–না–না, তবে থাক।
.
আমি বাঁইবাঁই করে প্রায় সিকি-মাইল এগিয়ে গেলুম। আর টেনিদা লম্বা-লম্বা ঠ্যাঙে তিন লাফেই ধরে ফেলল আমাকে : বুঝলি প্যালা, সেলুন ভারি ডেঞ্জারাস জায়গা। বলতে গেলে সুন্দরবনের চাইতেও ভয়াবহ। বুঝেসুঝে ঢুকতে না পারলেই স্রেফ বেঘোরে মারা যাবি। সেইজন্যেই তো তোর সঙ্গে এলুম। আর দেখলি তো, না থাকলে এতক্ষণে হয়তো তোর ঘাড় ফাঁপানো বাবরি কিংবা দেড়-হাত টিকি বেরিয়ে যেত।
–কিন্তু চুল তো ছাঁটতেই হবে টেনিদা।
–আলবাত ছাঁটাতেই হবে। টেনিদার গলার আওয়াজ গম্ভীর হয়ে উঠল; চুল না ছাঁটলে কি চলে? ছাঁটবার জন্যেই তো চুলের জন্ম। যদি চুল ছাঁটবার ব্যবস্থা না থাকত, তা হলে কি আর চুল গজাত? দ্যাখ না ক্ষুর আছে বলেই মানুষের মুখে গোঁফ উঠেছে। তবু সংসারে এমন এক-একটা পাষণ্ড লোক আছে যারা গোঁফ কামায় না, আর ক্ষুরকে অপমান করে।
নিশ্চয় হুলোদার বাবার কথা বলছে। আমার কিন্তু ওসব ভালো লাগছিল না। বলতে যাচ্ছি ‘গোঁফ-টোফ এখন থামাও না বাপু’–এমন সময় দেখি আর-একটা সেলুন। সুকেশ কর্তনালয়! আবার ইংরেজী করে লেখা : দি বেস্ট হেয়ার কাটিং।
–টেনিদা, ওই তো সেলুন।
–সেলুন?–টেনিদা ভুরু কোঁচকালে, তারপর নাক বাঁকিয়ে পড়তে লাগল : সুকেশ কর্তনালয়। কর্তনালয়! বাপস।
–বাপস!–বাপস কেন?
টেনিদা এবার বুক চিতিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কটমট করে কিছুক্ষণ তাকাল আমার দিকে। তারপর হঠাৎ আমার চাঁদির ওপর পটাং করে গোটা দুই টোকা মেরে বললে, গাঁট্টা খেতে পারবি?
আমি বিষম চমকে উঠে বললুম, মিছিমিছি আমি গাঁট্টা খাব? আমার কী দরকার?
–গুরুজনের মুখে-মুখে তক্কো করিস ক্যান র্যা? যা বলছি জবাব দে। খেতে পারবি গাঁট্টা? পাঁচ-দশ পনেরোটা?
আমি তাড়াতাড়ি বললুম, একটাও না, একটা খেতেও রাজি নই।
–সাতটা চাঁটি?
বললুম, কী বিপদ! হচ্ছে সেলুনের কথা–চাঁটি আসে কোত্থেকে?
–আসে, আসে। চাঁটাবার মওকা পেলেই আসে। নে– জবাব দে এখন। খাবি চাঁটি?
–কক্ষনো না।
–না?–টেনিদার গলা আরও গম্ভীর : ‘জাড্যাপহ’ শব্দের মানে জানিস?
–না।
–উড়ম্বর?
–না, তাও জানি না। আমি বিব্রত হয়ে বললুম, যাচ্ছি চুল কাটতে– তুমি কেন যে এসব ফ্যাচাং
কথাটা শেষ করার আগেই টেনিদা গর্জন করে উঠল : স্তব্ধ হও, রে-রে বাচাল।
তারপর আবার গদ্য করে বললে, জানিস্ কুটমল মানে কী? বল দেখি, মকুণিকা অর্থ কী?
আমি কাতর হয়ে বললুম, কী যে বলছ টেনিদা, কোনও মানে হয় না। তুমি কি পাগল, না পারশে মাছ যে খামকা এইসব বকবক করে–
টেনিদা আবার আমার চাঁদিতে পটাং করে একটা টোকা মারল–ওরে গাধা! সেলুল্পে। নাম দেখেও বুঝতে পারিসনি? কর্তনালয়, তার ওপর আবার সুকেশ! ওরকম নাম কে দিতে পারে? কোনও হেড পণ্ডিত নিশ্চয় ইস্কুল থেকে পেনশন নিয়ে এখন সেলুন খুলেছে। যেই ঢুকবি অমনি হয়তো জিজ্ঞেস করবে, আপনার শিরোরুহ কি সমূলে উৎপাটিত হইবে? তুই বুঝতে পারবি না, হাঁ করে তাকিয়ে থাকবি। তখন রেগে তোকে চাঁটি-গাঁট্টা লাগিয়ে বলবে, ‘অরে-রে অনড়বান, সত্বর বিদ্যালয়ে গমনপূর্বক প্রথম ভাগ পাঠ কর’—না–না ‘পাঠ করহ’।
শুনে, আমার পালাজ্বরের পিলে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। তবুও সাহসের ভান করে বললুম, যত সব বাজে কথা, গিয়েই দেখি না একবার।
টেনিদা বললে, যা না, যেতেই তো বলছি তোকে। যা ঢুকে পড়, এক্ষুনি যা—
এমনভাবে উৎসাহ দিলে আর যাওয়া যায় না, আমি তৎক্ষণাৎ এদিকের ফুটপাথে চলে এলুম।
–কিন্তু সেলুনে কি ঢোকা যাবে না টেনিদা?
টেনিদা চিন্তা করে করে অনেকক্ষণ ধরে আস্তে-আস্তে মাথা নাড়ল : আমার মনে হচ্ছে ঢোকা উচিত নয়। একটু ভালো বাংলা-টাংলা যদি জানতিস তা হলেও বা কথা ছিল।
–তবে চুল কাটা হবে না?–আমার পালাজ্বরের পিলে হাহাকার করে উঠল : কিন্তু ভালো করে চুল ছাঁটতে না পারলে হুলোদার বউভাতে যাব কী করে?
টেনিদা বললে, দাঁড়া ভেবে দেখি। তার আগে চারটে পয়সা দে।
–আবার পয়সা কেন?
–ডালমুট খাব, খেলে মগজ সাফ হবে, তখন বুদ্ধি বাতলে দেব।
কী আর করি, দিতেই হল চার পয়সা।
টেনিদা ওই চার পয়সার ডালমুখ কিনে বেশ নিশ্চিন্তে বুদ্ধি সাফ করতে লাগল, আমাকে একটুও দিলে না।
–টেনিদা, একবার ছোটকাকার অফিসে গেলে কেমন হয়?
টেনিদার ডালমুট চিবোনো বন্ধ হল : সে কী-রে। তোর ছোটকাকার সেলুন আছে নাকি?
–না-না, সেলুন না। ছোটকাকা বলছিল ওদের অফিসে ছাঁটাই হচ্ছে। গেলে আমার চুলটাও নিশ্চয় ছাঁটাই করে দেবে।
টেনিদা বিরক্ত হয়ে বললে, দুর বোকা–অফিসে কি চুল ছাঁটে? সে অন্য ছাঁটাই।
–কী ছাঁটাই?
–বোধ হয় জামাকাপড় ছাঁটাই। কান-টানও হতে পারে। কী জানি, ঠিক বলতে পারব। তবে চুল ছাঁটে না। তা হলে আমার কুট্টিমামার ধামার মতো চুলগুলো কবে হেঁটে দিত।
তাই তো।–মনটা দমে গেল।
–তবে কী করা যায়? টেনিদা ডালমুটের তলার নুনটা চাটতে-চাটতে বললে, ওই তো গাছটার তলায় ইট পেতে পরামানিক বসে আছে, চল ওর কাছে–
–কিন্তু পরামানিক?–আমি গজগজ করে বললুম, ওরা ভালো চুল কাটে না।
–তোকে বলেছে।–টেনিদা রেগে বললে, ওই বিড়ালই বনে গেলে বাঘ হয়–বুঝলি? এখন নিতান্ত ফুটপাথে বসে আছে, তাই ওর কদর নেই। একটা সেলন খুললেই ওর নাম হবে ‘দি গ্রেট কাটার’। চল চল আমার পিঠে একটা থাবড়া দিয়ে টেনিদা বললে, আমি আছি না সঙ্গে? এমন ডিরেকশন দিয়ে দেব লোকে বলবে, প্যালা ঠিক, সায়েব বাড়ি থেকে চুল ছেঁটে এসেছে। কোনও ভাবনা নেই–আয়–
