আমি বললুম, চলল না ফাজলেমি?
না।–খুব ভাবুকের মতো একটু চুপ করে থেকে টেনিদা বললে, হল কী জানিস, এক্সপিডিশন থেকে ফিরে কালিম্পঙে এসে বেশ রেস্ট নিচ্ছিলুম। আর ডাক্তার হরেকেষ্টবাবুর বাড়িতেও অনেক মুরগি–রোজ সকালে ককরককর করে তারা ঘুম ভাঙাত, আর দুপুরে, রাত্তিরে কখনও কারি, কখনও কাটলেট, কখনও রোস্ট হয়ে খাবার টেবিলে হাজির হত। বেশ ছিলুম রে–তা ওখানে একদিন এক ফরাসী টুরিস্টের সঙ্গে আলাপ হল। জানিস তো আমি খুব ভালো ফরাসী বলতে পারি।
ক্যাবলা বললে, পায়রা বুঝি?
পারি না? ডি-লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক–তা হলে কোন ভাষা?
হাবুল বললে, যথার্থ। তুমি কইয়া যাও।
লোকটার সঙ্গে তো খুব খাতির হল। এসব টুরিস্টদের ব্যাপার কী জানিস তো? সব কিছু সম্পর্কেই ওদের ভীষণ কৌতূহল। ইন্ডিয়ানদের টিকি থাকে কেন–তোমাদের কাকেদের রং এত কালো কেন, তোমাদের দেবতা কি খুব ভয়ানক যে তোমরা হরিবল-হরিবল (মানে হরিবোল আর কি!) চ্যাঁচাও-ইন্ডিয়ান গুবরে পোকা কি পাখিদের মতো গান গাইতে পারে, এ দেশের ছুঁচোরা কি শুয়োরের বংশধর? এই সব নানা কথা জিজ্ঞেস করতে করতে সে বললে–আচ্ছা মঁসিয়ো, তুমি তো হিমালয়াজে গিয়েছিলে, সেখানে ইয়েতি দেখেছ?
আমার হঠাৎ লোকটাকে নিয়ে মজা করতে ইচ্ছে হল। তার নাম ছিল লেলেফাঁ। আমি বেশ কায়দা করে তাকে বললুম, তুমি আছ কোথায় হে মঁসিয়ো লেলেফা? ইয়েতি দেখেছি মানে? আমি তো ধরেই এনেছি একটা।
–অ্যা, ধরে এনেছ?–লোকটা তিনবার খাবি খেল : কই, আজ পর্যন্ত কেউ তো ধরতে পারেনি।
আমি লেলেফাঁর বুকে দুটো টোকা দিয়ে বললুম, আমি পটলডাঙার টেনি শর্মা–সবাই যা পারে না, আমি তা পারি। আমার বাড়িতেই আছে ইয়েতি।
–অ্যাঁ!
–হ্যাঁ।
মঁসিয়ো লেলেফাঁ খানিকটা হাঁ করে রইল, তারপর ভেউভেউ করে কাঁদার মতো মুখ করলে, আবার কপ কপ করে তিনটে খাবি খেল–যেন মশা গিলছে। শেষে একটু সামলে নিলে চোটটা।
–আমায় দেখাবে ইয়েতি?
–কেন দেখাব না?
শুনে এমন লাফাতে লাগল লেলেফাঁ যে একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে চিতপাত হয়ে পড়ে গেল। আর একটু হলেই গড়িয়ে হাত তিরিশেক নীচে একটা গর্তে পড়ে যেত, আমি ওর ঠ্যাং ধরে টেনে তুললুম। উঠেই আমাকে দুহাতে জাপটে ধরল সে আর পাক্কা তিন মিনিট ট্যাঙো ট্যাঙো বলে নাচতে লাগল।
–চলল, এক্ষুনি দেখাবে।
আমি বললুম, সে হয় না মসিয়য়া, যখন তখন তাকে দেখানো যায় না। সে উইকে সাড়ে তিন দিন ঘুমোয়, সাড়ে তিন দিন জেগে থাকে। ঘুমের সময় তাকে ডিস্টার্ব করলে সে এক চড়ে তোমার মুণ্ডু
আমি জুড়ে দিলুম, কাঠমুণ্ডুতে উড়িয়ে দেবে।
টেনিদা বললে, রাইট। লেলেফাঁকে বললুম-কাল থেকে ইয়েতি ঘুমুচ্ছে। জাগবে, পরশু বারোটার পর। তারপর খেয়েদেয়ে যখন চাঙ্গা হবে–মানে তার মেজাজ বেশ খুশি থাকবে, তখন–মানে পরশু সন্ধের পর তোমাকে ইয়েতি দেখাব।
লেলেফাঁ বললে, আমার ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি তুলতে পারব তো?
খবরদার, ও কাজটিও কোরো না। ইয়েতিরা ক্যামেরা একদম পছন্দ করে না চাই কি খ্যাঁচ করে তোমায় কামড়েই দেবে হয়তো। তখন হাইড্রোফোবিয়া হয়ে মারা পড়বে।
ইয়েতি কামড়ালে হাইড্রোফোবিয়া হয়?
হাইড্রোফোবিয়া তো ছেলেমানুষ। কালাজ্বর হতে পারে, পালাজ্বর হতে পারে, কলেরা হতে পারে, চাই কি ইন্দ্রলুপ্ত–এমন কি সনন্ত ষঙন্ত প্রত্যয় পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।
ক্যাবলা প্রতিবাদ করল : সনন্ত ষঙন্ত প্রত্যয় কী করে
ইয়ু শাটাপ ক্যাবলা–সব সময় টিকটিকির মতো টিকিস-টিকিস করবিনি বলে দিচ্ছি। শুনে লেলেফাঁ ফরাসীতে বললে, মি ঘৎ। মানে-হে ঈশ্বর।
ক্যাবলা বললে, ফরাসীরা কি মি ঘৎ বলে নাকি
শাটাপ আই সে!–টেনিদা চেঁচিয়ে উঠল :ফের যদি তক্কো করবি, তা হলে এখুনি এক টাকার আলুর চপ আনতে হবে তোকে। যাকে বলে ফাইন।
ক্যাবলা কুঁকড়ে গেল, বললে, মী ঘৎ। থাক, আর তর্ক করব না, তুমি বলে যাও।
তবু তোকে আট আনার আলুর চপ আনতেই হবে। তোর ফাইন। যা–কুইক।
আমি বললুম, হুঁ, ভেরি কুইক।
বেগুনভাজার চাইতেও বিচ্ছিরি মুখ করে ক্যাবলা চপ নিয়ে এল।
বেড়ে ভাজে লোকটা–চপে কামড় দিয়ে টেনিদা বললে, যাকে বলে মেফিস্টোফিলিস।
আমি আকুল হয়ে বললাম, কিন্তু ইয়েতি?
ইয়েস ই য়ে স, ই য়ে তি। বুঝলি, আমার মাথায় তখন একটা প্ল্যান এসে গেছে। বাড়ি গিয়ে হরেকেষ্টবাবুকে বললুম সেটা। কুট্টিমামার ভায়রাভাই তো, খুব রসিক লোক, রাজি হয়ে গেলেন। তারপর ম্যানেজ করলুম কাইলাকে।
হাবুল বললে, কাইলা কেডা?
ও একজন নেপালী ছেলে–আমাদের বয়েসীই হবে। হরেকেষ্টবাবুর ডাক্তারখানায় চাকরি করে। খুব ফুর্তিবাজ সে। বললে, দাজু, রামরো রামরো। মানে–দাদা, ভালো, খুব ভালো।
ওদিকে সায়েবের আর সময় কাটে না।
–তোমার ইয়েতি কি এখনও ঘুমুচ্ছে?
নাক ডাকাচ্ছে।
সময়মতো জাগবে তো?
সময়মতো মানে? ঠিক বারোটায় উঠে বসবে। এক সেকেন্ডও লেট হবে না।
যা হোক–দিন তো এল। হরেকেষ্টবাবুর দোতলার হলঘরে আমি একটা কালো পর্দা টাঙালুম। প্ল্যান হল, খুব একটা ডিম লাইট থাকবে–আমি ধীরে ধীরে পর্দা সরিয়ে দেব। ইয়েতিকে দেখা যাবে। মাত্র দু মিনিট কি আড়াই মিনিট। তারপরেই আবার পর্দা ফেলে দেব।
আমি বললুম, কিন্তু ইয়েতি
ইয়ু শাটাপ–পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল! আরে, কিসের ইয়েতি? হরেকেষ্টবাবুর বাড়িতে মস্ত একটা ভালুকের চামড়া ছিল, প্ল্যান করেছিলুম কাইলা সেটা গায়ে পড়বে, আর একটা বিচ্ছিরি নেপালী মুখোশ এঁটে গোটা কয়েক লাফ দেবে–চেঁচিয়ে বলবে–দ্রাম-দ্রুম-ইয়াহু-মিয়াহু! ব্যস–আর দেখতে হবে না, ওতেই মঁসিয়ো লেলেফার দাঁতকপাটি লেগে যাবে।
