আমি গোড়াতেই বুঝেছিলাম এরকম হবে। হাবুলকেও বলেছিলাম কথাটা। কিন্তু সে তখন ইন্দ্ৰত্ব লাভ করে কৈলাসে শিবের কাছে যাওয়ার কথা ভাবছে, আমলই দিলে না। বললে, যাঃ যাঃ, এসব ওসব ফ্যাচফ্যাঁচ করিসনি। অরণ্যে পোকা থাকেই এবং নাকে মুখেও তারা পড়ে। চুপচাপ বরদাস্ত করে যানইলে মহর্ষি হবি কেমন করে?
তা বটে। তবে একটা জিনিস বুঝেছি মহর্ষিদের মেজাজ অমন ভীমরুলের চাকের মতো কেন, আর কথায় কথায়ই তাঁরা অমন তেড়ে ব্রহ্মশাপ ঝাড়েন কেন! আরে বাপু, ধৈর্যের একটা সীমা তো আছে মানুষের। নাকে মুখে অমন পোকার উপদ্রব হলে শান্তনুর মতো শান্ত মানুষও যে দুর্বাসা হতে বাধ্য, এ ব্যাপারে আমার আর তিলমাত্রও সন্দেহ নেই।
আচ্ছা জ্বালাতনেই পড়া গেল বাস্তবিক। সত্যি বলছি, আমি প্যালারাম বাঁড়ুজ্যে, পালাজ্বরে ভুগি আর বাসকপাতার রস খাই, আমার কী দায়টা পড়েছে মহর্ষি-টহর্ষির মতো গোলমেলে ব্যাপারে পা বাড়িয়ে? পটলডাঙার গলিতে থাকি, পটোল দিয়ে শিংমাছের ঝোল আর আতপ চালের ভাত আমার বরাদ্দ, একমুঠো চানাচুর খেয়েছি কি পেটের গোলমালে আমার পটল তুলবার, জো! এ-হেন আমি—একেবারে গোরুর মতো বেচারা লোক, আমিই শেষে পড়ে গেলাম ছহাত লম্বা আর বিয়াল্লিশ ইঞ্চি বুক-ওলা টেনিদার পাল্লায়।
আর টেনিদার পাল্লায় পড়া মানে যে কী, যারা পড়োনিউহু, ভাবতেই পারবে না। গড়ের মাঠের গোরা থেকে চোরাবাজারের চালিয়াত দোকানদার পর্যন্ত ঠেঙিয়ে একেবারে রপ্ত। হাত তুললেই মনে হবে রদ্দা মারলে, দাঁত বার করলেই বোধ হবে কামড়ে দিলে বোধ হয়। এই ভৈরব ভয়ঙ্কর লোকের খপ্পরে পড়েই আমাকে এখন মহর্ষি হয়ে ধ্যান করতে হচ্ছে।
কী আর করি! বসে আছি তো বসেই আছি। অরণ্যের ভেতরে একটা ফুটো—সেখান দিয়ে দেখছি হতভাগ্য হাবুলের নাক বেরিয়ে আছে। পোকার কামড়ে জেরবার হয়ে ভাবছি। ওই নাকেই একটা ধাঁ করে ঘুষি বসাব কিনা, এমন সময় শিষ্য দধিমুখের প্রবেশ।
দধিমুখ বললে, প্রভু আছে নিবেদন।
বললাম, কহ বৎস, শুনিব নিশ্চয়।
দধিমুখ বললে, কালি নিশিশেষে
দেখিলাম আশ্চর্য স্বপন।
দেখিলাম প্রভু যেন দেবদেহ ধরি
আরোহিয়া অগ্নিময় রথে,
চলেছেন মহাব্যোমে ছায়াপথ করি বিদারণ!
সত্ৰাসে কহিনু কাঁদি–
ওয়াকওয়াক্ থুঃ।
আর কী, পোকা! থু থু করে দধিমুখ সেটা আমার গায়েই ঝেড়ে দিলে, শিষ্যের আস্পর্ধাখানা দ্যাখো একবার। রাগে আমার শরীর জ্বলে গেল,—টিকি খাড়া হয়ে উঠল ব্রহ্মতেজে। কিন্তু শিষ্যকে শাপ দিলেই তো সব মাটি। মনে মনে ভাবলাম, দাঁড়াও চাঁদ, তোমাকেও শায়েস্তা করতে হচ্ছে।
হেসে বললাম, আছে, আছে রহস্য অদ্ভুত।
নিরেট মগজ তব সহজে তো বুঝিবে না সেটা,
কাছে এসো কহি কানে কানে।
দধিমুখ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আমার মুখ থেকে যা আশা করছিল তা শুনতে পায়নি কী যে করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। দধিমুখ অসহায়ভাবে একবার চারদিকে তাকাল।
আমি বললাম, দাঁড়াইয়া কেন?
কাছে এসো, মুখ আনো কানের নিকটে,
তবে তো জানিবে সেই অদ্ভুত বারতা।
এসো বৎস–
বালক, আরও কাছে আয়–কাছে আয় না—
দধিমুখের বয়স অল্প—একেবারে আনাড়ি। ইতস্তত করে, যেই আমার কানের কাছে মুখ আনা, অমনি আমি পালটা জবাব দিলাম। মস্ত একটা হাঁ করলাম, সঙ্গে সঙ্গেই এক ঝাঁক পোকা পড়ল মুখের ভেতর। আর পত্রপাঠ সেগুলো থুথু শব্দে ফেরত গেল দধিমুখের গালে, নাকে, মুখে, কপালে। শিষ্যকে গুরুর স্নেহাশিস!
দধিমুখ অ্যাঁ-অ্যাঁ করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঝড়াং করে ড্রপ সিন। খট করে বাঁশটা আমার নাকে পড়ল, তারপর সোজা নীচে। সিন শেষ হওয়ার আগেই দ্বিতীয় অঙ্ক সমাপ্ত।
তক্ষুনি স্টেজের ভেতর ছুটে এল ইন্দ্রবেশী হাবুল আর বিশ্বকর্মবেশী টেনিদা। টেনিদা বললে, এটা কী হল—অ্যাাঁ? এর মানেটা কী, শুনি?
আমি বিদ্রোহ করে বললাম, কিসের মানে?
টেনিদা দাঁত খিচিয়ে উঠল : প্লে-টা তুই মাটি করবি হতভাগা? কেন ওভাবে থুতু দিলি ক্যাবলার মুখে? একদম বরবাদ হয়ে গেল সিনটা। কী রকম হাসছে অডিয়ান্স—তা দেখছিস?
আমি বললাম, ক্যাবলাই তো থুতু দিয়েছে আগে।
টেনিদা বললে, হুম। দুটোর মাথাই একসঙ্গে ঠুকে দেব এক জোড়া বেলের মতো। যাক যা হয়ে গেছে সে তো গেছেই। এখন পরের সিনগুলোকে ভালো করে ম্যানেজ করা চাই–বুঝলি? যদি একটু বেয়াড়াপনা করিস তো একটা চাঁটির চোটে নাক একেবারে নাসিকে পাঠিয়ে দেব।
আমি বললাম, তুমি তো বলেই খালাস। কিন্তু স্টেজে হাঁ করে বসে ওই পোকা হজম করবে কে, সেটা শুনি?
টেনিদা হুঙ্কার করল, তুই করবি। আলবাত তোকেই করতে হবে। থিয়েটার করতে পারবি আর পোকা খেতে পারবি না? দরকার হলে মশা খেতে হবে, মাছি খেতে হবে–
হাবুল যোগ দিয়ে বললে, ইঁদুর খেতে হবে, বাদুড় খেতে হবে–
টেনিদা বললে, মাদুর খেতে হবে, এমন কি খাট-পালং খাওয়াও আশ্চর্য নয়। হুঁ হুঁ বাবা, এর নাম থিয়েটার।
–থিয়েটার করতে গেলে ওসব খেতে হয় নাকি?—আমি ক্ষীণ প্রতিবাদ জানালাম।
—হয় হয়। তুই এ-সবের কী বুঝিস র্যা—অ্যাাঁ? দানীবাবুর নাম শুনেছিস, দানীবাবু? তিনি যখন সীতার ভূমিকায় প্লে করতেন, তখন মনুমেন্ট খেয়ে নামতেন, সেটা জানিস?
—মনুমেন্ট খেয়ে!
—হ্যাঁ হ্যাঁ—মনুমেন্ট খেয়ে। যাঃ—যাঃ ক্যাঁচম্যাচ করিসনি। এক্ষুনি সিন উঠবে—কেটে পড়—নিজের পার্ট মুখস্থ করগে।
বেগুন-খেতে কাক-তাড়ানো কেলে হাঁড়ির মতো মুখ করে আমি স্টেজের একধারে এসে বসলাম। মনুমেন্ট খাওয়া! চালিয়াতির আর জায়গা পাওনি-মানুষে কখনও মনুমেন্ট খেতে পারে। কিন্তু প্রতিবাদ করলেই চাঁটি, তাই অমন বোম্বাই চালখানাও হজম করে গেছি।
