ভজগৌরাঙ্গ তাড়াতাড়ি বললেন : না-না–এগেইন নয়! আহা-হা, বড় কষ্ট হয়েছে তো তোমাদের। আমি কড়ার আওয়াজ শুনতেই পাইনি। মানে–এই–পেট ব্যথা করছিল কিনা, তাই একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। এসো–এসো–ভেতরে এসো
বারান্দায় একটা ছেঁড়া মাদুর পাতা, তার একপাশে কতকগুলো হিসেবের কাগজপত্র। একটা লণ্ঠন মিটমিট করে জ্বলছে। বাড়িতে ইলেকট্রিকের লাইন নিয়ে পয়সা খরচ করবেন, এমন পাত্রই নন ভজগৌরাঙ্গ। কাগজপত্রগুলো সরিয়ে দিয়ে বললেন : বোসো বাবা বোসো, একটু জিরোও আগে।
টেনিদা বলল : জিরোবার দরকার নেই, দোরগোড়ায় আধ ঘণ্টা জিরিয়েছি আমরা। পোলাও-কালিয়া কোথায় তাই বলুন!
–পোলাওকালিয়া?–ভজগৌরাঙ্গ খাবি খেলেন।
হুঁ, পোলাওকালিয়া!–টেনিদা বাঘাটে গলায় বললে; সেই রকমই কথা ছিল। কোথায় সে?
ভজগৌরাঙ্গ বললেন : এঃ, তাই তো একেবারে মনেই ছিল না। মানে সারা দিন খুব পেটের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিলুম কিনা, সেইজন্যেই তা ইয়ে, তোমাদের বরং চার আনা পয়সা দিচ্ছি, শেয়ালদায় পাঞ্জাবিদের দোকানে গিয়ে দুআনার মাংস আর দুআনার পুরি
আমি বললুম : দু আনায় মাংস দেয় না, চিবুনো-হাড় দিতে পারে একটুকরো।
টেনিদা গর্জন করে বললে : চালাকি? ফাঁকি দেবার মতলব করেছেন? জেল থেকে বাঁচিয়ে দিলুম–তার এই প্রতিদান? যাক, আমরা কিছু খেতে চাই না। চল প্যালা–এখুনি বেরিয়ে পড়ি চোঙা নিয়ে।
–আহা-হা, চোঙা আবার কেন?–ভজগৌরাঙ্গ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন : চোঙা-টোঙা খুব খারাপ জিনিস। ছিঃ বাবা টেনি, চোঙা নিয়ে চেঁচাতে নেই–ওতে লোকের শান্তি ভঙ্গ হয়।
–সে আমরা বুঝব। আমরা চোঙা ফুঁকে আপনাকে শিঙে ফুঁকিয়ে ছাড়ব। প্যালা–চলে আয়–
–আহা, থামো—থামো–ভজগৌরাঙ্গ টেনিদার হাত চেপে ধরলেন। তারপর ডিম ভাজার মতো করুণ মুখ করে মিহিদানার মতো মিহি গলায় বললেন : নিতান্তই যদি খাবে, তা হলে আমার খাবারটাই খেয়ে যাও। আমি নয় আজ রাতে এক গ্লাস জল খেয়েই শুয়ে থাকব।–বলেই ভজগৌরাঙ্গের দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
–আপনার খাবারটা কী?–আমার সন্দেহ হল।
–ভালো মাছ আছে আজকে–পুঁটি মাছ ভাজা। সেই সঙ্গে পান্তা ভাত। দশ দিন পরে দুগণ্ডা পয়সা দিয়ে একটুখানি মাছ এনেছিলুম আশা করে, কিন্তু কপালে না থাকলে। আবার বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ভজগৌরাঙ্গের।
বটে, পুঁটি মাছ ভাজা আর পান্তো ভাত। ও রাজভোগ আপনিই খান মশাই। পালা, চোঙা দুটো রেডি আছে তো? চল–বেরিয়ে পড়ি
ভজগৌরাঙ্গ কাঁউকাঁউ করে কী বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ খটখট করে বাজের মতো বেজে উঠল দরজার কড়া। সঙ্গে সঙ্গে বিদঘুটে মোটা গলায় কে বললে : ভাজগুড়ুংবাবু হ্যায়–ভাজগুড়ুং বাবু?
ভজগৌরাঙ্গ থমকে থেমে গেলেন। টেনিদা জিজ্ঞেস করলে : কোন্ হ্যায়?
আবার সেই মোটা গলা শোনা গেল : হামি লালবাজার থানা থেকে আসছে।
ভজগৌরাঙ্গ ঠকঠক করে কেঁপে উঠলেন।
–এই সেরেছে! টিকিটা টেনে দিয়েও পাহারাওয়ালা রাগ যায়নি নির্ঘাত লালবাজারের গিয়ে নালিশ করেছে–আর পুলিশে আমায় ধরতে এসেছে। বাবা টেনি, কাল মাংস পোলাও-চপ-কাটলেট সব খাওয়াব, আমাকে আজ যেমন করে হোক বাঁচাও।
বাইরে থেকে আবার আওয়াজ এল : জলদি দরজা খুলিয়ে দেন হামি লালবাজারসে আসছে!
–ওকে বলো–ইয়ে, তোমরা আমার ভাইপো, আর আমি তিন মাসের জন্যে দিল্লি গেছি বলেই ভজগৌরাঙ্গ চট করে অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়লেন, তারপরই একেবারে তক্তপোশের তলায়। সেখান থেকে কুকুরের বাচ্চার ডাকের মতো কুঁকুঁ করে আওয়াজ উঠতে লাগল। বোঝা গেল, ভজগৌরাঙ্গ প্রাণপণে কান্না চাপবার চেষ্টা করছেন।
–এ ভাজগুড়ুং বাবু–দরজা খোলিয়ে
টেনিদা ফিসফিস করে বললে : ব্যাপার সুবিধে নয় রে প্যালা, লালবাজারের পুলিশ কেন আবার? বুড়োর জন্যে আমরাও ফেঁসে যাব নাকি?
আমি বললুম : আমরা তো কখনও ল্যাম্পপোস্টে উঠিনি, আমাদের ভয় কিসের? দরজা খুলে দেখাই যাক।
তক্তপোশের তলায় আবার কুঁকুঁ করে আওয়াজ উঠতে লাগল।
টেনিদা দরজা খুলল ভয়ে ভয়ে। বাইরে খাকী জামাপরা এক পুলিশের লোক দাঁড়িয়ে তার হাতে একটা মস্ত বড় হাঁড়ি। আমাদের দেখেই এক প্রকাণ্ড স্যালুট ঠুকল। তারপর একটা চিঠি দিয়ে বললে : চটর্জি সাহেব দিয়া। হামি সাহাবকো আরদালী আছে।
রাস্তার আলোয় চিঠিটা পড়ে দেখলুম আমরা। কেষ্টনগর থেকে লিখেছে রামগোবিন্দ :
বাবা, পুলিশ অফিসার মিস্টার চাটার্জি আমার বন্ধু। কেষ্টনগরে বেড়াতে এসেছিলেন। ওঁর সঙ্গে তোমার জন্যে এক হাঁড়ি ভালো সরপুরিয়া আর সরভাজা পাঠালুম। ঘরে রেখে পচিয়ো না–খেয়ো। আমি আর মা ভালো আছি। প্রণাম নিয়ো।
রামগোবিন্দ।
টেনিদা একবার আমার দিকে তাকাল, আমি তাকালুম টেনিদার দিকে। আমি বললুম : আচ্ছা আরদালী সাহেব, সব ঠিক হ্যায়।
আরদালী সাহেব আবার স্যালুট করে, জুতো মচমচিয়ে চলে গেল।
আমি কী বলতে যাচ্ছিলুম, টেনিদা ঝট করে আমাকে দরজার বাইরে টেনে নিয়ে এল।
–চুপ, স্পিকটি নট! এক হাঁড়ি সরভাজা আর সরপুরিয়া–খাঁটি কেষ্টনগরের জিনিস। পোলাও-কালিয়া কোথায় লাগে এর কাছে।
দরজাটা টেনে দিতে দিতে টেনিদা হাঁক পাড়ল : ভজগৌরাঙ্গবাবু, লাইন ক্লিয়ার! পুলিশ তাড়িয়েছে। কাল আর ঘর থেকে বেরুবেন না। পরশু সন্ধ্যায় আমরা পোলাও কালিয়া খেতে আবার আসব। এখন দরজাটা বন্ধ করে দিন।
