শুনে, আমার রোমাঞ্চ হল।
বললুম, কেন খাব না আলবাত খাব। পেলেই খেতে থাকব! কে খাওয়াবে–তুমি?
টেনিদা আমার পিঠে ধাঁই করে চড় মারল একটা।
বদনাম দিসনি প্যালা বলে দিচ্ছি সেকথা।
বদনাম মানে?
আমি– এই টেনিরাম শর্মা কাউকে, কক্ষনো খাওয়াই না–নিজেই খেয়ে থাকি বরাবর। এ হচ্ছে আমার নীতি–মানে প্রিনসিপল। তোকে খাওয়াতে গিয়ে প্রিনসিপল নষ্ট করব? তুই তো দেখছি একটা নিরেট কুরুবক।
আমার বুকভরা আশা ধুক করে নিবে গেল। শুকনো মুখে বললুম, তবে কে খাওয়াবে? কার গরজ পড়ছে আমাকে চপ কাটলেট-পুডিং খাওয়াবে?
আছে-আছে–লোক আছে। সব খাবার সাজিয়ে বসে আছে। কেবল খেতে পারলে হয়।
অ–দোকানে।–আমি ব্যাজার হয়ে বললুম, খাওয়া-দাওয়ার কথা নিয়ে ঠাট্টা কোরো না টেনিদা, এসব খুব সিরিয়াস ব্যাপার। মনে ভীষণ ব্যথা লাগে।
তোর মগজে কিচ্ছু নেই, স্রেফ ঝিঙে-চচ্চড়িতে ভরতি। দোকান-টোকান নয়- একদম ফ্রি। তুই গেলেই টেবিল সাজিয়ে খেতে দেবে। কিন্তু খেতে পারবি না।
শুনে কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল–টেবিল সাজিয়ে খেতে দেবে, অথচ খেতে পারব না? পচা-টচা বুঝি? নাকি কেষ্টনগরের মাটির তৈরি?
উঁহু আসল–ওরিজিন্যাল। একদম ফ্রেশ। খেতে দেবে, অথচ খেতে পারবি না। উলটে, চোখ কপালে তুলে মরতে মরতে ফিরে আসবি।
এ যে দেখছি রহস্যের খাসমহল তৈরি করছে। চপ কাটলেট-পুডিং নিয়ে এসব ধাষ্টামো আমার ভালো লাগে না। আমি রেগে বললুম, সব বানিয়ে বানিয়ে যা তা বলছ। আমি চললুম।
আহা-হা-চটে যাচ্ছিস কেন?–টেনিদা বললে, আমি তো তোকে নেমন্তন্ন করতেই আসছিলুম। সেইসঙ্গে বলতে আসছিলুম, খেতে দেবে অথচ খেতে পারবি নে, মাঝখান থেকে প্রাণ নিয়ে টানাটানি।
খেতে দিয়ে বুঝি লাঠিপেটা করে?
দ্যুৎ! খুব মিষ্টি মিষ্টি হেসে হাসির গল্প করে। আর সেই গল্পই মারাত্মক।
কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।
মিটমিট করে হেসে টেনিদা বললে, তা হলে সবটা খুলে বলি তোকে। আয় বসা যাক একটু।
দুজনে মিলে বসে পড়লুম চাটুজ্যেদের বোয়াকে। টেনিদা বললে, ব্রহ্মবিকাশবাবুকে জানিস?
বললুম, না। অমন বিটকেল নামের কাউকে আমি চিনি না। চিনতে চাই না।
তিনিই খাওয়াতে চান।
খাওয়াতে চান তো খেতে দেন না কেন? তার মানে কী?
মানে–ওইটেই ওঁর রসিকতা।
অ্যাঁ!
বলছি, বলছি, বেশ মন দিয়ে শুনে যা। বুঝলি, ব্রহ্মবিকাশবাবুকে আমিও চিনতুম না। একদিন শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের সামনে নিজেই যেচে আলাপ করলেন আমার সঙ্গে। বললেন, তুমিই বুঝি পটলডাঙার টেনিরাম? বেশ বেশ! বড় আনন্দ হল। অনেক নাম শুনেছি তোমার তোমার বন্ধু প্যালারামের লেখা দু-একটা গল্পও পড়ে ফেলেছি। তা এসো না আজ বিকেলে অখিল মিস্তিরি লেনে আমার বাড়িতে। একসঙ্গে চা-টা খাওয়া যাবে।
বুঝলি, সে হল গত বছর পুজোর সময়, তোরা কেউ কলকাতায় নেই তখন। থাকলে তো দলবলসুদ্ধই নিয়ে যেতুম। কিন্তু গিয়ে বুঝলুম তোদের নিয়ে গেলে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যেত।
অখিল মিস্তিরি লেনে বেশ বড় বাড়ি পাট না ঝোলা গুড় কিসের যেন ব্যবসা করে অনেক টাকা জমিয়েছেন ব্রহ্মবিকাশবাবু। বিয়ে-থা করেননিঃ একা থাকেন, খুব ছিমছাম দারুণ পরিপাটি। বাড়িতে থাকবার মধ্যে একজন আধবুড়ো চাকর।
দরজার বেল টিপতেই সে এসে খুব খাতির করে নিয়ে গেল। একেবারে ডাইনিং হলে। সে একেবারে এলাহি কাণ্ড- বুঝলি! পট ভরতি চপ কাটলেট-সিঙাড়া, প্লেটে বোমার তালের মতো ইয়া এক পুডিং। কী সব দামী দামী কাপ-প্লেট, সে আর কী বলব তোকে। একটা চেয়ারে জাঁকিয়েই বসেছিলেন ব্রহ্মবিকাশবাবু, আমাকে দেখেই চিনিমাখা হাসি হেসে বললেন, এসো হে, তোমার জন্যেই বসে আছি।
খাবারের আয়োজন দেখেই তো আমার এক বচ্ছরের খিদে একসঙ্গে পেয়ে গেল। বললুম,হেঁ-হেঁ, কী সৌভাগ্য। বলেই, প্লেটে গোটা দুই কাটলেট একসঙ্গে তুলে নিলুম।
ব্ৰহ্মবিকাশ আড়চোখে একবার চেয়ে দেখলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, এসো হে টেনিরাম, একটু মজা করে খাওয়া যাক। শুনেছি তুমি খুব খেতে পারো; আমিও খাইয়ে লোক। কম্পিটিশন হোক, দেখা যাক কে কত তাড়াতাড়ি খেতে পারে।
জানিস তো, এরকম কম্পিটিশনে আমি সর্বদাই রেডি। নিজের খাবার চক্ষের নিমেষে ফিনিশ করে কিভাবে তোদের প্লেটগুলি টেনে নিই–সে তো হাড়ে হাড়ে টের পাস তোরা।…বললুম, হেঁ-হেঁ, সে তো খুব আনন্দের কথা। মনেমনে ভাবলুম, দাঁড়ান মশাই, আজ ব্ৰহ্ম খাওয়া দেখিয়ে দেব আপনাকে।
কিন্তু
টেনিদা থামল। আমি আকুল হয়ে বললুম, কিন্তু কী?
দাঁড়া না ঘোড়াড্ডিম।–
মুখটাকে আলুভাজার মতো করে টেনিদা বললে, মনের দুঃখুটা একটু সামলে নিতে দে। বুঝলি, কিচ্ছু খেতে পারলুম না–একখানা মোশ্চম বিষম খাওয়া ছাড়া। আর আমি যখন কপালে চোখ তুলে ত্রিভুবন দেখছি, তখন সব খাবারগুলো ব্ৰহ্মবিকাশবাবু পরিপাটি করে খেয়ে ফেলেন।
কী রকম?
আরে সেইটেই তো প্যাঁচ। এক কামড়ে যেই আধখানা কাটলেট মুখে পুরেছি, ব্রহ্মবিকাশ বললেন, ওহে টেনিরাম, একটা মজার ব্যাপার শোনো। এক ভদ্দরলোক না– পকেটে একটা মস্ত ছুঁচো নিয়ে বাসে উঠেছেন। যেই পকেটমার সে-পকেটে হাত ঢুকিয়েছে, অমনি ছুঁচোটা ই-ক্রিচ বলে দিয়েছে তার আঙুলে কামড়ে
বুঝলি, সেরেফ একটা বাজে মিথ্যে কথা। কেউ কি ছুঁচো পকেটে নিয়ে বাসে ওঠে? ছুঁচো কি মানিব্যাগ না রুমাল? কিংবা চাবির রিং? কিন্তু এমন বিটকেল ভঙ্গিতে কথাটা বললেন যে শুনে আমার বেদম হাসি পেয়ে গেল। সেই হাসির চোখে আধখানা কাটলেট গলায় গিয়ে আটকাল- দম আটকে যাই আর কি! চাকরটা বোধহয় জল হাতে রেডিই ছিল; মাথায় থাবড়ে-থাবড়ে জল দিতে যখন আমি খানিকটা সুস্থ হলুম–তখন বুঝলি, প্রায় সব ফিনিশ–কেবল আমার পাতের সেই আধখানা কাটলেট পড়ে আছে। গোটাটা উনিই তুলে মেরে দিয়েছেন।
