সব সেইভাবে ঠিক করা রইল। সায়েব যখন এল, তখন ঘরে একটা মিটমিটে আলো সামনে একটা কালো পর্দা, তার ওপর আমি কাল থেকে সায়েবকে ইয়েতি সম্পর্কে অনেক ভীষণ ভীষণ গল্প বলছিলুম। বুঝতে পারলুম, ঘরে ঢুকেই তার বুক কাঁপছে।
মজা দেখবার জন্যে হরেকেষ্ট ছিলেন, তাঁর কম্পাউন্ডার গোলোকবাবুও বসে ছিলেন। বেশ অ্যাটমসফিয়ার তৈরি হয়ে গেলে-ওয়ান-টু-থ্রি বলে আমি পদার্টা সরিয়ে দিলুম। আর
আমরা একসঙ্গে বললুম, আর?
এ কী! এ তো কাইলা নয়! তার ভালুকের চামড়া পড়ে গেছে, মুখোশ ছিটকে গেছে চিতপাত অবস্থায় ব্যাঙের মতো হাত-পা ছড়িয়ে সে ঠায় অজ্ঞান। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছাদ-পর্যন্ত-ছোঁওয়া এক মূর্তি। সে যে কী রকম দেখতে আমি বোঝাতে পারব না। মানুষ নয়, গরিলা নয়–অথচ গায়ে তার কাঁটা কাঁটা বাদামী রোঁয়া–চোখ দুটো জ্বলছে যেন আগুনের ভাঁটা। তিনটে সিংহের মতো গর্জন করে সে পরিষ্কার বাংলায় বললে, ইয়েতি দেখতে চাওনা? তবে নকল ইয়েতি দেখবে কেন-আসলকেই দেখো। বলে হাঃহাঃ করে ঘর-ফাটানো হাসি হাসল–তিরিশখানা ছোরার মতো ধারালো দাঁত তার ঝলকে উঠল, তারপর চোখের সামনে তার শরীরটা যেন গলে গেল, তৈরি হল একরাশ বাদামী ধোঁয়া-সেটা আবার মিলিয়ে গেল দেখতে-দেখতে। আর আমাদের গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে গেল যেন হিমালয়ের সেই ব্লিজার্ডের মতো একটা ঝড়ো হাওয়া, রক্ত জমে গেল আমাদের বন্ধ দরজার পাল্লা দুটো তার ধাক্কায় ভেঙে দশ হাত দূরে ছিটকে পড়ল। তারপর সেই হাওয়াটা হা-হা করতে করতে শাল আর পাইন বনে ঝাঁপটা মেরে একেবারে নাথুলার দিকে ছুটে গেল।
আমি তো পাথর। সায়েব মেঝেতে পড়ে কেবল গি গি করছে। কম্পাউন্ডার অজ্ঞান। হরেকেষ্টবাবু চেয়ারে চোখ উল্টে আছেন, আর বিড়বিড় করে বলছেন–কোরামিন-কোরামিন! সায়েবকে নয়–আমাকে দাও–এখুনি হার্ট ফেল করবে আমার।
টেনিদা থামল। বললে, বুঝলি, এই হচ্ছে আসল ইয়েতি। তাকে নিয়ে ফষ্টিনষ্টি করতে যাসনি-মারা পড়ে যাবি। আর তাকে কখনও দেখতেও চাসনিনা দেখলেই বরং ভালো থাকবি।
আমরা থ হয়ে বসে রইলুম খানিকক্ষণ। তারপর ক্যাবলা বললে, স্রেফ গুলপট্টি।
গুলপট্টি?–টেনিদা কটকট করে তাকাল ক্যাবলার দিকে; ওরা অন্তর্যামী। বেশি যে বকবক করছিস, হয়তো এখুনি একটা অদৃশ্য ইয়েতি তার সিংহের মতো থাবা তোর কাঁধের ওপর বাড়িয়ে দিয়ে
ওরে বাবা রে! এক লাফে রোয়াক থেকে নেমে পড়ে বাড়ির দিকে টেনে দৌড় লাগাল ক্যাবলা।
ঢাউস
চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে টেনিদা বললে, ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক। আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, তার মানে কী?
টেনিদা টক টক করে আমার মাথার ওপর দুটো টোকা মারল। বললে, তোর মগজ-ভর্তি খালি শুকনো খুঁটে–তুই এসব বুঝবিনি। এ হচ্ছে ফরাসী ভাষা।
আমার ভারি অপমান বোধ হল।
-ফরাসী ভাষা? চালিয়াতির জায়গা পাওনি? তুমি ফরাসী ভাষা কী করে জানলে? টেনিদা বললে, আমি সব জানি।
–বটে?–আমি চটে বললুম, আমিও তা হলে জার্মান ভাষা জানি।
–জার্মান ভাষা?–টেনিদা নাক কুঁচকে বললে, বল তো?
আমি তক্ষুনি বললুম, হিটলার-নাৎসি—বার্লিন–কটাকট!
হাবুল সেন বসে বসে বেলের আঠা দিয়ে একমনে একটা ছেঁড়া ঘুড়িতে পট্টি লাগাচ্ছিল। এইবার মুখ তুলে ঢাকাই ভাষায় বললে, হঃ, কী জার্মান ভাষাড়াই কইলি রে প্যালা! খবরের কাগজের কতগুলিন নাম–তার লগে একটা কটাকট জুইড়া দিয়া খুব ওস্তাদি কোরতে আছ! আমি একটা ভাষা কমু? ক দেখি—’মেকুরে হুড়ম খাইয়া হক্কৈড় করছে’–এইডার মানে কী?
টেনিদা ঘাবড়ে গিয়ে বললে, সে আবার কী রে! ম্যাডাগাস্কারের ভাষা বলছিস বুঝি?
–ম্যাডাগাস্কার না হাতি!–বিজয়গর্বে হেসে হাবুল বললে, মেকুর কিনা বিড়াল, হুড়ম খাইয়া কিনা মুড়ি খাইয়াহকৈড় করছে–মানে এঁটো করেছে।
হেরে গিয়ে টেনিদা ভীষণ বিরক্ত হল।
–রাখ বাপু তোর হুড়ম দুড়ম–শুনে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। এর চাইতে প্যালার জামান কটাকট’ও ঢের ভালো।
বলতে বলতে ক্যাবলা এসে হাজির। চোখ প্রায় অদ্ধেকটা বুজে, খুব মন দিয়ে কী যেন চিবুচ্ছে। দেখেই টেনিদার চোখ দুটো জুলজুল করে উঠল।
–অ্যাই, খাচ্ছিস কী রে?
আরও দরদ দিয়ে চিবুতে চিবুতে ক্যাবলা বললে, চুয়িং গাম।
–চুয়িং গাম!
–টেনিদা মুখ বিচ্ছিরি করে বললে, দুনিয়ায় এত খাবার জিনিস থাকতে শেষে রবার চিবুচ্ছিস বসে বসে। এর পরে জুতোর সুখতলা খাবি এই তোকে বলে দিলুম। ছ্যাঃ।
আমি বললুম, চুয়িং গাম থাক। কাল যে বিশ্বকর্মা পুজো–সেটা খেয়াল নেই বুঝি?
টেনিদা বললে, খেয়াল থাকবে না কেন? সেই জন্যেই তো বলছিলুম, ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস–
ক্যাবলা পট করে বললে, মেফিস্টোফিলিস মানে শয়তান।
–শয়তান!–চটে গিয়ে টেনিদা বললে, থাম থাম, বেশি পণ্ডিতি করিসনি। সব সময় এই ক্যাবলাটা মাস্টারি করতে আসে। কাল যখন মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক ইয়াক করে আকাশে উড়বে–তখন টের পাবি।
–তার মানে?–আমরা সমস্বরে জিজ্ঞাসা করলুম।
–মানে? মানে জানবি পরে–টেনিদা বললে, এখন বল দিকি, কাল বিশ্বকর্মা পুজোর কী রকম আয়োজন হল তোদের?
আমি বললুম, আমি দু ডজন ঘুড়ি কিনেছি।
হাবুল সেন বললে, আমি তিন ডজন।
ক্যাবলা চুয়িং গাম চিবুতে চিবুতে বললে, আমি একটাও কিনিনি। তোদর ঘুড়িগুলো কাটা গেলে আমি সেইগুলো ধরে ওড়াব।
