টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বলেছি, কেন, স্বাধীন ভারতে ইংরেজী ফলাবার দরকারটা কী? এই জন্যেই জাতির আজ বড় দুর্দিন!..শেষ কথাটা টেনিদা আমাদের পাড়ার শ্রদ্ধানন্দ পার্ক থেকে মেরে দিয়েছে। ওখানে অনেক মিটিং হয়, আর সবাই বলে, জাতির আজ বড় দুর্দিন। কাউকে বলতে শুনিনি, জাতির আজ ভারি সুদিন। অথচ যাওয়ার সময় দেখি, দিব্যি পান চিবুতে চিবুতে মোটরে গিয়ে উঠল। মরুক গে, জাতির দিন যেমনই হোক আমার আজকের দিনটা দারুণ রকমের ভালো। মানে, আজ সন্ধেয় আমাদের বল্টুদার পিসতুতো ভাই হুলোদর বউভাত। বল্টুদা আমাকে খেতে বলেছে। আমি বললুম, বা-রে মন খুশি হলে একটুখানি ফুর্তিও করতে পারব না?
–ফুর্তি? বলি হঠাৎ এত ফুর্তিটা কিসের? আমি সকাল থেকে একটুখানি আলুকাবলি খেতে পাইনি–চার পয়সার ডালমুটও না। মনের দুঃখে মরমে মরে আছি, আর তুই কুচো চিংড়ির মতো লাফাচ্ছিস?
বললুম, লাফাব না তো কী? আজ হুলোদার বউভাত।
–হুঁলোদার বউভাত?–টেনিদা খাঁড়ার মতো নাকটার ভেতর থেকে ফুড়ত করে একটা আওয়াজ বের করে বললে, তাতে তোর কী?
–দারুণ খ্যটি হবে সন্ধেবেলায়।
–হুলোদার বউভাতে খ্যাঁটি?
টেনিদার নাক থেকে আবার ফুড়ত করে আওয়াজ বেরুল : মানে নেংটি ইঁদুরের কালিয়া, টিকটিকির ডালনা, আরশোলার চাটনি–
–কক্ষনো না। –আমি ভীষণভাবে আপত্তি করে বললুম, লুচি-পোলাও-মাংস চপ-ফ্রাই-দই-ক্ষীর-দরবেশ–
টেনিদা প্রায় হাহাকার করে উঠল : আর বলিসনি, আমি এক্ষুনি হার্টফেল করব। সকাল থেকে একটুখানি আলুকাবলি অবধি খাইনি, আর তুই আমাকে এমন করে দাগা দিচ্ছিস? গো-হত্যের পাপে পড়ে যাবি প্যালা, এই বলে দিচ্ছি তোকে।
শুনে আমার দুঃখু হল। আমি চুপ করে রইলুম।
–হ্যাঁ রে, আমাকে তো বলেনি।
আমি বললুম, না বলেনি।
–আমি যদি তোর সঙ্গে যাই? মানে, তোর তো পেট-টেট ভালো নয়–বেশি খেয়ে-টেয়ে একটা কেলেঙ্কারি যাতে না করিস, সেইজন্যে যদি তোকে পাহারা দিতে।
আমি বললুম, চালাকি চলবে না। হুলোদার বাবা ভীষণ রাগী লোক। কান পর্যন্ত গোঁফ। দু’বেলা দুটো একমনী মুগুর ভাঁজেন। বিনা নেমন্তন্নে খেতে গেলে তোমাকে ছাদ থেকে ফুটপাথে ফেলে দেবেন।
টেনিদা ভারি ব্যাজার হয়ে গেল। বললে, আমি দেখছি, যেসব বাবার বড় বড় গোঁফ থাকে তারাই এমনি যাচ্ছেতাই হয়। বোধ হয় নিজেদের বাঘ-সিঙ্গী বলে ভাবে। আর যেসব বাবা গোঁফ কামায় মেজাজ খুব মোলায়েম। দেখ লই মনে হয় এক্ষুনি মিহি গলায় বলবে, খোকা, দুটো রসগোল্লা খাবে? আর গোঁফওয়ালা বাবাদের ছেলেরা দুবেলা গাট্টা খায়।
এই সকালবেলায় গোঁফ নিয়ে বকবকানি আমার ভালো লাগল না। চলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়িয়েছি, অমনি টেনিদা বললে, খ্যাঁট তো সন্ধেবেলায়–এখুনি গিয়ে কলাপাতা কাটবি নাকি? ·
কলাপাতা কাটব কেন? আমি কি ওদের চাকর রামধনিয়া? আমি যাচ্ছি চুল কাটতে। বলে ডাঁটের মাথায় চলে যাচ্ছি, টেনিদা আবার পিছু ডাকল–কোথায় চুল কাটবি? সেলুনে?–চল, আমি তোর সঙ্গে যাই।
আমার মনে নিদারুণ একটা সন্দেহ হল।
–আবার তুমি কেন? আমি চুল ছাঁটতে যাচ্ছি–তোমার যাবার কী দরকার?
টেনিদা বললে, দরকার আছে বই কি! বউভাতের নেমন্তন্ন খাবি যা-তা করে চুল হেঁটে গেলে মান থাকবে নাকি? এমন একখানা মোম ছাঁট লাগাবি যে, লোকে দেখলেই হ করে থাকবে। চল, আমি তোর চুল কাটার তদারক করব।
কথাটা আমার মনে লাগল। সত্যিই তো টেনিদা একটা চৌকস লোকদশরকম বোঝে। আর, চুপি-চুপি বলতে দোষ নেই, একা সেলুনে ঢুকতে আমারও কেমন গা ছমছম করে। যেরকম কচাকচ কাঁচি-কাচি চালায় মনে হয় কখন কচাং করে একটা কানই বা কেটে নেবে।
বললুম, চলো তা হলে।
প্রথমেই চোখে পড়ল, ওঁ তারকব্রহ্ম সেলুন।
যেই ঢুকতে যাচ্ছি, অমনি হাঁ-হাঁ করে বাধা দিল টেনিদা–খবর্দার প্যালা, খবর্দার। ওখানে ঢুকেছিস কি মরেছিস!
-কেন!
–নাম দেখছিস না? ওঁ তারকব্রহ্ম। ওখানে ঢুকলে কী হবে জানিস? সব চুলগুলো কদমছাঁট করে দেবে আর চাঁদির ওপর টিকি বানিয়ে দেবে একখানা; হয়তো টিকির সঙ্গে ফ্রিতে একটা গাঁদা ফুলও বেঁধে দিতে পারে–কিচ্ছুই বলা যায় না।
ঘাবড়ে গিয়ে বললুম, না, আমি টিকি চাই না, ফ্রি গাঁদা ফুলেও দরকার নেই।
–তবে চটপট চলে আয় এখান থেকে। দেখছিস না একটা হোঁতকা লোক কেমন জুলজুল করে তাকাচ্ছে? আর দেরি করলে হয়তো হাত ধরে হিড়হিড় করে ভেতরে টেনে নিয়ে যাবে।
তক্ষুনি পা চালিয়ে দিলুম। একটু এগোতেই বিউটি-ডি-সেলুনিকা।
একে বিউটি, তায় আবার সেলুনিকা! দেখেই আমার কেমন ভাব এসে গেল। বলতে ইচ্ছে করল : সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ। তারপর কী যেন রাতে প্রচণ্ড সূর্য-টুর্য-ও-সব আর মনে পড়ল না।
–টেনিদা এইখানেই ঢোকা যাক!
শুনেই টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে উঠল, হ্যাঁ, এইখানেই ঢুকবি বই কি! পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল খাস, তোর বুদ্ধি আর কত হবে!
–কেন? নামটা তো–
–হ্যাঁ, নামটাই তো! ঢুকেই দ্যাখ না একবার। ঠিক কবিদের মতো বাবরি বানিয়ে দেবে। পেছন থেকে দেখলে মনে হবে, মেমসায়েব হেঁটে যাচ্ছে। আর কেউ যদি তোকে ঠ্যাঙাতে চায়, তা হলে ওই বাবরি চেপে ধরে–
শুনেই আমার বুক দমে গেল। এমনিতেই ছোটকাকা আমার কান পাকড়াবার জন্যে তকে তকে থাকে, বাবরি পেলে কি আর রক্ষে থাকবে! কান প্লাস বাবরি একেবারে দুদিক থেকে আক্রমণ!
