-হয় বইকি।
—তবে আর কথা নেই—টেনিদা বোতল বের করে বললে, হাঁ কর—
লা আশান্বিত হয়ে বললে, আচার বুঝি?
—আচার বলে আচার। দুরাচার, কদাচার, সদাচারসক্কলের সেরা এই আচার। হাঁ কর-হাঁ কর ঝটপট—
লাড়ু হাঁ করল।
তার পরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। বাপরে মা-রে বড়দা-রে বলে লাড্ড চেঁচিয়ে উঠল।
টেনিদা দ্রুত পা চালাল।
–বাপ—
পিঠের উপর একটা ঢিল পড়তেই চমকে উঠল টেনিদা। লাড়ু ঢিল চালাচ্ছে। অতএব যঃ পলায়তি এবং প্রাণপণে। লাড়ু বাচ্চা হলেও ঢিলে বেশ জোর আসছে, হাতের তাকও তার ফসকায় না।
কিন্তু আর চলে না। গ্রামের লোক খেপে উঠেছে তার ওপর। বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখলে হইহই করে ওঠে। রাস্তায় দেখলে তেড়ে আসে। তাকে দেখলে ছেলেপুলে পালাতে পথ পায় না।
জ্যাঠাইমা বললেন, তুই কী শুরু করেছিস বাবা? লোকে যে তোকে ঠ্যাঙাবার ফন্দি আঁটছে।
টেনিদা গম্ভীর হয়ে রইল। পরে বললে, পরের জন্যে আমি প্রাণ দেব জেঠিমা!
–কী বললি? ঘরের লোকের কান কেটে নিৰি? কী সর্বনাশ! ওগো, আমাদের টেনু কি পাগল হয়ে গেল গোমড়াকান্না জুড়লেন জ্যাঠাইমা।
উদাস ব্যথিত মনে পথে বেরিয়ে পড়ল টেনিদা। কী অকৃতজ্ঞ, নরাধম দেশ। এই দেশের উপকারের জন্যে সে মরিয়া হয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে, অথচ কেউ বুঝছে না তার কদর! ছিঃ ছিঃ। এইজন্যেই দেশ আজ পরাধীনথুড়ি স্বাধীন। কিন্তু কী করা যায়? কীভাবে মানুষগুলোর উপকার করা যায়?
টেনিদা শূন্য মনে একটা গাছতলায় এসে বসল। ভরা দুপুর। কার্তিক মাসের নরম রোদের সঙ্গে ঝিরঝিরে হাওয়া। আকুল হয়ে চিন্তা করতে করতে হঠাৎ চটকা ভেঙে গেল।
একটু দূরে একটা নিমগাছের নীচে একটা ছাগল ঝিমুচ্ছে। ঝিমুচ্ছে! ভারি খারাপ লক্ষণ। এখানকার জলে হাওয়ায় ম্যালেরিয়া। ছাগলকেও ধরেছে। ধরাই স্বাভাবিক। আহা—অবোলা জীব! উপকার করতে হয়, তো ওদেরই। কেউ কখনও ওদের দুঃখ বোঝে না। আহা!
তা ছাড়া সুবিধেও আছে। মানুষের মতো এরা অকৃতজ্ঞ নয়। উপকার করতে গেলে তেড়ে মারতেও আসবে না। ঠিক কথা—আজ থেকে সেই অসহায় প্রাণীগুলোর ভালো করাই তার ব্রত। ছিঃ ছিঃ! কেন এতদিন তার একথা মনে হয়নি।
পাঁচনের বোতল বাগিয়ে নিয়ে টেনিদা ছাগলের দিকে পা বাড়াল?
তারপর?
তারপরের গল্প তো আগেই বলে নিয়েছি।
পেশোয়ার কী আমীর
চাটুজ্যেদের রকে বসে আমি একটা পাকা আমকে কায়দা করতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ খেতে হল না। গোটা-চারেক কামড় দিয়েই ফেলে দিতে হল—অ্যায়সা টক। দাঁতগুলো শিরশির করতে লাগল—মেজাজটা বেজায় খিঁচড়ে গেল আমার। বাড়িতে মাংস এসেছে দেখেছি-রাত্তিরে জুত করে হাড় চিবুতে পারব কি না কে জানে!
এই সময় কোত্থেকে পটলডাঙার টেনিদা এসে হাজির। গাঁক গাঁক করে বললে, এই প্যালা, আমটা ফেলে দিলি যে?
–যাচ্ছেতাই টক। খাওয়া যায় নাকি?
—টক? টেনিদা ধুপ করে আমার পাশে বসে পড়ে বললে, টক বলে বুঝি গেরাহ্যি হল না? সংসারে টক যদি না থাকত, তাহলে আচার পেতিস কোথায়? টক যদি না থাকত তাহলে কী করে দই জমত? টক যদি না থাকত তাহলে চালকুমড়োর সঙ্গে কামরাঙার তফাত
কী থাকত? টক যদি না থাকত তাহলে পিঁপড়েরা কী করে টক-টক হত? টক না থাকলে
টক না থাকলে পৃথিবীতে আরও অনেক অঘটন ঘটত–কিন্তু সে-সবের লম্বা লিস্টি শোনবার মতো উৎসাহ আমার ছিল না। আমি বাধা দিয়ে বললুম, তাই বলে অত টক আম কোনও ভদ্দরলোকে খেতে পারে নাকি?
আমের গন্ধে কোত্থেকে একটা মস্ত নীল রঙের কাঁঠালে-মাছি এসেছে, সেটা শেষতক টেনিদার খাঁড়ার মতো মস্ত নাকটার ওপর বসবার চেষ্টা করছিল। আমার কথা শুনে টেনিদার সেই পেল্লায় নাকের ভেতর থেকে রণ-ডরুর মতো একটা বিদঘুটে আওয়াজ বেরুল। মাছিটা শূন্যে বার-দুই ঘুরপাক খেয়ে বোঁ করে মাটিতে পড়ে গেল ভিরমি খেল না হার্টফেলই করল কে জানে?
টেনিদা বললে, ইস-স্-স্। খুব যে ভদ্দরলোক হয়ে গেছিস দেখছি। তবু যদি পালাজ্বরে ভুগে দু-বেলা পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল না খেতিস! তুই কি আমার গাবলু মামার চাইতেও ভদ্দরলোক? জানিস, গাবলু মামা এখন চারশো টাকা মাইনে পায়?
আমি ব্যাজার হয়ে বললুম, জেনে আমার লাভ কী? তোমার গাবলু মামা তো আমায় টাকা ধার দিতে যাচ্ছে না?
—তোর মত অখাদ্যিকে টাকা ধার দিতে বয়ে গেছে গাবলু মামার? টেনিদার নাক দিয়ে আবার একটা আওয়াজ বেরুল : জানিস—তিনবার আই-এ ফেল করা গাবলু মামা অত বড় চাকরিটা পেল কী করে? স্রেফ টক আমের জন্যে।
—টক আমের জন্যে? আমি হাঁ করে রইলুম : টক আম খেলে বুঝি ওই রকম চাকরি হয়?
—খেলে নয় রে গাধা-খাওয়ালে। তবে, তাক বুঝে খাওয়াতে জানা চাই। বলছি তোকে ব্যাপারটা অনেক জ্ঞান লাভ করতে পারবি। তার আগে গলির মোড় থেকে দুআনার ডালমুট নিয়ে আয়।
জ্ঞানলাভ করতে চাই আর না চাই, টেনিদা যখন ডালমুট খেতে চেয়েছে—তখন খাবেই। পকেটে পয়সা থাকলে ও ঠিক টের পায়। কী করি, আনতেই হল ডালমুট।
—তুই পেটরোগা, এ সব তোর খেতে নেই বলে এ্যাচকা টানে টেনিদা ঠোঙাটা কেড়ে নিলে। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। খেতে যখন দেবে না, তখন বেশ করে নজর দিয়ে দিই। পরে টের পাবে।
টেনিদা ভূক্ষেপ করলে না। বললে, তবে শোন। আমার মামার বাড়ি কোথায় জানিস তো? খঙ্গপুরে। সেই খঙ্গাপুর—যেখানে রেলের ইঞ্জিন-টিঞ্জিন আছে?
