টেনিদা বললে, ডি লা গ্র্যান্ডি। আরে, ওতেই হবে। তুই ডিম তিনটে ফেটিয়ে ফ্যাল–আমি স্টোভ ধরাচ্ছি ততক্ষণে।
ওমলেট বরাবর খেয়েই এসেছি, কিন্তু কী করে যে ফেটাতে হয় সেটা কিছুতেই মনে করতে পারলুম না। নাকি, ফোঁটাতে বলছে? তা হলে তো তা দিতে হয়। কিন্তু তা দিতে থাকলে ও কি আর ডিম থাকবে? তখন তো বাচ্চা বেরিয়ে আসবে। আর বাচ্চা বেরিয়ে এলে আর ওমলেট খাওয়া যাবে না–তখন চিকেন কারি রান্না করতে হবে। আর তা হলে–
টেনিদা বললে, অমন টিকটিকির মতো মুখ করে বসে আছিস কেন র্যা? তোকে ডিম ফেটাতে বললুম না?
–ফেটাতে বলছ? মানে ফাটাতে হবে? নাকি ফোঁটাতে বলছ? ফোঁটাতে আমি পারব সাফ বলে দিচ্ছি তোমাকে।
–কী জ্বালা!–টেনিদা খেঁকিয়ে উঠল : কোনও কাজের নয় এই হতচ্ছাড়াটাখালি খেতেই জানে! ডিম কী করে ফেটাতে হয় তাও বলে দিতে হবে? গোড়াতে মুখগুলো একটু ভেঙে নে–তারপর পেয়ালায় ঢেলে চামচ দিয়ে বেশ করে নাড়তে থাক। বুঝেছিস?
আরে তাই তো! এতক্ষণে মালুম হল আমার। আমাদের পটলডাঙার ‘দি গ্রেট আবোর-খাবো রেস্তোরাঁ’র বয় কেষ্টাকে অনেকবার কাঁচের গেলাসে ডিমের গোলা মেশাতে দেখেছি বটে।
পয়লা ডিমটা ভাঙতেই একটা বিচ্ছিরি বদ গন্ধে সারা ঘর ভরে উঠল। দোসরা ডিম থেকেও সেই খোশবু।
নাক টিপে ধরে বললুম, টেনিদা–যাচ্ছেতাই গন্ধ বেরুচ্ছে কিন্তু ডিম থেকে!
টেনিদা স্টোভে তেল ভরতে-ভরতে বললে, ডিম থেকে কবে আবার গোলাপ ফুলের গন্ধ বেরোয়? নাকি ডিম ভাঙলে তা থেকে হালুয়ার সুবাস বেরুবে? নে–নিজের কাজ করে যা।
–পচা বলে মনে হচ্ছে আমার।
–তোর মাথার ঘিলুগুলোই পচে গেছে–টেনিদা চটে বললে, একটা ভালো কাজের গোড়াতেই তুই বাগড়া দিবি! নে–হাত চালা। তোর ইচ্ছে না হয় খাসনি–আমি যা পারি ম্যানেজ করে নেব।
–করো, তুমিই করো তবে বলে যেই তেসরা নম্বর ডিম মেজেতে ঠুকেছি—
গলগল করে মেজে থেকে যে বস্তু বেরিয়ে এল, তার যে কী নাম দেব তা আমি আজও জানি না। আর গন্ধ? মনে হল দুনিয়ার সমস্ত বিকট বদ গন্ধকে কে যেন ওর মধ্যে ঠেসে রেখেছিল–একেবারে বোমার মতো ফেটে বেরিয়ে এল তারা। মনে হল, এক্ষুনি আমার দম আটকে যাবে।
–গেছি–গেছি বলে আমি একদম ঠিকরে পড়লুম বাইরে। সেই দুর্ধর্ষ মারাত্মক গন্ধের ধাক্কায় বোঁ করে যেন মাথাটা ঘুরে গেল, আর আমি দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়লুম শিবনেত্র হয়ে।
–উঁরে ব্বাপ–ই কীঁ গন্ধ র্যা!–টেনিদার একটা আর্তনাদ শোনা গেল। তারপর—
এবং তারপরেই–
টেনিদাও খুব সম্ভব একটা লাফ মেরেছিল। এবং পেল্লায় লাফ। পায়ের ধাক্কায় জ্বলন্ত কেরোসিন স্টোভটা তেল ছড়াতে ছড়াতে বলের মতো গড়িয়ে এল–সোজা গিয়ে হাজির হল ডোম্বলদার শোবার ঘরের দরজার সামনে। আর ডোম্বল-বৌদির সাধের সম্বলপুরী পদ দাউদাউ করে জ্বলে উঠল তৎক্ষণাৎ!
টেনিদা বললে, আগুন–আগুনফায়ার ব্রিগেড বসবার ঘরে টেলিফোন আছে। প্যালা-দৌড়ে যা–জিরো ডায়েলফায়ার ব্রিগেড–
ঊর্ধ্বশ্বাসে ফোন করতে ঢুকেছি, সেই পাকার কার্পেটে পা আটকে গেল। হাতে টেলিফোনও তুলেছিলুম, সেইটে সুদুই ধপাস করে রাম-আছাড় খেলুম একটা। ক্র্যাংকড়াৎ করে আওয়াজ উঠল। টেলিফোনের মাউথ-পিসটা সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে দু-টুকরো। যাক, নিশ্চিন্দি! ফায়ার ব্রিগেডকে আর ডাকতে হল না!
উঠে বসবার আগেই ঝপাস–ঝপাস!
টেনিদা দৌড়ে বাথরুমে ঢুকেছে, আর দুবালতি পনেরো দিনের পচা জল চৌবাচ্চা থেকে তুলে এনে ছুঁড়ে দিয়েছে সম্বলপুরী পদার ওপর। আধখানা পর্দা পুড়িয়ে আগুন নিবেছে, কিন্তু শোবার ঘরে জলের ঢেউ খেলছে–বিছানা-পত্ৰ ভিজে একাকার, খানিকটা জল চলকে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলটাকেও সাফ-সুফ করে দিয়েছে।
নিজেদের কীর্তির দিকে তাকিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলুম আমরা। বাড়ি-ভর্তি পচা ডিম আর পোড়া কাপড়ের গন্ধবসবার ঘরে দুইঞ্চি ধুলোর আস্তর–শোবার ঘর আর বারান্দা জলে থইথই–আধ-পোড়া পদাটা থেকে জল চুঁইয়ে পড়ছে, টেলিফোনটা ভেঙে চুরমার।
একেই বলে বাড়ি সুপারভাইজ করা–এর নামই জীবে প্রেম!
ঠিক তখনই নীচ থেকে ট্যাক্সির হর্ন বেজে উঠল–ভ্যাঁ–ভ্যঁপ–প!
টেনিদা নড়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে মাথা সাফ হয়ে গেছে ওর। চিরকালই দেখে আসছি এটা।
–প্যালা, কুইক।
কিসের কুইক সেকথাও কি বলতে হবে আর? আমিও পটলডাঙার ছেলেট্যাক্সির হর্ন শুনেই বুঝতে পেরেছি সব। সিঁড়ি দিয়ে তো নামলুম না–যেন উড়ে পড়লুম রাস্তায়!
ট্যাক্সি থেকে ভোম্বলদা নামছেন, ভোম্বল-বৌদি নামছেন, ডোম্বলদার ছোঁকরা চাকর জলধরের কোলে ব্যাম্বি নামছে।
আমাদের দেখেই ভোম্বলদা চেঁচিয়ে উঠলেন–কীরে টেনি, বাড়িঘর সব–
–সব ঠিক আছে ভোম্বলদা–একেবারে ছবির মতো সাজিয়ে দিয়ে এসেছি বলেই টেনিদা চাবির গোছাটা ছুঁড়ে দিলে ভোলার দিকে। তারপর হতভম্ব ডোম্বলদা একটা কথা বলবার আগেই দু-জনে দুলাফে একটা দুনম্বর চলতি বাসের ওপর।
আর দাঁড়ানো চলে এরপর? এক সেকেণ্ডও?
দধীচি, পোকা ও বিশ্বকর্মা
আপাতত গভীর অরণ্যে ধ্যানে বসে আছি। বেশ মন দিয়েই ধ্যান করছি। শুধু কতকগুলো পোকা উড়ে উড়ে ক্রমাগত নাকে মুখে এসে পড়ছে আর এমন বিশ্রী লাগছে যে কী বলব! নাকে ঢুকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে, কানের ভেতর ঢুকে ওই গভীর গহুরটার ভেতরে কোনও জটিল রহস্য আছে কিনা সেটাও বোঝবার চেষ্টা করছে। একবার ঢোক গিলতে গিয়ে ডজনখানিক খেয়েও ফেলেছি। খেতে বেশ মৌরি মৌরি লাগল—কিন্তু যা বিকট গন্ধ! বমি করতে পারতাম, কিন্তু ধ্যান করতে বসলে তো আর বমি করা যায় না। তাড়াব—সে-উপায়ও নেই, কারণ এখন আমি সমাধিস্থ—একেবারে নিবাত-নিষ্কম্প হয়েই থাকতে হবে আমাকে।
