চুকচুক করে বললেন, আহা-হা টেনিরাম, বিষম খেয়ে কম্পিটিশনে হেরে গেলে? খাবার তো আর নেই– একটু চা খাবে নাকি?
চা খেতে গিয়ে আবার একখানা বিষম খাই আর কি! আমি ঘোঁত ঘোঁত করে বেরিয়ে এলুম।
টেনিদার কথা শুনে আমি বললুম, ওটা অ্যাকসিডেন্ট। হঠাৎ বিষম খেয়েই তুমি খেতে পেলে না।
মোটেই না। ওই হচ্ছে ওঁর কায়দা। রাস্তায় বেরিয়ে চার-পাঁচটা ছেলের সঙ্গে দেখা। দুজন আমাকে চেনে। একজন ওই বিশু–সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ব্যাক খেলে। বিশু বললে, ব্যাপার কী টেনিদা? ব্রহ্মবিকাশ চোংদারের বাড়ি বুঝি খেতে গিয়েছিলে? প্রাণ নিয়ে ফিরেছ তো?
আমি তো থ।
তাদের কাছেই শুনলাম। এ হল ব্ৰহ্মবিকাশবাবুর খুব মজার খেলা। লোককে খেতে বলেন, তারা খাওয়া শুরু করলেই বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে একটা উদ্ভট কথা বলে দেন। সে তক্ষুনি বিষম খায় : প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে আর সেই ফাঁকে ব্রহ্মবিকাশ সব সাফ করে দেন। এই সেই কথামালার শেয়াল আর সারসের গপ্পোর মতো-বুঝেছিস?
আমি শুনে বললাম, কেউ যদি না হাসে, রামগরুড় হয়?
রামগরুড়কেও হাসিয়ে দেবেন : এমনি ওঁর বলার কায়দা। তুই আমি কী রে- একবার এক জাঁদরেল কাবুলিওয়ালাকে পর্যন্ত।
কাবুলিওয়ালা! তাকে পেলেন কোথায়?
কী করবেন! কেউ তো আর আসে না- সবাই চিনে ফেলেছে কিনা। শেষে রাস্তা থেকে এক কাবুলিওয়ালাকে অনেক ভুজুং ভাজুং দিয়ে ডেকে আনলেন। তারপর খেতে দিয়েই শুরু করলেন- সমঝা হ্যায় আগা সাহেব, এক আদমিকো বহুৎ লম্বে দাড়ি থা। ওহি দাড়িমে এক জিন তো ঘুস গিয়া। যব উয়ো আদমি কু খানেকো নিয়ে মুখে হাত লে যাতা, তব ওহি জিন সেই সব লাড্ডু-মণ্ডা ঝাঁ করে কেড়ে লেতা, আর দাড়িমে ছিপায়কে আপনি খা লেতা।
মানে, বুঝলি না, একটা লোকের লম্বা দাড়ির ভেতরে জিন–মানে একটা দৈত্য ঢুকে গিয়েছিল। লোকটা লাড্ডু-মণ্ডা কিছু খাবার জন্যে মুখ তুললেই ঝাঁ করে কেড়ে নিয়ে দাড়িতে লুকোনো দৈত্যটা সেগুলো খেয়ে ফেলত।…যেই বলা–কাবুলিওয়ালা অ্যায়সা বিষম খেল যে তিন দিন হাসপাতালে। তারপর সেই-যে দেশে চলে গেল, আর তার পাত্তা নেই।
আমি বললুম, কী ডেনজারাস!
শুধু ডেনজারাস? যাকে বলে পুঁদিচ্চেরি। কিন্তু এখন হয়েছে কী, আজ সকালে ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। বললেন, টেনিরাম, অনেকদিন তো তোমার সঙ্গে চা খাওয়া হয়নি, এসো না আজ বিকেলে। বেশ মজার গপ্পো-টগ্লো করা যাবে। আমি বললাম, আমার বন্ধু প্যালাকেও সঙ্গে আনব নাকি? উনি বললেন, সে তো খুব ভালো কথা নিশ্চয় নিয়ে আসবে। কী রে যাবি?
আঁতকে বললুম, উঁহু, নেভার। আমি চপ কাটলেট খেতে চাই, বিষম খেতে চাই না।
খুব গম্ভীর হয়ে টেনিদা একটু ভাবল। তারপর বললে, লুক হিয়ার, প্যালা।
ইয়েস স্যার।
ইয়ার্কি দিসনি ব্যাপারটা খুব পুঁদিচ্চেরি–একেবারে মেফিস্টোফিলিস যাকে বলে। আমি একটা প্ল্যান ঠাউরেছি।
কোনও প্ল্যানের ভেতরে আমি নেই। আমার আবার একটুতেই দারুণ হাসি পায়। মারা যাব নাকি শেষ পর্যন্ত?
দাঁড়া না কাঁচকলা। শোন। যেই উনি বেয়াড়া একটা হাসির গল্প আরম্ভ করবেন না–তুই কটাস করে আমাকে একটা চিমটি লাগাবি; আমিও একটা লাগিয়ে দেব তোকে। ব্যস আর হাসাতেই পারবেন না। তারপর–ডিলা–গ্র্যান্ডি—হুঁ, মাথায় একটা মতলব এসেছে। দিচ্ছি আজকে ব্রহ্মবিকাশ চোংদারকে ম্যানেজ করে। এখন উঠে পড়ছটা বাজে, কুইক।
আমি যাব না।
তোকে যেতেই হবে। নইলে এক থাপ্পড়ে তোর কান
কানপুরে পাঠিয়ে দেব।
ইয়া! একদম কারেক্ট! ওঠ–কুইক-কুইক
.
কী করা যায়, যেতেই হল ব্রহ্মবিকাশের বাড়িতে। টেনিদা যা বলেছিল ঠিক তাই। সেই বাড়ি, সেই আধবুড়ো চাকর, সেই ডাইনিং হল। চেয়ারে ব্রহ্মবিকাশ চোংদার। আর টেবিলে–
সে আর কী বলব। দেখলেই মনে হয় ঝাঁপিয়ে পড়ি। কিন্তু হাসি হাসি মুখে ব্রহ্মবিকাশ তাকিয়ে আছেন তিনি সবাইকে খেতে ডাকবেন, অথচ কাউকে খেতে দেবেন না। এরকম যাচ্ছেতাই লোক যে সংসারে থাকতে পারে আমি জানতুম না।
ব্ৰহ্মবিকাশ মুচকে মুচকে হাসছিলেন আর রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিল। বললেন, তুমিই বুঝি প্যালারাম? শিঙিমাছ দিয়ে পটোলের ঝোল খেতে বুঝি খুব ভালোবাস?
বললুম, সে আগে খেতুম–ছেলেবেলায়। এখন কালিয়া কাবাব কোর্মা খেয়ে থাকি।
ভালো–ভালো। আরে মানুষ তো খাওয়ার জন্যেই বেঁচে থাকে। এসো, লেগে যাও। কম্পিটিশন হোক। দেখা যাক, কে আগে খেতে পারে।
টেনিদা আমার গা টিপল।
তারপর যা হল, সংক্ষেপে বলি।
একটা গরম-গরম ফুলকপির সিঙাড়ায় সবে কামড় বসিয়েছি হঠাৎ ব্রহ্মবিকাশ বললেন, একটা কাণ্ড হয়েছে শোনো। এক লোকের খুব নাক ডাকত। তার ঘরে চোর ঢুকেছে। আর তক্ষুনি একটা গুবরে পোকা বোঁ করে উড়ে বসেছে লোকটার নাকে। তার নাক ডাকার ধাক্কায় গুবরে পোকাটা বুলেটের মতো ঠিকরে গিয়ে ঠাস করে চোরটার কপালে
বলার কায়দাই এমনি যে তক্ষুনি স্রেফ আমার অপঘাত ঘটে যেত। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আমার হাঁটুতে টেনিদার এক রামচিমটি আর আমিও টেনিদার পিঠে আর এক মোক্ষম চিমটি। দুজনেই এক সঙ্গে চ্যাঁ করে উঠলুম।
ব্ৰহ্মবিকাশ কেমন বোকা বনে গেলেন; তক্ষুনি থেমে গেল গল্পটা।
অ্যা–কী হল তোমাদের?
আমার হাঁটু জ্বালা করছিল, টেনিদারও যে খুব আরাম লাগছিল তা নয়। উচ্ছে খাওয়া-মুখে টেনিদা বললে, আজ্ঞে–ইয়ে–হয়েছে কী, হাসির গল্প শুনলেই আমাদের কেমন কান্না পায়।
