বাড়ি যাবেন!–টেনিদা আবার একটা যাচ্ছেতাই ভেংচি কাটল : মামাবাড়ির আবদার পেয়েছিস, না? টেক কেয়ার পেঁচো–ঠিক এক মিনিট সময় দিচ্ছি। যদি গান না ধরিস, এক থাপ্পড়ে তোর কান
ক্যাবলা বললে, কানপুরে চলে যাবে।
আমি হাবুলের কানে কানে বললুম, লোকে আমাদের এর পরে ঠেঙিয়ে মারবে, হাবলা। কী করা যায় বল তো?
তুই গান লেইখ্যা ওস্তাদি করতে গেলি ক্যান?
সংকীর্তন গাইবার বুদ্ধি তো তুই-ই দিয়েছিলি।
হাবুল কী বলতে যাচ্ছিল, আবার প্যাঁ-প্যাঁ করে হারমোনিয়াম বেজে উঠল পাঁচুর। এবং :
জাগো রে নগরবাসী–ভজো হনুমান
ঢোলক-করতালের আওয়াজে আবার চারদিকে ভূমিকম্প শুরু হল। আর পাঁচটি গলার স্বরে সেই অনবদ্য সংগীতচর্চা :
করিবেন তোমাদের তিনি বলবান–
কোনও সাড়াশব্দ নেই কোথাও। কুঁজো নয়, বেড়াল নয়, গাল নয়, কিচ্ছু নয়। সামনে কন্ট্রাকটার বিধুবাবুর নতুন তেতলা বাড়ি নিথর!
আমাদের গান চলতে লাগল :
ওগো-সকালে বিকালে যেবা করে ভীমনাম-
ডামবেল পর্যন্ত যেই এসেছে, দড়াম করে দরজা খুলে গেল আবার। গায়ে একটা কোট চড়িয়ে, একটা সুটকেস হাতে প্রায় নাচতে নাচতে বেরুলেন বাড়ির মালিক বিধুবাবু।
আমি আর হাবলা টেনে দৌড় লাগাবার তালে আছি, আঁক করে পাঁচুর গান থেমে গেছে, টেনিদার হাত থমকে গেছে ঢোলের ওপর। বিধুবাবু আমাদের মাথায় সুটকেস ছুঁড়ে মারবেন কিনা বোঝবার আগেই
ভদ্রলোক টেনিদাকে এসে জাপটে ধরলেন সুটকেসসুদ্ধ। নাচতে লাগলেন তারপর।
বাঁচালে টেনিরাম, আমায় বাঁচালে। অ্যালার্ম ঘড়িটা খারাপ হয়ে গেছে, তোমাদের ডাকাত-পড়া গান কানে না এলে ঘুম ভাঙত না; পাঁচটা সাতের গাড়ি ধরতে পারতুম না–দেড় লাখ টাকার কন্ট্রাকটই হাতছাড়া হয়ে যেত। কী চাই তোমাদের বলো। শেষ রাতে তিনশো শেয়ালের কান্না কেন জুড়ে দিয়েছ বলো–আমি তোমাদের খুশি করে দেব।
শেয়ালের কান্না না স্যার–শেয়ালের কান্না না!–বিধুবাবুর সঙ্গে নাচতে নাচতে তালে-তালে টেনিদা বলে যেতে লাগল : একসারসাইজ ক্লাব-ডামবেল বারবেল কিনব–অন্তত পঞ্চাশটা টাকা দরকার—
.
বেলা নটা। রবিবারের ছুটির দিন। চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে আছি আমরা। পাঁচুগোপালও গেস্ট হিসেবে হাজির আছে আজকে।
মেজাজ আমাদের ভীষণ ভালো। পঞ্চাশ টাকা দিয়ে গেছেন বিধুবাবু। সামনের মাসে আরও পঞ্চাশ টাকা দেবেন কথা দিয়েছেন।
নিজের পয়সা খরচ করে টেনিদা আমাদের আইসক্রিম খাওয়াচ্ছিল। আইসক্রিম শেষ করে, কাগজের গেলাসটাকে চাটতে-চাটতে বলল, তবে যে বলেছিলি হনুমান আর ভীমের নামে কাজ হয় না? হুঁ হুঁ–কলিকাল হলে কী হয়, দেবতার একটা মহিমে আছে না?
পাঁচু বললে, আর হুলো বেড়ালটা যদি আমার ঘাড়ে পড়ত
আমি বললুম, আর ফুলের টব যদি আমার মাথায় পড়ত।
হাবুল বললে, কুঁজাখান যদি দমাস কইর্যা তোমার নাকে লাগত
টেনিদা বললে, হ্যাং ইয়োর হুলো বেড়াল, ফুলের টব, কুঁজো। ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস।
আমরা চেঁচিয়ে বললুম, ইয়াক ইয়াক।
বনভোজনের ব্যাপার
হাবুল সেন বলে যাচ্ছিল–পোলাও, ডিমের ডালনা, রুই মাছের কালিয়া, মাংসের কোর্মা
উস-উস শব্দে নোলার জল টানল টেনিদা : বলে যা–থামলি কেন? মুর্গ মুসল্লম, বিরিয়ানি পোলাও, মশলদা দোসে, চাউ-চাউ, সামি কাবাব–
এবার আমাকে কিছু বলতে হয়। আমি জুড়ে দিলাম : আলু ভাজা, শুক্তো, বাটিচচ্চড়ি, কুমড়োর ছোকা–
টেনিদা আর বলতে দিলে না! গাঁক-গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠল : থাম প্যালা, থাম বলছি। শুক্তো বাটি–চচ্চড়ি।–দাঁত খিঁচিয়ে বললে, তার চেয়ে বল না হিঞ্চে সেদ্ধ, গাঁদাল আর শিঙিমাছের ঝোল! পালা-জ্বরে ভুগিস আর বাসক-পাতার রস খাস, এর চাইতে বেশি বুদ্ধি আর কী হবে তোর! দিব্যি অ্যায়সা অ্যায়সা মোগলাই খানার কথা হচ্ছিল, তার মধ্যে ধাঁ করে নিয়ে এল বাটি-চচ্চড়ি আর বিউলির ডাল! ধ্যাত্তোর।
ক্যাবলা বললে, পশ্চিমে কুঁদরুর তরকারি দিয়ে ঠেকুয়া খায়। বেশ লাগে।
–বেশ লাগে?–টেনিদা তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল : কাঁচা লঙ্কা আর ছোলার ছাতু আরও ভালো লাগে না? তবে তাই খা-গে যা। তোদের মতো উল্লুকের সঙ্গে পিকনিকের আলোচনাও ঝকমারি।
হাবুল সেন বললে, আহা-হা চৈইত্যা যাইত্যাছ কেন? পোলাপানে কয়–
–পোলাপান! এই গাড়লগুলোকে জলপান করলে তবে রাগ যায়। তাও কি খাওয়া যাবে এগুলোকে? নিম-নিসিলের চেয়েও অখাদ্য। এই রইল তোদের পিকনিক–আমি চললাম! তোরা ছোলার ছাতু আর কাঁচা লঙ্কার পিণ্ডি গেল গে–আমি ওসবের মধ্যে নেই!
সত্যিই চলে যায় দেখছি। আর দলপতি চলে যাওয়া মানেই আমরা একেবারে অনাথ। আমি টেনিদার হাত চেপে ধরলাম : আহ, বোসো না। একটা প্ল্যান-ট্যান হোক। ঠাট্টাও বোঝ না।
টেনিদা গজগজ করতে লাগল : ঠাট্টা। কুমডোর ছোকা আর কুঁদরুর তরকারি নিয়ে ওসব বিচ্ছিরি ঠাট্টা আমার ভালো লাগে না।
-না-না, ওসব কথার কথা।হাবুল সেন ঢাকাই ভাষায় বোঝাতে লাগল : মোগলাই খানা না হইলে আর পিকনিক হইল কী?
–তবে লিস্টি কর–টেনিদা নড়ে-চড়ে বসল।
প্রথমে যে লিস্টটা হল তা এইরকম :
বিরিয়ানি পোলাও
কোর্মা।
কোপ্তা কাবার দুরকম।
মাছের চপ–
মাঝখানে রেসিকের মতো বাধা দিলে ক্যাবলা : তা হলে বাবুর্চি চাই, একটা চাকর, একটা মোটর লরি, দুশো টাকা–
–দ্যাখ ক্যাবলা–টেনিদা ঘুষি বাগাতে চাইল।
