—অমন বাজখাঁই গলায় চেঁচাবেন না মশাই, পিলে চমকে যায়। জজ সাহেব ভূ কোঁচাকালেন : কী বলতে হয় ঝটপট বলে ফেলুন।
উকিল একটা ঘুষি বাগিয়ে তাকালেন টেনিদার দিকে। একরাশ কালো কালো আলপিনের মতো গোঁফগুলো তাঁর খাড়া হয়ে উঠল।
–ধর্মাবতার, আসামী ভজহরি মুখুজ্জে (আমাদের টেনিদা) কী অন্যায় করেছে, তা আপনি শুনেছেন। অবোলা জীবের ওপর ভীষণ অত্যাচার সে করেছে, তার নিন্দের ভাষা নেই। একটা ছাগল পরশু থেকে কাঁচা ঘাস পর্যন্ত হজম করতে পারছে না। আর-একটা সমানে বমি করছে। আর-একটা তিন দিন ধরে যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে ফরিয়াদির একটা ট্যাঁক-ঘড়ি সুষ্ঠু চিবিয়ে ফেলেছে!
রোগা সিঁটকে একটা লোক, হলধর পালুইসে-ই ফরিয়াদি। হলধর ফোঁসফোঁস করে কাঁদতে লাগল।
–খুব ভালো ঘড়ি ছিল হুজুরকী শক্ত! আমার ছেলে ওইটে ছুঁড়ে ছুঁড়ে আম পাড়ত। চলত না বটে, তবু ঘড়ির মতো ঘড়ি ছিল একটা বলে, হলধর এবার ভেউ-ভেউ করে কেঁদে ফেলল। কান্নার বেগ একটু কমলে বললে, ঘড়ি না-হয় যাক হুজুর, কিন্তু আমার অমন তিনটে ছাগল! বুঝি পাগল হয়ে গেল হুজুর—একেবারে উদ্দাম পাগল।
জজ কানে একটা দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে চুলকোতে চুলকোতে বিরক্ত মুখে বললেন, আঃ জ্বালাতন! আরে বাপু, তুমি তো দেখছি একটা ছাগল! ছাগল কখনও পাগল হয়? সে যাক, অপরাধের গুরুত্ব চিন্তা করে আমি আসামী ভজহরি মুখুজ্যেকে তিন টাকা জরিমানা করলাম। এই তিন টাকা ফরিয়াদি হলধর পালুইকে দেওয়া হবে তার ছাগলদের রসগোল্লা খাওয়াবার জন্যে।
জজ উঠে পড়লেন।
টেনিদা আমাদের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। ভাবটা এই; এ-যাত্ৰা তরিয়ে দে! আমার ট্যাঁক তো গড়ের মাঠ।
আমি, ক্যাবলা আর হাবুল সেন—চার মূর্তির তিন মূর্তি–চাঁদা করে তিন টাকা জমা দিয়ে টেনিদাকে খালাস করে আনলাম।
নিঃশব্দে চারজনে পথ দিয়ে চলেছি। কে যে কী বলব ভেবে পাচ্ছি না।
খানিক পরে আমি বললাম, খুব ফাঁড়া কেটে গেছে।
ক্যাবলা বললে, হ্যাঁ-জেল হয়ে যেতে পারত।
হাবুল ঢাকাই ভাষায় বললে, হ, দ্বীপান্তরও হইতে পারত। একটা ছাগলা যদি মইর্যা যাইতগা, তাইলে ফাঁসি হওনই বা আশ্চর্য আছিল কী।
এতক্ষণ পরে টেনিদা গাঁকগাঁক করে উঠল : চুপ কর, মেলা বাজে বকিসনি। ইঃ, ফাঁসি। ফাঁসি হওয়া মুখের কথা কিনা।
আবার নিস্তব্ধতা। টেনিদার পেছু-পেছু আমরা গড়ের মাঠের দিকে এগিয়ে চললাম। খানিক পরে আমিই আবার জিজ্ঞাসা করলাম, চানাচুর খাবে টেনিদা?
–নাঃ—টেনিদার মুখে-মুখে একটা গভীর বৈরাগ্য।
—আইসক্রিম কিনুম?—হাবুল সেনের প্রশ্ন।
–কিচ্ছু না।—টেনিদা একটা বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : মন খিঁচড়ে গেছে বুঝলি প্যালা। সংসারে কারও উপকার করতে নেই।
আমি বললাম, নিশ্চয় না!
—উপকারীকে বাঘে খায়।–ক্যাবলা বললে।
আমার মনের কথাটা বলে দিয়েছিস বলে টেনিদা ক্যাবলার পিঠ চাপড়ে দিলে ক্যাবলা উঃ উঃ করে উঠল।
হাবুল বললে, বিনা উপকারেই যখন পৃথিবী চলতে আছে, তখন উপকার করতে গিয়ে খামকা ঝামেলা বাড়াইয়া হইব কী?
—যা কইছস!–মনের আবেগে টেনিদা এবার হাবুলের ভাষাতেই হাবুলকে সমর্থন জানাল। তারপর গর্জন করে বললে, আমি আর-একখানা নতুন বর্ণ-পরিচয় লিখব। তার প্রথম পাঠ থাকবে : কখনও পরের উপকার করিও না।
ক্যাবলা বললে, সাধু, সাধু।
টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, সাধু! খবরদার–সাধু-ফাধুর নাম আমার কাছে আর করবিনে। যদি ব্যাটাকে পাই বলে, প্রচণ্ড একটা ঘুষি হাঁকাল আকাশের দিকে।
ব্যাপারটা তা হলে খুলেই বলি গোড়া থেকে।
মানুষের অনেক রকম রোগ হয় : কালাজ্বর, পালাজ্বর, নিমোনিয়া, কলেরা, পেটফাঁপা—এমনকি ঝিনঝিনিয়া পর্যন্ত। সব রোগের ওষুধ আছে, কিন্তু একটি রোগের নেই। সে হল পরোপকার। যখন চাগায় তখন অন্য লোকের প্রাণান্ত করে ছাড়ে।
টেনিদাকে একদিন এই রোগে ধরল। ছিল বেশ, পরের মাথায় হাত বুলিয়ে খাচ্ছিল-দাচ্ছিল, বাঁশি বাজাচ্ছিল। হঠাৎ কী যে হল কালীঘাটের এক সাধুর সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল।
হাতে চিমটে, মাথায় জটা, লেংটি পরা এক বিরাটকায় সাধু। খানিকক্ষণ কটমট করে টেনিদার দিকে তাকিয়ে হেঁড়ে গলায় বললে, দে পাঁচসিকে পয়সা।
পাঁচসিকে পয়সা! টেনিদা বলতে যাচ্ছিল, ইয়ার্কি নাকি! কিন্তু সাধুর বিশাল চেহারা, বিরাট চিমটে আর জবাফুলের মতো চোখ দেখে ভেবড়ে গেল। তো-তো করে বললে, পাঁচসিকে তো নেই বাবা, আনাসাতেক হবে!
—আনা-সাতেক? আচ্ছা তাই দে, আর একটা বিড়ি।
–বিড়ি তো আমরা খাইনে বাবাঠাকুর।
—হুঁ, গুডবয় দেখছি। তা বেশ। বিড়ি-ফিড়ি কক্ষনো খাসনি—ওতে যক্ষ্মা হয়। যাক—পয়সাই দে।
পয়সা হাতে পেয়ে সাধুর হাঁড়ির মতো মুখখানা খুশিতে ভরে উঠল। ঝুলি থেকে একটা জবা ফুল বের করে টেনিদার মাথায় দিয়ে বললে, তুই এখানে কেন রে?
–আজ্ঞে প্যাঁড়া খেতে এসেছিলাম।
সাধু বললে, তা বলছি না। তুই যে মহাপুরুষ রে। তোকে দেখে মনে হচ্ছে, পরোপকার করে তুই দেশজোড়া নাম করবি।
—পরোপকার।—টেনিদা একটা ঢোক গিলে বললে, দুনিয়ায় অনেক সকাজ করেছি। বাবা। মারামারি, পরের মাথায় হাত বুলিয়ে ভীমনাগের সন্দেশ খাওয়া, ইস্কুলের সেকেন্ড পণ্ডিতের টিকি কেটে নেওয়া কিন্তু কখনও তো পরোপকার করিনি!
–করিসনি মানে?—সাধু হেঁড়ে গলায় বললে, তুই ছোকরা তো বড্ড এঁড়ে তক্কো করিস। এই আমাকে নগদ সাত আনা পয়সা দিলি, খেয়াল নেই বুঝি? আমার কথা শোন। সংসার-টংসার ছেড়ে স্রেফ হাওয়া হয়ে যা। দুনিয়ায় মানুষের অশেষ দুঃখু—সেই দুঃখু দূর করতে আদা-নুন খেয়ে লেগে পড়। আর্তের সেবা কর—দেখবি তিন দিনেই তোর নামে টি-টি পড়ে যাবে। দে-দে একটা বিড়ি দে—
