আমের লোভেই কি না কে জানে, পাটকিলে রঙের মস্ত দাড়িওলা একটা রামছাগল গুটি গুটি পায়ে আমার দিকে এগোচ্ছে। আমার সমস্ত রাগ ছাগলটার ওপরে গিয়ে পড়ল। বটে—আম খাবে। দ্যাখো একবার পেশোয়ার কি আমীরকে পরখ করে!
ছাগলে সব খায়—জানিস তো প্যালা? ছাতা খায়, খাতা খায়, হকিস্টিক খায়, জুতো খায়জুতোবুরুশওয়ালাকেও যে বাগে পেলে খায় না একথা জোর করে বলা যায় না। আমার সেই কামড়ে-দেওয়া আমাকেই দিলুম ছুড়ে ওর দিকে।
মাটিতেও পড়তে পেল না ক্রিকেটের বলের মতোই আকাশে লাফিয়ে উঠে ছাগলটা আমটাকে লুফে নিলে! তারপর?
–ব্য-আ-আ-করে গগনভেদী আওয়াজ হল একটা। একটা নয়—যেন সমস্ত ছাগলজাতি একসঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল। তারপরেই টেনে একখানা দৌড় মারল। সে কী দৌড় রে প্যালা! চক্ষের পলকে বাগান পেরুল, মাঠ পেরুল, লাফ মারতে মারতে খানা-খন্দল পেরুল। বোধহয় মেদিনীপুরে গিয়েই শেষতক সেটা থামল।
আমি জ্বলন্ত চোখে আমগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলুম। ঘটাকে একটা খাওয়াতে পারলে বুকের জ্বালা নিবত। কিন্তু সেটাকে আর পাই কোথায়? তিন দিনের মধ্যেও টিকির ডগাটি পর্যন্ত দেখতে পাব না এটা নিশ্চিন্ত।
তা হলে কাকে খাওয়াই?
নির্ঘাত গাবলু মামাকে। দুদিন আমার কান দুটো বেহালার কানের মতো আচ্ছা করে মুচড়ে দিয়েছে। এ আম গাবলু মামারই খাওয়া দরকার। গোটা আষ্টেক আম কোঁচড়ে লুকিয়ে ফিরে এলুম।
ভগবান ভরসা থাকলে সবই সম্ভব হয় প্যালা বুঝলি? বাড়ি ফিরে দেখি ভীষণ হইচই। গাবলু মামা কোন্ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে চাকরির চেষ্টায়। দইয়ের ফোঁটা-টোটা পরানো হচ্ছে—দিদিমা–বড়মামি-দাদু—সবাই একসঙ্গে দুর্গা দুর্গা কালী কালী এই সব আওড়াচ্ছেন।
গাবলু মামার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি—কেউ নেই। শুধু টেবিলের ওপর রঙচঙে একটা বেতের ঝুড়ি। তাতে বাছা বাছা সব বোম্বাই আম। ভগবান বুদ্ধি দিলেন রে পালা। কেউ দেখবার আগেই আমি ঘরে ঢুকে গোটাকয়েক বোম্বাই সরিয়ে ফেললুমতার ওপর সাজিয়ে দিলুম সাতটা পেশোয়ার কি আমীর—মানে, সাতটা অ্যাঁটম বম্।
তারপরে গোয়ালঘরে লুকিয়ে বসে সেই বোম্বাই আমগুলো সাবাড় করছি—দেখি না, সেই ঝুড়িটা নিয়ে গাবলু মামা গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আর দাদু দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সমানে কালী কালী বলতে লাগলেন।
এইবার আমার চটকা ভাঙল। অ্যাঁ—ওই আম সাহেবের কাছে ভেট যাচ্ছে। গাবলু মামার অবস্থা কী হবে ভেবে আমারই তো গায়ের রক্ত জমে গেল। চাকরি তো দুরে থাকহাড়গোড় নিয়ে গাবলু মামা ফিরতে পারলে হয়। বেশ খানিকটা অনুতাপই হল এবার। ইস—এ যে লঘু পাপে গুরুদণ্ড হয়ে গেল রে।
বললে– বিশ্বাস করবিনি প্যালা—ওই আমের জোরেই শেষতক গাবলু মামার চাকরি হয়ে গেল। কী করে? সেইটেই আদত গল্প।
যে সাহেবটার সঙ্গে মামা দেখা করতে গেল, তার নাম ডার্কডেভিল। যতটা না বুড়ো হয়েছে তার চাইতে বেশি ধরেছে বাতে। প্রায় নড়তে-চড়তে পারে না, একটা চেয়ারে বসে রাত-দিন কোঁ কোঁ করছে। তার হাতেই গাবলু মামার চাকরি।
আমের ঝুড়ি নিয়ে গিয়ে গাবলু মামা সায়েবকে সেলাম দিলে। তারপর নাক-টাক কুঁচকে, মুখটাকে হালুয়ার মতো করে বললে, মাই গার্ডেনস্ ম্যাংগো স্যার। ভেরি গুড স্যার-ফর ইয়োর ইটিং স্যার
একদম চালিয়াতি-বুঝলি প্যালা। আমার মামার বাড়ির ধারে কাছেও আমের গাছ। নেই। তবু ওসব বলতে হয়—গাবলু মামাও চালিয়ে দিলে।
সায়েবটা বেজায় লোভী, তায় রাত-দিন রোগে ভুগে লোভ আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমের ঝুড়ি দেখেই সায়েবের নোলা লকলকিয়ে উঠল। তার ওপরে আবার সেই পেশোয়র কি আমীর-তার যেমন গড়ন, তেমনি রঙ! তক্ষুনি সে ছুরি বের করলে টেবিলের টানা থেকে।
–কাম বাবু, হ্যাভ সাম (একটুখানি খাও)–বলেই এক টুকরা সে গাবলু মামার দিকে এগিয়ে দিলে।
—নো স্যার—আই ইট মেনি স্যার,—এইসব বলে গাবলু মামা হাত-টাত কচলাতে লাগল। কিন্তু সায়েবের গোঁজানিস তো? ধরেছে যখন-খাইয়ে ছাড়বেই।
অগত্যা গাবলু মামাকে নিতেই হল টুকরোটা। আর মুখে দিয়েই–
–দাদা গো! গেলুম–বলে গাবলু মামা চেয়ারসুদ্ধ উলটে পড়ে গেল। কষে একটা দাঁত নড়ছিল, সেটাও খসে গেল সঙ্গে সঙ্গেই।
আর সায়েব?
আমে কামড় দিয়েই বিটকেল আওয়াজ ছাড়লে : ও গশ্—ঘোঁয়াক। তারপরেই তোক করে এক লাফে টেবিলে উঠে পড়ল, দাঁড়িয়ে উঠে বললে, মাই গড—ঘ্যাচাৎ!
এই বলে আর-এক লাফ। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছিল, সায়েব তার একটা ব্লেডকে চেপে ধরলে। তারপর ঘুরন্ত ফ্যানের সঙ্গে শূন্যে ঘুরতে লাগল বাঁই বাঁই করে।
সে কী যাচ্ছেতাই কাণ্ড—তোকে কী বলব প্যালা। ঘরের ভেতর নানারকম আওয়াজ শুনে সায়েবের আদাঁলি ছুটে এসেছিল। সে সায়েবকে ফ্যানের সঙ্গে বনবনিয়ে ঘুরতে দেখে বললে, রামরাম—এ কেইসা কাম! বলে সে কাকের মতো হাঁ করে রইল।
আর সেই সময়েই ঘুরন্ত আর উড়ন্ত সায়েবের হাত থেকে পেশোয়ার কি আমীর টুপ করে খসে পড়ল। আর পড়বি তো পড় একেবারে আদালির হাঁকরা মুখে।—এ দেশোয়ালী ভাই জান গইরে বলে আদালি পাঁই-পাঁই করে একেবারে ইস্টিশানের প্ল্যাটফর্মে এসে পড়ল। তখন মাদ্রাজ মেল ইস্টিশান ছেড়ে চলে যাচ্ছে—এক লাফে তাতেই উঠে পড়ল আদালি, তারপর পতন ও মূছ। ওয়ালটেয়ারে গিয়ে নাকি তার জ্ঞান হয়েছিল।
