দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছি আর নাক চুলকোচ্ছি, হঠাৎ টেনিদা একটা হাঁক ছাড়ল।
–ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি হাঁ করে? ভেতরে আয়।
ঢুকে পড়লুম ভেতরে।
গোছাবার সাজাবার কিছু নেই–সবই ভোম্বল-বৌদি বেশ পরিপাটি করে রেখে গেছেন। দিব্যি বসবার ঘরটি–আমি আরাম করে একটা সোফার ওপর বসে পড়লুম।
–এই, বসলি যে?
–কী করব, করবার তো কিছুই নেই।
–তা বটে।–টেনিদা হতাশ হয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখল একবার,ধুলো-টুলোও তো বিশেষ পড়েনি দেখছি।
–বন্ধ ঘরে ধুলো আসবে কোত্থেকে?
–হুঁ, তাই দেখছি। কিছুক্ষণ নাক-টাক চুলকে টেনিদা বললে, কোনও উপকার না করে চলে গেলে মনটা যে বড় হু-হুঁ করবে র্যা! আচ্ছা–একটা কাজ করলে হয় না? ঘরে ধুলো না থাকলেও মেজের ওই কার্পেটটায় নিশ্চয় আছে। আর ধুলো থাকবে না অথচ কার্পেট থাকবে–এ কখনও হতেই পারে না, এমন কোনওদিন হয়নি। আয়–বরং এটাকে—
কার্পেট ঝাড়বার প্রস্তাবটা আমার একেবারেই ভালো লাগল না। আপত্তি করে বললুম, কার্পেট নিয়ে আবার টানাটানি কেন? ও যেমন আছে তেমনি থাক না। খামকা–
–শাট আপ! কাজ করবি নে তো মিথ্যেই ট্রাম ভাড়া দিয়ে তোকে কালীঘাটে নিয়ে এলম নাকি? সোফায় বসে আর নবাবী করতে হবে না প্যালা, নেমে আয় বলছি–
অগত্যা নামতে হল, সোফা আর টেবিল সরাতে হল, কার্পেট টেনে তুলতে হল, তারপর একবার মাত্র একটি বার ঝাড়া দিতেই ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস!
ঘরের ভেতরে যেন ঘূর্ণি উঠল একটা! চোখের পলকে অন্ধকার।
টালা থেকে ট্যাংরা আর শেয়ালদা থেকে শিয়াখালা পর্যন্ত যত ধুলো ছিল একসঙ্গে পাক খেয়ে উঠল।–সেরেছে, সেরেছে, বলে এক বাঘা চিৎকার দিলুম আমি, তারপর দুলাফে আমরা বেরিয়ে পড়লুম ঘর থেকে নাকে ধুলো, কানে ধুলো, মুখে ধুলো, মাথায় ধুলো। পুরো দশটি মিনিট খক-খক খকখক করে কাশির প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে আবার কোত্থেকে গোটা দুই আরশোলা আমার নাকের ওপর ডিগবাজি খেয়েও গেল।
কাশি বন্ধ হলে মাথা-টাথা ঝেড়ে, মুখ-ভর্তি কিচকিচে বালি নিয়ে আমি বললুম, এটা কী হল টেনিদা?
টেনিদা গাঁক-গাঁক করে বললে, হুঁ! কেমন বেয়াড়া হয়ে গেল রে! মানে এত ধুলো যে ওর ভেতরে থাকতে পারে–বোঝাই যায়নি। ইস–ঘরটার অবস্থা দেখছিস?
হ্যাঁ-দেখবার মতো চেহারাই হয়েছে এবার। দরজা দিয়ে তখনও ধোঁয়ার মতো ধুলো বেরুচ্ছে–সোফা, টেবিল, টিপয়, বুক-কেস, রেডিয়ো-সব কিছুর ওপর নিট তিন ইঞ্চি ধুলোর আস্তর! ভোল-বৌদি ঘরে পা দিয়েই স্রেফ অজ্ঞান হয়ে পড়বেন।
দু-হাতে মাথা চুলকোতে চুলকোতে টেনিদা বললে, ইঃ–একেবারে নাইয়ে দিয়েছে রে!
আমি বললুম, ভালোই তো হল। কাজ করতে চাইছিলে, করো এবার প্রাণ খুলে! সারা দিন ধরেই ঝাঁট দিতে থাকো!
দাঁত খিচোতে গিয়েই বালির কিচকিচানিতে টেনিদা খপাৎ করে মুখ বন্ধ করে ফেলল।
–তা ঝাঁট তো দিতেই হবে। বাড়িতে এসে এই দশা দেখবে নাকি ভোম্বলদা?
–আবার ঝাড়তে হবে কার্পেট!
–নিকুচি করেছে কার্পেটের! চল–ঝাটা খুঁজে বের করি।
ঝাঁটা আর পাওয়া যায় না। বসবার ঘরে নয়–শোবার ঘরে নয়, শেষ পর্যন্ত রান্নাঘরে এসে হাজির হলুম আমরা।
-আরে ওই তো ঝাঁটা!
তার আগে জাল-দেওয়া মিট-সেফের দিকে নজর পড়েছে আমার।
–টেনিদা!
–কী হল আবার?–টেনিদা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে বললে, সারা ঘর ধুলোয় এককার হয়ে রয়েছে–এখন আবার ডাকাডাকি কেন? আয় শিগগির–একটু পরেই তো ওরা এসে পড়বে!
–আমি বলছিলুম কীকান দুটো একবার চুলকে নিয়ে জবাব দিলুম : মিট-সেফের ভেতর যেন গোটা-তিনেক ডিম দেখা যাচ্ছে।
–তাতে কী হল?–একটা মাখনের টিনও দেখতে পাচ্ছি। টেনিদার মনোযোগ আকৃষ্ট হল।
–আচ্ছা, বলে যা।
–দুটো কেরোসিন স্টোভ দেখতে পাচ্ছি দু-বোতল তেল দেখা যাচ্ছে–ওখানে শেলফের ওপর একটা দেশলাইও যেন চোখে পড়ছে।
–হুঁ, তারপর? আমি ওয়াশ-বেসিনটা খুলোম।
–এতেও জল আছে–দেখতে পাচ্ছ তো?
–সবই দেখতে পাচ্ছি। তারপর?
আমি আর একবার বাঁ কানটা চুলকে নিলুম : মানে সামনে এখন অনেক কাজ–যাকে বলে দুরূহ কর্তব্য। ঘর থেকে ওই মনখানেক ধুলো ঝেটিয়ে বের করতে ঘন্টাখানেক তো মেহনত করতে হবে অন্তত? আমি বলছিলুম কী, তার আগে একটু কিছু খেয়ে নিলে হয় না? ধরো তিনটে ডিম দিয়ে বেশ বড় বড় দুটো ওমলেট হতে পারে—
–ব্যস-ব্যস, আর বলতে হবে না! টেনিদার জিভ থেকে সড়াক করে একটা আওয়াজ বেরুল : এটা মন্দ বলিসনি। পেট খুশি থাকলে মেজাজটাও খুশি থাকে। আর এই যে একটা বিস্কুটের টিনও দেখতে পাচ্ছি–
পত্রপাঠ টিনটা টেনে নামাল টেনিদা, কিন্তু খুলেই মুখটা গাজরের হালুয়ার মতো করে বললে, ধেৎ!
–কী হল, বিস্কুট নেই?
–নাঃ, কতগুলো ডালের বড়ি! ছ্যা-ছ্যাঁ!–টেনিদা ব্যাজার হয়ে বললে, জানিস, ভোম্বল-বৌদি এম. এ. পাশ, অথচ বিস্কুটের টিনে বড়ি রাখে। রামমাঃ।
আমি বললুম, তাতে কী হয়েছে? আমার এলাহাবাদের সোনাদিও তো কীসব থিসিস লিখে ডাক্তার হয়েছে–সেও তো ডালের বড়ি খেতে খুব ভালোবাসে।
–রেখে দে তোর সোনাদি!–টেনিদা ঠক করে বড়ির টিনটাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে। বললে, বলি, মতলব কী তোর? খালি তক্কোই করবি আমার সঙ্গে, না ওমলেট-টোমলেট ভাজবি?
-আচ্ছা, এসো তা হলে, লেগে পড়া যাক।
লেগে যেতে দেরি হল না। সসপ্যান বেরুল, ডিম বেরুল, চামচে বেরুল, লবণ বেরুল, লঙ্কার গুঁড়োও পাওয়া গেল খানিকটা। শুধু গোটা-দুই পেঁয়াজ পাওয়া গেলেই আর দুঃখ থাকত না কোথাও।
