ন্যাংচাদা বলতে যাচ্ছে, তাই নাকি হঠাৎ চমচম চেঁচিয়ে উঠল : কোয়ায়েট! সব চুপ। রিহার্সেল হবে। মিস্টার ন্যাংচা—
ন্যাংচাদা বললে, আজ্ঞে?
–এক পা তুলে দাঁড়াও।
ন্যাংচাদা তাই করলে।
এবার দুপা তুলে দাঁড়াও।
ন্যাংচাদা ঘাবড়ে গিয়ে বললে, আজ্ঞে, দুপা তুলে কি
বলতেই তারাবদন চটাস করে একটা চাঁটি বসিয়ে দিলে ন্যাংচাদার গালে। বললে, রে বর্বর, স্তব্ধ করো মুখর ভাষণ! যা বলছি, তাই করো। ফিলিমে পার্ট করতে এসেছ দুপা তুলে দাঁড়াতে পারবে না! এয়ার্কি নাকি?
চাঁটি খেয়ে ন্যাংচাদার তো মাথা ঘুরে গেছে। কাঁউমাউ করে দুপা তুলে দাঁড়াতে গেল। আর যেই দুপা তুলতে গেছে, ধপাস করে পড়ে গেল মাটিতে।
সবাই চেঁচিয়ে উঠল : শেমশেম, পড়ে গেলি! ফাই–ফাই! :
ন্যাংচাদা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ফিলিমে নামতে গেলে নিশ্চয় দুপা তুলে দাঁড়াতে হয় কিন্তু কী করে যে সেটা পারা যায় কিছুতেই ভেবে পেল না।
তারাবদন ন্যাংচাদার জুলপি ধরে এমন হ্যাঁচকা মারল যে, তড়বড়িয়ে লাফিয়ে উঠতে হল বেচারিকে। তারপর তারাবদন বললে, এবার গান করো।
কী গান গাইব?
–যে গান খুশি। বেশ উপদেশপূর্ণ গান।
ন্যাংচাদা এক্কেবারে গাইতে পারে না..বুঝলি? মানে আমাদের প্যালার চাইতেও যাচ্ছেতাই গান গায়–একবার রাস্তায় যেতে-যেতে এমন তান ছেড়েছিল যে, শুনে একটা কাবলীওলা আচমকা আঁতকে উঠে ড্রেনের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু হিরো হওয়ার আনন্দে সেই ন্যাংচাদাই ভীমসেনী গলায় গান ধরল :
ভুবন নামেতে ব্যাদড়া বালক
তার ছিল এক মাসি–
ভূবনের দোষ দেখে দেখিত না
সে মাসি সর্বনাশী
এইটুকু কেবল গেয়েছে…হঠাৎ সবাই চেঁচিয়ে উঠল : স্টপ
তারাবদন বললে, না…আর গান না। এবার নাচো
-নাচব?
নিশ্চয় নাচবে।
–আমি তো নাচতে জানিনে।
নাচতে জানো না…হিরো হতে এসেছ? মামাবাড়ির আবদার পেয়েছো…না? বলেই কড়াৎ করে ন্যাংচাদার জুলপিতে আর-এক টান।
গেলুম গেলুম..বলে ন্যাংচাদা নাচতে লাগল। মানে ঠিক নাচ নয়…লাফাতে লাগল ব্যথার চোটে।
সকলে বললে, এনকোর…এনকোর!
যেই এনকোর বলা…অমনি তারাবদন আর-একটা পেল্লায় টান দিয়েছে ন্যাংচাদার জুলপিতে। পিসিমা গো গেছি..বলে ন্যাংচাদা এবার এমন নাচতে লাগল যে, তার কাছে কোথায় লাগে তোদের উদয়শংকর।
তারাবদন বললে, রাইট। ও-কে! কাট।
কাট! কাকে কাটবে? ন্যাংচাদা ভয় পেয়ে থমকে গেছে। তারাবদন বললে, এবার তা হলে সন্তরণের দৃশ্য। কী বলো বন্ধুগণ?
সঙ্গে সঙ্গে সকলে চেঁচিয়ে বললে, ঠিক…এবারে সন্তরণের দৃশ্য।
ন্যাংচাদা আরে আরে…করছ কী… বলতে বলতে সবাই ওকে চ্যাংদোলা করে তুলে ফেলল। তারপর চক্ষের পলকে নিয়ে ছুঁড়ে ফেললে সেই ডোবাটার ভেতরে।
কাদা মেখে ভূত হয়ে উঠতে যাচ্ছে…সবাই আবার ঠেলে ডোবার মধ্যে ফেলে দিলে। বলতে লাগল : সন্তরণ…সন্তরণ!
আর সন্তরণ। ন্যাংচাদার তখন প্রাণ যাওয়ার জো। সারা গা…জামাকাপড় কাদায় একাকার…নাকে-মুখে দুর্গন্ধপচা পাঁক ঢুকে গেছে, আর বিছুটির মতো সে কী জ্বলুনি। ন্যাংচাদা যেমনি উঠতে চায় অমনি সবাই তক্ষুনি তাকে ডোবায় ফেলে দেয়। আর চাঁচাতে থাকে : সন্তরণ…সন্তরণ
শেষে ন্যাংচাদা আকাশ ফাটিয়ে হাহাকার করতে লাগল..মানে হাহাকার ফিলিমে পার্ট করতে এসেছিল কিনা : বাঁচাও…বাঁচাও…আমাকে মেরে ফেললে..আমি আর ফিলিমে পার্ট করব না…
প্রাণ যখন যাবার দাখিল তখন কোত্থেকে তিন-চারজন খাকী শার্ট-প্যান্ট পরা লোক লাঠি হাতে দৌড়ে এল সেদিকে। আর তক্ষুনি তারাবদনের দল এক্কেবারে হাওয়া।
ন্যাংচাদার তখন প্রায় নাভিশ্বাস। খাকীপরা লোকগুলো তাকে পাঁক থেকে টেনে তুলে কিছুক্ষণ হাঁ করে মুখের দিকে চেয়ে রইল। শেষে বললে, ক্যা তাজ্জব! ই নৌতুন পাগলা ফির কাঁহাসে আসলো?
ব্যাপার বুঝলি? আরে…ওটা মোটেই ফিলিম স্টুডিয়ো নয়…লাম..মানে লুনাটিক অ্যাসাইলাম…অর্থাৎ কিনা পাগলা গারদ। উঁচু পাঁচিল আর লাম দেখেই ন্যাংচাদা ঘাবড়ে গিয়েছিল।
সেই থেকে ন্যাংচাদা নেংচে-নেংচে হাঁটে…আর সিনেমা হল দেখলেই চোখ বুজে করুণ গলায় গাইতে থাকে : দীনবন্ধু, কৃপাসিন্ধু..।
টেনিদা থামল। আমার ঝালমুনের শিশি ততক্ষণে সাফ। হাত চাটতে-চাটতে বললে, তাই বলছিলুম, তোর গোবরবাবুকে বারণ করে দে। আরে–আসলে ফিলিম স্টুডিয়োগুলোও এমনি পাগলা গারদ…গোবরবাবুকে স্রেফ ঘুঁটেচন্দর বানিয়ে ছেড়ে দেবে!
পরের উপকার করিও না
আমি প্যালারাম, ক্যাবলা আর হাবুল সেন—তিনজনে নেহাত গো-বেচারার মতো কাঁচুমাচু মুখ করে বসে আছি। তাকিয়ে আছি কাঠগড়ার আসামীর দিকে। তার মুখ আমাদের চেয়েও করুণ। ছ ফুট লম্বা অমন জোয়ানটা ভয়ে কেম্নের মতো কুঁকড়ে গেছে। গণ্ডারের খাঁড়ার মতো খাড়া নাকটাও যেন চেপসে গেছে একটা থ্যাবড়া ব্যাংয়ের মতো। সাধুভাষায় যাকে বলে, দস্তুরমতো পরিস্থিতি।
কে আসামী?
আর কে হতে পারে? আমাদের পটলডাঙার সেই স্বনামধন্য টেনিদা। গড়ের মাঠের গোরা ঠ্যাঙানোর সেই প্রচণ্ড প্রতাপ এখন একটা চায়ের কাপের মতো ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গেছে। চায়ের কাপ না বলে চিরতার গেলাসও বলতে পারা যায় বোধহয়।
-হুজুর ধর্মাবতার—
ফরিয়াদি পক্ষের উকিল লাফিয়ে উঠলেন। মনে হল যেন হাত দশেক ছিটকে উঠল একটা কুড়ি-নম্বরী ফুটবল। গলার আওয়াজ তো নয়—যেন আট-দশটা চীনে-পটকা ফাটল একসঙ্গে। ধর্মাবতার চেয়ারের ওপর আঁতকে উঠে পড়তে পড়তে সামলে গেলেন।
