কাজ দেখে যখন ফিরে আসছেন, বনের মধ্যে তখন ছায়া নেমেছে। দিব্যি ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে, চারিদিকে পাখিটাখি ডাকছে, রামগিদ্ধড়ের মেজাজটাও ভারি খুশি হয়ে রয়েছে। আস্তে-আস্তে জিপ চলেছে আর রামগিদ্ধড় গুনগুন করে গান গাইছেন : আরে হাঁবনমে চলে রামচন্দ্রজী, সাথমে চলে লছমন ভাই-এই সময় জিপের ড্রাইভার বাঁটকুল। সিং বললে, আরে এ কোন্ বেকুবের কাণ্ড। রাস্তাজুড়ে গাছের ডাল ভেঙে রেখেছে। এখন যাই কী করে? রামগিদ্ধড় দেখলেন তাই বটে। ছোট বড় ডালপালা দিয়ে বনের ছোট পথটি যেন একেবারে ব্যারিকেড করে রাখা হয়েছে। বুনো লোকগুলোর কারবারই আলাদা। বিরক্ত হয়ে বললেন, গাড়ি থামিয়ে রাস্তা সাফ করো বাঁটকুল সিং! বাঁটুল সিং জিপ থেকে নেমে রাস্তা পরিষ্কার করতে যাচ্ছে, আর ঠিক তখন–গুপ–গাপ, হুপ—হুপ–গবাৎ–
সমস্ত বন যেন একসঙ্গে ডাক ছেড়ে উঠল। গাছের মাথায় মাথায় ঝড় বয়ে গেল, আর বললে বিশ্বাস করবিনে প্যালা, দুপ-দাপ শব্দে কোত্থেকে কমসে কম দেড়শো হনুমান লাফিয়ে পড়ে রামগিদ্ধড়বাবুর জিপগাড়ি ঘেরাও করে ফেললে। দ্বিতীয় লঙ্কাকাণ্ডের পর এ যেন দ্বিতীয় রাবণবধের ব্যবস্থা।
ব্যাপার দেখেই তো বাঁটুল সিংয়ের হয়ে গেছে। সে তো আরে বাপ বলে বনবাদাড় ভেঙে দৌড়! রামগিদ্ধড়ও জিপ থেকে লাফিয়ে পড়লেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে গোদা হনুমান তাঁকে জাপটে ধরলে।
–বাবা-রে মা-রে–গেছি রে–বলে পরিত্রাহি হাঁক ছাড়লেন রামগিদ্ধড়, কিন্তু দেড়শো হনুমানের গুপ গাপ শব্দে তাঁর চ্যাঁচানি কোথায় তলিয়ে গেল। তখন কী হল বল দিকি? দুটো হনুমান তাঁর দুকান শক্ত করে পাকড়ে ধরলে, একটা তাঁর দু’গালে ঠাঁই ঠাঁই করে বেশ ক’বার চড়িয়ে দিলে।
–জান গিয়া জান গিয়া বলে যেই রামগিদ্ধড় চেঁচিয়ে উঠে হাঁক ছেড়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই যে হনুমানসকালে যাকে খুব জব্দ করেছিলেন, সে রামগিদ্ধড়ের মুখের ভেতর একখানা চাপাটি গলা পর্যন্ত ঠেসে দিলে।
কোন চাপাটি বুঝেছিস তো? মানে, লঙ্কা বাটায় লাল টুকটুকে সেই দোসরা নম্বরের চিজটি। জিভে সেটা লাগতে না লাগতেই রামগিদ্ধড়ের মুখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। একবার ফেলে দিতে গেলেন মুখ থেকে কিন্তু সাধ্য কী! তক্ষুনি দুগালে ধুমধাম করে দুই থাপ্পড়!
অগত্যা রামগিদ্ধড় নিজের কীর্তি সেই চাপাটি খেলেন, মানে খেতেই হল তাঁকে। দেড়শো হনুমানের সঙ্গে তো আর চালাকি নয়। দেড়শো হাতের দেড়শোটি চাঁটি খেলে রামগিদ্ধড়ও রাম-ইঁদুর হয়ে যাবেন। কিন্তু চাঁটি বাঁচাতে যা খেলেন তা চাপাটি নয়–সোজাসুজি দাবানল যাকে বলে। চিবুনি দিতেই চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল, মনে হতে লাগল, গলা থেকে চাঁদি পর্যন্ত কী বলে–একেবারে লেলিহান শিখায় জ্বলছে। রামগিদ্ধড় কেবল তারস্বরে বলতে পারলেন : জল–তার পরেই সব অন্ধকার।
ওদিকে কুলির দল আর বন্দুক-টক নিয়ে বাঁটকুল যখন ফিরে এল, তখন হনুমানদের এতটুকু চিহ্ন কোথাও নেই। কেবল রামগিদ্ধড় পথের মাঝখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। তারপর সেই চাপাটির চোট সামলাতে পাক্কা একটি মাস হাসপাতালে।
তাই বলছিলুম, আমার কাছে সার্কাসের শিম্পাঞ্জির গপ্পো আর করিসনি। আসল খেল দেখতে চাস তো সোজা কেওনঝড়ের জঙ্গলে চলে যা।
এই বলে পটলডাঙার টেনিদা আমার চাঁদিতে কড়াং করে একটা গাট্টা মারল আর তার পরেই তিন-চারটে বড় বড় লাফ দিয়ে সোজা শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের দিকে হাওয়া হয়ে গেল।
ন্যাংচাদার ‘হাহাকার’
ক্যাবলা বললে বড়দার বন্ধু গোবরবাবু ফিলিমে একটা পার্ট পেয়েছে।
টেনিদা চার পয়সার চীনেবাদাম শেষ করে এখন তার খোলাগুলোর ভেতর খোঁজাখুঁজি করছিল। আশা ছিল, দু-একটা শাঁস এখনও লুকিয়ে থাকতে পারে। যখন কিছু পেলে না, তখন খুব বিরক্ত হয়ে একটা খোলাই তুলে নিলে, কড়মড় করে চিবুতে চিবুতে বললে, বারণ কর ক্যাবলা–এক্ষুনি বারণ করে দে।
ক্যাবলা আশ্চর্য হয়ে বললে, কাকে বারণ করব? গোবরবাবুকে?
–আলবাত। নইলে তোর গোবরবাবু স্রেফ ঘুঁটে হয়ে যাবে।
ঘুঁটে হবে কেন? সেই যে কী বলে–মানে স্টার হবে।…আমি বলতে চেষ্টা করলুম।
স্টার হবে? আমার ন্যাংচাদাও স্টার হতে গিয়েছিল, বুঝলি? এখন নেংচে-নেংচে হাঁটে আর সিনেমা হাউসের পাশ দিয়ে যাবার সময় কানে আঙুল দিয়ে, চোখ বুজে খুব মিহি সুরে দীনবন্ধু, কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু বিতরো–এই গানটা গাইতে-গাইতে পেরিয়ে যায়।
বুঝতে পারছি। …হাবুল সেন মাথা নাড়ল : তোমার ন্যাংচাদা-রে ফিলিমের লোকেরা মাইরা ল্যাংড়া কইরা দিচ্ছে।
হঃ, মাইর্যা ল্যাংড়া করছে!–টেনিদা ভেংচে বললে, খামকা বকবক করিসনি, হাবুল। যেন এক নম্বরের কুরুবক।
ক্যাবলা বললে-কুরুবক তো ভালোই। এক রকমের ফুল।
–থাম, তুই আর সবজান্তাগিরি করিসনি। কুরুবক যদি ফুল হয়, তা হলে কানিবকও একরকমের গোলাপফুল। তা হলে পাতিহাঁসও এক রকমের ফজলি আম! তা হলে কাকগুলোও এক রকমের বনলতা হতে পারে।
ক্যাবলা বললে-বা-রে, তুমি ডিকশনারি খুলে দ্যাখো না।
শাট আপ! ডিকশনারি। আমিই আমার ডিকশনারি। আমি বলছি কুরুবক এক ধরনের বক–খুব খারাপ, খুব বিচ্ছিরি বক। যদি চালিয়াতি করবি তো এক চাঁটিতে তোর দাঁত
–দাঁতনে পাঠিয়ে দেব।–আমি জুড়ে দিলুম : কিন্তু বকের বকবকানি এখন বন্ধ করো বাপু। কী ন্যাংচাদার গল্প যেন বলছিলে?
