কামাতে খরচ হবে বলে দাড়ি রেখেছিল। তাতে বেশ সাধু সাধু দেখাত আর গাঁয়ের সাদাসিধে মানুষ কিছু ভক্তি-ছেদ্দাও করত। কিন্তু চুলটা মাঝে-মাঝে না কাটলে মাথা কুটকুট করে। তা ছাড়া কী বলে- রাত-দিন টাকার ধান্দায় ঘুরে ভুলোদা খুব সাফসুফ থাকতেও পারে না। জামা কাচে মাসে একবার, চান করে বছরে চারবার। তাই চুল একটু বেশি বড় হলেই উকুন এসে বাসা বাঁধে। কিন্তু চুল ছাঁটাইয়েও ভুলোদার খরচ ছিল না। বেশ একটা কায়দা করে নিয়েছিল। কী কায়দা বল দিকি?
আমি বললুম, বোধ হয় নিজেই কাঁচি দিয়ে ছাঁটাই করত।
টেনিদা সুকুমার রায়ের হযবরলর কাকটার মতো দুলে-দুলে বললে, হয় নি হয় নি–ফেল!
হাবুল বললে, হ, বুঝছি। নিজের মাথার চুল খামচা খামচা কইরা টাইন্যা তুলত।
–ইঃ–কী বুদ্ধি! মগজ তো নয়–যেন নিরেট একটা খাজা কাঁঠাল বসে আছে। আয় ইদিক–খিমচে খিমচে তোর খানিক চুল তুলে দি। কেমন লাগে, টের পাবি।
টেনিদা হাত বাড়াতেই হাবুল সড়াৎ করে এক লাফে রক থেকে নেমে পড়ল।
ক্যাবলা বললে, আমরা ও-সব কায়দা-ফায়দার খবর জানব কোত্থেকে। তুমিই বলো।
টেনিদা তেলেভাজার ফাঁকা ঠোঙাটা খুঁজে একটা কিসের ভাঙা টুকরো পেলে। অগত্যা সেইটেই মুখে পুরে দিয়ে বললে, কায়দাটা বেশ মজার। ভুলোদা নজর করে দেখেছিল দেহাতী নাপিতদের মধ্যে বেশ সুন্দর একটা নিয়ম আছে। চুল-দাড়ি ছাঁটতে স্বজাতির কাছ থেকে ওরা কখনও পয়সা নেয় না। গিয়ে নমস্কার করে সামনে বসলেই বুঝে নেবে– এ আমার সমাজের লোক। তখন দিব্যি একখানা ফ্রি হেয়ার কাট! আসবার সময় আর-একটা নমস্কার করে উঠে এলেই হল– একটা পয়সা খরচ নেই।
ভুলোদাও শিখে গিয়েছিল। ব্যবসার কাজে এ-গাঁয়ে ঘুরে বেড়াতে, আসতে-যেতে দুটি নমস্কার ঠুকলেই ব্যস, কাজ হাসিল।
সেদিনও তাই করেছে। রাম রাম ভেইয়া বলে তো বসে পড়েছে এক নাপিতের সামনে, চুল ছাঁটাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেহাতী ভাষায় নানান গপ্পো চলছে। চাষের অবস্থা কেমন, কোথায় ভাণ্ডা কে ভর্তা মানে বেগুনের ঘণ্ট দিয়ে আচ্ছা পুরী খাওয়া যায়, কোন গাছে তিনোয়া চুড়ৈল- মানে তিনটে পেত্নী রহতী বা। এই সব সদালাপের ভেতর দিয়ে ভুলোদার চুল কাটা তো শেষ হল।
চলে ভেইয়া–রাম রাম– বলে ভুলোদা পা বাড়াতে যাবে, তক্ষুনি একটা কাণ্ড হল।
সামনেই গঙ্গা। একটা খেয়া নৌকো ওপার থেকে এপারে লাগল। আর দেখা গেল, সেই নৌকো থেকে জনা পনেরো লোক এদিক পানেই আসছে। বুড়ো থেকে ছোকরা পর্যন্ত সব বয়সের লোক আছে তাদের ভেতর।
দেখেই নাপিতের চোখ কপালে উঠল। হায় রাম বলে খাবি খেল একটা। ভুলোদা গুটি-গুটি চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ নাপিত খপ করে হাত চেপে ধরলে তার।
–এই ভাগতা কেঁও? বৈঠো।
ভুলোদা অবাক। পয়সা চায় নাকি? দেহাতী ভাষায় বললে, আমি পয়সা দেব কেন? আমি তো তোমার স্বজাত।
নাপিত বললে, সে বলতে হবে না আমি জানি। ওই যে পনেরোজন লোক আসছে, দেখছ না? ওদের কামাতে হবে এখন। আমি একা পারব কেন? তুমিও আমাদের স্বজাত-হাত লাগাও।
অ্যাঁ!
নাপিত টেনে ভুলোদাকে পাশে বসিয়ে দিলে। বললে, কী করবে ভেইয়া-দেশ গাঁয়ের নিয়ম তো মানতে হয়। ওরাও আমাদের জাত-কুটুম। গাঁয়ের লোক মরছে- তাই সবাই কামাতে আসছে এপারে।
নাপিত একটা খাবি খেয়েছিল, ভুলোদা চারটে বিষম খেল।
তা-তা–ওরা এপারে কেন? ওপারে কামালেই তো পারত।
নাপিত রেগে বললে, বুদ্ধ! স্বজাত হয়েও যেন কিছু জানো না। কামাবে কে–সবারই তো অশৌচ।
ভুলোদা ততক্ষণে হাঁ করে বসে পড়েছে। মুখের ভেতর টপাং করে একটা পাকা বটের ফল পড়ল, টেরও পেলে না। ব্যাপারটা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে। আর বুঝেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে তার।
বুঝলি! আরও সব মজার নিয়ম রয়েছে ওদের দেশে। গাঁয়ে কেউ মরলেই সমস্ত পুরুষমানুষকে মাথা কামাতে হবে- দাড়ি চাঁছতে হবে। তাই সবসুদ্ধু এপারে এসে পৌঁছেছে।
ভুলোদা তবু একবার শেষ চেষ্টা করলে। আমার বহু কাজ আছে পেটমে দরদ হচ্ছে–
এর মধ্যে পনেরোজন লোক এসে পড়েছে। নাপিত ধমক দিয়ে বললে আভি চুপ করো–ক্ষুর লে লেও। বলেই ভুলোদার হাতে ক্ষুর ধরিয়ে দিলে একখানা।
পনেরোজন এসে তো রাম রাম বলে নমস্কার করে গোল হয়ে বসে পড়ল। ভুলোদার তখন মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে-হাত-পা একেবারে হিম। ম্যালেরিয়ায় ভোগ্য রোগাপটকা লোক তো নয়–ইয়া ইয়া সব জোয়ান। সঙ্গে পাকা পাকা বাঁশের লাঠি। এমন করে ঘিরে বসেছে যে, পালানোর রাস্তাঘাট সব বন্ধ।
পয়সা দিয়ে দাড়ি কামাবার ভয়ে কোনওদিন ক্ষুর ধরেনি– চুলছাঁটা তো বেয়ারিং পোস্টেই চালিয়েছে এতকাল। মাথা-মুখ কামাবে কী– কিছুই জানে না। কিন্তু সে কথা বলবারও জো নেই। এক্ষুনি দিব্যি বিনি-পয়সায় চুল কেটে নিয়েছে। যদি বলতে যায়, আমি তোমাদের সমাজের লোক নই- তা হলে কেবল নাপিতই নয়, সবসুদ্ধ ষোলোজন লোক তাকে অ্যায়সা ঠ্যাভানি দেবে যে, ভুলোদা কেবল তক্তা নয়–একেবারে তক্তাপোশ হয়ে যাবে। চেয়ার টেবিল হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়।
নাপিত ততক্ষণে একজনের মাথা জলে ভিজিয়েছে একটুখানি, তারপর ঘচাঘচ ক্ষুর চালাতে শুরু করেছে। আর একজন দিব্যি উবু হয়ে ভুলোদার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিয়ে ঘুঘুর মতো বসে আছে।
ওদিকে ভুলোদা চোখ বুজে বলছে : হে মা কালী, এ যাত্রা আমায় বাঁচাও। তোমায় আমি সোয়া পাঁচ আনার নানাবড্ড বেশি হয়ে গেল সোয়া পাঁচ পয়সার পুজো দেব।
