টেনিদা বললে, যা–যা সব-দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ঝাঁ করে রান্নাটা করে ফ্যাল বড় খিদে পেয়েছে।
তা পেয়েছে বইকি। পুরো এক হাঁড়ি লেডিকেনি এখনও গজগজ করছে পেটের ভেতর। আমাদের বরাতেই শুধু অষ্টরম্ভা। প্যাচার মতো মুখ করে আমরা কাঠখড়ি সব কুড়িয়ে আনলাম।
টেনিদা লিস্টি বার করে বললে, মাছের কালিয়া–প্যালা রাঁধিবে।
আমাকে দিয়েই শুরু। আমি মাথা চুলকে বললাম, খিচুড়ি-টিচুড়ি আগে হয়ে যাক–তবে তো?
–খিচুড়ি লাস্ট আইটেম–গরম গরম খেতে হবে। কালিয়া সকলের আগে। নে প্যালা-লেগে যা–
ক্যাবলার মা মাছ কেটে নুন-টুন মাখিয়ে দিয়েছিলেন, তাই রক্ষা। কড়াইতে তেল চাপিয়ে আমি মাছ ঢেলে দিলাম তাতে।
আরে–এ কী কাণ্ড! মাছ দেবার সঙ্গে সঙ্গেই কড়াই-ভর্তি ফেনা। তারপরেই আর কথা নেই–অতগুলো মাছ তালগোল পাকিয়ে গেল একসঙ্গে। মাছের কালিয়া নয়–মাছের হালুয়া।
ক্যাবলা আদালতের পেয়াদার মতো ঘোষণা করল : মাছের কালিয়ার তিনটে বেজে গেল।
–তবে রে ইস্টুপিড–। টেনিদা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল : কাঁচা তেলে মাছ দিয়ে। তুই কালিয়া রাঁধছিস? এবার তোর পালাজ্বরের পিলেরই একদিন কি আমারই একদিন।
এ তো মার্টিনের রেল নয়–সোজা মাঠের রাস্তা। আমার কান পাকড়াবার জন্যে টেনিদার হাতটা এগিয়ে আসার আগেই আমি হাওয়া। একেবারে পঞ্জাব মেলের স্পিডে।
টেনিদা চেঁচিয়ে বললে, খিচুড়ির লিস্ট থেকে প্যালার নাম কাটা গেল।
তা যাক। কপালে আজ হরি-মটর আছে সে তো গোড়াতেই বুঝতে পেরেছি। গোমড়া মুখে একটা আমড়া-গাছতলায় এসে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম।
বসে বসে কাঠ-পিঁপড়ে দেখছি, হঠাৎ গুটি গুটি হাবুল আর ক্যাবলা এসে হাজির।
–কী রে, তোরাও?
ক্যাবলা ব্যাজার মুখে বললে, খিচুড়ি টেনিদা নিজেই রাঁধবে। আমাদের আরও খড়ি আনতে পাঠাল।
সেই মুহূর্তেই হাবুল সেনের আবিষ্কার! একেবারে কলম্বাসের আবিষ্কার যাকে বলে?
–এই প্যালা–দ্যাখছস? ওই গাছটায় কীরকম জলপাই পাকছে!
আর বলতে হল না। আমাদের তিনজনের পেটেই তখন খিদেয় ইঁদুর লাফাচ্ছে। জলপাই-জলপাই-ই সই! সঙ্গে সঙ্গে আমরা গাছে উঠে পড়লাম–আহাটক-টক-মিঠে-মিঠে জলপাই–যেন অমৃত।
হাবুলের খেয়াল হল প্রায় ঘন্টাখানেক পরে।
–এই, টেনিদার খিচুড়ি কী হইল?
ঠিক কথা খিচুড়ি তো এতক্ষণে হয়ে যাওয়া উচিত। তড়াক করে গাছ থেকে নেমে পড়ল ওরা। হাতের কাছে পাতা-টাতা যা পেলে, তাই নিয়ে ছুটল উধ্বশ্বাসে। আমিও গেলাম পেছনে পেছনে, আশায় আশায়। মুখে যাই বলুক–এক হাতা খিচুড়িও কি আমায় দেবে না? প্রাণ কি এত পাষাণ হবে টেনিদার?
কিন্তু খানিক দূর এগিয়ে আমরা তিনজনেই থমকে দাঁড়ালাম। একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ!
টেনিদা সেই নারকেল গাছটায় হেলান দিয়ে ঘুমুচ্ছে। আর মাঝে মাঝে বলছে, দেদে ক্যাবলা, পিঠটা আর একটু ভাল করে চুলকে দে।
পিঠ চুলকে দিচ্ছে সন্দেহ কী। কিন্তু সে ক্যাবলা নয়-একটা গোদা বানর। আর চার-পাঁচটা গোল হয়ে বসেছে টেনিদার চারিদিকে। কয়েকটা তো মুঠো মুঠো চাল-ডাল মুখে পুরছে, একটা আলুগুলো সাবাড় করছে আর আস্তে আস্তে টেনিদার পিঠ চুলকে দিচ্ছে। আরামে হাঁ করে ঘুমুচ্ছে টেনিদা, থেকে থেকে বলছে, দে ক্যাবলা, আর একটু ভালো করে চুলকে দে!
এবার আমরা তিনজনে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম : টেনিদা বাঁদর বাঁদর।
–কী! আমি বাঁদর!বলেই টেনিদা হাঁ করে সোজা হয়ে বসলসঙ্গে সঙ্গেই বাপ বাপ বলে চিৎকার!
–ইঁ-ইঁ-ক্লিচ-ক্লি্চ! কিচ-কিচ!
চোখের পলকে বানরগুলো কাঁঠাল গাছের মাথায়। চাল-ডাল আলুর পুটলিও সেই সঙ্গে। আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে তরিবত করে খেতে লাগল–সেই সঙ্গে কী বিচ্ছিরি ভেংচি! ওই ভেংচি দেখেই না লঙ্কার রাক্ষসগুলো ভয় পেয়ে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিল!
পুকুরের ঘাটলায় চারজনে আমরা পাশাপাশি চুপ করে বসে রইলাম। যেন শোকসভা! খানিক পরে ক্যাবলাই স্তব্ধতা ভাঙল।
–বন-ভোজনের চারটে বাজল।
–তা বাজল।–টেনিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : কিন্তু কী করা যায় বল তো প্যালা? সেই লেডিকেনিগুলো কখন হজম হয়ে গেছে–পেট চুঁই-চুঁই করছে খিদেয়!
অগত্যা আমি বললাম, বাগানে একটা গাছে জলপাই পেকেছে, টেনিদা
জলপাই! ইউরেকা! বনে ফল-ভোজন–সেইটেই তো আসল বন-ভোজন! চল চল, শিগগির চল!
লাফিয়ে উঠে টেনিদা বাগানের দিকে ছুটল।
বেয়ারিং ছাঁট
পটলডাঙার টেনিদা, আমি আর হাবুল সেন চাটুজ্যেদের রকে বসে মন দিয়ে পেয়ারা খাচ্ছি। হঠাৎ দেখি, ক্যাবলা বেশ কায়দা করে–নাকটাকে উচ্চিংড়ের মতো আকাশে তুলে সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। কেমন একটা আলেকজাণ্ডারের মতো ভঙ্গি যেন দিগ্বিজয় করতে বেরিয়েছে।
টেনিদা খপ করে একটা লম্বা হাত বাড়িয়ে ক্যাবলাকে ধরে ফেলল।
বলি, অমন তালেবরের মতো যাওয়া হচ্ছে কোথায়? নাকের ডগায় একটা চশমা চড়িয়েছিস বলে বুঝি আমাদের দেখতেই পাসনি।
ক্যাবলা বললেন, দেখতে পাব না কেন? একটু কাজে যাচ্ছি
–এই রোববার সকালে কী এমন রাজকার্যে যাচ্ছিস র্যা! নেমন্তন্ন খেতে নাকি? তা হলে আমরাও সঙ্গে যাই।
ক্যাবলা গম্ভীর হয়ে বললে, না–নেমন্তন্ন না। আমি চুল ছাঁটতে যাচ্ছি।
চুল ছাঁটতে?–টেনিদা শুনে দারুণ খুশি হল : ডিলা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস। চল- আমিও যাচ্ছি।
এইবার আমার পালা। আমি চেঁচিয়ে বললুম, খবরদার ক্যাবলা, টেনিদাকে সঙ্গে নিয়েছিস কি মরেছিস! গত বছর টেনিদা আমাকে এমন একখানা গ্রেট-ছাঁটাই লাগিয়েছিল যে আমার বউভাতের নেমন্তন্ন খাওয়া একদম বরবাদ।
