হাবুল চুকচুক করে বললে, ইস ইস! আইচ্ছা ফ্যাচাঙে তো পইড়া গেছে তোমার ভুলোদা।
আমি বললুম, কিন্তু কী কিপটে দেখেছিস! তখনও পয়সার দিকে নজরটা ঠিক আছে।
টেনিদা বললে, তা আছে! ওই জন্যেই তো মা কালী ওকে দয়া করলেন না। সাদাসিধে মানুষগুলোর হকের পয়সা এইভাবে ঠকানো! এখন বোঝ মজাটা।
ভুলোদা তো সমানে জপ করছে : মা–মা–সোয়া পাঁচ আনা না–না-সোয়া পাঁচ পয়সার পুজো দেব–আর এদিকে যে-লোকটা মাথা পেতে ঠায় বসেই ছিল, তার ঘাড়ে ব্যথা হয়ে গেছে। সে রেগে ভুলোদার পেটে একটা খোঁচা দিয়ে বললে, আরে হাঁ করকে কাহে বৈঠা হায়।হাত লাগাও–
ভুলোদা দেখল, আর উপায় নেই। তক্ষুনি লোকটার মাথায় ক্ষুর বসিয়ে দে এক টান।
জল-টল কিছু দেয়নি- চুল ভেজেনি ওভাবে ক্ষুর লাগালে কী হয়, বুঝতেই পারিস।
আরে হাঁ-হাঁ-ক্যা করতা–বলে লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, আর ভুলোদা গি-গি-গি–বলে আওয়াজ তুলেই ঠায় অজ্ঞান।
সত্যি সত্যিই কি অজ্ঞান। আরে, না না। প্রাণটা তো বাঁচাতে হবে। তাই অজ্ঞান হওয়া ছাড়া ভুলোদা আর কোনও রাস্তা খুঁজে পেলে না।
তখন চারিদিকে ভারি গোলমাল শুরু হল।
–আরে, ক্যা ভৈল? ক্যা ভৈল? মর গেইল বা?– ক্ষুরের ঘায়ে যে-লোকটার চাঁদি ছুলে দিয়েছে সে পর্যন্ত তার পেল্লায় চাঁদিটা সামলে নিলে।
–এ জী, তুমারা ক্যা ভৈল? মানে– ওহে, তোমার কী হল?
ভুলোদা বলে চলল : গি-গি গি
তখন একজন বললে, ভূত পাকড়লি, কা?–মানে ভূতে ধরল।
সকলে একবাক্যে বললে, তাই হবে।
ব্যস আর কথা নেই। ষোলোজন লোক তক্ষুনি ভুলোদাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলল, যেভাবে শুয়োর নিয়ে যায় আর কি। ভুলোদার হাত-পা যেন ছিঁড়ে যেতে লাগল–একটুখানি নধর হুঁড়ি হয়েছিল, সেটা নাচতে লাগল ফুটবলের মতো কিন্তু ষোলোজনের কাছ থেকে বাঁচতে হলে চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় নেই। তখন গলা দিয়ে গি গি নয়–সত্যিকারের গোঁ গোঁ বেরুচ্ছে।
নিয়ে ফেললে এক রোজার বাড়িতে। সবাই মিলে চেঁচিয়ে বললে, ভূত পাকড়লি।
রোজা বললে, ঠিক হ্যায়–আচ্ছাসে পাকড়ো।
অমনি সবাই মিলে ভুলোদার হাত-পা ঠেসে ধরলে। ভুলোদা তেমনি গোঁ-গোঁ করতে লাগল।
এদিকে রোজা কতকগুলো শুকনো লঙ্কার মতো কী পুড়িয়ে ভুলোদার নাকে ধোঁয়া দিতে শুরু করলে। ফ্যাঁচচো ফ্যাচচো করে হাঁচতে-হাঁচতে ভুলোদার তো নাড়ি ছিঁড়ে যাবার দাখিল।
তারপরেই রোজা করেছে কি কোত্থেকে একটা খ্যাংড়াঝাঁটা এনে– কীসব বিড়বিড় করে বকতে বকতে ভুলোদাকে ঝপাং ঝপাং করে পিটতে আরম্ভ করেছে।
ভুলোদার অবস্থা তখন বুঝতেই পারছিস! গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল : বাবা-রে–মা-রে-ঠনঠনের কালী-রে– আমার দফা সারলে রে–আমি গেলুম রে!
নাপিতরা চোখ বড় বড় করে বললে, বাংলা বোল রহা।
তখন সবাই বললে, আঁ–বাঙালি ভূত পাকড়ালি। রাম রাম রাম।
রোজা মাথা নাড়লে। বললে, বাঙালির ভূত বহুৎ জব্বর ভূত। আরও জোরে ঝাঁটা চালাতে হবে।
ঝপাং ঝপাং ঝপাং! তার ওপরে নাকে সেই লঙ্কাপোড়ার গন্ধ। ভুলোদা আর কিছু টের পেল না।
উঠে বসল তিনঘণ্টা পরে। একটু একটু করে ব্যাপারটা খেয়াল হচ্ছে তখন। দেখলে, দুশো গাঁয়ের লোক তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। তার মাথা পরিষ্কার করে কামানো–একেবারে ন্যাড়া মুখে একটি দাড়ির চিহ্ন নেই, এমন কি ভুরু পর্যন্ত নিটোলভাবে চাঁছা। চাঁদির ওপরে দুর্গন্ধ কী একটা প্রলেপ মাখানো-গা-ভর্তি জল আর কাদা।
হেসে রোজা বললে, হাঁ, অব ঠিক হেই। ভূত ভাগ গইল বা।
হাঁ সেই থেকে ভূত সত্যিই পালিয়েছে ভুলোদার। এখন আর সস্তায় কিস্তিমাত করতে চায় না। নিয়মিত সেলুনে গিয়ে নগদ আটগণ্ডা পয়সা খরচ করে চুল ছেঁটে আসে।
তাই বলছিলুম, ওরে ক্যাবলা–
রেগে ক্যাবলা উঠে দাঁড়াল : আমি তোমার ভুলোদার মতো বিনি পয়সায় চুল ছাঁটতে চাইছিলুম–এ কথা তোমায় কে বলে?
তারপর তেমনি কায়দা করে নাকের ওপর চশমাটাকে আরও উঁচুতে তুলে, আলেকজাণ্ডারের ভঙ্গিতে গটমটিয়ে চলে গেল সে।
ব্রহ্মবিকাশের দন্তবিকাশ
হাবলু আর ক্যাবলা কলকাতায় নেই। গরমের ছুটিতে একজন গেছে বহরমপুরে পিসিমার বাড়িতে আম খেতে, আর একজন মা বাবার সঙ্গে উধাও হয়েছে শিলঙে। এখন পটলডাঙা আলো করে আছি আমরা দুই মূর্তি আমি আর টেনিদা। টেনিদাকেও দিন তিনেক দেখা যাচ্ছে না–কোন তালে যে ঘুরছে কে জানে।
ভাবছি বলটুদার কাছেই যাই, বেশ সময় কাটবে। বলটুদা আবার টেনিদার নাম শুনতে পারে না বলে, টেনিদা আবার মানুষ নাকি? এক নম্বরের চালিয়াত, কেবল উষ্টুম-ধুষ্টুম গল্প বানাতে পারে- আর সকলের সঙ্গে মারামারি করতে পারে– ছোঃ ছোঃ! আর টেনিদা বলে, বল্টে? ওটা একটা গোভূত। ফুটবল-মাঠে একবার পেলে এমন একখানা ল্যাং মেরে দেব না যে, একমাস চিতপটাং হয়ে থাকবে।
বলটুদার কাছেই বেরুচ্ছি, হঠাৎ টেনিদার সঙ্গে দেখা।
কী রে, মুখখানা যে ভারি খুশি-খুশি দেখছি- একেবারে ছানার পোলাওয়ের মতো! বলি, যাওয়া হচ্ছে কোথায়?
প্রায় বলেই ফেলেছিলুম বলটুদার বাড়ি; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিলুম। তা হলেই আর দেখতে হত না– ফটাং করে একটা রামগাঁট্টা পড়ত মাথার ওপর। বললুম, এই ইয়ে–মানে–একটু হাওয়া খেতে যাচ্ছিলুম।
দুদ্দুর–হাওয়া আবার খায় কে? হাওয়া খাওয়ার কোনও মানে হয় নাকি? হাওয়া খেয়ে পেট ভরে? চপ, কাটলেট, পুডিং–এইসব খাবি?
