টেনিদা বটে বললে, তুই একটা পয়লা নম্বরের পেঁয়াজ-চচ্চড়ি। বেশ ডিরেকশন দিয়ে দিয়ে চুল ছাঁটাচ্ছিলুম- চেঁচিয়ে-মেচিয়ে ভণ্ডুল করে দিলি। না রে ক্যাবলা, তোর কোনও ভয় নেই। আমি অ্যায়সা কায়দা করে তোর চুল ছাঁটিয়ে আনব যে, কী বলে- তোর মাথা দিয়ে কী বলে–একেবারে শিখা বেরুতে থাকবে।
হাবুল বললে, হ, শিখাই বাইর হইব। শিখার মানে হইল গিয়া টিকি।
আমি বললুম, তা বেশ তো তুই টিকিই রাখ ক্যাবলা। আমরা সবাই বেশ করে টানতে পারব!
টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, টেক কেয়ার! টিকি নিয়ে টিকটিকির মতো টিকটিক করবিনে– বলে দিচ্ছি? শিখা মানে বুঝি আর কিছু হয় না? তা হলে আলোর শিখা মানে কী? আলোর টিকি? আলোর কখনও টিকি হয়? কোন্ দিন বলবি, অন্ধকারের টিকি চাঁদের টিকি–
হাবুল খুব জ্ঞানীর মতো বললে, চাঁদের টিকি ধইর্যা রাশিয়ানরা তো টান মারছে।
আমি বাধা দিয়ে বললুম, কক্ষনো না। চাঁদের মাথা ন্যাড়া আমাদের পাড়ার নকুলবাবুর মতো। চাঁদের টিকি নেই।
ক্যাবলা বললে, উঃ–এরা তো মাথা ধরিয়ে দিলে দেখছি। ঘাট হয়েছে, আমি আর চুল ছাঁটতে চাই না। এই বসছি।
টেনিদা হতাশ হয়ে বলল,বসলি?
হ্যাঁ, বসলুম।
–আমাকে নিয়ে চুল ছাঁটতে যাবিনে?
না। ক্যাবলার মুখে একটা কঠিন প্রতিজ্ঞা দেখা দিলে : তোমাকে নিয়ে তো নয়ই। প্যালার সেই গ্রেট ছাঁটাই আমি দেখেছি, ও যে গল্পটা লিখেছিল মনের দুঃখে, সেটাও পড়েছি।
টেনিদা মন খারাপ করে বললে, তোর ভালোর জন্যেই বলেছিলুম। মানে আমার ভুলোদার মতো সস্তায় কিস্তিমাত করতে গিয়ে না পস্তাস, সেইজন্যেই বলছিলুম।
আমি বললুম, ব্যাপারটা খুলে বলো তা হলে। কী হয়েছিল তোমার ভুলোদার?
-কী হয়েছিল ভুলোদার? টেনিদা টকাং করে আমার চাঁদিতে ছোট্ট একটা গাঁট্টা মারলে : ফাঁকি দিয়ে গপ্পোটা বাগাবার চেষ্টা আর সেইটে পত্রিকায় লিখে দেবার মতলব? ও-সব চালাকি চলবে না। ভুলোদার সেই প্যাথেটিক কাহিনী শুনতে হলে চার আনার তেলেভাজা আগে আনো-কুইক।
আমার পকেটে দুআনা ছিল, আরও দুআনা হাবুলের কাছ থেকে আমায় ধার করতে হল।
.
দুখানা বেগুনি একসঙ্গে মুখে পুরে দিয়ে টেনিদা বললে, আমার ভুলোদা– মানে আমাদের দূর সম্পর্কের জ্যাঠামশাইয়ের এক ছেলে পয়সাকড়ির ব্যাপারে ছিল বেজায় টাইট। জ্যাঠামশাইয়ের টাকার অভাব ছিল না, ভুলোদাও কী সব ধানপাটের ব্যবসা করত কিন্তু একটা পয়সা খরচ করতে হলে ভুলোদার চোখ কপালে উঠে যেত।
বললে বিশ্বাস করবিনে, একদিন বাজারে গিয়ে টুক করে একটা নয়া পয়সা পড়ে গেল নালার ভেতরে। বাজারের নালা- বুঝতেই পারছিস! যেমন নোংরা– তেমনি বদখত গন্ধ তার ওপরে এক হাত পাঁক। দেখলেই নাড়ি উলটে আসে। কিন্তু ভুলোদা ছাড়বার পাত্তর নয়। এক ঘণ্টা ধরে দুহাতে সেই নালা ঘাঁটলে। আর একটার বদলে চার-চারটে নয়া পয়সা মিলল তার ভেতর থেকে, একটা অচল সিকি পেলে দুটো মরা শিঙিমাছ আর জ্যান্ত একটা খলসে মাছও পেয়ে গেল! তিনটে নয়া পয়সা নগদ লাভ হল, সেদিন আর মাছও কিনতে হল না।
হাবুল বললে, এ রাম?-থু-থু
টেনিদা বললে, থু-থু? জানিস, ভুলোদা এখন কত বড়লোক? বাড়িতে গামছা পরে বসে থাকে, কিন্তু ব্যাঙ্কে তার কত টাকা!
ক্যাবলা বললে, আমাদের বড়লোক হয়ে কাজ নেই, বেশ আছি। পচা ড্রেন থেকে মরা শিঙিমাছ খেতে পারব না– গামছা পরেও বসে থাকতে পারব না।
টেনিদা বললে না, না পারবি তো যা–কচুপোড়া খে গে।
আমি ব্যস্ত হয়ে বললুম, আঃ-ঝগড়া করছ কেন? গল্পটা বলতে দাও না।
টেনিদা গজগজ করতে লাগল; ই– বড়লোক হবেন না। না হলি তো না হলি– অত তড়পানি কিসের জন্যে র্যা? মরা শিঙিমাছ খেতে না চাস, জ্যান্ত তিমি মাছ খা গামছা পরতে না চাস আলোয়ান পরে বসে থাক। ওসব ধ্যাষ্টামো আমার ভালো লাগে না—হুঁ!
আমি বললুম, গপ্পোটা–
গপ্পোটা! টেনিদা মুখটাকে ডিম-ভাজার মতো করে বললে, ধ্যৎ। খালি কুরুবকের মতো বকবক করলে গপ্পো হয়?
ক্যাবলা বললে, কুরুবক এক রকমের ফুল। ফুল কখনও বকবক করে না।
টেনিদা চেঁচিয়ে বললে, শাট আপ? আমি বলছি কুরুবক এক রকমের বক– খুব বিচ্ছিরি বক। ফের যদি আমার সঙ্গে তক্কো করবি, তা হলে আমি এক্ষুনি কাঁচি এনে তোকে একটা গ্রেট ছাঁটাই লাগিয়ে দেব।
শুনে ক্যাবলার মুখ টুখ একবারে শুঁটকী মাছের মতো হয়ে গেল। বললে, নানা, তুমি বলে যাও। আমি আর তক্কো করব না।
করিসনি। বেঘোরে মারা যাবি তা হলে। বলে কুরুবক একরকমের ফুল। তা হলে। গোরুও একরকমের ফল, রসগোল্লা একরকমের পাখি, বানরগুলোও একরকমের পাকা তাল! যা–যা–চালাকি করিসনি।
আমি বললুম, কিন্তু ভুলোদা
–আরে গেল যা! এটা যে ভুলোদা-ভুলোদা করে খেপে যাবে দেখছি!–টেনিদা আমার চাঁদিতে আর একটা গাঁট্টা মারলে; শিঙিমাছ দিয়ে নিজেও পটোলের ঝোল খায় কিনা– তাই এত ফুর্তি হয়েছে। বলে তেলেভাজার ঠোঙা থেকে শেষ আলুর চপটা মুখে পুরে দিয়ে বললে, একদম সাইলেন্স! নইলে গল্প আমি আর বলব না।
আমরা বললুম, আচ্ছা–আচ্ছা!
টেনিদা শুরু করল :
ভুলোদা পশ্চিমে কোথায় ব্যবসা করত। ওদেশে থাকবার জন্যে আর পয়সা বাঁচাবার জন্যে তো বটেই, একেবারে পুরোপুরি দেশোয়ালি বনে গিয়েছিল। মোটা কুর্তা পরত, পায়ে দিত কাঁচা চামড়ার নাগরা গড়গড়িয়ে দেহাতী তালুতে সব সময় খইনি ডলত। পানকে বলতে পানোয়া–সাপকে বলত সাঁপোয়া। আমরা কিছু জিগ্যেস করলে অন্যমনস্কভাবে জবাব দিত–কুছ, কহলি হো?
