ক্যাবলা টকাৎ করে চুয়িং গামটাকে আবার গালের একপাশে ঠেলে দিলে।
টেনিদা–দি আইডিয়া!
আমরা সবাই একসঙ্গে ক্যাবলার দিকে তাকালুম। আমাদের দলে সেই-ই সব চেয়ে ছোট আর লেখাপড়ায় সবার সেরা–হায়ার সেকেন্ডারিতে ন্যাশনাল স্কলার। খবরের কাগজে কুশলকুমার মিত্রের ছবি বেরিয়েছিল স্ট্যান্ড করবার পরে, তোমরা তো সে-ছবি দেখেছ। সেই-ই ক্যাবলা।
ক্যাবলা ছোট হলেও আমাদের চার মূর্তির দলে সেই-ই সবচেয়ে জ্ঞানী, চশমা নেবার পরে তাকে আরও ভারিক্কি দেখায়। তাই ক্যাবলা কিছু বললে আমরা সবাই-ই মন দিয়ে তার কথা শুনি।
ক্যাবলা বললে, আমরা শেষ রাত্রে–মানে এই ভোরের আগে বেরুতে পারি সবাই।
শেষ রাত্তিরে-হাবুল হাঁ করে রইল :শেষ রাত্তিরে ক্যান? চুরি করুম নাকি আমরা?
চুপ কর না হাবলা– ক্যাবলা বিরক্ত হয়ে বললে, আগে ফিনিশ করতে দে আমাকে। আমি দেখেছি, ভোরবেলায় ছোট-ছোট দল কীর্তন গাইতে বেরোয়। লোকে রাগ করে না, সকালবেলায় ভগবানের নাম শুনে খুশি হয়। পয়সা-টয়সাও দেয় নিশ্চয়।
টেনিদা বললে, হু, রাত্তিরে ঘুমিয়ে-টুমিয়ে ভোরবেলায় লোকের মন খুশিই থাকে। তারপর যেই বাজারে কুমড়োকাঁচকলা আর চিংড়ি মাছ কিনতে গেল, অমনি মেজাজ খারাপ। আর অফিস থেকে ফেরবার পরে তো–ইরে ব্বাস।
আমি বললুম, মেজদা যেই হাসপাতাল থেকে আসে–অমনি সকলকে ধরে ইনজেকশন দিতে চায়।
হাবুল বললে, তর মেজদা যদি পাড়ার বড় লোকগুলারে ধইর্যা তাগো পুটুস-পুটুস কইর্যা ইনজেকশন দিতে পারত।
টেনিদা চেঁচিয়ে উঠল : অর্ডার-অর্ডার, ভীষণ গোলমাল হচ্ছে। কিন্তু ক্যাবলার আইডিয়াটা আমার বেশ মনে ধরেছে–মানে যাকে বলে সাইকোলজিক্যাল। সকালে লোকের মন খুশি থাকে–ইয়ে যাকে বলে বেশ পবিত্র থাকে, তখন এক-আধটা বেশ ভক্তিভরা গান-টান শুনলে কিছু-না-কিছু দেবেই। রাইট। লেগে পড়া যাক তা হলে।
আমি বললুম, কিন্তু জিমন্যাস্টিক ক্লাবের জন্যে আমরা হরিসংকীর্তন গাইব?
ক্যাবলা বললে, হরি-সংকীর্তন কেন? তুই তো একটু-আধটু লিখতে পারিস, একটা গান লিখে ফ্যাল। ভীম, হনুমান–এইসব বীরদের নিয়ে বেশ জোরালো গান।
আমি
হাঁ, তুই, তুই।–টেনিদা আবার গাঁট্টা তুলল : মাথার ঘিলুটা আর একবার নড়িয়ে দিই, তা হলেই একেবারে আকাশবাণীর মতো গান বেরুতে থাকবে।
আমি এক লাফে নেমে পড়লুম চাটুজ্যেদের রোয়াক থেকে।
বেশ, লিখব গান। কিন্তু সুর দেবে কে?
টেনিদা বললে, আরে সুরের ভাবনা কী–একটা কেত্তন-ফেত্তন লাগিয়ে দিলেই হল।
আর গাইব কেডা? হাবুলের প্রশ্ন শোনা গেল : আমাগো গলায় তো ভাউয়া ব্যাংয়ের মতন আওয়াজ বাইর অইব।
হ্যাং ইয়োর ভাউয়া ব্যাং।–টেনিদা বললে, এসব গান আবার জানতে হয় নাকি? গাইলেই হল। কেবল আমাদের থান্ডার ক্লাবের গোলকিপার পাঁচুগোপালকে একটু যোগাড় করতে হবে, ও হারমোনিয়াম বাজাতে পারে–গাইতেও পারে–মানে আমাদের লিড করবে।
হাবুল বললে, আমাগো বাড়িতে একটা কর্তাল আছে, লইয়া আসুম।
ক্যাবলা বললে, আমাদের ঠাকুর দেশে গেছে, তার একটা ঢোল আছে। সেটা আনতে পারি।
গ্র্যান্ড!-টেনিদা ভীষণ খুশি হল : ওটা আমিই বাজাব এখন। দেন এভরিথিং ইজ কমপ্লিট। শুধু গান বাকি। প্যালা-অফ অ্যান আওয়ার টাইম। দৌড়ে চলে যা–গান লিখে নিয়ে আয়। এর মধ্যে আমরা একটু তেলেভাজা খেয়েনি।
মাথা চুলকে আমি বললুম, আমিও দুটো তেলেভাজা খেয়ে গান লিখতে যাই না কেন? মানে–দু-একটা আলুর চপ-টপ খেলে বেশ ভাব আসত।
আর আলুর চপ খেয়ে কাজ নেই। যা বাড়ি যা–কুইক। আধ ঘণ্টার মধ্যে গান লিখে না আনলে ভাব কী করে বেরোয় আমি দেখব। কুইক–কুইক
টেনিদা রোয়াক থেকে নেমে পড়তে যাচ্ছিল। অগত্যা আমি ছুট লাগালুম। কুইক নয়–ক্যইকেস্ট যাকে বলে।
জাগো রে নগরবাসী, ভজো হনুমান
করিবেন তোমাদের তিনি বলবান।
ও গো–সকালে বিকালে যেবা করে ভীমনাম
সেই হয় মহাবীর নানা গুণধাম।
জাগো রে নগরবাসী–ডন দাও, ভাঁজো রে ডামবেল,
খাও রে পরান ভরি ছোলাকলা-আম-জাম-বেল
হও রে সকলে বীর, হও ভীম, হও হনুমান,
জাগিবে ভারত এতে করি অনুমান।
ক্যাবলা গান শুনে বললে, আবার অনুমান করতে গেলি কেন? লেখ–জাগিবে ভারত এতে পাইবে প্রমাণ।
টেনিদা বললে, রাইট। কারেকট সাজেসশন।
হাবুল বললে, কিন্তু মানুষরে হনুমান হইতে কইবা? চেইত্যা যাইব না?
টেনিদা বললে, চটবে কেন? পশ্চিমে হনুমানজীর কত কদর। জয় হনুমান বলেই তো কুস্তি করতে নামে। হনুমান সিং–হনুমানপ্রসাদ, এরকম কত নাম হয় ওদের। হনুমান কি চাড্ডিখানা কথা রে। এক লাফে সাগর পেরুলেন, লঙ্কা পোড়ালেন, গন্ধমাদন টেনে আনলেন, রাবণের রথের চুড়োটা কড়মড়িয়ে চিবিয়ে দিলেন এক দাঁতের জোরটাই ভেবে দ্যাখ একবার।
তবে কিনা-খাও রে পরান ভরি ছোলাকলা-আম-জাম-বেল চুয়িং গাম খেতে খেতে ক্যাবলা বললে, এই লাইনটা ঠিক
আমি বললুম, বারে, গানে রস থাকবে না? কলা-আম-জামে কত রস বল দিকি? আর দুটো-চারটে ভালো জিনিস খাওয়ার আশা না থাকলে লোকে খামকা ডামবেল বারবেল ভাঁজতেই বা যাবে কেন? লোভও তো দেখাতে হয় একটু।
ইয়া।-টেনিদা ভীষণ খুশি হল : এতক্ষণে প্যালার মাথা খুলেছে। এই গান গেয়েই আমরা কাল ভোররাত্তিরে পাড়ায় কীর্তন গাইতে বেরুব। ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস
