টেনিদা বললে, ঠিক। একথাটা আমিই তো ভাবতে যাচ্ছিলুম। তুই আগে থেকে ভাবলি কেন র্যা? ভারি বাড় বেড়েছেনা? তোকে পানিশমেন্ট দিলুম। যা গাছে ওঠ
ক্যাবলা বললে, বা-রে। লোকের ভালো করলে বুঝি এমনিই হয়? দাঁত খিঁচিয়ে টেনিদা বললে, তোকে ভালো করতে কে বলেছিল–শুনি? দুনিয়ায় কারও ভালো করেছিস কি মরেছিস। যা–গাছে ওঠ–
–যদি কাঠপিঁপড়ে কামড়ায়?
কামড়াবে। আমাদের বেশ ভালোই লাগবে।
–যদি ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়?
–তোর কান ছিঁড়ব! যা–ওঠ বলছি—
কী আর করে–যেতেই হল ক্যাবলাকে। যাওয়ার সময় বললে, ঘুড়ির দড়িটা ওই গোলপোস্টে বেঁধে দিয়ে টেনিদা। অত বড় ঢাউস খুব জোর টান দেবে কিন্তু।
টেনিদা নাক কুঁচকে মুখটাকে হালুয়ার মতো করে বললে, যা বেশি বকিসনি। ঘুড়ি উড়িয়ে উড়িয়ে বুড়ো হয়ে গেলুম–তুই এসেছিস ওস্তাদি করতে। নিজের কাজ কর।
ক্যাবলা বললে, বহুৎ আচ্ছা।
হু হু করে হাওয়া বইছে তখন। ডালের ডগায় উঠে ক্যাবলা ঢাউসকে ছেড়ে দিলে। সঙ্গে সঙ্গে গোঁ গোঁ করে ডাক ছেড়ে সেই পেল্লায় ঢাউস আকাশে উড়ল।
টেনিদার ওপর সব রাগ ভুলে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছি। কী চমৎকার যে দেখাচ্ছে ঢাউসকে। মাথার দুধারে দুটো পতাকা যেন বিজয়গর্বে পতপত উড়ছে-গোঁ-গোঁ আওয়াজ তুলে ঘুড়ি ওপরে উঠে যাচ্ছে। টেনিদা চেঁচিয়ে উঠল : ডি-লা-গ্র্যান্ডি–
কিন্তু আচমকা টেনিদার চ্যাঁচানি বন্ধ হয়ে গেল। আর হাঁউমাউ করে ডাক ছাড়ল হাবুল।
–গেল—গেল—
কে গেল? কোথায় গেল?
কে আর যাবে! অমন করে কেই বা যেতে পারে টেনিদা ছাড়া? তাকিয়ে দেখেই আমার চোখ চড়াৎ করে কপালে উঠে গেল। কপালে বললেও ঠিক হয় না, সোজা ব্ৰহ্মতালুতে।
শুধু ঢাউসই ওড়েনি। সেই সঙ্গে টেনিদাও উড়ছে। চালিয়াতি করে লাটাই ধরে রেখেছিল হাতে, বাঘা ঢাউসের টানে সোজা হাত-দশেক উঠে গেছে ওপরে!
এক লাফে গাছ থেকে নেমে পড়ল ক্যাবলা। বললে, পাকোপাকড়ো
কিন্তু কে কাকে পাকড়ায়! ততক্ষণে টেনিদা পনেরো হাত ওপরে। সেখান থেকে তার আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে :হাবুল রে–প্যালা রে-ক্যাবলা রে–
আমরা তিনজন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলুম :–ছেড়ে দাও, লাটাই ছেড়ে দাও—
টেনিদা কাঁউ কাঁউ করে বললে, পড়ে যে হাত-পা ভাঙব!
হাবুল বললে, তবে আর কী করবা! উইড়া যাও—
ঢাউস তখন আরও উপরে উঠেছে। জোরালো পুবের হাওয়ায় সোজা পশ্চিমমুখো ছুটেছে গোঁ-গোঁ করতে করতে। আর জালের সঙ্গে মাকড়সা যেমন করে ঝোলে, তেমনি করে মহাশূন্যে ঝুলতে ঝুলতে চলেছে টেনিদা।
পেছনে পেছনে আমরাও ছুটলুম। সে কী দৃশ্য! তোমরা কোনও রোমাঞ্চকর সিনেমাতেও তা দ্যাখোনি!
ওপর থেকে তারস্বরে টেনিদা বললে, কোথায় উড়ে যাচ্ছি বল তো?
ছুটতে ছুটতে আমরা বললুম, গঙ্গার দিকে।
–অ্যাঁ–ত্ৰিশূন্য থেকে টেনিদা কেঁউ কেঁউ করে বললে, গঙ্গায় পড়ব নাকি?
হাবুল বললে, হাওড়া স্টেশনেও যাইতে পারো।
-অ্যাঁ!
আমি বললুম, বর্ধমানেও নিয়ে যেতে পারে।
–বর্ধমান! বলতে বলতে শুন্যে একটা ডিগবাজি খেয়ে গেল টেনিদা।
ক্যাবলা বললে, দিল্লি গেলেই বা আপত্তি কী?সোজা কুতুবমিনারের চূড়ায় নামিয়ে দেবে এখন।
টেনিদা তখন প্রায় পঁচিশ হাত ওপরে। সেখান থেকে গোঙাতে গোঙাতে বললে, এ যে আরও উঠছে। দিল্লি গিয়ে থামবে তো? ঠিক বলছিস?
আমি ভরসা দিয়ে বললুম, না থামলেই বা ভাবনা কী? হয়ত মঙ্গলগ্রহেও নিয়ে যেতে পারে।
–মঙ্গলগ্রহ!–আকাশ ফাটিয়ে আর্তনাদ করে টেনিদা বললে, আমি মঙ্গলগ্রহে এখন যেতে চাচ্ছি না। যাওয়ার কোনও দরকার দেখছি না!
ক্যাবলা বললে, তবু যেতেই হচ্ছে। যাওয়াই তো ভালো টেনিদা। তুমিই বোধহয় প্রথম মানুষ যে মঙ্গলগ্রহে যাচ্ছ। আমাদের পটলডাঙার কত বড় গৌরব সেটা ভেবে দ্যাখো।
–চুলোয় যাক পটলডাঙা। আমি কিন্তু টেনিদা আর বলতে পারলে না, তক্ষুনি শূন্যে আর-একটা ডিগবাজি খেলে। খেয়েই আবার কাঁউ কাঁউ করে বললে, ঘুরপাক খাচ্ছি যে! আমি মোটেই ঘুরতে চাচ্ছি না–তবু বোঁ বোঁ করে ঘুরে যাচ্ছি।
ঘুড়ি তখন ক্যালকাটা গ্রাউন্ডের কাছাকাছি। আমরা সমানে পিছনে ছুটছি। ছুটতে ছুটতে আমি বললুম, ওরকম ঘুরতে হয়। ওকে মাধ্যাকর্ষণ বলে। সায়েন্স পড়োনি?
অনেক ওপর থেকে টেনিদা যেন কী বললে। আমরা শুনতে পেলুম না। কেবল কাঁউ কাঁউ করে খানিকটা আওয়াজ আকাশ থেকে ভেসে এল।
কিন্তু ওদিকে ঢাউস যত গঙ্গার দিকে এগোচ্ছে তত হাওয়ার জোরও বাড়ছে। পিছনে ছুটে আমরা আর কুলিয়ে উঠতে পারছি না। টেনিদা উড়ছে আর ডিগবাজি খাচ্ছে, ডিগবাজি খাচ্ছে আর উড়ছে।
স্ট্যান্ড রোড এসে পড়ল প্রায়। ঘুড়ি সমানে ছুটে চলেছে। এখুনি গঙ্গার ওপরে চলে যাবে। আমাদের লিডার যে সত্যিই গঙ্গা পেরিয়ে বর্ধমান হয়ে দিল্লি ছাড়িয়ে মঙ্গলগ্রহেই চলল। আমরা যে অনাথ হয়ে গেলুম।
আকাশ থেকে টেনিদা আবার আর্তস্বরে বললে, সত্যি বলছি–আমি মঙ্গলগ্রহে যেতে চাই না– কিছুতেই যেতে চাই না—
আমরা এইবারে একবাক্যে বললুম, না–তুমি যেয়ো না।
–কিন্তু নিয়ে যাচ্ছে যে!
–তা হলে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।–ক্যাবলা জানিয়ে দিলে।
–আর পৌঁছেই একটা চিঠি লিখো–আমি আরও মনে করিয়ে দিলুম : চিঠি লেখাটা খুব দরকার।
টেনিদা বোধহয় বলতে যাচ্ছিল নিশ্চয়ই চিঠি লিখবে, কিন্তু পুরোটা আর বলতে পারলে না। একবার কাঁউ করে উঠেই কোঁক করে থেমে গেল। আমরা দেখলুম, ঢাউস গোঁত্তা খাচ্ছে।
