–অঃ, ফাঁকি দিয়ে গল্প শোনার ফন্দি? টেনি শর্মাকে অমন আনরাইপ চাইল্ড মানে কাঁচা ছেলে পাওনি বুঝেছ, প্যালারাম চন্দর? ন্যাংচাদার রোমহর্ষক কাহিনী যদি শুনতে চাও তা হলে এক্ষুনি পকেট থেকে ঝাল-নুনের শিশিটা বের করো। একটু আগেই লুকিয়ে লুকিয়ে চাটা হচ্ছিল, আমি বুঝি দেখতে পাইনি?
কী ডেঞ্জারাস চোখ-দেখেছ? কত হুঁশিয়ার হয়ে খাচ্ছি ঠিক দেখে ফেলেছ। সাধে কি ইস্কুলের পণ্ডিতমশাই টেনিদাকে বলতেন, বাবা ভজহরি–তুমি হচ্ছ পয়লা নম্বরের শিরিগাল…মানে ফকস!
দেখেছে যখন, কেড়েই নেবে। কী আর করি–মানে-মানে দিতেই হল শিশিটা।
প্রায় অর্ধেকটা ঝাল-নুন একেবারে চেটে নিয়ে টেনিদা বললে ন্যাংচাদা-মানে আমার বাগবাজারের মাসতুতো ভাই
হাবুল বললে-চোরে-চোরে।
–অ্যাঁ! কী বললি?
–না-না, আমি কিছু কই নাই। কইতাছিলাম, একটু জোরে-জোরে কও!
–জোরে?–টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে নাকটাকে আলুসেদ্ধর মতো করে বললে, আমাকে কি অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো পেলি যে, খামকা হাউমাউ করে চ্যাঁচাব? মিথ্যে বাধা দিবি তো এক গাট্টায় চাঁদি
আমি বললুম-চাঁদপুরে পাঠিয়ে দেব।
–যা বলেছিস!–বলেই টেনিদা আমার মাথায় টকাস করে গাঁট্টা মারতে যাচ্ছিল, আমি চট করে সরে গিয়ে মাথা বাঁচালুম।
আমাকে গাঁট্টা মারতে না পেরে ব্যাজার হয়ে টেনিদা বললে–দরকারের সময় হাতের কাছে কিছু পাওয়া যায় না-বোগাস। মরুক গে–ন্যাংচাদার কথাই বলি। খবরদার কথার মাঝখানে ডিসটার্ব করবি না কেউ।
হ্যাঁ, যা বলছি। আমার বাগবাজারের মাসতুতো ভাই ন্যাংচাদার ছিল ভীষণ ফিলিমে নামবার শখ! বায়োস্কোপ দেখে-দেখে রাতদিন ওর ভাব লেগেই থাকত। বললে বিশ্বাস করবিনে, বাজারে কাঁচকলা কিনতে গেছে-হঠাৎ ওর ভাব এসে গেল। বললে, ওগো তরুণ কদলী! এই নিষ্ঠুর সংসার তোমাকে ঝোলের মধ্যে রান্না করে করে খায়–তোমার অরুণ, হিয়ার করুণ ব্যথা কে বুঝবে! এই বলে, খুব কায়দা করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ওফ বলতে যাচ্ছে, এমন সময় কাঁচকলাওয়ালা বললে, কোথাকার এঁচোড়ে পাকা ছেলে রে। দিতে হয় কান ধরে এক থাপ্পড়। ন্যাংচাদা আমার কানে কানে বললে—অহো–কী নৃশংস মনুষ্য–দেখেছিস?
এমন ভাবের মাথায় কেউ কি আই-এ পাশ করতে পারে? ন্যাংচাদা সব সাবজেক্টে ফেল করে গেল। আর মেসোমশাই অফিস থেকে ফিরে এসে যা-যা বললেন, সে আর তোদের শুনে কাজ নেই। মোদ্দা, অপমানে ন্যাংচাদার সারারাত কান কটকট করতে লাগল। প্রতিজ্ঞা করল, হয় ফিলিমে নেমে প্রতিভায় চারিদিক অন্ধকার করে দেবে–নইলে এ-পোড়া কান আর রাখবে না।
-খুব ইচ্ছেশক্তি থাকলে, মানে মনে খুব তেজ এসে গেলে বুঝলি, অঘটন একটা ঘটেই যায়। ন্যাংচাদা তো মনের দুঃখে সকালবেলা দি গ্র্যান্ড আবার খাবো রেস্তোরাঁয় ঢুকে এক পেয়ালা চা আর ডবল ডিমের মামলেট নিয়ে বসেছে। এমন সময় খুব সুট-টাই হাঁকড়ে এক ছোকরা এসে বসলো ন্যাংচাদার টেবিলে। ন্যাংচাদা দেখলে, তার কাছে একটা নীল রঙের ফাইল..আর তার ওপরে খুব বড় বড় করে লেখা ইউরেকা ফিলিম কোং। নবতম অবদান-হাহাকার।
ন্যাংচাদার মনের অবস্থা তো বুঝতেই পারছিস। উত্তেজনায় তার কানের ভেতর যেন তিনটে করে উচ্চিংড়ে লাফাতে লাগল, নাকের মধ্যে যেন আরশোলারা সুড়সুড়ি দিতে লাগল। তার সামনেই জলজ্যান্ত ফিলিমের লোক বসে–তাতে আবার নবতম অবদান। একেই বলে মেঘ না চাইতে জল। কে বলে, কলিযুগে ভগবান নেই।
ন্যাংচাদা বাগবাজারের ছেলে–তুখোড় চিজ। তিন মিনিটে আলাপ জমিয়ে নিলে। লোকটার নাম চন্দ্রবদন চম্পটী–সে হল হাহাকার ফিলিমের একজন অ্যাসিসট্যান্ট। মানে, ছবির ডিরেকটারকে সাহায্য করে আর কি।
হাবুল বললে সহকারী পরিচালক।
–চোপরাও।–টেনিদা হাবুলকে এক বাঘা ধমক লাগিয়ে বলে চলল, চন্দ্রবদনকে ন্যাংচাদা ভজিয়ে ফেললে। তার বদনে দুটো ডবল ডিমের মামলেট, চারটে টোস্ট আর তিন কাপ চা ঘুষ দিয়ে–শেষে হাতে চাঁদ পেয়ে গেল ন্যাংচাদা। ওঠবার সময় চন্দ্রবদন বললে–এত করে বলছেন যখন–বেশ, আপনাকে আমি ফিলিমে চান্স দেব। কাল বেলা দশটার সময় যাবেন বরানগরের ইউরেকা ফিলিমে–নামিয়ে দেব জনতার দৃশ্যে।
হাত কচলাতে কচলাতে ন্যাংচাদা বললে, স্টুডিয়োটা কোথায়, স্যর?
চন্দ্রবদন জায়গাটা বাতলে দিলে। বললে–দেখলেই চিনতে পারবেন। উঁচু পাঁচিল বাইরে লেখা রয়েছে ইউরেকা ফিলিম কোং। আচ্ছা আসি এখন, ভেরি বিজি, টা-টা–
হাত নেড়ে চন্দ্রবদন তড়াক করে একটা চলতি বাসে উঠল।
সেদিন রাত্তিরে তো ন্যাংচাদার আর ঘুম হয় না। বার বার বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জনতার দৃশ্যে পাট করছে। মানে, কখনও স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে কখনও জয়ধ্বনি করছে, কখনও অট্টহাসি হাসছে। অবিশ্যি হাসি আর জয়ধ্বনিটা নিঃশব্দেই হচ্ছে–পাশের ঘরেই আবার মেসোমশাই ঘুমোন কিনা।
সারা রাত ধরে জনতার দৃশ্য সড়গড় করে নিয়ে ন্যাংচাদা সকাল নটার আগেই সোজা ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের বাসে চেপে বসল। তারপর জায়গাটা আঁচ করে নেমে পড়ল বাস থেকে।
খানিকটা হাঁটতেই–আরে, ওই তো উঁচু পাঁচিল। ওইটেই নিশ্চয় ইউরেকা ফিলিম।
গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল ন্যাংচাদা। বাইরে একটা মস্ত লোহার গেট–ভেতর থেকে বন্ধ। তার ওপরে বোর্ডে কী একটা নাম লেখা আছে কিন্তু লতার ঝাড়ে নামটা পড়া যাচ্ছে না-দেখা যাচ্ছে কেবল তিনটে হরফ-এল, ইউ, এম।
