কান্না পায়!
পায় বইকি। শিব্রামের গপ্পো পড়তে গেলেই তো প্যালার দাঁতকপাটি লাগে। আমি তো সুকুমার রায়ের পাগলা দাশু পড়ে এত কেঁদেছিলুম যে বাড়িময় জল থইথই।
অ্যাঁ!
ব্ৰহ্মবিকাশ সামলে নিতে চেষ্টা করলেন, সেই ফাঁকে আমাদের হাত চলতে লাগল। তারপরেই এহে–ভারি দুঃখের কথা বলে, ভীষণ ব্যাজার হয়ে দুটো চিংড়ির কাটলেটে টান দিলেন, টেনিদা আবার একটা তাঁর হাত থেকে প্রায় কেড়ে আনল।
ব্রহ্মবিকাশ বোধহয় আর-একটা কিছু ঠাওরাতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ টেনিদা বললে, ব্রহ্মবিকাশবাবু
প্রাণপণে কাটলেট চিবুতে চিবুতে ব্রহ্মবিকাশ বললেন, অ্যাঁ?
আপনি তো হাসির গপ্পো জানেন, আমি খুব ভালো ম্যাজিক জানি।
অ্যাঁ!
এই যে দুটো জলের গেলাস দেখছেন, দূর থেকে এই গেলাসের জল আমি বদলে দেব। কখনও লাল হয়ে যাবে, কখনও নীল, কখনও হলদে, কখনও বেগুনী, কখনও সবুজ। শুধু মন্তর পড়ে।
শুনে ব্রহ্মবিকাশের চিবুনি থেমে গেল।
অ্যাঁ! তাও কি হয় নাকি? পিসি সরকার হলে নাকি হে?
পি-সি সরকার! তিনি তো আমার কাছে এটা শেখবার জন্যে ঝুলোঝুলি, আমিই শেখাইনি। দেখতে চান ম্যাজিকটা? নিন হাত পাতুন, নানা উলটো করে দুহাতের পাতা মেলে দিন টেবিলের ওপর। ইয়া–কারেক্ট।
ব্রহ্মবিকাশ কিছু না বুঝেই হাতের পাতা উবুড় করে টেবিলে মেলে দিয়েছিলেন। তিনি জানলেন না যে কী হারাইতেছেন? এবং পত্রপাঠ টেনিদা দুটো জলভরতি গ্লাস তাঁর দুহাতের চেটোয় বসিয়ে দিলে।
ধরে থাকুন– ধরে থাকুন। ধৈর্য ধরে বসে থাকুন; আস্তে আস্তে জল নীল হবে– লাল হবে হলদে হবে–বেগুনী হবে–প্যালা, কুইক কুইক।
আর বলবার অপেক্ষা রাখে? আমি তখন কুইক নই–কুইকেস্ট! আর টেনিদা চালাচ্ছিল একেবারে জেট-প্লেনের স্পিডে।
ব্ৰহ্মবিকাশ হাহাকার করে উঠলেন।
আরে–আরে—
আরে–আরে নয়, চুপ করে বসে থাকুন। এসব ম্যাজিকে একটু সময় লাগেই স্যার। অনেক হাসির গপ্পো শুনিয়েছেন; আজ একটু ম্যাজিক দেখুন। হাত নাড়তে চেষ্টা করলে আপনার দামী গেলাসেরই বারোটা বাজবে, আমার কী! হবে–হবে– নীল হবে, লাল হবে– সবুজ হবে–সব হবে! একটু ধৈর্য ধরুন; হাসি হাসি মুখে বসে থাকুন, ভাবতে চেষ্টা করুন হোকাস-পোকাস-গিলি-গিলি। প্যালা–কুইক–কুইক—
গেলাসের মায়ার ব্রহ্মবিকাশ হাঁ করে বেকুবের মতো বসে রইলেন, চাকরটাকে ডাকবার কথা পর্যন্ত তাঁর মনে এল না। আর সেই ফাঁকে আমরা
না–না, আমরা একেবারে ছোটলোক নই। উনি চিংড়ির যে কাটলেটটা আধখানা খেয়েছিলেন, সেটা ওঁর জন্যেই রেখে এসেছিলুম।
ভজগৌরাঙ্গ কথা
হাবুল সেন বর্ধমানে মামার বাড়ি বেড়াতে গেছে। ক্যাবলা গেছে বাবা-মার সঙ্গে নাইনিতালে। তাই পুজোর ছুটিতে পটলডাঙা আলো করে আছি চার মূর্তির দুজন–আমি আর টেনিদা।
বিকেলবেলা ভাবছি, ধাঁ করে লিলুয়ায় ছোট পিসিমার বাড়ি থেকে একটু বেড়িয়ে আসি–হঠাৎ বাইরে থেকে টেনিদার গাঁকগাঁক করে চিৎকার!
–প্যালা, কাম–কুইক!
নতুন ডাক্তার মেজদা হসপিটালে গোটাকতক রুগী-টুগী মেরে ফিরে আসছিল। নিজের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে দাঁত খিঁচিয়ে আমায় বলে গেল : যাও জাম্বুবান–তোমার দাদা হনুমান তোমায় ডাকছে। দুজনে মিলে এখন লঙ্কা পোড়াওগে।
জাম্বুবান কখনও লঙ্কা পোড়ায়নি–মেজদাকে এই কথাটা বলতে গিয়েও আমি বললুম না। ওকে চটিয়ে দিলে মুশকিল। একটু পেটের গণ্ডগোল হয়েছে কি, সঙ্গে সঙ্গে সাতদিন হয়তো সাগু বার্লি কিংবা স্রেফ কাঁচকলার ঝোল খাইয়ে রাখবে, নইলে পটাং করে পেটেই একটা ইনজেকশান দিয়ে দেবে। তাই মিথ্যে অপবাদটা হজম করে যেতে হল।
আবার টেনিদার সেই পাড়া কাঁপানো বাজখাঁই হাঁক প্যালা, আর ইউ ডেড?
টেনিদার চিৎকার শুনলে মড়া অবধি লাফিয়ে ওঠে, আর আমি তো এখনও মারাই যাইনি। হুড়মুড় করে দোতলা থেকে নেমে এসে বললুম কী হয়েছে, চ্যাঁচাচ্ছ কেন অত?
টেনিদা আমার চাঁদির ওপর কড়াং করে একটা গাট্টা মারল। বললে : তুই একটা নিরেট ভেটকি মাছ। আমি তো শুধু চ্যাঁচাচ্ছি ব্যাপারটা শুনলে তুই একেবারে ভজ গৌরাঙ্গ ভজ গৌরাঙ্গ বলে দু-হাত তুলে নাচতে থাকবি। যাকে বলে, নরীনৃত্যতি।
কাণ্ডটা দ্যাখো একবার–টেনিদা সংস্কৃত আওড়াচ্ছে। পণ্ডিতমশাই একবার ওকে গো শব্দরূপ জিজ্ঞেস করায় বলেছিল, গৌ–গৌবৌ-গৌবরঃ। শুনে পণ্ডিতমশাই চেয়ার থেকে উলটে পড়ে যেতে যেতে সামলে গিয়েছিলেন। আর ওকে বলেছিলেন– কী বলেছিলেন, সেটা নাইবা শুনলে!
কিন্তু সংস্কৃত যখন বলছে, তখন ব্যাপারটা নিশ্চয় সাংঘাতিক। বললুম : খামকা আমি নাচব কেন? আর যদিই বা নাচি, ভজ গৌরাঙ্গ বলব কেন? তোমার নাম ধরে ভজহরি ভজহরি বলেও তো নাচতে পারি! (তোমরা তো জানোই, টেনিদার পোশাকী নাম ভজহরি মুখুজ্যে।)
টেনিদা আমার নাকের সামনে বুড়ো আঙুল নাচিয়ে বললে : ভজহরি বলে নাচলে কচুপোড়া পাবি। আরে, আজ সন্ধের পর ভজগৌরাঙ্গবাবু যে পোলাও-মাংস খাওয়াচ্ছেন। তোকে আর আমাকে।
শুনে খানিকক্ষণ আমি হাঁ করে থাকলুম।
-কে খাওয়াচ্ছে বললে?
–ভজগৌরাঙ্গবাবু।
আমার হাঁ-টা আরও বড় হল : ভালো করে বলো, বুঝতে পারছি না।
বলেই বুঝতে পারলুম, কী ভুলটাই করেছি। টেনিদা সঙ্গে সঙ্গে আমার কানের কাছে মুখ এনে ভজগৌরাঙ্গ বলে এমন একখানা হাঁক ছাড়ল যে আমি আঁতকে তিন হাত লাফিয়ে উঠলুম। কান কনকন করতে লাগল, মাথা বনবন করে উঠল!
