এল-ইউ-এম! লাম। মানে ফিলাম। তার মানেই ফিলিম।
ক্যাবলা আপত্তি করলে, লাম! লাম কেন হবে? এফ-আই-এল-এম ফিলম।
টেনিদা রেগেমেগে চিৎকার করে উঠল : সায়লেন্স! আবার কুরুবকের মতো বকবক করছিস? এই রইল গল্প–আমি চললুম।
প্রায় চলেই যাচ্ছিল, আমরা টেনেটুনে টেনিদাকে বসালুম। হাবুল বললে, ছাইড়া দ্যাও ক্যাবলার কথা–চ্যাংড়া!
–চ্যাংড়া! ফের ডিসটার্ব করলে ট্যাংড়া মাছ বানিয়ে দেব বলে রাখছি। হুঁ! লোহার গেট বন্ধ দেখে ন্যাংচাদা গোড়াতে তো খুব ঘাবড়ে গেল। ভাবলে, চন্দ্রবদন নির্ঘাত গুলপট্টি দিয়ে দিব্যি পরস্মৈপদী খেয়েদেয়ে সটকান দিয়েছে। তারপর ভাবলে, অন্যদিকেও তো দরজা থাকতে পারে। দেখা যাক।
পাঁচিলের পাশ দিয়ে ঘুরঘুর করছে–গেট-ফেট তো দেখা যাচ্ছে না। খুব দমে গেছে, এমন সময় হঠাৎ ভীষণ মোটা গলায় কে বললে, হু আর ইউ?
ন্যাংচাদা তাকিয়ে দেখল, পাঁচিলের ভেতর একটা ছোট ফুটো। তার মধ্যে কার দুটো জ্বলজ্বলে চোখ আর একজোড়া ধুমসো গোঁফ দেখা যাচ্ছে। সেই গোঁফের তলা থেকে আবার আওয়াজ এল : হু আর ইউ?
ন্যাংচাদা বললে, আমি–মানে আমাকে চন্দ্রবদনবাবু ফিলিমে পার্ট করতে ডেকেছিলেন। এটাতে তো ইউরেকা ফিলিম?
–ইউরেকা ফিলিম?-গোঁফের তলা থেকে বিচ্ছিরি দাঁত বের করে কেমন খ্যাঁক-খেঁকিয়ে হাসল লোকটা। তারপর বললে, আলবাত ইউরেকা ফিলিম। পার্ট করবে? ভেতরে চলে এসো।
-গেট যে বন্ধ। ঢুকব কী করে?
–পাঁচিল টপকে এসো। ফিলিমে নামবে আর পাঁচিল টপকাতে পারবে না, কী বলো?
ন্যাংচাদা ভেবে দেখলে, কথাটা ঠিক। ফিলিমের কারবারই আলাদা। দ্যাখ না–বোঁ করে লোকে নল বেয়ে চারতলায় উঠে পড়ছে, ঝপাং করে পাঁচতলার থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ছে–একটা চলতি ট্রেন থেকে লাফিয়ে আর একটা ট্রেনে চলে যাচ্ছে। এসব না করতে পারলে ফিলিমে নামাবেই বা কেন? ন্যাংচাদা বুঝতে পারলে, এখানে পাঁচিল টপকে ভেতরে যাওয়াই নিয়ম, ওইটেই প্রথম পরীক্ষা।
ন্যাংচাদা কী আর করে? দেওয়ালের খাঁজে-খাঁজে পা দিয়ে উঠতে চেষ্টা করতে লাগল। দুপা ওঠে–আর সড়াৎ করে পিছলে পড়ে যায়। শখের সিলকের পাঞ্জাবি ছিঁড়ল, গায়ের নুনছাল উঠে গেল, ঠিক নাকের ডগায় আবার কুটুস করে একটা কাঠপিঁপড়ে কামড়ে দিলে। ভেতরে বোধহয় আরও কিছু লোক জড়ো হয়েছে তারা সমানে বলছে-হেঁইয়ো জোয়ান–আর একটু–আর একটু
প্রাণ যায় যায় কিন্তু ন্যাংচাদা হার মানবার পাত্তর নয়। একে বাগবাজারের ছেলে, তায় জনতার দৃশ্যে পার্ট করতে এসেছে। আধঘণ্টা ধ্বস্তাধ্বস্তি করে ঠিক উঠে গেল পাঁচিলের ওপর। বসে একটু দম নিতে যাচ্ছে, অমনি তলা থেকে কারা বললে, আয় রে আয়–চলে আয় দাদা–আয় রে, আমার কুমড়োপটাশ
আর বলেই ন্যাংচাদার পা ধরে হ্যাঁচকা টান। ন্যাংচাদা একেবারে ধপাস করে নীচে পড়ল। কুমড়োপটাশের মতোই।
কোমরে বেজায় চোট লেগেছিল, বাপ-রে মা-রে বলতে বলতে ন্যাংচাদা উঠে দাঁড়াল। দেখলে পাঁচিলে-ঘেরা মস্ত জায়গাটা সামনে খানিক মাঠের মতো–একটু দূরে একটা বড় বাড়ি, পাশেই একটা ছোট ডোবা–তাতে জল নেই, খানিক কাদা। আর তার সামনে পাঁচ-সাতজন লোক দাঁড়িয়ে নানারকম মুখভঙ্গি করছে।
একজন একটা হুঁকো টানছে–তাতে কলকে টলকে কিচ্ছুটি নেই। আর একজনের ছেঁড়া সাহেবি পোশাক কিন্তু টুপির বদলে মাথায় একটা ভাঙা বালতি বসানো। একজনের গলায় ছেঁড়া জুতোর মালা। আর একজন মুখে লম্বা-লম্বা গোঁফ-দাড়ি সমানে চেঁচিয়ে বলছে : কুকুর আসিয়া এমন কামড় দিল পথিকের পায়। বলেই সে এমন ভাবে ঘ্যাঁক করে দৌড়ে এল যে, ন্যাংচাদাকে কামড়ে দেয় আর কি।
সেই সাহেবি পোশাক পরা লোকটা ধাঁ করে রদ্দা মেরে কুকুর আসিয়া এমন কামড়কে দূরে সরিয়ে দিলে। তারপর বললে–বন্ধুগণ, আমাদের নতুন অভিনেতা এসে গেছেন। বেশ চেহারাটি।
সকলে চেঁচিয়ে বললে, হিরো আলবাত হিরো।
ন্যাংচাদা প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু হিরো শুনেই চাঙ্গা হয়ে উঠল। বুঝল, সিনেমায় তো নানারকম পার্ট করতে হয়–তাই ওরা সব ওইরকম সেজেছে, যাকে বলে মেক আপ। তারপর তাকেই হিরো করতে চায়! ন্যাংচাদা নাক আর কোমরের ব্যথা ভুলে একেবারে আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি হাসল। বললে, তা আজ্ঞে, হিরোর পার্টও আমি করতে পারব–পাড়ার থিয়েটারে দুবার আমি হনুমান সেজেছিলুম। কিন্তু চন্দ্রবদনবাবু কোথায়?
সেই জুতোর মালা-পরা লোকটা বললে, চন্দ্রবদন শ্বশুরবাড়ি গেছে–জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খেতে। আমি হচ্ছি সুর্যবদন ডিরেকটার।
বালতি মাথায় লোকটা তাকে ধাঁই করে এক চাঁটি দিলে : ইউ ব্লাডি নিগার! তুই ডিরেকটার কীরে? তুই তো একটা হুঁকোবরদার। আমি হচ্ছি ডিরেকটার–আমার নাম হচ্ছে তারাবদন।
সূর্যবদন চাঁটি খেয়ে বিড়বিড় করতে লাগল। আর যে-লোকটা কামড়াতে এসেছিল, সে সমানে বলতে লাগল :
সকালে উঠিয়া আমি মনে-মনে বলি
আজি কি সুন্দর নিশি পূর্ণিমা উদয়
একা ননী পাড়ে ছানা আমগাছে চড়ে
মহৎ যে হয় তার সাধু ব্যবহার
তারাবদন ধমকে দিয়ে বললে, চুপ! এখন রিহার্সেল হবে। তারপর হিরোবাবু-তোমার নাম কী?
ন্যাংচাদা বললে, আমার ভালো নাম বিষ্ণুচরণ–ডাকনাম ন্যাংচা।
-ন্যাংচা! আহা–খাসা নাম! শুনলেই খিদে পায়। তারপর ফিসফিসিয়ে বললে, জানো-আমার ডাক নাম চমচম!
