আমরা তিনজন চেঁচিয়ে উঠলুম : ইয়াক ইয়াক।
এবং পরদিন ভোরে–
শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের কাছে কাক ডাকবার আগে, ঝাড়ুদার বেরুনোর আগে প্রথম ট্রাম দেখা না দিতেই
জাগো রে নগরবাসী, ভজো হনুমান—
আগে-আগে গলায় হারমোনিয়াম নিয়ে পাঁচুগোপাল। তার পেছনে ঢোল নিয়ে টেনিদা, টেনিদার পাশে কর্তাল হাতে ক্যাবলা। থার্ড লাইনে আমি আর হাবুল সেন। টেনিদা বলে দিয়েছে, তোদের দুজনের গলা একেবারে দাঁড়কাকের মতো বিচ্ছিরি, কোনও সুর নেই, তোরা থাক ব্যাকলাইনে।
আহা–টেনিদা যেন গানের গন্ধর্ব। একদিন কী মনে করে যেন সন্ধ্যাবেলায় গড়ের মাঠে সুর ধরেছিল–আজি দখিন দুয়ার খোলা এসো হে, এসো হে, এসো হে। কিন্তু আসবে কে? জন তিনেক লোক অন্ধকারে ঘাসের ওপর শুয়েছিল, দু লাইন শুনেই তারা তড়াক তড়াক করে উঠে বসল, তারপর তৃতীয় লাইন ধরতেই দুড়দুড় করে টেনে দৌড় এসপ্ল্যানেডের দিকে–যেন ভূতে তাড়া করেছে।
আমি বলতে যাচ্ছিলুম, তোমার গলায় তো মা সরস্বতীর রাজহাঁস ডাকে কিন্তু হাবুল আমায় থামিয়ে দিলে। বললে, চুপ মাইর্যা থাক। ভালোই হইল, তর আমার গাইতে হইব না। অরা তিনটায় গাঁ-গাঁ কইর্যা চ্যাঁচাইব, তুই আর আমি পিছন থিক্যা অ্যাঁ-অ্যাঁ করুম।
সুতরাং রাস্তায় বেরিয়েই পাঁচুর হারমোনিয়ামের প্যাঁ-প্যাঁ আওয়াজ, টেনিদার দুমদাম ঢোল আর ক্যাবলার ঝমাঝম কতাল। তারপরেই বেরুল সেই বাঘা কীর্তন :
ওগো সকালে বিকালে যেবা করে ভীমনাম
পাঁচুর পিনপিনে গলা, টেনিদার গগনভেদী চিৎকার, ক্যাবলার ক্যাঁক্যাঁ আওয়াজ, হাবুলের সর্দি বসা স্বর আর সেই সঙ্গে আমার কোকিল-খাওয়া রব। কোরাস তো দূরে থাক পাঁচটা গলা পাঁচটা গোলার মতো দিগ্বিদিকে ছুটল :
জাগো রে নগরবাসী, ডন দাও–ভাঁজো রে ডামবেল-
ঘোঁয়াক ঘোঁয়াক করে আওয়াজ হল, দুটো কুকুর সারা রাত চেঁচিয়ে কেবল একটু ঘুমিয়েছে-তারা বাঁইবাঁই করে ছুটল। গড়ের মাঠের লোকগুলো তো তবু এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত দৌড়েছিল, এরা ডায়মন্ড হারবারের আগে গিয়ে থামবে বলে মনে হল না।
এবং তৎক্ষণাৎ
দড়াম করে খুলে গেল ঘোষেদের বাড়ির দরজা। বেরুলেন সেই মোটা গিন্নী–যাঁর চিৎকারে পাড়ায় কাক-চিল পড়তে পায় না।
আমাদের কোরাস থেমে গেল তাঁর একটি সিংহগর্জনে।
কী হচ্ছে অ্যাঁ। এই লক্ষ্মীছাড়া হতভাগা টেনি-কী আরম্ভ করেছিস এই মাঝরাত্তিরে?
অত বড় লিডার টেনিদাও পিছিয়ে গেল তিন পা।
মানে মাসিমা–মানে ইয়ে এই ইয়ে–একসারসাইজ ক্লাবের জন্য চাঁদা
চাঁদা! অমন মড়া-পোড়ানো গান গেয়ে–পাড়াসুদ্ধ লোকের পিলে কাঁপিয়ে মাঝরাত্তিরে চাঁদা? দূর হ এখেন থেকে ভূতের দল, নইলে পুলিশ ডাকব এক্ষুনি।
দড়াম করে দরজা বন্ধ হল পরক্ষণেই।
কীর্তন পার্টি শোকসভার মতো স্তব্ধ একেবারে।
হাবুল করুণ স্বরে বলল, হইব না টেনিদা। এই গানে কারও হৃদয় গলব না মনে হইতাছে।
হবে না মানে?–টেনিদা পান্তুয়ার মতো মুখ করে বললে, হতেই হবে। লোকের মন নরম করে তবে ছাড়ব।
কিন্তু ঘোষমাসিমা তো আরও শক্ত হয়ে গেলেন–আমাকে জানাতে হল।
উনি তো কেবল চেঁচিয়ে ঝগড়া করতে পারেন, জিমন্যাস্টিকের কী বুঝবেন! অলরাইট–নেকসট হাউস। গজকেষ্টবাবুর বাড়ি। আবার পদযাত্রা। আর সম্মিলিত রাগিণী :
খাও রে পরান ভরি ছোলা-কলা-আম-জাম-বেল–
হও রে সকলে বীর, হও ভীম, হও হনুমান
পাঁচু, টেনিদা, ক্যাবলা তেড়ে কেবল হও হনুমান পর্যন্ত গেয়েছে, আমি আর হাবলা আম পর্যন্ত বলে সুর মিলিয়েছি, অমনি গজকেষ্ট হালদারের দোতলার ঝুলবারান্দা থেকে
না, চাঁদা নয়। প্রথমে একটা ফুলের টব, তার পরেই একটা কুঁজো। মেঘনাদকে দেখা গেল না, কিন্তু টবটা আর একটু হলেই আমার মাথায় পড়ত, আর কুঁজোটা একেবারে টেনিদার মৈনাকের মতো নাকের পাশ দিয়ে ধাঁ করে বেরিয়ে গেল।
আমি চেঁচিয়ে বললুম, টেনিদা–গাইডেড মিশাইল।
বলতে বলতেই আকাশ থেকে নেমে এল প্রকাণ্ড এক হুলো বেড়াল-পড়ল পাঁচুর হারমোনিয়ামের ওপর। খ্যাঁচ-ম্যাচ করে এক বিকট আওয়াজ হারমোনিয়ামসুদ্ধু পাঁচু একেবারে চিত–আর ক্যাঁচক্যাঁচাঙ বলে বেড়ালটা পাশের গলিতে উধাও!
ততক্ষণে আমরা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছি। প্রায় হ্যারিসন রোড পর্যন্ত দৌড়ে থামতে হল আমাদের। পাঁচু কাঁদো কাঁদো গলায় বললে, টেনিদা, এনাফ। এবার আমি বাড়ি যাব।
হাবুল বললে, হ, নাইলে মারা পোড়বা সক্কলে। অখন কুজা ফ্যালাইছে, এইবারে সিন্দুক ফ্যালাইব। অখন বিলাই ছুঁইর্যা মারছে, এরপর ছাত থিক্যা গোরু ফ্যালাইব।
টেনিদা বললে, শাট আপ–ছাতে কখনও গোরু থাকে না।
না থাকুক গোরু-ফিক্যা মারতে দোষ কী। আমি অখন যাই গিয়া। হিষ্ট্রি পড়তে হইব।
এঃ–হিষ্ট্রি পড়বেন!–টেনিদা বিকট ভেংচি কাটল : ইদিকে তো আটটার আগে কোনওদিন ঘুম ভাঙে না। খবর্দার হাবলা–পালানো চলবে না। আর একটা চানস নেব। এত ভালো গান লিখেছে প্যালা, এত দরদ দিয়ে গাইছি আমরাজয় হনুমান আর বীর ভীমসেন মুখ তুলে চাইবেন না? এবং মহৎ কাজ করতে যাচ্ছি আমরা কিছু চাঁদা জুটিয়ে দেবেন না তাঁরা? ট্রাই ট্রাই এগেন। মন্ত্রের সাধন কিংবা–ধর, পাঁচু
পাঁচুগোপাল কাঁউমাউ করতে লাগল : একসকিউজ মি টেনিদা। পেল্লায় হুলো বেড়াল, আর একটু হলেই নাকফাঁক আঁচড়ে নিত আমার। আমি বাড়ি যাব।
