তার নীচে ছোট ছোট হরফে লেখা : সর্বসাধারণকে কোম্পানির শেয়ার কিনিবার জন্য অনুরোধ জানানো হইতেছে। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য মাত্র আট আনা। একত্রে তিনটি শেয়ার কিনিলে মাত্র এক টাকা।
এর পরে একটা হাত এঁকে লিখে দেওয়া হয়েছে : বিশেষ দ্রষ্টব্য শেয়ার কিনিলে প্রত্যেককেই বইতে অভিনয়ের চান্স দেওয়া হইবে। এমন সুযোগ হেলায় হারাইবেন না। মাত্র অল্প শেয়ার আছে, এখন না কিনিলে পরে পস্তাইতে হইবে। সন্ধান করুন- ১৮নং পটলডাঙা স্ট্রিট, কলিকাতা।
আর, বিজ্ঞাপনের ফল যে কত প্রত্যক্ষ হতে পারে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাতেনাতে তার প্রমাণ মিলে গেল। এমন প্রমাণ মিলল যে প্রাণ নিয়ে টানাটানি। অত তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা আমরা আশা করিনি। টেনিদাদের এত বড় বাড়িটা একেবারে খালি, বাড়িসুষ্ঠু সবাই গেছে দেওঘরে, হাওয়া বদলাতে। টেনিদার ম্যাট্রিক পরীক্ষা সামনে, তাই একা রয়ে গেছে বাড়িতে, আর আছে চাকর বিষ্ণু। তাই দিব্যি আরাম করে বসে আমরা তেতলার ঘরে রেডিয়ো শুনছি আর পাঁঠার ঘুগনি খাচ্ছি। এমন সময় বিষ্টু খবর নিয়ে এল মূর্তিমান একটি ভগ্নদূতের মতো।
বিষ্টুর বাড়ি চাটগাঁয়। হাঁইমাই করে নাকি সুরে কী যে বলে ভালো বোঝা যায় না। তবু যেটুকু বোঝা গেল, শুনে আমরা আঁতকে উঠলুম। গলায় পাঁঠার ঘুগনি বেঁধে গিয়ে মস্ত একটা বিষম খেল টেনিদা।
বিষ্টু জানাল : আঁড়িত ডাঁহাইত হইড়ছে (বাড়িতে ডাকাত পড়েছে)।
বলে কী ব্যাটা! পাগল না পেট খারাপ! ম্যাড়া না মিরগেল! এই ভর দুপুর বেলায় একেবারে কলকাতার বুকের ভেতরে ডাকাত পড়বে কী রকম!
বিষ্টু বিবর্ণ মুখে জানাল :নীচে হাঁসি দেইক্যা যান (নীচে এসে দেখে যান)।
আমি ভেবেছিলাম খাটের তলাটা নিরাপদ কিনা, কিন্তু টেনিদা এমন এক বাঘা হাঁকার ছাড়লে যে আমার পালাজ্বরের পিলেটা দস্তুরমতো হকচকিয়ে উঠল।
কাপুরুষ! চলে আয় দেখি একটা বোম্বাই ঘুষি হাঁকিয়ে ডাকাতের নাক ন্যাবড়া করে দি। আমি নিতান্ত গোবেচারা প্যালারাম বাঁড়ুজ্যে, শিংমাছের ঝোল খেয়ে প্রাণটাকে কোনওমতে ধরে রেখেছি, ওসব ডাকাত-ফাকাতের ঝামেলা আমার ভালো লাগে না। বেশ তো ছিলাম, এ-সব ভজঘট ব্যাপার কেন রে বাবা। আমি বলতে চেষ্টা করলুম, এই–এই মানে, আমার কেমন পেট কামড়াচ্ছে–
–পেট কামড়াচ্ছে! টেনিদা গর্জন করে উঠল : পাঁঠার ঘুগনি সাবাড় করার সময় তো সে কথা মনে ছিল না দেখছি। চলে আয় প্যালা, নইলে তোকেই আগে
কথাটা টেনিদা শেষ করল না, কিন্তু তার বক্তব্য বুঝতে বেশি দেরি হল না আমার। জয় মা দুর্গা– কাঁপতে কাঁপতে আমি টেনিদাকে অনুসরণ করলুম।
কিন্তু না– ডাকাত পড়েনি। পটলডাঙার মুখ থেকে কলেজ স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত কিউ!
কে নেই সেই কিউতে? স্কুলের ছেলে, মোড়ের বিড়িওয়ালা, পাড়ার ঠিকে ঝি, উড়ে ঠাকুর, এমন কি যমদূতের মতো দেখতে এক জোড়া ভীম-দর্শন কাবুলিওয়ালা।
আমরা সামনে এসে দাঁড়াতেই গগনভেদী কোলাহল উঠল।
–আমি শেয়ার কিনব—
–এই নিন মশাই আট আনা পয়সা—
ঝি বলল, ওগো বাছারা, আমি এক টাকা এনেছি। আমাদের তিনখানা শেয়ার দাও আর একটা হিরোইনের চান্স দিয়ো
পাশের বোর্ডিংটার উড়ে ঠাকুর বললে, আমিও আষ্টো গণ্ডা পয়সা আনুচি–
সকলের গলা ছাপিয়ে কাবুলিওয়ালা রুদ্র কণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়ল : এঃ বাব্বু, এক এক রূপায়া, লায়া, হামকো ভি চান্স চাহিয়ে
তারপরেই সমস্বরে চিৎকার উঠল : চান্স–চান্স! চিৎকারের চোখে আমার মাথা ঘুরে গেল- দুহাতে কান চেপে আমি বসে পড়লুম।
আশ্চর্য, টেনিদা দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে রইল একেবারে শান্ত, স্তব্ধ বুদ্ধদেবের মতো। শুধু তাই নয়, এ কান থেকে ওকান পর্যন্ত একটা দাঁতের ঝলক বয়ে গেল তার মানে হাসল।
তারপর বললে, হবে, হবে, সকলেরই হবে, বরাভয়ের মতো একখানা হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, প্রত্যেককেই চান্স দেওয়া হবে। এখন চাঁদেরা আগে সুড়সুড় করে পয়সা বের করে দেখি। খবরদার, অচল আধুলি চালিয়ো না, তা হলে কিন্তু
জয় হিন্দ–জয় হিন্দ
ভিড়টা কেটে গেলে টেনিদা দু হাত তুলে নাচতে শুরু করে দিলে। তারপর ধপ করে একটা চেয়ারে বসতে গিয়ে চেয়ারসুদ্ধই চিতপাত হয়ে পড়ে গেল।
আমি বললুম, আহা-হা
কিন্তু টেনিদা উঠে পড়েছে ততক্ষণে। আমার কাঁধের ওপর এমন একটা অতিকায় থাবড়া বসিয়ে দিলে যে, আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।
–ওরে প্যালা, আজ দুঃখের দিন নয় রে, বড় আনন্দের দিন। মার দিয়া কেল্লা! ভীমনাগ, দ্বারিক ঘোষ, চাচার হোটেল, দেলখোস-আঃ!
যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে আমিও বললুম, আঃ!
–আয় গুনে দেখি– এ কান থেকে ওকান পর্যন্ত আবার হাসির ঝলক উলসে উঠল।
রোজগার নেহাত মন্দ হয়নি। গুনে দেখি, ছাব্বিশ টাকা বারো আনা।
বারো আনা?–টেনিদা ভ্রূকুটি করলে, বারো আনা কী করে হয়? আট আনা এক টাকা করে হলে– উঁহু! নিশ্চয় ডামাডোলের মধ্যে কোনও ব্যাটা চার গণ্ডা পয়সা ফাঁকি দিয়েছে– কী বলিস?
আমি মাথা নেড়ে জানালুম, আমারও তাই মনে হয়।
উঃ–দুনিয়ায় সবই জোচ্চোর। একটাও কি ভালো লোক থাকতে নেইরে? দিলে সক্কালবেলাটায় বামুনের চার চার আনা পয়সা ঠকিয়ে। টেনিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : যাক, এতেও নেহাত মন্দ হবে না। দেলখোস, ভীমনাগ, দ্বারিক ঘোষ
