টেনিদা বললে, বাগুইআটি ছাড়িয়ে আরও চারটে ইস্টিশান। তার মানে প্রায় এক ঘন্টার মামলা। লেডিকেনির হাঁড়িটা বের কর, ক্যাবলা।
ক্যাবলা বললে, এখুনি। তাহলে পৌঁছবার আগেই সে সাফ হয়ে যাবে?
টেনিদা বললে, সাফ হবে কেন, দুটো-একটা চেখে দেখব শুধু। আমার বাবা ট্রেনে চাপলেই খিদে পায়। এই একঘন্টা ধরে শুধু-শুধু বসে থাকতে পারব না। বের কর হাঁড়ি–চটপট–
হাঁড়ি চটপটই বেরুল–মানে, বেরুতেই হল তাকে। তারপর মার্টিনের রেলের চলার তালে তালে ঝটপট করে সাবাড় হয়ে চলল। আমি ক্যাবলা আর হাবুল সেন জুল-জুল করে শুধু তাকিয়েই রইলাম। একটা লেডিকেনি চেখে দেখতে আমরাও যে ভালোবাসি, সেকথা আর মুখ ফুটে বলাই গেল না।
ইস্টিশান থেকে নেমে প্রায় মাইলখানেক হাঁটবার পরে ক্যাবলার মামার বাড়ি। কাঁচা রাস্তা, এঁটেল মাটি, তার ওপর কাল রাতে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে আবার। আগে থেকেই রসগোল্লার হাঁড়িটা বাগিয়ে নিলে টেনিদা।
–এটা আমি নিচ্ছি। বাকি মোটঘাটগুলো তোরা নে।
–রসগোল্লা বরং আমি নিচ্ছি, তুমি চালের পোঁটলাটা নাও টেনিদা।–লেডিকেনির পরিণামটা ভেবে আমি বলতে চেষ্টা করলাম।
টেনিদা চোখ পাকাল : খবরদার প্যালা, ওসব মতলব ছেড়ে দে। টুপটাপ করে দু-চারটে গালে ফেলবার বুদ্ধি, তাই নয়?– বাবা–চালাকি ন চলিষ্যতি।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাঁটরি বোঁচকা কাঁধে ফেলে আমরা তিনজনেই এগোলাম।
কিন্তু তিন পাও যেতে হল না। তার আগেই ধাঁইধপাস্! টেনে একখানা রাম-আছাড় খেল হাবুল।
–এই খেয়েছে কচুপোড়া!–টেনিদা চেঁচিয়ে উঠল।
সারা গায়ে কাদা মেখে হাবুল উঠে দাঁড়াল। হাতের ডিমের পুঁটলিটা তখন কুঁকড়ে এতটুকু–হলদে রস গড়াচ্ছে তা থেকে।
ক্যাবলা বললে, ডিমের ডালনার বারোটা বেজে গেল।
তা গেল। করুণ চোখে আমরা তাকিয়ে রইলাম সেইদিকে। ইস–এত কষ্টের ডিম। ওরই জন্যে রাজহাঁসের কামড় পর্যন্ত খেতে হয়েছে।
টেনিদা হুঙ্কার দিয়ে উঠল : দিলে সব পণ্ড করে। এই ঢাকাই বাঙালটাকে সঙ্গে এনেই ভুল হয়েছে। পিটিয়ে ঢাকাই পরোটা করলে তবে রাগ যায়।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, হাবুল চার টাকা চাঁদা দিয়েছে–তার আগেই কী যেন একটা হয়ে গেল! হঠাৎ মনে হল আমার পা দুটো মাটি ছেড়ে শোঁ করে শূন্যে উড়ে গেল, আর তারপরেই–
কাদা থেকে যখন উঠে দাঁড়ালাম, তখন আমার মাথা-মুখ বেয়ে আচারের তেল গড়াচ্ছে। ওই অবস্থাতেই চেটে দেখলাম একটুখানি। বেশ ঝাল ঝাল টক-টক–বেড়ে আচারটা করেছিল হাবুলের দিদিমা!
ক্যাবলা আবার ঘোষণা করলে, আমের আচারের একটা বেজে গেল!
টেনিদা খেপে বললে, চুপ কর বলছি ক্যাবলা–এক চড়ে গালের বোম্বা উড়িয়ে দেব।
কিন্তু তার আগেই টেনিদার বোম্বা উড়ল–মানে স্রেফ লম্বা হল কাদায়। সাত হাত দূরে ছিটকে গেল রসগোল্লার হাঁড়ি–ধবধবে শাদা রসগোল্লাগুলো পাশের কাদাভরা খানায় গিয়ে পড়ে একেবারে নেবুর আচার।
ক্যাবলা বললে, রসগোল্লার দুটো বেজে গেল!
এবার আর টেনিদা একটা কথাও বললে না। বলবার ছিলই বা কী! রসগোল্লার শোকে বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে চারজনে পথ চলতে লাগলাম আমরা। টেনিদা তবু লেডিকেনিগুলো সাবাড় করেছে, কিন্তু আমাদের সান্ত্বনা কোথায়! অমন স্পঞ্জ রসগোল্লাগুলো।
পাঁচ মিনিট পরে টেনিদাই কথা কইল।
–তবু পোনা মাছগুলো আছে–কী বলিস! খিচুড়ির সঙ্গে মাছের কালিয়া আর আলুভাজা-নেহাত মন্দ হবে না–অ্যাঁ?
হাবুল বললে, হ-হ, সেই ভালো। বেশি খাইলে প্যাট গরম হইব। গুরুপাক না খাওয়াই ভালো।
ক্যাবলা মিটমিট করে হাসল : শেয়াল বলছিল, দ্রাক্ষাফল অতিশয় খাট্টা!ক্যাবলা ছেলেবেলায় পশ্চিমে ছিল, তাই দুই-একটা হিন্দী শব্দ বেরিয়ে পড়ে মুখ দিয়ে।
টেনিদা বললে, খাট্টা! বেশি পাঁঠঠামি করবি তো চাঁট্টা বসিয়ে দেব।
ক্যাবলা ভয়ে স্পিকটি নট! আমি তখনও নাকের পাশ দিয়ে ঝাল ঝাল টক-টক তেল চাটছি। হঠাৎ বুক-পকেটটা কেমন ভিজে ভিজে মনে হল। হাত দিয়ে দেখি, বেশ বড়োসড়ো এক-টুকরো আমের আচার তার ভেতরে কায়েমি হয়ে আছে।
–জয়গুরু! এদিক-ওদিক তাকিয়ে টপ করে সেটা তুলে নিয়ে মুখে পুরে দিলাম। সত্যিহাবুলের দিদিমা বেড়ে আচার করেছিল। আরও গোটাকয়েক যদি ঢুকত।
বাগানবাড়িতে পৌঁছুলাম আরও পনেরো মিনিট পরে।
চারিদিকে সুপুরি আর নারকেলের বাগান–একটা পানা-ভর্তি পুকুর, মাঝখানে, একতলা বাড়িটা। কিন্তু ঘরে চাবিবন্ধ। মালীটা কোথায় কেটে পড়েছে, কে জানে!
টেনিদা বললে, কুছ পরোয়া নেই। চুলোয় যাক মালী। বলং বলং বাহ্বলং নিজেরা উনুন খুঁড়বখড়ি কুড়ব, রান্না করব–মালী ব্যাটা থাকলেই তো ভাগ দিতে হত। যা হাবুল ইট কুড়িয়ে আনউনুন করতে হবে। প্যালা, কাঠ কুড়িয়ে নিয়ে আয়,ক্যাবলাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যা।
–আর তুমি?–আমি ফস করে জিজ্ঞেস করে ফেললাম।
–আমি?–একটা নারকেল গাছে হেলান দিয়ে টেনিদা হাই তুলল : আমি এগুলো সব পাহারা দিচ্ছি। সবচাইতে কঠিন কাজটাই নিলাম আমি। শেয়াল কুকুর এলে তাড়াতে হবে তো।–যা তোরাহাতে-হাতে বাকি কাজগুলো চটপট সেরে আয়।
কঠিন কাজই বটে! ইস্কুলের পরীক্ষার গার্ডদেরও অমনি কঠিন কাজ করতে হয়। ত্রৈরাশিকের অঙ্ক কষতে গিয়ে যখন ‘ঘোড়া-ঘোড়া ঘাস-ঘাস’ নিয়ে আমাদের দম আটকাবার জো, তখন গার্ড মোহিনীবাবুকে টেবিলে পা তুলে দিয়ে ফোঁরর্-ফৌ শব্দে নাক ডাকাতে দেখেছি।
