তারপরেই স্বগতোক্তি করলে, উঃ, জোর কামড় মেরেছে পেটে মাইরি!
হাবুল চাপা গলায় বললে, আমারও পেটটা যেন কেমন গোলাচ্ছে রে!
আড়চোখে আমি একবার তাকিয়ে দেখলাম মাত্র। মনুমেন্ট খেয়ে হজম করতে পারো, দেখিই না হজমের জোর কত! আমি বললাম, তিষ্ঠ, তিষ্ঠ—
আগে করি ইষ্ট নাম ধ্যান–
ধ্যান ভঙ্গ যতক্ষণ নাহি হয়,
চুপচাপ থাকো ততক্ষণ।
তারপরে তনুত্যাগ করিব নিশ্চয়।
আমি ধ্যানে বসলাম। সহজে এধ্যান ভাঙছে না। পোকার উপদ্রব লেগেই আছে—তা থাক। আমি কষ্ট না করলে টেনিদা আর হাবুলের কেষ্ট মিলবে না। গরম চায়ের সঙ্গে কড়া পার্গেটিভ—এখনই কী হয়েছে!
টেনিদা মুখ বাঁকা করলে, শিগগির ধ্যান শেষ কর মাইরি। জোর পেট কামড়াচ্ছে রে!
আমি বললাম, চুপ। ধ্যান ভঙ্গ করিয়ো না
ব্ৰহ্মশাপ লাগিবে তা হলে—
ধ্যান কি সত্যি সত্যিই করছি নাকি! আরে ধ্যাৎ! আমি আড়চোখে দেখছি টেনিদার মুখ ফ্যাকাশে মেরে গেছে। হাবুলের অবস্থাও তথৈবচ। ভগবান করুণাময়।
টেনিদা কাতরস্বরে বললে, ওরে প্যালা, গেলাম যে। দোহাই তোর, শিগগির ধ্যান শেষ কর—তোর পায়ে পড়ছি প্যালা–
হাবুল বললে, ওরে, আমারও যে প্রাণ যায়–
আমি একেবারে নট-নড়নচড়ন। সামলাও এখন। মুনি-ঋষির ধ্যান-দেহত্যাগের ব্যাপার—এ কী সহজে ভাঙবার জিনিস!
–বাপস গেলাম—এক লক্ষে টেনিদা অদৃশ্য। একেবারে সোজা অন্ধকার আমতলার দিকে। পেছনে পেছনে হাবুল।
আর থিয়েটার?
সে কথা বলে আর কী হবে!
দশাননচরিত
আমি খুব উত্তেজিত হয়ে টেনিদাকে বললুম, ‘হ্যারিসন রোডের লোকে একটা পকেটমারকে ধরেছে।’
টেনিদা আমার দিকে কী রকম উদাসভাবে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ।
‘তারপর?’
‘তারপর আর কী! থানায় নিয়ে গেল।‘
‘লোকে পিটতে চেষ্টা করেনি?’
‘করেনি আবার? ভাগ্যিস একজন পুলিশ এসে পড়েছিল। সে হাতজোড় করে বললে–দাদারা, মেরে আর কী করবেন? মার খেয়ে খেয়ে এদের তো গায়ের চামড়া গণ্ডারের মতো পুরু হয়ে গেছে। অনর্থক আপনাদের হাত ব্যথা হয়ে যাবে। তার চাইতে ছেড়ে দিন–এ মাসখানেক জেলখানায় কাটিয়ে আসুক, ততদিন আপনাদের পকেটগুলো নিরাপদে থাকবে।’
‘বেশ হয়েছে।’–বলে টেনিদা গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর মস্ত একটা ঠোঙা থেকে একমনে কুড়কুড় করে ডালমুট খেতে লাগল।
আমি ওর পাশে বসে পড়ে বললুম, ‘আমাকে ডালমুট দিলে না?’
‘তোকে?–টেনিদা উদাস হয়ে ডালমুট খেতে খেতে বললে, না–তোকে দেবার মতো মুড নেই এখন। আমি এখন ভীষণ ভাবুক-ভাবুক বোধ করছি।’
‘ভাবুক-ভাবুক!’–শুনে আমার খুব উৎসাহ হল : ‘তুমি কবিতা লিখবে বুঝি?’
টেনিদা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘দুত্তোর কবিতা! ওসবের মধ্যে আমি নেই। যারা কবিতা লেখে–তারা আবার মনিষ্যি থাকে নাকি? তারা রাস্তায় চলতে গেলেই গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে যায়, নেমন্তন্নবাড়িতে তাদের জুতো চুরি হয়, বোশেখ মাসের গরমে যখন লোকের প্রাণ আইঢাই করে তখন তারা দোর বন্ধ করে পদ্য লেখে—”বাদলরাণীর নূপুর বাজে তাল-পিয়ালের বনে!” দুদ্দুর!’
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, ’বোশখ মাসের দুপুরে বাদলরাণীর কবিতা লেখে কেন?’
টেনিদা মুখটাকে ডিমভাজার মতো করে বললে, ‘এটাও বুঝতে পারলি না? বোশেখ মাসে কবিতা লিখে না পাঠালে আষাঢ় মাসে ছাপা হবে কী করে? যা–যা, কবিতা লেখার কথা আমাকে আর তুই বলিসনি। যত্তো সব ইয়ে–!’
আমি বললুম, ‘তবে তুমি ওরকম ভাবুক-ভাবুক হয়ে গেলে কেন!’
‘ওই পকেটমারের কথা শুনে।‘
‘পকেটমারের কথা শুনে কেউ ভাবুক হয় নাকি আবার?’ আমি বললুম, ‘সবাই তো তাকে রে-রে-রে করে ঠ্যাঙাবার জন্যে দৌড়ে যায়। আমারও যেতে ইচ্ছে করে। এই তো সেদিন হাওড়ার ট্রামে আমার বড় পিসেমশায়ের পকেট থেকে—’
‘ইউ শাট আপ প্যালা—’ টেনিদা চটে গেল : কুরুবকের মতো সব সময় বকবক করবি না–এই বলে দিচ্ছি তোকে। পঞ্চাননের ঠাকুর্দা দশাননের কথা যদি জানতিস, তা হলে বুঝতে পারতিস–এক-একটা পকেটমারও কী বলে গিয়ে–এই মহাপুরুষ হয়ে যায়।’
‘কে পঞ্চানন? কে-ই বা দশানন? আমি তো তাদের কাউকেই চিনি না।’
‘দুনিয়াসুদ্ধ সবাইকে তুই চিনিস নাকি? জাপানের বিখ্যাত গাইয়ে তাকানাচিকে চিনিস তুই?’
আমি বললুম, ‘না।’
‘লন্ডনের মুরগির দোকানদার মিস্টার চিকেনসনের সঙ্গে তোর আলাপ আছে?’
‘উহুঁ।‘
‘ফ্রান্সের সানাইওলা মঁসিয়ো প্যাঁকে দেখেছিস কোনওদিন?’
‘না–দেখিনি। দেখতেও চাই না কখনও।‘
‘তা হলে?’–টেনিদা আলুকাবলির মতো গম্ভীর হয়ে গেল : ‘তা হলে পঞ্চাননের ঠাকুর্দা দশাননকেই বা তুই চিনবি কেন?’
‘ঢের হয়েছে, আর চিনতে চাই না। তুমি যা বলছিলে বলে যাও।’
‘বলতেই তো যাচ্ছিলুম–টেনিদা আবার কিছুক্ষণ কুড়মুড় করে ডালমুট চিবিয়ে ঠোঙাটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললে, ‘খা। আমি তোকে ব্যাপারটা বলি ততক্ষণে।‘
আমি ঠোঙাটা হাতে নিয়ে দেখলুম খালি। ফেলে দিতে যাচ্ছি হঠাৎ দেখি একেবারে নীচের দিকে, টেনিদার চোখ এড়িয়ে কী করে একটা চীনেবাদামের দানা আটকে আছে। সেটা বের করেই আমি মুখে পুরে দিলুম। আড়চোখে দেখে টেনিদা বললে, ‘ইস, একটা বাদাম ছিল নাকি রে? একদম দেখতেই পাইনি। যাকগে, ওটা তোকে বকশিশ করে দিলুম।’
আমি বললুম, ‘সবই পঞ্চাননের ঠাকুর্দা দশাননের দয়া।‘
টেনিদা বললে, ‘যা বলেছিস। আচ্ছা, এবার দশাননের কথাই বলি।‘
–বুঝলি, কখনও যদি তুই ঘুঁটেপাড়ায় যাস—’
