ততক্ষণে গাবলু মামার চটকা ভেঙেছে। মাথার ওপরে সায়েবের বুটের ঠোক্কর কাঁধে এসে লাগতেই গাবলু মামা টেনে ছুট। একদৌড়ে বাড়িতে এসে আছাড় খেয়ে পড়ল—তারপরেই একশো চার জ্বর, আর তার সঙ্গে ভুল বকুনি : ওই—ওই আম আসছে। আমায় ধরলে!
বাড়িতে তো কান্নাকাটি। আমার মনের অবস্থা তো বুঝতেই পারছিস! কিন্তু পরের দিন তাজ্জব কাণ্ড! সকালেই সায়েবের দু নম্বর চাপরাশি গাবলু মামার নামে এক চিঠি নিয়ে এসে হাজির।
ব্যাপার কী?
না–গাবলু মামার চাকরি হয়েছে। আড়াইশো টাকা মাইনের চাকরি।
কেমন করে হল? রে, কেন হবে না? সায়েব তো ফ্যানের ব্লেড থেকে ছিটকে পড়ল। পড়তেই দেখে—আশ্চর্য ঘটনা। সায়েবের দশ বছরের বাত-হাত-পা ভালো করে নাড়তে পারত না-পেশোয়ার কি আমীরের এক ধাক্কাতেই সে-বাত বাপ-বাপ করে পালিয়েছে। কাল সারা বিকেল সায়েব মাঠে ফুটবল খেলেছে, আনন্দে সকলকে ভেংচি কেটেছে, বাড়ি ফিরে তার পেল্লায় মোটা মেমসায়েবের সঙ্গে মারামারি করেছে পর্যন্ত।
আর গাবলু মামার জ্বর? তক্ষুনি রেমিশন! দশ বালতি জলে চান করে, ভাত খেয়ে, কোট-পেন্টলুন পরে গাবলু মামা তক্ষুনি সায়েবকে সেলাম দিতে ছুটল।
বুঝলি প্যালা—তাই বলছিলুম, টক আমকে অচ্ছেদ্দা করতে নেই! জুতমতো কাউকে খাইয়ে দিতে পারলে বরাত খুলে যায়।
ডালমুটের ঠোঙাটা শেষ করে টেনিদা থামল।
—আহা, এমন বাতের ওষুধ! আমি বললুম, সে আমগাছটা—
দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেনিদা বললে, ও-সব ভগবানের দান রে—বেশিদিন কি সংসারে থাকে? পরদিনই কালবৈশাখী ঝড়ে গাছটা ভেঙে পড়ে গিয়েছিল।
প্রভাতসঙ্গীত
টেনিদা অসম্ভব গম্ভীর। আমরা তিনজনও যতটা পারি গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করছি। ক্যাবলার মুখে একটা চুয়িং গাম ছিল, সেটা সে ঠেলে দিয়েছে গালের একপাশে–যেন একটা মার্বেল গালে পুরে রেখেছে এই রকম মনে হচ্ছে। পটলডাঙার মোড়ে তেলেভাজার দোকান থেকে আলুর চপ আর বেগুনী ভাজার গন্ধ আসছে, তাইতে মধ্যেমধ্যে উদাস হয়ে যাচ্ছে হাবুল সেন। কিন্তু আজকের আবহাওয়া অত্যন্ত সিরিয়াস–তেলেভাজার এমন প্রাণকাড়া গন্ধেও টেনিদা কিছুমাত্র বিচলিত হচ্ছে না।
খানিক পরে টেনিদা বলল, পাড়ার লোকগুলো কী বলদিকি?
আমি বললুম, অত্যন্ত বোগাস।
খাঁড়ার মতো নাকটাকে আরও খানিক খাড়া করে টেনিদা বললে, পয়সা তো অনেকেরই আছে। মোটরওলা বাবুও তো আছেন কজন। তবু আমাদের একসারসাইজ ক্লাবকে চাঁদা দেবে না?
না–দিব না।–হাবুল সেন মাথা নেড়ে বললে, কয়–একসারসাইজ কইর্যা কী হইব? গুণ্ডা হইব কেবল!
হ, গুণ্ডা হইব!–টেনিদা হাবুলকে ভেংচে বললে, শরীর ভালো করবার নাম হল গুণ্ডাবাজি! অথচ বিসর্জনের লরিতে যারা ভুতুড়ে নাচ নাচে, বাঁদরামো করে, তাদের চাঁদা দেবার বেলায় তো পয়সা সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসে। প্যালার মতো রোগা টিকটিকি না হয়ে
বাধা দিয়ে বললুম, আবার আমাকে কেন?
ইউ শাটাপ।–টেনিদা বাঘাটে হুংকার ছাড়ল : আমার কথার ভেতরে কুরুবকের মতো-খুব বিচ্ছিরি একটা বকের মতো বকবক করবি না–সেকথা বলে দিচ্ছি তোকে। প্যালার মতো রোগা টিকটিকি না হয়ে পাড়ার ছেলেগুলো দুটো ডাম্বেল-মুগুর ভাঁজুক, ডন দিক–এই তো আমরা চেয়েছিলাম। শরীর ভালো হবে, মনে জোর আসবে, অন্যায়ের সামনে রুখে দাঁড়াবে, বড় কাজ করতে পারবে। তার নাম গুণ্ডাবাজি। অথচ দ্যাখ-দু-চারজন ছাড়া কেউ একটা পয়সা ঠেকাল না। আমরা নিজেরা চাঁদা-টাদা দিয়ে দু-একটা ডাম্বেল-টাম্বেল কিনেছি, কিন্তু চেস্ট একসপ্যান্ডার, বারবেল
ক্যাবলা আবার চুয়িং গামটা চিবোতে আরম্ভ করল। ভরাট মুখে বললে, কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না।
হাবুল মাথা নাড়ল : দিব না। ক্লাব তুইল্যা দাও টেনিদা।
তুলে দেব? কভি নেহি টেনিদার সারা মুখে মোগলাই পরোটার মতো একটা কঠিন প্রতিজ্ঞা ফুটে বেরুল : চাঁদা তুলবই। ইউ প্যালা!
আঁতকে উঠে বললুম, অ্যাঁ?
আমাদের নিয়ে তো খুব উষ্টুম-ধুষ্টুম গপ্পো বানাতে পারিস, কাগজে ছাপাটাপাও হয়। একটা বুদ্ধি-টুদ্ধি বের করতে পারিস নে?
মাথা চুলকে বললুম, আমি–আমি
হাঁ-হাঁ, তুই-তুই।–টেনিদা কটাং করে আমার চাঁদিতে এমন গাঁট্টা মারল যে ঘিলুটিলু সব নড়ে উঠল এক সঙ্গে। আমি কেবল বললুম, ক্যাঁক।
ক্যাবলা বললে, ওরকম গাঁট্টা মারলে তো বুদ্ধি বেরুবে না, বরং তালগোল পাকিয়ে যাবে সমস্ত। এখন ক্যাঁক বলছে, এর পরে ঘ্যাঁক-ঘ্যাঁক বলতে থাকবে আর ফস করে কামড়ে দেবে কাউকে।
গাঁট্টার ব্যথা ভুলে আমি চটে গেলুম।
ঘ্যাঁক করে কামড়াব কেন? আমি কি কুকুর?
টেনিদা বললে, ইউ শাটাপ–অকর্মার ধাড়ি।
হাবুল বললে, চুপ কইর্যা থাক প্যালা–আর একখান গাট্টা খাইলে ম্যাও-ম্যাও কইর্যা বিলাইয়ের মতন ডাকতে আরম্ভ করবি। অরে ছাইড়া দাও টেনিদা। আমার মাথায় একখান বুদ্ধি আসছে।
টেনিদা ভীষণ উৎসাহ পেয়ে ঢাকাই ভাষা নকল করে ফেলল : কইয়্যা ফ্যালাও।
হাবুল বললে, আমরা গানের পার্টি বাইর করুম।
গানের পার্টি? মানে-সেই যে চাঁদা দাও গো পুরবাসী? আর শালু নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব?–টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, আহা-হা, কী একখানা বুদ্ধিই বের করলেন। লোকে সেয়ানা হয়ে গেছে, ওতে আর চিঁড়ে ভেজে? সারা দিন ঘুরে হয়তো পাওয়া যাবে বত্রিশটা নয়া পয়সা আর দুখানা ছেঁড়া কাপড়। দুদ্দুর!
