কী আর করি, পরামানিকের সামনে বসেছি ইট পেতে। টেনিদা থাবা গেড়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। দেখছে মনের মতো ছাঁট হয় কি না।
কুরকুর করে কাঁচি চলেছে, আমিও বসে আছি নিবিষ্টমনে। হঠাৎ টেনিদা হাঁ হাঁ করে উঠল : এ পরামানিক জী, ঠারো ঠারো।
পরামানিক আশ্চর্য হয়ে বললে, ক্যা ভৈল বা?
–ভৈল না। মানে, ঠিক হচ্ছে না। অ্যায়সা নেহি। ও-ভাবে ছাঁটলে চলবে না।
পরামানিক বললে, তো কেইসা?
আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, কেন বাগড়া দিচ্ছ টেনিদা? বেশ তো কাটছে–কাটুক না।
টেনিদা দাঁত বের করে বললে, কাটুক না। যা-তা করে কাটলেই হল? এ হল বউভাতের ছাঁট, এর কায়দাই আলাদা। যা খুশি কেটে দেবে, আর শেষে লোকে আমারই বদনাম করে বলবে, ছি–ছি–পটলডাঙার টেনিরাম কাছে থাকতেও প্যালা যাচ্ছেতাই চুল ছেঁটে এসেছে! রামোঃ!
পরামানিক অধৈর্য হয়ে বললে, কেইসা ছাঁটাই?. বোলিয়ে না।
–বোলতা তো হ্যাঁয়!–টেনিদা আমার মাথায় আঙুল দেখিয়ে বলে চলল : হিঁয়া দু ইঞ্চি ছাঁটকে দেও, হিয়া তিন ইঞ্চি–
আমি কাতর হয়ে বললুম, আমার কায়দায় দরকার নেই টেনিদা–ও যেমন কাটছে কাটুক।
–শট আপ! ছেলেমানুষ তুই–গুরুজনের মুখে-মুখে কথা বলিস কেন?–শুনো জী পরামানিক, হিয়া-সে চার ইঞ্চি কাট দেও– হিঁয়া ফের এক ইঞ্চি–হিঁয়া দু ইঞ্চি ঘাড় ছাঁচকে দেও–
পরামানিক এবার রেগে গেল! ওইসা নেহি হোতা।
টেনিদা বললে, জরুর হোতা। তুম কাটো।
পরামানিক বললে, নেহি ওইসা কভি নেহি হোতা।
আমি কাঁদো কাঁদো হয়ে বললুম, দোহাই টেনিদা, পায়ে পড়ছি তোমার, ওকে কাটতে দাও
টেনিদা গর্জন করে বললে, চোপ রাও। তুম কাটো পরামানিক জী—
পরামানিকের আত্মসম্মানে ঘা লেগেছে তখন। নিজের সংকল্পে সে অটল।
–নেহি, হোতা নেহি।
–আলবাত হোতা। কয়ঠো ছাঁট দেখা তুম? তুম ছাঁটের কেয়া জানতা? কাটো–
–নেহি কাটেগা। বদনাম হো যায়েগা হামকো। ওইসব নেহি হোতা।
–নেহি হোতা?–টেনিদা এবার চেঁচিয়ে উঠল : সব হোতা। আকাশে শুটনিক হোতা মাথামে টাক হোতা– মুরগি আজ ঠ্যাং নিয়ে চলে বেড়াতা, কাল সেই ঠ্যাং প্লেটমে কাটলেট হো-যাতা। সব হোতা, তুমি নেহি জানতা!
–হাম নেহি জানতা?
–নেহি জানতা।–টেনিদার গলার স্বর বজ্রকঠোর।
–আপ জানতে হেঁ- পরামানিক এবার চ্যালেঞ্জ করে বসল।
–জরুর জানতা হেঁ!–টেনিদা গরুণ উত্তেজিত।
–তো কাটিয়ে।
পরামানিকের বলবার অপেক্ষা মাত্র। পটাং করে টেনিদা তার কাঁচি হাত থেকে কেড়ে নিলে। আর আমি—’বাবা-রে-মা-রেপিসিমা-রে’–বলে চেঁচিয়ে লাফিয়ে ওঠবার আগেই আমার চুলে টেনিদার কাঁচি চলতে লাগল : এই দেখো চার ইঞ্চি–এই দেখো পাঁচ ইঞ্চি এই দেখো–ইয়ে তিন ইঞ্চি—দেখো–
কিন্তু পরামানিক দেখবার আগেই আমি চোখে সর্ষে ফুল দেখছি তখন। উঠে প্রাণপণে ছুট মেরেছি আর তারস্বরে চেঁচাচ্ছি : মেরে ফেললে ডাকাত–খুন–
আমার পেছনে রাস্তার লোক ছুটছে, কুকুর ছুটছে, পরামানিক ছুটছে, পুলিশ ছুটছে। আর সকলের আগে ছুটছে কাঁচি হাতে টেনিদা। বলছে, দাঁড়া প্যালা– দাঁড়া। একবার ওকে ভালো করে দেখিয়ে দিই, ছাঁট কাকে বলে–
হুলোদার বউভাতে সবাই পোলাও-মাংস-ফ্রাই-সন্দেশ খাচ্ছে এতক্ষণে, আর আমি? একেবারে মোক্ষম ছাঁট দিয়ে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছি। অর্থাৎ ন্যাড়া হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এই ছাঁট নিয়ে কোনওমতেই বউভাতের নেমন্তন্ন খেতে যাওয়া চলে না। আর চাটুজ্যেদের রোয়াক থেকে কে যেন আমাকে শুনিয়ে-শুনিয়ে চিৎকার করে বললে, ডি-লা গ্রাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক! মনে হল, টেনিদারই গলা।
নিদারুণ প্রতিশোধ
চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে পটলডাঙার টেনিদা বেশ মন দিয়ে তেলেভাজা খাচ্ছিল। আমাকে দেখেই কপকপ করে বাকি বেগুনি দুটো মুখে পুরে দিয়ে বললে, এই যে শ্রীমান প্যালারাম, কাল বিকেলে কোথায় গিয়েছিলে? খেলার মাঠে তোর যে টিকিটাও দেখতে পেলুম না, বলি ব্যাপারখানা কী?
আমি বললুম, আমি মেজদার সঙ্গে সাকাস দেখতে গিয়েছিলাম।
–বটে-বটে! তা কী রকম দেখলি?
–খাসা! ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস যাকে বলে! হাতি, বাঘ, সিঙ্গি, ফ্লায়িং ট্রাপিজ, মোটর সাইকেল কত কী! কিন্তু জানো টেনিদা, সব চাইতে ভালো হল শিম্পাঞ্জির খেলা। চা খেল, চুরুট ধরাল।
–আরে ছোঃ ছোঃ!–টেনিদা নাকটাকে কুঁচকে পাতিনেবুর মতো করে বললে, রেখে দে তোর শিম্পাঞ্জি। আমার কুট্টিমামার বন্ধু রামগিদ্ধড়বাবু একবার একটা গোদা হনুমানের যে-খেল দেখেছিলেন, তার কাছে কোথায় লাগে তোর সাকাসের শিম্পাঞ্জি! নস্যি–স্রেফ নস্যি।
–তাই নাকি?–আমি টেনিদার কাছে ঘন হয়ে বললুম : রামগিদ্ধড়বাবু কোথায় দেখলেন সে-খেলা?
–উড়িষ্যায়।
আমি মাথা নেড়ে বললুম, বুঝেছি। পুরীতে গিয়ে জগন্নাথের মন্দিরে আমি কয়েকটা বড় হনুমান দেখেছিলুম।
ধ্যাত্তোর পুরী। ওগুলো আবার মনিষ্যি–থুড়ি হনুমান নাকি? গাদাগাদা জগন্নাথের পেসাদ খেয়ে নাদাপেট নিয়ে বসে আছে-গলায় একটা করে মাদুলি পরিয়ে দিলেই হয়। হনুমান দেখতে গেলে জঙ্গলে যেতে হয়, মানে কেওনঝড়ের জঙ্গলে।
–কেওনঝড়! সে আবার কোথায়?
–তাই যদি জানবি, তা হল পটলডাঙায় বসে পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল খাবি কেন র্যা? নে, গপ্পো শুনবি তো এখন মুখে ইস্কুপ এঁটে চুপটি করে বসে থাকবকের মতো বকবক করিসনি।
