টেনিদা হিড়হিড় করে টানতে টানতে আমাকে চাটুজ্যেদের বোয়াকে নিয়ে এল। বললে : শুনে যে তোর মুচ্ছো যাওয়ার জো হল দেখছি। বিশ্বেস হচ্ছে না বুঝি?
বাঁ-দিকের কানটা চেপে ধরে আমি বললুম : ভজগৌরাঙ্গ আমাদের মাংসপোলাও খাওয়াবে?
–আলবত। তোকে আর আমাকে।
–ভজগৌরাঙ্গ সমাদ্দার?
নির্ঘাত!
বলে কী টেনিদা? পাগল হয়ে গেছে না পেট খারাপ হয়েছে? ভজগৌরাঙ্গবাবুর মতো কৃপণ সারা কলকাতায় আর দুজন নেই। একাই থাকেন। ওঁর ছেলে রামগোবিন্দ চাকরি পেয়েই নিজের মাকে নিয়ে কেষ্টনগরে চলে গেছে–মানে পালিয়ে বেঁচেছে। ভজগৌরাঙ্গ পাটের দালালি করছেন, আর টাকা জমাচ্ছেন। বাড়ির সামনে ভিক্ষুক এলে লাঠি নিয়ে তাড়া করেন। একবার গোটাকয়েক ডেয়ো পিঁপড়ে ওঁর একটুখানি চিনি খেয়ে ফেলেছিল, ভদ্রলোক পিঁপড়েগুলোকে ধরে একটা শিশিতে পুরে রাখলেন আর পর পর তিনদিন সেই পিঁপড়ে দিয়ে চা করে খেলেন। সেই ভজগৌরাঙ্গ পোলাও-মাংস খাওয়াবেন আমাকে আর টেনিদাকে? উঁহু, মাথা খারাপ হলেও একথা লোকে ভাবতে পারে না। টেনিদারই পেট খারাপ হয়েছে!
টেনিদা বললে : অমন শিঙাড়ার মতো মুখ করে, ছাগলের মতো তাকিয়ে আছিস যে? তা হলে সব খুলে বলি, শোন!
কাল শেষরাত্তিরে ছোট কাকা সরকারি কাজে এরোপ্লেনে চেপে সিঙ্গাপুরে গেছে। আমি দমদমে ছোট কাকাকে তুলে দিয়ে যখন ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরেছি, তখন রাত চারটে। গলির মধ্যে ঢুকেই দেখি যে এক যাচ্ছেতাই ব্যাপার! একটা লোক ল্যাম্পপোস্টের ওপর ঝুলছে; আর নীচ থেকে একজন পাহারাওলা উতারো-উতারো বলে তার ঠ্যাং ধরে টানছে।
এগিয়ে এসে দেখি ল্যাম্পপোস্ট ধরে যে-লোকটা ঝুলছে, সে আর কেউ নয়–ভজগৌরাঙ্গবাবু!
বলল কী–ভজগৌরাঙ্গবাবু? তা শেষরাত্তিরে ল্যাম্পপোস্ট ধরে ঝুলতে গেল কেন?
–আরে, সেইটেই তো গণ্ডগোল! পাহারাওলা তো এক হ্যাঁচকা টানে ভজগৌরাঙ্গকে চালকুমড়োর মতো ধপাত করে নামিয়ে নিলে। তারপর বলে, তো ইলেকট্রিকের তার চুরি করতা হ্যায়–চলো থানামে! আর ভজগৌরাঙ্গ হাঁউমাউ করতে থাকে, আমি শেষ রাত্রে বৈঠকে বৈঠকে হিসাব লিখতা থা, একঠো কাগজ উড়কে ল্যাম্পপোস্টকে উপরে গিয়ে লটকে গিয়া, সেইঠো পাড়তে গিয়া। পাহারাওলা তা বিশ্বেস করবে কেন? খালি বলে, তোম চোর হ্যায়–চলো থানামে।
আমাকে দেখেই ভজগৌরাঙ্গবাবুর সেকি কান্না! বলে, বাবা টেনি, আমায় বাঁচাও। এই বুড়ো বয়েসে চোর বলে ধরে নিয়ে গেলে আমি আর বাঁচব না।
যাই হোক, আমি পাহারাওলাকে অনেক বোঝালুম। বললুম, এ দারোগা সাব–এ লোক আচ্ছা আদমি, চুরি নেহি করতা। ছোড় দিজিয়ে দারোগা সাহেব।–দারোগা সাহেব বলাতে লোকটা একটু ভিজল। খানিকটা খইনিটইনি খেয়ে, ভজগৌরাঙ্গবাবুর টিকিতে একটা টান দিয়ে বলল, আচ্ছা, আজ ছোড় দেতা। ফের যদি তুম্ ল্যাম্পপোস্টে উঠে গা, তো তুমকো ফাঁসি দে দেগা।–বলে চলে গেল।
তখন ভজগৌরাঙ্গ আমার হাত জড়িয়ে ধরলেন। বললে, বাবা টেনি, তুমি আমায় ধনে-প্রাণে বাঁচিয়েছ। একথা কাউকে বোলো না–তা হলে পাড়ায় মুখ দেখাতে পারব না। তোমাকে আমি চারটে পয়সা দিচ্ছি, ডালমুট খেয়ো। আমি বললুম, অত সস্তায় হবে না স্যার! যদি আমাকে আর প্যালাকে কাল সন্ধেয় পোলাও-মাংস খাওয়াতে পারেন, তবেই ব্যাপারটা চেপে যাব।
শুনে বুড়োর চোখ কপালে চড়ে গেল। বলে, এই গরমে পোলাও-মাংস খেতে নেই বাবা-শেষে অসুখ করে পড়বে। তার চে বরং দুই আনা পয়সা দিচ্ছি-তুমি আর প্যালারাম বোঁদে কিংবা গুজিয়া কিনে খেয়ো। পাকৌড়াও খেতে পারো।
আমি বললুম, এই আশ্বিন মাসে মোটেই গরম নেই–ওসব বাজে কথা চলবে না। জেলের হাত থেকে বাঁচালুম, একশো-দুশো টাকা ফাইনও হতে পারত, তার বদলে কিনা বোঁদে আর পাকৌড়া। বেশ, কিছু খাওয়াতে হবে না আপনাকে। সকাল হলেই আমি আর প্যালা দুটো চোঙা মুখে নিয়ে রাস্তায় বেরুব। আমি বলব–পটলডাঙার ভজগৌরাঙ্গ, প্যালা বলবে–তার-চোর। আমি বলব–পুলিশ ধরে কাকে? প্যালা বলবে–ভজগৌরাঙ্গকে। ব্যাস–বুড়ো একদম ঠাণ্ডা। সুড়সুড় করে রাজি হয়ে গেল। বুঝলি প্যালা–একেই বলে পলিটিকস্।
তা হলে আজ সন্ধেয় আমরা পোলাও কালিয়া খাচ্ছি? ভজগৌরাঙ্গের বাড়িতে?
–নিশ্চয়। ঠেকাচ্ছে কে?
এবারে সত্যি সত্যিই আমি নেচে উঠলুম! চেঁচিয়ে বললুম : ডি-লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস–
টেনিদা বলল :ইয়াক–ইয়াক!
.
সন্ধের পরে ভজগৌরাঙ্গের বাড়ি গিয়ে তো সমানে কড়া নাড়ছি দুজনে। পুরো পনেরো মিনিট কড়া নাড়বার পরেও কোনও সাড়াশব্দ নেই। বুড়ো চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে আছে ভেতরে। সারা রাত কড়া নাড়লেও দরজা খুলবে বলে মনে হল না।
আমি বললুম : হল তো? খাও এখন পোলাও-কালিয়া। পিঁপড়ে দিয়ে ও চা খায়–ওর কথায় তুমি বিশ্বাস করলে?
টেনিদা খেপে গেল। খাড়া নাকটাকে গণ্ডারের মতো উঁচু করে বললে : দরজা খুলবে না। দাঁড়া–খোলাচ্ছি। আমি বলছি–ভজগৌরাঙ্গ–তুই সঙ্গে সঙ্গে বলবি–
মনে আছে। হাঁক পাড়ো
টেনিদা যেই আকাশফাটা চিৎকার তুলেছে–ভজগৌরাঙ্গ, আর আমি কাঁসরের মতো ক্যানকেনে গলায় জবাব দিয়েছি–তার-চোর,–অমনি চিচিং ফাঁক! ক্যাঁচ দরজা খুলে গেল। একমুখ কাঁচা-পাকা দাড়ি নিয়ে ভজগৌরাঙ্গ বেরিয়ে এলেন সুট করে।
–আহা-হা, করছ কী! চুপচুপ!
–চুপচুপ মানে? আধ ঘণ্টা ধরে কড়া নাড়ছি–কোনও সাড়াই নেই? ভেবেছেন কি আপনি? প্যালা–এগেইন।–
