আমি বললাম, চটলে কী হবে? চারজনে মিলে চাঁদা উঠেছে দশ টাকা ছ-আনা।
টেনিদা নাক চুলকে বললে, তাহলে একটু কম-সম করেই করা যাক। ট্যাক-খালির জমিদার সব-তোদের নিয়ে ভদ্দরলোকে পিকনিক করে!
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, তুমি দিয়েছ ছ-আনা, বাকি দশ টাকা গেছে আমাদের তিনজনের পকেট থেকে। কিন্তু বললেই গাঁট্টা। আর সে গাঁট্টা ঠাট্টার জিনিস নয়-জুতসই লাগলে স্রেফ গালপাট্টা উড়ে যাবে।
রফা করতে করতে শেষ পর্যন্ত লিস্টটা যা দাঁড়াল তা এই :
খিচুড়ি (প্যালা রাজহাঁসের ডিম আনিবে বলিয়াছে)
আলু ভাজা (ক্যাবলা ভাজিবে)
পোনা মাছের কালিয়া (প্যালা রাঁধিবে)
আমের আচার (হাবুল দিদিমার ঘর হইতে হাত-সাফাই করিবে)
রসগোল্লা, লেডিকেনি (ধারে ম্যানেজ করিতে হইবে)
লিস্টি শুনে আমি হাঁড়িমুখ করে বললাম, ওর সঙ্গে আর-একটা আইটেম জুড়ে দে হাবুল। টেনিদা খাবে।
–হেঁ–হেঁ–প্যালার মগজে শুধু গোবর নেই, ছটাকখানেক ঘিলুও আছে দেখছি। বলেই টেনিদা আদর করে আমার পিঠ চাপড়ে দিলে। গেছি গেছি বলে লাফিয়ে উঠলাম আমি।
আমরা পটলডাঙার ছেলে কিছুতেই ঘাবড়াই না। চাটুজ্জেদের রোয়াকে বসে রোজ দু-বেলা আমরা গণ্ডায় গণ্ডায় হাতি-গণ্ডার সাবাড় করে থাকি। তাই বেশ ডাঁটের মাথায় বলেছিলাম, দূর-দূর। হাঁসের ডিম খায় ভদ্দরলোক। খেতে হলে রাজহাঁসের ডিম। রীতিমতো রাজকীয় খাওয়া!
–কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে শুনি? খুব যে চালিয়াতি করছিস, তুই ডিম পাড়বি নাকি?–টেনিদা জানতে চেয়েছিল।
–আমি পাড়তে যাব কোন দুঃখে? কী দায় আমার?–আমি মুখ ব্যাজার করে বলেছিলাম : হাঁসে পাড়বে।
–তা হলে সেই হাঁসের কাছ থেকে ডিম তোকেই আনতে হবে। যদি না আনিস, তা হলে–
তা হলে কী হবে বলবার দরকার ছিল না। কিন্তু কী গেরো বলল দেখি। কাল রবিবার–ভোরের গাড়িতেই আমরা বেরুব পিকনিকে। আজকের মধ্যেই রাজহাঁসের ডিম যোগাড় করতে না পারলে তো গেছি। পাড়ায় ভন্টাদের বাড়ি রাজহাঁস আছে গোটাকয়েক। ডিম-টিমও তারা নিশ্চয় পাড়ে। আমি ভন্টাকেই পাকড়ালাম। কিন্তু কী খলিফা ছেলে ভন্টা! দু-আনার পাঁঠার ঘুগনি আর ডজনখানেক ফুলুরি সাবড়ে তবে মুখ খুলল।
–ডিম দিতে পারি, তবে, নিজের হাতে বার করে নিতে হবে বাক্স থেকে।
–তুই দে না ভাই এনে। একটা আইসক্রিম খাওয়াব। ভন্টা ঠোঁট বেঁকিয়ে বললে, নিজেরা পোলাও-মাংস সাঁটবেন আর আমার বেলায় আইসক্রিম। ওতে চলবে না। ইচ্ছে হয় নিজে বের করে নাও–আমি বাবা ময়লা ঘাঁটতে পারব না। কী করি, রাজি হতে হল।
ভন্টা বললে, দুপুরবেলা আসিস। বাবা মেজদা অফিসে যাওয়ার পরে। মা তখন ভোঁস-ভোঁস করে ঘুমোয়। সেই সময় ডিম বের করে দেব।
গেলাম দুপুরে। উঠোনের একপাশে কাঠের বাক্স–তার ভেতরে সার সার খুপরি। গোটা-দুই হাঁস ভেতরে বসে ডিমে তা দিচ্ছে। ভন্টা বললে, যা–নিয়ে আয়।
কিন্তু কাছে যেতেই বিতিকিচ্ছিরিভাবে ফাঁস-ফাস করে উঠল হাঁস দুটো।
ফোঁসফোঁস করছে যে!
ভন্টা উৎসাহ দিলে : ডিম নিতে এসেছিস–একটু আপত্তি করবে না? তোর কোন ভয় নেই প্যালাদে হাত ঢুকিয়ে।
হাত ঢুকিয়ে দেব? কিন্তু কী বিচ্ছিরি ময়লা!–ময়লা আর কী বদখত গন্ধ! একেবারে নাড়ি উলটে আসে। তার ওপরে যেরকম ঠোঁট ফাঁক করে ভয় দেখাচ্ছে–
ভন্টা বললে, চিয়ার আপ প্যালা। লেগে যা!
যা থাকে কপালে বলে যেই হাত ঢুকিয়েছি–সঙ্গে সঙ্গে–ওরে বাপরে! খটাং করে হাঁসটা হাত কামড়ে ধরল। সে কী কামড়! হাঁই-মাই করে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
–কী হয়েছে রে ভন্টা, নীচে এত গোলমাল কিসের?-ভস্টার মার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল।
আমি আর নেই। তাঁচকা টানে হাঁসের ঠোঁট থেকে হাত ছাড়িয়ে চোঁচা দৌড় লাগালাম। দরদর করে রক্ত পড়ছে তখন।
রাজহাঁস এমন রাজকীয় কামড় বসাতে পারে কে জানত। কিন্তু কী ফেরোজ ভস্টাটা। জেনে-শুনে ব্রাহ্মণের রক্তপাত ঘটাল। আচ্ছা পিকনিকটা চুকে যাক–দেখে নেব তারপর। ওই পাঁঠার ঘুগনি আর ফুলুরির শোধ তুলে ছাড়ব।
কী করা যায়–গাঁটের পয়সা দিয়ে মাদ্রাজী ডিমই কিনতে হল গোটাকয়েক।
পরদিন সকালে শ্যামবাজার ইস্টিশানে পৌঁছে দেখি, টেনিদা, ক্যাবলা আর হাবুল এর মধ্যেই মার্টিনের রেলগাড়িতে চেপে বসে আছে। সঙ্গে একরাশ হঁড়ি কলসি, চালের পুঁটলি, তেলের ভাঁড়। গাড়িতে গিয়ে উঠতে টেনিদা হাঁক ছাড়ল : এনেছিস রাজহাঁসের ডিম?
দুর্গা নাম করতে করতে পুঁটলি খুলে দেখালাম।
–এর নাম রাজহাঁসের ডিম। ইয়ার্কি পেয়েছিস?–টেনিদা গাঁট্টা বাগাল।
আমি গাড়ির খোলা দরজার দিকে সরে গেলাম : মানে–ইয়ে, ছোট রাজহাঁস কিনা–
-ঘোট রাজহাঁস! কী পেয়েছিস আমাকে শুনি? পাগল না পেটখারাপ?
হাবুল সেন বললে, ছাড়ান দাও–ছাড়ান দাও। ডিম তো আনছে!
টেনিদা গর্জন করে বললে, ডিম এনেছে না কচু। এই তোকে বলে রাখছি প্যালাডিমের ডালনা থেকে তোর নাম কেটে দিলাম। এক টুকরো আলু পর্যন্ত নয়, একটু ঝোলও নয়! ..
মন খারাপ করে আমি বসে রইলাম। ডিমের ডালনা আমি ভীষণ ভালোবাসি, তাই থেকেই আমাকে বাদ দেওয়া! আচ্ছা বেশ, খেয়ো তোমমরা। এমন নজর দেব পেট ফুলে ঢোল হয়ে যাবে তোমাদের।
পিঁ করে বাঁশি বাজল–নড়ে উঠল মার্টিনের রেল। তারপর ধ্বস-ধ্বস ভোঁস ভোঁস করে এর রান্নাঘর, ওর ভাঁড়ার-ঘরের পাশ দিয়ে গাড়ি চলল।
