টেনিদা মিটমিট করে হেসে বললে, হয়েছে, বোঝা গেছে তাদের দৌড়। আর আমি কী ওড়াব জানিস? আমি–এই টেনি শর্মা?–টেনিদা খাড়া নাকটাকে খাঁড়ার মতো উঁচু করে নিজের বুকে দুটো টোকা মেরে বললে, আমি যা ওড়াব–তা আকাশে বোঁ বোঁ করে উড়বে, গোঁ গোঁ করে এরোপ্লেনের মতো ডাক ছাড়বে-হুঁ হুঁ! ডি-লা-গ্র্যান্ডি—
বাকিটা ক্যাবলা আর বলতে দিলে না। ফস করে বলে বসল : ঢাউস ঘুড়ি বানিয়েছ বুঝি?
–বানিয়েছ বুঝি?–টেনিদা রেগে ভেংচে বললে, তুই আগে থেকে বলে দিলি কেন? তোকে আমি বলতে বারণ করিনি?
ক্যাবলা আশ্চর্য হয়ে বললে, তুমি আমাকে ঢাউস ঘুড়ির কথা বললেই বা কখন, বারণই বা করলে কবে? আমি তো নিজেই ভেবে বললুম।
–কেন ভাবলি?–টেনিদা রকে একটা কিল মেরেই উঃ উঃ করে উঠল : বলি, আগ বাড়িয়ে তোকে এসব ভাবতে বলেছে কে র্যা? প্যালা ভাবেনি, হাবলা ভাবেনি–তুই কেন। ভাবতে গেলি?
হাবুল সেন বললে, হুঁ, ওইটাই ক্যাবলার দোষ। এত ভাইব্যা ভাইব্যা শ্যাষে একদিন ও কবি হইব।
আমি মাথা নেড়ে বললুম, হুঁ, কবি হওয়া খুব খারাপ। আমার পিসতুতো ভাই ফুচুদা একবার কবি হয়েছিল। দিনরাত কবিতা লিখত। একদিন রামধন ধোপার খাতায় কবিতা করে লিখল :
পাঁচখানা ধুতি, সাতখানা শাড়ি
এসব হিসাবে হইবে কিবা?
এ-জগতে জীব কত ব্যথা পায়
তাই ভাবি আমি রাত্রি-দিবা।
রামধনের ওই বৃদ্ধ গাধা
মনটি তাহার বড়ই সাদা–
সে-বেচারা তার পিঠেতে চাপায়ে
কত শাড়ি ধুতি-প্যান্ট লইয়া যায়–
মনোদুখে খালি বোঝ টেনে ফেরে গাধা
একখানা ধুতি-প্যান্ট পরিতে না পায়!
টেনিদা বললে, আহা-হা, বেশ লিখেছিল তো! শুনে চোখে জল আসে!
হাবুল মাথা নেড়ে বললে, হ, খুবই করুণ।
আমি বললুম, কবিতাটা পড়ে আমারও খুব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু পিসিমা ধোপার হিসেবের খাতায় এইসব দেখে ভীষণ রেগে গেল! রেগে গিয়ে হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে একটা চাল কুমড়ো নিয়ে ফুচুদাকে তাড়া করলে। ঠিক যেন গদা হাতে নিয়ে শাড়িপরা ভীম দৌড়োচ্ছে।
টেনিদা বললে, তোর পিসিমার কথা ছেড়ে দে–ভারি বেরসিক। কিন্তু কী প্যাথেটিক কবিতা যে শোনালি প্যালা–মনটা একেবারে মজে গেল। ইস–সত্যিই তো। গাধা কত ধুতি-প্যান্ট-শাড়ি টেনে নিয়ে যায়, কিন্তু একখানা পরিতে না পায়।–বলে টেনিদা উদাস হয়ে দূরের একটা শালপাতার ঠোঙার দিকে তাকিয়ে রইল।
সান্ত্বনা দিয়ে হাবুল বললে, মন খারাপ কইর্যা আর করবা কী। এই রকমই হয়। দ্যাখো না–গোবর হইল গিয়া গোরর নিজের জিনিস, অন্য লোকে তাই দিয়া ঘুঁইট্যা দেয়। গোরু একখানা ঘুঁইট্যা দিতে পারে না।
দাঁত খিঁচিয়ে টেনিদা বললে, দিলে সব মাটি করে। এমন একটা ভাবের জিনিসধাঁ করে তার ভেতর গোবর আর খুঁটে নিয়ে এল। নে–ওঠ এখন, ঢাউস ঘুড়ি দেখবি চল।
.
–ডি-লা-এ্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক—
বলতে বলতে আমরা যখন গড়ের মাঠে পৌঁছলুম তখন সবে সকাল হচ্ছে। চৌরঙ্গির এদিকে সূর্য উঠছে আর গঙ্গার দিকটা লালে লাল হয়ে গেছে। দিব্যি ঝিরঝির করে হাওয়া দিচ্ছেকখনও কখনও বাতাসটা বেশ জোরালো। চারদিকে নতুন ঘাসে যেন ঢেউ খেলছে। সত্যি বলছি আমি পটলডাঙার প্যালারাম, পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল খাইআমারই ফুচুদার মতো কবি হতে ইচ্ছে হল।
কখন যে সুর করে গাইতে শুরু করেছি–রবি মামা দেয় হামা গায়ে রাঙা জামা ওই–সে আমি নিজেই জানিনে। হঠাৎ মাথার ওপর কটাৎ করে গাট্টা মারল টেনিদা।
–অ্যাই সেরেছে! এটা যে আবার গান গায়।
–তাই বলে তুমি আমার মাথার ওপর তাল দেবে নাকি?
–আমি চটে গেলম।
তাল বলে তাল! আবার যদি চামচিকের মতো চিচি করবি, তাহলে তোর পিঠে গোটাকয়েক ঝাঁপতাল বসিয়ে দেব সে বলে দিচ্ছি। এসেছি ঘুড়ি ওড়াতে–উনি আবার সুর ধরেছেন!
আমার মনটা বেজায় বিগড়ে গেল। খামকা সকালবেলায় নিরীহ ব্রাহ্মণ-সন্তানের মাথায় গাঁট্টা মারলে। মনে মনে অভিশাপ দিয়ে বললুম, হে ভগবান, তুমি ওড়বার আগেই একটা খোঁচা-টোঁচা দিয়ে টেনিদার ঢাউস ঘুড়ির ঢাউস পেটটা ফাঁসিয়ে দাও। ওকে বেশ করে আকেল পাইয়ে দাও একবার।
ভগবান বোধহয় সকালে দাঁতন করতে করতে গড়ের মাঠে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। আমার প্রার্থনা যে এমন করে তাঁর কানে যাবে–তা কে জানত।
ওদিকে বিরাট ঢাউসকে আকাশে ওড়াবার চেষ্টা চলছে তখন। টেনিদা দড়ির মস্ত লাটাইটা ধরে আছে–আর হাবুল সেন হাঁপাতে হাঁপাতে প্রকাণ্ড ঢাউসটাকে ওপরে তুলে দিচ্ছে। কিন্তু ঢাউস উড়ছে নাঘপাৎ করে নীচে পড়ে যাচ্ছে।
টেনিদা ব্যাজার হয়ে বললে, এ কেমন ঢাউস রে। উড়ছে না যে!
হাবুল সেন মাথা নেড়ে বললে, হ, এইখান উড়ব না। এইটার থিক্যা মনুমেন্ট উড়ান সহজ।
শুনে আমার যে কী ভালো লাগল। খামকা ব্রাহ্মণের চাঁদিতে গাঁট্টা মারা! হুঁ হুঁ। যতই পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল খাই, ব্ৰহ্মতেজ যাবে কোথায়! ও ঘুড়ি আর উড়ছে না–দেখে নিয়ো।
খালি ক্যাবলা মিটমিট করে হাসল। বললে, ওড়াতে জানলে সব ঘুড়িই ওড়ে।
ওড়ে নাকি? টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, তবে দে না উড়িয়ে।
ক্যাবলা বললে, তোমার ঘুড়ি তুমি ওড়াবে, আমি ওসবের মধ্যে নেই। তবে বুদ্ধিটা বাতলে দিতে পারি। অত নীচ থেকে অত বড় ঘুড়ি ওড়ে? ওপর থেকে ছাড়লে তবে তো হাওয়া পাবে। ওই বটগাছটার ডাল দেখছ? ওখানে উঠে ঘুড়িটা ছেড়ে দাও। ডালটা অনেকখানি এদিকে বেরিয়ে এসেছে–ঘুড়ি গাছে আটকাবে না–ঠিক বোঁ করে উঠে যাবে। আকাশে।
