‘ভূত বাজখাই গলায় বললে, “এই বেতমিজ, তুই কে রে? আমার প্রাসাদে ঢুকেছিস কেন?”
‘দশানন একটু সামলে নিলে। উঠে সামনে এসে একেবারে মাটিতে লুটিয়ে প্রণাম করলে ভূতকে। বললে, “হুজুর, আমায় মাপ করবেন। আমি কিছুই জানতুম না। সন্ধেবেলায় বাঘের ভয়ে ছুটতে ছুটতে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি। দয়া করে রাতটার মতো আমায় থাকতে দিন। ভেরে উঠেই চলে যাব।”
‘ভূত খুশি হল। চাপদাড়ির ফাঁকে হেসে বললে, “ঠিক আছে, থেকে যা। তুই যখন আমার আশ্রয় নিয়েছিস, তখন তোকে কিছু বললে আমার গুণাহ (মানে পাপ) হবে। কিন্তু তোর বাড়ি কোথায়?”
“আজ্ঞে বাংলাদেশে।”
“বেশ–বেশ, উঠে দাঁড়া।”
‘দশানন উঠে ভূতের সামনে দাঁড়াল। ভূত খুব মন দিয়ে দেখতে লাগল তাকে। তারপর বললে, “তোর বেশ সাহস-টাহস আছে দেখছি। আমার একটা কাজ করতে পারবি?”
“আজ্ঞে, হুকুম করলেই পারি।”–দশানন খুব বিনীত হয়ে হাত কচলাতে লাগল।
“তুই একবার নবাব সিরাজদ্দৌলার কাছে যেতে পারিস?”
“আজ্ঞে কার কাছে?”–দশানন ঘাবড়ে গেল।
“কেন–বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজদ্দৌলার নাম শুনিসনি?”–ভূত খুব আশ্চর্য হল : তুই কোথাকার গাধা রে!”
“নাম জানি বই কি হুজুর, বিলক্ষণ জানি।”–দশানন মাথা চুলকে বললে, “কিন্তু তিনি তো অনেকদিন আগে মারা গেছেন–আমি কী করে তাঁর কাছে”।
“মারা গেছেন? নবাব সিরাজদ্দৌলা! সে কি রে! পলাশীর যুদ্ধের পরে তিনি রাজমহলের দিকে রওনা হলেন, আমাকে বললেন—’মনসবদার জবরদস্ত খাঁ, তুমি আমার এইসব মণিমুক্তাগুলো নিয়ে কোথাও লুকিয়ে থাকো এখন। আমি এরপরে আবার ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধ করব, তখন তোমাকে দরকার হবে–তোমায় আমি ডেকে পাঠাব। ততক্ষণ তুমি সুন্দরবনের প্রাসাদে গিয়ে লুকিয়ে থাকো।” সেই থেকে আমি আছি এখানে। কবে আমার এন্তেকাল (মানে মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু নবাবের ডাক শোনবার জন্যে আমি বসে আছি, আর আমার দুই জেবে (মানে পকেটে) লাখ লাখ টাকার হীরে-মোতি বয়ে বেড়াচ্ছি। দেখবি?”
বলেই জবরদস্ত খাঁ তার জেবের পকেট থেকে দু-হাত ভর্তি করে মণিমুক্তো বের করল। চাঁদের আলোয় সেগুলো ঝলমল করতে লাগল, দেখে চোখ ঠিকরে বেরুল দশাননের। মাথা ঘুরে যায় আর কি।
‘জবরদস্ত খাঁ সেগুলো আবার পকেটে পুরে বললে—”আর তুই বলছিস নবাব বেঁচে নেই? না-হতেই পারে না। তা হলে নিজেকেই এবার আমায় খুঁজতে যেতে হচ্ছে।”
‘দশানন চুপ করে রইল।
‘জবরদস্ত খাঁ বললে, “প্রথমে যাই মুর্শিদাবাদে, তারপরে যাব রাজমহল, তারপর মুঙ্গের পর্যন্ত ঘুরে আসব। তুই আজ রাতে আমার প্রাসাদে থাকতে পারিস। কোনও ভয় নেই—মন্সবদার জবরদস্ত খাঁর মঞ্জিলে বাঘও ঢুকতে সাহস পাবে না। কিন্তু কাল সকালেই কেটে পড়বি। ফিরে এসে যদি দেখি তুই রয়েছিস, তা হলে তক্ষুনি কিন্তু তোর গান নিয়ে নেব।”
‘এই বলেই, জবরদস্ত খাঁ ধাঁ করে চাঁদের আলোর মধ্যে মিশে গেল।
‘আর দশানন? যা থাকে কপালে বলে, তক্ষুনি বেরিয়ে পড়ল ভূতের বাড়ি থেকে। অন্ধকারে খানিক হেঁটে একটা গাছে উঠে রাত কাটালে! সকালে নদীর ধারে গিয়ে দূরে একটা জেলেদের নৌকো চোখে পড়ল–বিস্তর ডাকাডাকি করে, তাদের নৌকোয় উঠে দেশে চলে এল।
‘আর তারপর?
‘তারপর দেশে ফিরে অতিথিশালা করল, পুকুর কাটাল, গরিবকে দান-ধ্যান করতে লাগল, মহাপুরুষ হয়ে গেল—’
আমি বাধা দিয়ে বললুম, ‘বা-রে, টাকা পেল কোথায়?’
‘টাকার অভাব কী রে গর্দভ? জবরদস্ত খাঁর পকেট মেরে এক থাবা মণি-মুক্তো তুলে নিয়েছিল না?
‘অ্যাঁ!’–আমি খাবি খেলুম : ‘ভূতের পকেট কেটে?’
‘যে কাটতে পারে–ভূতের পকেটই বা সে রেয়াত করবে কেন?’–টেনিদা হাসল : ‘অমন এক্সপার্ট হাত। কিন্তু ওইতেই তো তার স্বভাব-চরিত্তির একেবারে বদলে গেল। স্বয়ং নবাব সিরাজদ্দৌলার মণি-মুক্তো–সেগুলো কি আর বাজে খরচ করা যায় রে? ওসব বেচে লাখ লাখ টাকা পেল দশানন; আর তাই দিয়ে পরের উপকার করতে লাগল–মহাপুরুষ বনে গেল একেবারে।’
‘আর প্যাস্থার সাহেব?’
‘বাঘের পকেট কাটলে রায়সাহেব উপাধি দেবে বলেছিল, ভূতের পকেট কেটেছে জানলে তো মহারাজা-টহারাজা করে দিত। কিন্তু জানিস তো–ইংরেজ নবাবের শত্রু। শুনলেই কেড়ে নিত ওগুলো। তাই বলছিলুম প্যালা, পকেটমারকেও তুচ্ছ করতে নেই, সেও যে কখন কী হয়ে যায়—’
আমি বললুম, ‘বাজে কথা–সব বানানো।‘
‘বানানো?’ টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, ‘ইউ প্যালাইউ গেট আউট–।‘
গেট-আউট আর কী করে হয়, রাস্তার ধারেই তো বসেছিলুম দু-জনে। আমি টেনিদার গাঁট্টা এড়াবার জন্যে ঝাঁ করে পটলডাঙা স্ট্রিটে লাফিয়ে পড়লুম।
দি গ্রেট ছাঁটাই
–ডিলা-গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস—
এই পর্যন্ত যেই বলেছি, অমনি খ্যাঁক-খ্যাঁক করে তেড়ে এসেছে টেনিদা।
–টেক কেয়ার প্যালা, সাবধান করে দিচ্ছি। মেফিস্টোফিলিস পর্যন্ত সহ্য করেছি, কিন্তু ‘ইয়াক ইয়াক’ বলবি তো এক চাঁটিতে তোর কান দুটোকে কোন্নগরে পাঠিয়ে দেব।
সেই ঢাউস ঘুড়িতে ওড়বার পর থেকেই বিচ্ছিরি রকমের চটে রয়েছে টেনিদা। ইয়াক শব্দ শুনলেই ওর মনে হয়, এক্ষুনি বুঝি ঝপাং করে গঙ্গার জলে গিয়ে পড়বে। সেদিন গণেশমামা কায়দা করে ইংরেজীতে বলছিল :ইয়া-ইয়া। শুনে টেনিদা তাকে মারে আর কি।
শেষে হাবুল সেন গিয়ে ঠাণ্ডা করে : আহা, খামকা চেইত্যা যাওয়া ক্যান? পেন্টুলুন পইর্যা ইংরাজী কইত্যাছে।
