‘আমি বললুম, খুঁটেপাড়া আবার কোথায়?’
‘সে গোবরডাঙা থেকে যেতে হয়-সাত ক্রোশ হেঁটে। মানে, যাওয়া খুব মুস্কিল। কিন্তু যদি কখনও যাস-দেখবি দশানন হালদারের নাম শুনলে লোকে এখনও মাটিতে মাথা নামিয়ে পেন্নাম করে। বলে, “এমন ধার্মিক, এমন দানবীর আর হয় না। ইস্কুল করেছেন, গরিব-দুঃখীকে দুবেলা খেতে দিয়েছেন, মন্দির গড়েছেন, পুকুর কেটেছেন।” কিন্তু আসলে এই দশানন কে ছিল, জানিস? এক নম্বরের পকেটমার।‘
‘পকেটমার?’
‘তবে আর বলছি কী? অমন ঘোড়ে পকেটমার আর দুজন জমেছে কিনা সন্দেহ। পাঠশালায় যেদিন প্রথম পড়তে গেল, সেদিনই পণ্ডিতমশাইয়ের ফতুয়ার পকেট থেকে তাঁর নস্যির ডিবে চুরি করে নিলে। পণ্ডিত তাকে কষে বেত-পেটা করে তাড়িয়ে দিলেন। বাপকাকা-দাদা–তার হাত থেকে কারও পকেটের রেহাই ছিল না। যত পিট্টি খেত, ততই তার রোখ চেপে যেত। শেষে যখন একদিন বাড়িতে গুরুদেব এসেছেন আর দশানন তার ট্যাক থেকে প্রণামীর বারো টাকা আনা পয়সা মেরে নিয়েছে–সেদিন দশাননের বাপ শতানন হালদারের আর সইল না। বাড়ির মোষবলির খাঁড়াটা উঁচিয়ে দশাননকে সে এমন তাড়া লাগাল যে দশানন এক দৌড়ে একেবারে কলকাতায় পৌঁছে তবে হাঁফ ছাড়ল।
‘আর জানিস তো, কলকাতা মানেই পকেটমারের স্বর্গ। অনেক গুণী তোক তো আগে থেকেই ছিল, কিন্তু বছরখানেকের ভেতর দশানন তাদের সম্রাট হয়ে উঠল। তার উৎপাতে লোকে পাগল হয়ে গেল। টালা থেকে টালিগঞ্জ আর শেয়ালদা থেকে শালকে পর্যন্ত, কারও পকেটের টাকাকড়ি কলম থেকে মায় সুপুরির কুচি কিংবা এলাচ-দানা পর্যন্ত বাদ যেত না।
‘ধরা যে পড়ত না, তা নয়। দুমাস ছ’মাস জেল খাটত, তারপর বেরিয়ে এসে আবার যে-কে সেই। পুলিশ সুষ্ঠু জেরবার হয়ে উঠল। তখন দেশে ইংরেজ রাজত্ব ছিল, জানিস তো? পুলিশ কমিশনার ছিল এক কড়া সাহেব–মিস্টার প্যান্থার না কী যেন নাম। লোকে তার কাছে গিয়ে ধরনা দিতে লাগল। প্যান্থার তাদের বললে, “পকেটমারকে ফাঁসি ডেওয়া যায় না–নটুবা আমি ডশাননকে টাই ডিম। এবার ঢারিতে পারিলে টাহাকে এমন শিক্ষা ডিব যে সে আর পকেট কাটিবে না।”
‘ধরা অবশ্য দশানন কদিন বাদেই পড়ল। পকেটমারের ব্যাপার তো জানিস, ওরা প্রায়ই জেলে গিয়ে মুখ বদলে আসে–ওদের ভালোই লাগে বোধ হয়। কিন্তু এবার দশানন ধরা পড়বামাত্র তাকে নিয়ে যাওয়া হল প্যান্থার সাহেবের কাছে। সাহেব বললে, “ওয়েল ডশানন, টুমি টো কলিকাটায় লোককে ঠাকিটে ডিবে না। টাই এবার টোমার একটা পাকা বাবসটো করিতেছি।”–এই বলে সে হুকুম দিলে, “ইহাকে লঞ্চে করিয়া লইয়া গিয়া সুরবনে (মানে সুন্দরবনে) ছাড়িয়া ডাও-সেখানে গিয়া এ কাহার পকেট মারে ডেখিব। ঝঘের তো আর পকেট নাই।”
‘দশানন বিস্তর কান্নাকাটি করল, “আর করব না স্যার-এ-যাত্ৰা ছেড়ে দিন স্যার” বলে অনেক হাতে পায়ে ধরল, কিন্তু চিড়ে ভিজল না। সাহেব ঠাট্টা করে বললে, “যাও–বাঘের পকেট মারিটে চেষ্টা করো। যডি পায়রা, টোমাকে রায় সাহেব উপাঢ়ি ডিব।”
‘তারপরে আর কী? পুলিশ লঞ্চে করে দশাননকে নিয়ে গেল সুন্দরবনে। সেখানে তাকে নামিয়েই তারা দে-চম্পট। তাদেরও তো বাঘের ভয় আছে।
‘এদিকে দশাননের তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। জলে গিজগিজ করছে কুমির–ঝোপে ঝোপে মানুষখেকো বাঘ–সুন্দরবন মানেই যমের আড়ত। এর চাইতে সাহেব যে তাকে ফাঁসিতে ঝোলালেও ভালো করত!
‘বেলা পড়ে আসছিল, একটু দূরেই কোথায় হালুম-হালুম ডাক শোনা গেল। দশানন একেবারে চোখ-কান বুজে ছুটল। সুঁদরী গাছের শেকড়ে হোঁচট খেয়ে, গোলপাতার ঝোপে আছাড় খেয়ে-দৌড়তে দৌড়তে দেখে সামনে এক মস্ত ভাঙা বাড়ি। আদ্যিকালের পুরনোইট-কাঠ খসে পড়ছে, তবু অনেকখানি এখনও দাঁড়িয়ে। মরিয়া হয়ে দশানন ঢুকে গেল তারই ভেতরে। হাজার হোক, বাড়ি তো বটে!
‘ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতেই দেখে সামনে একটা মস্ত ঘর। দরজায় তার মাকড়সার জাল, ভেতরে কত জন্মের ধুলো। তবু ঘরটা বেশ আস্ত আছে। একটু সাফসুফ করে নিলে শাওয়াও যাবে একপাশে। দেশলাই জ্বেলে, সাবধানে সব দেখে নিলে দশানন। না–সাপ-খোপ নেই। আর দোতলার ঘর-বাঘও চট করে এখানে উঠে আসবে না। শুধু দশানন ঘরে ঢুকতে ঝটপট করে কতগুলো চামচিকে বেরিয়ে এল–তা বেরোক, চামচিকেকে তার ভয় নেই।
‘ক্যানিং-এর বাজার থেকে পুলিশ তাকে এক চাঙারি খাবার দিয়েছিল, মনের দুঃখে তাই খানিকটা খেল দশানন। বাইরে তখন দারুণ অন্ধকার নেমেছে। ঝিঝি ডাকছে, পোকা ডাকছে–অনেক দূর থেকে বাঘের ডাকও আসছে। “জয় মা কালী” বলে কাপড় জড়িয়ে ঘরের এক কোনায় শুয়ে পড়ল দশানন। রাতটা তো কাটুককাল সকালে যা হয় দেখা যাবে।
‘বাঘের ডাক, ঝিঝির শব্দ, জঙ্গলের পাতায়-পাতায় হাওয়ায় আওয়াজ আর মশার কামড়ের ভেতরে ভয়-ভাবনায় কখন যে দশানন ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না। কতক্ষণ ধরে ঘুমুচ্ছিল, তাও না। হঠাৎ একসময়ে সে চমকে জেগে উঠল। দেখল, ভাঙা জানলা দিয়ে ঘরের ভেতরে জ্যোৎস্না পড়েছে–আর সেই জ্যোৎস্নার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক বিরাট পুরুষ। তার পোশাক-আশাক থিয়েটারের মোগল সেনাপতির মতো। মুখে লম্বা দাড়ি, মাথায় পাগড়ি। আগুনের মতো তার চোখ দুটো দপদপ করে জ্বলছে।
‘দশাননের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। বুঝতে বাকি রইল না–এটা ভূত। তাও যে-সে ভূত নয়–একেবারে মোগলাই ভূত।
