–বললাম যে বাবাঠাকুর, আমি বিড়ি খাই না।
—ওহো, তাও তো বটে! বেশ, বেশ, বিড়ি কখনও খাসনি। আর শোন—পরের উপকারে নশ্বর জীবন বিলিয়ে দে। আজ থেকেই লেগে যা–বলে কান থেকে একটা আধপোড়া বিড়ি নামিয়ে, সেটা ধরিয়ে সাধু ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হল।
টেনিদা খানিকক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপরেই কালীঘাটের মা কালীর মহিমাতেই কি না কে জানে সাধুর কথাগুলো তার মাথার মধ্যে পাক খেতে লাগল। পরোপকার? সত্যিই তো, তার মতো কি আর জিনিস আছে! জীবন আর কদিনের? সবই তো মায়া—স্রেফ ছলনা। সুতরাং যেকদিন বাঁচা যায়—লোকের ভালো করেই কাটিয়ে দেওয়া যাক।
সেই রাত্রেই সংসার ছাড়ল টেনিদা। মানে কলকাতা ছাড়ল।
গেল দেশে। কলকাতা থেকেই মাইল-দশেক দূরে ক্যানিং লাইনে বাড়ি। গাঁয়ের নাম। ধোপাখোলা। দেশের বাড়িতে দূর-সম্পর্কের এক বুড়ি জ্যাঠাইমা থাকেন। কানে খাটো। টেনিদাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, হ্যাঁ রে, এমন অসময়ে দেশে এলি যে?
—পরোপকার করব জেঠিমা!
—পুরী খেতে এসেছিস? পুরী এখানে কোথায় বাবা? পোড়া দেশে কি আর ময়দাফয়দা কিছু আছে? ইংরেজ রাজত্বে আর বেঁচে সুখ নেই।
–ইংরেজ রাজত্ব কোথায় জেঠিমা? এখন তো আমরা স্বাধীন, মানে-টেনিদা বাংলা করে বুঝিয়ে দিলে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট।
–কোট-প্যান্ট?—জেঠিমা বললেন, ছি বাবা, আমি বিধবা মানুষ, কোট-প্যান্ট পরব কেন? থান পরি।
—দুত্তোর—এ যে মহা জ্বালা হল। আমি বলছিলাম, দেশে রোগবালাই কিছু আছে?
-মালাই। মালাই খাবি? দুধই পাওয়া যায় না। গো-মড়কে সব গোক উচ্ছন্ন হয়ে গেছে।
–উঃ কানে হাত দিয়ে টেনিদা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
কিন্তু দিন-তিনেক গ্রামে ঘুরে টেনিদা বুঝতে পারল, সত্যিই পরোপকারের অখণ্ড সুযোগ আছে। গ্রাম জুড়ে দারুণ ম্যালেরিয়া। পেটভরা পিলে নিয়ে সারা গাঁয়ের লোক রাত-দিন বোঁ-বোঁ করছে। সেইদিনই কলকাতায় ফিরল টেনিদা। পাঁচ বোতল তেতো পাঁচন কিনে নিয়ে দেশে চলে গেল। কিন্তু দুনিয়াটা যে কী যাচ্ছেতাই জায়গা, সেটা টের পেতে তার দেরি হল না।
অসুখে ভুগে মরবে, তবু ওষুধ খাবে না।
একটা জামগাছের নীচে বসে ঝিমুচ্ছিল গজানন সাঁতরা। সন্দেহ কী—নির্ঘাত ম্যালেরিয়া। টেনিদা গজাননের দিকে এগিয়ে এল। তারপর গজানন ব্যাপারটা বুঝতে না বুঝতে এবং ট্য-ফোঁ করে উঠবার আগেই টেনিদা তার মুখে আধ বোতল জ্বরারি পাঁচন ঢেলে দিলে। যেমন বিচ্ছিরি, তেমনি তেতো! আসলে গজাননের জ্বর-ফর কিছু হয়নি—খেয়েছিল খানিকটা তাড়ি। যেমন পাঁচন মুখে পড়া—নেশা ছুটে গিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। তারপর সোজা মারমার শব্দে টেনিদাকে তাড়া করল।
কিন্তু ধরতে পারবে কেন? লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে টেনিদা ততক্ষণে পগার পার।
কী সাঙ্ঘাতিক লোক এই গজানন। পরোপকার বুঝল না, বুঝল না টেনিদার মধ্যে আজ মহাপুরুষ জেগে উঠেছে। তবু হাল ছাড়লে চলবে না। পরের ভালো করতে গেলে অমন কিছু-না-কিছু হয়ই। মনকে সান্ত্বনা দিয়ে টেনিদা স্বগতোক্তি করলে, এই দ্যাখো না বিদ্যাসাগর মশাই—
পরদিন বিকেলে সে গেল গ্রামের পাঁচুমামার বাড়িতে।
একটা ভাঙা ইজিচেয়ারে শুয়ে পাঁচুমামা উঃ-আঃ করছেন।
–কী হয়েছে মামা?–বগল থেকে পাঁচনের, বোতলটা বাগিয়ে দাঁড়াল টেনিদা।
—এই গেঁটে বাত বাবা! গাঁটে গাঁটে ব্যথা। করুণ স্বরে পাঁচুমামা জানাল।
–বাত? ওঃ—টেনিদা মুহূর্তের জন্যে কেমন দমে গেল। তারপরেই উৎসাহের চিহ্ন ফুটে উঠল তার চোখেমুখে।
–আর ম্যালেরিয়া? ম্যালেরিয়া কখনও হয়নি?
–হয়েছিল বইকি। গত বছর।
–হতেই হবে!—বিজ্ঞের মতো গম্ভীর গলায় টেনিদা বললে, ওই হল রোগের জড়। ওই ম্যালেরিয়া থেকেই সব। কিন্তু ভেব না তফাত সব ভালো করে দিচ্ছি।
—ভালো করে দিবি?—পাঁচুমামার মুখে-চোখে কৃতজ্ঞতা ফুটে বেরুল : তুই তা হলে ডাক্তার হয়ে এসেছিস? কই শুনিনি তো!
ডাক্তার কী বলছ মামাতার চেয়ে ঢের বড়। একেবারে মহাপুরুষ।
অগাধ বিস্ময়ে পাঁচুমামা হাঁ করলেন। টেনিদার দিকেই মুখ করে ছিলেন : কাজেই হাঁ করার সঙ্গে সঙ্গেই আর কথা নয়-জ্বরারি পাঁচন চলে গেল মামার গলার মধ্যে।
—ওয়াক-ওয়াক! ওরে বাবারে-ডাকাত রে—মেরে ফেললে রেওয়া-ওয়াক্-গেছি গেছি—পাঁচুমামা হাহাকার করে উঠলেন।
টেনিদা ততক্ষণে বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে। শুনতে পেল, ভেতর থেকে মামা অশ্রাব্য ভাষায় তাকে গাল দিচ্ছেন। তা দিন-তাতে কিছু আসে যায় না। পরোপকার তো হয়েছে। এর দাম মামা বুঝবে যথাসময়ে। তৃপ্তির হাসি নিয়ে টেনিদা পথ চলল।
খানিক দূর আসতেই চোখে পড়ল একটা আমগাছতলায় একটি বছর-আটেকের ছেলে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে চ্যাঁচাচ্ছে।
-এই, কী নাম তোর?
ছেলেটা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললে, সাচ্চু।
–লাড্ডু! তা অমন করে কাঁদছিস কেন? চোখের জলে যে হালুয়া হয়ে যাবি-আর লাড্ড থাকবি না। কী হয়েছে তোর?
–বড়দা চাঁটি মেরেছে।
—কেন, তোকে তবলা ভেবেছিল বুঝি?
–না। লাচ্ছু বললে, আমি কাঁচা আম খেতে চেয়েছিলাম।
—এই কার্তিক মাসে কাঁচা আম খেতে চেয়েছিস! শুধু চাঁটি নয়, গাঁট্টা খাওয়ার মতো শখ।
টেনিদা চলে যাচ্ছিল, কী মনে হতেই ফিরে দাঁড়াল হঠাৎ।
—তোর টক খেতে খুব ভালো লাগে বুঝি? লাড়ু মাথা নাড়ল।
—হুঁ—নির্ঘাত ম্যালেরিয়ার লক্ষ্মণ! তোর জ্বর হয়?
