঁচার জন্যেই খেতে হয়। যাই হোক, আমার পাল্লায় যখন এসে পড়েছিস, তখন তোকে শিখিয়ে দেব সত্যিকারের বাঁচা কাকে বলে। কুস্তি লড়বি, লাঠি খেলবি, বন্দুক ছুঁড়বি। ঘি আর মেঠাই খেয়ে পেটে যে থলথলে চর্বি জমেছে–এক মাসের মধ্যে লোপাট হয়ে যাবে ওসব। ছাতি চওড়া হবে-সত্যিকারের জোয়ান করে তুলব। এই মুরলী তোর দেখাশোনা করবে–আর কিষণলাল তোকে মানুষ করার ভার নেবে। কিন্তু খবদ্দার। পালাবার চেষ্টা করেছিস তো মরেছিস! কালী মাইজীর কাছে নিয়ে তোকে বলি দেব–মনে থাকে যেন।

কথাগুলো রঘু যে সব শুনতে পেল তা নয়। কিন্তু যা শুনল তা-ই যথেষ্ট। আর-একবার কেঁদে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু বৃন্দা সিং ওর চোখের দিকে তাকাতেই সেকান্নাটা কোঁৎ করে গলা বেয়ে পেটের ভিতরে নেমে গেল তার।

বৃন্দা সিং বললে, আমি এখন যাচ্ছি, বিকেলে ফিরে আসব। কিষণলাল, তুমি এক্ষুনি একে তালিম লাগাও, আমি এসে খবর নেব, কতদূর এগোল।

এই বলে বাকি দুজন সঙ্গীকে নিয়ে নাগরা জুতো মচমচিয়ে বেরিয়ে গেল বৃন্দা সিং। সামনে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কোথায় যে মিলিয়ে গেল কে জানে?

রঘু একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাচ্ছি, কিন্তু আশা মরীচিকা। সঙ্গে সঙ্গে আর-একটা লম্বা জোয়ান এগিয়ে এল তার দিকে। গায়ের রংটা ফসার দিকে। মাথায় ছোট-ছোট লালচে চুল–রোদ পড়ে তামার কুচির মতো জ্বলছে, বাঁ দিকের ভুরুর নীচ থেকে একটা পুরনো কাটা দাগ ধনুকের মতো বেঁকে নেমে এসেছে ঠোঁট পর্যন্ত। চোখ দুটো ট্যারা। মালকোঁচা করে পরা কাপড়, গায়ে ফতুয়া, দু-হাতে দুটো লোহার বালা। সব মিলে ভয়ঙ্কর লোকটাকে আরও বিকট দেখাচ্ছে। এ-ই কিষণলাল।

কিষণলাল ট্যারা চোখে খানিকক্ষণ দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল–অর্থাৎ বেশ করে লক্ষ করল রঘুকে। তারপর বললে, আও।

রঘু মুরলীর পেছনে কাঠ হয়ে রইল, এক পা নড়ল না। কিষণলাল আবার মোটা গলায় বললে, এই রঘুয়া, চলা আও।

মুরলী কানে কানে বললে, চলা যাও–ডরো মৎ।

বলির পাঁঠার মতো মুরলীর আড়াল থেকে বেরুল রাঘবলাল। কিষণলাল খপ করে তার হাতটা চেপে ধরল। আঙুল তো নয়–যেন লোহার আংটা! রঘুর হাতের হাড় মড়মড় করে উঠল।

কিষণলাল তাকে টানতে টানতে ঘর থেকে বার করে নিয়ে গেল। কিষণলালের সঙ্গে যেতে যেতে রঘু দেখল, একটা মস্ত পুরনো বাড়ির অর্ধেকটা ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে–তৈরি হয়েছে কতগুলো মাটির পাঁজা তার ওপর ঘাস আর বনতুলসীর জঙ্গল গজিয়েছে। মাত্র খান তিন-চার ঘর কোনওমতে দাঁড়িয়ে আছে, একটু-আধটু সারিয়ে-সুরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেইটেই এদের আস্তানা। পুরনো চুন-সুরকি আর গাছপালার গন্ধে ভরে আছে বাতাস। বাড়িটার সামনে আর দুধারে একটু ফাঁকা জায়গা–কেটে সাফ করা হয়েছে মনে হয়। তা ছাড়া চারদিকে জঙ্গল আর জঙ্গল। শালগাছ তো আছেই, কয়েকটা শিমুল গাছ ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। আরও কী কী গাছ রয়েছে রঘু চিনতে পারল না। বনের ভেতর দিয়ে কয়েকটা ছোট-ছোট পায়ে-চলা কোথায় যে চলে গেছে কে জানে?

সেই ফাঁকা জায়গার খানিকটা অংশ বেশ করে কোপানো রঘু বুঝল এখানে কুস্তি হয়। তারই কাছাকাছি একটা গাছতলায় কিষণলাল রঘুকে এনে দাঁড় করাল। বললে, খাড়া রহে।

রঘু দাঁড়িয়ে রইল।

–ইধার উধার ভাগো মৎ।

রঘু মাথা নেড়ে জানালো,–সে ভাগবে না।

–আমি এখুনি আসছি–বটে চট করে কিষণলাল আবার সেই ভাঙা বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। রঘু দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল চারদিকে। চোখে পড়ল, খানিক দূরে একটা শালগাছের ওপর থেকে তিনটে বানর একমনে তাকে দেখছে। একটা আবার চোখ পিটপিট করে তাকে ভেংচে দিলে।

ভ্যাংচাক যত খুশি। অন্য জায়গা হলে রঘু এতক্ষণে দু-চারটে ঢিল ছুঁড়ে দিত, কিন্তু বিপাকে পড়লে সবই সইতে হয়। রঘু মুখ হাঁড়ি করে দাঁড়িয়ে রইল।

কিণষলাল ফিরে এল। তার দু হাতে দুটো লাঠি। একটা প্রকাণ্ড, আর-একটা তার চাইতে একটু ছোট। মতলব কী? ওই লাঠি দুটো দিয়ে ঠ্যাঙাবে নাকি তাকে? কিন্তু দুটোর দরকার কী, একটার এক ঘা খেলেই তো রঘু চিরকালের মতো ঠাণ্ডা।

কিন্তু কিষণলাল তাকে ঠ্যাঙাল না। সামনে এসে ছোট লাঠিটা তার দিকে এগিয়ে ধরল।

–নে।

রঘুকে নিতে হল।

লাঠি খেলেছিস কোনওদিন?

–না।

–কুস্তি করেছিস?

–না।

–হুঁ! তাই এই বয়সেই পেটে অমন করে চর্বি গজিয়েছে, বুকটা হয়েছে পায়রার মতো। তিনদিনে আমি তোকে ঠিক করে দিচ্ছি। এবার লাঠিটা ধর।

রঘু লাঠির গোড়াটা ধরল।

–বেকুব কাঁহাকা? ও-ভাবে নয়। দেড় হাত বাদ দিয়ে তারপর দু পাশে মুঠো করে ধর। ধরেছিস? এইবারে লাঠি তোল!–তোল বললেই তোলা যায় নাকি? একটা বাঁশের লাঠির যে এমন নিদারুণ ওজন হতে পারে, রঘু সেটা এই প্রথম বুঝতে পারল। যেন ভীমের গদা তুলেছে এমনি মনে হল, টনটনিয়ে উঠল হাতের কবজি।

–ঠিক হ্যায়! এইবার লাগা আমার লাঠির সঙ্গে। আওর জোরসে! খালি ঘি-মিঠাই খাস, একটু তাগদ নেই শরীরে? হুঁ–ঠিক হয়েছে। কারও মাথায় মারতে হলে কিংবা কেউ মাথায় মারতে এলে–এমনি করে মারবি। এইভাবে আটকে দিবি। একেই বলে শির-সমঝা?

আর সমঝা! এক শিরের ধাক্কাতেই রঘুর শির ঝনঝন করছে তখন! আর কী এই লাঠিটা। রঘুর কাঁধ থেকে হাত দুটো ছিঁড়ে পড়বার জো হল।

কিষণলাল বললে, লাঠি ফেক–

লাঠি ফেক, কথাটার মানে হল, লাঠিটা এগিয়ে নিয়ে ধরে ছোড়বার ভঙ্গিতে জোরে তার মাথাটা মাটিতে ঠেকানো। কিন্তু ফে কথাটার অর্থ রঘু সোজাসুজি বুঝে নিল। তৎক্ষণাৎ হাত থেকে ছুঁড়ে দিলে লাঠিটা, আর সেটা সোজা গিয়ে ধাঁই করে কিষণলালের হাঁটুর ওপর পড়ল।

–আরে বাপ, মার দিয়া! বলে হাহাকার করে উঠল কিষণলাল। হাঁটু চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল কিছুক্ষণ, বিশ্রী মুখ করে চোট-খাওয়া জায়গাটা ডলাই-মলাই করল, তারপর উঠে দাঁড়াল। তখন তার দাঁত কড়কড় করছে, তার কটা চুলে রোদ পড়ে তামার কুচির মতো জ্বলছে আর দুটো ট্যারা চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে।

–উল্লু-ভাল্লু—গড্ডর–খড্ডর কাঁহাকা—

উল্ল, ভাল্লু, গড্ডর–এ-সবের মানে বোঝা যায়, কিন্তু খচ্চর যে কী ব্যাপার সেইটেই বুঝতে চেষ্টা করছিল রঘু। তার আগেই বাঘের মতো তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল কিষণলাল। দুটো লম্বা-লম্বা হাতে স্রেফ একটা বেড়াল-ছানার মতো মাটি তুলে নিলে, তারপর সোজা ছুঁড়ে দিলে ওপর দিকে।

কাঁউ কাঁউ করে একটা আওয়াজ বেরুল রঘুর গলা দিয়ে। আর পরক্ষণেই টের পেল মাটি থেকে হাত-সাতেক ওপরে একটা গাছের ডালে সে সওয়ার হয়েছে। তখুনি নীচে পড়ে যাচ্ছিল, প্রাণপণে ডালটাকে চেপে ধরে তার ওপর শুয়ে পড়ল।

নীচে থেকে হা-হা করে হেসে উঠল কিষণলাল। বললে, আব রহো, হঁয়াই রহো।

তা ছাড়া আর কী করতে পারে রঘু? জীবনে সে কোনওদিন গাছে চড়েনি–এমনকি ঘুড়ি ধরবার লোভেও নয়। চিরকালই সে বাপ-মায়ের আদরের দুলাল, ননীর পুতুল। এই ডাল থেকে কেমন করে যে মাটিতে নামবে সেটা ভাবতেই মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল তার।

আর তখন—

পাতার আড়াল থেকে হাজারখানেক লাল পিঁপড়ে বেরিয়ে সবেগে তাকে আক্রমণ করল। তাদের নিজস্ব দুর্গে এই অনধিকারীর প্রবেশ তারা কোনওমতেই সহ্য করতে রাজি নয়।

.

ছয়

কিষণলাল আবার গলা ফাটিয়ে হাসল কিছুক্ষণ।

— হো–হো, দেখো দেখো। পেরকা উপর বান্দর কেইসে বৈঠা হ্যা।

পের অর্থাৎ গাছের ওপর বাঁদর বসে আছে। কিন্তু রাঘবলাল আর সত্যিই কিছু বানর নয় তা হলে লাফে লাফে এ-ডাল থেকে ও-ডালে সে হাওয়া হয়ে যেতে পারত। তার বদলে চোখ কপালে তুলে সে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে রইল, আর দলে-দলে লাল পিঁপড়ে এসে–বাবা রে–মা রে গেলুম রে–

গোলমাল শুনে মুরলী বেরিয়ে এসেছিল। এই ছেলেটাকে রঘুর ভালো মনে হয়েছিল, ভেবেছিল, বিপদে-আপদে অন্তত মুরলীর কাছে আশ্রয় পাবে সে। কিন্তু এ কী বিশ্বাসঘাতকতা! সংসারে কাউকে যে চেনবার জো নেই! মুরলীও হাসছে। কালো মুখের ভেতর থেকে সাদা সাদা দাঁত বের করে সমানে হেসে চলেছে। রঘু আর্তনাদ করে উঠল : এই ভাই মুরলী, চুট্টি (পিঁপড়ে) আমাকে খেয়ে ফেললে!

–তো উতরো না। নেমে এস।

–কেমন করে নামব?

–কোশিস কর।

কী করে কোশিস করে রঘু? একেবারে ননীর পুতুল। খেয়েছে, ঘুমিয়েছে, মোটা হয়েছে, আর পনেরো বছর বয়সেও প্যাঁচার ডাকে ভয় পেয়ে মা-কে জড়িয়ে ধরেছে। গাছ থেকে নামা কি তার কাজ?

–উতরো–উতরো বলে কিষণলাল তার লম্বা লাঠিটা দিয়ে একটা খোঁচা লাগিয়ে দিল রঘুর পেটে। রঘু গোঁ গোঁ করে উঠল।

একেবারে দুমুখো আক্রমণ! গাছে লাল পিঁপড়ের ব্যাটেলিয়ান, তলা থেকে লাঠির গুঁত। আর ঠিক সেই সময় চোখে পড়ল, মাথার একটু ওপরে গোটা-চারেক বাঁদর তাকে ভেংচি কাটছে। তাদের ভাবভঙ্গি সন্দেহজনক। ওই চারটিতে মিলে যদি খ্যাঁচখ্যাঁচিয়ে তাকে আঁচড়ে দেয়, তা হলে গায়ের ছাল-চামড়া বলে কিছু আর থাকবে না।

হে মা কালী! হে বাবা হনুমানজী! এই দুঃসময়ে রাঘবলালকে বাঁচাও।

এর মধ্যে একটা লাল পিঁপড়ে কুটুস করে রাঘবের কানের গোড়ায় কামড়ে দিয়েছে আর কিষণলাল আবার ক্যাঁক করে লাগিয়েছে লাঠির গুঁতো। আর তো পারা যায় না।

–উতরো না! একটু নীচে নামোডাল ধরে ঝুলে পড়ো!-মুরলী উপদেশ দিতে লাগল।

তা ছাড়া আর উপায় নেই। চেষ্টা তাকে করতেই হবে। প্রাণ দিয়ে টানাটানি পড়েছে। এখন।

প্রায় দশমিনিট ধস্তাধস্তির পর–ঝপাং।

রঘু ঠিক মাটিতে নামল না–পড়ল। তারপরে আরও মিনিট দশেক নাচানাচি করতে হল প্রাণপণে। মানে, ইচ্ছে করেই নাচল না, ওই পিঁপড়েরাই নাচিয়ে ছাড়ল তাকে। মুরলী এগিয়ে এসে কিছু পিঁপড়ে ছাড়িয়ে দিলে গা থেকে। তখন বে-দম হয়ে রাঘবলাল বসে পড়ল গাছতলায়, গায়ের চামড়া ছড়ে গেছে এখানে-ওখানে, পিঁপড়ের কামড়ে চাকা-চাকা হয়ে ফুলে উঠেছে, আর বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা কামারশালার হাপরের মতো ওঠাপড়া করছে। হায়রে ছানার জিলিপি! তোর জন্যে এত দুর্ভোগ সইতে হবে সেকথা কি রাঘবলাল স্বপ্নেও ভেবেছিল। কিন্তু বসে বসে দুঃখ করবার জো নেই। কিষণলাল এক হ্যাঁচকা টানে তাকে তুলে ফেললে।

–আও, লাঠি ধরো।

কিছুতেই নিস্তার নেই। আবার সেই কালান্তক লাঠি খেলা। ওঃ!

.

দেখতে-দেখতে কুড়িবাইশটা দিন কেটে গেল। এর মধ্যে রাঘবলাল অনেক দেখেছে, ঠেকেছে, অনেক শিখেছে। বুঝেছে এ বড় কঠিন ঠাঁই। এখানে মা নেই, বাবা নেই, দোকানের চাকর ছোট্ট–যে লুকিয়ে-চুরিয়ে তাকে এটা-ওটা মিঠাই খাওয়াত, সেও নেই। এমন কি স্কুলের সেই বন্ধুরাও নয়–যারা ঠাট্টা করে মানপত্র দিলেও নিরীহ, শান্ত রাঘবলালকে বেশ ভালোইবাসত। ননী, ছানা ঘি-ভাত এসবের কোনও পাটই নেই এখানে।

বৃন্দা সিং তো আছেই, তা ছাড়া আছে আরও দশ বারোজন মানুষসকলেই যেন বাঘের দোসর!

ভোরে উঠে কাঁচা ছোলা খেতে হয়, কুস্তি লড়তে হয়, লাঠি-সড়কি-তলোয়ারের খেলা শিখতে হয়। বন্দুক ছোঁড়াও শিখতে হবে এর পর। আর খাওয়া শুকনো শুকনো বড়বড় রুটি, কিছু ডাল-তরকারি আর দুধ। ট্যাঁ-ফোঁ করবার জো নেই–যে-কেউ এসে ধাঁ করে। এমন এক-একটি পেল্লায় চড় কষিয়ে দেয় যে আধঘণ্টা ধরে মাথা-ফাথা বোঁ-বোঁ করে ঘুরতে থাকে। প্রথম দিনে ছোলা খেতে রাজি হয়নি বলে একজন তো তাকে ঠ্যাং ধরে গদার মতো শূন্যে তুলেছিল, একটা আছাড় দিলেই একদম ঠাণ্ডা। ভাগ্যিস মুরলী হাঁ-হাঁ করে এসে পড়েছিল, নইলে সেই দিনই রাঘবলালের হয়ে যেত।

এই বাইশ দিনে অনেকটা অভ্যেস হয়ে এসেছে। ছোলা চিবুতে ভালো না লাগলেও খুব যে খারাপ লাগে তা-ও নয়। রুটি আর তরকারি এখন গোগ্রাসেই খায়-তবে গরম ঘি-ঢালা ভাতের মতো অত বেশি খেতে পারে না। খাওয়ার পরেই শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে না, চোখে। ঝিমুনি ধরে না। মনে হয় অনেকখানি সে দৌড়ে আসতে পারে, লাফালাফি করতে পারে অনেক দূর পর্যন্ত।

শরীরটা বেশ ঝরঝরে হয়ে গেছে। ভুঁড়ি-টুঁড়িগুলো এর মধ্যে যেন চুপসে কোথায় চলে গেছে। এখন লাঠির ভারে কবজি আর ছিঁড়ে আসতে চায় না। রাঘব মাথার ওপর বনবনিয়ে ঘুরোতে পারে সেটাকে। প্যাঁচার ডাকে ভয় পাওয়া দূরে থাক, রাত্রে যখন ঘরের আশপাশ থেকে উ কা হু–উ কা হু বলে শেয়ালরা গলা ছেড়ে কী যেন জিজ্ঞেস করতে থাকে, তখন রাঘবলাল অঘোরে ঘুমোয়।

আগের সেই ভিতু, বোকা আর পেটুক রাঘবলাল অনেকটাই বদলে গেছে। এমন কি বাবা-মা বাড়ির জন্যে মধ্যে-মধ্যে খুব কান্না পেলেও এখানে সে যে খুব খারাপ আছে তা নয়। মুরলী তাকে খুব ভালোবাসে, কিষণলাল কখনও কখনও পিঠ চাপড়ে দেয়, বৃন্দা সিং-ও আর তেমন কটমট করে তার দিকে তাকায় না। আসল ভয় সেখানে নয়। রাঘবলাল জেনেছে, এরা ডাকাত। নানা জায়গায় ডাকাতি করে পুলিশের তাড়া খেতে খেতে এখন কিছুদিনের জন্য এই বলরামপুরের জঙ্গলে এসে ঘাঁটি গেড়েছে। কী একটা মতলব নিয়ে কিছুদিন চুপচাপ করে রয়েছে কোনও একটা বড়গোছের কাণ্ড ঘটিয়ে এখান থেকে পালাবে। দিনের বেলা ওদের কেউ-কেউ গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর গেরুয়া পরে, কাঁধে ঝোলা নিয়ে বেরোয়–দুরের গঞ্জে যায়, দরকারি জিনিসপত্র কিনে-কেটে আনে। আর মাঝরাতে বৃন্দা সিংয়ের ঘরে বসে ফিসফিস করে কী সব আলোচনা করে। সে আলোচনা, রাঘবলাল তো দূরে থাক, মুরলীরও শোনবার জো নেই।

আর এই জন্যেই রাঘবলালের ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করে, শেষ পর্যন্ত সে কিনা ডাকাতের দলে গিয়ে ভিড়ল! যে-ডাকাতরা মানুষ খুন করে, লুটতরাজ করে, ধরা পড়লে ফাঁসিতে কিংবা জেলে যায় তাদের সঙ্গে মিশে তাকে কাটাতে হচ্ছে! পারলে এই মুহূর্তে সে ছুটে পালাত। কিন্তু মুরলী তাকে বলেছে, বৃন্দা সিং মিথ্যেই শাসায়নি। তার চোখ চারদিকে খোলা। পালাবার চেষ্টা করলেই টুটি চেপে ধরবে, তারপর গভীর বনের ভেতর কোথায় একটা পোড়ো পুরনো কালীমন্দির আছে, সেইখানে নিয়ে গিয়ে বলি দিয়ে দেবে।

কী হবে রাঘবলালের? কী করবে সে?

সেদিন বিকেলে বসে বসে এইসব কথাই সে ভাবছে, এমন সময় মুরলী এল। দুটো কুড়ল তার দুহাতে।

বললে, চল রঘুয়া।

–কোথায় যেতে হবে?

–সর্দার বলেছে, রান্নার কাঠ নেই। বন থেকে কেটে আনতে হবে।

দুজনে বেরিয়ে পড়ল।

এর আগে এত গভীর বনের ভেতরে রঘু কোনওদিন ঢোকেনি। বড় বড় গাছের ছায়া কী অন্ধকার হয়ে আছে এখানে ওখানে। পায়ের নীচে কী স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা মাটি। কত লতা, কত ঝোঁপঝাড়, কত রকমের ফুল ফুটেছে। তার ভেতরে ঝাঁটি ফুলগুলোকে রাঘবলাল চেনে, তাদের গন্ধে বন যেন ভরে রয়েছে। কোথাও বা কালো ভিজে মাটি ছেয়ে শিমুলের ফুল ঝরেছে-যেন বনের মধ্যে কে একখানা লাল কার্পেট পেতে রেখেছে। টুই-টুই করে মিষ্টি গলায় কী একটা পাখি ডেকে চলেছে একটানা।

মুরলী বললে, আমার বনে বনে ঘুরতে বেশ লাগে। তোর ভালো লাগে না?

একেবারেই নয়। কিন্তু সেকথা রাঘবলাল মুখ ফুটে বলতে পারল না।

আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে একটা শুকনো মরা গাছ পাওয়া গেল। মুরলী বললে, এইটেকেই কাটা যাক–কী বলিস?

আচ্ছা।

মুরলী কুড়ল তুলে জোরে গাছটায় কোপ বসালো। কিন্তু কুড়লটা তখুনি টেনে তুলতে পারলে না–অনেকখানি বসে গিয়েছিল। মুরলী কুড়ল ধরে টানাটানি করছে, আর সেই তখন—

গর্‌—র—র্‌–

শুধু একবার একটা আওয়াজ, ঝোঁপ নড়বার শব্দ, তারপরেই যেন একরাশ সোনালি আগুন ঠিকরে উঠল বনের ভেতর থেকে। পরক্ষণেই যা দেখল তাতে মাথার চুল একেবারে খাড়া হয়ে গেল রঘুর। দেখলে, আর্তনাদ করে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়েছে মুরলী, আর তার পিঠের ওপর চেপে বসেছে বিরাট এক চিতাবাঘ। এক সারি ছোরার মতো তীক্ষ্ণ দাঁত মেলে গর্জন করছে : গর্‌—র—র্‌–

.

সাত

রঘুর চুল খাড়া হল–টিকিটাও যেন সোজা দাঁড়িয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট দিতেই যাচ্ছিল–হঠাৎ তার কানে এল মুরলীর চিৎকার : বাঁচাও–বাঁচাও–

সংসারে কোনও মানুষ ভীরু–কেউ সাহসী, রাত্তিরে গায়ে আরশোলা পড়লে কারও দাঁতকপাটি লাগে, কেউবা অমাবস্যার মাঝরাতে একা শ্মশানে যেতে ভয় পায় না হাতে লাঠি বাগিয়ে দশজন ডাকাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শুধু কি গায়ের জোরের জন্যেই? আরে না–না। মনের জোর থাকলে শরীরে শক্তি আপনি এসে যায়। মানুষ ভীরু হয় কেন? আঁচল-চাপা হয়ে থাকে বলে, জুজুবুড়ির ভয়ে ছমছমানি লাগে–সেইজন্যে।

রাঘবেরও তাই হয়েছিল। কিন্তু তেমন অবস্থায় পড়লে ভীরুর বুকেও তিনটে হাতির বল আসে। রাঘবলাল পালাতে গিয়েও ফিরে দাঁড়াল।

ওদিকে মুরলী ডাকছে : বাঁচাও—বাঁচাও–

একমিনিট কি দু মিনিট–কিংবা তাও নয়। রাঘব নিজেও জানে না কী করে অত বড় কুড়লটাকে সে মাথার ওপর তুলে ধরল। তারপরেই ঝপাংকুড়লের কোপ পড়ল সোজা বাঘটার ঘাড়ের উপর। খ্যাঁ–অ্যাঁ–অ্যাঁ খ্যাঁক–একটা আওয়াজ করল বাঘটা, মুরলীকে ছেড়ে ছিটকে সাত হাত দূরে গিয়ে পড়ল। রাঘবের মতো ছোট ছেলের হাতের ঘায়ে তার শক্ত গায়ে মারাত্মক চোখ হয়তো লাগেনি, কিন্তু যেটুকু লেগেছিল তাই যথেষ্ট। ঘা-খাওয়া বাঘ প্রায়ই রুখে দাঁড়ায় কিন্তু এই বাঘটার বোধহয় এতেই আক্কেল দাঁত গজিয়ে গিয়েছিল। আর-একবার সে ঘ্যাও বলে আওয়াজ তুলল, তারপর বনের ভিজে ভিজে কালো মাটি আর শুকনো পাতার ওপর রক্ত ছড়াতে ছড়াতে চক্ষের পলকে হাওয়া হয়ে গেল।

রাঘবের কপাল বলতে হবে। মুরলীকে ছেড়ে বাঘটা তারই ওপর চওড়া হলে কী যে ঘটত-সে কথা জোর করে বলা শক্ত।

–তুই আমায় বাঁচালি রঘু! একথা আমি কোনওদিনই ভুলব না।

কিন্তু কাকে বলছে মুরলী? হাতে কুড়লটা ধরাই আছে–সেই মরা গাছাটায় ঠেসান দিয়ে বসে পড়েছে রঘু। তার চোখ দুটো বোজা-শরীর নিঃসাড়। এতক্ষণে সে সত্যিই জ্ঞান হারিয়েছে।

মুরলী আস্তে আস্তে তাকে ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল : রঘুয়া–রঘুয়া–এ রাঘবলাল বনের ভেতর ঝিরঝির করে হাওয়া বইছিল, দূরে কাছে তিতিরেরা এ-ওর সঙ্গে কথা কইছিল, ঘুঘু ডাকছিল ঘুম-ঘুম্ শব্দে। ভিরমির ভাবটা কেটে গিয়ে রঘু চোখ মেলল।

তারপরই কাতর গলায় বললে, মুরলী।

মুরলী রাঘবের কাঁধে হাত বুলিয়ে বললে, ভাইয়া, এই তো আমি!

–বাঘটা কোথায়?

–তোমার চোট খেয়েই তো পালিয়েছে।

–আমার?

ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে লাগল রাঘব–যেন তখনও কিছু বুঝতে পারছে না।

–আরে, বাঘটা তো হাঁ করে আমায় কামড়াতে যাচ্ছিল–একটু হলেই গলায় দাঁত বসিয়ে দিত! ঠিক সেই সময় তুই কুড়ল দিয়ে জব্বর ঘা মেরে দিলি ওকে। মনে নেই। তাইতেই ল্যাজ তুলে ছুটে পালাল।

রাঘব উঠে দাঁড়াল–চোখ কচলাল বারকয়েক। তখন তার মুরলীর কথা মনে পড়ল।

–ভাই তোমার লাগেনি তো?

–না–না, সামান্য আঁচড়ে দিয়েছে। ও কিছু নয়।

রাঘব হঠাৎ মুরলীকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললে। এই কদিনেই মুরলীকে সে যে কতখানি ভালবেসে ফেলেছে, যেন এইবার বুঝতে পারল সেটা! আর তার কান্নায় মুরলীরও চোখ ছলছল করে উঠল।

মুরলী বলল, চল ভাইয়া ফিরে চল। চোট-লাগা বাঘকে বিশ্বাস নেই বিশেষ করে চিতা। ঝোঁপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আবার কখন এসে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়তে পারে। তখন আর সামলানো যাবে না। এই বেলা পালাই।

বৃন্দা সিংয়ের আড্ডায় রাতারাতি নিদারুণ খাতির বেড়ে গেল রাঘবলালের।

বৃন্দা সিং তার মস্ত গোঁফজোড়ায় তা দিয়ে, হঠাৎ কোনও কথা না বলে, রাঘবকে একেবারে শূন্যে ছুঁড়ে দিলে। রঘু আঁতকে উঠে আঁই আঁই করে উঠল! তার মনে হল, আবার বোধহয় সেদিনের মতো তাকে তুলে দেওয়া হচ্ছে গাছের ডালে। কিন্তু কাছাকাছি কোথাও গাছ ছিল না, আর পড়তে-পড়তেই আবার তাকে লুফে নিল বৃন্দা সিং। আর ধরাম ধরাম করে গোটা কয়েক পেল্লায় চাঁটি পড়ল রাঘবের পিঠে। যেন রামা হো–রামা হো গাইবার তালে বেশ করে ঢোলক বাজিয়ে নিলে বারকয়েক।

কিন্তু রাঘবের পিঠটা ঢোলক নয়–লাগলও বিলক্ষণ। তবু রাঘব কেঁদে উঠতে পারল না। সে বুঝতে পারছিল, তাকে আদর করা হচ্ছে।

বৃন্দা সিং বললে, শাবাশ–শাবাশ, এই তো চাই! ডর-পোক হয়ে ননীর পুতলা হয়ে বেঁচে থাকার কোনও মানে হয়? চর্বির টিবি ছিলি, এইবার মানুষ হচ্ছিস। শেষে একদিন হয়তো তুই ই এই দলের সর্দার হয়ে উঠবি। তখন সারা হিন্দুস্থানের তোক বলবে, হাঁ ডাকু বটে রাঘবলাল–তার নাম শুনলে মিলিটারি ভি ডর খায়।

এই কথা শুনেই রাঘবলালের খারাপ লাগল। বৃন্দা সিংয়ের মতো ভয়ঙ্কর লোকও তাকে বাহবা দিচ্ছে–এতে মনটা খুশি হতেই পারে, কিন্তু বড় হলে সে নামজাদা ডাকাত হবে, এইতে রঘু ভারি দমে গেল। এই লোকগুলো সাংঘাতিক ডাকাত-পুলিশের ভয়ে এখানে লুকিয়ে আছে রঘু প্রাণপণে তা ভুলে থাকতে চেষ্টা করে। কিন্তু ইচ্ছে করলেই ভোলা যায় না। এক-একদিন রাত্রে বাইরে পাতার আওয়াজ কিংবা শেয়াল-কুকুরের চলার শব্দে তার মনে হয়, এই বুঝি পুলিশের দল বল আসছে, এদের সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে লটকে দেবে।

পালাতে পারলে সে বাঁচে এখান থেকে। কিন্তু মুরলী বলে দিয়েছে, বৃন্দা সিংয়ের দুটো চোখ এই বনের হাজার হাজার জোনাকির মতো চারদিকে জ্বলছে। পালাতে গেলেই ধরা পড়বে, আর তারপর

ওদিকে বৃন্দা সিংয়ের কথা শুনে কিষণলাল বললে, খালি রঘুয়ারই প্রশংসা করছ কেন সর্দার? ওকে লাঠি খেলা শিখিয়ে, কুস্তি লড়িয়ে মানুষ করেছে কে, সেটাও বলল।

বৃন্দা সিং বললে, আলবাত–আলবাত! কিষণলালেরও বাহাদুরি আছে বইকি!

কিন্তু রঘুর প্রশংসা শুনে একজনের গা জ্বালা করছিল, তার নাম ভুট্টারাম। বেঁটে চেহারার লোক ভূট্টারাম, মুখে বসন্তের দাগ, একটা চোখ আবার তার কানা। এই বলরামপুরের আচ্ছায় ভুট্টারামকেই রঘু একদম পছন্দ করে না। যখন-তখন মাথায় গাঁট্টা মারে, রঘুর টিকি ধরে টেনে দেয়। এক-একদিন রাত্রে শোয়ার সময় রঘুকে গা-হাত-পা টিপে দিতে বলে, পছন্দ না হলে ঠাঁই করে চড় বসায়। মুরলীও দুচক্ষে ভুট্টারামকে দেখতে পারে না, বলে, ও একনম্বরের বিচ্ছু।

সেই ভুট্টারাম মুখ বাঁকিয়ে একটা ছড়া কাটল :

তুফান সে কৌয়া গিরে
মৌলা বোলো দেখো খেল্‌।।

(অর্থাৎ ঝড়ে কাক মরে–আর মোল্লা বলছে, আমার ওস্তাদিটা দ্যাখো একবার!)

বৃন্দা সিং ধমক দিয়ে বললে, চোপরাও! তু তো একদম নিকম্মা; কারও ভাল দেখলে বুঝি সহ্য হয় না? ভাগ হিঁয়াসে!

সবাই হেসে উঠল, সব চাইতে বেশি করে হাসল রাঘবলাল। আর মুখটা গোঁজ করে সামনে থেকে সুড় সুড় করে চলে গেল ভুট্টারাম।

কিন্তু লোকটার পেটে পেটে কুবুদ্ধি। সেদিন রাতেই সেটা টের পাওয়া গেল।

সবাই তখন অঘোরে ঘুমুচ্ছে, হঠাৎ রাঘবলালের বাপ রে–মা রে চিৎকার।

মুরলী লাফিয়ে উঠল। বৃন্দা সিং, কিষণলাল, চামরি সিং, হনুমান প্রসাদ–যে যেখানে ছিল, টর্চ লাইট আর লাঠি-সোঁটা নিয়ে দৌড়ে এল। সেই বাঘটাই পিছে পিছে এসে চড়াও হল নাকি রঘুর ওপর।

–ক্যা হুয়া? ক্যা হুয়া?

–আমার গায়ের ওপর কী একটা জানোয়ার এসে লাফিয়ে পড়ল।

–জানবর? কাঁহা জানর!–বৃন্দা সিং খাঁটিয়ার তলায় টর্চ ফেলতেই দেখা গেল সেটাকে। প্রকাণ্ড একটা কোলা ব্যাঙ। রেগে বেগুন হয়ে বসে আছে আর ড্যাবড্যাব করে তাকাচ্ছে। তার কায়দাই আলাদা।

এই জানোয়ার! সবাই হেসে লুটোপুটি হল। আর এবারে সব চাইতে বেশি হাসল ভুট্টারাম।

–হো দেখা কেইসা পালোয়ান ব্যাঙের ভয়ে মুছা যায়! হাহা! ও আবার বাঘ মারবে। তুফানসে কৌয়া গিরে, মৌলা বোলে–

বৃন্দা সিং ব্যাঙটার ঠ্যাং ধরে বাইরে এনে ভেতর ছুঁড়ে ফেলে দিলে। তারপর ধমক দিয়ে বললে, এতনা রাতমে হল্লা মত করো, সব কোই আব শো যাও।

সবাই শুতে গেলে মুরলী এসে বসল রঘুয়ার খাঁটিয়ায়। চুপি চুপি জিজ্ঞেস করলে, ব্যাঙটা এই ঘরের মধ্যে কেমন করে এল রে রঘুয়া?

–সে আমি কী করে জানব ভাই?

–বুঝলি, এ হচ্ছে ও বিচ্ছটার কাজ। ওই ভুট্টারামই বাইরে থেকে ওটাকে ধরে এনে তোর গায়ের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছে। তুই যে বাঘটাকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিস আর সবাই তোকে ভালো বলছে, এ ওর প্রাণে একেবারেই সইছে না। তাই সর্দারের কাছে তোকে বুন্ধু। বানাবার জন্যে কাণ্ডটা করেছে।

–ভুট্টারাম আমাকে একেবারেই দেখতে পারে না ভাই।–রঘু কাঁদো কাঁদো হল।

–দাঁড়া, ওকে মজা দেখাচ্ছি। কাউকে কিছু এখন বলিসনি, কাল রাত্তিরে এর বদলা নেব।

পরদিন বিকেলে লাঠি খেলা হয়ে গেলে রাঘবলাল যখন কোদাল নিয়ে কুস্তির জায়গায় মাটি কোপাচ্ছে, তখন কাউকে কিছু না বলে চুপি-চুপি বনের একদিকে চলে গেল মুরলী। ঝোঁপের ভেতর এক জায়গায় তার দরকারি গর্ত দেখেছে একটা। ফিরল অন্ধকার হলে–সকলের চোখ এড়িয়ে। দুটি ছোট-ছোট ঝাঁপির মতো নিয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে যে কী লুকিয়ে নিয়ে এল রাঘবলালও তা জানতে পারলে না। কিন্তু জানল ভুট্টারাম। সেই মাঝরাত্তিরেই।

–জান গিয়া–জান গিয়া–মার দিয়া! সে কী বিকট চিৎকার! যেন সাতটা ষাঁড় এক সঙ্গে হাঁকাহাঁকি করছে ভুট্টারামের গলায়!

–কৌন মার দিয়া? কিসকো মার দিয়া? কেইসে মার দিয়া?

আবার দলবল নিয়ে, তেমনি লাঠি ঠ্যাঙা বাগিয়ে ছুটে এল বৃন্দা সিং। খাঁটিয়ায় বসে পরিত্রাহি চ্যাঁচাচ্ছে ভুট্টরাম। আট-দশটা লম্বা লম্বা কাঁটা বিঁধে আছে তার গায়ে, আর সে সমানে চিৎকার করছে : একদম মার দিয়া–জান মে মার দিয়া–

সবাই ব্যাপারটা ভালো করে বোঝবার আগেই ছোট একটা শজারু কিষণলালের পায়ের তলা দিয়ে ঝুমঝুম করে কাঁটা বাজাতে বাজাতে খোলা দরজা দিয়ে সুড়ৎ করে বাইরে নেমে গেল।

.

আট

এমনি করে সুখে-দুঃখে রাঘবলালের আরও কিছুদিন কাটল। কিন্তু মনের অস্বস্তি যেন কিছুতেই কাটে না। বৃন্দা সিং আর তার দলবলের মতিগতি কিছু বোঝা গাচ্ছে না। আপাতত বেশ আছে; রুটি পাকাচ্ছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে, ভালো মানুষের মতো দূরের গঞ্জে গিয়ে এটা-ওটা কিনে আনছে, আর এক-একদিন বেশ ঢোল বাজিয়ে প্রাণ খুলে গান গাইছে। আর রঘু কুস্তি করছে, লাঠি খেলছে, ডন-বৈঠক দিচ্ছে। এর মধ্যেই তার থলথলে ভুড়ি উধাও হয়েছে, গোলগাল মুখ ভেঙে চওড়া হয়ে উঠেছে চোয়ালের হাড়, ছাতি বেড়ে গেছে অনেকখানি, হাতের গুলি শক্ত হয়ে উঠেছে। এখন কিষণলাল তার সঙ্গে লাঠি খেলে, রঘু যখন ডান হাতে বাঁ হাতে চারের মতো ঘুরিয়ে তার মার আটকায়–তখন কিষণলাল খুশি হয়ে বলে, বহুৎ আচ্ছা-বহুৎ আচ্ছা।

আর মুরলী সবচেয়ে খুশি।

বলে–রঘুয়া, আর-একটু বড় হলে তুই আমাদের সব চাইতে জোয়ান হয়ে উঠবি। কেউ দাঁড়াতে পারবে না তোর সঙ্গে। এসব ভালো–খুব ভালো। কিন্তু–

কিন্তু যেই রাত হয়, বনের ওপর কালো ছায়া নামে, তারপর গাছপালাগুলো অন্ধকারে ভুতুড়ে হয়ে যায়, তখন রাঘবের মনের ওপরেও ছায়া পড়তে থাকে। আরও রাত বাড়ে, ঝাঁ ঝাঁ করে ঝিঁঝির ডাক উঠে সমস্ত বনটাকে যেন করাতের মতো চিরতে থাকে। কোথায় কীসব পাখি ডাকে কু কু কুক! মোটা গলায় মধ্যে মধ্যে হুতোম প্যাঁচা সাড়া তোলে, শেয়ালের আলাপ আসে, আর কখনও কখনও সব ছাপিয়ে অনেক দূরে গুমগুম করে শোনা যায় বাঘের ডাক।

সেই তখন—

রাঘবের ভয় করে? না!

কান্না পায়। মার কথা মনে পড়ে, বাবার জন্য ভারি কষ্ট হয়। বাবার যেসব কথা সে তখন শুনেও শুনত না, সেইগুলোও তার কানে বাজতে থাকে : তুই আমার একমাত্র ছেলে, তোর ওপরেই তো আমার সব ভরসা। দুদিন পরে বুড়ো হয়ে যাব–দোকানপাট আর। দেখতে পারব না–তখন তুই ছাড়া কে আমার পাশে এসে দাঁড়াবে? কে আমাদের দেখবে? কে দুমুঠো খেতে দেবে? তুই মানুষের মতো মানুষ হ–তোকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করবার জন্যে আমার শেষ পয়সাটা অবধি আমি খরচ করব।

আরও মনে পড়ে, ক্লাসে মাস্টারমশাই বিলেতের কোন এক বড়লোকের গল্প বলেছিলেন। তাঁর বাবাও ছিলেন সামান্য দোকানদার। একদিন তাঁর অসুখ করেছিল, ছেলেকে বললেন, তুই আজ দোকানে যা! আদুরে ছেলে জবাব দিলে, এত রোদ্দুরে আমি যেতে পারব না। বাবা আর একটি কথাও বললেন না–সেই অসুখ নিয়েই রোদের মধ্যে দোকানে চলে গেলেন। বড় হয়ে সেই ছেলেটির সেজন্যে এত অনুতাপ হয়েছিল যে রোজ দুপুরে মাথার টুপি খুলে কিছুক্ষণ রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেবেলার সেই অপরাধের শাস্তি নিত।

বাবার কথা, মাস্টারমশাইয়ের কথা তখন রঘুর এক কান দিয়ে ঢুকে আর কান দিয়ে গুলতির মতো ছিটকে বেরিয়ে অন্য কানে গেছে। সকালে ঘুম ভেঙেই ভাবত, এখন কী খাব। সরপুরিয়া না সরভাজা? দুপুরে থালার পাশে বারোরকম রান্না সাজানো থাকত। বিকেলে পাঁচ-সাতটা চমচম আর এক ভাঁড় রাবড়ি তো ছিল বাঁধা জলযোগ। আর রাত্তিরে খাওয়া-খাওয়া আর খাওয়া। ও-ই তখন একমাত্র লক্ষ্য, যাকে বলে ধ্যান-জ্ঞান-তপস্যা। কে শুনছে বাপের কথা,মাস্টারের কথা। চিরজীবন এমন করে খেয়েই দিব্যি কেটে যাবে।

কিন্তু রাতের বেলা বনের মধ্যে করাত চেরার মতো আওয়াজ করে যখন ঝিঁঝি ডাকে, যখন বাঘের ডাকে সমস্ত বলরামপুরের জঙ্গল গুমগুম করে ওঠে, যখন একা খাঁটিয়ায় রাঘবলালের আর ঘুম আসে না–তখন তার চোখ দিয়ে জল পড়ে। তারও সেই টুপি খুলে রোদ্দুরে। দাঁড়াবার মতো একটা কিছু করতে ইচ্ছে হয়। যদি সে কোনওদিন বাড়ি ফিরতে পারে তা হলে খাওয়ার কথা আর ভাববে না। বাবার কথা শুনবে-লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে চেষ্টা করবে।

অথচ, ফিরতে সে কি কোনওদিনই পারবে আর? বৃন্দা সিংয়ের চোখ এখন হাজার হাজার জোনাকি হয়ে পাহারা দেয়–এই বন থেকে সে প্রাণ নিয়ে বেরুতে পারবে না। ভয়টা আরও ঘন হয়ে রাঘবের বুকে চেপে বসতে চায়, যখন অনেক রাত পর্যন্ত গোল হয়ে বসে। দলবল নিয়ে বৃন্দা সিং চাপা গলায় ফিসফিসিয়ে আলোচনা করে। তখন ওদের মুখগুলোকে মানুষের বলে বোধ হয় না–বাঘের মতো দেখায়।

রাঘব বুঝতে পেরেছে, ওরা কী একটা ভয়ঙ্কর ডাকাতির মতলব আঁটছে। আর তখনই রঘুর রক্ত আতঙ্কে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তার জীবন ডাকাতের দলের কাটবে। যারা মানুষ মারে, লুট করে! ফাঁসির আসামী হয়–দীপান্তরে যায়!

মুরলীকে জিজ্ঞেস করে : কী করি ভাই?

মুরলী বলে, জানি না।

–চল না, পালাতে চেষ্টা করি।

–কালী মাঈজীর মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বলি দিয়ে দেবে।

–সেও ভালো। কিন্তু কিছুতেই ডাকাত হতে পারব না!

মুরলী একটু চুপ করে থাকে। ওর চোখ দুটো ছল-ছল করে।

–পালিয়েই বা কী হবে? তোর নয় ঘর আছে–আমার কে আছে? আমি কার কাছে থাকব?

–কেন, আমাদের বাড়িতে যাবে। আমার মা বাবা খুব ভালো লোক, তোমাকে কত আদর করবে–দেখে নিয়ো।

মুরলী আবার চুপ করে থাকে। তারপর বলে, না সর্দারকে ছেড়ে আমি যাব না।

–তুমি সর্দারকে ভক্তি করো? ওইরকম ভয়ঙ্কর লোকটাকে?

–জানি না। খুব ছোটবেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। কোন্ গ্রাম–বাপের নাম কী, কিছুই মনে নেই। কিন্তু সেই থেকে সর্দার আমায় মানুষ করেছে। নেমকহারামি করতে পারব না আমি।

রাঘব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মুরলীর দিকে। এই ছেলেটাকে সে বুঝতে পারে না।

এমন সময় হয়তো দাঁত বের করে এসে হাজির হয় ভুট্টারাম। লোকটাকে দেখলে গা জ্বলে যায়।

–কী মতলব আঁটা হচ্ছে দুজনে? খইনি-খাওয়া কালোকালো দাঁত দেখিয়ে ভুট্টারাম জানতে চায়। মুরলী বলে, তা দিয়ে তোমার কী দরকার?

–দরকার কিছুই নেই, কিন্তু এই রঘুয়াটা ভারি বদমাশ। একদিন আমি ওর বদন বিগড়ে দেব।

রঘু মুরলীর পাশে সরে আসে। মুরলী বলে, কেন, কী করেছে ও?

–আমার গায়ে শজারু ছেড়ে দিয়েছে।

–আর তুমি ওরু খাঁটিয়ায় ব্যাঙ ছেড়ে দাওনি?

–চুপ রহো–ভুট্টারাম খইনি-খাওয়া দাঁতগুলোকে খিঁচিয়ে বলে : তু ভি পহেলা নম্বর কা বিচ্ছু!

–একদম জানসে মার দেগা।

–তো আও—

ভুট্টারাম নাক ফুলিয়ে গরগর করে ওঠে। একবার হাঁটু দুটো থাবড়ে তৈরি হয় কুস্তিগিরের মতো, তারপর বুনো মোষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় ওদের দিকে।

ঠিক তক্ষুনি চেঁচিয়ে ওঠে মুরলী।

–হাঁ হাঁ–দেখো দেখো ভুট্টারাম! তোমার পায়ের কাছে একটা কাঁকড়া বিছে।

–আরে বাপ! বলে ভুট্টারাম তিড়িং করে লাফ মারে একটা, আর সঙ্গে সঙ্গে শুকনো ডাঙাতে পা পিছলে দড়াম করে রাম-আছাড়।

তখন রঘু আর মুরলীকে কে পায়? হাসতে হাসতে দুজনে টেনে দৌড়। আর ওদের ধরতে না পেরে পেছন থেকে চেঁচিয়ে গাল দিতে থাকে ভুট্টারাম : একদম মার দেগা–জান লে লেগা–টিকি উখার দেগা। ই বাত হম আভি কহ দেলা—হুঁ–হুঁ।

.

দুপুর বেলা কে যেন কোন দিকে চলে যায়, রঘু বুঝতে পারে না। এই পোড়ো বাড়িটা অন্তত ফাঁকা হয়ে যায় তখন। কিষণলাল কি ভুট্টারামের মতো দু-একজন হয়তো বা খাঁটিয়া পেতে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোয়। বাকি মানুষগুলোর কোনও পাত্তা পাওয়া যায় না। এমন কি মুরলী পর্যন্ত কোথায় যেন কোন দিকে চলে যায়। তখন রঘু আপন মনে বেড়াতে বেরোয়।

খুব ঘন বন যেদিকে–সেদিকে যায় না। সেই চিতাবাঘটার কথাটা এখনও মনে আছে তার–সে কি সহজে ভোলবার মতো? মানুষের পায়ে-চলা পথ লক্ষ করেই সে এগোয়। দেখে ফুল ফুটেছে, পাখি ডাকছে, খরগোশ ছুটে পালাচ্ছে। রঘুর মনে পড়ে স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটাকে। গঙ্গার ধার দিয়ে লাল কাঁকরের পথ–তার দুধারে ঝাউয়ের শোঁ শোঁ আওয়াজ আর কৃষ্ণচূড়ার ফুলে একাকার।

সব এখন স্বপ্নের মতো লাগে।

আজও রঘু এমনি করে নিজের মনে চলেছিল। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

এ কী! এ কোথায় এল সে।

একটা পুরনো মন্দির, তার গা বেয়ে বটগাছ উঠেছে। তবু মন্দিরটা বেশ পরিষ্কার মনে হয়, লোকের আসা-যাওয়া আছে এখানে। মন্দিরের সামনেই একটা দিঘি, পদ্মফুলে আর কলমি শাকে ছাওয়া। আট-দশটা ফাটল-ধরা সিঁড়ি নেমে গেছে সেই দিঘিতে।

বেশ জায়গাটা তো।

রঘু গুটিগুটি পায়ে মন্দিরের দিকে এগোল, ভেতরে আধো-অন্ধকার। তবু রঘু দেখতে পেল বেদীর ওপর কালো পাথরের কালীমূর্তি। লকলক করছে লাল টকটকে জিভ–চোখ দুটি কিসের তৈরি কে জানে–যেন ঝকঝক করে জ্বলছে। হাতে টিনের খঙ্গ নয়, আসল খাঁড়া একখানা–তার এক কোপে মানুষের গলা নামিয়ে দেওয়া যায়।

তা হলে এই সেই বৃন্দা সিংয়ের কালী মন্দির! দরকার হলে যেখানে সে নরবলি দিতে পারে।

কালীমূর্তিকে প্রণাম করবে কি–এখান থেকে এখন ছুটে পালাতে পারলে বেঁচে যায় রাঘবলাল। কিন্তু পালাতে পারল না। কে যেন দুটো গজাল ঠুকে তার পা দুটোকে সেইখানে আটকে দিলে।

রঘু দেখল, ঠিক যেন কালীমূর্তির পেছন থেকে বেরিয়ে এল স্বয়ং বৃন্দা সিং।

–রঘুয়া! বাজের মতো গলায় বৃন্দা সিং ডাকল। রঘু কাঠ। গলা দিয়ে তার স্বর ফুটল না।

–তু হিয়াঁ আয়া কেঁও?–বৃন্দা সিয়ের চোখ দুটো আগুনের ভাঁটার মতো ঘুরতে লাগল :

কাহে?

বৃন্দা সিং যেভাবে পা বাড়াল তাতে মনে হল, এখুনি সে দুটো সাঁড়াশির মতো হাত দিয়ে গলা টিপে ধরবে। রঘু একভাবে দাঁড়িয়ে রইল–যেন তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক তখুনি রঘু চেঁচিয়ে উঠল : সর্দার, সর্দার,–তোমার মাথার ওপর সাপ।

লাফিয়ে সরে গিয়ে বৃন্দা সিং দেখে, ফাটা দেওয়ালের ভেতর দিয়ে একটা গোখোর ফণা দুলছে। আর একটু দেরি হলেই তার কপালে ছোবল বসিয়ে দিত।

তীরবেগে কালীর হাতের খাঁড়াটা খুলে নিয়ে বৃন্দা সিং–এক কোপ। সাপের মাথাটা তিন হাত দূরে ছিটকে পড়ল। আর ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়তে লাগল বৃন্দা সিংয়ের।

–তোকে মাপ করলাম। আর তুই আমার জান বাঁচালি। এ-কথা কোনওদিন আমি ভুলব না।

.

নয়

রাঘবের ভয় তখনও কাটেনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দেখছিল, কুচকুচে কালো সেই সাপটার প্রকাণ্ড শরীরটা দেওয়ালের ফাটলের ভেতর থেকে বাইরে ঝুলে পড়ছে একটু-একটু করে–তখনও থর-থর করে কাঁপছে। তার কাটা গলা দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছে। তারপর এক সময়ে ঝুপ করে এক বান্ডিল দড়ির মতো সাপটা মেঝের ওপর খসে পড়ল।

বৃন্দা সিং কয়েকটা শুকনো ফুলপাতা কুড়িয়ে খাঁড়াটা মুছে ফেলল। কালীমূর্তির হাতে সেটা আবার বসিয়ে দিয়ে এসে দাঁড়াল রাঘবের পাশে। কাঁধে হাত রেখে ডাকল : রঘুয়া!

রঘু চুপ করে রইল। সর্দার বললে, ঠিক আছে, কালী মাঈজীই আজ তোকে পাঠিয়েছিলেন এদিকে। নইলে ওই সাপটা আমার কপালেই ছোবল বসিয়ে দিত। দুনিয়ার কোনও রোজাই আমাকে বাঁচাতে পারত না।

রঘু হাসতে চেষ্টা করল, হাসতে পারল না। বুকটা তখনও সমানে ঢিপঢিপ করছে তার। সর্দার বললে, আয় আমার সঙ্গে। দুজনে বনের পথ ধরে আড্ডার দিয়ে এগিয়ে চলল।

বৃন্দা সিংয়ের কর্কশ গলাটা নরম হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞেস করল : তোর মা-বাপের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়?

রঘুর চোখে জল এসে গেল। হাতের পিঠে চোখটা মুছে বললে, হুঁ।

–ফিরে গিয়ে কী করবি?

–ভালো করে লেখাপড়া শিখব। ইস্কুলে যাব।

–বাপের দোকানে মিঠাই চুরি করে খাবি না? রসগোল্লা, মোণ্ডা, দহি, ছানার জিলাপি। তা যদি না হত, তা হলে কি সে এই বলরামপুরের জঙ্গলে এমন ভাবে এসে পড়ত! পড়ত এই ডাকাতদলের পাল্লায়?

–না, আর ও-সব খাব না।

বৃন্দা সিং হেসে বললে, কেন, অরুচি ধরে গেল?

–তা নয়। ও-সব বেশি খেলে পেটে চর্বি হয়ে যায়, বুদ্ধি মোটা হয়।

–ঠিক বাত! সর্দার একটু হাসল, তারপর গম্ভীর ভাবে কি যেন ভাবতে লাগল।

রঘু কিছুক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে চলল, শেষে আর থাকতে না পেরে ডাকল : সর্দার!

বৃন্দা সিং যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল : কী বলছিস?

–আমায় সত্যিই ছেড়ে দেবে? দেশে চলে যেতে দেবে?

–ভেবে দেখব! সর্দার আবার অন্যমনস্ক হয়ে গেল। যেন নিজের সঙ্গেই কথা কইতে লাগল সে : জানিস রঘুয়া, আমিও ইচ্ছে করে ডাকু হইনি। কোনওদিন যে আমাকে এই পেশা নিতে হবে সে কথা ভাবতেও পারিনি আমি।

রঘু অবাক হয়ে সর্দারের মুখের দিকে তাকাল।

বৃন্দা সিং বলে চলল : আমার দেশ কোথায়–জানিস? রাজস্থানে। তুই বাঙাল মুলুকে থাকিস, সে-দেশের কথা তুই ভাবতেও পারবি না। শুধু বালি আর পাথর। জল নেই বললেই চলে। ফসল একরকম হয়ই না। বড় বড় শহর আছে। রাজা আছে। বড়াবড়া শেঠজী আছে। মন্দির-মঞ্জিল আছে। কিন্তু গাঁয়ের মানুষের কষ্টের শেষ নেই। আমারও খাওয়া জুটত না। আমার মা জয়পুরে ভিখ মাঙতে গিয়ে এক শেঠজীর হাওয়া-গাড়ির তলায়। চাপা পড়ে মরে গেল। তখন আর মাথার ঠিক রইল না রাগে-দুঃখে আমি ডাকু হয়ে গেলাম। পেট ভরে যদি এক বেলাও রুটি খেতে পেতাম তা হলে সব অন্যরকম হয়ে যেত।

রঘু ভয়ে ভয়ে বললে, সর্দার! আমিও ডাকু হতে চাই না। আমায় ছেড়ে দাও।

হঠাৎ বৃন্দা সিংয়ের লাল-লাল ভয়ঙ্কর চোখ দুটো দপ দপ করে জ্বলে উঠল।

–তারপর কী করবি? বৃন্দা সিং গর্জে উঠল : পুলিশের কাছে গিয়ে বলে দিবি আমার দলের কথা? তারা আমায় ধরে নিয়ে গিয়ে ফাঁসি লটকে দিক–এই তোর মতলব?

–না সর্দার।

–না সর্দার? বাঘের ডাকের মতো ফেটে পড়ল বৃন্দা সিংয়ের গলা : গোয়েন্দা সব গোয়েন্দা! কাউকে বিশ্বাস করি না আমি। শোন রঘুয়া! তুই মুরলীর জান বাঁচিয়েছিস, আজ আমাকে বাঁচিয়েছিস। তাই এবার তোকে আমি মাপ করলাম। ফের যদি এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা বলবি, তা হলে তোকে সোজা কালী মাঈজীর মন্দিরে নিয়ে খতম করে দেব। ইয়াদ রাখনা-হুঁশিয়ার!

বলেই ঝড়ের মতো বন ভেঙে কোন দিকে এগিয়ে গেল। রাঘবলাল সর্দারকে আর দেখতেও পেল না।

কাঠ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। আশ্চর্য মেজাজ বৃন্দা সিংয়ের কিছু বোঝবার জো নেই। এই দিব্যি মিষ্টি মুখে কথা বলছে, তারপরেই হঠাৎ রেগে গোঁ গোঁ করে উঠল : তখন তার মুখ চোখের দিকে তাকায় কার সাধ্যি? মনে হতে থাকে, এখন সে জ্যান্ত মানুষ ধরে বাঘের মতো কচমচিয়ে চিবিয়ে খেতে পারে!

বেশ বলছিল, নিজের কথা, বলছিল রঘুকে সে ছেড়ে দেবে, কিন্তু একটু পরেই কী যে হল!

রঘু তাকিয়ে দেখল, আড্ডার কাছাকাছি এসে পড়েছে সে। কিন্তু এখন আর ওখানে যেতে ইচ্ছে করল না। একটা প্রকাণ্ড আমলকী গাছে অসংখ্য ফল ধরেছে, সরু সরু পাতার আড়ালে গোছায় গোছায় আমলকী সবুজ মার্বেলের মত ঝুলছে, কয়েকটা পাকা ফল ছড়িয়ে আছে তলায়। জায়গাটা পরিষ্কার দেখে রঘু সেখানে বসে পড়ল, দুটো আমলকী কুড়িয়ে নিয়ে চিবুতে লাগল অন্যমনস্কভাবে।

এখন বেলা পড়ে এসেছে। রঘুর মনে পড়ল, এই সময় তাদের স্কুলের ড্রিল পিরিয়ড। রঘু ভালো ড্রিল করতে পারত না। অ্যাটেনশন বললে ফল ইন, রাইট টার্ন বললে, লেফট টার্ন নিত। তখন তার খিদেতে নাড়ি চিনবিনিয়ে উঠেছে, কেবল ভাবছে, বাড়িতে মা আজ কী নতুন খাবার রেখেছে তার জন্যে! কিন্তু কুস্তি লড়ে, লাঠি খেলে রঘু ভাবছে, ড্রিল করার মতো এমন ভাল জিনিসও তার ভালো লাগত না–এমনি অকর্মা ছিল সে! সাধে কি ফিগার ভুল হলে ড্রিল মাস্টার ধীরেনবাবু এসে তার কান ধরে চাঁটি লাগিয়ে দিতেন?

আবার যদি কখনও ফিরে যেতে পারি। কিন্তু বৃন্দা সিং তাকে কি আর ফিরতে দেবে? ডাকু হয়েই বোধহয় তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে শেষ পর্যন্ত।

–আব তুমকো মিলা—

রঘু চমুকে তাকাতেই দেখল, সামনে ভুট্টারাম দাঁড়িয়ে। রঘু উঠে পড়ল। আর কতগুলো উঁচু-উঁচু বিশ্রী দাঁত দেখিয়ে ভুট্টারাম বললে, সেদিন তো খুব চালাকি করে পালিয়ে গেলি মুরলীর সঙ্গে। এখন যদি তোকে পিটিয়ে তুলোধুনো করি–কী করবি?

সে-রাঘবলাল আর নয়–যে প্যাঁচার ডাকে মূছা যেত। ভুট্টারামের কথায় তার গা জ্বলে গেল।

–তুমি আমায় মারবে কেন?

–তুই আমার খাঁটিয়ায় শজারু ছাড়লি কেন? আমার পিঠ ফুটো হয়ে গেছে।

রাঘবের বলতে ইচ্ছে হল, তোমার তো গণ্ডারের চামড়া, দুটো শজারুর কাঁটায় আর কী হয় তোমার? কিন্তু সে-কথা না বলে সে জবাব দিলে : তুমি আমার গায়ে ব্যাঙ দিয়েছিলে কেন?

ভুট্টারাম দাঁত খিঁচিয়ে বললে, বেশ করেছি। এখন তোকে মেরে আমি হালুয়া করে দেব। দেখি কে বাঁচায়।

রঘু মাথা সোজা করে বললে, খবর্দার!

–খবর্দার! আচ্ছা, দেখো তব—

দুটো হাত সামনে ছড়িয়ে নিয়ে ভুট্টারাম ঝাঁপিয়ে পড়ল রঘুর ওপর। রঘু অমনি কাঠবেড়ালির মতো সড়াৎ করে সরে গেল, আর ভুট্টারাম সোজা গিয়ে ধাক্কা খেল আমলকী গাছটার সঙ্গে। চেঁচিয়ে উঠল : আরেঃ বাপ!

রঘু আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।

ভুট্টারাম আনন্দে হেসে উঠল। উঁচু-উঁচু দাঁতগুলো চকচক করে উঠল তার। ছোরাটা তুলে সে রঘুর দিকে এগিয়ে গেল–এখুনি ওর বুকে বসিয়ে দেবে।

প্রাণের দায়ে চেঁচিয়ে উঠল রঘু : মুরলী–মুরলী–ভেইয়া–

–কোই নেহি। কোই তুমকো নেই বঁচায় গা–দাঁতে দাঁত ঘষে ভুট্টারাম ছোরাটাকে বাগিয়ে ধরল, কিন্তু ছোরা আর নামল না। তার আগেই কে তার হাত মুচড়ে ধরল। যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠল ভুট্টারাম, ছোরাটা মাটিতে পড়ে গেঁথে গেল।

রঘু দেখল, বৃন্দা সিং দাঁড়িয়ে।

বৃন্দা সিং একটা প্রকাণ্ড চড় বসিয়ে দিল ভুট্টারামের গালে। ঢাকের চামড়া ফেটে যাওয়ার মতো আওয়াজ উঠল একটা। আর একটা চড় পড়ল, তারপরেই ভুট্টারাম লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল মাটির উপরে।

কিন্তু শুয়ে থাকতেও পারল না। একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে সর্দার তক্ষুনি দাঁড় করাল তাকে। ভুট্টারামের চোখ দুটো বোজা, সারাটা শরীর তার টলছে। মুখটা ফাঁক হয়ে আছে, রক্ত দেখা যাচ্ছে দাঁতের গোড়ায় গোড়ায়।

সর্দার বললে, শাবাশ রঘুয়া। সব দেখেছি আমি। চল এখন আমার সঙ্গে। আগে ভুট্টারামের বিচার হবে, তারপর দুসরা কাজ।

আজ রাতেই এই বদমাশকে আমি বলি দেব।

ভুট্টারাম সেই অবস্থায় হাউহাউ করে কেঁদে উঠল।

–সর্দার মুঝে মাপ–

–মাপ! কভি নেহি! এই বাচ্চার সঙ্গে কুস্তিতে হেরে গিয়ে তুই ছোরা বের করিস। চোট্টা, ডর-পোক বদমাশ কাঁহাকা! তোর মতো লোক সঙ্গে থাকলে বৃন্দা সিংয়ের দলের বদনাম। তোকে আমি সাবাড় করে দেব।

–সর্দার!

–চোপ রহো! টুটি চেপে ধরে যেমন করে বেড়াল ইঁদুরকে ঝাঁকুনি দেয়, তেমনি করেই সর্দার তাকে ঝাঁকি দিলে। বললে, তোকে মরতে হবে। জরুর।

আর তখন রাঘবলালই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বৃন্দা সিংয়ের পায়ের কাছে।

–সর্দার, তোমার পায়ে পড়ছি, ভুট্টারামকে এবার মাপ করে দাও।

বৃন্দা সিং রঘুর দিকে তাকাল। আর রক্তমাখা দাঁতগুলো বের করে ট্যারা-ট্যারা চোখ দুটোকে মেলে ধরে স্বয়ং ভুট্টারাম হাঁ করে চেয়ে রইল রঘুর দিকে–সমস্ত ভয়-ডর ব্যথা ভুলে গিয়েই।

এমন অসম্ভব ঘটনা জীবনে সে কখনও দেখেনি।

.

দশ

ভুট্টারামের ব্যাপারটা নিয়ে খুব হইচই হল খানিকটা, আর বৃন্দা সিংয়ের আড্ডায়, রঘুর খাতিরও বেড়ে গেল সাংঘাতিক। বাচ্চা তো কেয়া–দেখা? ভুট্টারামকে কেউ পছন্দ করত না। লোকটার মন ভারি নীচ, আর ভয়ঙ্কর কুঁদুলে। কিন্তু সহজেই পার পেল না ভুট্টারাম।

প্রথমে তো রঘুর কাছে মাফ চাইতে হলই, তারপর দলের মধ্যে থেকে অকারণ গণ্ডগোল বাধানোর জন্যে তাকে পুরো তিন হাত টেনে নাক খত দিতে হল : ম্যায় ক্যায়সা কাম কভি নেহি করুঙ্গা–কভি নেই করুঙ্গা–

তবু আর রাগ রইল না ভুট্টারামের। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল, রঘুর দয়াতেই এ-যাত্রা প্রাণে বেঁচে গিয়েছে সে। নইলে যেরকম খেপে গিয়েছিল বৃন্দা সিং, তাকে নরবলি দিয়েই ছাড়ত।

সেদিন রাতের বেলা ঘরে রঘুকে একা পেয়ে ভুট্টারাম গুটিগুটি পায়ে হাজির হল তার কাছে। এ-ভাই রাঘবলাল।

ভুট্টারামের এমন চিনিমাখানো মিহি গলা যে থাকতে পারে এর আগে তা কখনও ভাবাই যায়নি। হাঁড়িচাঁচার মতো বিশ্রী আওয়াজে সে বরাবর চোখ পাকিয়ে ডেকেছে : রঘুয়া!

কিন্তু গলার মোলায়েম আওয়াজে রঘুর সন্দেহ গেল না। সাবধান হয়ে খাঁটিয়ার ওপর সোজা পিঠ খাড়া করে বসল। ভুট্টারামকে বিশ্বাস নেই–কী মতলব সে আঁটছে কে জানে!

রঘু বলল, কী চাই আবার?

ভুট্টারাম আবার সেই চিনিমাখানো আওয়াজে জানাল যে, বিশেষ কিছুই সে চাইতে আসেনি, রাঘব আজকে সর্দারের হাত থেকে তাকে বাঁচিয়েছে। এই কৃতজ্ঞতাটাই সে ভুলতে পারছে না কিছুতেই।

-ঠিক আছে, যাও।

-না ভাই রাঘবলাল, এ-শুধু মুখের কথা নয়। তোমার দয়ার কথা ভেবে আমি তোমায় কিছু উপহার দিতে চাই।

সে কী! উপহার?

কুতার ভেতর থেকে একটা আঙটি বের করে ভুট্টারাম বললে, ইঠো তোম্ লে লো ভাইয়া! হাঁ মামুলি সোনেকা চিজ।

–আমি সোনার আঙটি দিয়ে কী করব?

–রাখবে তোমার সাছে। সকলকে বলবে, ভুট্টারাম মুঝে ই আঙগোটি দিয়া।–বলো জোর করেই রঘুর হাতে গুঁজে দিলে আঙটিটা। রঘু বুঝতে পারল, তাকে উপহার দিয়ে ভুট্টারাম সর্দারের নেকনজর ফিরে পেতে চায়।

–এ তুমি কোথায় গেলে?

–এক ডাকাইতিসে মিলা থা। এক আউরত কি হাথসে ছিন লিয়া। ভুট্টারাম হাসল।

অর্থাৎ ডাকাতি করে পেয়েছিল আর একটি মেয়ের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিল।

ভুট্টারাম চলে গেলে আঙটিটার দিকে চেয়ে বসে রইল রাঘবলাল। আঙটিতে একটা লাল পাথর ছিল, সেটি যেন এক ফোঁটা রক্তের মতো হয়ে জ্বলতে লাগল তার সামনে। একজনের কত আশার জিনিস এই আঙটি–সেটা জোর করে কেড়ে এনেছে। কে জানে তাকে মেরেও ফেলেছে কি না–যা নিষ্ঠুর লোক ভুট্টারাম। রঘুর চোখে জল এল।

এই আঙটি হাতে পরবে সে–এমন পাপের জিনিস! নিজের ভবিষ্যতের চেহারাটা যেন আঙটিটার ভেতর দেখতে পেল সে। সেও ডাকাত হবে–খুনী হবে–এমনি করে পরের জিনিস কেড়ে নেবে।

রাঘবলাল আর সইতে পারল না। আঙটিটা যেন হাতের মধ্যে আগুনের মতো জ্বলতে লাগল তার। ওটাকে সে অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যেই ছুঁড়ে ফেলে দিলে।

.

রাত তখন কত কেউ জানে না। বনের ওপর থমথম করছে অন্ধকার। আকাশে মেঘ হয়ে গুমট করে আছে–একটা পাতা পর্যন্ত নড়ছে না কোথাও। শুধু করাত দিয়ে কাঠ-চেরার মতো আওয়াজ তুলে ঝিঁঝি ডাকছে, পাখির ছানারা ঘুমের মধ্যে চমকে চমকে উঠছে কখনও। একটু আগেই শেয়ালের ডাক উঠেছিল, অনেক দূর থেকে গুম গুম করে বেজে উঠেছিল বাঘের গর্জন। কিন্তু এখন কিছুই শোনা যাচ্ছে না আর।

গরমে ঘেমে-নেয়ে রাঘবলল অঘোরে ঘুমুচ্ছিল। স্বপ্ন দেখছিল, শনিবার তাড়াতাড়ি স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, দুপুরবেলা, বই-খাতা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসছে সে। রাস্তায় ধুলো উড়ছে–আমের মুকুল থেকে গন্ধ উঠছে–একটা বকুল গাছের তলায় অনেকগুলো ফুল লাল হয়ে শুকিয়ে আছে।

সেই সময় কে তার কানে কানে ডাকল : রঘুয়া। স্বপ্নের ঘোরে রঘু ভাবল, মা। কিন্তু স্কুলের রাস্তায় মা কেমন করে আসবে?

আবার ডাক এল : রঘু!

রঘু ধড়মড় করে উঠে বসল। না, স্কুলের রাস্তা নয়। বলরামপুরের জঙ্গলে, সেই ভাঙা বাড়ির ঘরটায় মিটমিট করে জ্বলে একটা লণ্ঠনের আলো। পাশের খাঁটিয়ায় মুরলী অঘোর ঘুমে মগ্ন। তাকে আস্তে আস্তে ঠেলা দিয়ে ডাকছে তার গুরু কিষণলাল।

–কী হয়েছে গুরুজী?

–আও মেরা সাথ।

কোথায় যেতে হবে? হঠাৎ রঘুর দারুণ ভয় ধরল। সেই কালী মন্দিরে তাকেই বলি দিতে নিয়ে যাবে নাকি এখন?

কিছুই তো বলা যায় না–সর্দারের মেজাজকে একেবারেই বিশ্বাস নেই।

কিষণ হাসল : আও, কুছ ডর নেহি!

রঘু উঠে এল। তখনও চোখ থেকে ঘুমের ঘোরটা তার ভাঙেনি, তখনও আতঙ্কে বুকের ভেতরটা তার হাপরের মতো ওঠা-পড়া করছে।

কিষণলাল রঘুর হাত ধরে বললে, সর্দার বোলায়া।

–কেন?

–জরুরি কাম হ্যায়। আও!

কিষণলাল ভরসা দিল বটে, তবে রঘুর পা কাঁপতে লাগল। একটা পুতুলের মতোই কিষণলালের পেছনে পেছনে সর্দারের ঘরে এসে ঢুকল সে।

ঘরের মেঝেতে গোল হয়ে বসেছে দলের সব বড়বড় জোয়ান। মাঝখানে বৃন্দা সিং। চাপা গলায় আলাপ চলছে তাদের মধ্যে।

রঘুকে দেখে সর্দারের চোখের দৃষ্টি যেন স্নেহে কোমল হয়ে গেল। বললে, আও বাচ্চা পাহালওয়ান, বৈঠো।

দলের সবাই হেসে উঠল।

রঘু ভয়ে ভয়ে বসে পড়ল কোনায়। এই সব চাঁইদের বৈঠকে কেন যে তাকে ডাকা হয়েছে তা সে বুঝতে পারল না। চিরদিনই সে আর মুরলী এসবের বাইরে থাকে।

সদর গম্ভীর হয়ে ডাকল :রঘুয়া।

–কহিয়ে সর্দার! দলে থাকতে থাকতে হিন্দীটা কিছু কিছু রপ্ত হয়ে এসেছে রাঘবের।

–তোমার সাহস আর বুদ্ধি দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। তাই একটা বড় কাজের ভার দেব তোমায়।

কিষণলাল রঘুর পিঠ চাপড়ে দিলে।

–শাবাশ রঘুয়া। সর্দার ডেকে কাজের ভার দিচ্ছে–আজ তুই জাতে উঠে গেলি।

সর্দার বললে, বলরামপুরের জঙ্গলে এই দুমাস আমরা কুটমুট বসে নেই। একটা বহুৎ ভারি মতলব আমাদের। সব ঠিক হয়ে গেছে এবার। কাল রাত দুটোর সময় ডাক-গাড়ি এই জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাবে, তখন আমরা সেটা লুট করব।

রঘুর চোখ কপালে উঠল।

সর্দার আস্তে আস্তে বলে চলল : সে তো এমনিতে হবে না, সে-গাড়ি উল্টে দিতে হবে, অ্যাকসিডেন্ট হবে–দুচারশো আদমি মরবে–সেই মওকায় আমরা লুট করে নেব সব।

সারা ঘরটা স্থির হয়ে রইল, একটা কথা বলছে না কেই। কেবল বাইরে থেকে একটানা করাত-চেরার মতো ঝিঁঝির ডাক উঠছে। লণ্ঠনের আলো বৃন্দা সিংয়ের প্রকাণ্ড মুখোনার ওপরে, ঠিক একটা রাক্ষসের মতো দেখাচ্ছে তাকে।

–তাই,–সর্দার বলে চলল : লাইনের জোর খুলে দিতে হবে, ফিসপ্লেট সরাতে হবে। ব্যস–কাম পাকা।

দলের একজন আনন্দে বলে উঠল : আউর ডাক-গাড়ি কী দৌড় ভি খতম! বহুৎ রুপিয়া মিল জায়েগা সর্দার–সোনা চাঁদি ভি আ জায়গা।

–হাঁ, আয়েগা। উসি ওয়াস্তে–সর্দার আবার রঘুর দিকে তাকাল। তুমি কাল যাবে তেওয়ারির সঙ্গে। ফিসপ্লেট সরাতে হবে, ওর সঙ্গে কাজে হাত লাগাবে তুমিও। এই কাজই তোমাকে দিলাম। ইয়াদ রাখনা–তোমাদের কাজের ওপরেই ভরসা–মেল-গাড়ি যদি বেরিয়ে যায়, সব বরবাদ হয়ে যাবে। কারণ, এই জঙ্গলে আর আমরা বেশি দিন থাকতে পাব না–ডেরা ডান্ডা তুলতে হবে আমাদের। ক্যা রঘুয়া, পারবে তো?

কিষণলালই রঘুর হয়ে জবাব দিলে। আর একবার শিষ্যের পিঠটা চাপড়ে দিয়ে বললে, জরুর। কাহে নেহি? আমি নিজের হাতে তৈরি করেছি সর্দার, দেখে নিয়ে।

কিন্তু একটা কথাও বলতে পারল না রাঘব। সারা শরীরটা তার জমে পাথর হয়ে গেল, কপাল বেয়ে দরদর করে নামতে লাগল ঘামের স্রোতে। মনে হতে লাগল, যেন হাত-পা বেঁধে তাকেই কেউ একটা ছুটন্ত মেল-ট্রেনের চাকার তলায় ফেলে দিয়েছে।

.

এগারো

সমস্ত দিনটা রঘুর যে কী ভাবে কাটল, সে শুধু রঘুই জানে। রাত্রে যখন সর্দারের ঘর থেকে সে বেরিয়ে এসেছিল তখন তার সামনে সারা পৃথিবীটা ঘুরছে। সবাই যত বলছে, শাবাশ রঘুয়া, ততই তার হাত-পা পেটের মধ্যে ঢুকে যেতে চাইছে।

সর্দার তাকে সম্মান দিয়েছে। এমন বাচ্চা বয়সে এত বড় খাতির এর আগে কেউ পায়নি–এমন কি মুরলীও না। ভুট্টারাম তো ওদের চাইতে বেশ বড়, তবু তাকে কোনও বিশেষ কাজে সচরাচর ডাকা হয় না। আর রাঘব এই দুমাসের মধ্যেই একেবারে সর্দারের নিজের লোক হয়ে গেছে, কিষণলাল তো তার নাম করতে অজ্ঞান!

কাজটা কী? সব চাইতে দরকারি কাজ–অর্থাৎ মেল-ট্রেন আসবার একটু আগেই লাইনের জোড় খুলে দিতে হবে। তারপর গাড়িটা উল্টে পড়বে, কয়েকশো মানুষের প্রাণ যাবে, আর সেই ফাঁকে বৃন্দা সিংয়ের দলবল গাড়িটা লুট করে নেবে।

খুন? শুধু খুন নয়–কতকগুলো নিশ্চিন্ত নিরীহ মানুষ, কত বাচ্চা ছেলে, কত মা, কত বুড়োবুড়ি প্রাণ হারাবে। যারা বাঁচবে, কারও হাত কাটা যাবে, কারও পা উড়ে যাবে। এত বড় অন্যায় কি আর আছে? রাঘব কি কখনও এমন পাপ করতে পারে।

একবার ভাবল, মুরলীকে জাগিয়ে সব বলে, কিন্তু মুরলী কী করবে? সে যে কিছুতেই এ কাজ পারবে না–একথা সদাকে গিয়ে বলবার জো নেই। বৃন্দা সিংয়ের হুকুম না

পালানোটা হয়তো এখন একেবারে অসম্ভব নয়। সবাই তাকে বিশ্বাস করে, কেউ আর তার ওপর নজর রাখছে না। আজ রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, আর কালই এখানকার আস্তানা তুলে ফেলবে বলে বাড়ির সামনেও কোনও পাহারা নেই। রঘু পালাতে পারে, সহজেই পালাতে পারে এখন।

সেই কখন বন কাঁপিয়ে, শেয়ালের ডাক উঠেছিল, এখন আবার ডাকল। তার মানে, রাত দুটোর কম নয়। এই সুযোগ। এদের সঙ্গে দুমাস কাটিয়ে রাঘবের এখন আর রাতকে ভয় নেই। সে দেখেছে মানুষের চাইতে বড় কেউ নয়, দুনিয়ার সব জন্তু-জানোয়ার মানুষকেই। ভয় করে চলে। যার গায়ে জোর আছে, মনে সাহস আছে–কোনও অন্ধকার, কোনও সাপবাঘ তার পথ আটকাতে পারে না।

রঘু নিজে খাঁটিয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওদিকের খাঁটিয়ায় মুরলী অঘোরে ঘুমুচ্ছে। এখান থেকে চলে গেলে ওর জন্যে মধ্যে মধ্যে রঘুর ভারি খারাপ লাগবে–ছেলেটা সত্যি-সত্যিই ভালোবেসেছিল ওকে। মুরলীর মা বাবা কেউ নেই, যাওয়ার কোনও জায়গা নেই, এদের। দলে থেকেই হয়তো ফাঁসির দড়িতে ঝুলবে একদিন, নইলে কালাপানিতে গিয়ে পাথর। ভাঙবে।

মুরলীকে যদি সঙ্গে করে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যায় তো কেমন হয়? যদি বাবা-মার কাছে বলে, আমার একটি ভাই এনেছি, তোমরা ওকে আমার মতো করে মানুষ করো–তা হলে কী হয়? মাকে সে জানে–মা খুশিই হবে। কিন্তু বাবা? তার বাবাও তো ভালো লোক। শহরের সবাই বলে, রামগর্জন সিং খুব সাচ্চা আদমি, সে কখনও পচা মিঠাই বিক্রি করে না, কোনওদিন কাউকে ঠকায় না। তবু রাঘব পেটুক বলেই তাকে মাঝে মাঝে গালমন্দ করত আর নেহাত সইতে পারেনি বলেই তো অমন করে একটা রামলাঠি নিয়ে তাকে তেড়ে এসেছিল। এখন সে বুঝতে পারে, কী বিশ্রী লোভী ছিল সে, আর রাতদিন পেট-পুজোর। কথা ভাবলে মানুষ কত অপদার্থ হয়ে যায়। ভালো মানুষ বলেই রামগর্জন তাকে এতদিন। বাড়িতে রেখেছে। আর কারও বাপ হলে কবে পিটিয়ে রাস্তায় দূর করে দিত।

তা হলে মুরলীকে নিয়েই যাবে সঙ্গে করে? তাদের তো কোনও অভাব নেই। মুরলী তার আপন ভাইয়ের মতোই তো কাছে থাকতে পারবে।

ডাকবে মুরলীকে?

কিন্তু ডাকতে সাহস হল না। যদি মুরলী যেতে রাজি না হয়? যদি জানাজানি হয়ে যায়। থাক, দরকার নেই।

রঘু দরজা খুলল নিঃশব্দে। বাইরে ঝিঁঝির ডাকে ঝমঝম করছে বন। কী অন্ধকার চারদিকে! আকাশে এক-টুকরো চাঁদ হয়তো ছিল, কিন্তু গভীর কালো মেঘের তলায় সেটা ডুব দিয়েছে। আর সেই অন্ধকারে হাজার-হাজার জোনাকির সবুজ আলো জ্বলছে আর নিবছে।

একবারের জন্যে রঘুর হৃৎপিণ্ড কুঁকড়ে গেল, মনে হল, ওরা যেন বৃন্দা সিংয়ের হয়ে লাখ-লাখ চোখ মেলে পাহারা দিচ্ছে–এখনি বিকট স্বরে আকাশ কাঁপিয়ে উঠবে–সর্দার পালাচ্ছে, পালাচ্ছে—পালাচ্ছে–

রঘু থমকে দাঁড়াল।

সর্দারের ভয়ে, আর-একটা কথা তার মনে পড়েছে।

সে তো পালাবে! কিন্তু তারপর?

সর্দারের মেল-গাড়ি লুট করা তো বন্ধ থাকবে না, লাইনের জোড় খোলবার জন্যে লোকের অভাব ঘটবে না কোথাও। তেওয়ারি তো আছেই, তার সঙ্গে সঙ্গে অন্য যে-কেউ চলে যাবে। গাড়ি ঠিকই ওলটাবে, মানুষ মরবে, আর

রঘুর মনে হল, সে তো পালাচ্ছে না–এতগুলো লোককে মরণের মুখে ঠেলে দিয়ে স্বার্থপরের মতো নিজের ঘরে চলে যাচ্ছে। কালকের মেল গাড়িতে তার বাব্রাও যে থাকবে না–একথাই বা কে জোর করে বলতে পারে? রঘু তো জানে, তার বাবাও নানা কাজকর্মে অনেক সময় রেলে চেপে কোথায় কোথায় চলে যায়।

কী করা যায়?

কোথাও থানায় গিয়ে খবর দেওয়া যায়, পুলিশের লোক ডেকে এনে বৃন্দা সিংকে দলবলসুদ্ধ ধরিয়ে দেওয়া চলে আজই। সকলেরই এই ঘুমন্ত অবস্থায়। কিন্তু তাই কি পারে রাঘবলাল? হোক ডাকাত, তবু তো বৃন্দা সিং তাকে ভালোবাসে, তাকে বিশ্বাস করে–শুধু শুধু নিমকহারামি করতে পারবে না।

তা হলে?

হঠাৎ আকাশের কালো মেঘে খানিক বিদ্যুৎ চমকাল, আর তারই সঙ্গে সঙ্গে রঘুর একটা কথা মনে পড়ে গেল। তাদের স্কুলের একজন মাস্টারমশাই ছিলেন ব্রজবাবু। ছেলেরা তাঁকে খুব পছন্দ করত আর তাঁর ক্লাসে রঘুর মতো বোকা ছেলেও কান খাড়া করে একমনে বসে থাকত।

ব্রজবাবু পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে ছেলেদের নানা গল্প বলতেন। সেই গল্পেরই একটা রঘুর মনের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠল।

একটি ছোট ছেলে দেখল, রেলের পুলটা বর্ষায় ভেঙে গেছে আর সে-খবর না জেনেই একখানা রেলগাড়ি ঝকঝক করে ছুটে আসছে সেই পুলের দিকে। তখন ছেলেটি করলে কী–

রঘুর ভাবনা যেন সঙ্গে সঙ্গে সব কথার জবাব পেয়ে গেল। না, সে পালাবে না, তার চাইতে ঢের বড় কাজ তার করবার আছে। সে কাজ শেষ না হলে তার ছুটি নেই। তার জন্যে যদি তার প্রাণ যায়–সেও ভালো।

রঘু বুক ভরে একবার বাইরের ভিজে বাতাস টেনে নিলে শ্বাসের সঙ্গে, একবার চোখ ভরে দেখল, অন্ধকারে লাখো লাখো সবুজ জোনাকি জ্বলছে। তারপর দরজাটা আবার বন্ধ করে নিজের চারপাইতে ফিরে এল। শুতে পারল না, সারা রাত ঠায় বসে রইল আর শুনল, জঙ্গলের ওপর দিয়ে ঝড়ের আওয়াজ তুলে একটা ট্রেন ছুটে যাচ্ছে।

সেই ডাকগাড়ি!

পরের দিনটা রঘুর যেন আর কাটতে চায় না। মাথার ভেতরে সমানে ঝিমঝিম করে চলল, গলা শুকিয়ে উঠলে লাগল বার বার। ভালো করে সে খেতে পারল না, মন ভরে মুরলীর সঙ্গে গল্প করতেও পারল না।

মুরলী বললে, কী হল রে রঘুয়া?

–কুছ নেহি।

আজ রাতে কী একটা ভারি কাজ হবে–মুরলী ফিসফিসিয়ে বললে, সব তৈরি হচ্ছে।

তা হলে মুরলীকে এখনও কিছু বলেনি সর্দার! রঘু চুপ করে রইল।

মুরলী আবার বললে, তোর ভয় হচ্ছে না রঘুয়া?

রাঘব আস্তে-আস্তে বললে, যা হওয়ার হবে, মিথ্যে ভয় করে লাভ কী?

–এ হি তো ঠিক বাত! মুরলী বললে, আমার অবশ্য গোড়াতে খুব ভয় করত। এখন ভালোই লাগে।

–না-হক মানুষ মারতে ভালো লাগে?

ফস করে রাঘ রাঘব জিজ্ঞেস করে বসল।

মুরলী কেমন থতমত খেয়ে গেল। বললে, না খুন-জখম নয় তবে অনেক রুপেয়া আউর জেবরাত (গয়না) মিলে–

–এই টাকা-গয়না দিয়ে কী হবে মুরলী? মুরলী একটু চুপ করে রইল। তরপর বললে, ইয়ে সওয়াল তো ঠিক হয়, লেকিন

–লেকিন?

মুরলী আবার চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। যেন কী জবাব দিবে খুঁজে পাচ্ছে বা।

রঘু বললে, এখন হাতে কোনও কাজ আছে মুরলী?

কুছ না, কুছ না। কাজকাম যো কুছ হেবে, সে তো রাতের-বেলা। এখন ছুট্টি।

–তা হলে চল, বেড়িয়ে আসি।

–কোথায় যাবি?

–বনের ভেতর।

–বনের ভেতর! যদি বাঘ আসে?

–কিছু হবে না। রঘু হাসল : ডাকুকে বাঘেও ভয় পায়।

মুরলীও হাসল : চল তা হলে।

দুজনে বেরিয়ে পড়ল। ভিজে-ভিজে কালো মাটির ওপর দিয়ে আঁকাবাঁকা পায়ে-চলা পথ–বৃন্দা সিংয়ের দলের মতোই দুজন বেপরোয়া মানুষ চলাচল করে কেবল তা দিয়ে। সরকারি জঙ্গল হলে হয়তো সরকারের লোকজনের আসা-যাওয়া থাকত, গাছের গায়ে নম্বর পড়ত, একটা জঙ্গল-অফিসও থাকত হয়তো। কিন্তু এই বনের মালিক কোন্ রাজাবাহাদুর–অনেক আগে বড় বড় সাহেবদের নিয়ে শিকার খেলতে আসতেন–এখন সেসব বন্ধ হয়ে গেছে। জঙ্গল পড়ে আছে–খুশিমতো কাঠুরিয়ারা এসে বাইরে থেকে দুটো-চারটে গাছ কাটে, কিন্তু বাঘের ভয়ে কেউ সাহস করে ভেতরে ঢোকে না। তাই বৃন্দা সিংয়ের পক্ষে একটা চমৎকার আস্তানা বলরামপুরের জঙ্গল। রাজাদের কালীবাড়িতে এখন ডাকাতেরাই পুজো চড়ায়।

দুজনে চলতে লাগল। এখানে-ওখানে থোকায় থোকায় আমলকী যেন সবুজ ফটিকের গুচ্ছের মতো দুলছে। ভাঁট ফুল ফুটেছে হলদে-লাল আরও নানারকম অজানা ফুলে ছেয়ে গেছে ঝোঁপঝাড়, মাটির বুক থেকে এক-একটা নীল আলোর মতো জেগে উঠেছে ভূঁইচাপা। কয়েকটা পলাশ-শিমুল লালে লাল। বনে বসন্ত।

রঘুর মনে পড়ল, এই সময় সরস্বতী পুজো হয়ে যায়–স্কুলের প্রতিমাকে তারা পলাশ ফুল দিয়ে ঢেকে দিত; তারপর আসত দোল। সেই আবির-পিচকারিকুম নিয়ে সারাদিন কী আনন্দ। রঘুর মাথায় টুপি পরিয়ে, গায়ে রং আর কালিঝুলি মাখিয়ে ছেলেরা তাকে হোলির রাজা সাজাত–সবাই তাকে ঠাট্টা করত। কিন্তু এখন তার মনে হল, এদের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবার দোলের রাজা সাজতে পারাও কত সুখের কত আনন্দের ব্যাপার।

মুরলী বললে, এই রঘুয়া–কী ভাবছিস?

–কিছু না।

–আয়, বসি কোথাও।

–বোস।

এক জায়গায় অনেকখানি জুড়ে প্রকাণ্ড একটা গাছ দাঁড়িয়ে। মোটা মোটা অসংখ্য শিকড় মাটি খুঁড়ে উঠেছে তার। গাছটায় ফিকে লাল রঙের ফুল ফুটেছে অজস্র; একটা মিঠে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে সারা বনে, হাওয়ায় বৃষ্টির গুঁড়োর মতো পাপড়ি ঝরছে। অসংখ্য খুদে মৌমাছির ভিড় জমেছে গাছটাতে। দুজনে তারই দুটো শিকড়ে পড়ল।

–আচ্ছা মুরলী?

–কী রে?

–আজ রাতে একটা ডাকাতি হবে কোথায়–না?

–তাই তো মনে হচ্ছে। মুরলীকে নির্বিকার মনে হল। এসবে এখন আর ওর কিছু বিশেষ আসে-যায় না, অনেকদিন ধরে দলের সঙ্গে থাকতে থাকতে ওর অভ্যাস হয়ে গেছে এ-সমস্ত।

–মানুষ মরবে?

–মরতে পারে দু-চারজন। আবার যদি কিছু গোলমাল না করে সব দিয়ে দেয়, তা হলে কাউকে কিছু বলবে না সর্দার। এদিকে সর্দারের দিল খুব দরাজ।

–আচ্ছা, দলের লোক মরে না কখনও।

–মরে বই কি ধরাও পড়ে। কভি কভি গাঁয়ের লোকের সঙ্গে জবর লড়াই ভি হয়–তখন দুদলেই পাঁচ-সাতজন ঘায়েল হয়ে যায়। এই তো তিন-মাহিনা আগে-মুরলী অন্যমনস্ক হয়ে গেল : ছারা জিলার এক গাঁয়ের মহাজনবাড়ি আমরা লুটতে গেলাম। বাড়িতে বন্দুক ছিল, গাঁওবালা আদমি ভি এসে হাজির হল। জোর লড়াই বাধল তখন। এদের পাঁচ-সাতজন খতম হল, আমাদের তিন-তিন জোয়ান ভি। মুরলীর চোখে জল এল : জানিস রঘুয়া, ফাগুলাল ছিল আমারই বয়েসী, তোর চাইতেও আমার ভারি দোস্তি ছিল তার সঙ্গে। মহাজনের গুলিতে তার পায়ে এমন চোট লাগল যে এক-পা আর চলতে পারে না। তাকে আনাও যায় না-ফেলে আসাও যায় না। পুলিশের হাতে পড়লে সব হয়তো কবুল করে দেবে। তখন সর্দার কী করলে জানিস? তলোয়ারে এক কোপে একদম জিন্দা ফাগুলালের মাথাটা কেটে নিলে, তারপর সেই মুণ্ডুটা খানিকটা দুরে দরিয়ায়

–থাক, থাক, আর বলতে হবে না- রঘু কান চেপে ধরল।

–এখন শুনতে খারাপ লাগছে, কিন্তু তোরও অভ্যেস হয়ে যাবে। হয়তো আজ রাতেই দেখছি, আমি ঘায়েল হয়ে পড়েছি–সর্দার তোকেই হুকুম দিয়ে বলবে, এ রঘুয়া, মুরলীকা শির কাট লে। তোকেও তাই করতে হবে।

–ও-কথা ছেড়ে দে মুরলী-রঘুর যেন দম আটকে এল : আচ্ছা, এই যে দল বেঁধে খুন-ডাকাতি হয়, টাকা-গয়না জোগাড় হয়, তারপর সেগুলো দিয়ে কী করে?

–কেন ভাগবাটোয়ারা হয়।

–তারপর?

–সবই নিজের নিজের ভাগ নিয়ে খরচা করে, ফুর্তি করে। তা ছাড়া যাদের ঘরবাড়ি দেশ-গাঁ আছে, তারা দো-চার মাহিনার জন্যে বাড়ি চলে যায় ভালো মানুষের মতো কাজকারবারও করে। পুলিশের ঝামেলা কম হলে আবার এসে দল বাঁধে, দুতিন মাহিনা এখানে-ওখানে ডাকাতি করে ফের ঘরে ফিরে যায়।

–ঘরে তাদের মা বাপ বহিন-ভাই বালবাচ্চা আছে?

মুরলী হাসল :হ্যাঁ অনেকেরই আছে। খালি আমি আর সর্দার একদম সাফ। তখন বৃন্দা সিং ইয়া বড় এক দাড়ি লাগিয়ে লাগিয়ে সাধু সেজে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘোরে, কোথায় কার ঘরে কেমন সোনা-দানা আছে তার খবর নেয়। আর আমি তার চেলা হয়ে পিছে পিছে বেড়াই।

–তোমাদের কথা আলাদা। কিন্তু যাদের মা বাপ ভাই-বোন ছেলে-মেয়ে আছে, তারা কেমন করে মানুষ খুন করে ভাই মুরলী?

–বললুম তো হাত দুর হয়ে যায়। তখন মুরলী মারা আর মানুষ মারায় কোনও তফাত থাকে না।

–আর ধরা পড়লে?

–ফাঁসি কা তক্তা। গলায় দড়ি পরে ড্যাং ড্যাং করে দু-মিনিট বহুৎ মজাদার নাচ। ব্যস, উসকে বাদ খেল খতম।-মুরলী হি-হি করে হেসে উঠল আবার। আর রাঘবের মনে মুরলী কী অসহ্য নিষ্ঠুর–মন বলে, মায়া-মমতা বলে ওরও বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই আর।

আজকে রঘুর প্রথম রাত। তারও প্রথম হাতেখড়ি। কিন্তু কী ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্য টদিয়ে। একজন-দুজন নয় কয়েকশো নিশ্চিন্ত নিরীহ মানুষকে খুন করে। চমৎকার।

ভাবতে ভাবতে হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে আসে! তাই, ভেবে আর দরকার নেই। যা হওয়ার হবে।

রঘু আলোচনাটা ঘুরিয়ে নিলে।

–তোর ছেলেবেলার কথা কিছু মনে নেই মুরলী? বৃন্দা সিংয়ের কাছে আসবার আগেকার কোন কথা?

মুরলী যেন চমকে উঠল। তারপর চেয়ে রইল সামনের দিকে–যেখানে পলাশের মাথাগুলো লালে লাল, যেখানে সোনালি আলোয়লতার জালে কয়েকটা কুল গাছ ঢাকা পড়ে গেলেও একরাশ লাল-হলুদ পাকা ফল উঁকি মারছে তার ভেতর থেকে। একজোড়া ঘুঘু ওদের সামনেই উড়ে পড়ে মাটি থেকে কী যেন খুঁটে খুঁটে খেতে লাগল, ওদের বসে থাকতে দেখেও এতটুকু ভয় পেল না, পাখিদের সোনা নেই, টাকা-গয়না নেই–তাই ডাকাতদের তারা ভয়ও পায় না।

–আমার ছেলেবেলা? বচ্‌পন? মুরলী যেন ঘুমের মধ্যে থেকে জেগে উঠল : একটু-একটু মনে আসে ভাই। যেন স্বপ্নের মতো লাগে। একটা ভৈষাঁর পিঠে চড়ে বাবার সঙ্গে চলেছি। পথের ধারে জলের ভেতর পদ্মফুল ফুটেছেলতায় লতায় সিঙাড়া ধরেছে। দূরে মহাবীরজীর একটা লাল ঝাণ্ডা দেখা যায় বটগাছের মাথায়–সেখানে মেলা বসেছে–এতদূর থেকেও মানুষের গলার আওয়াজ শুনি। আমি যেন বাবাকে বলি, বাবা মেলায় গিয়ে আমাকে লাড়ু আর জিলাবি কিনে দিতে হবে।

–তারপর? রঘুর চোখ চকচক করে উঠল।

–আবার দেখি,–তেমনি ঘুমভাঙা গলায় বলে চলল মুরলী : কোথায় যেন রামলীলা হচ্ছে। ঢোলক বাজছে করতাল বাজছে সীতা মাইজী নেচে নেচে গান করছে, কোত্থেকে চলে এল দুশমন রাবোয়া। সীতাজীকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর বাবার কোলে মাথা রেখে আমি ঘুমিয়ে পড়লুম।

মুরলী দীর্ঘশ্বাস ফেলল : আর কিছু মনে নেই।

–আমার মা বাবার কাছে যাবি মুরলী?

মুরলী অদ্ভুত উদাস দৃষ্টিতে সামনের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। জবাব দিল না।

–যাবি মুরলী?

মুরলী হয়তো এবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, আবার চকচক করে উঠেছিল তার চোখ দুটো। কিন্তু কোনও কথা বলবার সে সুযোগ পেল না। তার আগেই বন কাঁপিয়ে বাঘের ডাকের মতো গম্ভীর গলা ভেসে এল : মুরলী–মুরলী–

দুজনেই চমকে কান খাড়া করল। কে ডাকছে?

আবর লহরে লহরে ভেসে আসতে লাগল সেই ডাক : মুরলী–এ মুরলী? কিধার গিয়া রে তুম?

–সর্দার।

মুরলী লাফিয়ে উঠল। চল রঘুয়া, শিগগির চল। কী কাজে যেন ডাক পড়েছে।

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলল সে। সাড়া দিয়ে বললে, আতা হুঁ সর্দার, আভি ম্যায় আতা হুঁ—

রাঘব ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে চলল পেছনে পেছনে। পা দুটো তার আর চলতে চায় না। মুরলীর কাছ থেকে কথাটার জবাব পাওয়া গেল না। আর পাওয়া গেলেই বা কী লাভ হত? আজকের এই দুঃস্বপ্নের রাতটার পরে রঘুই কি আর কখনও নিজের বাবা-মার কাছে ফিরে যেতে পারবে?

দিন কাটে–রোজ যেমন কাটে। এরই মধ্যে চলল আলাপ-আলোচনা, তলোয়ারে শান দেওয়া বন্দুক পরিষ্কার করা। চাপা উত্তেজনা থমথম করছে চারদিকে। ভুট্টারাম লাফিয়ে উঠছে থেকে থেকে, বহুৎ দিনোঁকে বাদ আজ এক ভারি কাম হোগা। কিন্তু সেই ভারি কাজটা যে কী, সে তা এখনও জানে না। ভুট্টারামের লাফানি দেখে এত দুঃখের মধ্যেও হাসি পাচ্ছে রাঘবের।

একবার কিষণলাল এসে জিজ্ঞেস করল, ভয় হচ্ছে নাকি রে রঘুয়া?

–নেহি গুরুজী।

কিষণলাল বললে, বহুৎ আচ্ছা। পহেলি দফে কলিজা সবারই একটু গড়বড়ায়, কিন্তু তোর দেখছি খুব শক্ত। বড়ে খুশিকা বাত।

দিন কাটল, সন্ধ্যা নামল, রাত হল। পোড়ো বাড়িটার ঘরে ঘরে মিটমিটে আলো জ্বলল। অন্য দিন নটা বাজতে-নাবাজতে জোয়ানের দল খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে, উঠে পড়ে রাত চারটের পরেই। কিন্তু আজ আর কারও চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। সবাই তৈরি হচ্ছে।

এগারোটা–বারোটা—

তখন তেওয়ারি এসে ডাকল :রঘুয়া চল—

মুরলী অবাক হয়ে বললে, ও কোথায় যাচ্ছে?

–কাম মে! তেওয়ারি হেসে বললে : আও রঘুয়া!

রঘু বেরিয়ে গেল তেওয়ারির সঙ্গে। অবাক হয়ে চেয়ে রইল মুরলী–ব্যাপারটা এখনও সে বুঝতে পারছে না।

দুজনে দুটো টর্চ নিয়ে জঙ্গলের ভেতরে দিয়ে এগিয়ে চলল। আজও তেমনি লাখে লাখে জোনাকি জ্বলছে, চারদিকে সেই থরেথরে অন্ধকার–বনের গাছপালা কন্ধকাটার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু রঘু কিছু টের পাচ্ছিল না। ঝিঁঝির ডাক ছাপিয়ে তার কান ভরে বাজছিল নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ।

যেতে যেতে সব বুঝিয়ে বলল তেওয়ারি। রঘু শুনতে লাগল।

তেওয়ারির হাতে যে-থলেটি আছে তার মধ্যে রয়েছে হাতুড়ি, সাঁড়াশি, রেঞ্চ–এইসব। এইগুলো দিয়ে লাইনের তিন-চারটে জোড় সে খুলে দেবে। রঘু আলো ধরে তাকে সাহায্য করবে।

ব্যস, আধি ঘণ্টেকে কাম। এর মধ্যে সর্দার তার দলবল নিয়ে তৈরি হয়ে চলে আসবে। একটু পরেই আসবে ডাকগাড়ি। উসকে বাদ–ওর পরে কী যে হবে, সেটা আর তেওয়ারি বলল না। দু-তিনবার টেনে-টেনে হাসল, আর সেই হাসি শুনেই রঘুর রক্ত যেন জল হয়ে গেল।

জঙ্গল পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে দু-জনে যেখানে এল, সেখান থেকে স্টেশন প্রায় চার মাইল দূরে। এইখানটাই সবচেয়ে নিরিবিলি; এর ত্রিসীমানাতে জনমানুষেরও চিহ্ন নেই। তেওয়ারি বললে, ইধার বহুৎ শের (বাঘ) ভি হ্যায়। কিন্তু শেরাও ডাকুকে ভয় করে, তার কাছে এগোয় না।

দুপাশে ঘন বন, মাঝখান দিয়ে রেলের লাইন চকচক করেছ। চাঁদ নেই, কিন্তু আকাশ-ভরা তারার আলোয় আইন জ্বলছে, সাদা সাদা নুড়িগুলো পর্যন্ত ঝিকমিক করছে। তেওয়ারি বললে, হিয়াঁ–

তেওয়ারি বানিয়ে বলেনি। আধঘণ্টার মধ্যেই লাইন থেকে দুজনে গোটা-চারেক জোড় খুলে ফেলল, লোহার বলটুগুলোকে তেওয়ারি ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দিল বনের মধ্যে। বললে, উপরসে কুছ মালুম নেহি হোগা, লেকিন গাড়ি যব আয়েগা, তব–

কাজ শেষ করে দুজনে জঙ্গলের মধ্যে নেমে এল। খানিকটা যেতেই চোখেমুখে টর্চের আলো এসে পড়ল একরাশ।

বৃন্দা সিং দলবল নিয়ে হাজির।

–হো গিয়া?

–হে গিয়া সর্দার।

–ঠিক হ্যায়।–একবার হাতঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল বৃন্দা সিং–আউর পর (পনের) মিনট। সব কোঁই এইি বৈঠ যাও।

সব ছায়ামূর্তির মতো বসে রইল সেখানে। ঝিঁঝির ডাক বেজে চলল, বনের পাতায়-পাতায় হাওয়া উঠল, দূরে যেন বাঘের ডাকও শোনা গেল একবার। কারও মুখে কোন কথা নেই। মুরলী শুধু একবার ফিসফিস করে ডাকল, রঘু। কিন্তু রঘুকে পাশে দেখতে পেল না, কোথায় যেন উঠে গেছে সে।

ঝম্ ঝম্ ঝম্‌! চাকার আর লোহার শব্দ–একটা গভীর বাঁশির আওয়াজ। মেল ট্রেন আসছেদূরের বাঁকটা ঘুরছে। আর তিন মিনিটের মধ্যেই এসে পড়বে জোড় খোলা লাইনের ওপর।

সর্দার বললে, সব তৈয়ার?

–তৈয়ার?

ট্রেন আসছে–আরও কাছে আসছে। কিন্তু এ কী। জোড়ের মুখে আসবার ঠিক আগেই জোরালো একটা বাঁশি বাজিয়ে বিকট আওয়াজে থেমে গেল কেন? এমন তো কথা ছিল না। বারোজোড়া চোখ জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল বাঘের মতো।

ও কে? টর্চের মুখে লাল কাপড় বেঁধে এখনও লাইনের ওপর দোলাচ্ছে কে? ওই তো গাড়িটাকে ঠিক জোড়ের মুখে থামিয়ে দিয়েছে। ট্রেনের সার্চলাইটের আলোয় তাকে চিনতে আর কারও বাকি নেই।

–বঘুয়া! বেইমান!–এক মুরলী ছাড়া এগারোটা গলা একসঙ্গে গর্জন করে উঠল।

বৃন্দা সিং বন্দুক তুলল। দাঁতে দাঁত ঘষে বললে, পহেলে উসকো খতম কর দেনা–

বন্দুক তুলল, কিন্তু ট্রিগার টানতে পারল না। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, মন্দিরে সেদিন সাপের হাতে নির্ঘাত মরণ থেকে তাকে বাঁচিয়েছিল রঘু। যো জান দিয়া, উসকো জান লেনা? রামরাম। রাজপুত কখনও একাজ করতে পারে?

কিন্তু ট্রিগার টানল কিষণলাল। দুম করে শব্দ, নীল আগুনের ঝলক, তারপর একটা চাপা চিৎকার করে রঘু লাইনের ওপর লুটিয়ে পড়ল।

.

বারো

ততক্ষণে একটা বিরাট হইহই শুরু হয়ে গেছে চারদিকে।

ড্রাইভার ফায়ারম্যান সব নেমেছে, গার্ড এগিয়ে এসেছেন। ট্রেনের ঘুমন্ত যাত্রীদের কাছেও পৌঁছে গেছে খবরটা। দেখতে-দেখতে তিন-চারশো লোক জড়ো হয়ে গেছে সেখানে।

–ক্যা হুয়া?

–হোয়া দি ম্যাটার?

–কী হয়েছে কী হয়েছে?

ইঞ্জিনের দিনকরা আলোতে কী যে হয়েছে তা আর বুঝতে বাকি নেই কারও। মাত্র সাত-আট হাত আগেই লাইনের দুধারে নাট বল্ট আর ফিসপ্লেট ছড়ানো। ঠিক সময়মতো গাড়িটা থেমে না গেলে কী যে হত তা ধারণাও করা যায় না। মারাত্মক অ্যাসিডেন্ট হত–গাড়ি উল্টে পড়ত, কতগুলো মানুষের যে প্রাণ যেত কে বলতে পারে!

আর এই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা থেকে ট্রেনটাকে যে বাঁচিয়েছে সে–

যেন লাইনের ওপরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে রঘু। লাল কাপড়ে জড়ানো টর্চটা ছিটকে চলে গেছে দূরে, মাথা থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে।

কে এ? কোথা থেকে এল? ট্রেনের ড্রাইভার বলল, গাড়িটা থেমে যাওয়ার মিনিট খানেক পরেই সে বন্দুকের মতো আওয়াজ শুনেছে একটা। মনে হয়, পাশের জঙ্গল থেকে ছেলেটাকে গুলি করেছে কেউ।

পাশের জঙ্গল–তা বটে! লাইনের দু ধারে ঘন কালো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে যেন অন্ধকারের পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। সেই জমাটি কালো বনের গায়ে হাজার হাজার জোনাকির আলো লাখ-লাখ ভূতের চোখের মতো জ্বলছে আর নিবছে। ট্রেন-থেমে-যাওয়া অদ্ভুত নিস্তব্ধতার ভেতরে তীব্র স্বরে ঝিঁঝির ডাক উঠছে-মনে হচ্ছে যেন হাজার করাত চালিয়ে আকাশটাকে কারা টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতে চাইছে।

কে একজন শুকনো গলায় বললে, এ বলরামপুরের জঙ্গল। বাঘ-ভালুক আছে–ভয়ানক জায়গা।

কিন্তু এই ভয়ঙ্কর জঙ্গলের ভেতর কোথা থেকে এল এই ছোট ছেলেটি–ট্রেনটাকে এমন সাংঘাতিক অপঘাত থেকে বাঁচিয়ে দিলে? আর বনের মধ্যে থেকে কেইবা তাকে গুলি করে বসল?

চারদিকে তাকিয়ে গাড়ির তিন-চারশো যাত্রীর বুক ছমছম করতে লাগল!

যাত্রীদের মধ্যে থেকে একজন ডাক্তার এগিয়