সে কী গোঁত্তা! মাথা নিচু করে বোঁ-বোঁ শব্দে নামছে তো নামছেই। নামতে নামতে একেবারে ঝপাস করে সোজা গঙ্গায়। মঙ্গলগ্রহে আর গেল নামত বদলে পাতালের দিকে রওনা হল।
আর টেনিদা? টেনিদা কোথায়? সেও কি ঘুড়ির সঙ্গে গঙ্গায় নামল?
না–গঙ্গায় নামেনি। টেনিদা আটকে আছে। আটকে আছে আউটরাম ঘাটের একটা মস্ত গাছের মগডালে। আর বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে একদল কাক কাকা করে টেনিদার চারপাশে চক্কর দিচ্ছে।
ছুটতে ছুটতে আমরা গাছতলায় এসে হাজির হলুম। কেবল আমরাই নই। চারিদিক থেকে তখন প্রায় শ-দুই লোক জড়ো হয়েছে সেখানে। পোর্ট কমিশনারের খালাসি, নৌকোর মাঝি, দুটো সাহেব–তিনটে মেম।
-ওঃ মাই–হোয়াজজাট (হোয়াটস দ্যাট)?–বলেই একটা মেম ভিরমি গেল।
কিন্তু তখন আর মেমের দিকে কে তাকায়? আমি চেঁচিয়ে বললুম, টেনিদা, তা হলে মঙ্গলগ্রহে গেলে না শেষ পর্যন্ত?
টেনিদা ঢাউস ঘুড়ির মতো গোঁ-গোঁ আওয়াজ করে বললে, কাকে ঠোকরাচ্ছে!
–নেমে এসে তা হলে।
টেনিদা গাঁ-গাঁ করে বললে, পারছি না! ওফ–কাকে মাথা ফুটো করে দিলে রে পালা। পোর্ট কমিশনারের একজন কুলি তখুনি ফায়ার ব্রিগেডে টেলিফোন করতে ছুটল। ওরাই এসে মই বেয়ে নামিয়ে আনবে।
চাটুজ্যেদের রকে বসে আমি বললুম, ডি-লা-গ্র্যান্ডি–
সারা গায়ে আইডিন-মাখানো টেনিদা কাতর স্বরে বললে, থাক, ও আর বলিসনি। তার চাইতে একটা করুণ কিছু বল। তোর ফুচুদার লেখা রামধনের ওই বৃদ্ধ গাধার কবিতাটাই শোনা। ভারি প্যাথেটিক। ভারি প্যাথেটিক।
তত্ত্বাবধান মানে–জীবে প্রেম
রবিবারের সকালে ডাক্তার মেজদা কাছাকাছি কোথাও নেই দেখে আমি মেজদার স্টেথিসকোপ কানে লাগিয়ে বাড়ির হুলোবেড়াল টুনির পেট পরীক্ষা করছিলাম। বেশ গুরগুর করে আওয়াজ হচ্ছে, মানে এতদিন ধরে যতগুলো নেংটি ইঁদুর আরশোলা টিকটিকি খেয়েছে। তারা ওর পেটের ভেতরে ডাকাডাকি করছে বলে মনে হচ্ছিল। আমি টুনির পেট সম্পর্কে এইসব দারুণ দারুণ চিন্তা করছি, এমন সময় বাইরে থেকে টেনিদা ডাকল : প্যালা, কুইক–কুইক!
স্টেথিসকোপ রেখে এক লাফে বেরিয়ে এলুম বাড়ি থেকে।
–কী হয়েছে টেনিদা?
টেনিদা গম্ভীর হয়ে বললে, পুঁদিচ্চেরি।
মনে কোনওরকম উত্তেজনা এলেই টেনিদা ফরাসী ভাষায় কথা বলতে থাকে। তখন কে বলবে, স্রেফ ইংরিজির জন্যেই ওকে তিন-তিনবার স্কুল ফাঁইন্যালে আটকে যেতে হয়েছে।
আমি বললুম, পুঁদিচ্চেরি মানে?
–মানে ব্যাপার অত্যন্ত সাঙ্ঘাতিক। এক্ষুনি তোকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। ক্যাবলা কিংবা হাবুল সেন কাউকে বাড়িতে পেলুম না–তাই সঙ্গে তোকেই নিয়ে যেতে এসেছি।
–কোথায় নিয়ে যাবে?
–কালীঘাটে।
–কালীঘাটে কেন?–আমি উৎসাহ বোধ করলুম। কোথাও খাওয়াটাওয়ার ব্যবস্থা আছে বুঝি?
–এটার দিনরাত খালি খাওয়ার চিন্তা!–বলে টেনিদা আমার দিকে তাক করে চাঁটি তুলল, সঙ্গে সঙ্গে এক লাফে তিন হাত দূরে ছিটকে গেলুম আমি।
–মারামারি কেন আবার? কী বলতে চাও, খুলেই বলো না।
চাঁটিটা কষাতে না পেরে ভীষণ ব্যাজার হয়ে টেনিদা বললে, বলতে আর দিচ্ছিস কোথায়?সমানে চামচিকের মতো চাঁকাক করছিস তখন থেকে। হয়েছে কী জানিস, আমার পিসতুতো ভাই ডোম্বলদার ফ্ল্যাটটা একটু তত্ত্বাবধান–মানে সুপারভাইজ করে আসতে হবে।
–তোমার ভোম্বলদা কী করছেন? কম্বল গায়ে দিয়ে লম্বা হয়ে পড়ে আছেন?
–আরে না না! ডোম্বলদা, ডোম্বল-বৌদি, মায় ডোম্বলদার মেয়ে ব্যাধি-সবাই মিলে ঝাঁসি না গোয়ালিয়র কোথায় বেড়াতে গেছে। আজই সকালে সাড়ে দশটার গাড়িতে ওরা আসবে। এদিকে আমি তো স্রেফ ভুলে মেরে বসে আছি, বাড়ির কী যে হাল হয়েছে কিছু জানি না। চল–দুজনে মিলে এই বেলা একটু সাফ-টাফ করে রাখি।
শুনে পিত্তি জ্বলে গেল। আমি তোমার ডোম্বলদার চাকর নাকি যে ঘর ঝাঁট দিতে যাব? তোমার ইচ্ছে হয় তুমি যাও।
টেনিদা নরম গলায় আমাকে বোঝাতে লাগল তখন।–ছি প্যালা, ওসব বলতে নেই-পাপ হয়। চাকরের কথা কেন বলছিস র্যা–এ হল পরোপকার। মানে জীবসেবা। আর জানিস তো–জীবে প্রেম করার মতো এমন ভালো কাজ আর কিচ্ছুটি নেই?
আমি মাথা নেড়ে বললুম, তোমার ভোলদাকে প্রেম করে আমার লাভ কী? তার চেয়ে আমার হুলো বেড়াল টুনিই ভাল। সে ইঁদুর-টিদুর মারে।
টেনিদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, কলেজে ভর্তি হয়ে তুই আজকাল ভারি পাখোয়াজ হয়ে গেছিস ভারি ডাঁট হয়েছে তোর! আচ্ছা চল আমার সঙ্গে বিকেলে তোকে চাচার হোটেলে কাটলেট খাওয়াব।
–সত্যি?
–তিন সত্যি। কালীঘাটের মা কালীর দিব্যি।
এরপরে জীবকে–মানে ভোলদাকে প্রেম না করে আর থাকা যায়? দারুণ উৎসাহের সঙ্গে আমি বললুম, আচ্ছা চলো তাহলে।
বাড়িটা কালীঘাট পার্কের কাছেই। তেতলার ফ্ল্যাটে ভোলা থাকেন, ভোম্বল-বৌদি থাকেন, আর তিন বছরের মেয়ে ব্যাম্বি থাকে।
টেনিদা চাবি খুলতে যাচ্ছিল, আমি হাঁ-হাঁ করে বাধা দিলুম।
–আরে আরে, কার ঘর খুলছ? দেখছ না–নেমপ্লেট রয়েছে অলকেশ ব্যানার্জি, এম. এস. সি.?
–ডোম্বলদার ভালো নামই তো অলকেশ।
শুনেই মন খারাপ হয়ে গেল। এমন নামটাই বরবাদ? ডোম্বলদার পোশাকি নাম দোলগোবিন্দ হওয়া উচিত। ভূতেশ্বর হতেও বাধা নেই, এমনকি কালীচরণও হতে পারে। কিন্তু অলকেশ একেবারেই বেমানান–আর অলকেশ হলে কিছুতেই ভোলা হওয়া উচিত নয়।
